মুক্তিযুদ্ধে সেনা কর্মকর্তাদের দুইটা ভাগ ও রাষ্ট্রের ট্র্যাজেডি
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও, বিজয়ের পরপরই রাষ্ট্রকে দুটি গভীর ঐতিহাসিক ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয়েছে। এর একটি হলো পাকিস্তানপন্থী ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, এবং দ্বিতীয়টি ছিল নবগঠিত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন। একাত্তরে একই সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসাররা দেশপ্রেমের ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।

TruthBangla
Oct 20, 2025
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও, বিজয়ের পরপরই রাষ্ট্রকে দুটি গভীর ঐতিহাসিক ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয়েছে। এর একটি হলো পাকিস্তানপন্থী ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, এবং দ্বিতীয়টি ছিল নবগঠিত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন। একাত্তরে একই সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসাররা দেশপ্রেমের ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদল অস্ত্র ধরেছিল মুক্তির জন্য, আরেকদল পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে নীরব বা সরব সমর্থন জুগিয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই দুই বিপরীত মেরুর সামরিক কর্মকর্তাদের এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার মধ্য দিয়েই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জন্ম নেয় এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক ট্র্যাজেডির।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই রাষ্ট্রের কাঁধে চেপে বসা দুই বোঝা
একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য সেনাবাহিনী হলো সার্বভৌমত্বের রক্ষাকর্তা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই সেনাবাহিনীতে এক অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্থায়ী হয়ে গেল। এই বিভাজন ছিল নিছক পদমর্যাদার নয়, বরং ছিল আদর্শিক এবং বিশ্বাসগত - মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বনাম পাকিস্তানপন্থী আনুগত্য।
ঐতিহাসিক পাপ: বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুটি বড় 'কলঙ্ক ও পাপ' এই নতুন জাতিসত্তার ওপর ছায়া ফেলেছিল: এক, ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামী এবং দুই, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আদর্শিক বিভাজন।
বিভাজনের সূত্রপাত: একদিকে ছিল মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন; অন্যদিকে ছিল পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা যারা যুদ্ধের পুরো সময়টা পাকিস্তানে নিরাপদে অবস্থান করেছিলেন। এই দুই পক্ষের সহাবস্থানই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সামরিক শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সেনাবাহিনীর জন্মগত বিভাজন – দুই মেরুর অবস্থান
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের অবস্থান ছিল দুই বিপরীত দিকে, যা স্বাধীনতার পরে এক জটিল কাঠামোর জন্ম দেয়।
মুক্তির সপক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারা
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই বহু বাঙালি সেনা কর্মকর্তা, সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়ে, দেশ ও জাতিকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শফিউল্লাহসহ আরও বহু দেশপ্রেমিক সামরিক ব্যক্তিত্ব জীবন বাজি রেখে সেক্টর ও ব্রিগেডগুলোর নেতৃত্ব দেন। এঁদের ত্যাগ ও বীরত্বই সেনাবাহিনীর ভিত্তি।
পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থাকা কর্মকর্তারা
বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের আরেক অংশ দেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থেকে সামরিক বাহিনীতেই বহাল ছিল। যুদ্ধের পুরো সময়টাই এসব বাঙালি সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানে অবস্থান করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের পর বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালি সামরিক অফিসারদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সদ্য স্বাধীন দেশে এদের দ্রুত বাহিনীতে পদায়ন করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত ছিল একদিকে যেমন মানবিক, তেমনি অন্যদিকে রাষ্ট্রের জন্য ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আদর্শগতভাবে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণকারী এই কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মানসিক ও আদর্শিক দূরত্ব ছিল দুর্লঙ্ঘনীয়।
১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি – পাকিস্তানপন্থী ষড়যন্ত্রের প্রথম আঘাত
