>

>

শহীদ জুয়েল বীর বিক্রম – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

শহীদ জুয়েল বীর বিক্রম – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস কেবল ট্রফি, সেঞ্চুরি কিংবা রেকর্ডের খতিয়ান নয়; এটি রক্ত, ত্যাগ এবং এক অতুলনীয় দেশপ্রেমের মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের স্বর্নাক্ষরে লেখা এক উজ্জ্বল ও অমলিন নাম শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল (বীর বিক্রম)। সত্তরের দশকের প্রারম্ভে ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় যে তরুণ ডানহাতি ব্যাটসম্যানের উইকেটের চারপাশে দুর্দান্ত শট খেলে স্বাধীন দেশের ক্রিকেট দলের ওপেনিং পজিশন নিজের নামে লিখে নেওয়ার কথা ছিল, সময়ের অমোঘ আহ্বানে সেই তরুণকেই নিজ হাতে ব্যাটের বদলে স্টেনগান তুলে নিতে হয়েছিল।

TruthBangla

শহীদ জুয়েল বীর বিক্রম – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

“আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম!” ~ শহিদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল বীর বিক্রম।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস কেবল ট্রফি, সেঞ্চুরি কিংবা রেকর্ডের খতিয়ান নয়; এটি রক্ত, ত্যাগ এবং এক অতুলনীয় দেশপ্রেমের মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের স্বর্নাক্ষরে লেখা এক উজ্জ্বল ও অমলিন নাম শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল (বীর বিক্রম)। সত্তরের দশকের প্রারম্ভে ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় যে তরুণ ডানহাতি ব্যাটসম্যানের উইকেটের চারপাশে দুর্দান্ত শট খেলে স্বাধীন দেশের ক্রিকেট দলের ওপেনিং পজিশন নিজের নামে লিখে নেওয়ার কথা ছিল, সময়ের অমোঘ আহ্বানে সেই তরুণকেই নিজ হাতে ব্যাটের বদলে স্টেনগান তুলে নিতে হয়েছিল।

ঢাকা শহরের বুকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘুরে বেড়ানো দুর্ধর্ষ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ এর এই অসম সাহসী গেরিলা যোদ্ধা রণাঙ্গনে নিজের রক্তে লিখে গিয়েছিলেন স্বাধীনতার মূল অর্থ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর টর্চার সেলে নিজের জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হাতের আঙ্গুল নিয়েও তিনি যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তা কেবল কোনো ক্রিকেটারের স্বপ্ন ছিল না; তা ছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মসংবাদ ঘোষণা।

ষাট ও সত্তরের দশকের ঢাকা এবং এক উদীয়মান ক্রিকেটার

১৯৫০-এর দশকে ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী আবদুল হালিম চৌধুরী (যিনি পরিবার, বন্ধু ও ক্রীড়ামোদীদের কাছে ‘জুয়েল’ নামে পরিচিত ছিলেন) বেড়ে উঠেছিলেন এক উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি ক্রীড়াবিদদের জাতীয় পর্যায়ে পাকিস্তান দলে সুযোগ পাওয়ার পথটি কখনোই মসৃণ ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক স্বৈরাচারের প্রাচীর ভেদ করে যে ক'জন তরুণ নিজেদের সহজাত প্রতিভা দিয়ে ক্রিকেট ময়দানে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করেছিলেন, জুয়েল ছিলেন তাঁদের অগ্রভাগে।

জুয়েল ছিলেন মূলত একজন আক্রমণাত্মক ডানহাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান এবং একজন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য উইকেটকিপার। তৎকালীন ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেট লীগে তিনি 'আজাদ বয়েজ ক্লাব' এবং 'ইস্ট এন্ড ক্লাব'-এর হয়ে নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়াম (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) ছিল তাঁর চেনা বিচরণক্ষেত্র।

আজাদ বয়েজ ক্লাবের অবদান: ঢাকা ক্রিকেটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব 'আজাদ বয়েজ ক্লাব' ছিল সেই সময়ের তরুণ উদীয়মান বাঙালি খেলোয়াড়দের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। জুয়েল তাঁর ব্যাটিং শৈলী, দ্রুত ফুটওয়ার্ক এবং কভার ড্রাইভের জন্য ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন।

