মুক্তিযুদ্ধের পর যে ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে ছিল বাংলাদেশ
দীর্ঘ নয় মাসের একটি সুপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর ও সর্বাত্মক যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের এই নতুন রাষ্ট্রটি যখন বিশ্বমানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তার পায়ের নিচে ছিল না কোনো শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি, ছিল না কার্যকর কোনো প্রশাসনিক কাঠামো, আর ছিল না স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলার সামান্যতম অস্তিত্ব। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের চালানো পোড়ামাটি নীতির (Scorched Earth Policy) ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হচ্ছে, তখন একদিকে যেমন সাড়ে সাত কোটি বাজ্ঞালির কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল বিজয়ের মহাসংগীত, ঠিক অন্যদিকে দেশের দিগন্ত জুড়ে দৃশ্যমান ছিল এক নির্মম, বিভীষিকাময় বাস্তবতার চিত্র। দীর্ঘ নয় মাসের একটি সুপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর ও সর্বাত্মক যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের এই নতুন রাষ্ট্রটি যখন বিশ্বমানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তার পায়ের নিচে ছিল না কোনো শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি, ছিল না কার্যকর কোনো প্রশাসনিক কাঠামো, আর ছিল না স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলার সামান্যতম অস্তিত্ব। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের চালানো পোড়ামাটি নীতির (Scorched Earth Policy) ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে।
একটি স্বাধীন দেশের যাত্রালগ্নে যে ধরনের ন্যূনতম অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়, তার প্রতিটি কণা এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানির চরম মূল্যের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা তাৎক্ষণিকভাবে দেশের মানুষের সামনে নিয়ে এসেছিল এক সীমাহীন চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের অবসান ঘটলেও যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত দেশটিকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কোটি শরণার্থী যারা জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা, পুনর্বাসন করা এবং দেশের অভ্যন্তরে গৃহহীন হয়ে পড়া লাখো মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া ছিল সদ্য স্বাধীন সরকারের প্রধানতম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ। প্রশাসন থেকে শুরু করে অর্থনীতি সবকিছুই শূন্য থেকে শুরু করার এই মহাকাব্যিক লড়াই ছিল এক নতুন যুদ্ধ, যা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির যুদ্ধ।
কৃষি খাতের বিপর্যয় ও সোনালী আঁশের মহাসংকট
স্বাধীনতার ঠিক পরপরই বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের (GDP) প্রায় পঞ্চান্ন শতাংশেরও বেশি আসত কৃষি খাত থেকে। অর্থাৎ, এ দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি আবর্তিত হতো উর্বর পলিমাটি আর ফসলের ক্ষেতকে কেন্দ্র করে। কিন্তু নয় মাসের যুদ্ধ এই কৃষি খাতের মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছিল। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী খুব ভালো করেই জানতো যে, এ দেশের কৃষিকে ধ্বংস করতে পারলে বাঙালি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। সেই উদ্দেশ্য থেকেই তারা দেশের মাইলের পর মাইল উর্বর কৃষিজমিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল, জ্বালিয়ে দিয়েছিল কৃষকের ধানের গোলা, এবং ধ্বংস করেছিল চাষাবাদের প্রাথমিক সব উপকরণ।
যুদ্ধোত্তর সময়ে বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত এক জরিপে উঠে আসে অত্যন্ত ভয়াবহ তথ্য। যুদ্ধকালীন সময়ে চাষাবাদের প্রধান চালিকাশক্তি তথা গবাদি পশু ব্যাপকভাবে জবাই ও ধ্বংস করা হয়েছিল। ফলে লাঙল টানার মতো পশুর তীব্র সংকট দেখা দেয়। এছাড়া উন্নত বীজ, সার এবং সেচ দেওয়ার মতো যান্ত্রিক পাম্পগুলো সম্পূর্ণ বিনষ্ট বা লুটপাট হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে, কৃষি খাতে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন টাকা, যা তৎকালীন মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশের সমতুল্য। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছিল, যার ফলে দেশজুড়ে এক তীব্র খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস দেখা দেয়। কৃষির এই বিপর্যয় কেবল তৎকালীন উৎপাদনকেই ব্যাহত করেনি, বরং ভবিষ্যৎ চাষাবাদের যে ধারাবাহিকতা, তাকেও সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছিল। বীজধানের অভাব এবং চাষের পশুর সংকটের কারণে স্বাধীনতার প্রথম মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষির পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার তথা তৎকালীন 'সোনালী আঁশ' পাটের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ প্রায় আশি শতাংশই আসত পাট এবং পাটজাত দ্রব্য থেকে, যার বার্ষিক মূল্য ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানি বাহিনী পাটের গুদামগুলোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে বন্দরে মজুত রাখা এবং মিলগুলোতে থাকা বিপুল পরিমাণ তৈরি পাটপণ্য ছাই হয়ে যায়। দেশের প্রধান প্রধান পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি বিকল করে দেওয়া হয়েছিল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অকেজো থাকায় কারখানাগুলো চালু করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের সামনে পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে আগের গৌরব ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর অবস্থান ফিরিয়ে আনা এক অতিমানবীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন শূন্য, তখন এই প্রধান রপ্তানি খাতের পঙ্গুত্ব দেশের অর্থনীতিকে সচল করার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে দেয়।
চা শিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অবরুদ্ধ দুয়ার
পাটের পরেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অর্থকরী ফসলটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখত, সেটি হলো চা। সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ঢাল জুড়ে গড়ে ওঠা চা বাগানগুলো ছিল লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি বড় উৎস। কিন্তু যুদ্ধকালীন নয় মাসে এই বাগানগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চা বাগানের ম্যানেজার ও দক্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়, এবং শ্রমিকদের উচ্ছেদ করা হয়। ফলস্বরূপ, ১৯৭০-৭২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে চায়ের উৎপাদন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গিয়ে মাত্র ছাব্বিশ মিলিয়ন পাউন্ডে নেমে আসে।
উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের যে সুনির্দিষ্ট বাজার ছিল, তাও সংকুচিত হয়ে পড়ে। যুদ্ধোত্তর বিশৃঙ্খলার কারণে বিদেশের ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সাথে অভ্যন্তরীণ পরিবহণ ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরগুলোর অকার্যকারিতা চা শিল্পের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। উৎপাদিত চা বন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কোনো নিরাপদ ও সস্তা মাধ্যম অবশিষ্ট ছিল না, এবং বন্দরে পৌঁছালেও তা জাহাজে করে বিদেশে পাঠানোর কোনো উপায় ছিল না। ফলে গুদামেই নষ্ট হতে থাকে মূল্যবান চা পাতা, যা সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে বড় ধরনের ধাক্কা সৃষ্টি করে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার পঙ্গুত্ব: ভেঙে পড়া রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক
মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গেরিলা যুদ্ধ ছিল আমাদের বিজয়ের অন্যতম প্রধান শক্তি। পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল ও রসদ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। নদীমাতৃক এই দেশের এক প্রান্তের সাথে অন্য প্রান্তের যোগাযোগের মূল মাধ্যম ছিল ছোট-বড় অসংখ্য সেতু ও কালভার্ট। নয় মাসের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের মাইন হামলা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পশ্চাদপসরণের সময় চালানো ধ্বংসযজ্ঞের কারণে দেশের প্রায় তিনশত সেতু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
এর ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখা যায়, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ যেন অসংখ্য বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মালামাল পরিবহণ, ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো বা সাধারণ মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার এই পঙ্গুত্ব দূর করা সরকারের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রীজ এবং মেঘনা ব্রীজের মতো বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ধ্বংসাবশেষ। হার্ডিঞ্জ ব্রীজের স্প্যান ভেঙে নদীতে পড়ে থাকায় উত্তরবঙ্গের সাথে সারা দেশের রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল।