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তির উপর পাকিস্তানপন্থী সামরিক গোষ্ঠীর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় আঘাত। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ছিল না, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
সামরিক অভ্যুত্থান ও পাকিস্তান ফেরত কুশীলব
ষড়যন্ত্রের মূল: সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের এই আদর্শিক সংঘাতই ১৫ আগস্টের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মূল অনুঘটক ছিল। এই অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অনেকেই ছিলেন সেই সামরিক কর্মকর্তারা, যাদের মনে মুক্তিযুদ্ধ বা বঙ্গবন্ধুর প্রতি কোনো গভীর শ্রদ্ধা ছিল না। এরা ছিল মূলত পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তাদের একটি অংশ, যারা আদর্শগতভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর আঘাত: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে তারা সদ্য স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকেই আঘাত করল। এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, সামরিক অভ্যুত্থানের আড়ালে পাকিস্তানপন্থী ও সামরিক শক্তি আবার রাষ্ট্রের মূল স্রোতে ফিরে আসার পথ খুঁজছিল।
আদর্শিক শূন্যতা ও জামায়াতের সংযোগ
রাজনৈতিক সুযোগ: এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, এর সঙ্গে বিহারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের ষড়যন্ত্রও জড়িত ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি আদর্শিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়।
রাষ্ট্রের আদর্শিক পরিবর্তন: এই শূন্যতা পাকিস্তানপন্থী সামরিক ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এর মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের সময় কোণঠাসা হয়ে পড়া জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
৭ নভেম্বরের পাল্টা আঘাত – মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্ব নির্মূল
১৫ আগস্টের ঘটনার পর ক্ষমতার পালাবদল কেবল শুরু হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতাতেই ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একাধিক পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীতে থাকা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নির্মূল করা।
টার্গেট কিলিংস ও মুক্তিযোদ্ধা নিধন
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী বিশৃঙ্খলায় সেনাবাহিনীতে থাকা অনেক প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্বকে সামরিক বাহিনী থেকে চিরতরে নির্মূল করার এক সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। যারা একাত্তরে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তারাই এবার অভ্যন্তরীণ শত্রুদের হাতে প্রাণ দিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পাকিস্তানপন্থী আদর্শ কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
কর্নেল তাহেরের ট্র্যাজেডি
একই ঘটনার জের ধরে পরবর্তীতে কর্নেল তাহের সহ অন্য অনেক সামরিক কর্মকর্তাকে বিচারের নামে হত্যা করা হয়। এই বিচার ছিল তড়িঘড়ি করা এবং বিতর্কিত। এর ফলে, একাত্তরে জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের একটি বড় অংশকে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা সামরিক বাহিনীর আদর্শিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
জিয়াউর রহমানের উত্থান ও ক্ষমতার কুক্ষিগতকরণ
৭ নভেম্বরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। তবে তাঁর উত্থান এবং ক্ষমতা ধরে রাখার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত।
চতুর চাল ও সামরিক সুবিধাবাদ
জিয়াউর রহমান নিজে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও, ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে তিনি দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের সমর্থন ও সহযোগিতা গ্রহণ করেন।
তাঁর এই 'চতুর চালের' ফলে মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানপন্থী এই দুই শিবিরই সাময়িকভাবে ক্ষমতার ভাগ পেতে শুরু করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামরিক নেতৃত্বই সুবিধাভোগী হন। এই ক্ষমতার খেলা প্রমাণ করে, সদ্য স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী তার আদর্শিক চেতনা থেকে সরে গিয়ে দ্রুতই ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।
বিচার ও হত্যাযজ্ঞের স্থায়ী ক্ষত
ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে জিয়াউর রহমান সামরিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার সেনা কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের বিচারের নামে হত্যা করেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার উপর এক স্থায়ী ক্ষত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিচার ও হত্যাযজ্ঞের শিকারদের বেশিরভাগই ছিলেন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। এই নৃশংসতা প্রমাণ করে, সামরিক বাহিনীতে আদর্শিক সংঘাতের ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
