১৯৭২-৭৫: জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও শেখ মুজিবের শাসনামল
পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রের সাথে আমরা পেয়েছিলাম এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ ও চরম বিশৃঙ্খলায় ভরা একটা দেশ। বাংলাদেশের চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছিল একটি বিশেষায়িত বাহিনী জাতীয় রক্ষীবাহিনী (Jatiyo Rakkhi Bahini - JRB)। রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত প্যারামিলিটারি ফোর্স। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে রক্ষীবাহিনীর আদলে বিশেষায়িত প্যারামিলিটারি ফোর্স রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃত এবং প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া অধ্যায়গুলোর একটি এই রক্ষীবাহিনী।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক চরম ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং ১ কোটি শরণার্থীর দেশে ফেরার চ্যালেঞ্জ নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন, তখন চারপাশ থেকে শুরু হয়েছিল বহুমাত্রিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রের সাথে আমরা পেয়েছিলাম এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ ও চরম বিশৃঙ্খলায় ভরা একটা দেশ।
একটি সদ্য স্বাধীন দেশে যখন স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলার চাকা সচল করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন দেশবিরোধী, চোরাকারবারি, অস্ত্রধারী চরমপন্থী এবং পরাজিত শক্তির দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করতে একযোগে মাঠে নেমেছিল। বাংলাদেশের চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছিল একটি বিশেষায়িত বাহিনী জাতীয় রক্ষীবাহিনী (Jatiyo Rakkhi Bahini - JRB)।
রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত প্যারামিলিটারি ফোর্স। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে রক্ষীবাহিনীর আদলে বিশেষায়িত প্যারামিলিটারি ফোর্স রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃত এবং প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া অধ্যায়গুলোর একটি এই রক্ষীবাহিনী। মাত্র ১২ হাজার সদস্যের একটি বাহিনীকে কীভাবে একটি দল বা ব্যক্তির নিজস্ব বাহিনী বলা সম্ভব?
জাসদের গণকন্ঠ ও স্বাধীনতার চিরশত্রু জামায়াতের অনুসারীরা গুজব ছড়িয়ে দেয় “বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন”। এমন একটা নিকৃষ্ট মিথ্যাচার তথ্য ছড়িয়ে তৎকালীন সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়। পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলাম গত কয়েক দশক ধরে রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে একটা মিথ ও ভয়ের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, যা বাস্তব ইতিহাসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। রক্ষীবাহিনী নিয়ে বিরোধীদের মুখে আমরা যা শুনি, তার প্রায় পুরোটাই একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার। আজ রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, ঐতিহাসিক সত্য এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের আলোতে এই জাতীয় রক্ষীবাহিনীর গঠন, অবদান, সত্য এবং প্রোপাগান্ডার এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবচ্ছেদ তুলে ধরা হলো।
কেন প্রয়োজন ছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনীর?
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে ১৯৭২ সালের যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। এটি কোনো হুট করে নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তৎকালীন সময়ের এক চরম প্রশাসনিক সংকটের ফসল ছিল।
নামকরনের স্বকীয়তা: জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রথম ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র আইন প্রয়োগকারী বা নিরাপত্তা বাহিনী, যার নামকরণ করা হয়েছিল সম্পূর্ণ খাঁটি বাংলা ভাষায়। পাকিস্তান আমলের ‘পুলিশ’ বা ব্রিটিশ আমলের সামরিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় ও আত্মপরিচয়মূলক নাম দেওয়া হয়েছিল একে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’।
ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং সংকট
১৯৭২ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের নিয়মিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভেতরে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ফাটল দেখা দেয়। তৎকালীন ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, যা পরে বিডিআর এবং বর্তমানে বিজিবি) এবং পুলিশ বাহিনীর ভেতর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত সদস্য এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় যখন ১৯৭২ সালে ইপিআরের ভেতরে ‘মুক্তিযোদ্ধা বনাম অমুক্তিযোদ্ধা’ দ্বন্দ্বে এক ভয়াবহ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। গুজব রটানো হয়েছিল যে, “যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি বা যারা পাকিস্তানে আটকা ছিল, তাদের সবাইকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে”।
এই কৃত্রিম গুজবের ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন ইপিআরের ভেতর এক ভয়াবহ সশস্ত্র বিদ্রোহ ও প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল যে, তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েও উত্তেজিত জোয়ানদের থামাতে ব্যর্থ হন।
এই চরম আইনশৃঙ্খলার সংকটের মুখে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে সশরীরে বিদ্রোহস্থলে ছুটে যান। তাঁর জাদুকরী নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে সেই ভয়াবহ বিদ্রোহ ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু এই ঘটনাটি বঙ্গবন্ধুকে একটি গভীর সত্য অনুধাবন করতে বাধ্য করে নিয়মিত পেশাদার বাহিনীগুলোর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
তাই বর্ডার পাহারা দেওয়ার জন্য ইপিআর এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে আগের দায়িত্বে রেখে, দেশের বিশেষ অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলার জন্য একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড এবং বিশ্বস্ত বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ভাবনারই ফসল ছিল “জাতীয় রক্ষীবাহিনী”।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে তিনি বলেছিলেন, "পাহাড়সম অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান বন্ধ এবং চরমপন্থীদের দমনে এই বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। রক্ষী বাহিনী কোনো দলীয় বাহিনী নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদেই এটি গঠিত হয়েছে।" বিভিন্ন ভাষণ ও সংসদে তিনি রক্ষী বাহিনীকে ‘অপশক্তি দমন ও দেশ পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় একটি অনুগত বাহিনী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
রক্ষীবাহিনী বিষয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বলেন,
“স্বাধীনতার পর দেশের আইন শৃঙ্খলার কিছু অবনতি ঘটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়। কাজেই অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব আর্মিকে দেওয়া হতো। ওই সময় আমি এই দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম। সেটাকে লক্ষ্য রেখে পুলিশকে শক্তিশালী করার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়।”