এই প্রলয়ঙ্করী ক্ষতির মধ্যেও বাংলাদেশি প্রকৌশলী এবং রেলওয়ে শ্রমিকরা অনন্য দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যুদ্ধবিধ্বস্ত ২৪৭টি রেল ব্রীজের মধ্যে ১৯৪টিকে মেরামত করে স্বাধীন দেশের প্রথম মাসেই, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৩রা জানুয়ারির মধ্যেই ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন। এর ফলে সীমিত আকারে রেল যোগাযোগ শুরু করা সম্ভব হলেও, হার্ডিঞ্জ ব্রীজের মতো বড় এবং জটিল ব্রীজগুলো পুনর্নির্মাণ ও সম্পূর্ণ সচল করতে আরও প্রায় seis (ছয়) মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল। এই যোগাযোগ বিপর্যয়ের কারণে বিদেশ থেকে আসা জরুরি খাদ্যশস্য ও চিকিৎসা সামগ্রী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে খাদ্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে ভূমিকা রাখে।
ভূরাজনৈতিক কূটনীতি, বিশ্ব স্বীকৃতি ও মিত্রদের ভূমিকা
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক লক্ষ্য ছিল দেশের ভেতরের খাদ্যসামগ্রীর চরম অভাব দূর করা এবং যেকোনো মূল্যে একটি আসন্ন বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ ঠেকানো। যুদ্ধের কারণে দেশে তখন খাদ্যশস্যের ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল প্রায় চল্লিশ লক্ষ টন। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য বা উৎপাদন ক্ষমতা দেশের নিজের ছিল না। তাই সদ্য স্বাধীন এই দেশকে টিকিয়ে রাখতে এবং মানুষের মুখে অন্ন জোগাতে প্রয়োজন ছিল ব্যাপক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও মানবিক সাহায্য। আর সেই সাহায্য নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি অত্যন্ত সুচারু, দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি।
নভজাতক বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্র নীতির মূল ভিত্তি ঘোষণা করে: "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।" বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM)-এর নীতি আদর্শ গ্রহণ করে, বিশ্বমঞ্চে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘোষণা দেয় এবং বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করে। বঙ্গবন্ধুর এই বিশ্বজনীন ও প্রগতিশীল কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বরফ গলতে শুরু করে। বিশ্বের সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের এই আন্তরিক আগ্রহের কারণে ১৯৭২ সালের ১লা জুনের মধ্যেই বিশ্বের প্রায় ৭৫টি দেশ বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। বাহাত্তরের শেষ নাগাদ এই স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৪টিতে, যা ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একটি বিশাল কূটনৈতিক বিজয়।
স্বাধীনতার একদম শুরু থেকেই ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুটি দেশ বাংলাদেশের পাশে অত্যন্ত শক্তভাবে দাঁড়িয়েছিল একটি হলো প্রতিবেশী ভারত এবং অন্যটি পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন। কূটনৈতিক মহলে এই সহায়তার পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত অনেক সমীকরণ এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকলেও, তৎকালীন শিশু বাংলাদেশের বেঁচে থাকার জন্য এবং মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর জন্য এই পদক্ষেপগুলো ছিল অপরিহার্য। ১৯৭২ সালের ৩রা মার্চ মস্কোতে বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠনে গতি প্রদান করে।
সোভিয়েত ও ভারতের বিশেষ সহায়তায় যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি যেভাবে মোকাবিলা করা হয়:
চট্টগ্রাম বন্দর সচলকরণ: পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশপথে অসংখ্য সামুদ্রিক মাইন পুঁতে রেখেছিল এবং বহু জাহাজ ডুবিয়ে রেখেছিল। সোভিয়েত নৌবাহিনীর একটি বিশেষ দল এসে জীবন বাজি রেখে সেই ভাসমান মাইন অপসারণ করে এবং অবরুদ্ধ নৌপথ মুক্ত করে।
নৌপথের নিরাপত্তা: ভারতীয় নৌবাহিনী দেশের অন্যান্য নদীপথ ও সমুদ্র উপকূলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মাইন সরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অবকাঠামো উন্নয়ন: সোভিয়েতের সরাসরি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় ঘোড়াশালে ১১০ মেগাওয়াটের তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুনর্নির্মাণের কাজ এবং সারাদেশে ধ্বংসপ্রাপ্ত আটটি রেডিও স্টেশন পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এই ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রচার ও বন্ধুত্বের ফলে ১৯৭২ সালের শুরুর দিকেই প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১২ মিলিয়ন ডলার। ১৯৭২-৭৩ পুরো অর্থবছরের হিসেবে এই বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৮৮৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। খাদ্য সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা হাত বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে ১৯৭২ সালে বিদেশ থেকে প্রায় তিন মিলিয়ন টন ধান ও গম ত্রাণ হিসেবে দেশে আসে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট: অস্ত্রের ঝনঝনানি ও আইন-শৃঙ্খলা
