বাংলাদেশে উগ্রবাদের কালো ছায়া - অতীত জঙ্গিবাদ নেটওয়ার্ক ও মতিঝিল আইইডি কাণ্ড
রাজধানী ঢাকার হৃদপিণ্ড মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে সম্প্রতি একটি পরিত্যাক্ত ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আইইডি (Improvised Explosive Device) বা হাতে তৈরি মারাত্মক বিস্ফোরক। মেট্রোরেল আজ কেবল কোনো আধুনিক গণপরিবহন নয়; এটি প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জীবনের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। ঠিক এমন একটি জনবহুল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাদদেশে এই ধরনের আইইডির উপস্থিতি এক রূঢ় বাস্তবতাকে আমাদের চোখের সামনে উন্মোচন করেছে।

TruthBangla

বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার স্থিতিশীলতার প্রশ্নে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দেশের সচেতন সমাজকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। এটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন কোনো আইনি ঘটনা বা কৌতূহলজনক সংবাদ হিসেবে দেখার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এটি কোনো প্যানিক বা ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়, বরং অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট তুলে ধরার জন্য উন্মোচন করা প্রয়োজন।
রাজধানী ঢাকার হৃদপিণ্ড মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে সম্প্রতি একটি পরিত্যাক্ত ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আইইডি (Improvised Explosive Device) বা হাতে তৈরি মারাত্মক বিস্ফোরক। মেট্রোরেল আজ কেবল কোনো আধুনিক গণপরিবহন নয়; এটি প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জীবনের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। ঠিক এমন একটি জনবহুল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাদদেশে এই ধরনের আইইডির উপস্থিতি এক রূঢ় বাস্তবতাকে আমাদের চোখের সামনে উন্মোচন করেছে।
আইইডি এই একটি মাত্র শব্দই যেকোনো দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধকে মুহূর্তে ওলট-পালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিগত কয়েক বছর ধরে এই ধরনের মারণাস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী ও প্রশিক্ষিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বাংলাদেশে আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ার যেসব তথ্য চাউর হচ্ছিল, মতিঝিলের ঘটনাটি তারই এক বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসনিক স্তরে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে যদি এখনই চরম সতর্কবার্তা জারি করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে অচিরেই দেশকে এমন এক অন্ধকারে প্রবেশ করতে হতে পারে, যার ভয়াবহতা কল্পনা করাও কঠিন।
মতিঝিল ঘটনা ও রথযাত্রা টার্গেট: বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির গভীর চক্রান্ত
ঘটনার বিষদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক মারাত্মক চক্রান্তের রূপরেখা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিত্যক্ত ছাতাটি থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইইডিটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে। তবে এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছিল না; এর নেপথ্যে ছিল সুদূরপ্রসারী এক ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক ষড়যন্ত্র।
বুবি-ট্র্যাপ (Booby Trap) কৌশল ও ছাতার ভেতর বোমা
উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকটি ছাতার কাঠামোর সাথে এমন এক নিখুঁত কৌশলে সেট করা ছিল, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘বুবি-ট্র্যাপ’ বলা হয়। অর্থাৎ, কোনো সাধারণ পথচারী বা কৌতূহলী মানুষ যদি ছাতাটিকে কুড়িয়ে নিয়ে খোলার চেষ্টা করত, সাথে সাথেই আইইডিটি বিস্ফোরিত হতো।
যদিও বিস্ফোরকটির প্রাথমিক ক্ষমতা পুরো একটি স্টেশন উড়িয়ে দেওয়ার মতো হয়তো ছিল না, কিন্তু একটি জনবহুল এলাকায় ছাতা খোলার মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়া নিশ্চিত করার জন্য এটি ছিল যথেষ্ট।
রথযাত্রাকে লক্ষ্য করে সাম্প্রদায়িক উসকানি
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঘটনার সময়ে মতিঝিলের ওই নির্দিষ্ট পথ দিয়ে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার শোভাযাত্রা অতিক্রম করার কথা ছিল। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে, এই হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ওই ধর্মীয় মিছিলকে টার্গেট করেই করা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্যগুলো ছিল:
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেওয়া: রথযাত্রায় হামলা চালিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এক অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া কভারেজ: বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি চরম নেতিবাচক ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া।
অর্থনৈতিক কেন্দ্রকে অচল করা: মতিঝিলের মতো বাণিজ্যিক হাব ও মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রজেক্টকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা।
ঘটনার পরপরই ডিএমপির ডগ স্কোয়াড ও সিটিটিসি পুরো মেট্রোরেল স্টেশন এবং আশপাশের এলাকাজুড়ে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু এই ঘটনাটি যা রেখে গেছে, তা হলো এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতার অনুভুতি।
আইইডি (IED) প্রযুক্তি ও উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের অনুপ্রবেশ