‘মুজিব বাহিনী’র একচেটিয়া মিথ খণ্ডন
“জাতীয় রক্ষীবাহিনী” সম্পর্কে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অপপ্রচারটি হলো এটি নাকি ছিল কেবলই ‘মুজিব বাহিনী’ (BLF) এর সদস্যদের নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধুর একটি ব্যক্তিগত পেটুয়া বাহিনী। এই তথ্যটি ডাহা মিথ্যা এবং ঐতিহাসিক প্রোপাগান্ডা।
প্রকৃত সত্য হলো, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রথম কয়েক ব্যাচের প্রতিটি সদস্য ছিলেন শতভাগ সার্টিফাইড বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উইংয়ের অংশ ছিলেন না।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হাজার হাজার বেসামরিক গেরিলা বা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের মেধা ও শক্তিকে রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই তরুণ ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুশৃঙ্খল সরকারি বাহিনীর আওতায় আনা হবে। এর ফলে রক্ষীবাহিনী গঠনের মাধ্যমে বহুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে এই বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রক্ষীবাহিনী গঠন করে তাদের এই বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়।
কাদেরিয়া বাহিনীর আধিক্য: রক্ষীবাহিনীতে সবচেয়ে বেশি জনবল অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইলের বীর বিক্রম কাদের সিদ্দিকীর ‘কাদেরিয়া বাহিনী’র দুর্ধর্ষ যোদ্ধাদের দিয়ে। মূলত যারা সরাসরি রণাঙ্গনে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্যে অবিচল ছিলেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
কাদেরিয়া বাহিনী ছাড়াও রক্ষীবাহিনীতে বিপুল সংখ্যক সদস্য ছিলেন তৎকালীন ‘গণবাহিনী’ এবং ‘মুজিব বাহিনী’ থেকে।
বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা: এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারা, যারা কোনো নির্দিষ্ট দলের অধীনে না খেলে সরাসরি মাতৃভূমির টানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তারাও এই বাহিনীতে যোগ দেন।
সুতরাং, একে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বাহিনী বলা ইতিহাসকে অস্বীকার করার শামিল। এটি ছিল সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সমন্বিত জাতীয় রূপ।

রক্ষীবাহিনীর সদস্য: অ-পেশাদারিত্ব বনাম খাঁটি দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা
রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, তারা কেউ প্রথাগত ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি সামরিক একাডেমির বিলাসবহুল ব্যারাকে বছরের পর বছর কুচকাওয়াজ করা পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। এই বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন ছাত্র বা তরুণ বয়সের। তারা যুদ্ধের আগে কোনোদিন অস্ত্র ছুঁয়েও দেখেননি।
১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি বাহিনী এদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তারা মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং নিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে লড়েছিলেন। প্রথাগত ট্রেনিংপ্রাপ্ত কোনো সৈনিকের যুদ্ধে যাওয়া আর একজন সাধারণ বেসামরিক ছাত্রের খালি পায়ে দেশের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এই বেসামরিক বীরত্বের অনন্য প্রতীক ছিলেন রক্ষীবাহিনীর জোয়ানরা।
যুদ্ধোত্তর সামাজিক বাস্তবতার শিকার
যুদ্ধের পর এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত করুণ। অনেকে যুদ্ধে তাদের পিতা, ভাই বা পুরো পরিবার হারিয়েছিলেন। অনেকের ঘরবাড়ি পাকিস্তানি আর্মি পুড়িয়ে দিয়েছিল, ফলে তাদের থাকার কোনো জায়গা ছিল না।
যুদ্ধের কারণে পড়াশোনা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং পুনরায় শিক্ষাজীবনে ফেরার মতো অর্থনৈতিক বা মানসিক অবস্থা অনেকের ছিল না। সংসারে হাল ধরার মতো কেউ না থাকায় চরম বেকারত্ব ও অনাহারে দিন কাটছিল অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার।
বঙ্গবন্ধু এই বীর সন্তানদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসন এবং একই সাথে তাদের ভেতরের অদম্য দেশপ্রেমকে দেশের কাজে লাগানোর জন্য রক্ষীবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর মতো সুযোগ-সুবিধা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন না। সেনা, পুলিশ বা ইপিআরের মধ্যে যেখানে পদোন্নতি, খাই খাই স্বভাব, পাওয়া না-পাওয়া এবং পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসার বনাম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনা অফিসারদের মধ্যে ক্ষমতার তীব্র কোন্দল ছিল, জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে তেমন কোনো অসন্তোষ বা শৃঙ্খলাভঙ্গ ছিল না। তারা ছিলেন দেশপ্রেমের পাগল এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।
সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাদা ছোড়াছুড়ি, পদোন্নতি পোস্টিং নিয়ে তদবির, দলাদলি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধু অতিষ্ঠ ছিলেন। লে. কর্নেল এম এ হামিদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন,
“কর্নেল সাহেব কী বলব! আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে complain করে। অমুক এই করেছে - সে এই করেছে। আমার পোস্টিং, আমার প্রোমোশন... বলুন তো কী হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়াকামড়ি করলে, ডিসিপ্লিন না রাখলে এই আর্মি দিয়ে আমি কী করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো না দেশ চালাবো? আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবাই খাই খাই শুরু করেছে। কোথা থেকে আমি দেব, তা কেউ ভাবতে চায় না।”
বঙ্গবন্ধুর এই আক্ষেপে বুঝা যায় তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রকৃত অবস্থা। অপরদিকে জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে কোন শৃঙ্খলাভঙ্গ ছিলো না বা পদ নিয়ে দলাদলিও ছিলো না। তারা ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।

যুদ্ধোত্তর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রক্ষীবাহিনী
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের মতো শান্ত ছিল না। সেই ভয়াবহ অস্থির সময়ে রক্ষীবাহিনীকে যে সকল ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়েছিল, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চরমপন্থী দমন: ১৬ই ডিসেম্বরের পর সব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দেননি। এর বাইরে দেশীয় পাকিস্তানি দালাল আল-বদর ও রাজাকারদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র সমাজের অপরাধী চক্রের হাতে চলে যায়। একই সাথে চরমপন্থী সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি এবং মাওবাদী জাসদের সশস্ত্র উইং ‘গণবাহিনী’ দেশজুড়ে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা শুরু করে।