বাহ্যিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য আসলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং জটিল আকার ধারণ করেছিল দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় কেবল নিয়মিত সামরিক বাহিনীই যুদ্ধ করেনি, বরং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছিল বিশাল এক সশস্ত্র গণবাহিনী বা guerrilla বাহিনী। এই গণবাহিনীতে শামিল হয়েছিলেন সাধারণ গ্রামীণ কৃষক, মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী, দিনমজুর, এবং স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো তরুণ ছাত্র। সরকারি ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, এই নিয়মিত ও অনিয়মিত গণবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪,০০০। এর বাইরে সরাসরি রাজনৈতিক নির্দেশনায় গঠিত হয়েছিল 'মুজিববাহিনী', যাদের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই বিশাল সংখ্যক মানুষের হাতে রয়ে যায় আধুনিক ও মারাত্মক সব আগ্নেয়াস্ত্র। সবারই ছিল দীর্ঘ নয় মাস ধরে সরাসরি সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করার বাস্তব ট্রেনিং। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিল ঘেঁটে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। এর বাইরেও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও পশ্চাদপসরণের সময় তাদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন উপদল কর্তৃক লুটকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের পরিমাণও কম ছিল না। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় ছিল, মূল ধারার মুক্তিযোদ্ধাদের বাইরেও দখলদারদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং উগ্রপন্থী বিহারীদের একটা বড় অংশের কাছেও বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ গোপন অবস্থায় রয়ে গিয়েছিল। এই বিপুল অস্ত্রের উপস্থিতি সদ্য স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক ও ভঙ্গুর করে তোলে।
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার পর, তাঁর প্রথম ও প্রধান কাজগুলোর একটি ছিল এই বেসামরিক অস্ত্র উদ্ধার করা। তাঁর আবেগঘন ও দৃঢ় আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অস্ত্র সরকারের কাছে সমর্পণ করতে শুরু করেন। কিন্তু এই অস্ত্র সমর্পণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও চরম জটিলতা দেখা দেয় অতি-বামপন্থী উগ্র রাজনৈতিক দল এবং পরাজিত শক্তির অবশিষ্ট অংশকে নিয়ে। অতি-বামপন্থীদের একটি বড় অংশ তৎকালীন বৈশ্বিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাত্ত্বিক প্রভাবে বিশ্বাস করত যে, বাংলাদেশে অর্জিত এই স্বাধীনতা প্রকৃত বিপ্লব নয়, এটি একটি 'অসম্পূর্ণ বিপ্লব'। এই ভ্রান্ত ও উগ্র ধারণা থেকে তারা সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গোপন আস্তানা গড়ে তুলে সশস্ত্র সংগ্রাম বা তথাকথিত সর্বহারা বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
তৎকালীন ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক 'মর্নিং নিউজ' (Morning News)-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ মাসেই কেবল রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ছয় হাজারের বেশি গুরুতর অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল। দেশজুড়ে সশস্ত্র হামলা, ডাকাতি, থানা লুট এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, তরুণদের সামনে কোনো চাওয়া-পাওয়ার মিল না হওয়া, তীব্র খাদ্যের অভাব, এবং কোনো ধরনের কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ না থাকায় অনেক যুদ্ধফেরত যুবক ও সাধারণ মানুষ অপরাধের অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ে। একই সাথে, নয় মাসের ভয়াবহ যুদ্ধ, স্বজন হারানো এবং পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, যার কোনো সঠিক হিসেব বা মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার ব্যবস্থা সেই সময়ে কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ করার মতো সুযোগ সরকারের ছিল না।
শরণার্থী পুনর্বাসন ও বিহারী জনগোষ্ঠীর অমীমাংসিত সমীকরণ
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আরেকটি বিশাল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ছিল দেশে বসবাসকারী প্রায় পাঁচ লাখ অবাঙালি বা বিহারী জনগোষ্ঠী। মূলত ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারত বিভাগের পর ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং এর আশপাশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পূর্ব বাংলায় চলে আসে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্প এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশায় বেশ ভালো দখল তৈরি করে নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ tenderness চলাকালীন সময়ে এই বিহারী জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সরাসরি সহযোগী হিসেবে সাধারণ বাঙালিদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ঘরবাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে।