সাধারণ পটকা বা হাতবোমার সাথে আইইডি (Improvised Explosive Device)-এর গুণগত ও কৌশলগত ব্যবধান আকাশ-পাতাল। আইইডি তৈরি করা কোনো সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট কেমিক্যাল জ্ঞান, ইলেকট্রনিক সার্কিটের দক্ষতা এবং ডেটনেটিং ফিউজ ব্যবহারের বিশেষ প্রশিক্ষণ।
আইইডি (IED) কেন এত বিপজ্জনক? আইইডি হলো এমন একটি বিস্ফোরক ব্যবস্থা যা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ বস্তুর (যেমন: বোতল, ব্যাগ, ছাতা, পাইপ) ভেতর লুকিয়ে রাখা যায়। এটি দূরনিয়ন্ত্রিত (Remote Control), সময় নিয়ন্ত্রিত (Timer) কিংবা কোনো স্পর্শ/চাপের (Trigger) মাধ্যমে ফাটানো সম্ভব। সিরিয়া, ইরাক, কিংবা আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় উগ্রবাদীরা এই আইইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটিয়েছে।
বিগত অন্তত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রশিক্ষক গোপনে বাংলাদেশে যাতায়াত করেছে এবং স্থানীয় ছোট ছোট উগ্রবাদী সেলগুলোকে আইইডি তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। মতিঝিলে রেখে যাওয়া এই বোমাটি মূলত উগ্রবাদীদের পক্ষ থেকে একটি ‘টেস্ট কেস’ (Test Case)।
তারা দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা, রেসপন্স টাইম (Response Time) এবং জনসাধারণের সচেতনতা পরিমাপ করতেই এই মহড়াটি চালিয়েছে। এটি সংকেত দিচ্ছে যে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন আর নিষ্ক্রিয় নেই তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
২০২৪ পরবর্তী নিরাপত্তা শূন্যতা ও কাউন্টার-টেররিজমের স্থবিরতা
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকাঠামো এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। দেশের সার্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ তৎপরতা প্রয়োজন ছিল, সেখানে ঘটে চলেছে ঠিক উল্টো ঘটনা।
বিশেষায়িত বাহিনীর নজরদারির অভাব
বাংলাদেশের জঙ্গি ও উগ্রবাদ দমনে যে দুটি বাহিনী সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিট এবং সোয়াট (SWAT) টিম। ৫ই আগস্টের পর থেকে এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর অপারেশনাল সক্ষমতা ও মনোযোগ অন্য খাতে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যেসব দক্ষ কমান্ডোদের কাজ ছিল উগ্রবাদী সেলগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা ও কাউন্টার-অপারেশন চালানো, তাদের এখন নিয়োজিত করা হচ্ছে সীমান্ত চোরাচালান ধরা বা সাধারণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজে। দেশের অভ্যন্তরে বহু বছর ধরে গড়ে তোলা জঙ্গি দমন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক (Intelligence Network) কার্যত ভেঙে পড়েছে বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
"জঙ্গি নাটক" বয়ানের মারাত্মক মাশুল
বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে একটি ভুল ও আত্মঘাতী বয়ান সমাজে স্থান পেয়েছিল যে "বাংলাদেশে আসলে কোনো জঙ্গি বা উগ্রবাদী নেই, এসবই নাকি শাসকগোষ্ঠীর তৈরি করা নাটক।" এই ধরনের অদূরদর্শী মানসিকতা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ছাড় (Security Vacuum) এনে দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে যখন একটি দেশের কাউন্টার-টেররিজম অর্জনকে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়, তখন আসল উগ্রবাদীরা পর্দার অন্তরালে নিজেদের সংঘটিত করার সুবর্ণ সুযোগ পায়। মতিঝিলের আইইডি কাণ্ড প্রমাণ করে দিল যে উগ্রবাদ কোনো নাটক ছিল না, এটি এক নির্মম ও বিপজ্জনক বাস্তবতা।
আরো কিছু ঘটনায় জঙ্গিবাদ কানেকশন
শেখ হাসিনার আমল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তৎপরতায় যেসকল জঙ্গি নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জঙ্গি সংগঠনগুলো কীভাবে প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল, রূপ ও ছদ্মবেশ পরিবর্তন করছে।
ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (FCS) ও শাহ আমানত সাবির (জুলাই ২০২৬-এর ঘটনা)
২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী 'ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম' (FCS) নামক একটি মারাত্মক উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে সক্ষম হয়। এই চক্রের মূল হোতা শাহ আমানত সাবিরকে গ্রেফতারের পর যে তথ্য সামনে আসে, তা দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের রীতিমতো চমকে দেয়।
ছদ্মবেশ ও রাজনৈতিক খোলস পরিবর্তন: শাহ আমানত সাবির মূলত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উগ্র ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন 'ইসলামী ছাত্রশিবির'-এর রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতিতে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে তার খোলস পরিবর্তন করেন। তিনি ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (NCP)-এর রাজনীতির সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। এই নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে উগ্রবাদী ও সশস্ত্র নেটওয়ার্ক বিস্তারের পথ সুগম করেন।
মার্শাল আর্টের আড়ালে সামরিক প্রশিক্ষণ: সাবির তরুণদের আকৃষ্ট করার জন্য এক অভিনব বয়ান তৈরি করেছিলেন। তিনি ফেসবুকে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তার সংগঠনকে "বিশ্বের প্রথম শিরকমুক্ত, কুফরমুক্ত, মিউজিকমুক্ত এবং পরিপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী মার্শাল আর্ট কেন্দ্র" হিসেবে প্রচার করতেন। মার্শাল আর্ট শেখানোর নামে তিনি প্রকৃতপক্ষে তরুণদের মগজধোলাই (Brainwashing) করছিলেন এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সামরিক ড্রিল বা Militant Training প্রদান করছিলেন। সাবির নিজেকে "আমির-ই-মুজাহিদ" বা ধর্মযোদ্ধাদের নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
