একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত?
স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

TruthBangla
Aug 24, 2025
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র একটি সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল না, এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত হওয়া অন্যতম বৃহৎ এবং সুপরিকল্পিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে একটি জাতির মরণপণ গণযুদ্ধ। অথচ স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। এই প্রবন্ধটি সেই সকল বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ইতিহাস, তথ্য এবং বাস্তবতার আলোকে একটি অকাট্য জবাব।
সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে যখন কিছু ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ ক্ষণে ক্ষণে নিজেদের রূপ বদল করে, শুধুমাত্র মনোযোগ আকর্ষণ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য, তখন আমাদের ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। পিনাকী ভট্টাচার্য একটা ভিডিওতে দাবি করেছেন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে মাত্র ২ হাজার মানুষ মারা গিয়েছেন। অথচ এই একই ব্যক্তি ২০১৩ সালে সামহোয়্যার ইন ব্লগে এক ব্লগপোস্টে রীতিমতো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছিলেন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। পিনাকী, ইলিয়াস, হিরো আলম - এরা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার। এরা ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদল করে।
আফসোস লাগে যে আমার ইতিহাসের জ্ঞান এতটাই কম যে, এই ধরনের বহুরূপী ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছে থেকে আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা নিতে হয়। আরো দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে এই ধরনের বিতর্ক, তামাশা বা মশকরা করা শুধুমাত্র ইতিহাসের বিকৃতি নয়, এটি দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করা শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা। বিশ্বে খুব কম জাতিই আছে যারা নিজেদের ইতিহাসের এই ভয়াবহ অধ্যায় নিয়ে এমন হীনমন্যতা ও বিকৃতি প্রদর্শন করে। প্রশ্ন হলো, কেন এই বিতর্ক? এই বিতর্ক সৃষ্টি করে একটি পক্ষ মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক ভিত্তি এবং এর ভয়াবহতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।
পরিসংখ্যান নয় – ব্যক্তিগত ও জাতীয় ট্র্যাজেডি
যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ‘৩ হাজার নাকি ৩০ লাখ’ তা নিয়ে তর্ক করতে আসেন, তারা হয়তো নিজেদের পরিবারে সরাসরি কোনো স্বজন হারাননি। আর এ কারণেই, গণহত্যার সংখ্যা তাদের কাছে কেবল একটি বিমূর্ত পরিসংখ্যান। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩ হাজার নাকি ৩০ লাখ তা নিয়ে তর্ক করতে আসেন। কিন্তু ছবির এই মানুষটা কিন্তু সেই তর্কে যান না। কারণ মুক্তিযুদ্ধে তিনি একাই হারিয়েছেন ২৭ জন স্বজনকে। তাও আবার এক রাতেই। যার মধ্যে রয়েছেন তাঁর বাবা, মা, পাঁচ ভাই-বোন, নানী, দুই মামা, মামী, খালা এবং ফুফা। ফেনীর ফুলগাজীর জামুড়া গ্রামে গেলে আজও দেখা পাবেন শহীদ স্বজন এই করিমুল হকের। গণহত্যার শিকার করিমুল হকের মতো মানুষের কাছে এটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এক রাতের বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডি।
এক রাতে ২৭ স্বজন হারানোর বেদনা
ফেনীর ফুলগাজীর জামুড়া গ্রামের শহীদ স্বজন করিমুল হক মাত্র এক রাতেই হারিয়েছেন তার বাবা, মা, পাঁচ ভাই-বোন, নানী, দুই মামা, মামী, খালা এবং ফুফাসহ মোট ২৭ জন স্বজনকে। এই ব্যক্তিগত ক্ষতি কি সামান্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব? যখন একটি পরিবার এমন চরম মূল্য দেয়, তখন সংখ্যা নিয়ে বিতর্ককারীরা আসলে সেই ত্যাগের গভীরতাকে অস্বীকার করেন।
শহীদের সংখ্যা নিয়ে তামাশা করার আগে, আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে, ৩০ লাখ সংখ্যাটি আসলে সেই ৩০ লাখ পরিবারের, সেই ৩০ লাখ ব্যক্তির, যারা চরম নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন।
গণহত্যার প্রামাণিক দলিল: কিছু বৃহৎ গণহত্যার চিত্র
মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যাগুলো ছিল সুপরিকল্পিত এবং জাতিগত নির্মূলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই হত্যাযজ্ঞকে এক প্রকার 'খেলা' হিসেবে নিয়েছিল, যেখানে বাঙালিরা ছিল কেবল 'শিকার'। এই নৃশংসতার মাত্রা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যাটিকে অনুধাবন করার জন্য গণহত্যার কয়েকটি বড় ঘটনা এবং তাদের বিবরণ জানা অপরিহার্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাদেশে কতগুলো বধ্যভূমি ছিল, তার প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারো। তবে, গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করা ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর কেবল দেশের ৪০টি জেলায়ই ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। এই ৪০টি জেলাতেই পাকিস্তানিদের টর্চার সেলের সংখ্যা ছিল ১,১১৮টি।
১. চুকনগর গণহত্যা – ৪ ঘণ্টার নৃশংসতা
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত হওয়া হাজারো গণহত্যার মধ্যে ১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল একটি গণহত্যা ছিল না; এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে সংঘটিত হওয়া বৃহত্তর গণহত্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনার নির্বিচার ব্রাশফায়ারে ১২ হাজারেরও বেশি নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চরম মূল্য এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার প্রামাণিক দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
শরণার্থীর স্রোত এবং চুকনগরের অবস্থান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় আক্রমণের পর বাঙালিরা বুঝে গিয়েছিল, মুক্তি ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নেমে আসে সীমাহীন নিপীড়ন। জীবন বাঁচাতে দলে দলে মানুষ পালাতে শুরু করে। তাদের প্রধান গন্তব্য ছিল সীমান্তবর্তী ভারত।
ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট এবং দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে বা নৌকাযোগে সীমান্তের দিকে ছুটতে শুরু করে। এই যাত্রাপথে ভারত সীমান্তে পৌঁছানোর জন্য খুলনার চুকনগর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট বা অস্থায়ী যাত্রাবিরতির স্থান।
চুকনগর ছিল যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত একটি ছোট জনপদ, যেখানে সামান্য বাজার ও কয়েকটি স্কুল ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চুকনগর বাজারে বহু শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। আশেপাশের গ্রামগুলোও জনসমাগমে ভরে উঠেছিল। ২০ মে-র আগেই এখানে লক্ষাধিক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, যারা কেবল একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন - কিভাবে সীমান্ত পেরোবেন। চুকনগরের মানুষও সাধ্যমতো তাদের আশ্রয় ও খাদ্য জুগিয়েছিলেন।
