>

>

১৯৭২-৭৫: জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও শেখ মুজিবের শাসনামল

১৯৭২-৭৫: জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও শেখ মুজিবের শাসনামল

বাংলাদেশের চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছিল একটি বিশেষায়িত বাহিনী জাতীয় রক্ষীবাহিনী (Jatiyo Rakkhi Bahini - JRB)। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃত এবং প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া অধ্যায়গুলোর একটি এই রক্ষীবাহিনী।

TruthBangla

১৯৭২-৭৫: জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও শেখ মুজিবের শাসনামল

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক চরম ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং ১ কোটি শরণার্থীর দেশে ফেরার চ্যালেঞ্জ নিয়ে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন, তখন চারপাশ থেকে শুরু হয়েছিল এক বহুমাত্রিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। একটি সদ্য স্বাধীন দেশে যখন স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলার চাকা সচল করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন সমাজবিরোধী, চোরাকারবারি, অস্ত্রধারী চরমপন্থী এবং পরাজিত শক্তির দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করতে একযোগে মাঠে নেমেছিল।

বাংলাদেশের চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছিল একটি বিশেষায়িত বাহিনী জাতীয় রক্ষীবাহিনী (Jatiyo Rakkhi Bahini - JRB)। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃত এবং প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া অধ্যায়গুলোর একটি এই রক্ষীবাহিনী। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু-বিরোধী ও আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো গত কয়েক দশক ধরে রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে এমন এক মিথ ও ভয়ের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, যা বাস্তব ইতিহাসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। রক্ষীবাহিনী নিয়ে বিরোধীদের মুখে আমরা যা শুনি, তার প্রায় পুরোটাই একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার। আজ রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, ঐতিহাসিক সত্য এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের আলোতে এই জাতীয় রক্ষীবাহিনীর গঠন, অবদান, সত্য এবং প্রোপাগান্ডার এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবচ্ছেদ তুলে ধরা হলো।

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর উৎপত্তি ও নেপথ্য ইতিহাস

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে ১৯৭২ সালের যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। এটি কোনো হুট করে নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তৎকালীন সময়ের এক চরম প্রশাসনিক সংকটের ফসল ছিল।

নামকরনের স্বকীয়তা: জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রথম ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র আইন প্রয়োগকারী বা নিরাপত্তা বাহিনী, যার নামকরণ করা হয়েছিল সম্পূর্ণ খাঁটি বাংলা ভাষায়। পাকিস্তান আমলের ‘পুলিশ’ বা ব্রিটিশ আমলের সামরিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় ও আত্মপরিচয়মূলক নাম দেওয়া হয়েছিল একে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’

ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং সংকট

১৯৭২ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের নিয়মিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভেতরে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ফাটল দেখা দেয়। তৎকালীন ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, যা পরে বিডিআর এবং বর্তমানে বিজিবি) এবং পুলিশ বাহিনীর ভেতর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত সদস্য এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় যখন ১৯৭২ সালে ইপিআরের ভেতরে ‘মুক্তিযোদ্ধা বনাম অমুক্তিযোদ্ধা’ দ্বন্দ্বে এক ভয়াবহ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। গুজব রটানো হয়েছিল যে, যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি বা যারা পাকিস্তানে আটকা ছিল, তাদের সবাইকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই কৃত্রিম গুজবের ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন ইপিআরের ভেতর এক ভয়াবহ সশস্ত্র বিদ্রোহ ও প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল যে, তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েও উত্তেজিত জোয়ানদের থামাতে ব্যর্থ হন।

এই চরম আইনশৃঙ্খলার সংকটের মুখে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে সশরীরে বিদ্রোহস্থলে ছুটে যান। তাঁর জাদুকরী নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে সেই ভয়াবহ বিদ্রোহ ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু এই ঘটনাটি বঙ্গবন্ধুকে একটি গভীর সত্য অনুধাবন করতে বাধ্য করে নিয়মিত পেশাদার বাহিনীগুলোর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তাই বর্ডার পাহারা দেওয়ার জন্য ইপিআর এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে আগের দায়িত্বে রেখে, দেশের বিশেষ অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলার জন্য একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড এবং বিশ্বস্ত বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ভাবনারই ফসল ছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনী।

‘মুজিব বাহিনী’র একচেটিয়া মিথ খণ্ডন

জাতীয় রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অপপ্রচারটি হলো এটি নাকি ছিল কেবলই ‘মুজিব বাহিনী’ (BLF) এর সদস্যদের নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধুর একটি ব্যক্তিগত পেটুয়া বাহিনী। এই তথ্যটি ডাহা মিথ্যা এবং ঐতিহাসিক প্রোপাগান্ডা।

প্রকৃত সত্য হলো, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রথম কয়েক ব্যাচের প্রতিটি সদস্য ছিলেন শতভাগ সার্টিফাইড বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উইংয়ের অংশ ছিলেন না।