ফলে ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথেই এক অদ্ভুত ও চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যে সব বাঙালি পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছেন, যাদের বাড়িঘর বিহারীদের সহায়তায় জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিশোধপরায়ণতা দেখা দেয়। অন্যদিকে বিহারীদের কাছেও ছিল আধুনিক অস্ত্র, ফলে দুই পক্ষের মধ্যেই এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়। স্বাধীনতার এই তীব্র আবেগ এবং স্বজন হারানোর গভীর বেদনার মাঝে উভয় পক্ষের টিকে থাকার লড়াই এক জটিল সামাজিক সংকটে রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে শুরুতে কোনো বড় ধরনের গণহত্যা বা রক্তগঙ্গা এড়াতে ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে বিহারী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কঠোর কর্ডন বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার এই বিহারী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে দেশের বিভিন্ন স্থানে (যেমন ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর) সুনির্দিষ্ট ক্যাম্প বা অবরুদ্ধ অবস্থায় পুনর্বাসন করে।
এই বিহারী জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার (Repatriation) তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে চরম গড়িমসি শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলস্বরূপ, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসন, খাদ্য ও মানবিক অধিকারের সমস্যাটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা হিসেবে চেপে বসে, যার পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সমাধান আজ অবধি পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।
কালোবাজারি, চোরাচালান ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব
১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরের দিকে এসে বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থা সরকারের বিভিন্ন উদ্দীপনা এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ধীরে ধীরে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু এই উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল দেশের সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে পারেনি মূলত এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি ও আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের করাল গ্রাসের কারণে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা এবং দীর্ঘ সীমান্ত পাহারার জন্য পর্যাপ্ত সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিডিআর) গড়ে না ওঠার পূর্ণ সুযোগ নেয় এই চোরাকারবারিরা।
তৎকালীন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকার বস্তুনিষ্ঠ খবর থেকে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ টন সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে পাচার হয়ে যায়। এ দেশের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে চোরাকারবারিরা ওপারে চড়া দামে চাল বিক্রি করতে থাকে। শুধু চালই নয়, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি পাটের মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশই অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে চলে যায়। এর ফলে রাষ্ট্র তার কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি আয় ও শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়। এই কৃত্রিম সংকটের কারণে দেশের অভ্যন্তরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। বাজারে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, যার ফলে কাগজের টাকার মান দ্রুত কমতে থাকে। এর ওপর আরেকটি অসাধু ও দেশদ্রোহী চক্র আন্তর্জাতিক চক্রের সহায়তায় বাজারে জাল নোটের প্রচলন শুরু করে, যা দেশের তরুণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও মুদ্রা বাজারকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তোলে। সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এক অসহনীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
১৯৭৪ সালের মহাদুর্যোগ: বন্যা ও দুর্ভিক্ষের মানবিক বিপর্যয়
নতুন এই দেশ যখন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানামুখী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার ওপর আঘাত হানে প্রকৃতির চরম রুদ্ররূপ। ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণে বাংলাদেশ বরাবরই দুর্যোগপ্রবণ, কিন্তু ১৯৭৪ সালের বর্ষা মৌসুমে যে প্রলয়ঙ্করী বন্যা দেখা দেয়, তা দেশের ইতিহাসে সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। দেশের জটিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যখন নানামুখী মেরুকরণ ও ভাঙাগড়ার খেলা চলছে, ঠিক তখনই দেশের প্রধান প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় ১৭ থেকে ১৯টি জেলা সম্পূর্ণ প্লাবিত করে দেয়।