এই চরমপন্থীরা প্রতিনিয়ত সরকারি থানা লুট করত, পুলিশের ফাঁড়ি পুড়িয়ে দিত, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ডাকাতি করত এবং দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিল-কারখানায় অগ্নিসংযোগ করে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর জাসদের গণবাহিনীর উগ্র ও ধ্বংসাত্মক রূপ এদেশের মানুষ স্বচক্ষে দেখেছে। এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ বা নিয়মিত বাহিনী যেখানে ব্যর্থ হচ্ছিল, সেখানে রক্ষীবাহিনী বুক চিতিয়ে লড়াই করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল।
১ কোটি শরণার্থীর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন: মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাঁচাতে যে ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন তারা স্বদেশে ফিরে আসেন, তখন তারা দেখেন তাদের ঘরবাড়ি, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও সুযোগ সন্ধানীরা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। রক্ষীবাহিনীর অন্যতম প্রধান কাজ ছিল এই দখলদারদের শক্ত হাতে উচ্ছেদ করা এবং শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে আসা নিঃস্ব মানুষদের তাদের পৈতৃক সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া।
ফেলে যাওয়া পাকিস্তানি ও বিহারী সম্পত্তি রক্ষা: অনেক ধনী পাকিস্তানি এবং অবাঙালি (বিহারী) যুদ্ধের সময় বা ঠিক পরে তাদের বিশাল সম্পত্তি, বাড়িঘর ও কলকারখানা ফেলে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। সদ্য স্বাধীন দেশের একশ্রেণির চোর ও লুটেরা চক্র এই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিগুলো নিজেদের নামে দখল করার মচ্ছব শুরু করেছিল। রক্ষীবাহিনী কঠোর অভিযান পরিচালনা করে এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দখলমুক্ত করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা: যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়ে যে সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভারতে চলে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকের বাড়িঘর ও জমি এদেশে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে বা অবৈধভাবে দখল হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাস্তবায়নে রক্ষীবাহিনী এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের নিরাপত্তা প্রদান করে এবং তাদের জমিজমা দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করে।
তৎকালীন মন্ত্রী ও সাবেক সেনাপ্রধান এম এ জি ওসমানী রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পুষ্ট তরুণদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনীটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সাধারণ পুলিশ বাহিনীর ওপর চাপ কমাতে এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে।”
তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই বাহিনীকে যুদ্ধপরবর্তী অস্বাভাবিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, "সদ্য স্বাধীন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, কালোবাজারি ও চোরাচালান বন্ধে রক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক উপস্থিতি ও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজনীয় ছিল।"
রক্ষীবাহিনীর সাথে গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সংঘর্ষ
তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন করে তীব্র সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয়। জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি দমনে রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কঠোর। গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ, নাশকতা ও ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তারা আওয়ামী লীগ সদস্য এবং থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশকে আহত করতো ও পুলিশের অস্ত্র লুটপাট করে নিতো। গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি সারা দেশে লিফলেট বিলিয়ে বোমা বিস্ফোরণ করতো ও আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে টহল দিতো। আইনশৃঙ্খলা জবাবে রক্ষীবাহিনীও কঠোর ধরপাকড় ও দমননীতি গ্রহণ করে।
১৯৭৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয় “জাসদ ও সর্বহারা পার্টি ৭৩ জন পুলিশ ও বিডিআর সদস্য হত্যা করেছে। ২টি থানা ও ১৭টি পুলিশ ফাঁটি লুট করেছে।” চরমপন্থীদের সহিংসতায় অতিষ্ঠ হয়ে একই দিনে দেড়শ’ থানায় রক্ষীবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে ‘কালো দিবস’ আখ্যায়িত করে জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা করে ও বোমা বিস্ফোরণ করে। এসব চরমপন্থী গোষ্ঠী বিজয় দিবস বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং লিফলেট বিলি করে তারা ঘোষণা করে জাতীয় প্রেসক্লাব, পত্রিকা অফিস, কমলাপুর রেলস্টেশন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ বোমা মেড়ে উড়িয়ে দেয়ার। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি ঢাকায় দুটি স্থানে কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ করেছিল।
১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে আবারও তারা নাশকতা শুরু করে। ১৭ মার্চ জাসদের একটি মিছিল থেকে গণবাহিনীর কর্মীরা কয়েকটি ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণ করে এবং কয়েকটি স্থানে ভাংচুর চালায়। মিছিলটি ঢাকা রমনা ও পল্টন এলাকায় আসলে জাসদের কর্মীরা রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। এ সময় রক্ষীবাহিনীর গুলিতে কিছু জাসদ কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর জাসদ নেতা মেজর আবদুল জলিল রক্ষীবাহিনীকে "সরকারের ব্যক্তিগত বা দলীয় পেটোয়া বাহিনী" হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
জাসদের গণবাহিনী যত্রতত্র রক্ষীবাহিনীর সাথে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তো এবং বোমা বিস্ফোরণ সহ দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করতো। জবাব রক্ষীবাহিনীও তাদের প্রতি গুলিবর্ষণ করতো ও গণগ্রেফতার করতো। এভাবে অসংখ্য জাসদের রাজনৈতিক কর্মীর হতাহতের অভিযোগ উঠে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে।
তৎকালীন সময়ে জাসদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ ও মওলানা ভাসানীর পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক হক-কথা’ পত্রিকা বঙ্গবন্ধু সরকার ও রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে নানা মিথ্যাচার ও গুজব সংবাদ ছাপাতো। তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেয় "রক্ষীবাহিনী কাউকে তুলে নিলে তার হদিস পাওয়া যায় না"। এতে জনসাধারণে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যা রাষ্ট্রের একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কখনোই ইতিবাচক ছিল না।
রক্ষীবাহিনী বনাম সেনাবাহিনী গুজব
তৎকালীন জাসদের গণবাহিনীর শীর্ষ নেতারা ও ডাকু সিরাজের অনুসারীরা ভাষণ ও লিফলেট বিতরণ করে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে উসকানি দিত। রক্ষীবাহিনীর বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি এমন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সেনাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করা হতো, যা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একটি ব্যাপক অপপ্রচার ছিল যে, সরকার সেনাবাহিনীকে অবহেলা করে রক্ষীবাহিনীকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে এবং এটি সম্ভবত সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য কী বলে?