কাদেরিয়া বাহিনীর আধিক্য: রক্ষীবাহিনীতে সবচেয়ে বেশি জনবল অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইলের বীর বিক্রম কাদের সিদ্দিকীর ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ থেকে।

অন্যান্য বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি: এতে বিপুল সংখ্যক সদস্য ছিলেন তৎকালীন ‘গণবাহিনী’ এবং ‘মুজিব বাহিনী’ থেকে।

বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা: এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারা, যারা কোনো নির্দিষ্ট দলের অধীনে না খেলে সরাসরি মাতৃভূমির টানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তারাও এই বাহিনীতে যোগ দেন।

সুতরাং, একে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বাহিনী বলা ইতিহাসকে অস্বীকার করার শামিল। এটি ছিল সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সমন্বিত জাতীয় রূপ।

অ-পেশাদারিত্ব বনাম দেশপ্রেমের পাগল

রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, তারা কেউ প্রথাগত ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি সামরিক একাডেমির বিলাসবহুল ব্যারাকে বছরের পর বছর কুচকাওয়াজ করা পেশাদার সৈনিক ছিলেন না।

এই বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন ছাত্র বা তরুণ বয়সের। তারা যুদ্ধের আগে কোনোদিন অস্ত্র ছুঁয়েও দেখেননি। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি বাহিনী এদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তারা মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং নিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে লড়েছিলেন। প্রথাগত ট্রেনিংপ্রাপ্ত কোনো সৈনিকের যুদ্ধে যাওয়া আর একজন সাধারণ বেসামরিক ছাত্রের খালি পায়ে দেশের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এই বেসামরিক বীরত্বের অনন্য প্রতীক ছিলেন রক্ষীবাহিনীর জোয়ানরা।

যুদ্ধোত্তর সামাজিক বাস্তবতার শিকার

যুদ্ধের পর এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত করুণ। অনেকে যুদ্ধে তাদের পিতা, ভাই বা পুরো পরিবার হারিয়েছিলেন। অনেকের ঘরবাড়ি পাকিস্তানি আর্মি পুড়িয়ে দিয়েছিল, ফলে তাদের থাকার কোনো জায়গা ছিল না।

যুদ্ধের কারণে পড়াশোনা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং পুনরায় শিক্ষাজীবনে ফেরার মতো অর্থনৈতিক বা মানসিক অবস্থা অনেকের ছিল না। সংসারে হাল ধরার মতো কেউ না থাকায় চরম বেকারত্ব ও অনাহারে দিন কাটছিল অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার।

বঙ্গবন্ধু এই বীর সন্তানদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসন এবং একই সাথে তাদের ভেতরের অদম্য দেশপ্রেমকে দেশের কাজে লাগানোর জন্য রক্ষীবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর মতো সুযোগ-সুবিধা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন না। সেনা, পুলিশ বা ইপিআরের মধ্যে যেখানে পদোন্নতি, পাওয়া না-পাওয়া এবং পাকিস্তান-প্রত্যাগত বনাম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতার তীব্র কোন্দল ছিল, জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে তেমন কোনো অসন্তোষ বা শৃঙ্খলাভঙ্গ ছিল না। তারা ছিলেন দেশপ্রেমের পাগল এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।

যুদ্ধোত্তর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রক্ষীবাহিনী

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের মতো শান্ত ছিল না। সেই ভয়াবহ অস্থির সময়ে রক্ষীবাহিনীকে যে সকল ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়েছিল, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চরমপন্থী দমন

১৬ই ডিসেম্বরের পর সব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দেননি। এর বাইরে দেশীয় পাকিস্তানি দালাল, আল-বদর, রাজাকারদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র সমাজের অপরাধী চক্রের হাতে চলে যায়। একই সাথে চরমপন্থী সর্বহারা, নকশাল এবং পরবর্তীতে জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) সশস্ত্র উইং ‘গণবাহিনী’ দেশজুড়ে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা শুরু করে।

এই চরমপন্থীরা প্রতিনিয়ত সরকারি থানা লুট করত, পুলিশের ফাঁড়ি পুড়িয়ে দিত, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ডাকাতি করত এবং দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিল-কারখানায় অগ্নিসংযোগ করে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। (১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর জাসদের গণবাহিনীর উগ্র ও ধ্বংসাত্মক রূপ এদেশের মানুষ স্বচক্ষে দেখেছে)। এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ বা নিয়মিত বাহিনী যেখানে ব্যর্থ হচ্ছিল, সেখানে রক্ষীবাহিনী বুক চিতিয়ে লড়াই করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল।

১ কোটি শরণার্থীর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন

মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাঁচাতে যে ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন তারা স্বদেশে ফিরে আসেন, তখন তারা দেখেন তাদের ঘরবাড়ি, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও সুযোগ সন্ধানীরা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। রক্ষীবাহিনীর অন্যতম প্রধান কাজ ছিল এই দখলদারদের শক্ত হাতে উচ্ছেদ করা এবং শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে আসা নিঃস্ব মানুষদের তাদের পৈতৃক সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া।