এই প্রলয়ঙ্করী বন্যায় দেশের লাখ লাখ হেক্টর ফসলি জমি, বিশেষ করে আমন ধানের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যায়। যুদ্ধোত্তর সময়ে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট এবং সেতু পুনর্নির্মাণের কাজ যেখানে যতটুকু হয়েছিল, তা এই বন্যার পানির তোড়ে আবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি লজিস্টিকস বা ত্রাণ পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফসলহানি এবং খাদ্য সরবরাহের চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ফলে দেশজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তথা দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়।
সরকারি নথিপত্র এবং তথ্য অনুসারেই, ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসের এই দুর্ভিক্ষে অনাহারে ও অপুষ্টিতে ভুগে প্রায় সাড়ে সাতাশ হাজার মানুষ মারা যান। তবে তৎকালীন বিভিন্ন স্বাধীন গবেষক এবং বেসরকারি হিসেবে এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আরও অনেক বেশি, যা প্রায় এক লাখের ঘর ছুঁয়েছিল। ১৯৭০ সালের স্বাভাবিক সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের শেষভাগে এসে চাল, ডাল, লবণসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। লঙ্গরখানাগুলোতে হাজার হাজার বুভুক্ষু মানুষের লাইন, কঙ্কালসার শিশুর কান্নায় দেশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের নামী সংবাদমাধ্যম যেমন 'নিউ ইয়র্ক টাইমস' (The New York Times)-এর পাতায় পাতায় বাংলাদেশের এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের ছবি ও খবর প্রধান শিরোনাম হিসেবে ছাপা হতে থাকে, যা বিশ্ববাসীকে নাড়া দেয়।
যুদ্ধোত্তর এই সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশ মূলত একটি জীবন্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করেছে। একদিকে পাকিস্তানি হানাদারদের রেখে যাওয়া অবকাঠামোগত শূন্যতা, লাখ লাখ কর্মহীন ও অস্ত্রধারী যুবক, মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া হাজারো মানুষ; অন্যদিকে স্বজন হারানো কোটি মানুষের বুকফাটা হাহাকার। এই সংকটের সুযোগ নিয়ে একদল সুযোগসন্ধানী, মজুদদার ও কালোবাজারি মানুষের লুটতরাজের চেষ্টা পরিস্থিতিকে নরকতুল্য করে তুলেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি সূত্র মতেই, ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৪ সালের মে মাসের মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত সময়েই দেশে ৯,৫৪০টি হত্যাকাণ্ড এবং ১২,২৪৪টি মারাত্মক ডাকাতি ও রাহাজানির ঘটনা ঘটেছিল, যা তৎকালীন সামাজিক অস্থিরতার এক জীবন্ত দলিল।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্গঠনের পরিসংখ্যানগত চিত্র
বিষয় / খাতের নাম | ক্ষয়ক্ষতি ও সংকটের বিবরণ | পরিসংখ্যান / আর্থিক মূল্য | পুনর্গঠন ও গৃহীত পদক্ষেপ |
কৃষি খাত (Agriculture) | চাষের পশু নিধন, বীজ ধ্বংস, উর্বরা জমিতে অগ্নিসংযোগ ও পোড়ামাটি নীতি। | ৪.৩ বিলিয়ন টাকা (জিডিপির ৩০%) | বিদেশ থেকে বীজ ও সার আমদানি, গবাদি পশু সরবরাহ ও সরকারি ভতুর্কি। |
পাট শিল্প (Jute Sector) | পাটের গুদাম পুড়িয়ে দেওয়া, পাটকলের যন্ত্রপাতি বিকল, বিদ্যুৎ সংকট। | রপ্তানি আয়ের ৮০% ক্ষতি ($৩০০-৩৫০ মিলিয়ন) | রাষ্ট্রীয়করণ ও রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে মিলগুলো মেরামত করে পুনরায় চালু করা। |
চা শিল্প (Tea Industry) | বাগান পরিচর্যা বন্ধ, জনবল সংকট, আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হওয়া। | উৎপাদন ১/৩ কমে ২৬ মিলিয়ন পাউন্ডে হ্রাস | বিকল্প বিপণন ও অভ্যন্তরীণ নদীপথে পরিবহণের ব্যবস্থা সচল করা। |
যোগাযোগ অবকাঠামো | রেল ও সড়ক সেতু ধ্বংস, সড়ক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া। | ৩০০+ সেতু ও ২৪৭টি রেল ব্রীজ ক্ষতিগ্রস্ত | জানুয়ারি '৭২-এর মধ্যে ১৯৪টি রেল ব্রীজ মেরামত, হার্ডিঞ্জ ব্রীজ পুনর্নির্মাণ। |
আন্তর্জাতিক কূটনীতি | শূন্য রিজার্ভ ও নতুন দেশ হিসেবে বিশ্বের স্বীকৃতি আদায়ের চ্যালেঞ্জ। | ৭৫টি দেশ (জুন '৭২) ও ৯৪টি দেশ (ডিসেম্বর '৭২) | জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ, বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন। |
নৌপথ ও বন্দর সচলকরণ | চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন ও ডুবন্ত জাহাজ। | প্রধান সমুদ্র বাণিজ্য পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ | সোভিয়েত নৌবাহিনীর বিশেষ টাস্কফোর্স কর্তৃক মাইন ও ডুবন্ত জাহাজ অপসারণ। |
