কিলো ফ্লাইট ১৯৭১ - যেভাবে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর
একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন স্থল এবং জলপথের তীব্র লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ, ঠিক তখন আকাশসীমায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার গল্প তৈরি করেছিল একদল অদম্য সাহসী তরুণ। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি অফিসার, ক্যাডেট ও বিমানসেনারা মূলত স্থলযুদ্ধে সাধারণ সৈনিক ও গেরিলা হিসেবে যুদ্ধ করছিলেন। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে এবং শত্রুর আকাশপথের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে একটি নিজস্ব বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছিল।

TruthBangla
একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন স্থল এবং জলপথের তীব্র লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ, ঠিক তখন আকাশসীমায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার গল্প তৈরি করেছিল একদল অদম্য সাহসী তরুণ। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি অফিসার, ক্যাডেট ও বিমানসেনারা মূলত স্থলযুদ্ধে সাধারণ সৈনিক ও গেরিলা হিসেবে যুদ্ধ করছিলেন। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে এবং শত্রুর আকাশপথের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে একটি নিজস্ব বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছিল।
পরিত্যক্ত রানওয়ে, বিষাক্ত সাপে ঘেরা জঙ্গল এবং শত্রুর চোখ এড়িয়ে অত্যন্ত গোপনে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম বৈমানিক ইউনিট। এর নাম ‘কিলো ফ্লাইট’ (Kilo Flight)।
১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে মাত্র ৩টি পুরানো ও ত্রুটিপূর্ণ আকাশযান এবং ৫৮ জন সদস্য নিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা আজ আধুনিক বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (Bangladesh Air Force) মূল ভিত্তিপ্রস্তর। জন্ম নেওয়ার মাত্র ৬৬ দিনের মাথায় আকাশপথে শত্রুর হৃদকম্প সৃষ্টি করে এই কিলো ফ্লাইট কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিল এবং ভারতের ওপর পাকি আক্রমণের রাতেই পাল্টা জবাব দিয়েছিল, তার এক পূর্ণাঙ্গ ও রোমাঞ্চকর সামরিক ব্যবচ্ছেদ এই নিবন্ধে তুলে ধরা হলো।
রক্তেভেজা বিদ্রোহ থেকে 'কিলো ফ্লাইট'
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি জাতির ওপর নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, তখন তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে (PAF) কর্মরত বহু বাঙালি অফিসার, পাইলট ও বিমানসেনা জীবন বাজী রেখে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
ঐতিহাসিক সংখ্যাগত পরিসংখ্যান
মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন:
অবসর্ড ও কর্মরত বিমানসেনা: প্রায় ৫০০ জন।
অফিসার ও পাইলট: ৩৫ জন প্রখ্যাত অফিসার।
সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই বিমানসেনারা মূলত বিভিন্ন সেক্টরে পদাতিক বাহিনীর অংশ হয়ে সম্মুখ সমরে লড়াই করছিলেন। তবে মুক্তাঞ্চলে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহের জল ও স্থলপথে বিমান হামলার মাধ্যমে আঘাত হানার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ফোর্সেস (BDF)-এর কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল এ. জি. ও. ওসমানী, ভারত সরকার এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) যৌথ সংলাপে সিদ্ধান্ত হয় একটি গোপন ও স্বাধীন বাঙালি ফ্লাইং স্কোয়াড্রন তৈরি করা হবে।
কেন নাম 'কিলো ফ্লাইট'?