২০ মে ১৯৭১ – এক ভয়াবহ সকালের পূর্বাভাস
গণহত্যার দিন, অর্থাৎ ২০ মে ১৯৭১, চুকনগরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। শরণার্থী ও স্থানীয়রা ভাবতেও পারেননি যে, তাদের ওপর এমন চরম আঘাত আসতে চলেছে।
সেদিন সকালে হাজার হাজার মানুষ চুকনগর বাজারের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে পুরোনো বটগাছ এবং স্কুলের মাঠে অপেক্ষা করছিলেন। তারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে নৌকার ব্যবস্থা করছিলেন বা ভারতের দিকে পরবর্তী গন্তব্যের জন্য দলবদ্ধ হচ্ছিলেন।
দুপুর ১টার দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কয়েকটি সামরিক ট্রাক যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে চুকনগর বাজারে প্রবেশ করে। স্থানীয় কিছু রাজাকার ও বিহারীর দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতেই হানাদার বাহিনী এই স্থানটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: সীমান্তগামী শরণার্থীদের নির্মূল করা এবং গণহত্যা চালিয়ে বাকিদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে তারা দেশ ত্যাগ করতে না পারে।
৪ ঘণ্টার নৃশংসতা – পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম হত্যাযজ্ঞ
যে নৃশংসতাটি ঘটেছিল তা ছিল সুপরিকল্পিত এবং চরম নিষ্ঠুরতার উদাহরণ। মাত্র এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনা কোনো বাধা ছাড়াই এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। ট্রাকগুলো বাজার এলাকায় পৌঁছানোর পরই কোনো প্রকার হুঁশিয়ারি না দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে। পাকিস্তানি সেনারা শরণার্থীদের দিকে মেশিনগান ও রাইফেল তাক করে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার শুরু করে।
টার্গেট ছিল মানুষ: তারা বিশেষভাবে বটগাছের নিচে, বাজারের শেডের নিচে এবং স্কুলের মাঠে জড়ো হওয়া নিরস্ত্র, অভুক্ত মানুষগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এই মানুষগুলোর হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না; তারা ছিল কেবল প্রাণ বাঁচাতে পলায়নরত সাধারণ নাগরিক।
১২ হাজারেরও বেশি শহীদ: দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৪টা/৫টা পর্যন্ত, অর্থাৎ মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে, পাকিস্তানি সেনারা তাদের মেশিনগানের সমস্ত ম্যাগাজিন শেষ করে দেয়। এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তারা অন্তত ১২ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে সংঘটিত হওয়া অন্যতম বৃহত্তর গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত।
নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া – প্রকৃত সংখ্যা অজানা
গণহত্যার পর পাকিস্তানি সেনারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। কিন্তু নৃশংসতার চিহ্ন মুছতে তারা আরও একটি জঘন্য কাজ করেছিল। নিহতদের বেশিরভাগের লাশ চুকনগরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভদ্রা নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। গণহত্যার শিকারদের অধিকাংশই চুকনগর বা ডুমুরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন না, তারা ছিলেন অন্যান্য জেলার মানুষ। এই কারণেও নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কখনোই সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি।
আনুমানিক সংখ্যা: গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভদ্রা নদীর স্রোত, বৃষ্টি এবং লাশ অপসারণের কারণে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। কোনো কোনো সূত্র অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। যা-ই হোক না কেন, ১২ হাজার সংখ্যাটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং এটিই প্রমাণ করে যে, অল্প সময়েও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা সম্ভব।
গণহত্যার পরবর্তী দৃশ্য – নীরব সাক্ষী চুকনগর
পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর চুকনগরের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। এলাকাটি যেন এক মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল রক্তে ভেজা এক মৃত্যুপুরীতে। চুকনগরের বাজার, মাঠ এবং সড়কের ওপর জমাট বেঁধে থাকা রক্তের স্রোত প্রমাণ করছিল কী ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ ঘটে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেন, মানুষের রক্তে বাজারের জমি পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল।
গণকবর ও ত্রাণ: স্থানীয়ভাবে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের পক্ষে এতগুলো লাশ দাফন করা সম্ভব ছিল না। অনেকে সাহসিকতার সাথে গণহত্যার শিকারদের পরিচয় জানার চেষ্টা করেন এবং আশেপাশের ছোট ছোট গর্তে তাদের গণকবর দেন। তবে বেশিরভাগ লাশই ভদ্রা নদীর স্রোতে মিশে যায়। বেঁচে যাওয়া মানুষজন দ্রুত এলাকা ত্যাগ করায় গণহত্যার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
২. চট্টগ্রাম – বধ্যভূমির শহর
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমি ও টর্চার সেলের এক ভয়াবহ কেন্দ্রে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধরে এই বন্দর নগরীর আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল নিরীহ মানুষের আর্তনাদে। ইতিহাস ও তথ্য-উপাত্ত বলছে, চট্টগ্রামকে ‘বধ্যভূমির শহর’ বললে কোনো অত্যুক্তি হয় না।
চট্টগ্রামের ভূ-প্রকৃতি এবং গণহত্যার কৌশল
চট্টগ্রাম ভৌগোলিক দিক থেকে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেমন ছিল একটি প্রধান সমুদ্রবন্দর, তেমনি ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতে আক্রমণের ঘাঁটি। কিন্তু সামরিক গুরুত্বের আড়ালে, এখানকার পাহাড়ি এলাকা, ঘন জঙ্গল এবং নদীর তীরগুলো হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সহজ ক্ষেত্র।
কেন চট্টগ্রাম টার্গেট ছিল?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র: চট্টগ্রাম ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই অঞ্চলের মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমন করতে পারলেই পূর্ব পাকিস্তানের মনোবল ভেঙে দেওয়া সহজ ছিল।
ভূ-প্রাকৃতিক সুবিধা: পাহাড়, টিলা ও জঙ্গল থাকার কারণে হত্যা করার পর লাশ গুম করা বা গণকবর তৈরি করা সহজ ছিল। নদীর তীরগুলোও লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো, যা গণহত্যার সংখ্যা আড়াল করতে সাহায্য করত।
একশ’র বেশি বধ্যভূমি – এক নীরব সাক্ষ্য
চট্টগ্রামে সংঘটিত গণহত্যার মূল প্রমাণ হলো এর বধ্যভূমির ব্যাপকতা। সারাদেশে যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে গণহত্যা চলেছে, সেখানে চট্টগ্রাম ছিল গণহত্যার একটি সুসংগঠিত কেন্দ্র।
১১৬টি বধ্যভূমির সন্ধান: কেবল চট্টগ্রাম শহরেই ১১৬টি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। এই সংখ্যাটিই বলে দেয়, পুরো নয় মাস ধরে পরিকল্পিতভাবে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। এই বধ্যভূমিগুলো ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেললাইনের ধার, পাহাড়ের পাদদেশ, পুরাতন স্থাপনা এবং এমনকি লোকালয়ের আশপাশে।