'সারিয়া' বা ডাকাতির মাধ্যমে ফান্ডিং: সাবির ও তার অনুসারীরা সংগঠনের সামরিক তহবিল গঠন করতে কোনো আইনি বা স্বাভাবিক পথ বেছে নেয়নি। তারা সরাসরি ছিনতাই ও ডাকাতির পথ বেছে নেয়। ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে 'সারিয়া' বা গনিমাদের মাল হিসেবে আখ্যায়িত করে নিজেদের অনুসারীদের মনে অপরাধবোধ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল।
আইইডি (IED) টেস্ট ও আন্তর্জাতিক আইএস (ISIS) কানেকশন: অভিযান চালিয়ে সাবিরের উদ্ধারকৃত মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইস থেকে যে ফরেনসিক ডাটা পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় সাবিরের তত্ত্বাবধানে নির্জন প্রত্যন্ত এলাকায় আইইডি (Improvised Explosive Device) বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছিল। বোমার টেস্টের সময় সাবির ও তার সহযোগীরা 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিচ্ছিল এবং সেই ভিডিও ধারণ করে দেশের বাইরে তাদের আন্তর্জাতিক মেন্টরদের কাছে পাঠাচ্ছিল। সবচেয়ে আশঙ্কজনক বিষয় ছিল, উদ্ধারকৃত ওই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজেছিল আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর প্রাতিষ্ঠানিক অফিশিয়াল রণসংগীত বা নাশিদ। সাবিরের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল কথিত ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ প্রতিষ্ঠার জন্য তরুণদের একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র স্কোয়াডে পরিণত করা।
হাসনাবাদের মাদ্রাসায় 'মাদার অব শয়তান' (TATP) ল্যাবরেটরি (২৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এর ঘটনা)
২০২৫ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার ‘দক্ষিণ উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’-য় একটি বিকট ও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। একতলা মাদ্রাসা ভবনটির ইটের দেয়াল মুহূর্তের মধ্যে উড়ে গিয়ে রাস্তায় আছড়ে পড়ে এবং মূল ছাদে বিশাল ফাটল দেখা দেয়।
বিস্ফোরকের প্রকৃতি ও TATP-র উপস্থিতি: কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও ল্যাব বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে উচ্চ-ঘনত্বের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এবং TATP (Triacetone Triperoxide) তৈরির রাসায়নিক উপাদান ও সরঞ্জাম উদ্ধার করেন। আন্তর্জাতিক সামরিক ভাষায় TATP-কে বলা হয় "Mother of Satan" বা "শয়তানের মা"। রাসায়নিক হিসেবে এটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও সংবেদনশীল। সামান্য তাপ, ঘর্ষণ বা আঘাতেই এটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। বৈশ্বিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (ISIS) ও আল-কায়েদা বিশ্বজুড়ে যতগুলো আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতে এই TATP ব্যবহার করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের ওই মাদ্রাসায় মূলত একটি টিএটিপি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে ভুল মিশ্রণের কারণে দুর্ঘটনাবশত বিস্ফোরণটি ঘটে যায়।
মাস্টারমাইন্ড আল আমিন শেখ রাজিব ও ২০১৬ সালের গুলশান হামলার সংযোগ: অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বোমার কারখানার নেপথ্যে ছিল আল আমিন শেখ রাজিব নামক একজন উগ্রবাদী, যে বাহ্যিকভাবে সাধারণ আলেম বা ধর্মীয় শিক্ষকের ছদ্মবেশে ছিল। রাজিব ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কুখ্যাত 'তামিম-সারোয়ার' গ্রুপের একজন অত্যন্ত সক্রিয় ক্যাডার। এই তামিম-সারোয়ার গ্রুপই ২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিসান বেকারিতে সংঘটিত ভয়াবহতম জঙ্গি হামলার নেপথ্য কারিগর ছিল। রাজিবকে ২০১৭ সালেও র্যাব অস্ত্র ও জিহাদি বইসহ নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছিল। জামিনে বের হয়ে সে পুনরায় কেরানীগঞ্জে একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সুইসাইডাল স্কোয়াডের রিক্রুটমেন্ট সেন্টার ও টিএটিপির মতো মারাত্মক বিস্ফোরক তৈরির ল্যাব গড়ে তুলেছিল।
চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসা ও পাকিস্তানের 'লস্কর-ই-তৈয়বা' কানেকশন (৭ অক্টোবর ২০১৩)
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের মূল ঘাটি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের লালখান বাজার ‘জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া’ মাদ্রাসায় ২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
পাইপবোমা ও গ্রেনেড তৈরি: ঘটনার পর পুলিশ ও বোমা বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল থেকে তাজা বোমা, পাইপ ও গ্রেনেড সদৃশ বিস্ফোরক তৈরির বিশাল সরঞ্জাম উদ্ধার করে। অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের কক্ষে ছাত্ররা সরাসরি বোমার কারখানায় কাজ করছিল।
আন্তর্জাতিক সংযোগ ও মুফতি ইজহার: গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করে যে, উক্ত মাদ্রাসায় যে প্রযুক্তির পাইপবোমা তৈরি হচ্ছিল, তা হুবহু পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত প্রযুক্তির সাথে মিলে যায়। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা (LeT) এই প্রযুক্তির বোমার প্রধান ব্যবহারকারী। লালখান বাজার মাদ্রাসার পরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন নায়েবে আমির মুফতি ইজহারুল ইসলাম এবং তার ছেলে মুফতি হারুনের সাথে লস্কর-ই-তৈয়বা এবং আফগান ফেরত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) সরাসরি যোগাযোগ প্রমাণিত হয়। এই মুফতি ইজহার ইতিপূর্বেও হুজি-র সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন।