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সার্বিক অর্থ ও সরঞ্জামের সংকট ছিল। সেনাবাহিনীর জন্য বুট, ইউনিফর্ম ও আধুনিক আবাসন সরবরাহে বাজেট ঘাটতিকে সরকারের অবহেলা হিসেবে প্রচার করে নিম্নপদস্থ জওয়ানদের উসকে দেওয়া হয়েছিল। সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করতে চক্রান্তকারীরা অপপ্রচার ছড়িয়েছিল যে “রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি বাজেট পায়”।
প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ হ্রাসের জন্য সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছিল যে, রক্ষীবাহিনীর পেছনে সব টাকা ঢালা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তুলনায় রক্ষীবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র ও যানবাহনে সজ্জিত করা হচ্ছিল বলে একটি ধারণা সামরিক মহলে কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক নথি বলছে ভিন্ন কথা।
১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে রক্ষীবাহিনীর বাজেট ছিল মাত্র ৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সেনাবাহিনীর বাজেট শুরুতে ৯২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে তা ১২২ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে এই অর্থবছরে জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যেখানে রক্ষীবাহিনীর বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। রক্ষীবাহিনীর মোট বরাদ্দ ছিল সেনাবাহিনীর মূল বাজেটের ১০ থেকে ১২ শতাংশের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র।
রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত হালকা পদাতিক বাহিনী। তাদের হাতে মূলত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, হালকা সাব-মেশিনগান (SMG) এবং টহল যানবাহন ছিল। তাদের কোনো ভারী আর্টিলারি, সাঁজোয়া যান বা ট্যাংক ছিল না। সেনাবাহিনী ছিল দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ পেশাদার প্রতিরক্ষা শক্তি। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল ভারী কামান, সাঁজোয়া বহর এবং মিশর থেকে উপহার পাওয়া টি-৫৪/৫৫ ট্যাংক।
রক্ষীবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৬,০০০। অপরদিকে বাংলাদেশের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ এরও বেশি। সামরিক বাজেট, রেশন ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকেও নিয়মিত সেনাবাহিনী রক্ষীবাহিনীর চেয়ে বহু গুণে এগিয়ে ছিল।
তৎকালীন সময়ে জাসদ ও স্বাধীনতার চিরশত্রুরা গুজব রটিয়ে দেয় রক্ষীবাহিনী দিয়ে শেখ মুজিব সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করছে। অথচ একটি প্যারামিলিটারি ফোর্স দিয়ে পুরো সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপনের দাবি ভিত্তিহীন ও অবাস্তব। তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ বলেন, “রক্ষীবাহিনীর সদস্য-সংখ্যা ১২০০০ হলেও সর্বত্র প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল তাদের সংখ্যা লক্ষাধিক।”
"পেশাদার সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রধান সামরিক বাহিনী বানানো হবে" এমন কৃত্রিম গুজব সেনানিবাসগুলোতে নিয়মিত ছড়ানো হতো। পেশাদার সেনাবাহিনীর সমান্তরালে একটি রাজনৈতিক অনুগত বাহিনীকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে কৌশলে গুজব রটিয়ে দেয়া হচ্ছিলো, যা সামরিক শৃঙ্খলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে সেনাসদস্যদের এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ একটি পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করেছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
বিভিন্ন দেশে রয়েছে ‘রক্ষীবাহিনী’
ইরানের আইআরজিসি সম্পর্কে আমরা সবাই জানি, এটি ইরানের রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনীর নিজস্ব পদাতিক, নৌ ও বিমান শাখার পাশাপাশি ‘কুদস ফোর্স’ নামে একটি বিশেষ শাখা রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় ‘ন্যাশনাল গার্ড’। এটি রক্ষীবাহিনীর মতোই একটি প্যারামিলিটারি বাহিনী। বেসামরিক পেশায় নিযুক্ত নাগরিকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এই রিজার্ভ বা আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য হতে পারে।
মিশরে রক্ষীবাহিনীর আদলে রয়েছে সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্সেস (CSF)। এই বিশালাকার আধাসামরিক বাহিনী প্রধানত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিরোধে নিরাপত্তায় নিয়োজিত।
কানাডায় একই রক্ষীবাহিনীর নাম হচ্ছে “সিটিজেন সোলজার”। এটি মূলত সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত ‘আর্মি রিজার্ভ’ বাহিনী।
ডেনমার্ক এবং ফিনল্যান্ডে স্থানীয় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে রক্ষীবাহিনীর আদলে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী আছে।
চীনের 'পিপলস আর্মড পুলিশ' একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত বিশাল আধাসামরিক বাহিনী, এটাও বঙ্গবন্ধুর রক্ষীবাহিনীর আদলে গড়া। এই বাহিনীর প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দাঙ্গা ও গণ-উত্তেজনা দমন, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান পরিচালনা।
রাশিয়ায় ‘ন্যাশনাল গার্ড অব দ্য রাশিয়ান ফেডারেশন’ বা ‘রসবার্ডিয়া’ রয়েছে, এটাও রক্ষীবাহিনীর মতো প্যারামিলিটারি বাহিনী। এটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে জবাবদিহি করে। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা এই বাহিনীর মূল দায়িত্ব।
সৌদি আরবে রক্ষীবাহিনীর আদলে রয়েছে সৌদি অ্যারাবিয়ান ন্যাশনাল গার্ড (SANG)। এটি সরাসরি সৌদি রাজপরিবারের বিশেষ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
ভারতে রক্ষীবাহিনীর আদলে রয়েছে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (CRPF) বাহিনী। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, নকশালবিরোধী অভিযান ও সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে নিয়মিত সেনাবাহিনীর বাইরে এটি রাষ্ট্রীয় বিশেষ বাহিনী হিসেবে নিয়োজিত থাকে।
‘এলিট ফোর্স’ প্যারাডাই: আধুনিক র্যাব বনাম রক্ষীবাহিনী
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কাজের ধরন, তাদের কঠোরতা এবং অভিযানের প্রকৃতিকে যদি আমরা আধুনিক আইন প্রয়োগকারী কাঠামোর সাথে তুলনা করি, তবে দেখতে পাব রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত বর্তমান র্যাব এর মতো একটি এলিট ফোর্স।
২০০৪ সালে গঠিত হয় র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। নব্বইয়ের দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে সারা দেশে অপরাধের চরম বৃদ্ধি, সংগঠিত অপরাধী চক্রের বিস্তার এবং জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর উত্থান রোধে র্যাবের জন্ম হয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল: জাতীয় রক্ষীবাহিনীর মূল ভিত্তি ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা, বিশেষ করে যুব ও ছাত্রনেতাকর্মীরা। এটি সরাসরি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচালিত হতো।
এর বিপরীতে, র্যাব কোনো নতুন অনিয়মিত দল বা আলাদাভাবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যাডার বাহিনী নয়। এটি সামরিক ও বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষায়িত সংস্থা। র্যাবের অর্ধেকের বেশি সদস্য আসেন বাংলাদেশ পুলিশ থেকে এবং বাকি অংশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি এবং আনসার থেকে প্রেষণে নিয়োগ পান।
অভিযানের ধরন ও কাজের ক্ষেত্র: রক্ষীবাহিনীর অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সরকারের সশস্ত্র বিরোধীদের মোকাবিলা করা। তৎকালীন জাসদের গণবাহিনী, ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি এবং অসাধু কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে বাহিনীটি ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক ও সাময়িক অভিযান পরিচালনা করে।
অন্যদিকে, র্যাবের অভিযানের ক্ষেত্র আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং অপরাধ দমনে বিস্তৃত। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর শাইখ আব্দুর রহমান এবং বাংলা ভাইয়ের মতো শীর্ষ চরমপন্থীদের গ্রেপ্তার, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) দমন, সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ করানো এবং সীমান্ত এলাকার বিপুল পরিমাণ মাদক ও অবৈধ অস্ত্র জব্দে র্যাব মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
একটি এলিট ফোর্স যখন কাউন্টার-টেররিজম বা সশস্ত্র চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে, তখন তাকে অস্ত্র প্রয়োগ করতে হয়। সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর ও নির্মম হতে হয় এটি বাহিনীর পেশাদারিত্বের অংশ, কোনো অপরাধ নয়।
আজ র্যাব যেভাবে জঙ্গিবাদ, চরমপন্থী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালায়, ঠিক একই রকম ভূমিকা তৎকালীন সময়ে রক্ষীবাহিনী পালন করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাসদ ও তৎকালীন ডানপন্থী-বামপন্থী চরমপন্থীরা রক্ষীবাহিনীর এই পেশাদার কঠোরতাকে ‘অমানবিক নির্যাতন’ হিসেবে প্রোপাগান্ডা আকারে ছড়াতে থাকে, যাতে সাধারণ মানুষের চোখে বঙ্গবন্ধুকে স্বৈরাচার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
জিয়াউর রহমানের আত্মীকরণ: প্রোপাগান্ডার কফিনে চূড়ান্ত পেরেক
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের ছড়ানো সমস্ত প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারের দেয়াল এক নিমেষে ধসে পড়ে একটিমাত্র ঐতিহাসিক সত্যের সামনে। আর সেই সত্যটি হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান যখন দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং সেনাপ্রধান হন, তখন তিনি নিজে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে, কোনো প্রকার প্রশ্ন বা স্ক্রিনিং ছাড়াই পুরো রক্ষীবাহিনীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ (Assimilation) করেন।
আজ যারা বিএনপির রাজনীতি করেন বা যারা বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে রক্ষীবাহিনীকে গালি দেন, তাদের কাছে আমার একটি সোজা রাজনৈতিক প্রশ্ন:
"রক্ষীবাহিনী যদি সত্যিই উশৃঙ্খল, অমানবিক, অপেশাদার এবং ভারতপন্থী বা ভারতের দালাল বাহিনী হতো তবে চরম ভারত-বিরোধী ন্যারেটিভ নিয়ে ক্ষমতায় আসা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান কেন এই পুরো বাহিনীকে বিলুপ্ত না করে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি পবিত্র ও সংবেদনশীল সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন?"