মুক্তিযুদ্ধের পর, এই স্থানগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত মাথার খুলি, কঙ্কাল ও মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্র পাওয়া যায়, যা চট্টগ্রামের গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। প্রতিটি বধ্যভূমিই যেন এক একটি নীরব সাক্ষী, যা আজও সেই নৃশংসতার গল্প বহন করে।
দামপাড়া বধ্যভূমি – ৪০ হাজার শহীদের আর্তনাদ
চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম বৃহৎ এবং ভয়াল বধ্যভূমি ছিল দামপাড়া বধ্যভূমি। এই স্থানটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি পরিকল্পিত কিলিং জোন।
অবস্থান ও ভয়াবহতা: বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর গরিবুল্লাহ শাহর মাজার যেখানে অবস্থিত, সেখানেই ছিল এই বধ্যভূমি। এই স্থানটি ছিল শহরের কেন্দ্রস্থল সংলগ্ন, যা প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সেনারা লোকালয়ের কাছাকাছিও গণহত্যা চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।
হত্যার পদ্ধতি: প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং গবেষণামূলক তথ্যমতে, প্রতিদিন রাতে বেশ কয়েকটি ট্রাক ভর্তি করে সাধারণ মানুষ ধরে আনা হতো এই স্থানে। বন্দীদের দিয়ে নিজেদের কবর বা গর্ত খনন করানোর পর তাদের ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো এবং সেখানেই মাটিচাপা দেওয়া হতো।
৪০ হাজারের মতো মানুষকে হত্যা: মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রায় ৪০ হাজারের মতো নিরীহ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। প্রতিটি গর্ত যখন লাশে পূর্ণ হয়ে যেত, তখন হত্যাকারীরা পাশেই নতুন করে গর্ত খনন করত।
দামপাড়া বধ্যভূমি প্রমাণ করে, পাকিস্তানি বাহিনী তাদের হত্যার সংখ্যা নিয়ে কতটা উন্মত্ত ছিল। এটি ছিল শুধুমাত্র 'শাস্তি' নয়, বরং একটি জাতিগত নির্মূল অভিযান।
পাহাড়তলী বধ্যভূমি – খুলির স্তূপ ও নৃশংসতার প্রতিযোগিতা
চট্টগ্রামের গণহত্যার আরেক নারকীয় কেন্দ্র ছিল পাহাড়তলী বধ্যভূমি। এখানকার হত্যাকাণ্ডের বিবরণ শুনলে মানবতা স্তব্ধ হয়ে যায়।
১০০টি গণকবর: চট্টগ্রামের অন্যতম বড় এই বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার পর প্রায় ১০০টি গর্ত বা গণকবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এই গণকবরগুলো ছিল বিভিন্ন আকারের এবং বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত।
একটি গর্তে ১০৮২টি খুলি: গবেষক এবং উদ্ধারকারী দলগুলো যখন এই গণকবরগুলো খনন করে, তখন বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখতে পায়। এর মধ্যে একটি গর্তেই পাওয়া যায় ১ হাজার ৮২টি মাথার খুলি।
ভয়াবহতা: খুলিগুলোর এই বিশাল সংখ্যা ইঙ্গিত দেয় যে, এই স্থানে দিনের পর দিন হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পর দ্রুত মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। মাথার খুলিগুলো ছিল এলোমেলোভাবে ছড়ানো, যা নির্দেশ করে হত্যার পর তাদের কোনো প্রকার ধর্মীয় বা মানবিক মর্যাদা দেওয়া হয়নি, দ্রুত গণকবর দেওয়া হয়েছিল।
পাহাড়তলী বধ্যভূমি শুধু নিহতদের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং যেভাবে তাদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল, তার মধ্য দিয়েও পাকিস্তানি বাহিনীর পৈশাচিকতা তুলে ধরে।
অন্যান্য গণহত্যা – লালখান বাজার থেকে ওয়াসা মোড়
চট্টগ্রামের গণহত্যা কেবল দামপাড়া বা পাহাড়তলীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরো শহরেই বিচ্ছিন্ন ও সুপরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।
লালখান বাজারের হত্যাকাণ্ড: মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে, ৩০ মার্চ এবং পরবর্তী কয়েক দিনে চট্টগ্রামের লালখান বাজারে পাকিস্তানি বাহিনী ও স্থানীয় বিহারীরা একত্রিত হয়ে প্রায় আড়াই হাজার বাঙালিকে হত্যা করেছিল।
ওয়াসার মোড়ের নির্মমতা: একই সময়ে, ৩০ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা কৌশলে পানি সরবরাহের আশ্বাসে ওয়াসার মোড়ে নিরীহ সাধারণ মানুষকে জড়ো করে এবং সেখানে গণহত্যা চালায়। এই কৌশল ছিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি সাধারণ প্র্যাকটিস - আশ্বাসের নামে সাধারণ মানুষকে ডেকে এনে হত্যা করা।
ঢাকা ও তার আশেপাশে গণহত্যার বিভীষিকা
অনেকেই ২৫শে মার্চের 'অপারেশন সার্চলাইট' রাতের বিভীষিকাকেই ঢাকার গণহত্যার একমাত্র চিত্র মনে করেন। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা রাজাকার ও বিহারীরা ২৫ মার্চের পরেও নয় মাস ধরে ঢাকা মহানগরী ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোতে যে লাগাতার গণহত্যা চালিয়েছিল, তার ভয়াবহতা ছিল কল্পনাতীত। এই গণহত্যাগুলো প্রমাণ করে যে, পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো ছিল এক একটি জীবন্ত 'মৃত্যুকূপ'।
২৫শে মার্চের পরের ঢাকা – এক অনবরত মৃত্যুপুরী
২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মূলত ঢাকা শহরকে টার্গেট করে তাদের বর্বরোচিত সামরিক অভিযান শুরু করে। কিন্তু এই অপারেশন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ঢাকা এবং এর উপকণ্ঠে হত্যাকাণ্ড থেমে যায়নি। যারা দাবি করেন যে, ২৫শে মার্চের পরে আর কোনো বড় গণহত্যা হয়নি, তারা হয় সত্য জানতে চান না, নয়তো সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করেন।
ঢাকা শহরের পাশে অবস্থিত বিভিন্ন বধ্যভূমি, টর্চার সেল এবং গণকবরগুলো নীরব সাক্ষী হিসেবে আজও সেই দীর্ঘ নয় মাসের ভয়াবহতা বহন করছে। এই গণহত্যাগুলো পাকিস্তানি বাহিনীর 'জাতিগত নির্মূল অভিযান' (Ethnic Cleansing) নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ।
গাবতলী বধ্যভূমি – এক ভয়ঙ্কর 'মৃত্যুকূপ'
ঢাকার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গাবতলী এলাকায় সংঘটিত গণহত্যা ছিল সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজধানীর নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোর গণহত্যার এক ভয়াবহ উদাহরণ।
পুরনো স্টীল ব্রিজের শহীদদের কান্না
বর্তমান গাবতলী ব্রিজের পাশে থাকা পুরনো স্টীল ব্রিজটি ছিল সেই ভয়ঙ্কর গণহত্যার কেন্দ্রস্থল। এটি ছিল কার্যত একটি 'মৃত্যুকূপ' বা জলজ্যান্ত বধ্যভূমি। এই স্থানটি বেছে নেওয়ার কারণ ছিল কৌশলগত - লাশগুলো সহজেই বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দিয়ে প্রমাণ লোপাট করা যেত।
প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য: স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রায় প্রতিদিনই রাতে মিলিটারি ও বিহারীরা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাক ভর্তি নিরীহ বাঙালি ও স্বাধীনতা সমর্থকদের ধরে আনত। রাত ১২টা পার হওয়ার পরই ব্রিজের দুই পাশের বাতি নিভিয়ে শুরু হতো নির্বিচারে গুলি।
হত্যাকাণ্ডের মাত্রা: সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এমন কোনো রাত ছিল না, যে রাতে পাকিস্তানি সেনারা এই ব্রিজে মানুষ মারেনি। ধারণা করা হয়, শুধুমাত্র এই একটি ব্রিজে হানাদার বাহিনী ১৫ হাজারেরও বেশি বাঙালিকে হত্যা করেছিল। এই বিশাল সংখ্যাটিই প্রমাণ করে, ঢাকা সংলগ্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে নিয়মিত গণহত্যা চালানো হয়েছিল।
