একাত্তরের রণাঙ্গনে একজন বিহারি মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ খান
অবাঙালি হয়েও যে মানুষগুলো প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অস্ত্র ধরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত সৈয়দ খান। তাঁর যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি এক নৈতিক পরীক্ষার ফল। তবে যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ ছিল তাঁর যুদ্ধ-পরবর্তী জীবন - যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং ভুল বোঝাবুঝির নির্মম শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে।

TruthBangla
Dec 10, 2025
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল বাঙালির বীরত্বগাঁথা নয়, এটি মানবতা ও আদর্শের পক্ষে দাঁড়ানো সকল মানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম। সেই অগ্নিঝরা দিনে, যখন ধর্ম ও ভাষাভিত্তিক বিভাজন তুঙ্গে, তখন অবাঙালি হয়েও যে মানুষগুলো প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অস্ত্র ধরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত সৈয়দ খান। তাঁর যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি এক নৈতিক পরীক্ষার ফল। তবে যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ ছিল তাঁর যুদ্ধ-পরবর্তী জীবন - যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং ভুল বোঝাবুঝির নির্মম শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। এই প্রবন্ধে আমরা সৈয়দ খানের সেই সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অন্তহীন নীরব কান্নাকে তুলে ধরব, যা একাত্তরের এক ভিন্ন দিক উন্মোচন করে।
এক অবাঙালি সেনার দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, যখন গোটা পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতার আগুনে জ্বলছে, তখন সৈয়দ খান কর্মরত ছিলেন ইপিআর (East Pakistan Rifles) বাহিনীতে। তাঁর কোম্পানি তখন কুড়িগ্রামের চিলমারীতে। সেই মুহূর্তে, তাঁর মতো অবাঙালি সদস্যের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল এক চরম পরীক্ষা। চারদিকে যখন অবিশ্বাস আর সন্দেহ, তখন দেশের প্রতি তাঁর গভীর মায়া এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকার তাগিদই তাঁকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
তাঁর চোখের দিকে সবাই তাকাচ্ছিল - তিনি এখন কী করবেন? কেউ কেউ তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সৈয়দ খান দেশের প্রতি তাঁর মায়াকে উপেক্ষা করতে পারেননি। তিনি তাঁর কোম্পানির অন্য সদস্যদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, দেশপ্রেম কোনো ভাষা বা জাতিসত্তার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা ন্যায় ও মুক্তির আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
কাউনিয়া ব্রিজের অপারেশন - এক নৈতিক দ্বিধা
সৈয়দ খানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সম্মুখযুদ্ধটি ছিল কুড়িগ্রামের কাউনিয়া ব্রিজে। এই অপারেশন ছিল একদিকে যেমন সামরিক কৌশল, তেমনি অন্যদিকে এক করুণ নৈতিক পরীক্ষার মুহূর্ত।
মুক্তিযোদ্ধারা কাউনিয়া ব্রিজের অপর প্রান্তে অবস্থান নেন, যেখানে নদীর ওপারে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি (তৎকালীন জিআরপি থানা)। ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে তাঁরা এমন কৌশলী অবস্থানে ছিলেন যে, পাকিস্তানি সেনারা তা বুঝতে পারেনি। সৈয়দ খান তাঁর কোম্পানির সদস্যদের সঙ্গে এই অপারেশনের পরিকল্পনা করেন।
দুর্ভাগ্যের পথচলা
ঠিক সেই সময় এক পাকিস্তানি মেজর, তিনজন সিপাহি এবং একজন বাঙালি ওসি (Officer-in-Charge) ব্রিজ পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের দিকে আসছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাঙালি অফিসারটিই ছিলেন দলটির সামনে।
