যে স্কুল থেকে জন্ম নিল ৩৯ মুক্তিযোদ্ধা ও ৪ খেতাবপ্রাপ্ত বীর
জামালপুরের বকশীগঞ্জে অবস্থিত ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের। এটিই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে অন্তত ৩৩ জন (মূল তথ্যে ৩৯ জন বলা হলেও, যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী ৩৩ জন) ছাত্র সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এবং তাদের মধ্যে তিন জন ছাত্র চারটি বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব লাভ করেন।

TruthBangla
Dec 6, 2025
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন অসংখ্য বিস্ময়কর অধ্যায় লুকিয়ে আছে, যা জাতীয় পর্যায়ে তেমন স্বীকৃতি পায়নি। আমরা প্রায়শই বৃহৎ সামরিক কৌশল বা রাজনৈতিক নেতাদের বীরত্ব নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু নীরব মফস্বল থেকে উঠে আসা কিশোর যোদ্ধাদের গল্পগুলো এখনো রয়ে গেছে ইতিহাসের ধূসর পাতায়। তেমনি এক গৌরবোজ্জ্বল কিন্তু প্রায় বিস্মৃত ইতিহাস হলো - জামালপুরের বকশীগঞ্জে অবস্থিত ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের। এটিই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে অন্তত ৩৩ জন (মূল তথ্যে ৩৯ জন বলা হলেও, যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী ৩৩ জন) ছাত্র সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এবং তাদের মধ্যে তিন জন ছাত্র চারটি বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব লাভ করেন। এই স্কুলটি একাত্তরে পরিণত হয়েছিল কিশোর বীরদের এক নীরব প্রশিক্ষণা কেন্দ্রে।
নীরব গৌরবগাথা ও বিস্মৃতির পর্দা
১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় - সাধারণ একটি গ্রাম্য স্কুল। কিন্তু এর অবদান দেশের শ্রেষ্ঠ সামরিক একাডেমিগুলোর চেয়েও কম নয়। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাতির স্বাধীনতার জন্য স্কুলের কিশোর ছাত্ররা কী অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ করতে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই প্রতিষ্ঠান।
একটি একক স্কুল থেকে ৩৩ জন (মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকা অনুযায়ী) ছাত্রের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং এর মধ্যে তিনজন ছাত্রের চারটি সামরিক খেতাব অর্জন - এটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনস্বীকার্য সত্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ইতিহাস শুধু সাধারণ জনগণই নয়, স্বয়ং ওই স্কুলের বর্তমান ছাত্ররাও অনেকে জানে না। এই বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এই মহানায়কদের স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
ধানুয়া কামালপুর – রণক্ষেত্র সংলগ্ন একটি স্কুল
ধানুয়া কামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থানগত গুরুত্ব এর ঐতিহাসিক ভূমিকাকে বুঝতে সাহায্য করে। বকশীগঞ্জের এই এলাকাটি ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী এবং মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ফলে এই অঞ্চলটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জন্য একটি প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
ভৌগোলিক গুরুত্ব ও ১১ নম্বর সেক্টর
ধানুয়া কামালপুর গ্রামটি ভারতীয় সীমান্তের এত কাছে ছিল যে, মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যেতে এবং অপারেশন শেষে ফিরে আসতে পারতেন। এটি ছিল সামরিক ট্রানজিটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
এই অঞ্চলটি ছিল কর্নেল তাহের (পরবর্তীতে কর্নেল আবু তাহের) এবং উইং কমান্ডার এম হামিদুল্লাহ খানের অধীনে থাকা ১১ নম্বর সেক্টরের কর্মপরিধির অন্তর্ভুক্ত। এই সেক্টরটির গেরিলা যুদ্ধ এবং সম্মুখ সমরে অবদান ছিল অসাধারণ।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু
ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় ধানুয়া কামালপুর এলাকাটি ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। এই অঞ্চলে প্রায়শই সামরিক অভিযান চলত। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক যেমন ছিল, তেমনি প্রতিরোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষাও ছিল প্রবল। স্কুলের ছাত্ররা এই প্রতিরোধের চেতনা থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
কিশোর যোদ্ধাদের তালিকা – এক স্কুলের ৩৩ বীর
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাদের বয়সের সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন। এদের মধ্যে যারা বিভিন্ন খেতাবপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা ছাড়াও বহু ছাত্র সরাসরি গেরিলা যুদ্ধ ও সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন।
খেতাবপ্রাপ্ত বীরেরা
এই স্কুলের তিন ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অবিশ্বাস্য সাহসিকতার জন্য চারটি সামরিক খেতাব অর্জন করেন, যা সত্যিই বিরল:
বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম | খেতাব | তৎকালীন অবস্থা |
নূর ইসলাম | বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক | স্কুলের ছাত্র (সঠিক শ্রেণী অজানা) |
মতিউর রহমান | বীর প্রতীক | স্কুলের ছাত্র (সঠিক শ্রেণী অজানা) |
বশির আহমেদ | বীর প্রতীক | দশম শ্রেণীর ছাত্র |
১. নূর ইসলাম (বীর বিক্রম, বীর প্রতীক): একটি স্কুল থেকে একই মুক্তিযোদ্ধার দুটি সামরিক খেতাব অর্জন করা ব্যতিক্রমী ঘটনা। তাঁর বীরত্বগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
২. মতিউর রহমান (বীর প্রতীক): কিশোর বয়সেও তাঁর সামরিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতা তাঁকে এই শ্রেষ্ঠ সামরিক খেতাবে ভূষিত করেছিল।
৩. বশির আহমেদ (বীর প্রতীক): দশম শ্রেণীর ছাত্র বশির আহমেদ ছিলেন বয়সে কিশোর, কিন্তু সাহসিকতায় প্রবীণ। তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত একটি অপারেশন ছিল অবিশ্বাস্য—যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
অন্যান্য ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান
খেতাবপ্রাপ্তদের পাশাপাশি আরও অন্তত ত্রিশজন ছাত্র সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কেউ কেউ ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কেউবা দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা অপারেশনে যুক্ত হয়েছিলেন। তাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণই এই স্কুলটিকে 'মুক্তিযোদ্ধাদের স্কুল' হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
বশির আহমেদের অবিশ্বাস্য বীরত্ব
বশির আহমেদ, যিনি একাত্তরে ছিলেন দশম শ্রেণীর ছাত্র, তাঁর বীরত্বগাথা কিংবদন্তীর মতো। তাঁর ব্যক্তিগত সাহসিকতা ছিল সামরিক বাহিনীর যেকোনো কমান্ডারের চেয়েও বেশি।
জীবন বাজি রেখে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা
বশির আহমেদ (গলায় মাফলার পরিহিত) হাতে সাদা পতাকা নিয়ে সরাসরি পাকিস্তানি ক্যাম্পে ঢুকে গিয়েছিলেন। এই কাজটি করতে প্রয়োজন হয়েছিল অবিশ্বাস্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস।
তিনি সরাসরি পাকিস্তানি কমান্ডারদের বলেছিলেন - "সারেন্ডার করো"। কিশোরের মুখে এমন দাবি শুনে পাকিস্তানি সেনারা হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
যৌথবাহিনীর (মুক্তি ও মিত্রবাহিনী) সহযোগিতায় এবং সামরিক কৌশলের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
২০০ সৈন্যের সারেন্ডার
বশির আহমেদের এই মধ্যস্থতার ফলস্বরূপ, প্রায় ২০০ জন পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যকে সারেন্ডার করিয়ে নিরাপদে ভারতে নিয়ে যান। যুদ্ধক্ষেত্রে এমন ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যস্থতা অত্যন্ত বিরল। এই অপারেশনটি প্রমাণ করে, বয়সে কিশোর হলেও বশির আহমেদের সামরিক প্রজ্ঞা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তাঁর এই বীরত্বগাথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর বীর প্রতীক খেতাব পাওয়ার অন্যতম কারণ।
স্কুলটির ভূমিকা – নৈতিক প্রেরণা ও প্রতিরোধের চেতনা
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় কেবল ভবনের সমষ্টি ছিল না; এটি ছিল প্রতিরোধের চেতনার কেন্দ্র।
নেতৃত্বের নীরব প্রেরণা: স্কুলের শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদ সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ না নিলেও, তাঁরা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। স্কুলটি ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাওয়া যেত।
ছাত্র সংসদের প্রভাব: তৎকালীন ছাত্র সংসদ এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ছাত্রদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। তাঁদের সাংগঠনিক ক্ষমতা অন্যান্য ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিল। তাদের কাছে স্বাধীনতা ছিল কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়, বরং অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে নৈতিক বিদ্রোহ।
গেরিলা যোগাযোগের কেন্দ্র: ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে স্কুলটি এবং এর আশেপাশের এলাকা হয়ে উঠেছিল গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য স্থানীয় যোগাযোগের কেন্দ্র। এই অঞ্চলের মানুষজন, যারা ছিলেন ছাত্রদের অভিভাবক, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন।
স্বীকৃতির অভাব ও ম্যুরাল স্থাপনের দাবি: এত বড় একটি গৌরবময় ইতিহাস সত্ত্বেও, এই স্কুলটির অবদান জাতীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়নি। এমনকি স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যেও এক ধরনের অবহেলা পরিলক্ষিত হয়।
ম্যুরাল স্থাপনের অনুরোধ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক এবং সচেতন মহল জামালপুরের এই চার খেতাবপ্রাপ্ত কিশোর যোদ্ধার স্কুলে একটি ম্যুরাল স্থাপনের জন্য জোর অনুরোধ জানিয়ে আসছে। এই ম্যুরালটি নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতো।
কর্তৃপক্ষের অবহেলা: দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রাথমিক দাবীর প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দিলেও, ম্যুরাল স্থাপনের কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং এক ধরনের অবহেলা দেখাচ্ছিল। এই অবহেলা কেবল স্কুলটির প্রতি নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিও অসম্মানজনক।
যে স্কুলের ছাত্ররা দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল, সেই স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থীদের এই বীরত্বগাথা জানা এবং হৃদয়ে ধারণ করা উচিত। এই ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য কেবল ম্যুরাল নয়, স্কুল পাঠ্যক্রমেও এর অন্তর্ভুক্তিকরণ জরুরি।
ইতিহাস রক্ষায় প্রজন্মের অঙ্গীকার
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এটি প্রমাণ করে, স্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর বা পেশার মানুষের অর্জন নয়, বরং তা ছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের সম্মিলিত স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের ফসল।
এই স্কুলের ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণ এবং তিনজনের চারটি সামরিক খেতাব অর্জন—এই তথ্যটি বাংলাদেশের জাতীয় গর্বের অংশ হওয়া উচিত। এই বীরেরা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, কিশোর বয়স কোনো বাধা নয়, বরং তা সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রমাণ।
আমাদের কজনই বা জানি এই ইতিহাস? এই অজানা ইতিহাসকে তুলে ধরে এর সঠিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা আমাদের মতো প্রজন্মের দায়িত্ব। বশির আহমেদ, নূর ইসলাম এবং মতিউর রহমানের মতো বীরদের গল্পগুলো শুধু স্কুলের দেওয়ালেই নয়, প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী হওয়া উচিত।
এই স্কুলের কিশোর বীরদের প্রতি রইল বিনম্র কুর্নিশ ও অভিবাদন। তাঁদের আত্মত্যাগ এবং বীরত্বের মহিমা চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