মিরপুর – কসাইখানা হিসেবে পরিচিত শহরতলী
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা শহরতলীর মিরপুর এলাকাটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের প্রধান দোসর বিহারী ও রাজাকারদের নৃশংসতার প্রতীক। অবাঙালি বিহারীদের আধিপত্য এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতা মিরপুরকে এক ধরনের 'কসাইখানায়' পরিণত করেছিল, যেখানে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের টার্গেট করে পাইকারি হারে হত্যা করা হতো।
২৩টি বধ্যভূমির বিভীষিকা
মিরপুর এলাকায় বধ্যভূমির সংখ্যা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে, গণহত্যা ছিল এখানে একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
বধ্যভূমির সংখ্যা: শুধুমাত্র মিরপুরেই ২৩টি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিটি বধ্যভূমিই বহন করে হাজারো শহীদের করুণ কাহিনি।
শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি: মিরপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়ঙ্কর ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। একাত্তরে এই জায়গার একপাশে ছিল বিশাল জঙ্গল। এই জঙ্গলে হাজার হাজার মানুষকে কুপিয়ে বা গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পরেও এই বধ্যভূমির ভয়াবহতা আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবন থেকে কমার্স কলেজ যেতে যে কালভার্টটি পড়ে, সেখানে উদ্ধার করা গিয়েছিল ৬০ বস্তা মাথার খুলি। খুলির এই বিশাল স্তূপ সেই সময়ের নৃশংসতার সাক্ষ্য বহন করে।
শিরনিরটেক ও আলোকদী গ্রামের ট্র্যাজেডি
মিরপুরের স্থানীয় গ্রামগুলোতেও পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা ছিল সীমাহীন:
শিরনিরটেক গণহত্যা: মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুরের শিরনিরটেক এলাকায় হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা প্রায় ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করে।
আলোকদী গ্রামের গণহত্যা (২৪-২৫ এপ্রিল): ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৫ এপ্রিল দুপুর ১টা পর্যন্ত মিরপুরের আলোকদী গ্রামে পাকিস্তানিরা এক ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন প্রায় ৩ হাজার নিরীহ মানুষ। এই গ্রামের মোট ৮টি কুয়া ভরে গিয়েছিল মানুষের লাশে। কুয়াগুলো ভরে যাওয়া লাশের দৃশ্যই বলে দেয়, কত দ্রুত এবং কত বড় আকারে এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছিল।
জিঞ্জিরা গণহত্যা – ২৫ মার্চের পরের প্রথম আঘাত
২৫শে মার্চের মূল অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা সংলগ্ন কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী আরেকটি বড় ধরনের গণহত্যা চালায়, যা ছিল ২৫ মার্চের পর ঢাকার আশেপাশে প্রথম বৃহৎ আকারের গণহত্যা।
সময় ও কারণ: ২৫ মার্চ রাতের মাত্র এক সপ্তাহ পরেই, অর্থাৎ এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় হামলা চালায়। এই আক্রমণের প্রধান কারণ ছিল, ঢাকা শহর থেকে প্রাণ বাঁচাতে বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষ পার্শ্ববর্তী জিঞ্জিরায় আশ্রয় নিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনারা ভেবেছিল, এখানেই হয়তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শহীদের সংখ্যা: এই গণহত্যায় ২ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডটি প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সেনারা তাদের অপারেশনাল এরিয়া থেকে প্রাণ বাঁচাতে যারা পালিয়ে যাচ্ছিল, তাদেরও ছাড় দেয়নি।
ঢাকার এই হত্যাকাণ্ডগুলো প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা ২৫শে মার্চের এক রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সুপরিকল্পিত এবং সুদূরপ্রসারী। ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করে এই ধারাবাহিক গণহত্যা ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেওয়ার একটি কৌশল। মিরপুর বা গাবতলীর মতো স্থানগুলোতে বিহারী ও রাজাকারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, স্থানীয় কিছু দোসর ছাড়া এই বিপুল পরিমাণ গণহত্যা চালানো পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অসম্ভব ছিল। এটি গণহত্যার অপরাধের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
গাবতলীর ১৫ হাজার, মিরপুরের বিভিন্ন বধ্যভূমির হাজার হাজার এবং জিঞ্জিরার ২ হাজার - এই বিশাল সংখ্যক শহীদের আত্মত্যাগই আমাদের ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যাটির ভয়াবহতা ও সত্যতা নিশ্চিত করে।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বধ্যভূমি
গণহত্যার ভয়াবহতা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছোট শহর, প্রত্যন্ত গ্রাম, খেয়াঘাট, রেলওয়ে স্টেশন - সবখানেই রচিত হয়েছিল মৃত্যুপুরী। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া, আর তার উপায় হিসেবে তারা বেছে নিয়েছিল নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন জেলার বধ্যভূমি ও টর্চার সেলের বিবরণ আমাদের গণহত্যার প্রকৃত চিত্র বুঝতে সাহায্য করে। এই স্থানগুলো ছিল কেবল হত্যাকাণ্ডস্থল নয়, ছিল অমানবিক নির্যাতনের কেন্দ্র।
ফতুল্লার হরিহরপাড়া – ২০ হাজার শহীদের করুণ গাঁথা
নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লার শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের হরিহরপাড়া গ্রাম ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার এক ভয়ংকর কেন্দ্র। এই গ্রামের গণহত্যা কেবল স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্যও উদ্বেগের কারণ ছিল।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ১৯৭২ সালের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হরিহরপাড়া গ্রামে গণহত্যার শিকার শহীদের আনুমানিক সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার।
ব্যাপকতার কারণ: মূলত ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে যখন নৌপথে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছিলেন, তখন শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী এই গ্রামটি ছিল তাদের গন্তব্য বা যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তানি বাহিনী এখানে অতর্কিত হামলা চালিয়ে এবং আটক করে এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, যা নদীপথের যাত্রীদের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়।
লাকসামের 'হত্যাপুরী' – বেলতলী বধ্যভূমি
কুমিল্লা জেলার লাকসামের চিত্রও ছিল igualy (সমানভাবে) ভয়াবহ। লাকসাম জংশনের পাশে অবস্থিত একটি সিগারেট ফ্যাক্টরি, যা স্থানীয়ভাবে বেলতলী নামে পরিচিত, মুক্তিযুদ্ধের সময় এক নারকীয় বধ্যভূমিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
১০ হাজারেরও বেশি শহীদ: এই বধ্যভূমিতে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকাররা।