লালখান বাজার ঘটনা ও পাইপ বোমার সূত্র
মতিঝিলে উদ্ধারকৃত আইইডিটির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি ছিল এক ধরনের উন্নত ঘরানার ‘পাইপ বোমা’ (Pipe Bomb)। এই পাইপ বোমার সাথে বাংলাদেশের অতীতের উগ্রবাদী তৎপরতার এক গভীর ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামের লালখান বাজারে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল। পরবর্তীতে পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা এবং অ্যাসিড উদ্ধার করে। ওই মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বিতর্কিত উগ্রবাদী নেতা হারুন ইজহার এবং তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম।
সেই সময়ও যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হারুন ইজহারকে বিস্ফোরক ও পাইপ বোমাসহ গ্রেফতার করেছিল, তখন সমাজের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন। তারা পুলিশি অভিযানকে ‘জঙ্গি নাটক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং তীব্র সমালোচনা শুরু করেছিল।
আজকে মতিঝিলে যে পাইপ বোমার দেখা মিলল, তার ম্যানুফ্যাকচারিং কৌশল ও নেটওয়ার্ক সেই ২০১৩ সালের উগ্রবাদী সেলের সাথে বহুলাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ। অতীতে যেসব বিপজ্জনক বীজ বপন করা হয়েছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সময় বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল, আজ তারাই আবার নতুন চেহারায় সামনে আসছে।
শেখ হাসিনার 'জিরো টলারেন্স' নীতি ও কাউন্টার-টেররিজম কৌশল
শেখ হাসিনা যেভাবে বাংলাদেশকে উগ্রবাদের কালো থাবা থেকে রক্ষা করেছেন, তা বিশ্ব দরবারে "Bangladesh Model of Counter-Terrorism" হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তার দমন কৌশল কেবল সামরিক বা পুলিশি অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল।
১. বিশেষায়িত আইন-শৃঙ্খলা ইউনিট গঠন: শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্তে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে গঠিত হয় Counter Terrorism and Transnational Crime (CTTC) ইউনিট এবং পরবর্তীতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অধীনে গঠিত হয় Anti Terrorism Unit (ATU)। এই বিশেষায়িত সংস্থাগুলোকে বিশ্বমানের গোয়েন্দা প্রযুক্তি, ট্র্যাকিং ডিভাইস এবং সোয়াত (SWAT) প্রশিক্ষণে সজ্জিত করা হয়। হোলি আর্টিসান পরবর্তী সময়ে তারা দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা শতাধিক গোপন জঙ্গি আস্তানা (যেমন: কল্যাণপুর, গাজীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, আতিয়া মহল) সফলভাবে ধ্বংস করে।
২. মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন রোধ (BFIU-র ভূমিকা): জঙ্গিবাদের প্রধান জ্বালানি হলো অর্থায়ন। শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)-কে শক্তিশালী করেন। হুন্ডি, অবৈধ ট্রাস্ট, ছদ্মবেশী এনজিও এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদেশ থেকে জঙ্গি অর্থায়ন আসা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়। অপরাধের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থকে 'সারিয়া' বা 'গনিমত' বলে চালানোর প্রক্রিয়া প্রতিরোধে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়।
৩. কাউন্টার-ন্যারেটিভ ও সামাজিক প্রতিরোধ: শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছিলেন উগ্রবাদের আদর্শিক মোকাবিলা ছাড়া কেবল বন্দুক দিয়ে এটি পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয়। এজন্য তিনি দেশের প্রকৃত আলেম-ওলামা, ইমাম এবং সুফি ধারার ইসলামি চিন্তাবিদদের একত্রিত করেন। লক্ষাধিক আলেমের স্বাক্ষর সংবলিত "সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামি ফতোয়া" প্রকাশ করা হয়। জুম্মার খুতবায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদান এবং অভিভাবকদের সচেতন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
৪. আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা: শেখ হাসিনা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেশী দেশ ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইন্টারপোল এবং আন্তর্জাতিক কাউন্টার-টেররিজম জোটগুলোর সাথে শক্তিশালী তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস বা আল-কায়েদা যাতে বাংলাদেশে ঘাঁটি বানাতে না পারে, সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন।
এক নজরে বাংলাদেশে আইইডি কাণ্ড, উগ্রবাদী হামলা ও নিরাপত্তা ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া প্রধান প্রধান আইইডি, বোমা হামলা ও কাউন্টার-টেররিজম সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী নিচে সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
হামলার সাল / ঘটনা | হামলার ধরন ও অস্ত্র | মূল টার্গেট ও স্থান | হতাহত ও সামাজিক প্রভাব | রাষ্ট্রীয় ও আইনি পদক্ষেপ |
১৯৯৯ (উদীচী হামলা) | রিমোট-কন্ট্রোলড আইইডি / টাইম বোমা | উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যশোর। | ১০ জন নিহত, ১০০+ আহত। দেশে প্রথম বড় আইইডি হামলা। | হারকাতুল জিহাদ (HuJI-B)-এর নাম উঠে আসে। |
২০০১ (রমনা বটমূল) | উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাইম বোমা (IED) | পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, রমনা বটমূল। | ১০ জন নিহত, বহু আহত। সাংস্কৃতিক চেতনায় আঘাত। | হুজি প্রধান মুফতি হান্নানসহ একাধিক জঙ্গির ফাঁসির রায়। |
২০০৪ (২১শে আগস্ট) | সামরিক গ্রেডের 'আর্জেস' গ্রেনেড | শেখ হাসিনার জনসভা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। | ২৪ জন নিহত, ৫২০+ আহত। শেখ হাসিনাকে হত্যার অপচেষ্টা। | আন্তর্জাতিক তদন্ত ও পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাদের সাজা প্রদান। |