১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর শুভ উদ্বোধন ঘটে। এই সময় বিমানবাহিনীর চিফ অফ এয়ার স্টাফ বা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার। তাঁর নামের শেষের অক্ষর ‘কে’ (K)-কে স্মরণীয় করে রাখতে এবং সামরিক সাংকেতিক গোপনীয়তা বজায় রাখতে এই ইউনিটের নামকরণ করা হয় ‘কিলো ফ্লাইট’।
কিলো ফ্লাইটে মূলত ৫৮ জন সদস্যকে বিভিন্ন সেক্টর থেকে বাছাই করে আনা হয়। এতে পিআইএ (Pakistan International Airlines) এবং প্ল্যান্ট প্রটেকশন ডিপার্টমেন্ট থেকে আসা অভিজ্ঞ সিভিল পাইলটরাও যুক্ত হন।
ডিমাপুরের বৈরি পরিবেশ ও ৩টি ঐতিহাসিক আকাশযান
কিলো ফ্লাইটের যাত্রাপথ মোটেই সুগম ছিল না। ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের নিজস্ব বহর থেকে বাংলাদেশ সরকারকে মাত্র ৩টি পুরানো, অবসরপ্রাপ্ত ও যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত আকাশযান হস্তান্তর করে। এর সাথে ছিল নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরের প্রতিকূল পরিবেশ।
ডিমাপুরের বৈরি প্রকৃতি: ডিমাপুর বিমানঘাঁটিটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। ঘন জঙ্গলে ঢাকা, যোগাযোগের অযোগ্য এবং সাপের উপদ্রবে জরাজীর্ণ একটি জায়গা। কোনো আধুনিক নেভিগেশনাল এইড বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা ছিল না। চারপাশের উঁচু উঁচু পাহাড় রাতে ও কুয়াশায় বিমান চালনার জন্য ছিল চরম বিপজ্জনক।
আকাশযানগুলোর কারিগরি রূপান্তর (Modification): বাঙালি টেকনিশিয়ান এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রকৌশলীরা এই সাধারণ ও পুরনো বিমানগুলোকে রাতারাতি মারাত্মক যুদ্ধবিমানে রূপান্তর করেন:
ডিএইচসি-৩ অটার বিমান (DHC-3 Otter): এটি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৮০ মাইল গতির একটি হালকা বিমান। এর দুই ডানার নিচে ৭টি করে মোট ১৪টি রকেট পড বসানো হয়। বিমানটির পেছনের দরজা খুলে একটি থ্রি-নট-থ্রি ব্রাউনিং মেশিনগান বসানো হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এর মেঝের পাটাতন কেটে ১০টি ২৫ পাউন্ডের বোমা বসানো হয়, যা ফেলার কোনো প্রথাগত বোম-রিলিজ বোতাম ছিল না। পাইলট ও গানারদের হাত দিয়ে বোমার সেফটি পিন খুলে মেঝের ফাঁক দিয়ে নিচে ফেলে দিতে হতো!
এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার (Alouette III): ফ্রান্সের তৈরি এই হেলিকপ্টারটিতে নিচ থেকে আসা বুলেটের হাত থেকে পাইলটকে বাঁচাতে মেঝের নিচে ১ ইঞ্চি পুরু স্টিলের পাত ঝালাই করে লাগানো হয়। এতে ১৪টি রকেট ছোঁড়ার পাইলন এবং সাইড ডোরে ব্রাউনিং মেশিনগান সেট করা হয়। বাড়তি ওজনের কারণে এটি বাতাসে বেশ নড়বড়েভাবে উড়তো।
ডিসি-৩ ডাকোটা (DC-3 Dakota): এটিকে প্রথমে ৫০০ পাউন্ড বোমা বহনের উপযোগী করা হলেও পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব (যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ) ও ভিআইপি পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
রক্তঘাম ঝরানো প্রশিক্ষণ ও অদম্য আত্মত্যাগ
ডিমাপুরের সেই জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অভিজ্ঞ অফিসারদের অধীনে শুরু হয় দিন-রাত ১৮ ঘণ্টার দুঃসাহসিক প্রশিক্ষণ।
প্রশিক্ষক ও অভিভাবকগণ: ভারতীয় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং, স্কোয়াড্রন লিডার ঘোষাল, স্কোয়াড্রন লিডার সঞ্জয় কুমার চৌধুরী এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সি. এম. সিংলা দিনরাত এক করে বাঙালি পাইলটদের আধুনিক এরিয়াল কমব্যাট ও নাইটি ফায়ারিংয়ের কৌশল শেখান।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উড়াল: পাহাড়ের ওপরে প্যারাস্যুট ফেলে সেটাকে কাল্পনিক টার্গেট বানিয়ে রকেট ও বোমা বর্ষণের কৌশল অভ্যাস করা হতো। পাইলটদের কোনো নেভিগেশন রাডার বা আধুনিক সরঞ্জাম ছিল না; নিখাদ অনুমান, চোখ এবং ঘড়ির কাঁটার হিসাবের ওপর ভিত্তি করে পাহাড়ের খাদে নেমে ডাইভ দিতে হতো।
ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদের ভাষ্য:
"আমরা ২০০-২৫০ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচুতে উড়তে পারতাম না। যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ের গায়ে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি ছিল। কিন্তু আমরা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই পুরোনো আকাশযানগুলোকে নিজেদের আয়ত্তে এনেছিলাম।"