দৈনিক পূর্বদেশ-এর বর্ণনা: ১৯৭২ সালেই দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই স্থানটিকে 'হত্যাপুরী' হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, "বিগত নয়টি মাসে এই ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কোণায়, বিভিন্ন কক্ষে ও কোঠায়, বিভিন্ন সেলে এবং ছাদে যে অত্যাচার, নারী ধর্ষণ ও নির্বিচারে গণহত্যা চলেছিল তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।”
নিয়মিত হত্যাকাণ্ড: রেলওয়ে জংশন হওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থান থেকে আটককৃত বাঙালিদের এখানে এনে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। লাকসামবাসীদের জন্য এই ফ্যাক্টরির কালো দেয়ালগুলো আজও সেই ভয়াবহ স্মৃতির নীরব সাক্ষী।
ডাকাতিয়া নদীর গণহত্যা ও বধ্যভূমি
কুমিল্লার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত গণহত্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডাকাতিয়া নদীর তীরে সংঘটিত নৃশংসতা। নদীটি কুমিল্লার জনজীবনের প্রাণ হলেও একাত্তরে তা পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকার ও আল-বদররা নিরীহ বাঙালি, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সমর্থকদের ধরে এনে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করত।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত। স্থানীয় দালালরা প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থক এবং বিত্তশালী বাঙালিদের তালিকা করত। এরপর পাকবাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে আনত। বন্দীদের নৃশংসভাবে নির্যাতন করার পর বেয়োনেট চার্জ করে বা গুলি করে হত্যা করা হতো। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও অনেকে জীবন বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিতেন, কিন্তু জল্লাদদের গুলিতে সেখানেই প্রাণ হারাতেন।
ডাকাতিয়া নদীর তীরে সংঘটিত গণহত্যার শিকার হওয়া মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যমতে, এই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থান গণকবরে পরিণত হয়েছিল। লাশগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, যা নদীর স্রোতে ভেসে যেত বা বালির নিচে চাপা পড়ে যেত।
যদিও কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, ঐতিহাসিকগণ এবং গবেষকগণ অনুমান করেন যে, কেবল ডাকাতিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকাতেই কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এটি ছিল কুমিল্লার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ একক গণহত্যা।
ডাকাতিয়া নদীর তীর ছাড়াও কুমিল্লা জেলায় অসংখ্য স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্থানগুলো হলো সেই নীরব সাক্ষী, যেখানে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
কুমিল্লার চিহ্নিত বধ্যভূমি
কুমিল্লা জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় বধ্যভূমি এবং গণকবর পাওয়া যায়। সরকারিভাবে চিহ্নিত কিছু প্রধান বধ্যভূমি হলো
কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন বধ্যভূমি: এটি ছিল জেলার অন্যতম বৃহৎ বধ্যভূমি। ক্যান্টমেন্টে নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো এবং পরে এখানে হত্যা করা হতো।
বেলতলী বধ্যভূমি (সদর দক্ষিণ): কুমিল্লার অন্যতম পরিচিত বধ্যভূমি এটি। এখানেও বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
লাকসামের বধ্যভূমি: লাকসাম রেলওয়ে জংশন এবং তার আশেপাশের এলাকাও পাকবাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছিল।
ব্রাহ্মণপাড়া বধ্যভূমি (বুড়িচং): এখানেও অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।
কুমিল্লা টাউন হল এবং জেলা পরিষদ সংলগ্ন বধ্যভূমি: শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই স্থানগুলোতেও বহু মানুষ শহীদ হন।
কুমিল্লা জেলায় কতটি বধ্যভূমি রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন। কারণ বহু স্থান এখনও অনাবিস্কৃত বা সরকারি নথিতে স্থান পায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলায় অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বধ্যভূমি বা গণকবর রয়েছে।
খুলনার গল্লামারী বধ্যভূমি – রক্তের স্রোত ও আত্মদানের প্রতীক
খুলনা শহরের গল্লামারী বধ্যভূমি গণহত্যার আরেক ভয়ংকর দলিল। এই বধ্যভূমিটি ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান কিলিং জোনগুলোর অন্যতম।
২৫ হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড: কেবল খুলনা শহরের এই গল্লামারী বধ্যভূমিতেই পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল।
লাশ গুমের কৌশল: পাকিস্তানি সেনারা এখানে মানুষ হত্যা করে গল্লামারী খাল ও সংলগ্ন জলাশয়ে লাশ ফেলে দিত। লাশ পচনের ফলে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। পাকিস্তানি সেনাদের এই কৌশল ছিল একদিকে দ্রুত লাশ গুম করা, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের মনে চরম ভীতি সঞ্চার করা। এই ২৫ হাজার সংখ্যাটিই প্রমাণ করে, শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় শহরগুলোতেই গণহত্যার ভয়াবহতা কেমন ছিল।
দিনাজপুরের টিঅ্যান্ডটি টর্চার সেল – ৩ ইঞ্চি পুরু রক্ত জমাট
গণহত্যার পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনী দেশজুড়ে অসংখ্য টর্চার সেল বা নির্যাতন কেন্দ্র স্থাপন করেছিল, যেখানে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর চালানো হতো অমানবিক অত্যাচার। দিনাজপুরের টিঅ্যান্ডটি অফিস ছিল তেমনই এক ভয়ংকর নির্যাতন কেন্দ্র।
১০ হাজার বাঙালির উপর নির্যাতন: ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই টর্চার সেলের ভয়াবহ বিবরণ পাওয়া যায়। এই সেলে প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে নির্যাতন করা হয়েছিল।
রক্তের জমাট: প্রতিবেদনের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশটি ছিল – সেলের মেঝেতে প্রায় ৩ ইঞ্চি পুরু রক্ত জমাট বাঁধা ছিল। এই বিবরণটিই বলে দেয়, কত দীর্ঘ সময় ধরে এবং কী পরিমাণ রক্তক্ষরণ এই নির্যাতন কেন্দ্রে ঘটেছিল। টর্চার সেলের মেঝেতে জমাট বাঁধা রক্ত কোনো একক হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ছিল দিনের পর দিন ধরে চালানো অমানবিক নির্যাতনের ফল।
১৭,৪৫৪টি গণহত্যা ও ১,১১৮টি টর্চার সেলের ভয়াবহতা
অনেকেই ভুলবশত মনে করেন যে, ১৯৭১ সালের হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল যুদ্ধের ডামাডোলে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন কিছু নৃশংসতা। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত, বিশেষ করে গণহত্যার গবেষণাভিত্তিক প্রমাণসমূহ, স্পষ্টভাবে দেখায় যে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল পাকিস্তানি হায়েনাদের নয় মাস ধরে পরিচালিত ফুল স্কেলের এক সুপরিকল্পিত যুদ্ধাপরাধ। বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার একটি সুসংগঠিত নীলনকশা অনুযায়ী এই বর্বরতা চালানো হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের এই ভয়াবহতা অনুধাবন করার জন্য, '১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর'-এর গবেষণালব্ধ তথ্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে। এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সংখ্যাগুলোই প্রমাণ করে, হত্যা ও নির্যাতন ছিল পাকিস্তানি সামরিক কৌশলের মূল অংশ।
