স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট খুনি এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত শেখ হাসিনা
রাজনীতিতে বয়ান বা ন্যারেটিভের একটি নিজস্ব খেলা আছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যখন কোনো নেতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পুতুল হতে অস্বীকার করেন, নিজের দেশের সার্বভৌমত্বকে কোনো পরাশক্তির কাছে বন্ধক দিতে রাজি হন না, তখন তাঁর বিরুদ্ধে খুব সুপরিকল্পিতভাবে শব্দার্থের যুদ্ধ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশীয় সুবিধাভোগী চক্র সবাই মিলে নির্দিষ্ট কিছু নেতিবাচক তকমা বা লেবেল তৈরি করে সেই নেতার গায়ে সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করে।

TruthBangla

Jul 11, 2026
রাজনীতিতে বয়ান বা ন্যারেটিভের একটি নিজস্ব খেলা আছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যখন কোনো নেতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পুতুল হতে অস্বীকার করেন, নিজের দেশের সার্বভৌমত্বকে কোনো পরাশক্তির কাছে বন্ধক দিতে রাজি হন না, তখন তাঁর বিরুদ্ধে খুব সুপরিকল্পিতভাবে শব্দার্থের যুদ্ধ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশীয় সুবিধাভোগী চক্র সবাই মিলে নির্দিষ্ট কিছু নেতিবাচক তকমা বা লেবেল তৈরি করে সেই নেতার গায়ে সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করে।
আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা এমন তিনটি সুনির্দিষ্ট পরিভাষা দেখতে পাই, যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক কিছু মহল তাঁর বিরুদ্ধে চব্বিশ ঘণ্টা ব্যবহার করে এসেছে। নাম তিনটি হলো স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট এবং খুনি।
ওপর ওপর দেখলে মনে হবে এগুলো হয়তো কোনো রাজনৈতিক ব্যর্থতার খতিয়ান বা তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু আপনি যদি একজন সচেতন, নিরপেক্ষ এবং দূরদর্শী নাগরিক হিসেবে এই প্রোপাগান্ডার দেয়ালটি ভেঙে ভেতরের সত্যটা খুঁজতে যান, তবে দেখতে পাবেন অভিযোগ তিনটি হলেও এর পেছনের বাস্তবতা আসলে একটাই। আর তা হলো শেখ হাসিনার আপসহীনতা, অকুতোভয় নেতৃত্ব এবং দেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে টিকিয়ে রাখার একক লড়াই।
আসুন, এই তিনটি লেবেলের আড়ালের প্রকৃত সত্য, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের উন্নয়নে এর বাস্তব প্রভাব নিয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
শেখ হাসিনা “স্বৈরাচার”
সমালোচকদের মুখে শেখ হাসিনার নামের পাশে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি উচ্চারণ করা হয়, তা হলো তিনি একজন ‘স্বৈরাচার’। কিন্তু কেন? তিনি কি জনগণের ভালো চাননি? নাকি তাঁর এই ‘স্বৈরাচারী’ ইমেজের পেছনে লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর চক্রান্তের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক সত্য?
চার পরাশক্তির চাপ ও অকুতোভয় নেতৃত্ব
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি মূলত বহুকেন্দ্রীক। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এবং ভারত এই চার পরাশক্তির নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে বঙ্গোপসাগর তথা এই দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করে। একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ওপর এই চার পরাশক্তির চব্বিশ ঘণ্টা কোনো না কোনো অদৃশ্য চাপ বজায় থাকত। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় চেয়েছে বাংলাদেশকে তাদের একটি ভূ-রাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো এক পক্ষের কাছে নিজের দেশকে সঁপে দেননি। তিনি চার পরাশক্তির চোখের দিকে চোখ রেখে কথা বলেছেন, যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের চোখে ‘অবাধ্যতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব বন্ধক না দেওয়ার খেসারত
পশ্চিমা শক্তিগুলো বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কিংবা আমাদের সমুদ্র বন্দরগুলোর ওপর সুক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গোপসাগরে একটি সামরিক ঘাঁটি বা স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করা, যা দিয়ে তারা চীন ও ভারতকে কাউন্টার করতে পারে। শেখ হাসিনা খুব ভালো করে জানতেন, দেশের মাটি বা বন্দর যদি কোনো বিদেশী শক্তির সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব চিরতরে বিপন্ন হবে। তিনি পরিষ্কার ভাষায় সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পশ্চিমাদের কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি না করার এই যে দৃঢ় অবস্থান, একেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘স্বৈরাচারী একগুঁয়েমি’ বলে প্রচার করা হয়েছে।
ভারসাম্যমূলক কূটনীতির মাস্টারক্লাস
শেখ হাসিনা কোনো দেশের সাথে বৈরিতা করেননি, আবার কারও গোলামিও করেননি। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই নীতির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি:
ভারতের সাথে ছিটমহল সমস্যা এবং সমুদ্র সীমানার ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিত করেছেন।
চীনের কাছ থেকে বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েছেন।
রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছেন।
আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
এই যে চার পরাশক্তিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এটা কোনো পুতুল সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। যারা নিজেদের পুতুলকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল, শেখ হাসিনা তাদের চাপের কাছে মাথা নত করেননি বলেই তাদের বয়ানে তিনি একজন “স্বৈরাচার”।
শেখ হাসিনা “ফ্যাসিস্ট”
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যে অভিযোগটি তোলা হয়, তা হলো তিনি ‘ফ্যাসিস্ট’। সমালোচকদের মতে, তিনি নাকি সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন এবং নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। কিন্তু এই ‘এজেন্ডা’র বাস্তব রূপটা আসলে কী ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল ইস্পাত-কংক্রিটের কাঠামোতে।
পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিল এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্ত
২০১১-২০১২ সালের দিকে যখন বাংলাদেশের স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা, তখন বিশ্বব্যাংক বানোয়াট ও কাল্পনিক ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ এনে এই প্রকল্পের ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ একতরফাভাবে বাতিল করে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে বিশ্বমঞ্চে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণ করা এবং তাঁর সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। পরবর্তীতে কানাডার আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে বিশ্বব্যাংকের সেই অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং ‘অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি গালগল্প’ (Speculative Gossip)।
মাথা নিচু না করার এক জেদি বাঙালি
বিশ্বব্যাংক যখন ঋণ বাতিল করল, তখন দেশের ভেতরের একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজ চিল্কার শুরু করেছিল যে "বিশ্বব্যাংক ছাড়া বাংলাদেশ কোনোদিন পদ্মা সেতু বানাতে পারবে না, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।" যেকোনো সাধারণ নেতা হলে হয়তো বিশ্বব্যাংকের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতেন কিংবা তাদের অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে মাথা নিচু করতেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন: "বাংলাদেশ কারও কাছে হাত পাতবে না। আমরা আমাদের নিজেদের টাকায়, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করব।"
বাঙালির সক্ষমতার বিশ্বজয়
৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের এই বিশাল মেগা প্রজেক্ট যখন সম্পূর্ণ বাংলাদেশের নিজস্ব টাকায় সম্পন্ন হলো, তখন পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে রইল। শেখ হাসিনা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন বাঙালি পারে, বাংলাদেশ পারে। এই যে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর প্রেসক্রিপশন অমান্য করে, তাদের আর্থিক স্বৈরাচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের দেশের টাকায় দেশকে উন্নত করা এই জেদ, এই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকেই তাঁর বিরোধীরা ‘ফ্যাসিবাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কারণ, একজন ‘নরম’ বা ‘নতজানু’ নেতার পক্ষে বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক শক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে এমন অসাধ্য সাধন করা কোনোদিন সম্ভব ছিল না।
শেখ হাসিনা “খুনি”
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা সবচেয়ে গুরুতর এবং স্পর্শকাতর লেবেলটি হলো তিনি একজন ‘খুনি’। এই শব্দটির আড়ালে মূলত তাঁর সরকারের সেই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোকে টার্গেট করা হয়, যা তিনি নিয়েছিলেন এদেশের শান্তি, শৃঙ্খলা এবং উগ্রবাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য।
নৈরাজ্য ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বাংলাদেশের কথা একটু মনে করে দেখুন। জেএমবি, বাংলা ভাই, দেশজুড়ে ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা, রমনার বটমূলে হামলা, আর ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে রক্তগঙ্গা এটাই ছিল উগ্রবাদের চারণভূমি হওয়া বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র। শেখ হাসিনা যখন ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এলেন, তিনি পরিষ্কার ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের মাটিতে কোনো জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের স্থান হবে না।
২০১৬ সালের ১লা জুলাই যখন গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হলো, আন্তর্জাতিক মহল ভেবেছিল বাংলাদেশ হয়তো এবার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও কঠোর কমান্ডে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাত্র কয়েক ঘণ্টার ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে সেই জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে দেশের আনাচে-কানাচে থাকা সমস্ত জঙ্গি নেটওয়ার্ক সুকৌশলে এবং কঠোরভাবে দমন করা হয়।
রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বনাম রাজনৈতিক সহিংসতা
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এদেশের মানুষ দেখেছে ‘রাজনীতি’র নামে কী ভয়াবহ নৈরাজ্য চালানো হয়েছিল। সাধারণ বাসে আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা, রেললাইন উপড়ে ফেলা, চলন্ত ট্রেনে পেট্রোল বোমা মারা এগুলো কি কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল? এগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা।
একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো তাঁর দেশের নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। রাষ্ট্রকে যদি টিকে থাকতে হয়, তবে তাকে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হতে হয়।
শেখ হাসিনা সেই নৈরাজ্যবাদীদের কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। তিনি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোনো আপস করেননি। যারা দেশকে একটি ব্যর্থ ও জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিল, যারা সাধারণ মানুষের ওপর পেট্রোল বোমা মেরে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল, শেখ হাসিনা তাদের হাতে দেশ তুলে দেননি। তিনি মানুষের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা আর দেশের সার্বভৌমত্বকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। আর এই কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণেই নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বয়ানে তিনি একজন “খুনি”।
প্রোপাগান্ডা বনাম বাস্তবতা
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছড়ানো এই তিনটি নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা পরিভাষার আড়ালে প্রকৃতপক্ষে কী জাতীয় অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদী সুফল লুকিয়ে ছিল, তা সহজে বোঝার জন্য নিচের ছকটি লক্ষ্য করুন:
সমালোচক ও প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডা | অভিযোগের পেছনের আসল কারণ (Root Cause) | শেখ হাসিনার নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও অর্জন | দেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব |
১. স্বৈরাচার (Dictator) | কোনো পরাশক্তির অন্ধ দাসত্ব বা অনুগত পুতুল হতে রাজি হননি। | সেন্ট মার্টিন বা কোনো বন্দর বিদেশী সামরিক ঘাঁটি করার জন্য লিজ দেননি। চোখে চোখ রেখে কূটনীতি করেছেন। | বাংলাদেশের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় আছে। |
২. ফ্যাসিস্ট (Fascist) | আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ও দেশীয় সুশীলদের প্রেসক্রিপশন অমান্য করেছেন। | বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিলের পর সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছেন। | বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণিত হয়েছে। দক্ষিণ জনপদের ২১টি জেলার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেছে। |
৩. খুনি (Killer) | রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার উগ্রবাদী ও নৈরাজ্যবাদী চক্রান্তকে কঠোর হাতে দমন করেছেন। | হোলি আর্টিজান পরবর্তী জঙ্গিবাদ নির্মূল এবং বাসে পেট্রোল বোমা মারা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি। | দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। দেশ জঙ্গি রাষ্ট্র হওয়া থেকে বেঁচেছে। |
বাংলাদেশের ইতিহাসের মেগা-স্ট্রাকচারাল রূপান্তর
শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে যারা তাঁর অর্থনৈতিক অবদানকে খাটো করতে চায়, তাদের এই আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিটি অবকাঠামোর দিকে তাকানো উচিত। তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘উন্নয়নশীল রাষ্ট্র’ (LDC Graduation) হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি এনে দিয়েছেন।
ঢাকা মেট্রো রেল (MRT Line-6): ঢাকার বুকে গণপরিবহনের চেহারা বদলে দিতে সম্পূর্ণ উড়াল পথে চালু করা হয় অত্যাধুনিক মেট্রো রেল। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ মাত্র কয়েক মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল যাতায়াত করছেন, যা দেশের কর্মঘণ্টা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে বিলিয়ন ডলারের সাশ্রয় এনে দিচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু টানেল (কর্ণফুলী নদী): চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ৩.৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল নির্মাণের মাধ্যমে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেল বাস্তবায়ন করা হয়। এটি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর এবং কক্সবাজারের অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাথে সংযোগ স্থাপনের মূল চালিকাশক্তি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: রাশিয়ার কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম একক মেগা প্রজেক্ট হিসেবে ২৪০০ মেগাওয়াটের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ঢাকা-কক্সবাজার রেললিঙ্ক: স্বাধীনতার পর প্রথমবার পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত এই ডুয়েলগেজ রেলপথ চালুর ফলে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন
একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে তার অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা কতটা মজবুত হওয়া প্রয়োজন, তা শেখ হাসিনা খুব ভালো করে জানতেন। তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং সীমান্ত এলাকাগুলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় (North-East India) বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী দল যেমন উলফা (ULFA), এনএসসিএন (NSCN) এর মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল।
বিচ্ছিন্নতাবাদ নির্মূল: শেখ হাসিনা সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের মাটিকে কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তিনি উলফাসহ সমস্ত ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দেন এবং তাদের সমস্ত ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেন।
আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা: এই একটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দশকের পর দশক ধরে চলা সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটে। এই কৌশলগত সহযোগিতার কারণেই ভারত আজীবন শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
ইতিহাস গালি নয়, কাজ মনে রাখে
মানবজাতির ইতিহাসের পাতা উল্টালে একটি চিরন্তন সত্য বারবার সামনে আসে যেসব দূরদর্শী নেতা তাঁদের নিজেদের যুগের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন, যারা নিজেদের দেশের দীর্ঘমেয়াদী মঙ্গলের জন্য কঠোর ও অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করেননি, সমসাময়িক সময়ে তাঁদের সবচেয়ে বেশি গালিগালাজ শুনতে হয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাসের কিছু উদাহরণ
আব্রাহাম লিংকন: আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার জন্য এবং রাষ্ট্রকে খণ্ডবিখণ্ড হওয়া থেকে বাঁচাতে যখন তিনি গৃহযুদ্ধ (Civil War) ঘোষণা করেছিলেন, তৎকালীন আমেরিকার অর্ধেক মানুষ তাঁকে ‘খুনি’, ‘স্বৈরাচার’ এবং ‘হত্যাকারী’ বলে গালি দিয়েছিল। কিন্তু আজ ইতিহাস তাঁকে আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্মরণ করে।
লি কুয়ান ইউ: আধুনিক সিঙ্গাপুরের নির্মাতা লি কুয়ান ইউ যখন একসময়ের ম্যালেরিয়া আক্রান্ত, দরিদ্র জেলেপড়াকে আজকের আধুনিক সিঙ্গাপুরে রূপান্তর করছিলেন, পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে ‘ফ্যাসিস্ট’ এবং ‘গণতন্ত্রের হত্যাকারী’ বলে তিরস্কার করেছিল। কারণ তিনি দেশের অভ্যন্তরে কোনো বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য বরদাশত করতেন না। আজ সিঙ্গাপুরের সমৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে পুরো বিশ্ব তাঁর প্রজ্ঞার প্রশংসা করে।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও এই ঐতিহাসিক সত্যটি একশ ভাগ প্রযোজ্য। যারা আজ সস্তা রাজনৈতিক স্বার্থে বা বিদেশী প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা জনসভায় দাঁড়িয়ে তাঁকে “স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট, খুনি” বলে গালি দিচ্ছেন, তারা আসলে বর্তমানের কুয়াশায় অন্ধ হয়ে আছেন।
তাহলে প্রশ্ন একটাই থেকে যায় যারা দিনরাত এক করে দেশ বাঁচায়, দেশ গড়ে, তারাই কি তবে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি গালি খায়? যারা পরাশক্তির সামনে মাথা নত করে না, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ায়, তারাই কি তবে সমসাময়িক স্বার্থান্বেষী মহলের চোখে সবচেয়ে বড় “অপরাধী”?
গালি বনাম কাজ: কেন এই তীব্র অপপ্রচার?
তাহলে প্রশ্ন জাগে, যে নেত্রী সমুদ্র জয় করলেন, সীমান্ত সমস্যার সমাধান করলেন, বিশ্বব্যাংককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতু বানালেন, দেশের রিজার্ভকে ১ বিলিয়ন থেকে ৪৮ বিলিয়নে নিয়ে গেলেন তাঁকে কেন দিনরাত ‘স্বৈরাচার’, ‘ফ্যাসিস্ট’ আর ‘খুনি’ বলে গালি দেওয়া হয়?
এর পেছনের কারণটি অত্যন্ত পরিষ্কার। শেখ হাসিনা কোনো বিদেশী প্রভুর ‘ইয়েস ম্যান’ ছিলেন না। তিনি যখনই দেশের স্বার্থে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখনই আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ী, কর্পোরেট মোড়ল এবং তাদের এদেশের বেতনভুক্ত সুশীল সমাজ ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে। তারা জানে, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা অসম্ভব, তাই তাদের একমাত্র অস্ত্র হলো চরিত্র হনন এবং মনস্তাত্ত্বিক অপপ্রচার।
কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম সত্যকে ধারণ করে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুকেও একই কায়দায় লজ্জিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয় তাঁরই নামে। ঠিক একইভাবে, আগামী দিনের উন্নত, আত্মমর্যাদাশীল ও আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিটি মেগা স্ট্রাকচার, প্রতিটি ফ্লাইওভার, প্রতিটি টানেল আর সমুদ্রের সীমানা চিৎকার করে সাক্ষ্য দেবে—এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রকৃত রূপকার আর কেউ নন, তিনি আমাদের দেশরত্ন শেখ হাসিনা। গালি সাময়িক, কিন্তু কাজ চিরন্তন।