আদর্শের পতন – আজমীর মতো দেশ বিরোধীদের সন্তানেরা
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের এই আদর্শিক স্খলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণ হলো কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও দেশদ্রোহীদের সন্তানদের সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া।
গোলাম আযমের পুত্র এবং সামরিক বাহিনী
গোলাম আযম ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশের সৃষ্টিতে কেবল বিরোধিতা করেননি, বরং কুখ্যাত রাজাকার বাহিনী ও শান্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে বাঙালি নিধনে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তিনি ৮০-এর দশক পর্যন্ত এই দেশকে আবারও পাকিস্তানের অংশ করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সব ধরনের অপপ্রচার ও অসহযোগিতায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ক্ষমা ও পদায়ন: সেই গোলাম আযমের পুত্র আজম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হয়েছেন, এমনকি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পর্যন্ত পদোন্নতি লাভ করেছেন। এটি জাতির জন্য এক বিরাট অনাচার এবং সামরিক বাহিনীর নৈতিকতার ওপর এক চরম আঘাত।
মূল্যবোধের পতন: দেশ সৃষ্টির ঘোর বিরোধিতাকারীর সন্তান যখন দেশের সার্বভৌমত্বের রক্ষকের ভূমিকায় আসীন হয়, তখন এটি প্রমাণ করে যে, আদর্শিক মূল্যবোধের দিক থেকে সেনাবাহিনী কতটা দূষিত ও স্খলিত হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা তরুণ প্রজন্মের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
আজকের সেনাবাহিনী – জাতীয়তাবাদের দুর্বল ভিত্তি
এই আদর্শিক দূষণের কারণে আজকের সেনাবাহিনীতে অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয়তাবাদের সেই তেজ বা আদর্শিক দৃঢ়তা দেখা যায় না, যা একাত্তরের রণাঙ্গনে ছিল। সেনাবাহিনীর অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোথাও যেন দেশের সার্বভৌম অস্তিত্বের চেয়ে বাণিজ্যিক দিকটি বেশি প্রাধান্য পায়।
ইউএন শান্তি মিশন: ইউএন শান্তি মিশন ধরে রাখার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও, এই সিদ্ধান্তের পেছনে সামরিক বাহিনীর জাতীয় বীরত্বের চেতনার চেয়ে আর্থিক সুবিধা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বেশি ভূমিকা রাখে। এটি স্বাভাবিক, তবে এর সঙ্গে যখন আদর্শিক শূন্যতা যোগ হয়, তখন বিষয়টি জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভাব: ফলে, বুক চিতিয়ে দেশকে ভালোবাসা এবং দেশের জন্য লড়াই করা অল্প কজন মুক্তিযোদ্ধার আদর্শিক উত্তরাধিকার বহনকারী অফিসার এই বাহিনীতে বরাবরই সংখ্যালঘু থেকে গেছেন।
৫৫ বছর পরেও ত্যাগের মূল্য
এই ধারার অফিসারদের, যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতি অবিচল ছিলেন, তাঁদের এই দেশের জন্মের পর থেকে মূল্য দিতে হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত: ৭৫-এর ট্র্যাজেডি, সামরিক অভ্যুত্থান এবং বিচারের নামে হত্যাকাণ্ড—এ সবই প্রমাণ করে, যারা দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তাঁদেরকেই পরবর্তীতে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে।
বেদনাদায়ক সত্য: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও যখন দেখতে হয়, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয় বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা কোণঠাসা হয়ে থাকে, আর রাজাকারদের দোসররা সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকে, তখন এটি জাতির জন্য এক চরম বেদনাদায়ক সত্য।
ক্ষত নিরাময় ও জাতীয় আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ আদর্শিক বিভাজন ছিল একাত্তরের ক্ষতচিহ্ন যা স্বাধীনতার পরেও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণে পরিণত হয়।
আদর্শিক সঙ্কট: ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্র, ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সামরিক শাসনের মাধ্যমে এই আদর্শিক বিভাজনকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, সামরিক বাহিনী তার মূল নৈতিক ভিত্তি—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—থেকে বহুলাংশে সরে আসে।
জাতীয় দায়: দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রক্ষা করার জন্য এই ঐতিহাসিক ক্ষত নিরাময় করা অত্যাবশ্যক। এর জন্য প্রয়োজন:
সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত সামরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের প্রভাব সামরিক বাহিনী থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা।
দেশের জন্য জীবন দেওয়া বীর অফিসারদের ত্যাগ যেন কোনোভাবেই আদর্শহীন ক্ষমতালিপ্সু সামরিক গোষ্ঠীর হাতে অপমানিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবি।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