স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, বাংলাদেশের গণহত্যার শিকার হওয়া স্থানগুলো চিহ্নিতকরণের কাজ চলমান। তবে '১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর'-এর গবেষণা আমাদের সামনে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে।
৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করা এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪০টি জেলায় গণহত্যার যে চিত্র তুলে এনেছে, তাতে দেখা যায়, এই নির্দিষ্ট ৪০টি জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে।
ব্যাপকতার বিশ্লেষণ: এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নির্দেশ করে যে, দেশের প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি জনপদ গণহত্যার শিকার হয়েছে। যদি মাত্র ৪০টি জেলায় এই সংখ্যক গণহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে বাকি ২৪টি জেলায় এর সংখ্যা যুক্ত হলে তা এক বিশাল আকার ধারণ করবে।
গণহত্যা কী?: মনে রাখা জরুরি, একটি 'গণহত্যা' (Mass Killing) মানেই সেখানে কেবল একজন বা দুজন হত্যার শিকার হননি। এর মানে হলো, এটি এমন একটি স্থান যেখানে সামরিক বাহিনী বা তাদের দোসররা দলবদ্ধভাবে, ব্যাপক আকারে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। চুকনগরের মতো একটি স্থানে ৪ ঘণ্টায় ১২ হাজার মানুষকে হত্যার ঘটনাও এর অন্তর্ভুক্ত, আবার কোনো গ্রামের একটি নির্দিষ্ট স্থানে ২০-৩০ জনকে হত্যার ঘটনাও এর অন্তর্ভুক্ত। এই ১৭,৪৫৪টি ঘটনার পেছনে থাকা মোট শহীদের সংখ্যাটি তাই ৩০ লাখের হিসাবকে সমর্থন করে।
এই বিপুল সংখ্যক গণহত্যার স্থান চিহ্নিত হওয়ার অর্থ হলো - পাকিস্তানিরা এমন কোনো স্থান বাকি রাখেনি যেখানে বাঙালিরা নিরাপদ বোধ করতে পারে। তারা শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানেনি; তাদের লক্ষ্য ছিল:
ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি: সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভয় সৃষ্টি করে প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া।
মেধাশূন্য করা: বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং পেশাজীবীদের হত্যা করে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করা।
হিন্দু ও অমুসলিম নির্মূল: সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন চালিয়ে তাদের বিতাড়িত বা হত্যা করা।
৪০ জেলায় ১,১১৮টি টর্চার সেল
গবেষণায় দেখা গেছে, ঐ ৪০টি জেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর স্থাপিত টর্চার সেলের সংখ্যা ছিল অন্তত ১,১১৮টি।
কৌশলগত ব্যবহার: এই টর্চার সেলগুলো সাধারণত স্কুল, কলেজ, সরকারি ভবন, রেলওয়ের বাংলো বা পরিত্যক্ত স্থাপনায় তৈরি করা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল:
স্বাধীনতার পক্ষের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে এনে তথ্য বের করা।
যৌন নির্যাতন (যুদ্ধকালীন ধর্ষণ) করা।
দীর্ঘ ও বীভৎস নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে জনগণের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া।
কাঠামোগত প্রমাণ: ১,১১৮টি টর্চার সেলের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে, হত্যাকাণ্ড ছিল সামরিক কৌশল নয়, বরং একটি সুসংগঠিত জাতিগত নির্মূল অভিযান। একটি সুসংগঠিত বাহিনী যখন একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য এত বিপুল সংখ্যক নির্যাতন কেন্দ্র পরিচালনা করে, তখন বোঝা যায়, এটি ছিল তাদের যুদ্ধাপরাধের মূল কাঠামো।
টর্চার সেলের ভয়াবহতার উদাহরণ
টর্চার সেলের বর্ণনাগুলো এতই ভয়াবহ যে, তা যেকোনো সুস্থ মানুষের মনকে নাড়া দিতে বাধ্য।
দিনাজপুর টিঅ্যান্ডটি টর্চার সেল: ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনাজপুরের টিঅ্যান্ডটি অফিসে একটি টর্চার সেলে প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে নির্যাতন করা হয়। সেই সেলের মেঝেতে নাকি ৩ ইঞ্চি পুরু রক্ত জমাট বাঁধা ছিল।
বেলতলী (লাকসাম) হত্যাপুরী: লাকসাম জংশনের কাছে অবস্থিত সিগারেট ফ্যাক্টরিটি স্থানীয়ভাবে 'হত্যাপুরী' নামে পরিচিত ছিল। এটিও ছিল একটি বিশাল টর্চার সেলের কেন্দ্র, যেখানে নির্যাতন, নারী ধর্ষণ ও নির্বিচারে গণহত্যা চলেছিল।
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, প্রতিটি টর্চার সেল ছিল একেকটি মৃত্যুপুরী, যেখানে মানুষের উপর চরম অমানবিক অত্যাচার চালানো হতো।
৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা – আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ঐতিহাসিক দলিল
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে যখনই কোনো বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হয়, তখনই প্রয়োজন হয় ইতিহাসের সেই অমোঘ সত্যগুলোকে সামনে নিয়ে আসার, যা কেবল দেশীয় দলিল নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সংবাদমাধ্যম এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রেও প্রতিষ্ঠিত। ৩০ লাখ শহীদ কোনো আবেগপ্রবণ উচ্চারণ নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক সত্যের দলিল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রাথমিক অনুমান – যুদ্ধকালীন তথ্য
মুক্তিযুদ্ধ যখন চলছে, তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বিশ্ব থেকে গণহত্যার তথ্য আড়াল করার সব রকম চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ও পত্রিকাগুলোর সাহসী সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই গণহত্যার ভয়াবহতা অনুমান করতে শুরু করে।
নিউজ উইক – প্রথম দিকেই ৭ লাখের ইঙ্গিত
বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’ (Newsweek) ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক প্রতিবেদনে পূর্ব পাকিস্তানে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে।
প্রতিবেদন: নিউজ উইকের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানে চলমান যুদ্ধে তখন পর্যন্ত (অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের মধ্যেই) প্রায় ৭ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
তাৎপর্য: এই সংখ্যাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ছিল যুদ্ধের একেবারে প্রাথমিক দিকের হিসাব। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৭ লাখ শহীদের সংখ্যাটিই প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি বাহিনী কী ধরনের ফুল-স্কেল গণহত্যা শুরু করেছিল। নয় মাসের শেষে এই সংখ্যাটি যে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, তা সহজেই অনুমেয় ছিল।
দ্য হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস – ২০ লাখের অনুমান
যুদ্ধ যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমান আরও স্পষ্ট হতে শুরু করে।
প্রতিবেদন: ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দ্য হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস’ (The Hampstead and Highgate Express) পত্রিকার এক প্রতিবেদনে পূর্ব বাংলার যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়।
সংখ্যা: এই প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব বাংলার যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ২০ লাখ।