জিয়াউর রহমান একজন পেশাদার সৈনিক ছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, রক্ষীবাহিনীর জোয়ানরা সম্পূর্ণ লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা, চরম সুশৃঙ্খল, দেশপ্রেমিক এবং অত্যন্ত কঠোর ট্রেনিংপ্রাপ্ত। এই বাহিনীর ডেডিকেশন এবং সামরিক কার্যকারিতা দেখেই জিয়াউর রহমান তাদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে সেনাবাহিনীর জনবল ও শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন।
রক্ষীবাহিনীর সেই সুপ্রশিক্ষিত জোয়ানরাই পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফ্রন্টে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন। এই একটিমাত্র ঐতিহাসিক সত্যই প্রমাণ করে যে, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপবাদগুলো ছিল স্রেফ রাজনৈতিক আবর্জনা।
জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB) সংক্রান্ত মিথ বনাম ঐতিহাসিক সত্য
জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে বিরোধীদের ছড়ানো প্রোপাগান্ডা এবং নথিপত্র সমর্থিত প্রকৃত সত্যকে সহজভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি বিস্তারিত তথ্যছক দেওয়া হলো:
পর্যালোচনার বিষয় | বিরোধী রাজনৈতিক ব্লকের অপপ্রচার (Myths) | ঐতিহাসিক ও নথিপত্র সমর্থিত সত্য (Facts) | প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব |
১. বাহিনীর গঠন ও সদস্য | এটি কেবল ‘মুজিব বাহিনী’র সদস্যদের নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী ছিল। | প্রথম কয়েক ব্যাচের প্রতিটি সদস্য ছিলেন সার্টিফাইড বীর মুক্তিযোদ্ধা; যেখানে সবচেয়ে বেশি ছিল কাদেরিয়া বাহিনী ও সাধারণ বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের অংশ। | এটি কোনো দলীয় বাহিনী ছিল না, বরং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল। |
২. বাহিনীর জাতীয়তা ও এজেন্ডা | এটি একটি ‘ভারতপন্থী’ বাহিনী ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রাখা। | এটি ছিল একমাত্র বাহিনী যার নামকরণ সম্পূর্ণ বাংলায় করা হয় (জাতীয় রক্ষী বাহিনী)। এর মূল কাজ ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। | ভারত-বিরোধী সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এই বাহিনীকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সেনাবাহিনীতে যুক্ত করেন, যা তাদের দেশপ্রেমের চূড়ান্ত প্রমাণ। |
৩. অভিযানের ধরন ও কঠোরতা | রক্ষীবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার ও রাজনৈতিক নিপীড়ন চালাত। | তারা ছিল বর্তমান র্যাবের মতো একটি ‘এলিট ফোর্স’। তাদের মূল লড়াই ছিল থানা লুটকারী চরমপন্থী, সর্বহারা, নকশাল এবং জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনীর বিরুদ্ধে। | চোরাকারবারি দমন, ব্যাংক ডাকাতি রোধ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়ানো দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে তারা অবদান রাখে। |
৪. সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ভূমিকা | রক্ষীবাহিনী মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি দখল করেছিল। | ভারত থেকে ফিরে আসা ১ কোটি শরণার্থীর জমি পুনরুদ্ধার, সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্পত্তি দখলমুক্ত করা এবং বিহারীদের ফেলে যাওয়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা ছিল তাদের কাজ। | যুদ্ধোত্তর সমাজে যে ভয়াবহ মব-জাস্টিস ও সম্পত্তি দখলের মচ্ছব শুরু হয়েছিল, তা রক্ষীবাহিনী শক্ত হাতে প্রতিহত করে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। |
৫. বাহিনীর শৃঙ্খলা ও ট্রেনিং | রক্ষীবাহিনী ছিল একটি অগোছালো, অপেশাদার ও উশৃঙ্খল মিলিশিয়া গ্রুপ। | অত্যন্ত সুশৃঙ্খল বাহিনী ছিল, যেখানে নিয়মিত আর্মি বা পুলিশের মতো কোনো অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা অসন্তোষ ছিল না। পরবর্তীতে এর ট্রেইনিং অত্যন্ত উচ্চমানের হয়। | তাদের উচ্চমানের সামরিক প্রশিক্ষণ ও পেশাদার ডিসিপ্লিন দেখেই জিয়াউর রহমান তাদের ডিফেন্স ফোর্সের মেইনস্ট্রিমে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন। |
৬. পরবর্তী ঐতিহাসিক পরিণতি | ১৯৭৫ সালের পর এই বাহিনীকে অপরাধী হিসেবে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। | ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের (Jatiyo Rakkhi Bahini Absorption Ordinance, 1975) মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হয়। | রক্ষীবাহিনীর জোয়ানরা পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং জাতিসংঘ শান্তি মিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। |
রক্ষীবাহিনীর পরিচয়
রক্ষীবাহিনী একটি নিয়মিত সরকারি বাহিনী ছিল। এর শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে আসা, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার এ. এন. এম. নুরুজ্জামান। সেনাবাহিনীর জেষ্ঠ্য কর্মকর্তাদের পাশাপাশি একাধিক জুনিয়ার কমিশনড অফিসারও (JCO) এই বাহিনীতে প্রেষণে পদায়িত ছিলেন। এই বাহিনীর নিজে থেকে কোনো অপারেশন করার ক্ষমতা ছিল না। পুলিশ বা সিভিল প্রশাসন সাহায্য চাইলেই কেবল তারা এগিয়ে আসত। তারা ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো অপারেশন করতে পারত না।
বর্তমানের র্যাবের সাথে তুলনা করলে, আইনি কাঠামোর দিক থেকে র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি স্বাধীন। তৎকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে রক্ষীবাহিনীর প্রধান দুর্বলতা ছিল তাদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ। যেখানে আজকের একজন পুলিশ কনস্টেবল ৬ মাসের প্রশিক্ষণ পান, সেখানে সেই সংকটের সময়ে রক্ষীবাহিনীর অফিসারদের ২ মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়াও সম্ভব হয়নি। সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ শেষে এই বাহিনীর প্রথম কাজ ছিল ঢাকার রাস্তায় ছিনতাই ঠেকাতে গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করা এবং ট্রেনে বিনা টিকিটে ভ্রমণ বন্ধে টিকিট চেক করা। কারণ, তৎকালীন পরিস্থিতিতে সশস্ত্র কিছু যুবক ব্যাপক গাড়ি ছিনতাই শুরু করেছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকিট না কাটার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