সহযোদ্ধা ও সহ-ক্রিকেটারগণ: ক্রিকেট অঙ্গনে তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন রাকিবুল হাসান, আশরাফুল হক, সৈয়দ আশরাফুল হক, এবং পরবর্তীতে ইস্ট এন্ড ও আবাহনীতে আলো ছড়ানো একঝাঁক ক্রিকেটার। ১৯৭০-৭১ মৌসুমে ক্রিকেট মহলে এই আলোচনা ছিল স্পষ্ট যে স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত যেকোনো কাঠামোয় যদি দল গঠিত হয়, তবে সেই দলের নির্ভরযোগ্য ওপেনিং ব্যাটসম্যান হবেন জুয়েল।

জুয়েল কেবল একজন ভালো খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং তাঁর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অদম্য সাহসিকতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। মাঠের ভেতরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও ঠান্ডা মাথার ক্রিকেটীয় বুদ্ধি পরবর্তীতে রণাঙ্গনে তাকে এক অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধায় রূপান্তরিত হতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছিল।

শহীদ জুয়েল – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

২৫শে মার্চের কালরাত্রি ও ব্যাট ছেড়ে ব্যাটলফিল্ডে যাত্রা

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পুরো পূর্ব পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল, ঠিক তখনই ঢাকা স্টেডিয়ামে চলছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নানা তৎপরতা। কিন্তু ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকা শহরে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ইআরডি, এবং সাধারণ পথচারীদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলাই বাঙালি জাতির ভাগ্য চিরতরে বদলে দেয়। জুয়েল তখন ঢাকার রাজপথে দেখেছেন নিরীহ মানুষের রক্ত, স্বজনদের আর্তনাদ এবং হানাদারদের তাণ্ডব।

মেলাঘর যাত্রা ও প্রশিক্ষণ: ২৫শে মার্চের পর জুয়েল বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যাটে বল কানেক্ট করে সেঞ্চুরি করার চেয়ে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করা হাজার গুণ বেশি জরুরি। তিনি সিদ্ধান্ত নেন ক্রিকেট মাঠ ছেড়ে যুদ্ধে যাওয়ার। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে পৌঁছান।

মেলাঘর ছিল মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের প্রধান সদর দপ্তর ও রূপকথার প্রশিক্ষণ শিবির। সেক্টর কমান্ডার মেজর (পরে মেজর জেনারেল) খালেদ মোশাররফ এবং মেলাঘর ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (পরে লে. কর্নেল) এ টি এম হায়দারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেখানে তরুণ বাঙালিদের কঠোর সামরিক ও গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল।

জুয়েল সেখানে কোনো ধরনের বাড়তি সুবিধা নেননি; একজন সাধারণ ক্যাডেটের মতো কাদা-মাটিতে অস্ত্র চালনা, এক্সপ্লোসিভ তৈরি, হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং ডিমোলিশন কোর্স সম্পন্ন করেন। ক্রীড়াবিদ হওয়ার কারণে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা (Physical Fitness) এবং চোখের আই-কন্টাক্ট ছিল অসাধারণ, যা অস্ত্র চালনা ও মাইন বসানোর কাজে তাকে অন্যদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রেখেছিল।

শহীদ জুয়েল – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

খেলার মাঠে (বাঁ থেকে) রাকিবুল হাসান, বাসিল ডি’অলিভেরা এবং শহীদ জুয়েল; ছবিসুত্র: cricketcountry.com

‘ক্র্যাক প্লাটুন’ ও ঢাকার বুকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বুকে কাঁপন

মেলাঘরে প্রশিক্ষণ শেষে সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ঢাকা শহরকে মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিকভাবে অচল করে দেওয়ার জন্য এক বিশেষ বিগ্রেড বা বিশেষ গেরিলা ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এই ইউনিটের নাম দেওয়া হয় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’

ক্র্যাক প্লাটুনের দুঃসাহসিক যোদ্ধারা: এই দুর্ধর্ষ শহুরে গেরিলা দলে জুয়েলের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন ঢাকার স্বনামধন্য ও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একঝাঁক প্রতিভাবান মুখ:

শহীদ শফি ইমাম রুমী (শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র)
শহীদ বদিউল আলম বদি (বীর বিক্রম)
শহীদ মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ (শহীদ আজাদ)
কাজী কামালউদ্দিন (বীর বিক্রম, বিশিষ্ট ঝালকাঠি/ঢাকার বাস্কেটবল খেলোয়াড়)
হাবিবুল আলম (বীর প্রতীক)
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীর বিক্রম)
এম বি এ জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং আরও অনেকে।

শহীদ জুয়েল – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা; ছবিসুত্র: bdlive24.com

ক্র্যাক প্লাটুন ও জুয়েলের ভূমিকা

জুয়েল যোগ দেন বিশেষ গেরিলা দল ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এ। এই দলের সদস্যরা ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে ছোট ছোট দুঃসাহসিক অপারেশন চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে অস্থির করে তুলেছিল। ক্র্যাক প্লাটুন ছিল বাঙালি তরুণদের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের প্রতীক।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল অপারেশন: ১৯৭১ সালের জুন মাসে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। পাকিস্তান সরকার বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে পূর্ব পাকিস্তান বা ঢাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ‘স্বাভাবিক’ ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডা নস্যাৎ করতে মেলাঘর থেকে নির্দেশ আসে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ফাইভ স্টার ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে’ (বর্তমান শেরাটন/ইন্টারকন্টিনেন্টাল) হামলা চালানোর।

জুয়েল, রুমী, বদি এবং মায়ারা অত্যন্ত সুনিপুণ কৌশলে ট্যুরিস্ট সেজে এবং গাড়ির লুকানো প্রকোষ্ঠে এক্সপ্লোসিভ বহন করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের হাই-সিকিউরিটি জোনে প্রবেশ করেন এবং গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটান। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের চোখের সামনে ঘটা এই বিস্ফোরণ বিশ্ব গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়:

“ঢাকা নিয়ন্ত্রণে নেই, পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে কাজ করছে গেরিলারা।”

উলন ও ধানমন্ডি পাওয়ার সাব-স্টেশন ডিমোলিশন: ঢাকা শহরকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কার্যক্রম স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে একাধিক পাওয়ার সাব-স্টেশনে গ্রেনেড ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ (C-4) দিয়ে হামলা চালানো হয়। রামপুরা উলন বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং ধানমন্ডি সাব-স্টেশন অপারেশনে জুয়েল সরাসরি হ্যান্ড গ্রেনেড এবং ডিমোলিশন চার্জ সেট করেছিলেন।

ক্রিকেট মাঠে উইকেটের পেছনে যেমন জুয়েলের হাতের তালু থেকে বল ফস্কে যেত না, তেমনি রণাঙ্গনে তাঁর হাত থেকে নিক্ষিপ্ত হ্যান্ড গ্রেনেড শতভাগ নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানত।

পেট্রোল পাম্প ও থানা হামলা: রাজারবাগ, মগবাজার, যাত্রাবাড়ী এবং ধানমন্ডির বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর পেট্রোল পাম্প এবং পাকিস্তানি সেনা ভর্তি জিপ লক্ষ্য করে ছোট ছোট হিট-অ্যান্ড-রান অপারেশনে জুয়েল ছিলেন এক নিয়মিত নাম। তাঁর উপস্থিতিতে সহযোদ্ধারা সাহসের শক্তি পেতেন।

গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট: আগস্টের রক্তঝরা রাত

জুলাই ও আগস্ট জুড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের একের পর এক সফল অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী এবং ঢাকা ক্যাপিটাল কমান্ডের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়। পুরো শহরজুড়ে চিরুনি অভিযান শুরু করে আর্মি ইন্টেলিজেন্স ও তাদের সহযোগী রাজাকার-আলবদর বাহিনী।

১৯৭১ সালের ২৯শে আগস্ট গভীর রাত (৩০শে আগস্টের প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধানমন্ডি, মগবাজার, এবং কাঠালবাগানের একাধিক ক্র্যাক প্লাটুন আস্তানায় একযোগে রেইড দেয়।