তাৎপর্য: অক্টোবর মাসের মধ্যেই ২০ লাখের কাছাকাছি মানুষের নিহত হওয়ার এই তথ্যটি নিশ্চিত করে যে, গণহত্যা ধীরে ধীরে নয় মাসের দীর্ঘ পথ ধরে চলতে থাকে এবং এর ব্যাপকতা ছিল অভাবনীয়।
এই প্রাথমিক আন্তর্জাতিক অনুমানগুলো স্পষ্ট করে যে, ৩০ লাখের সংখ্যাটি কোনো মনগড়া বা হঠাৎ করে দেওয়া ঘোষণা নয়, বরং এটি ছিল নয় মাস ধরে চলতে থাকা ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত গণহত্যার একটি যৌক্তিক পরিণতি।
প্রাভদা পত্রিকার প্রতিবেদন – বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার আগেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
৩০ লাখ শহীদের সংখ্যাটিকে কেবল 'শেখ মুজিবের তিন লাখকে ভুল করে তিন মিলিয়ন বলা' বলে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান, তাদের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘প্রাভদা’ (Pravda) পত্রিকার প্রতিবেদনটি একটি অকাট্য জবাব।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হিসেবে প্রাভদা ছিল বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী একটি সংবাদপত্র। বিজয়ের মাত্র তিন সপ্তাহ পরে, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি, প্রাভদা পত্রিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনের শিরোনাম: ‘পূর্ব পাকিস্তানের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা গোপন করা সম্ভব হয়নি’ (The brutality of the Pakistani army on East Pakistan could not be hidden)।
শহীদ সংখ্যা: এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চলমান গণহত্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এই তথ্যটি আন্তর্জাতিকভাবে ৩০ লাখের সংখ্যাটিকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
সময়কাল: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেছিলেন। প্রাভদার প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় তারও এক সপ্তাহ আগে।
প্রমাণ: এটি প্রমাণ করে যে, ৩০ লাখের সংখ্যাটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত, পর্যবেক্ষণ ও প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে করা একটি ঐতিহাসিক অনুমান।
মুক্তিযুদ্ধে দলিলপত্র ও গবেষণার সুযোগ
শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের অবসানের জন্য তথ্যের উৎসগুলো উন্মুক্ত ও সহজলভ্য। যারা তথ্যভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগৃহীত দলিলপত্রই প্রধান উৎস।
১৫ খণ্ডের দলিলপত্র – তথ্য অনুসন্ধানের ভিত্তি
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রগুলো হলো সেই সময়ের ঘটনাবলী, চিঠি, রিপোর্ট, সামরিক নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যের এক বিশাল সংগ্রহ।
দলিলপত্রের সৃষ্টি: বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, এই ১৫ খণ্ডের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের মূল গবেষণার কাজ শুরু হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৮২ সালের দিকে)। ফলে, এই দলিলগুলো কোনো একক রাজনৈতিক দলের প্রোপাগান্ডা নয়, বরং এটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংগৃহীত তথ্যভান্ডার।
সুস্পষ্ট ধারণা: এই বিশাল দলিলগুলো মনোযোগ সহকারে পর্যালোচনা করলে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, গণহত্যাগুলোর ব্যাপকতা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার চিত্র সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এই দলিলগুলোই পরোক্ষভাবে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যাটিকে সমর্থন করে, কারণ সেখানে উল্লিখিত গণহত্যার ঘটনার সমষ্টিগত ভয়াবহতা এই সংখ্যাটিকে যৌক্তিক প্রমাণ করে।
সীমান্তের ওপারে শরণার্থী মৃত্যু – অনস্বীকার্য ট্র্যাজেডি
এই আলোচনাগুলোর ভিড়ে একটি চরম সত্য প্রায়শই চাপা পড়ে যায় - তা হলো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করা কোটি মানুষের মানবেতর জীবন এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘটে যাওয়া লাখ লাখ মৃত্যু। এই মৃত্যুগুলো সরাসরি বুলেটের আঘাতে না হলেও, তা ছিল গণহত্যারই পরোক্ষ পরিণতি।
শরণার্থী সংকট - গণহত্যার অপরিহার্য ফল
একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের পথে যে বিপুল মানবীয় মূল্য দিতে হয়, তার একটি বড় অংশ হলো বাস্তুচ্যুতি এবং শরণার্থী সংকট। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রির পর যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে, তখন লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগ কেবল সামরিক হামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত জাতিগত নির্মূল অভিযানের অনিবার্য ফল।
মুক্তিযুদ্ধকালীন এই শরণার্থী মৃত্যু নিয়ে বিতর্কের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয় - আর তা হলো শরণার্থী মৃত্যু। এই ট্র্যাজেডিটি মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যার বাইরে আরেকটি বৃহত্তর মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা – প্রতি ৭ জনে ১ জন শরণার্থী
মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটির কিছু বেশি। এই সীমিত জনসংখ্যার তুলনায় ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল অভাবনীয়ভাবে বিশাল।
১ কোটি শরণার্থীর ভিড়: আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (আইসিআরসি) এবং ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রায় ১ কোটি বাঙালি ভারতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। এই সংখ্যাটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এবং দ্রুততম মানব স্থানান্তরের ঘটনা।
জনসংখ্যার অনুপাতে প্রভাব: এর অর্থ দাঁড়ায়, তৎকালীন বাংলাদেশের প্রতি ৭ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন ছিলেন শরণার্থী। একটি দেশের জনসংখ্যার এতো বড় একটি অংশকে একযোগে ঘরবাড়ি, সম্পদ ও মাতৃভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা প্রমাণ করে, দেশের অভ্যন্তরে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল এবং পাকিস্তানি বাহিনী কী মাত্রায় নিপীড়ন চালিয়েছিল।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের শরণার্থী হওয়াটাই প্রমাণ করে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য ছিল শুধু বিদ্রোহ দমন করা নয়, বরং একটি পুরো জাতিকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা।
সীমান্তের ওপারে জীবন – অপুষ্টি ও মহামারীর শিকার
শরণার্থী শিবিরে জীবন ছিল চরম মানবেতর। যুদ্ধের উত্তাপ থেকে রক্ষা পেলেও, এই মানুষগুলো সেখানে মুখোমুখি হয়েছিলেন অপুষ্টি, রোগ এবং মহামারীর মতো নীরব ঘাতকের।
মৌলিক সুবিধার অভাব: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যে দ্রুত তৈরি হওয়া এই শিবিরগুলোতে রাতারাতি এতো মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, চিকিৎসা, স্যানিটেশন এবং আশ্রয় দেওয়া সম্ভব ছিল না।
মানবেতর দিনযাপন: বেশিরভাগ শরণার্থীকেই প্রচণ্ড ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হতো। সামান্য পলিথিন বা বাঁশের মাচার নিচে এক কোটিতেও বেশি মানুষের জীবনধারণ ছিল এক মর্মান্তিক দৃশ্য।