ফেলে যাওয়া পাকিস্তানি ও বিহারী সম্পত্তি রক্ষা

অনেক ধনী পাকিস্তানি এবং অবাঙালি (বিহারী) যুদ্ধের সময় বা ঠিক পরে তাদের বিশাল সম্পত্তি, বাড়িঘর ও কলকারখানা ফেলে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। সদ্য স্বাধীন দেশের একশ্রেণির চোর ও লুটেরা চক্র এই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিগুলো নিজেদের নামে দখল করার মচ্ছব শুরু করেছিল। রক্ষীবাহিনী কঠোর অভিযান পরিচালনা করে এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দখলমুক্ত করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা

যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়ে যে সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভারতে চলে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকের বাড়িঘর ও জমি এদেশে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে বা অবৈধভাবে দখল হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাস্তবায়নে রক্ষীবাহিনী এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের নিরাপত্তা প্রদান করে এবং তাদের জমিজমা দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করে।

‘এলিট ফোর্স’ প্যারাডাই: আধুনিক র‍্যাব বনাম রক্ষীবাহিনী

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কাজের ধরন, তাদের কঠোরতা এবং অভিযানের প্রকৃতিকে যদি আমরা আধুনিক আইন প্রয়োগকারী কাঠামোর সাথে তুলনা করি, তবে দেখতে পাব রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত বর্তমান র‍্যাব (Rapid Action Battalion)-এর মতো একটি এলিট ফোর্স।

একটি এলিট ফোর্স যখন কাউন্টার-টেররিজম বা সশস্ত্র চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে, তখন তাকে অস্ত্র প্রয়োগ করতে হয়। সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর ও নির্মম হতে হয় এটি বাহিনীর পেশাদারিত্বের অংশ, কোনো অপরাধ নয়। আজ র‍্যাব যেভাবে জঙ্গিবাদ, চরমপন্থী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালায়, ঠিক একই রকম ভূমিকা তৎকালীন সময়ে রক্ষীবাহিনী পালন করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাসদ ও তৎকালীন ডানপন্থী-বামপন্থী চরমপন্থীরা রক্ষীবাহিনীর এই পেশাদার কঠোরতাকে ‘অমানবিক নির্যাতন’ হিসেবে প্রোপাগান্ডা আকারে ছড়াতে থাকে, যাতে সাধারণ মানুষের চোখে বঙ্গবন্ধুকে স্বৈরাচার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

জিয়াউর রহমানের আত্মীকরণ: প্রোপাগান্ডার কফিনে চূড়ান্ত পেরেক

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের ছড়ানো সমস্ত প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারের দেয়াল এক নিমেষে ধসে পড়ে একটিমাত্র ঐতিহাসিক সত্যের সামনে। আর সেই সত্যটি হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান যখন দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং সেনাপ্রধান হন, তখন তিনি নিজে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে, কোনো প্রকার প্রশ্ন বা স্ক্রিনিং ছাড়াই পুরো রক্ষীবাহিনীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ (Assimilation) করেন।

প্রোপাগান্ডাকারীদের প্রতি একটি মৌলিক যৌক্তিক প্রশ্ন

আজ যারা বিএনপির রাজনীতি করেন বা যারা বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে রক্ষীবাহিনীকে গালি দেন, তাদের কাছে আমার একটি সোজা রাজনৈতিক প্রশ্ন:

"রক্ষীবাহিনী যদি সত্যিই উশৃঙ্খল, অমানবিক, অপেশাদার এবং ভারতপন্থী বা ভারতের দালাল বাহিনী হতো তবে চরম ভারত-বিরোধী ন্যারেটিভ নিয়ে ক্ষমতায় আসা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান কেন এই পুরো বাহিনীকে বিলুপ্ত না করে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি পবিত্র ও সংবেদনশীল সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন?"

জিয়াউর রহমান একজন পেশাদার সৈনিক ছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, রক্ষীবাহিনীর জোয়ানরা সম্পূর্ণ লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা, চরম সুশৃঙ্খল, দেশপ্রেমিক এবং অত্যন্ত কঠোর ট্রেনিংপ্রাপ্ত। এই বাহিনীর ডেডিকেশন এবং সামরিক কার্যকারিতা দেখেই জিয়াউর রহমান তাদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে সেনাবাহিনীর জনবল ও শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন। রক্ষীবাহিনীর সেই সুপ্রশিক্ষিত জোয়ানরাই পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফ্রন্টে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন। এই একটিমাত্র ঐতিহাসিক সত্যই প্রমাণ করে যে, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপবাদগুলো ছিল স্রেফ রাজনৈতিক আবর্জনা।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB) সংক্রান্ত মিথ বনাম ঐতিহাসিক সত্য

জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে বিরোধীদের ছড়ানো প্রোপাগান্ডা এবং নথিপত্র সমর্থিত প্রকৃত সত্যকে সহজভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি বিস্তারিত তথ্যছক দেওয়া হলো:

পর্যালোচনার বিষয়

বিরোধী রাজনৈতিক ব্লকের অপপ্রচার (Myths)

ঐতিহাসিক ও নথিপত্র সমর্থিত সত্য (Facts)

প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

১. বাহিনীর গঠন ও সদস্য

এটি কেবল ‘মুজিব বাহিনী’র সদস্যদের নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী ছিল।

প্রথম কয়েক ব্যাচের প্রতিটি সদস্য ছিলেন সার্টিফাইড বীর মুক্তিযোদ্ধা; যেখানে সবচেয়ে বেশি ছিল কাদেরিয়া বাহিনী ও সাধারণ বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের অংশ।

এটি কোনো দলীয় বাহিনী ছিল না, বরং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল।

২. বাহিনীর জাতীয়তা ও এজেন্ডা

এটি একটি ‘ভারতপন্থী’ বাহিনী ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এটি ছিল একমাত্র বাহিনী যার নামকরণ সম্পূর্ণ বাংলায় করা হয় (জাতীয় রক্ষী বাহিনী)। এর মূল কাজ ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

ভারত-বিরোধী সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এই বাহিনীকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সেনাবাহিনীতে যুক্ত করেন, যা তাদের দেশপ্রেমের চূড়ান্ত প্রমাণ।

৩. অভিযানের ধরন ও কঠোরতা

রক্ষীবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার ও রাজনৈতিক নিপীড়ন চালাত।

তারা ছিল বর্তমান র‍্যাবের মতো একটি ‘এলিট ফোর্স’। তাদের মূল লড়াই ছিল থানা লুটকারী চরমপন্থী, সর্বহারা, নকশাল এবং জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনীর বিরুদ্ধে।

চোরাকারবারি দমন, ব্যাংক ডাকাতি রোধ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়ানো দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে তারা অবদান রাখে।

৪. সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ভূমিকা

রক্ষীবাহিনী মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি দখল করেছিল।

ভারত থেকে ফিরে আসা ১ কোটি শরণার্থীর জমি পুনরুদ্ধার, সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্পত্তি দখলমুক্ত করা এবং বিহারীদের ফেলে যাওয়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা ছিল তাদের কাজ।

যুদ্ধোত্তর সমাজে যে ভয়াবহ মব-জাস্টিস ও সম্পত্তি দখলের মচ্ছব শুরু হয়েছিল, তা রক্ষীবাহিনী শক্ত হাতে প্রতিহত করে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।

৫. বাহিনীর শৃঙ্খলা ও ট্রেনিং

রক্ষীবাহিনী ছিল একটি অগোছালো, অপেশাদার ও উশৃঙ্খল মিলিশিয়া গ্রুপ।

অত্যন্ত সুশৃঙ্খল বাহিনী ছিল, যেখানে নিয়মিত আর্মি বা পুলিশের মতো কোনো অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা অসন্তোষ ছিল না। পরবর্তীতে এর ট্রেইনিং অত্যন্ত উচ্চমানের হয়।

তাদের উচ্চমানের সামরিক প্রশিক্ষণ ও পেশাদার ডিসিপ্লিন দেখেই জিয়াউর রহমান তাদের ডিফেন্স ফোর্সের মেইনস্ট্রিমে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন।

৬. পরবর্তী ঐতিহাসিক পরিণতি

১৯৭৫ সালের পর এই বাহিনীকে অপরাধী হিসেবে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়।

১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের (Jatiyo Rakkhi Bahini Absorption Ordinance, 1975) মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হয়।

রক্ষীবাহিনীর জোয়ানরা পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং জাতিসংঘ শান্তি মিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB)-এর ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এমন কিছু আইনি, রাজনৈতিক, সামরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া যায়, যা সাধারণ আলোচনায় উঠে আসে না। এই বাহিনীকে বুঝতে হলে এর ভেতরের প্রশাসনিক জটিলতা, সুনির্দিষ্ট কিছু অপারেশন এবং ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫-এর কালরাতে তাদের ভূমিকার পেছনের বাস্তব সত্য জানা আবশ্যক।

‘JRB অর্ডার ১৯৭২’ এবং বিতর্কের সূত্রপাত

রক্ষীবাহিনীকে যে আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭২ সালের ৭ই মার্চ একটি রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ, ১৯৭২’ (President's Order No. 21 of 1972) জারি করা হয়।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা: এই আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারাটি ছিল রক্ষীবাহিনীর যেকোনো সদস্য সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের পরোয়ানা (Warrant) ছাড়াই যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং তল্লাশি করতে পারতেন।

আইনি সুরক্ষার যৌক্তিকতা: যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন হাজার হাজার অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে, প্রতিদিন পুলিশ ফাঁড়ি লুট হচ্ছে, তখন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়া মেনে সন্ত্রাস দমন করা অসম্ভব ছিল। বর্তমান সময়ের Anti-Terrorism Act বা বিশেষ এলিট ফোর্সের ক্ষমতার মতোই এই ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলো (বিশেষ করে জাসদ ও ডানপন্থীরা) এটিকে ‘নাগরিক অধিকার হরণ’-এর তকমা দিয়ে প্রচার করতে থাকে।