সৈয়দ খানের সামনে এসে পড়ে এক চরম দ্বিধা। যদি তিনি ব্রাশ ফায়ার করেন, তবে বাঙালি অফিসারটির বাঁচার কোনো উপায় নেই। আবার যদি আক্রমণ না করা হয়, তবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবর পেয়ে যাবে এবং পুরো কোম্পানি ঝুঁকিতে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, দেশের স্বার্থে হতভাগ্য বাঙালি অফিসারটির জীবন অবসানই মঙ্গলজনক। কারণ, সেই বাঙালি অফিসারটিকে জীবিত রেখে পাকিস্তানিদের আক্রমণ শুরু করলে পুরো অপারেশনের লক্ষ্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বিপন্ন হতে পারত।
ব্রাশ ফায়ারের দায়িত্ব দেওয়া হয় সৈয়দ খানকেই। পাক জোয়ানদের সঙ্গেই মারা পড়লেন সেই বাঙালি অফিসারটিও। কাউনিয়া ব্রিজের অপারেশন দিয়েই শুরু হলো তাঁদের যুদ্ধযাত্রা।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল অসংখ্য কঠিন, আবেগহীন ও নৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্তের সমষ্টি - যা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নিতে হয়েছিল।
সম্মুখযুদ্ধ - চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও পিছু হটা
কাউনিয়া ব্রিজে আক্রমণের পর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান টের পেয়ে যায় এবং তারা গুলি চালাতে শুরু করে।মুক্তিযোদ্ধারাও এবার প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যান। পাকসেনারা খুব চেষ্টা করে ব্রিজ পার হওয়ার জন্য, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা সে সুযোগ দেননি।
সৈয়দ খানের ভাষায়, সেদিন এই ব্রিজ পার হওয়া পাকবাহিনীর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথম সম্মুখযুদ্ধে তাঁরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হন এবং পাকবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।
বিকল্প কৌশল ও পশ্চাদপসরণ
পাকবাহিনী যখন কিছুতেই ব্রিজ পার হতে পারল না, তখন তারা বিকল্প বুদ্ধি আঁটে। তারা প্লেনে করে মুক্তিযোদ্ধাদের তিন-চার কিলোমিটার পেছনে মহেন্দ্রনগরে আসে, উদ্দেশ্য ছিল পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলা।
গোপন সূত্রে সে খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময়ে তাঁদের কোম্পানিতে ইপিআর ও কিছু মুক্তিসেনা মিলে প্রায় ৬০ জন সদস্য ছিল। তাঁরা দ্রুত সেখান থেকে রাজাহাট হয়ে কুড়িগ্রাম চলে আসেন।
এই পশ্চাদপসরণ ছিল সামরিক কৌশল। ভারী অস্ত্রের অভাব ও শত্রুর আকাশপথে আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে হলে পিছু হটা ছাড়া উপায় ছিল না।
কুড়িগ্রাম থেকে ভূরুঙ্গামারী - ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে সমন্বয়
কুড়িগ্রাম থেকে সরে আসার পর মুক্তিযোদ্ধারা আবারও তিনটি ভিন্ন জায়গায় ডিফেন্স নেন। তিন জায়গাতেই লড়াই হয় এবং পাকসেনারা সাময়িকভাবে তাদের অবস্থান ছেড়ে চলে যায়।
পরের দিন আবার এসে পাকিস্তানিরা আক্রমণ চালায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ভারী কোনো অস্ত্র না থাকায় তাঁরা সমানভাবে মোকাবিলা করতে পারছিলেন না। বাধ্য হয়ে তাঁরা নদী পার হয়ে পাটেশ্বরী চলে এলেন। এরপর তাঁরা ভূরুঙ্গামারী হাইস্কুল ক্যাম্পে এসে ওঠেন, যেখানে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হয়েছিলেন।
সমন্বিত অপারেশন
ভূরুঙ্গামারী ক্যাম্পে একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে এক কোম্পানি ভারতীয় সেনা এসে যোগ দেয়। এরপর শুরু হয় সমন্বিত আক্রমণ।তাঁরা খবর পান, হাতিবান্ধা থানায় পাঞ্জাবিরা ডিফেন্স নিয়ে আছে। সৈয়দ খান ৪০ জন সেনাসদস্য নিয়ে ফায়ার করতে করতে এগোতে থাকেন।
একই সঙ্গে ভারতীয় সেনারা ওপর থেকে সিলিং (Ceiling) বা গোলাবর্ষণ করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা যখন শত্রুদের কাছাকাছি চলে যান, তখন ভারতীয় সেনারা সিলিং বন্ধ করে এবং তাঁরা ফায়ার শুরু করেন।
ট্র্যাজেডি ও সাফল্য
এই সময় পাঞ্জাবিরা পাল্টা সিলিং শুরু করে দিল। এতে তাঁদের বরিশালের একজন নায়েক সুবেদার সেখানে শহীদ হন।