২০০৫ (সিরিজ বোমা) | ক্ষুদ্রাকৃতির টাইম-আইইডি ও আইইডি | একযোগে ৬৩টি জেলার ৫০০+ কৌশলগত স্থান। | ২ জন নিহত, ৫০+ আহত। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর চরম আঘাত। | জেএমবি নিষিদ্ধ ঘোষণা; শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের ফাঁসি। |
২০১৩ (লালখান বাজার) | হ্যান্ডমেড পাইপ বোমা ও কেমিক্যাল | মাদ্রাসার অন্দরে বোমা তৈরির কারখানা, চট্টগ্রাম। | ৩ জন নিহত (বিস্ফোরণে)। উগ্রবাদী আস্তানার উন্মোচন। | উগ্রবাদী নেতা হারুন ইজহার গ্রেফতার ও বিস্ফোরক বাজেয়াপ্ত। |
২০১৬ (হোলি আর্টিসান) | আসাল্ট রাইফেল, গ্রেনেড ও আইইডি | কূটনৈতিক এলাকা গুলশানের রেস্তোরাঁ। | ২০ জন জিম্মি (১৭ বিদেশী) ও ২ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত। | 'অপারেশন থান্ডারবোল্ট' পরিচালনা ও নিউ-জেএমবি ধ্বংস। |
২০২৪ (মতিঝিল মেট্রো) | ছাতার ভেতরে বুবি-ট্র্যাপড আইইডি | মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন ও রথযাত্রা। | কোনো প্রাণহানি হয়নি (আইইডি সফলভাবে নিষ্ক্রিয়)। | ডিএমপি বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও ডগ স্কোয়াড কর্তৃক তল্লাশি। |
বিএনপি-জামায়াত জোট আমল বনাম আওয়ামী লীগ সরকার
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস বুঝতে হলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কালের দিকে তাকাতে হয়। সেই সময়ে তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় বাংলাদেশে উগ্রবাদের অভূতপূর্ব প্রসার ঘটেছিল।
১. বাংলা ভাই ও জেএমবি-র ভয়াল উত্থান: ২০০১-২০০৬ মেয়াদে রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ অঞ্চলে শায়খ আব্দুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবি প্রকাশ্য সামরিক মহড়া দিয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী নেতারা জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে একে "বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি" বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
২. ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা: ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে ৫০০টিরও বেশি স্থানে বোমা হামলা চালিয়ে জেএমবি তাদের সক্ষমতা ও দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের জানান দেয়। এটি ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।
৩. ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। পরবর্তীতে তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কিছু কর্মকর্তা, হাওয়া ভবনের রাজনৈতিক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) যৌথ পরিকল্পনায় এই হামলা পরিচালিত হয়েছিল।
২০০৯ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পর শেখ হাসিনা এই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে আগে দেশের ভেতর থেকে জঙ্গিবাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী নীতিমালার সাথে সমন্বয় করে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেন। অ্যান্টি-টেররিজম অ্যাক্ট (সন্ত্রাস বিরোধী আইন) প্রণয়ন ও সংশোধন, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিট গঠন এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB)-কে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার মাধ্যমে তিনি জঙ্গি আস্তানাগুলোতে ধারাবাহিক আঘাত হানতে শুরু করেন।
বাংলাদেশে উগ্রবাদের ঐতিহাসিক ধারা ও প্রজন্মের রূপান্তর
বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের রূপরেখা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নিজেদের কৌশল, আদর্শিক প্রচার এবং অস্ত্র ব্যবহারের ধরন বহুবার পরিবর্তন করেছে। বিশ্লেষকগণ বাংলাদেশে উগ্রবাদের বিকাশকে মূলত পাঁচটি প্রজন্মে (Generations) ভাগ করে থাকেন:
১ম প্রজন্ম: আফগান ফেরত যোদ্ধা ও হুজি-বি (১৯৮৯–২০০০)
আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের পর আফগানিস্তান থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশি যোদ্ধারা ১৯৮৯ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (HuJI-B) গঠন করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ও আফগানিস্তানভিত্তিক উগ্রবাদী মডেলকে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা।
মূল ঘটনা: ১৯৯৯ সালে যশোরের উদীচীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা এবং ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে রক্তক্ষয়ী হামলা।
২য় প্রজন্ম: জেএমবি ও ক্যাডারভিত্তিক বিস্ফোরণ (২০০১–২০০৬)
২০০১ সালের পর শায়খ আব্দুর রহমান এবং বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (JMJB)। তারা উত্তরাঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি একটি সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করে।
মূল ঘটনা: ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে ৫০০টিরও বেশি স্থানে সিরিজ বোমা হামলা এবং ঝালকাঠিতে দুই বিচারককে হত্যা।
৩য় প্রজন্ম: আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও ডিজিটাল রেডিক্যালাইজেশন (২০১৩–২০১৫)
ইন্টারনেটের প্রসার এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের যুগে উত্থান ঘটে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT)-এর, যা পরবর্তীতে আনসার আল-ইসলাম নামে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (AQIS) আনঅফিসিয়াল উইং হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কৌশল: তারা বৃহৎ বোমা হামলায় না গিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি (ব্লগার, প্রকাশক ও মুক্তমনা লেখক)-দের ওপর গুপ্তহত্যার কৌশল গ্রহণ করে।