রণাঙ্গনের বীরদের হাতে কমান্ড

অনেকে মনে করেন রক্ষীবাহিনী কোনো পেশাদার নেতৃত্ব ছাড়া চলত। এটি সম্পূর্ণ ভুল। এই বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক মস্তিস্কেরা।

মহাপরিচালক (Director General): রক্ষীবাহিনীর প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এ. এন. এম. নুরুজ্জামান (বীর উত্তম)। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের সফল কমান্ডার। তাঁর মতো একজন সুশৃঙ্খল এবং বীর সামরিক কর্মকর্তার অধীনে এই বাহিনী পরিচালিত হতো।

অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা: উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আনোয়ার উল আলম শহীদ (যিনি টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন) এবং সরোয়ার মোল্লা

প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (Savar Camp): ঢাকার সাভারে (বর্তমান যেখানে সাভার সেনানিবাস ও পিএটিসি অবস্থিত) রক্ষীবাহিনীর মূল প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলা হয়। সেখানে কঠোর সামরিক ডিসিপ্লিন এবং শারীরিক কসরতের মাধ্যমে তাদের গড়ে তোলা হয়েছিল।

‘মেজর জেনারেল উবান’ বিতর্ক ও ভারতীয় ইনভলভমেন্ট

আওয়ামী লীগ-বিরোধী প্রোপাগান্ডার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো রক্ষীবাহিনী নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ছায়া রূপ ছিল এবং ভারতীয় অফিসাররা এটি চালাত। এই মিথটির উৎপত্তি কীভাবে হলো?

জেনারেল সুজন সিং উবান ফ্যাক্টর: ১৯৭১ সালে ভারতের স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স (SFF) এবং মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, রক্ষীবাহিনী গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে অর্গানাইজেশনাল সেট-আপ কেমন হবে, সে বিষয়ে টেকনিক্যাল পরামর্শ দেওয়ার জন্য জেনারেল উবানকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

বাস্তব সত্য: জেনারেল উবান কেবল একটি অ্যাডভাইজরি বা পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা একটি নবজাত রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গঠনের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। রক্ষীবাহিনীর কোনো অপারেশনাল কমান্ড, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণে কোনো একক ভারতীয় কর্মকর্তা ছিলেন না। এর রিক্রুটমেন্ট থেকে শুরু করে কমান্ড পর্যন্ত সবকিছু ছিল শতভাগ বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে।

যে অপারেশনগুলো প্রোপাগান্ডার জন্ম দিয়েছিল

রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের একটি অংশের ক্ষোভ তৈরির পেছনে ছিল দেশের কিছু কুখ্যাত চোরাকারবারি, কালোবাজারি এবং উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দলের সুপরিকল্পিত মিডিয়া ক্যাম্পেইন। রক্ষীবাহিনী মূলত তিনটি প্রধান ফ্রন্টে আঘাত হেনেছিল, যার কারণে তারা শক্তিশালী শত্রু তৈরি করে:

১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ এবং মজুতদারদের সিন্ডিকেট

১৯৭৪ সালে যখন দেশে এক ভয়াবহ বন্যা ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও জোতদাররা চাল, ডাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুদামে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছিল। বঙ্গবন্ধু রক্ষীবাহিনীকে নির্দেশ দেন এই কালোবাজারিদের গুদাম সিলগালা করার জন্য। রক্ষীবাহিনী যখন এই সিন্ডিকেটের ওপর নির্মম আঘাত হানে, তখন সেই কোটিপতি মজুতদাররা তাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অত্যাচারী’ ন্যারেটিভ ছড়াতে শুরু করে।

সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টি দমন

শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও বরিশালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সিরাজ সিকদারের ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’ পাকিস্তান আমলের মতোই স্বাধীন বাংলাদেশেও সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছিল। তারা একের পর এক সরকারি খাদ্যগুদাম লুট করছিল এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হত্যা করছিল। রক্ষীবাহিনী অত্যন্ত কঠোর কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সি (Counter-insurgency) অপারেশন চালিয়ে সর্বহারা পার্টির এই সশস্ত্র নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়।

জাসদের গণবাহিনীর ‘থানা লুট’ প্রতিরোধ

তৎকালীন সময়ে জাসদের সশস্ত্র উইং ‘গণবাহিনী’র মূল টার্গেট ছিল দেশের মফস্বল অঞ্চলের দুর্বল থানাগুলো। তারা আচমকা থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশদের হত্যা করে সমস্ত অস্ত্র লুট করে নিয়ে যেত। রক্ষীবাহিনী দেশের প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ থানায় বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করে গণবাহিনীর এই ডেসপ্যারেট মুভমেন্ট রুখে দেয়।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫: রক্ষীবাহিনী কেন নিষ্ক্রিয় ছিল?