প্রতীক ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর লোগোর জন্ম: প্রশিক্ষণ চলাকালীন একদিন চন্দন সিং ও স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেন যে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আকাশযানে একটি বিশেষ প্রতীক থাকতে হবে। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় হেলিকপ্টার ও বিমানের ভার্টিক্যাল স্ট্যাবিলাইজারে একটি বৃত্তাকার লাল চাকতির ওপর সবুজ রঙের উদীয়মান বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা হবে। এই ঐতিহাসিক চিহ্নটির মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
৩ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক রাত: অপারেশনাল স্ট্রাইক
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর রাত ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান অধ্যায়। এদিন বিকেলবাবেল পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে আকস্মিক বিমান হামলা (Preemptive Strike) চালায়। কিন্তু তারা ঘূর্ণাক্ষরেও ঘুণাক্ষরে টের পায়নি যে, তাঁদের এই আক্রমণের কয়েক ঘণ্টা আগেই বাঙালিদের ‘কিলো ফ্লাইট’ প্রস্তুত হয়ে বসে আছে পাল্টা আঘাত হানার জন্য।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস গড়তে ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতেই নির্ধারিত হয় দুটি মূল লক্ষ্যবস্তু:
১. চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি ও তেল ডিপো।
২. নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপো।
এই দুটি স্থাপনা ছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর চালিকাশক্তি। কারণ এগুলো থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর জ্বালানি সরবরাহ করা হতো।
নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপো অভিযান
তেলিয়ামুরা হেলিপ্যাড থেকে রাত ৯টা ১৫ মিনিটে উড্ডয়ন করে আলুয়েট-৩ হেলিকপ্টারটি। পরিচালনা করছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ এবং কো-পাইলট হিসেবে ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম। সাথে ছিলেন গানার ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন।
শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিতে নেভিগেশন লাইট বন্ধ করে, একদম গাছের ওপর দিয়ে (Tree-top height) উগে ডেমরা হয়ে সোজা নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে পৌঁছান তারা। পাকিস্তানি সেনারা বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক ১৪টি রকেট ও মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে পুরো গোদনাইল তেল ডিপো আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় কপ্টারটি নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
চট্টগ্রাম পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারি অভিযান
একই রাতে ত্রিপুরার কৈলাসশহর থেকে ডিএইচসি-৩ অটার বিমানটি নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে উড়াল দেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম এবং কো-পাইলট ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ।
পাক বাহিনীর রাডার এড়াতে তারা মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে এসে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আচমকা আঘাত হানেন। অটার বিমান থেকে একে একে ২৪টি রকেট এবং হাতের সাহায্যে মেঝের ফাঁক দিয়ে ফেলা ১০টি বোমা সরাসরি রিফাইনারির বিশাল তেলের ট্যাংকে আঘাত হানে। পুরো চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা আগুনের লেলিহান শিখায় ছেয়ে যায়। একইসাথে বন্দরে নোঙর করা দুটি পাকিস্তানি অস্ত্র ও জ্বালানিবাহী জাহাজও ধ্বংস হয়।
এই আক্রমণের পর পাকিস্তানি জেনারেলদের মনোবলে চিরতরে ধস নেমে আসে। তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে, বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো নিজস্ব বিমানশক্তি থাকতে পারে এবং তারা মাঝরাতে এমন নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম!