৪র্থ প্রজন্ম: নিউ-জেএমবি ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব (২০১৫–২০১৭)
মধ্যপ্রাচ্যে আইএস (ISIS)-এর উত্থানের প্রভাবে বাংলাদেশে গড়ে ওঠে ‘নিউ-জেএমবি’। তামিম চৌধুরী ও সারোয়ার জাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গ্রুপটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হামলায় অংশ নেয়।
মূল ঘটনা: ২০১৬ সালের ১লা জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিসান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলা।
৫ম প্রজন্ম: হাইব্রিড মডেল ও ছদ্মবেশী নেটওয়ার্ক (বর্তমান)
বর্তমানে উগ্রবাদীরা চিরাচরিত মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রিক্রুটমেন্টের বাইরে এসে কলোনিয়াল ও কর্পোরেট বা আধুনিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ:
ছদ্মবেশী সংগঠন: ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’-এর মতো মার্শাল আর্ট বা জিউ-জিতসু ট্রেনিং ক্লাবের আড়ালে তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ দান।
পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় ট্রেনিং ক্যাম্প: জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার মতো সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (যেমন: KNF) সহায়তা নিয়ে পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় নতুন আস্তানা গড়ে তোলা।
সাইবার রেডিক্যালাইজেশন ও অপরাধের ‘ধর্মীয়করণ’
আধুনিক যুগে প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলোকে আরও বেশি গোপনীয় ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন (Encrypted Messaging): উগ্রবাদীরা এখন আর সাধারণ মোবাইল ফোন বা খোলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে না। যোগাযোগের জন্য তারা শেষ-থেকে-শেষ এনক্রিপ্টেড (End-to-End Encrypted) অ্যাপ যেমন: Telegram, Element, Threema, Session ইত্যাদি ব্যবহার করে। এসকল মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে বিশেষ ‘সিক্রেট চ্যাট’ ও ‘সেলফ-ডিস্ট্রাক্টিং মেসেজ’ ব্যবহার করে তারা গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে যায়।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডি: চিরাচরিত ব্যাংকিং চ্যানেলগুলোয় মানিলন্ডারিং ও সসাসপেক্ট লেনদেনের ওপর কঠোর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা (BFIU) নজরদারি থাকায় উগ্রবাদীরা এখন অর্থ লেনদেনের জন্য বিটকয়েন (Bitcoin), ইউএসডিটি (USDT) কিংবা অন-ক্লেমেবল এনক্রিপ্টেড ওয়ালেট ব্যবহার করছে।
সাধারণ অপরাধকে ‘শারিয়া/গণিমত’ আখ্যা দেওয়া: সাম্প্রতিক তদন্তে দেখা গেছে, উগ্রবাদী দলগুলো অর্থের জন্য নিজস্ব সদস্যদের দিয়ে ব্যাংক ডাকাতি, সাধারণ পথচারীদের ছিনতাই কিংবা বড় ধরনের প্রতারণা করায়। তাদের মগজধোলাই এমনভাবে করা হয় যে, তারা মনে করে এই অর্থ অমুসলিম বা রাষ্ট্রের সম্পত্তি এবং এটি ‘গণিমতের মাল’ হিসেবে গ্রহণ করা ধর্মীয়ভাবে বৈধ।
'গাজওয়াতুল হিন্দ' ও দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা
বাংলাদেশের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো কখনো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বয়ান কী?
উগ্রবাদী আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলো (বিশেষ করে আল-কায়েদা ও আইএস) ভারতীয় উপমহাদেশে এক চূড়ান্ত ধর্মযুদ্ধের কাল্পনিক রূপরেখা প্রচার করে, যাকে তারা ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ নামে অভিহিত করে। এই মনস্তাত্ত্বিক বয়ানের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের উদীয়মান ও বিভ্রান্ত তরুণদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে প্ররোচিত করা।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রভাব
তালেবানের ক্ষমতা দখল (২০২১): ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী মনস্তত্ত্বে নতুন হাওয়া লাগে। বহু বাংলাদেশি তরুণ অনলাইনে আফগানিস্তানের ল্যান্ডস্কেপ ও ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে হিজরতের নামে ঘর ছাড়ে।
লস্কর-ই-তৈয়বা ও আফগান লবি: পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়বা (LeT) ও জাইশ-ই-মোহাম্মদ (JeM)-এর প্রস্তুত করা বিভিন্ন আইইডি ও বিস্ফোরকের ম্যানুয়াল এবং কেমিক্যাল রেসিপি অনলাইনে বাংলায় অনূদিত হয়ে স্থানীয় উগ্রবাদীদের হাতে পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনসমূহের এক নজরে তুলনামূলক চিত্র
নিচে বাংলাদেশে সক্রিয় বা নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রধান উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর আদর্শিক ভিত্তি, মূল কৌশল এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো:
সংগঠনের নাম | প্রতিষ্ঠার সময়কাল | আন্তর্জাতিক আদর্শিক সংযোগ | মূল কৌশল ও হামলার ধরন | বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা |
হুজি-বি (HuJI-B) | ১৯৮৯ | আল-কায়দা / তালেবান (আফগান নেটওয়ার্ক) | জনসভায় বোমা ও গ্রেনেড হামলা, শীর্ষ রাজনীতিবিদদের টার্গেট করা। | শীর্ষ নেতারা সাজাপ্রাপ্ত; বর্তমানে কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত বা নিষ্ক্রিয়। |
জেএমবি (JMB) | ১৯৯৮ | ওহাবি / সালাফি উগ্রবাদী ভাবাদর্শ | একযোগে সারা দেশে সিরিজ আইইডি ও পাইপ বোমা বিস্ফোরণ। | মূল সংগঠন ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে; বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা ফাঁসি/গ্রেফতারকৃত। |
আনসার আল-ইসলাম (ABT) | ২০১৩ | আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS) | স্লিপার সেলের মাধ্যমে টার্গেটেড কিলিং ও অনলাইন প্রপাগান্ডা। | গোপনে সক্রিয়; অনলাইন প্রচারণা ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপে রিক্রুটমেন্ট অব্যাহত। |