একপর্যায়ে পাঞ্জাবিরা পাশের একটি নালা ধরে পেছনে সরে যায়। ওই অপারেশনে কোনো পাঞ্জাবি মারা গেছে কি না, তাঁরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি, কিন্তু পরে সেখানে গিয়ে তাঁরা অনেক রক্ত দেখতে পান। তাঁদের ধারণা, সেখানে অনেক হতাহত হয়েছে, যাদের পাঞ্জাবিরা সরিয়ে নিয়ে যায়।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও বীর প্রতীক খেতাব
সৈয়দ খান তাঁর কোম্পানির সঙ্গে রংপুরের হারাগাছা এলাকায় থাকতেই দেশ স্বাধীন হয়। তাঁর মতো বীরের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
কাউনিয়া এবং হাতিবান্ধা - এই দুটি অপারেশনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তাঁকে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। এটি ছিল তাঁর সাহসিকতা, নির্ভীকতা এবং দেশের প্রতি তাঁর অবিচল আনুগত্যের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
যুদ্ধ-পরবর্তী ট্র্যাজেডি - একাকীত্বের নির্মম শিকার
মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ খানের বীরত্বগাঁথা কেবল যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা লাভের পর। এই অংশটি তাঁর জীবনের এক চরম ট্র্যাজেডি, যা একাত্তরের যুদ্ধের ভুল বোঝাবুঝির কালো দিককে উন্মোচন করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে সৈয়দ খান তাঁর পরিবারের কাউকে পাননি। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের হত্যা করা হয়েছিল। এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত।
যুদ্ধের পর তাঁর অবাঙালি পরিচয়ের কারণে বা স্থানীয় ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বা স্থানীয় জনগণই তাঁর স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের হত্যা করেছিল। যুদ্ধ জয়ের আনন্দ তাঁর জন্য পরিণত হয়েছিল চিরন্তন শোকে। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
দ্বিতীয় জীবন ও আরও বড় বিচ্ছেদ
পরে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হলেও আর্থিক অনটনের কারণে সেই স্ত্রীও তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে চলে গেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সৈয়দ খান আজ পরিণত বয়সে একেবারে অসহায় অবস্থায় অন্যের আশ্রয়ে রয়েছেন।
জীবনের এই ঝড় বয়ে যাওয়ায় তাঁর বয়স এখন প্রায় ৮২। তিনি অনেক কিছুই ঠিকমতো মনে করতে পারেন না বা গুছিয়ে বলতে পারেন না। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এমন করুণ পরিণতি আমাদের সমাজের কাছে এক বড় প্রশ্ন চিহ্ন দাঁড় করায়।
উপেক্ষিত নায়কের প্রতি আমাদের দায়
বীর প্রতীক সৈয়দ খানের জীবনের গল্পটি কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতা নয়, এটি সেই নীরব বেদনা ও উপেক্ষার গল্প, যা যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে অনেক মুক্তিযোদ্ধার জীবনে নেমে এসেছিল। তিনি প্রমাণ করেছেন, জাতীয়তা নির্বিশেষে ন্যায় ও মুক্তির জন্য অস্ত্র ধারণ করাই সত্যিকারের বীরত্ব। তাঁর মতো মানুষই প্রমাণ করেছেন, একাত্তরের সংগ্রাম ছিল মানবতার।
যে মানুষটি দেশের জন্য নিজের জন্মদাতা পরিচয়কে তুচ্ছ করে, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং যুদ্ধের পর পরিবার হারিয়েছেন, তাঁকে সমাজের শেষ প্রান্তে এসে এমন অসহায় অবস্থায় কেন থাকতে হবে? সৈয়দ খানের এই করুণ পরিণতি সেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের সমাজের দায়বদ্ধতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যাদের অনেকেই খ্যাতি বা পরিচিতির আড়ালে নীরবে কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তা কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, এটি আমাদের জাতীয় বিবেকের কাছে এক চিরন্তন প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত
অনুলিখন: আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী অফিস
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