৩ থেকে১৬ ডিসেম্বর: পরবর্তী ঐতিহাসিক ১২টি অপারেশন
৩ ডিসেম্বরের সফল অভিযানের পর কিলো ফ্লাইট আর থেমে থাকেনি। ৪ ডিসেম্বর থেকে ভারত ও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে কিলো ফ্লাইট ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাথে যৌথভাবে (Joint Operations) পূর্ব পাকিস্তানের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।
ডিমাপুর থেকে ঘাঁটি স্থানান্তরিত হয়ে প্রথমে শমসেরনগর এবং পরবর্তীতে সরাসরি আগরতলা বিমানঘাঁটিতে আনা হয় কিলো ফ্লাইটকে, যাতে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে ঢুকে স্ট্রাইক করা যায়।
উল্লেখযোগ্য পরবর্তী অভিযানসমূহ
মৌলভীবাজার ও সিলেট সেনাছাউনি হামলা (৬ ডিসেম্বর): সুলতান মাহমুদ ও ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে সিলেটের শত্রুপক্ষের শক্তিশালী সেনা ঘাটিতে বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
জামালপুর ও মেঘনা নদী অভিযান: নদীপথে পালিয়ে যাওয়া পাকিস্তানি সেনাদের বার্জ, ট্রলার ও গানবোটের ওপর অটার ও হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশ থেকে রকেট হামলা চালানো হয়।
ভৈরব ও নরসিংদী অপারেশন: মেঘনা নদীর ওপর দিয়ে রানিং কমব্যাট পরিচালনা করে পাকিস্তানি সেনাদের পিছু হঠতে বাধ্য করে কিলো ফ্লাইট।
মোট সাফল্য: ৫ থেকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে সিলেট, ভৈরব, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, কুমিল্লা ও নরসিংদীসহ মোট ১২টি সফল এরিয়াল কমব্যাট ও গ্রাউন্ড স্ট্রাইক সম্পন্ন করে ইতিহাস গড়ে এই ইউনিট।
একনজরে কিলো ফ্লাইট ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সূচনা
কিলো ফ্লাইটের সার্বিক গঠন, সদস্য, প্রযুক্তি ও অর্জনের মূল তথ্যসমূহ নিচে সারণীর মাধ্যমে একনজরে উপস্থাপন করা হলো:
মূল বিষয়াভলি | বিস্তারিত সামরিক তথ্য ও বিবরণ |
প্রতিষ্ঠা তারিখ ও স্থান | ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; ডিমাপুর পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি, নাগাল্যান্ড, ভারত। |
প্রতিষ্ঠাতা প্রধান | গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার (মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি)। |
কিলো ফ্লাইটের কমান্ডার | স্কোয়াড্রন লিডার (পরে এয়ার ভাইস মার্শাল) সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম। |
মোট জনবল | ৫৮ জন (৯ জন মূল পাইলট, বিমানসেনা ও দক্ষ টেকনিশিয়ান)। |
ব্যবহৃত আকাশযান | ১. ডিএইচসি-৩ অটার ২. এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার ৩. ডিসি-৩ ডাকোটা। |
ঐতিহাসিক প্রথম স্ট্রাইক | ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ মধ্যরাত; ১. নারায়ণগঞ্জ গোদনাইল ২. চট্টগ্রাম পতেঙ্গা। |
মোট পরিচালিত অভিযান | ১২টিরও বেশি সফল এয়ার স্ট্রাইক ও রিকনসিলিয়েশন মিশন। |
বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তি | ৬ জন বীর উত্তম (সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান) এবং ৩ জন বীর প্রতীক। |
বীর সেনানী ও অর্জিত রাষ্ট্রীয় খেতাব
কিলো ফ্লাইটের প্রতিটি সদস্য জীবন বাজি রেখে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আকাশে উড়িয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে তাদের এই অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁদের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাবে ভূষিত করে।
কিলো ফ্লাইটের সদস্যগণের নাম এবং তাঁদের রাষ্ট্রীয় খেতাবসমূহ:
১. স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ — বীর উত্তম (কিলো ফ্লাইট কমান্ডার)
২. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোহাম্মাদ শামসুল আলম — বীর উত্তম
৩. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম — বীর উত্তম
৪. ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ — বীর উত্তম
৫. ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ — বীর উত্তম
৬. ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন আহমেদ — বীর উত্তম
৭. ক্যাপ্টেন আব্দুল খালেক — বীর প্রতীক
৮. ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার — বীর প্রতীক
৯. ক্যাপ্টেন আব্দুল মুকিত — বীর প্রতীক
পাকিস্তান বিমানবাহিনী ত্যাগ ও বাঙালি অফিসারদের বিদ্রোহ
যে জাতির কোনো নিজস্ব ফাইটার জেট ছিল না, ছিল না কোনো আধুনিক বিমানঘাঁটি, নেভিগেশন রাডার কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র সেই বাঙালি জাতি কীভাবে অত্যন্ত সেকেলে, জরাজীর্ণ ও বেসামরিক বিমানকে হাতুড়ি-বাটাল দিয়ে বোমারু বিমানে রূপান্তর করে পাকিস্তান সামরিক জান্তার অহংকার চুরমার করে দিয়েছিল?