স্বাধীনতার পরপরই দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেয়। টঙ্গি, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত শ্রমিক সংঘর্ষ হতো এবং পাটের গুদামে আগুন দেওয়া হতো। সন্ত্রাসীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালেই ৫৪টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কেবল ১৯৭৩ সালেই সারা দেশে ১,৮৯৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
জাসদের গণবাহিনী এবং সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি দেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু করে। এই সময়ে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়:
এমপি আবদুল গফুর: ৬ জুন ১৯৭২ (সহযোগীসহ নিহত)
এমপি সওগাতুল আলম: ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩
এমপি নুরুল হক: ৩ মে ১৯৭৩
এমপি মোতাহার উদ্দিন আহমদ: ১০ জানুয়ারি ১৯৭৪
এমপি গাজী ফজলুর রহমান: ১৬ মার্চ ১৯৭৪
এমপি অ্যাডভোকেট ইমান আলী: ১ আগস্ট ১৯৭৪
এমপি গোলাম কিবরিয়া: ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৪ (কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ঈদের নামাজ পড়া অবস্থায়)
এমপি আবদুল খালেক: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ (নেত্রকোণা)
এ ছাড়া ১৯৭২ সালে ২৯ জন, ১৯৭৩ সালে ৭৭ জন, ১৯৭৪ সালে ৫২ জন এবং ১৯৭৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৪ জন জনপ্রতিনিধি, ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে হত্যা করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৯৭৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দেশের ১৫০টি থানায় রক্ষীবাহিনী মোতায়েন করা হয়। একই বছরের ৩ অক্টোবর পাবনার শাহজাদপুরে দুর্বৃত্তদের সাথে রক্ষীবাহিনীর এক তীব্র বন্দুকযুদ্ধ হয়, যাতে ৮ জন সন্ত্রাসী (তথাকথিত বিপ্লবী) নিহত হয়। এরপর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে এবং ১৯৭৫ সালের প্রথমার্থের মধ্যেই দেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
একই সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও বড় ধরনের দেশপ্রেমিক অভিযান চালায়।
মিরপুর মুক্তকরণ: ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি দুই দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মিরপুরকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ৪১ জন বীর সদস্য শহীদ হন।
সাতকানিয়া অভিযান: ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাতকানিয়া এলাকা রাজাকার ও আলবদরদের দখলে ছিল। ১৯৭৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে ৬০ জন রাজাকার-আলবদরকে নির্মূল করে এলাকাটি মুক্ত করে।
জাতীয় রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত একটি খাঁটি দেশপ্রেমিক বাহিনী। তারা সবাই ছিলেন জাতীয়তাবাদী চেতনার অধিকারী। এই বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল তৎকালীন উগ্র বামপন্থীরা, যারা সশস্ত্র নৈরাজ্য সৃষ্টি করছিল।
পরবর্তীতে এই উগ্রপন্থীরাই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয় এবং ক্ষমতায় গিয়ে মনগড়া বয়ান তৈরি করে রক্ষীবাহিনীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ, আলমগীর কবির কিংবা তরিকুল ইসলামের মতো ব্যক্তিদের নাম বলা যায়, যারা একসময় সশস্ত্র নৈরাজ্যের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে বিএনপির মন্ত্রী হন।
রক্ষীবাহিনীকে বুঝতে হলে এর ভেতরের প্রশাসনিক জটিলতা, সুনির্দিষ্ট কিছু অপারেশন এবং ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫-এর কালরাতে তাদের ভূমিকার পেছনের বাস্তব সত্য জানা আবশ্যক।
‘JRB অর্ডার ১৯৭২’ এবং বিতর্কের সূত্রপাত
রক্ষীবাহিনীকে যে আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭২ সালের ৭ই মার্চ একটি রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ, ১৯৭২’ (President's Order No. 21 of 1972) জারি করা হয়।
বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা: এই আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারাটি ছিল রক্ষীবাহিনীর যেকোনো সদস্য সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের পরোয়ানা (Warrant) ছাড়াই যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং তল্লাশি করতে পারতেন।
আইনি সুরক্ষার যৌক্তিকতা: যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন হাজার হাজার অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে, প্রতিদিন পুলিশ ফাঁড়ি লুট হচ্ছে, তখন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়া মেনে সন্ত্রাস দমন করা অসম্ভব ছিল। বর্তমান সময়ের Anti-Terrorism Act বা বিশেষ এলিট ফোর্সের ক্ষমতার মতোই এই ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলো (বিশেষ করে জাসদ ও ডানপন্থীরা) এটিকে ‘নাগরিক অধিকার হরণ’-এর তকমা দিয়ে প্রচার করতে থাকে।
রণাঙ্গনের বীরদের হাতে রক্ষীবাহিনীর কমান্ড
অনেকে মনে করেন রক্ষীবাহিনী কোনো পেশাদার নেতৃত্ব ছাড়া চলত। এটি সম্পূর্ণ ভুল। এই বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক মস্তিস্কেরা।
মহাপরিচালক (Director General): রক্ষীবাহিনীর প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এ. এন. এম. নুরুজ্জামান (বীর উত্তম)। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের সফল কমান্ডার। তাঁর মতো একজন সুশৃঙ্খল এবং বীর সামরিক কর্মকর্তার অধীনে এই বাহিনী পরিচালিত হতো।
অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা: উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আনোয়ার উল আলম শহীদ (যিনি টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন) এবং সরোয়ার মোল্লা।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (Savar Camp): ঢাকার সাভারে (বর্তমান যেখানে সাভার সেনানিবাস ও পিএটিসি অবস্থিত) রক্ষীবাহিনীর মূল প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলা হয়। সেখানে কঠোর সামরিক ডিসিপ্লিন এবং শারীরিক কসরতের মাধ্যমে তাদের গড়ে তোলা হয়েছিল।
‘মেজর জেনারেল উবান’ বিতর্ক ও ভারতীয় ইনভলভমেন্ট
স্বাধীনতার চিরশত্রুদের প্রোপাগান্ডার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো রক্ষীবাহিনী নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ছায়া রূপ ছিল এবং ভারতীয় অফিসাররা এটি চালাত। এই মিথটির উৎপত্তি কীভাবে হলো?