ধানমন্ডির একটি গোপন আস্তানায় জুয়েল, শফি ইমাম রুমী, সহযোদ্ধা সামাদ এবং আরও কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, গ্রেনেড ও অটোমেটিক অস্ত্র লুকানো ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, ইনফর্মার ও পাকিস্তানি সামরিক জিপ চারদিক থেকে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সংক্ষিপ্ত বাকবিতণ্ডা ও অস্ত্র উদ্ধারের পর পাকিস্তানি ঘাতক দল শহীদ জুয়েলসহ ক্র্যাক প্লাটুনের অকুতোভয় সেনানীদের গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরা অবস্থায় গাড়িতে তোলে।

এমপি হোস্টেল ও রমনা টর্চার সেলের নরকযাতনা

গ্রেপ্তারের পর জুয়েল এবং তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার তৎকালীন মালিবাগ/রমনা থানা সংলগ্ন আর্মি ইন্টেলিজেন্স সেল এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে।

পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ভালো করেই জানত যে এরা সাধারণ কোনো নাগরিক নয়; এরা সেই দুর্ধর্ষ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’, যারা পুরো ঢাকা শহর কাঁপিয়ে দিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চরম শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে সেক্টর-২-এর মেলাঘর ক্যাম্পের অবস্থান, ক্যাপ্টেন হায়দারের যোগাযোগ কেন্দ্র এবং ঢাকায় লুকিয়ে থাকা অন্যান্য সহযোদ্ধাদের গোপন ঠিকানা বের করা।

ক্রিকেটারের হাতের ওপর আঘাত

শহীদ জুয়েল ছিলেন একজন বিখ্যাত ক্রিকেটার এই তথ্যটি পাকিস্তানি নির্যাতনকারীরা জানতে পেরেছিল। ফলে তাঁর ওপর তাদের হিংস্রতা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। তারা জানত, একজন ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর হাত ও আঙ্গুল।

পিঞ্জিরায় আটকে রেখে জুয়েলকে ছাদের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে চাবুক পেটা করা হয়। প্লায়ার্স (Pliers) ও ভারী হাতুড়ি দিয়ে জুয়েলের ডান হাতের প্রতিটি আঙ্গুল একের পর এক থেঁতলে ও ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হয়। নখ উপড়ে ফেলা হয় এবং ক্ষতস্থানে লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্দেশ্য ছিল একটাই যাতে যন্ত্রণায় চিৎকার করে জুয়েল তাঁর সহযোদ্ধাদের নাম প্রকাশ করে দেন। কিন্তু শরীর থেকে রক্ত ঝরলেও, হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেলেও জুয়েলের মুখ থেকে একটি শব্দও বের করা যায়নি। তিনি তাঁর সহযোদ্ধা মায়া, কামাল, কিংবা মেলাঘরের কোনো সিক্রেট তথ্য ফাঁস করেননি। নিজের জীবন দিয়ে তিনি বাঁচিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকায় অবস্থানরত শত শত অন্যান্য গেরিলা যোদ্ধাকে।

শহীদ জুয়েল – ক্রিকেটার থেকে রণাঙ্গনে এক কিংবদন্তীর আত্মত্যাগ

শহীদ জুয়েলের জার্সি হাতে মুশফিক, মাশরাফি এবং সাকিব; ছবিসুত্র: ntvbd.com

“আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম!”

রমনা ও এমপি হোস্টেল টর্চার সেলের সেই ভয়াল অন্ধকূপের নীরবতা ভেদ করে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন, সাহসী ও কালজয়ী উক্তি।

নির্যাতনের এক পর্যায়ে যখন জুয়েলের দেহ সম্পূর্ণ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, ডান হাতের আঙ্গুলগুলো মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে, এবং নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড সামনে ঝুলছে তখন একজন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা বা জল্লাদ টিটকারি মেরে বা শেষ ইচ্ছা হিসেবে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল,

"কিরে ক্রিকেটার, তোর তো হাতের আঙ্গুল সব শেষ! এখন আর কীভাবে বল করবি আর ব্যাট ধরবি?"

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, শারীরিক যন্ত্রণার চরম শিখরে অবস্থান করেও শহীদ জুয়েল তাঁর রক্তমাখা মুখ তুলে জল্লাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাতায় অমর হয়ে আছে:

“আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম!”