এই পরম সামরিক রূপকথার নেপথ্য নায়ক ছিল ‘কিলো ফ্লাইট’ (Kilo Flight) বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম সশস্ত্র উড়ন্ত ইউনিট।
নাগাল্যান্ডের দুর্গম জঙ্গলে, সাপের উপদ্রব আর পরিত্যক্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্যাঁতসেঁতে রানওয়েতে জন্ম নেওয়া কিলো ফ্লাইট মাত্র ৬৬ দিনের অলৌকিক প্রশিক্ষণে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারি ও নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপোতে আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিসংগ্রামের গতিচিত্র চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
বাঙালি বিমানসেনাদের ঐতিহাসিক পলায়নের ঘটনা
পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে (PAF) কর্মরত প্রায় ৫০০ জন অভিজ্ঞ বাঙালি বিমানসেনা এবং ৩৫ জন প্রখ্যাত পাইলট ও কর্মকর্তা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ঘাঁটি ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
পশ্চিম পাকিস্তানের রিসালপুর, করাচি, পেশোয়ার এবং পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা ও চট্টগ্রাম ঘাঁটি থেকে বাঙালি অফিসাররা অবিশ্বাস্য কৌশলে পালিয়ে ভারতের সীমান্তে প্রবেশ করেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই অকুতোভয় বিমানসেনারা বিভিন্ন সেক্টরে গিয়ে সাধারণ পদাতিক বাহিনীর সাথে স্টেনগান ও রাইফেল হাতে স্থলযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
নিজস্ব এয়ার উইং গঠনের কৌশলগত গুরুত্ব
মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার এবং বিডিএফ (BDF) হাই-কমান্ড অনুধাবন করেন যে, কেবল স্থলযুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে দ্রুত পরাস্ত করা সম্ভব নয়। এর কারণ ছিল:
পাক বাহিনীর রসদ সরবরাহ স্তব্ধ করা: পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের প্রধান অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জ্বালানি নদীপথ ও আকাশপথে পরিবহন করত।
রাতের আঁধারে মনস্তাত্ত্বিক আঘাত: পাকিস্তানি পাইলটরা দিনের বেলা আকাশে একক আধিপত্য বিস্তার করলেও রাতের বেলা নিচু দিয়ে উড়ে হামলা চালাতে চরম অপটু ছিল।
স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব: একটি স্বাধীন সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সামরিক পূর্ণতার জন্য নিজস্ব একটি বিমানবাহিনী থাকা অপরিহার্য ছিল।
অবশেষে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার, ভারতীয় বিমানবাহিনী (IAF) এবং ভারত সরকারের পারস্পরিক শীর্ষ বৈঠকের পর ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাধীন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
নাগাল্যান্ডের দুর্গম ‘ডিমাপুর’ ঘাঁটি ও কিলো ফ্লাইটের গোড়াপত্তন
১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ডিমাপুর (Dimapur) নামক এক অত্যন্ত গোপন স্থানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর।
‘কিলো ফ্লাইট’ নামকরণের রহস্য: সামরিক গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এই নতুন উড়ন্ত ইউনিটের সাংকেতিক নামকরণ করা হয় ‘কিলো ফ্লাইট’। তৎকালীন স্বাধীন বিমানবাহিনীর প্রধান সংগঠক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার-এর নামের প্রথম অক্ষর 'K' (Khondker) থেকে সামরিক ফোনেটিক অ্যালফাবেট (Phonetic Code Alphabet) অনুযায়ী এর নাম রাখা হয় 'Kilo' বা 'কিলো ফ্লাইট'।
প্রাথমিক অবকাঠামো ও বিমান বহর: স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে ভারত সরকার এবং যোধপুরের মহারাজার পক্ষ থেকে ৩টি পুরানো বেসামরিক আকাশযান উপহার দেওয়া হয়:
১. ডিসি-৩ ডাকোটা (DC-3 Dakota): আমেরিকার তৈরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বি-ইঞ্জিন বিশিষ্ট পরিবহন বিমান।