নিউ-জেএমবি | ২০১৫ | ইসলামিক স্টেট (ISIS - মধ্যপ্রাচ্য) | আত্মঘাতী হামলা, জিম্মি সংকট ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার (যেমন: হোলি আর্টিসান)। | কাউন্টার-টেররিজম অভিযানে নেতৃত্ব শূন্য হলেও স্লিপার সেল বিদ্যমান। |
জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া | ২০১৯-২০২০ | দেশীয় হাইব্রিড নেটওয়ার্ক (পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে যুক্ত) | দুর্গম পাহাড়ে সামরিক ক্যাম্প স্থাপন ও আধুনিক অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ। | আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে শীর্ষ নেটওয়ার্ক উন্মোচিত ও আস্তানা ধ্বংস। |
কাউন্টার-টেররিজম এজেন্সি ও মেগা অপারেশনের ইতিহাস
বাংলাদেশ উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণে যে বৈশ্বিক সাফল্য দেখিয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিল বিশেষায়িত কিছু নিরাপত্তা বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও নির্ভীক অভিযান।
ঐতিহাসিক প্রধান প্রধান কাউন্টার-টেররিজম অপারেশনসমূহ:
১. অপারেশন থান্ডারবোল্ট (জুলাই ২০১৬): গুলশানের হোলি আর্টিসানে সেনা কমান্ডোদের নেতৃত্বে চালিত অভিযান, যার মাধ্যমে ১২ ঘণ্টার জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।
২. অপারেশন স্টর্ম ২৬ (জুলাই ২০১৬): ঢাকার কল্যাণপুরে ‘জাহাজ বিল্ডিং’-এ সিটিটিসির অভিযান, যেখানে ৯ জন নিউ-জেএমবি জঙ্গি নিহত হয় এবং তাদের বড় ধরনের নাশকতার ছক বানচাল হয়।
৩. অপারেশন হিট স্ট্রাইক ও স্প্লিটার ব্ল্যাস্ট (২০১৬–২০১৭): নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া এবং গাজীপুরে সিটিটিসির ড্রাইভ, যেখানে নিউ-জেএমবির মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি নিহত হয়।
৪. অপারেশন আতিয়া মহল (মার্চ ২০১৭): সিলেটের শাপলাবাগে আতিয়া মহলের জঙ্গি আস্তানায় সেনাবাহিনী ও সোয়াটের যৌথ অভিযান, যা টানা চার দিন ধরে চলে।
জাতীয় সুরক্ষা নিশ্চিতে বহুমুখী কৌশল ও করণীয়
উগ্রবাদ কেবল একটি আইনি বা পুলিশি সমস্যা নয়; এটি একটি মানসিক ও আদর্শিক ব্যাধি। একে পুরোপুরি দূর করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
১. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: সিটিটিসি (CTTC), অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (ATU) এবং র্যাব-এর কাউন্টার-টেররিজম উইংগুলোকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে দিতে হবে।
২. সাইবার স্পেস মনিটরিং: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক সাইবার টুলস ব্যবহার করে ডার্কওয়েব ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং গ্রুপের উগ্রবাদী কনটেন্ট শনাক্ত করে তা বন্ধ করতে হবে।
৩. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তান বা যুবসমাজ হঠাৎ করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা, কিংবা ইন্টারনেটে অতিরিক্ত সময় কাটিয়ে কোনো উগ্রবাদী বয়ানে আসক্ত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।
৪. ডি-রেডিক্যালাইজেশন (De-radicalization) প্রোগ্রাম: যারা উগ্রবাদে ভুলবশত জড়িয়ে পড়েছে কিন্তু বড় অপরাধ করেনি, তাদের উপযুক্ত কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মূলধারার সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশের উগ্রবাদী সংগঠনগুলো কখনোই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো গোষ্ঠী ছিল না। তাদের পেছনে সবসময় কাজ করেছে আন্তর্জাতিক আদর্শিক ও বস্তুগত নেটওয়ার্ক।
আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আল-কায়েদার মূল প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরি এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা শাখা (AQIS) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।
আস-সাহাব মিডিয়া (As-Sahab Media): তাদের অফিসিয়াল প্রচার সংস্থা 'আস-সাহাব' নিয়মিত বাংলায় অডিও, ভিডিও এবং ম্যাগাজিন (যেমন: নবায়ে হারব) প্রকাশ করে।
কৌশল: তারা সাধারণত বড় কোনো স্থাপনায় হঠাৎ হামলার চেয়ে সমাজের সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে 'টার্গেটেড কিলিং' (Targeted Killing) এবং স্লিপার সেল তৈরিতে বেশি বিশ্বাসী।
ইসলামিক স্টেট (ISIS) ও ‘আমাক’ নেটওয়ার্ক
আইএস মূলত তাদের প্রোপাগান্ডা উইং ‘আমাক নিউজ এজেন্সির’ (Amaq News Agency) মাধ্যমে সারা বিশ্বে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। হোলি আর্টিসান হামলার পর থেকে তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন উগ্রবাদী গ্রুপকে সরাসরি ‘উলায়া অব বেঙ্গল’ (Wilayah Bengal) বা তাদের বাংলাদেশ প্রদেশ হিসেবে দাবি করার চেষ্টা করে আসছে।
রোহিঙ্গা সীমান্ত ঝুঁকি ও উগ্রবাদ
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো নিরাপত্তা বিশ্লেষণের এক বড় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আরসা (ARSA) এবং আরএসও (RSO)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে স্থানীয় উগ্রবাদীদের যোগাযোগ দেশীয় নিরাপত্তার জন্য একটি মারাত্মক টাইম-বোমা (Time-bomb)। সীমান্ত পারাপার, অবৈধ আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ এবং ড্রাগ মানির (ইয়াবা বাণিজ্য) মাধ্যমে উগ্রবাদীদের অর্থায়নের এক নতুন রুট তৈরি হয়েছে।
'তাকফির' মতবাদ ও মনস্তাত্ত্বিক মগজধোলাই
উগ্রপন্থীরা কেবল আবেগ দিয়ে মানুষ রিক্রুট করে না; তাদের একটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে।