রক্ষীবাহিনীর সমালোচকরা প্রায়ই একটি অত্যন্ত কুটিল প্রশ্ন তোলেন: "বঙ্গবন্ধুর এত অনুগত এবং শক্তিশালী বাহিনী হওয়া সত্ত্বেও ১৫ই আগস্ট সকালে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো, তখন রক্ষীবাহিনী কেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে খুনি মেজরদের প্রতিরোধ করল না?"

এই ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে কোনো অপেশাদারিত্ব ছিল না, বরং ছিল চরম প্রশাসনিক শূন্যতা এবং চেইন অব কমান্ডের ব্রেকডাউন। ১৫ই আগস্টের সেই কালো রাতে রক্ষীবাহিনীর মূল চালিকাশক্তি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান বাংলাদেশে ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা আকস্মিক এই ধাক্কা সামলাতে পারেননি।

ভারী অস্ত্রের অভাব: রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত হালকা অস্ত্রে সজ্জিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী। তাদের কোনো ট্যাংক, দূরপাল্লার আর্টিলারি বা সাঁজোয়া যান ছিল না। অন্যদিকে, খুনি মেজররা ল্যান্সার এবং আরমার্ড কোরের ভারী ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ভারী অস্ত্রের সাপোর্ট ছাড়া সাভার থেকে রক্ষীবাহিনীর পদাতিক জওয়ানদের ঢাকায় এসে যুদ্ধ করা সামরিক দিক থেকে আত্মঘাতী ছিল।

সেনাবাহিনীর প্রধানের নির্দেশ না পাওয়া: রক্ষীবাহিনীর তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বড় সামরিক মুভমেন্টের জন্য সেনাবাহিনীর সদর দফতর বা রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্দেশ প্রয়োজন হতো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ নিজেই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন এবং রেডিওতে যখন খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে পুরো সামরিক বাহিনীকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন রক্ষীবাহিনী আইনি ও কৌশলগতভাবে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

রক্ষীবাহিনীর বিশেষ অপারেশন, নেতৃত্ব ও ঐতিহাসিক টাইমলাইন

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভেতরের সাংগঠনিক রূপ এবং তাদের ঐতিহাসিক যাত্রার মূল মাইলফলকগুলো নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

প্রশাসনিক/অপারেশনাল দিক

বিবরণ ও মূল তথ্য

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব

মূল অর্ডিন্যান্স (আইন)

প্রেসিডেন্টস অর্ডার নং ২১ (১৯৭২)

বাহিনীকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেফতারের আইনি বৈধতা দেয়।

সর্বোচ্চ জনবল (Peak Strength)

প্রায় ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ জওয়ান (১৯৭৫ পর্যন্ত)

দেশের প্রতিটি জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ মহকুমায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন ছিল।

পোশাক ও ইউনিফর্ম

জলপাই সবুজ (Olive Green) রঙের ড্রেস

এই পোশাকটি দেখলেই তৎকালীন চরমপন্থী ও চোরাকারবারিদের বুকে কাঁপন ধরত।

প্রধান অপারেশনাল জোন

ঢাকা, চট্টগ্রাম, আড়িয়াল খাঁ নদী অববাহিকা, সুন্দরবন সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল।

জলদস্যু, নদীপথের ডাকাত এবং সীমান্ত চোরাচালান রোধে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন।

বাজেট ও অর্থায়ন

সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দ

সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন, কোনো অনিয়ম বা অসন্তোষ ছিল না।

বিলুপ্তির আইনি রূপ

দ্য জাতীয় রক্ষী বাহিনী (অ্যাবজরপশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পুরো বাহিনীকে রেগুলার আর্মিতে রূপান্তর করেন।

জিয়াউর রহমানের ‘অ্যাবজরপশন অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫’

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর, ৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন, তখন তিনি একটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি করেন। অধ্যাদেশটির নাম ছিল ‘The Jatiyo Rakkhi Bahini (Absorption) Ordinance, 1975’

সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশন: এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার প্রশিক্ষিত জওয়ানকে সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন ও ঐতিহ্যবাহী ৯ম পদাতিক ডিভিশন (9th Infantry Division)-এর বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মর্যাদা ও সাকুল্যে সুবিধা: তাদের পূর্ববর্তী চাকরির সময়কালকে গণনা করা হয় এবং নিয়মিত সেনা সদস্যদের মতোই তাদের পদমর্যাদা, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।

ইতিহাস কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। রক্ষীবাহিনী যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের কোনো অগোছালো ‘মিলিশিয়া’ বা ‘উশৃঙ্খল লাঠিয়াল বাহিনী’ হতো, তবে জিয়াউর রহমানের মতো একজন কট্টর পেশাদার সামরিক শাসক এবং তৎকালীন পাকিস্তান-প্রত্যাগত সেনা অফিসাররা কখনই তাদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি এলিট প্রফেশনাল ফোর্সের ভেতরে ঢুকিয়ে নিতেন না।

জিয়াউর রহমান তাদের ভেতরের অদম্য দেশপ্রেম, কঠোর মুক্তিদ্ধার মানসিকতা এবং সাভার একাডেমির উচ্চমানের সামরিক প্রশিক্ষণকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন বলেই তাদের সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং, রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে যত অপপ্রচার তা কেবলই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার রাজনৈতিক অধ্যায়ের সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা মাত্র।