২. ডিএইচ-৩ অটার (DH-3 Otter): কানাডায় তৈরি এক-ইঞ্জিনের হালকা বিমান (সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টা ৮০ মাইল)।
৩. এলুয়েট-৩ (Alouette III): ফ্রান্সে তৈরি একটি হালকা বেসামরিক হেলিকপ্টার।
৯ জন অকুতোভয় পাইলট ও সংগঠক
কিলো ফ্লাইটের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ১০-১২ জন কর্মকর্তা ও পাইলট, যার মধ্যে ৯ জন সরাসরি আকাশযুদ্ধে অংশ নেন:
স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ (কিলো ফ্লাইটের অধিনায়ক)
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোহাম্মাদ শামসুল আলম
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম
ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ
ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ
ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার
ক্যাপ্টেন আব্দুল খালেক
ক্যাপ্টেন আব্দুল মুকিত
ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন আহমেদ
এদের সাথে ছিলেন ৫৮ জন অকুতোভয় বাঙালি টেকনিশিয়ান ও এয়ারম্যান, যাঁরা বেসামরিক বিমানগুলোকে হাতুড়ি ও ঝালাই মেশিন দিয়ে বোমারু বিমানে রূপান্তর করেছিলেন।
দেশীয় প্রকৌশল ও বেসামরিক বিমানকে বোমারু জাহাজে রূপান্তর
ডিমাপুরের ওই জঙ্গলবেষ্টিত পরিত্যক্ত ঘাঁটিটিতে আধুনিক কোনো সামরিক ওয়ার্কশপ ছিল না। কিন্তু বাঙালি টেকনিশিয়ানরা তাঁদের মেধা ও অদম্য সাহসের শক্তিতে জরাজীর্ণ বিমানগুলোকে বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজে রূপান্তর করেন।
১. ডিএইচ-৩ অটার (DH-3 Otter) বিমানে রূপান্তর
রকেট পড: বিমানটির দুই ডানার নিচে ৭টি করে মোট ১৪টি রকেট ছোঁড়ার পড বসানো হয়।
হাতে ফেলা বোমা: বিমানের কাঠের মেঝের মাঝখানের পাটাতন কেটে ফাঁকা করা হয়। সেখানে ১০টি ২৫ পাউন্ড ওজনের বোমা রাখা হয়। বোমার সেফটি পিন হাত দিয়ে টেনে খুলে ফাঁকা মেঝে দিয়ে নিচে নিক্ষেপ করার অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ মেকানিজম তৈরি করা হয়।
মেশিনগান: পেছনের দরজা খুলে একটি হাত-পরিচালিত .৩০৩ ব্রাউনিং মেশিনগান মাউন্ট করা হয়।
২. এলুয়েট-৩ (Alouette III) হেলিকপ্টারে রূপান্তর
বুলেটপ্রুফ বর্ম: নিচ থেকে শত্রুর গুলির আঘাত থেকে পাইলটদের বাঁচাতে হেলিকপ্টারের মেঝেতে ১ ইঞ্চি পুরু ভারী স্টিলের পাত ঝালাই করে লাগানো হয়।
অস্ত্র সংযোজন: কপ্টারের দুই পাশে ১৪টি রকেট ছোঁড়ার পাইলন এবং দরজায় দুটি ব্রাউনিং মেশিনগান সেট করা হয়। ভারী স্টিল ও অস্ত্রের কারণে কপ্টারটি বাতাসে বিশ্রীভাবে কাঁপত, তবুও বীর পাইলটেরা তা দিয়েই যুদ্ধ করেছিলেন।
ডিমাপুরের মৃত্যুপুরীতে ১৮ ঘণ্টার অমানসিক প্রশিক্ষণ
নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর এয়ারফিল্ডটি ছিল বিষাক্ত সাপ, জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘেরা এক ভয়ংকর জায়গা। নাইট-ফ্লাইং, নেভিগেশন সিস্টেম ছাড়া কম উচ্চতায় ওড়া এবং নিখুঁত নিশানা হানার জন্য প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা করে প্রশিক্ষণ চলতে থাকে।
প্রশিক্ষণ নির্দেশকবৃন্দ: ভারতীয় বিমানবাহিনীর বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত অফিসার দিনরাত এক করে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন:
গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং (অপারেশনের প্রধান দিকনির্দেশক)
স্কোয়াড্রন লিডার ঘোষাল
স্কোয়াড্রন লিডার সঞ্জয় কুমার চৌধুরী
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সি. এম. সিংলা
কলকাতা পাড়ি ও লাল-সবুজ প্রতীক
প্রশিক্ষণ চলাকালে একদিন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম একাই অটার বিমান নিয়ে উড্ডয়ন করেন। দীর্ঘ সময় পরেও তিনি না ফেরায় ক্যাম্পে শোকের ছায়া নেমে আসে। সূর্যাস্তের পর তিনি ফিরে আসলে জানা যায় তিনি দিকভুল করে সোজা পূর্ব পাকিস্তান অতিক্রম করে কলকাতায় গিয়ে অবতরন করেছিলেন এবং সেখানে জ্বালানি নিয়ে পুনরায় ডিমাপুরে ফিরে এসেছেন!