এই উক্তির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

১. স্বাধীনতার অবিচল প্রত্যয়: ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে যখন বাংলাদেশ জয়ের মুখ দেখেনি, চারপাশে কেবল পাকিস্তানি বাহিনীর দখলদারিত্ব ও লাশের স্তূপ, ঠিক সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একজন উদীয়মান তরুণ অটল বিশ্বাস রাখতেন যে দেশ স্বাধীন হবেই এবং সেই স্বাধীন দেশের একটি 'জাতীয় ক্রিকেট দল' (National Team) থাকবে!

২. মানসিক অজেয়তা: পাকিস্তানি সেনারা ভেবেছিল শারীরিক অঙ্গহানি ঘটিয়ে তারা একজন তরুণকে ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু জুয়েল প্রমান করেছেন শরীরকে ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু কোনো মুক্তিকামী জাতির ভিতরের স্বপ্নকে হত্যা করা যায় না।

৩. তিন আঙ্গুলের ব্যাখ্যা: ব্যাটিং গ্রিপের জন্য ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল, শাহাদাত আঙ্গুল ও মধ্যমা এই তিনটি আঙ্গুলের গুরুত্ব অপরিহার্য। নিজের ভেঙে যাওয়া শরীরের শেষ আশা হিসেবেও তিনি কেবল দেশের হয়ে ওপেনিংয়ে ব্যাট করার স্বপ্নটি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন।

শাহাদাত বরণ, নিখোঁজ লাশ ও ‘বীর বিক্রম’ খেতাব

৩০শে আগস্টের পর থেকে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমার্ধের কোনো এক কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, শহীদ শফি ইমাম রুমী, শহীদ বদিউল আলম বদি, শহীদ মীর আনোয়ার হোসেন অনু, এবং শহীদ মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।

শহীদের লাশের পরিণতি: স্বাধীনতার পর অনেক অনুসন্ধান করেও শহীদ জুয়েল কিংবা শহীদ রুমীদের লাশের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, কুর্মিটোলা সেনানিবাসের পেছনের নিচু জমি অথবা বুড়িগঙ্গা নদীতে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হলেও জুয়েলের মা, স্বজন ও সহযোদ্ধারা কোনোদিন তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে একমুঠো মাটি দিতে পারেননি।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি-বীর বিক্রম: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং ক্র্যাক প্লাটুনে দুঃসাহসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলকে মরণোত্তর দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর বিক্রম’-এ ভূষিত করে।

একনজরে শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল (বীর বিক্রম)

নিচে শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল (বীর বিক্রম)-এর জীবন, ক্রীড়াঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্মৃতির প্রধান প্রধান তথ্য সংক্ষেপে একটি তালিকায় উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় / ক্ষেত্র

তথ্যাবলী ও ঐতিহাসিক রূপরেখা

পূর্ণ নাম ও ডাকনাম

আবদুল হালিম চৌধুরী (ডাকনাম: জুয়েল)

জন্ম ও জন্মস্থান

১৯৫০-এর দশক, ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)

ক্রীড়া পরিচয় ও ক্লাবসনেহ

ডানহাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান ও উইকেটকিপার; আজাদ বয়েজ ক্লাব ও ইস্ট এন্ড ক্লাব, ঢাকা

ক্রিকেটীয় সমসাময়িক সহযোদ্ধাগণ

রাকিবুল হাসান, আশরাফুল হক, জিয়াউল ইসলাম, সৈয়দ আশরাফুল হক

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্র

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ (সেক্টর-২, মেলাঘর ক্যাম্প)

গেরিলা ইউনিট ও অবস্থান

দুর্ধর্ষ শহুরে গেরিলা দল ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ (ঢাকা শহর)

উল্লেখযোগ্য অপারেশনসমূহ

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল বিস্ফোরণ, উলন ও ধানমন্ডি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ধ্বংস, পেট্রোল পাম্প আক্রমণ

গ্রেপ্তারের তারিখ ও স্থান

৩০শে আগস্ট, ১৯৭১ (ধানমন্ডির ক্র্যাক প্লাটুনের গোপন আস্তানা থেকে)

বন্দিশালা ও নির্যাতনের কেন্দ্র

ঢাকার এমপি হোস্টেল ও রমনা থানা মিলিটারি টর্চার সেল

ঐতিহাসিক কালজয়ী উক্তি

“আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম!”