জেনারেল সুজন সিং উবান ফ্যাক্টর: ১৯৭১ সালে ভারতের স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স (SFF) এবং মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, রক্ষীবাহিনী গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে অর্গানাইজেশনাল সেট-আপ কেমন হবে, সে বিষয়ে টেকনিক্যাল পরামর্শ দেওয়ার জন্য জেনারেল উবানকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বাস্তব সত্য: জেনারেল উবান কেবল একটি অ্যাডভাইজরি বা পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা একটি নবজাত রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গঠনের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। রক্ষীবাহিনীর কোনো অপারেশনাল কমান্ড, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণে কোনো একক ভারতীয় কর্মকর্তা ছিলেন না। এর রিক্রুটমেন্ট থেকে শুরু করে কমান্ড পর্যন্ত সবকিছু ছিল শতভাগ বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে।
যে অপারেশনগুলো প্রোপাগান্ডার জন্ম দিয়েছিল
রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের একটি অংশের ক্ষোভ তৈরির পেছনে ছিল দেশের কিছু কুখ্যাত চোরাকারবারি, কালোবাজারি এবং উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দলের সুপরিকল্পিত মিডিয়া ক্যাম্পেইন। রক্ষীবাহিনী মূলত তিনটি প্রধান ফ্রন্টে আঘাত হেনেছিল, যার কারণে তারা শক্তিশালী শত্রু তৈরি করে:
১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ এবং মজুতদারদের সিন্ডিকেট: ১৯৭৪ সালে যখন দেশে এক ভয়াবহ বন্যা ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও জোতদাররা চাল, ডাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুদামে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছিল। বঙ্গবন্ধু রক্ষীবাহিনীকে নির্দেশ দেন এই কালোবাজারিদের গুদাম সিলগালা করার জন্য। রক্ষীবাহিনী যখন এই সিন্ডিকেটের ওপর নির্মম আঘাত হানে, তখন সেই কোটিপতি মজুতদাররা তাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অত্যাচারী’ ন্যারেটিভ ছড়াতে শুরু করে।
সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টি দমন: শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও বরিশালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সিরাজ সিকদারের ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’ পাকিস্তান আমলের মতোই স্বাধীন বাংলাদেশেও সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছিল। তারা একের পর এক সরকারি খাদ্যগুদাম লুট করছিল এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হত্যা করছিল। রক্ষীবাহিনী অত্যন্ত কঠোর কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সি (Counter-insurgency) অপারেশন চালিয়ে সর্বহারা পার্টির এই সশস্ত্র নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়।
জাসদের গণবাহিনীর ‘থানা লুট’ প্রতিরোধ: তৎকালীন সময়ে জাসদের সশস্ত্র উইং ‘গণবাহিনী’র মূল টার্গেট ছিল দেশের মফস্বল অঞ্চলের দুর্বল থানাগুলো। তারা আচমকা থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশদের হত্যা করে সমস্ত অস্ত্র লুট করে নিয়ে যেত। রক্ষীবাহিনী দেশের প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ থানায় বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করে গণবাহিনীর এই ডেসপ্যারেট মুভমেন্ট রুখে দেয়।
১৫ই আগস্ট ১৯৭৫: রক্ষীবাহিনী কেন নিষ্ক্রিয় ছিল?
রক্ষীবাহিনীর সমালোচকরা প্রায়ই একটি অত্যন্ত কুটিল প্রশ্ন তোলেন: “বঙ্গবন্ধুর এত অনুগত এবং শক্তিশালী বাহিনী হওয়া সত্ত্বেও ১৫ই আগস্ট সকালে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো, তখন রক্ষীবাহিনী কেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে খুনি মেজরদের প্রতিরোধ করল না?”
এই ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে কোনো অপেশাদারিত্ব ছিল না, বরং ছিল চরম প্রশাসনিক শূন্যতা এবং চেইন অব কমান্ডের ব্রেকডাউন। ১৫ই আগস্টের সেই কালো রাতে রক্ষীবাহিনীর মূল চালিকাশক্তি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান বাংলাদেশে ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা আকস্মিক এই ধাক্কা সামলাতে পারেননি।
ভারী অস্ত্রের অভাব: রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত হালকা অস্ত্রে সজ্জিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী। তাদের কোনো ট্যাংক, দূরপাল্লার আর্টিলারি বা সাঁজোয়া যান ছিল না। অন্যদিকে, খুনি মেজররা ল্যান্সার এবং আরমার্ড কোরের ভারী ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ভারী অস্ত্রের সাপোর্ট ছাড়া সাভার থেকে রক্ষীবাহিনীর পদাতিক জওয়ানদের ঢাকায় এসে যুদ্ধ করা সামরিক দিক থেকে আত্মঘাতী ছিল।
সেনাবাহিনীর প্রধানের নির্দেশ না পাওয়া: রক্ষীবাহিনীর তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বড় সামরিক মুভমেন্টের জন্য সেনাবাহিনীর সদর দফতর বা রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্দেশ প্রয়োজন হতো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ নিজেই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন এবং রেডিওতে যখন খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে পুরো সামরিক বাহিনীকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন রক্ষীবাহিনী আইনি ও কৌশলগতভাবে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
রক্ষীবাহিনীর বিশেষ অপারেশন, নেতৃত্ব ও ঐতিহাসিক টাইমলাইন
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভেতরের সাংগঠনিক রূপ এবং তাদের ঐতিহাসিক যাত্রার মূল মাইলফলকগুলো নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
প্রশাসনিক/অপারেশনাল দিক | বিবরণ ও মূল তথ্য | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব |
মূল অর্ডিন্যান্স (আইন) | প্রেসিডেন্টস অর্ডার নং ২১ (১৯৭২) | বাহিনীকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেফতারের আইনি বৈধতা দেয়। |
সর্বোচ্চ জনবল (Peak Strength) | প্রায় ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ জওয়ান (১৯৭৫ পর্যন্ত) | দেশের প্রতিটি জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ মহকুমায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন ছিল। |
পোশাক ও ইউনিফর্ম | জলপাই সবুজ (Olive Green) রঙের ড্রেস | এই পোশাকটি দেখলেই তৎকালীন চরমপন্থী ও চোরাকারবারিদের বুকে কাঁপন ধরত। |