প্রশিক্ষণের শেষভাগে গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং-এর প্রস্তাবনায় হেলিকপ্টারের গায়ে বাংলাদেশের প্রতীক আঁকা হয় লাল বৃত্তের ভেতর সবুজ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র। আর ভারতীয় সিরিয়াল নম্বর 'IAF 364' মুছে লিখে দেওয়া হয় 'EBR' (East Bengal Regiment)।
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১: পতেঙ্গা ও গোদনাইল তেল ডিপোতে তাণ্ডব
টানা ৬৬ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে আসে সেই ঐতিহাসিক সময়। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ মধ্যরাতে কিলো ফ্লাইট তাদের প্রথম ও প্রধান অপারেশনে আঘাত হানে।
পাকিস্তানের প্রধান দুই সামরিক জ্বালানি কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারি ছিল প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
১. নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপো আক্রমণ
রাত ১২টা ১ মিনিটে তেলিয়ামুরা হেলিপ্যাড থেকে উড়াল দেয় এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার।
পাইলট ও ক্রু: স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, কো-পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম এবং গানার ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
অভিযান কৌশল: নেভিগেশন লাইট ও রেডিও বার্তা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে, কম উচ্চতায় ঢাকা-কুমিল্লা মহাসড়ক ধরে ডেমরা হয়ে গোদনাইলে পৌঁছান তারা।
ফলাফল: অস সতর্ক পাক বাহিনীকে হতবাক করে দিয়ে একের পর এক রকেট ও মেশিনগানের গোলা বর্ষণ করে তেলের প্রধান ট্যাঙ্কারগুলো সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়।
২. চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারি আক্রমণ
কৈলাসশহর এয়ারফিল্ড থেকে রাত ১২টা ২০ মিনিটে যাত্রা শুরু করে ডিএইচ-৩ অটার বিমান।
পাইলট ও ক্রু: ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম, কো-পাইলট ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ।
অভিযান কৌশল: বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে মাত্র কয়েকশো ফুট ওপর দিয়ে উড়ে এসে পাকিস্তানি রাডারকে সম্পূর্ণ ধোঁকা দেওয়া হয়।
ফলাফল: একযোগে ২৪টি রকেট বর্ষণ এবং হাতে বোমার পিন খুলে রিফাইনারির বিশাল তেলের ট্যাঙ্কার ও বন্দরে নোঙর করা ২টি বিশাল সামরিক জাহাজে আঘাত হানা হয়। পতেঙ্গার আকাশ আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে ওঠে।
এই আকস্মিক আকাশ হামলার ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যে তাদের কোনো নিরাপদ সামরিক ঘাঁটি আর অবশিষ্ট নেই।
কিলো ফ্লাইটের সমস্ত অপারেশন ও সামরিক পরিসংখ্যান সারণী
মুক্তিযুদ্ধে কিলো ফ্লাইটের পরিচালিত প্রধান প্রধান অভিযান, অংশগ্রহণকারী পাইলট এবং এর কৌশলগত ফলাফল নিচে একটি সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
তারিখ | অপারেশনের স্থান | ব্যবহৃত আকাশযান | অংশগ্রহণকারী পাইলট ও ক্রু | সামরিক প্রভাব ও অর্জন |
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ | গোদনাইল তেল ডিপো, নারায়ণগঞ্জ | এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার (EBR) | সুলতান মাহমুদ, বদরুল আলম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ | প্রধান জ্বালানি ডিপো ধ্বংস; ঢাকার পাক সামরিক সরবরাহ স্তব্ধ। |
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ | পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারি, চট্টগ্রাম | ডিএইচ-৩ অটার বিমান | শামসুল আলম, আকরাম আহমেদ | ২৪টি রকেট বর্ষণ; ইস্টার্ন রিফাইনারি ও ২টি অস্ত্রবাহী জাহাজ ভস্মীভূত। |
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | মৌলভীবাজার পাক-ক্যান্টনমেন্ট, সিলেট | এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার | সুলতান মাহমুদ, শাহাবুদ্দিন আহমেদ | সিলেট সেক্টরে পাক বাহিনীর শক্তঘাঁটি ও বাঙ্কার ধ্বংস। |
৭-১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ | জামালপুর, নরসিংদী ও মেঘনা নদী | ডিএইচ-৩ অটার ও এলুয়েট-৩ | যৌথ কিলো ফ্লাইট টিম | পিছু হটতে থাকা পাক বাহিনীর নদীপথের কনভয় ও বার্জ ধ্বংস। |