‘তাকফির’ (Takfir) নীতি কী? তাকফিরি মতবাদ হলো এমন এক চরমপন্থী ধারণা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি তাদের নির্দিষ্ট উগ্রবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে সম্পূর্ণ একমত না হয়, তবে তাকে 'কাফের' বা 'মুরতাদ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই তারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংবিধান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং এমনকি সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলাকে ধর্মীয়ভাবে 'বৈধ' বলে প্রচার করে।
জঙ্গি অর্থায়নের গোপন কৌশল (Terror Financing & Money Laundering)
একটি উগ্রবাদী সেল পরিচালনা, আইইডি তৈরি এবং সদস্যদের নিরাপদ আস্তানায় রাখার জন্য অবিরাম অর্থের প্রয়োজন হয়। এই অর্থ সংগ্রহের জন্য তারা আধুনিক ও প্রচলিত বহু কৌশল ব্যবহার করে:
১. ডিজিটাল ক্রিপ্টো ওয়ালেট: সেন্ট্রাল ব্যাংকিং সিস্টেম এড়িয়ে চলতে ব্লকচেইনের USDT (Tether) এবং Bitcoin ব্যবহার করে বিদেশ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়।
২. বেনামী ভুয়া এনজিও ও চ্যারিটি: শিক্ষাবৃত্তি, এতিমখানা বা মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের কথা বলে প্রবাসীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তুলে তার বড় অংশ গোপনে উগ্রবাদী কাজে ডাইভার্ট করা হয়।
৩. 'গণিমতের মাল' নীতি: সাধারণ পথচারীর মোবাইল-টাকা ছিনতাই করা বা ব্যাঙ্ক ডাকাতি করাকে তারা ধর্মীয় বৈধতা দিয়ে ফান্ড বানায়।
আইইডি (IED) ও কেমিক্যাল প্রযুক্তির গভীর প্রযুক্তিগত পার্থক্য
হামলার ধরণ এবং কেমিক্যালের ওপর ভিত্তি করে বিস্ফোরকের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ভিন্ন হয়। নিচে উগ্রবাদীদের ব্যবহৃত প্রধান কেমিক্যাল ও প্রযুক্তিগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
TATP কেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থার জন্য দুঃস্বপ্ন?
নাইট্রোজেনবিহীন গঠন: অধিকাংশ এয়ারপোর্ট ও মেটাল ডিটেক্টর বিস্ফোরক শনাক্ত করতে নাইট্রোজেন পরমাণু অনুসন্ধান করে। কিন্তু TATP-র রাসায়নিক সূত্রে কোনো নাইট্রোজেন থাকে না, ফলে এটিকে সাধারণ স্ক্যানারে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
চরম অস্থিরতা (Instability): এটি প্রস্তুত করার সময় যেকোনো ছোট ভুলের কারণে বোম্বমেকার নিজে সহ পুরো ল্যাব মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে (যেমনটি ঘটেছিল কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে)।
বর্তমান ঝুঁকি, সম্ভাব্য পরিণতি ও রাষ্ট্রের জরুরি করণীয়
মতিঝিলের ঘটনাটি আমাদের সামনে এক চরম সত্য তুলে ধরেছে শত্রু আমাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছে। এখন যদি রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণ ঘুমিয়ে থাকে, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য হাই-এলার্ট জারিকরণ: দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (Critical National Infrastructure) যেমন মেট্রোরেল, বিমানবন্দর, পদ্মা সেতু, পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে অবিলম্বে সর্বোচ্চ মাত্রার ‘হাই-এলার্ট’ (High Alert) জারি করতে হবে।
কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটগুলোর পুনর্গঠন: সিটিটিসি, র্যাব ও সোয়াটের অপারেশনের মূল ফোকাসকে অবিলম্বে রাজনৈতিক বা সাধারণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে পুনরায় কাউন্টার-টেররিজমে ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক শিথিলতা ছাড়া উগ্রবাদী স্লিপার সেলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে।
কেমিক্যাল ও আইইডি কাঁচামাল বাণিজ্যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: আইইডি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল (যেমন: নাইট্রেট সালফার, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, ডেটনেটর) বাজারে কীভাবে বিক্রি হচ্ছে, তার ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। সীমান্ত এলাকায় যেসব আন্তর্জাতিক বোমাকারের যাতায়াতের খবর রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি (If You See Something, Say Something): সাধারণ নাগরিকদেরও এখন চরম সতর্ক হতে হবে। মেট্রোরেল, বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন বা যেকোনো জনবহুল স্থানে পরিত্যক্ত ছাতা, ব্যাগ, প্যাকেট বা বোতল দেখলে কেউ নিজে থেকে খোলার বা স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না।
তাৎক্ষণিকভাবে ৯৯৯ বা নিকটস্থ পুলিশ ও সিকিউরিটি গার্ডকে অবহিত করুন। উগ্রবাদী বা সন্দেহভাজন কোনো কার্যক্রম আশেপাশে চোখে পড়লে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান।
জাতীয় অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের আহ্বান
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিক অবকাঠামোর অগ্রগতি, অন্যদিকে উগ্রবাদ ও অস্থিতিশীলতার গভীর আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে উদ্ধারকৃত আইইডিটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা (Warning Shot)। উগ্রবাদীদের মূল লক্ষ্য আমাদের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা, দেশে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করা।
যে উগ্রবাদকে একসময় কঠোর হস্তে দমন করে দেশকে শান্তির নীড়ে পরিণত করা হয়েছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে সেই উগ্রবাদ যেন আর কোনোদিন এই সোনার বাংলায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। দল-মত নির্বিশেষে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে এখনই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী দিনগুলোতে যে অন্ধকার অপেক্ষা করছে, তার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ ইতিহাস কাউকে দেবে না।