প্রধান অপারেশনাল জোন | ঢাকা, চট্টগ্রাম, আড়িয়াল খাঁ নদী অববাহিকা, সুন্দরবন সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল। | জলদস্যু, নদীপথের ডাকাত এবং সীমান্ত চোরাচালান রোধে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন। |
বাজেট ও অর্থায়ন | সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দ | সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন, কোনো অনিয়ম বা অসন্তোষ ছিল না। |
বিলুপ্তির আইনি রূপ | দ্য জাতীয় রক্ষী বাহিনী (অ্যাবজরপশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫ | জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পুরো বাহিনীকে রেগুলার আর্মিতে রূপান্তর করেন। |
জিয়াউর রহমানের ‘অ্যাবজরপশন অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫’
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর, ৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন, তখন তিনি একটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি করেন। অধ্যাদেশটির নাম ছিল ‘The Jatiyo Rakkhi Bahini (Absorption) Ordinance, 1975’।
সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশন: এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার প্রশিক্ষিত জওয়ানকে সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন ও ঐতিহ্যবাহী ৯ম পদাতিক ডিভিশন (9th Infantry Division)-এর বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মর্যাদা ও সাকুল্যে সুবিধা: তাদের পূর্ববর্তী চাকরির সময়কালকে গণনা করা হয় এবং নিয়মিত সেনা সদস্যদের মতোই তাদের পদমর্যাদা, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।
ইতিহাস কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। রক্ষীবাহিনী যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের কোনো অগোছালো ‘মিলিশিয়া’ বা ‘উশৃঙ্খল লাঠিয়াল বাহিনী’ হতো, তবে জিয়াউর রহমানের মতো একজন কট্টর পেশাদার সামরিক শাসক এবং তৎকালীন পাকিস্তান-প্রত্যাগত সেনা অফিসাররা কখনই তাদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি এলিট প্রফেশনাল ফোর্সের ভেতরে ঢুকিয়ে নিতেন না।
জিয়াউর রহমান তাদের ভেতরের অদম্য দেশপ্রেম, কঠোর মুক্তিদ্ধার মানসিকতা এবং সাভার একাডেমির উচ্চমানের সামরিক প্রশিক্ষণকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন বলেই তাদের সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং, রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে যত অপপ্রচার তা কেবলই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার রাজনৈতিক অধ্যায়ের সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা মাত্র।
হিংসার রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত
জাতীয় রক্ষীবাহিনী কেন এত অল্প সময়ে অন্য বাহিনীগুলোর হিংসার শিকারে পরিণত হয়েছিল, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
ঈর্ষণীয় সাফল্য ও ঈর্ষার সংস্কৃতি: একটি সদ্য গঠিত বাহিনী, যারা সম্পূর্ণ অ-পেশাদার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেও শুধুমাত্র দেশপ্রেমের জোরে মাত্র কয়েক মাসের কঠিন ট্রেনিং নিয়ে দেশজুড়ে চোরাচালান, থানা লুট এবং চরমপন্থীদের দমন করে ফেলেছিল, তাদের এই অভাবনীয় সাফল্য তৎকালীন অন্যান্য প্রথাগত বাহিনীগুলোর (যারা পাকিস্তান আমলের আমলাতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব বহন করছিল) ভেতরে এক তীব্র হিংসা ও ঈর্ষার জন্ম দেয়। রক্ষীবাহিনী যখন প্রশংসায় ভাসছিল, তখন অন্যান্য বাহিনীর একটি অংশ নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অপপ্রচার শুরু করে।
বঙ্গবন্ধুকে কালিমালিপ্ত করার সহজ টার্গেট: স্বাধীনতাবিরোধী চিরশত্রুরা খুব ভালো করেই জানত যে, বঙ্গবন্ধুকে যদি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে হয়, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাঁর গঠিত সংস্থাকে সাধারণ মানুষের সামনে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। রক্ষীবাহিনীকে যদি ‘অত্যাচারী’ প্রমাণ করা যায়, তবে তার দায় সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ওপর চাপানো সহজ হয়। ঠিক এই স্ট্র্যাটেজি মেনেই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদের মুখপত্র ‘গণকণ্ঠ’ এবং অন্যান্য পাকিস্তানপন্থী পত্রিকাগুলো নিয়মিতভাবে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশ করতে থাকে, যার ধারাবাহিকতা আজ পর্যন্ত বিএনপির একাংশ ও অন্যান্য আওয়ামী-বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ধরে রেখেছে।
প্রোপাগান্ডার অবসান ও বীরদের প্রতি রক্তঋণ
ইতিহাসের একটি অমোঘ নিয়ম হলো সত্যকে সাময়িকভাবে মিথ্যার কুয়াশা দিয়ে ঢেকে রাখা গেলেও, সময়ের পরিক্রমায় তা প্রমাণের আলোতে বেরিয়ে আসবেই। জাতীয় রক্ষীবাহিনী নিয়ে গত ৫ দশক ধরে যে ভয়াবহ প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যার বেড়াজাল তৈরি করা হয়েছে, জিয়াউর রহমান কর্তৃক এই বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণের একটিমাত্র সত্যই সেই পুরো প্রোপাগান্ডার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ছিলেন এদেশের সূর্যসন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য একবার নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, আর স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে নিজেদের যুবতী বয়স ও ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে রক্ষীবাহিনীর পোশাকে দ্বিতীয়বার যুদ্ধে নেমেছিলেন।
আজ এই আধুনিক ও সচেতন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বীর সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার করা। বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিকভাবে খাটো করার নোংরা উদ্দেশ্যে যারা রক্ষীবাহিনীর মতো একটি সম্পূর্ণ দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযোদ্ধানির্ভর বাহিনীকে বিতর্কিত করতে চায়, তাদের সেই মিথ্যাচারকে আমাদের রুখে দিতে হবে। জাতীয় রক্ষীবাহিনী কোনো স্বৈরাচারের পেটুয়া বাহিনী ছিল না; তারা ছিল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অতন্দ্র প্রহরী, একদল দেশপ্রেমের পাগল বীর মুক্তিযোদ্ধার সুশৃঙ্খল জাতীয় প্রাচীর। তাদের এই মহান ত্যাগ ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।