চিকিৎসার অপ্রতুলতা: লাখ লাখ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি ছিল এক মারাত্মক সমস্যা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা সহজেই রোগে আক্রান্ত হচ্ছিলেন।
৬ লক্ষাধিক মানুষের করুণ মৃত্যু
অপুষ্টি এবং দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে শরণার্থী শিবিরগুলোতে দ্রুত সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। এই রোগগুলোই সেখানে প্রধান ঘাতক হয়ে ওঠে।
কলেরার মহামারী: শিবিরগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল কলেরা এবং আমাশয়ের মতো জলবাহিত রোগের কারণে। সঠিক স্যানিটেশন এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব এই মহামারিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে।
মৃত্যুর সংখ্যা: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং ভারত সরকারের কিছু নথি অনুযায়ী, শুধুমাত্র কলেরাসহ বিভিন্ন মহামারিতে শরণার্থী শিবিরগুলোতে অন্তত ৬ লাখ শরণার্থী মৃত্যুবরণ করেন। এই সংখ্যাটি হলো গণহত্যার শিকার না হয়েও কেবল বাস্তুচ্যুতির কারণে অপঘাতে মৃত্যুর এক বিশাল ট্র্যাজেডি।
এই ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু ছিল স্বাধীনতার জন্য দেওয়া পরোক্ষ মূল্য। তারা সরাসরি পাকিস্তানিদের বুলেটের শিকার না হলেও, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চালানো বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের ফলেই তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল এবং সেই চরম কষ্টের ফলস্বরূপ তাদের জীবনাবসান ঘটেছিল।
শহীদের স্বীকৃতির বাইরেও ট্র্যাজেডি
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ৫ লাখ শরণার্থী মৃত্যু একটি গুরুতর প্রশ্ন তোলে: এই মৃত্যুর দায় কার? এই মানুষগুলো স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করে শরণার্থীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তারা গণহত্যার শিকার হননি বলে প্রচলিত ৩০ লাখ শহীদের হিসাবে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এই মৃত্যুগুলো পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর 'পুশ-ফ্যাক্টরের' (ঠেলে বের করে দেওয়া) সরাসরি ফল। তাদের দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা না হলে, এই অপমৃত্যুগুলো ঘটত না।
শরণার্থী শিবিরে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু সেসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে ভারতকে চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই সংকটই বিশ্বকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলা নৃশংসতা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন করে তোলে। তবে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন শহীদের সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা চলে, তখন এই শরণার্থী মৃত্যুগুলো ঐতিহাসিক আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারেনি। এটি এক ধরনের নীরব ট্র্যাজেডি হিসেবেই থেকে গেছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য ও মানসিক বিকৃতি
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা কত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের নিজেদের ভেতরের সাক্ষ্য ও ঘটনার বিবরণী থেকে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যাকে একটি ‘খেলা’ বা ‘প্রতিযোগিতা’ হিসেবে নিয়েছিল।
গওহর আইয়ুবের বইয়ে ভয়ংকর স্বীকারোক্তি
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুবের লেখা ‘Glimpses into the Corridors of Power’ বইয়ে একটি ভয়ানক বর্ণনা রয়েছে। তিনি তার বাবা পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
মানসিক বিকারগ্রস্ত অফিসার: রাওয়ালপিন্ডির একটি সামরিক হাসপাতালে এক পাকিস্তানি অফিসারকে মানসিক চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার পর তিনি মারাত্মক মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। যুদ্ধের কথা মনে হলেই তার শরীরে খিঁচুনি দিয়ে জ্বর আসত, ঘুমে দুঃস্বপ্ন দেখতেন - কেউ যেন তাকে বলত, বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে হিন্দুদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এই অফিসার একাই যুদ্ধের সময় ১৪ হাজারের বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিলিং স্কোয়াড ও স্কোরের প্রতিযোগিতা
পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের দৃষ্টিতে বাঙালিরা ছিল 'নিম্নমানের মুসলমান', অনেকটা 'হাফ হিন্দু'। এই নোংরা প্রজাতিকে হত্যা করা তাদের কাছে বৈধ ছিল - এই বিকৃত থিওরি নিয়েই তারা গণহত্যায় মেতে উঠেছিল।
স্কোরের প্রতিযোগিতা: ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি সেনারা যখন অভিযানে বের হত, তখন ফিরে আসার পরে একজন আরেকজনের কাছে তাদের 'স্কোর' জিজ্ঞেস করত। এই স্কোর মানে ছিল, কে কতজনকে হত্যা করেছে। এটি নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত।
কিলিং স্কোয়াড: মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীতে এমন অনেক 'কিলিং স্কোয়াড' বা বিশেষ ঘাতক দল ছিল, যাদের একমাত্র কাজই ছিল মানুষ হত্যা করা। এই কিলিং স্কোয়াডগুলোর অস্তিত্বই প্রমাণ করে, হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় নীতি।
উপসংহার
একটি যুদ্ধে কতজন মানুষ মারা গিয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা কখনোই নির্ণয় করা যায় না। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও মৃতের সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৮ কোটি ৫০ লাখের মধ্যে আনুমানিক ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ৩০ লাখ সংখ্যাটি কোনো একক জরিপের ফল নয়, এটি গণহত্যা, যুদ্ধকালীন মৃত্যু ও আন্তর্জাতিক তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া একটি সর্বজনীনভাবে গৃহীত ও প্রামাণিক অনুমান।
যারা ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যাটিকে বিকৃত করতে চান, তারা মূলত:
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার দায়কে লঘু করতে চান।
জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাসকে অপমানের মাধ্যমে দুর্বল করতে চান।
কিন্তু ইতিহাস কোনো বহুরূপী ইনফ্লুয়েন্সারের ব্যক্তিগত মন্তব্যের উপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস নির্ভর করে করিমুল হকের মতো স্বজনহারাদের চোখের জলের উপর, চুকনগরের নদীর জলে ভেসে যাওয়া লাশের উপর, গাবতলী ব্রিজের নিচে জমাট বাঁধা রক্তের উপর, এবং আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের স্বীকারোক্তির উপর।
৩০ লাখ শহীদ - এই সংখ্যাটি তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাঙালি জাতির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, রক্তের ঋণ এবং প্রতিবাদের প্রতীক। ইতিহাস বিকৃতির এই অপচেষ্টাকে রুখতে প্রতিটি সচেতন নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র এবং প্রামাণিক তথ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখা অপরিহার্য।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