বৈদেশিক সাহায্য | খাদ্য সংকট দূরীকরণ ও জরুরি ত্রাণ সামগ্রী জোগাড় করার চাপ। | প্রাথমিক সাহায্য $৬১২ মিলিয়ন (মোট $৮৮৬ মিলিয়ন) | ৩ মিলিয়ন টন ধান-গম আমদানি ও দেশজুড়ে লঙ্গরখানা স্থাপন। |
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা | বেসামরিক মানুষের হাতে অস্ত্রের আধিক্য, অতি-বামপন্থী উগ্রবাদ। | ১,৫০,০০০+ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৪,০০০ গণবাহিনী | বঙ্গবন্ধুর ডাকে অস্ত্র সমর্পণ ক্যাম্পেইন, জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন ও চিরুনি অভিযান। |
সামাজিক সংকট (বিহারী) | অবাঙালি বিহারী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও পাকিস্তানের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান। | ৫ লাখ বিহারী শরণার্থী ক্যাম্পে অবরুদ্ধ | ভারতীয় ও বাংলাদেশি বাহিনী কর্তৃক ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা। |
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও বন্যা | ১৭-১৯টি জেলা প্লাবিত, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, কৃত্রিম খাদ্য সংকট ও চোরাচালান। | সরকারি মতে ২৭,৫০০ মৃত (বেসরকারি মতে ১ লক্ষ+) | রেশনিং ব্যবস্থার জোরদারকরণ, আন্তর্জাতিক ত্রাণের আবেদন ও সীমান্ত পাহারা কড়াকড়ি। |
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও প্রশাসনিক শূন্যতা
১৪ ডিসেম্বরসহ পুরো যুদ্ধজুড়ে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও বিজ্ঞানীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার ফলে প্রশাসন ও দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট তৈরি হয়।
স্বাধীনতার পর প্রবাসী সরকারের সাথে কাজ করা আমলা এবং দেশে অবরুদ্ধ থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরণের সমন্বয়হীনতা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যা প্রাথমিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা, অস্ত্র উদ্ধার ও যুদ্ধাপরাধী সংকট
যুদ্ধ শেষে সারা দেশে অসংখ্য সাধারণ মানুষের হাতে আধুনিক অস্ত্র থেকে গিয়েছিল। এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ছিল নতুন সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি (বিহারী) জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় রাজাকার-আলবদরদের জানমালের নিরাপত্তা ও তাদের বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টিও ছিল বেশ জটিল।
ধ্বংসের ছাই থেকে ফিনিক্সের উত্থান
জাতীয় ইতিহাসের সেই অত্যন্ত বেদনাবিধুর, সংকটময় এবং অশ্রুসিক্ত সময়কে আমরা আজ বহু পেছনে ফেলে এসেছি। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ সালের সেই চরম অন্ধকার সময়টি ছিল মূলত বাংলাদেশের অগ্নিপরীক্ষা। একটি রাষ্ট্রকে জন্মের শুরুতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির যে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাষ্ট্রই তা সহ্য করে টিকে থাকতে পেরেছে। পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকরা এবং পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলাদেশ হবে একটি 'তলহীন ঝুড়ি' (Bottomless Basket), যা কখনোই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু তারা বাঙালি জাতির অদম্য ইচ্ছা, আত্মত্যাগ এবং টিকে থাকার লড়াকু মানসিকতাকে মূল্যায়ন করতে ভুল করেছিলেন।
আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যে দেশের সমুদ্র বন্দর মাইন দিয়ে অবরুদ্ধ ছিল, আজ সেই দেশের তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে রাজত্ব করছে। যে দেশ খাদ্যের জন্য বিদেশের ত্রাণের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল, আজ সেই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের সেই রিক্ত বালুচরে দাঁড়িয়ে এ দেশের মানুষ যে কঠোর পরিশ্রম আর রক্ত জল করা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তারই ফসল আজকের এই উদীয়মান বাংলাদেশ। একদম কবির কবিতার অমর বাণীর মতো করেই, সেই প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসস্তূপের ছাই থেকেই আমরা ফুটিয়েছি অপরূপ লাল-সবুজের ফুল:
“শহীদের পূণ্য রক্তে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ পুষ্পিত সৌরভ। বাংলার নগর, বন্দর গঞ্জ, বাষট্টি হাজার গ্রাম ধ্বংসস্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল হয়ে ফোটে। প্রাণময় মহৎ কবিতা আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে।”
ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে, ধ্বংসের গভীরতা যত বড়ই হোক না কেন, যদি জাতির বুকে থাকে একতা আর অদম্য দেশপ্রেম, তবে যেকোনো অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে আলোর দিগন্তে পৌঁছানো সম্ভব। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সেই কঠিন দিনগুলোর শিক্ষা আজ আমাদের সামনের দিনগুলোতে আরও উন্নত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন একটি 'সোনার বাংলা' গড়ার প্রেরণা জোগায়।