হিংসার রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত

জাতীয় রক্ষীবাহিনী কেন এত অল্প সময়ে অন্য বাহিনীগুলোর হিংসার শিকারে পরিণত হয়েছিল, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

ঈর্ষণীয় সাফল্য ও ঈর্ষার সংস্কৃতি: একটি সদ্য গঠিত বাহিনী, যারা সম্পূর্ণ অ-পেশাদার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেও শুধুমাত্র দেশপ্রেমের জোরে মাত্র কয়েক মাসের কঠিন ট্রেনিং নিয়ে দেশজুড়ে চোরাচালান, থানা লুট এবং চরমপন্থীদের দমন করে ফেলেছিল, তাদের এই অভাবনীয় সাফল্য তৎকালীন অন্যান্য প্রথাগত বাহিনীগুলোর (যারা পাকিস্তান আমলের আমলাতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব বহন করছিল) ভেতরে এক তীব্র হিংসা ও ঈর্ষার জন্ম দেয়। রক্ষীবাহিনী যখন প্রশংসায় ভাসছিল, তখন অন্যান্য বাহিনীর একটি অংশ নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অপপ্রচার শুরু করে।

বঙ্গবন্ধুকে কালিমালিপ্ত করার সহজ টার্গেট: পরাজিত শক্তি ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র খুব ভালো করেই জানত যে, বঙ্গবন্ধুকে যদি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে হয়, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাঁর গঠিত সংস্থাকে সাধারণ মানুষের সামনে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। রক্ষীবাহিনীকে যদি ‘অত্যাচারী’ প্রমাণ করা যায়, তবে তার দায় সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ওপর চাপানো সহজ হয়। ঠিক এই স্ট্র্যাটেজি মেনেই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদের মুখপত্র ‘গণকণ্ঠ’ এবং অন্যান্য ডানপন্থী পত্রিকাগুলো নিয়মিতভাবে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশ করতে থাকে, যার ধারাবাহিকতা আজ পর্যন্ত বিএনপির একাংশ ও অন্যান্য আওয়ামী-বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ধরে রেখেছে।

প্রোপাগান্ডার অবসান ও বীরদের প্রতি রক্তঋণ

ইতিহাসের একটি অমোঘ নিয়ম হলো সত্যকে সাময়িকভাবে মিথ্যার কুয়াশা দিয়ে ঢেকে রাখা গেলেও, সময়ের পরিক্রমায় তা প্রমাণের আলোতে বেরিয়ে আসবেই। জাতীয় রক্ষীবাহিনী নিয়ে গত ৫ দশক ধরে যে ভয়াবহ প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যার বেড়াজাল তৈরি করা হয়েছে, জিয়াউর রহমান কর্তৃক এই বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণের একটিমাত্র সত্যই সেই পুরো প্রোপাগান্ডার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ছিলেন এদেশের সূর্যসন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য একবার নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, আর স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে নিজেদের যুবতী বয়স ও ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে রক্ষীবাহিনীর পোশাকে দ্বিতীয়বার যুদ্ধে নেমেছিলেন।

আজ এই আধুনিক ও সচেতন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বীর সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার করা। বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিকভাবে খাটো করার নোংরা উদ্দেশ্যে যারা রক্ষীবাহিনীর মতো একটি সম্পূর্ণ দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযোদ্ধানির্ভর বাহিনীকে বিতর্কিত করতে চায়, তাদের সেই মিথ্যাচারকে আমাদের রুখে দিতে হবে। জাতীয় রক্ষীবাহিনী কোনো স্বৈরাচারের পেটুয়া বাহিনী ছিল না; তারা ছিল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অতন্দ্র প্রহরী, একদল দেশপ্রেমের পাগল বীর মুক্তিযোদ্ধার সুশৃঙ্খল জাতীয় প্রাচীর। তাদের এই মহান ত্যাগ ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jul 12, 2026

/

Post by

২০২৪ সালের রক্তাক্ত ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর যখন সাধারণ মানুষ একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং নিরাপদ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে এক ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়ের জাল বুনে চলেছে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ পাওয়া একটি ঘটনা পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে বহুল পরিচিত ‘মার্শাল আর্ট’ শেখানোর আড়ালে দেশের তরুণ প্রজন্মকে উগ্রবাদী ও সশস্ত্র সামরিক (Militant) প্রশিক্ষণের আওতায় আনার এক মারাত্মক চক্রান্ত উন্মোচিত হয়েছে।

Jul 12, 2026

/

Post by

লোকরঞ্জনবাদী (Populist) এবং আবেগসর্বস্ব বক্তব্য শুনতে যতই বীরত্বপূর্ণ মনে হোক না কেন, বাস্তবতার ধূলিকণায় এর বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও ভূ- geopolitical মূল্য একদম শূন্য। পারমাণবিক বোমার কার্যকারিতা, এর দীর্ঘমেয়াদী আফটার ইফেক্ট, আকাশচুম্বী রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, কারিগরি ব্লু-প্রিন্ট এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল সম্পর্কে এই সমস্ত স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞান আসলেই তলানিতে।