শাহাদাতের আনুমানিক সময়

৩১শে আগস্ট থেকে ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ (সুনির্দিষ্ট মৃতদেহ উদ্ধার করা যায়নি)

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও খেতাব

‘বীর বিক্রম’ (মরণোত্তর বীরত্বসূচক খেতাব)

স্মারক প্রতিষ্ঠান ও সম্মাননা

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ‘শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ড’; প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ‘শহীদ জুয়েল-শহীদ মুশতাক স্মৃতি ক্রিকেট ম্যাচ’

স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং শহীদ জুয়েলের অমর উত্তরাধিকার

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানো, টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকার যে গৌরবময় যাত্রা তার প্রথম ও মূল বীজটি বপন করেছিলেন শহীদ জুয়েল।

শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে 'শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ড'

মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারির নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ড’। হাজার হাজার দর্শক যখন সেখানে বসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ছক্কা-চারের আনন্দ উপভোগ করেন, তখন স্টেডিয়ামের সেই নামফলকটি অনুচ্চ স্বরে মনে করিয়ে দেয় এই মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল শহীদ জুয়েলের মতো বীরদের রক্ত ও আঙ্গুল বিসর্জনের বিনিময়ে।

শহীদ জুয়েল - শহীদ মুশতাক মেমোরিয়াল ম্যাচ

প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) আয়োজন করে ‘শহীদ জুয়েল একাদশ বনাম শহীদ মুশতাক একাদশ’ প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ। (উল্লেখ্য, শহীদ মুশতাক ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক, যিনি ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকা স্টেডিয়ামের কোয়ার্টারে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন।)

এই খেলায় বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটারেরা অংশ নিয়ে এই দুই মহান শহীদ ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

ক্রিকেটারদের কাছে অনুপ্রেরণা

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক সফল অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবালরা একাধিকবার বিভিন্ন মঞ্চে শহীদ জুয়েলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। মুশফিক ও মাশরাফিদের হাতে শহীদ জুয়েলের ব্যবহৃত স্মৃতি স্মারক ও স্মারক জার্সি তুলে দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরিত হয়।

জাতীয় দলের ক্রিকেটারেরা যখন লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে জাতীয় সংগীত গাইতে মাঠে নামেন, তখন প্রকৃতপক্ষে শহীদ জুয়েলের সেই অসমাপ্ত স্বপ্নেরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

একটি অসমাপ্ত ইনিংস ও এক চিরন্তন স্বাধীন মানচিত্র

আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলের জীবনের ক্রিকেটীয় ইনিংসটি হয়তো ১৯৭১ সালের আগস্টে গিয়ে মাত্র ২১-২২ বছর বয়সে থেমে গিয়েছিল। কিন্তু রণাঙ্গনে তিনি যে ইনিংসটি খেলে গিয়েছিলেন, তার কোনো সমাপ্তি নেই।

যে তিনটি আঙ্গুল দিয়ে জুয়েল স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে ব্যাটিং কভার ড্রাইভ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আঙ্গুলগুলো হয়তো বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্মমতার কাছে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা শেষ উত্তরটি ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে খোদাই হয়ে গেছে।

আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা ক্রিকেট ভালোবাসে, যারা এই দেশকে ভালোবাসে তাদের জন্য শহীদ জুয়েল কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম নয়; জুয়েল একটি আদর্শের নাম। জুয়েল শেখান কীভাবে নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ ও জীবনের চেয়ে মাতৃভূমির সম্মানকে উঁচুতে তুলে ধরতে হয়।

যতদিন বাংলাদেশে ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যতদিন মিরপুর বা চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে লাল-সবুজের পতাকা উড়বে, যতদিন জাতীয় দল আন্তর্জাতিক ময়দানে ওপেনিংয়ে নামবে ততদিন প্রতিটি কভার ড্রাইভ, প্রতিটি বাউন্ডারি এবং প্রতিটি জয়ের আনন্দে শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল অমর হয়ে থাকবেন।

আজ এই মহান বীর, অকুতোভয় গেরিলা ও অমর ক্রিকেটারের প্রতি রইলো গভীর ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.