১২-১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ | ভৈরব, কাসবা ও ফেঞ্চুগঞ্জ | এলুয়েট-৩ ও অটার বিমান | সুলতান মাহমুদ, বদরুল আলম, আলমগীর সাত্তার | যৌথ বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর পদাতিক দলকে সরাসরি আকাশ সহায়তা প্রদান। |
৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর: আকাশপথে একচ্ছত্র আধিপত্য ও যৌথ অভিযান
৩ ডিসেম্বরের সফল আক্রমণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়। কিলো ফ্লাইট তাদের ঘাঁটি ডিমাপুর থেকে সরিয়ে প্রথমে শমসেরনগর এবং পরবর্তীতে আগরতলায় নিয়ে আসে।
সিলেট ও জামালপুর মিশন: ৬ ডিসেম্বর সিলেটের মৌলভীবাজারে পাকিস্তানি সেনাশিবিরে হেলিকাপ্টার থেকে ভয়াল হামলা চালান স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ও ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন।
নৌ-বহর ধ্বংস: ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে মেঘনা নদী, ভৈরব ও জামালপুরে নদীপথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টানিরত পাকিস্তানি সেনাবহর ও গানবোটের ওপর একাধিক সফল আকাশ হামলা চালায় কিলো ফ্লাইট।
যৌথ আকাশ আধিপত্য: ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) সাথে মিলে কিলো ফ্লাইটের এই অকুতোভয় পাইলটরা ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের পুরো আকাশসীমা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
বীরত্বগাথা, রাষ্ট্রীয় খেতাব ও স্বাধীন বিমানবাহিনীর ভিত্তি
কিলো ফ্লাইটের অসামান্য বীরত্ব ও জীবনবাজি রাখা অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাদের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাবে ভূষিত করে:
‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত পাইলটগণ
১. স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ (বীর উত্তম)
২. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোহাম্মাদ শামসুল আলম (বীর উত্তম)
৩. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম (বীর উত্তম)
৪. ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ (বীর উত্তম)
৫. ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ (বীর উত্তম)
৬. ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন আহমেদ (বীর উত্তম)
‘বীর প্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত পাইলটগণ
১. ক্যাপ্টেন আব্দুল খালেক (বীর প্রতীক)
২. ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার (বীর প্রতীক)
৩. ক্যাপ্টেন আব্দুল মুকিত (বীর প্রতীক)
স্বাধীনতার পর এই কিলো ফ্লাইটের সদস্য ও টেকনিশিয়ানরাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আজকের আধুনিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ বিমানবাহিনী (BAF)-র।
ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থান
একটি রাষ্ট্রের বিমানবাহিনী গড়ে তুলতে স্বাভাবিক সময়ে প্রয়োজন হয় বছরের পর বছর, কোটি কোটি ডলারের আধুনিক সুপারসনিক ফাইটার জেট এবং আধুনিক রাডার সিস্টেম। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালি বীর সন্তানেরা প্রমাণ করেছিলেন যে, অস্ত্র বা প্রযুক্তির চেয়ে বড় শক্তি হলো বুকে থাকা অদম্য দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার ক্ষুধা।
মাত্র ৫৮ জন যোদ্ধা, ৩টি পুরনো ছাটাই করা বিমান আর মাত্র ৬৬ দিনের ট্রেনিং নিয়ে ডিমাপুরের বিষাক্ত জঙ্গল থেকে যে 'কিলো ফ্লাইট' ডানা মেলেছিল, তা কেবল শত্রুকেই ছারখার করেনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিল এক স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের আগমন।
আজকের আধুনিক, ত্রিমাত্রিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ বিমানবাহিনী যে গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে ডানা মেলে আকাশে ওড়ে, তার প্রতিটি পালকে খোদাই করা রয়েছে ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘কিলো ফ্লাইট’-এর বীরত্ব, ঘাম ও রক্তের মহাকাব্য।