Jul 11, 2026

/

Post by

রাজনীতিতে বয়ান বা ন্যারেটিভের একটি নিজস্ব খেলা আছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যখন কোনো নেতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পুতুল হতে অস্বীকার করেন, নিজের দেশের সার্বভৌমত্বকে কোনো পরাশক্তির কাছে বন্ধক দিতে রাজি হন না, তখন তাঁর বিরুদ্ধে খুব সুপরিকল্পিতভাবে শব্দার্থের যুদ্ধ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশীয় সুবিধাভোগী চক্র সবাই মিলে নির্দিষ্ট কিছু নেতিবাচক তকমা বা লেবেল তৈরি করে সেই নেতার গায়ে সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করে।

Jul 11, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর থেকে বিগত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ বা প্রচারণামূলক কৌশল আমরা অবলোকন করে আসছি। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের পেইড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং হাজার হাজার ‘বট আইডি’ (Bot Accounts) থেকে প্রতিনিয়ত একটি অপপ্রচার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে চালানো হয়: “ভারত বাংলাদেশকে গ্রাস করছে, বাংলাদেশ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, ১৯৭১ সালে ভারত আমাদের সাহায্য করেনি বরং পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করার জন্য যুদ্ধ করেছিল।”

Jul 10, 2026

/

Post by

বাংলাদেশী রাজনীতির পটভূমি সবসময়ই নাটকীয়তা, সংঘাত এবং অপ্রত্যাশিত মোড় দিয়ে ঘেরা। কিন্তু ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে’র প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা-৮ আসনের এমপি পদপ্রার্থী ওসমান হাদীর ওপর ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনামাত্র নয়; বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, সাংগঠনিক শিথিলতা এবং ক্ষমতার অন্ধত্বের এক জ্বলন্ত দলিল। ওসমান হাদীর ট্র্যাজেডির নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক সত্য কথন।

Jul 7, 2026

/

Post by

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্ব রাজনীতিতে এমন দুটি অন্যতম উদাহরণ হলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বা আইআরজিসি এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB)। এই নিবন্ধে প্রদত্ত উপাত্তসমূহ এবং গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই দুটি বাহিনীর গঠন, উদ্দেশ্য, তাদের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক মিল-অমিল এবং ইতিহাসের গতিপথে তাদের প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

Jul 12, 2026

/

Post by

২০২৪ সালের রক্তাক্ত ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর যখন সাধারণ মানুষ একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং নিরাপদ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে এক ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়ের জাল বুনে চলেছে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ পাওয়া একটি ঘটনা পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে বহুল পরিচিত ‘মার্শাল আর্ট’ শেখানোর আড়ালে দেশের তরুণ প্রজন্মকে উগ্রবাদী ও সশস্ত্র সামরিক (Militant) প্রশিক্ষণের আওতায় আনার এক মারাত্মক চক্রান্ত উন্মোচিত হয়েছে।

Jul 12, 2026

/

Post by

লোকরঞ্জনবাদী (Populist) এবং আবেগসর্বস্ব বক্তব্য শুনতে যতই বীরত্বপূর্ণ মনে হোক না কেন, বাস্তবতার ধূলিকণায় এর বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও ভূ- geopolitical মূল্য একদম শূন্য। পারমাণবিক বোমার কার্যকারিতা, এর দীর্ঘমেয়াদী আফটার ইফেক্ট, আকাশচুম্বী রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, কারিগরি ব্লু-প্রিন্ট এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল সম্পর্কে এই সমস্ত স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞান আসলেই তলানিতে।

Jul 11, 2026

/

Post by

রাজনীতিতে বয়ান বা ন্যারেটিভের একটি নিজস্ব খেলা আছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যখন কোনো নেতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পুতুল হতে অস্বীকার করেন, নিজের দেশের সার্বভৌমত্বকে কোনো পরাশক্তির কাছে বন্ধক দিতে রাজি হন না, তখন তাঁর বিরুদ্ধে খুব সুপরিকল্পিতভাবে শব্দার্থের যুদ্ধ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশীয় সুবিধাভোগী চক্র সবাই মিলে নির্দিষ্ট কিছু নেতিবাচক তকমা বা লেবেল তৈরি করে সেই নেতার গায়ে সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করে।

Jul 11, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর থেকে বিগত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ বা প্রচারণামূলক কৌশল আমরা অবলোকন করে আসছি। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের পেইড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং হাজার হাজার ‘বট আইডি’ (Bot Accounts) থেকে প্রতিনিয়ত একটি অপপ্রচার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে চালানো হয়: “ভারত বাংলাদেশকে গ্রাস করছে, বাংলাদেশ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, ১৯৭১ সালে ভারত আমাদের সাহায্য করেনি বরং পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করার জন্য যুদ্ধ করেছিল।”

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.