জীবিতদের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি, বলেছিলেন অঁদ্রে মালরো
বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক, ফরাসি প্রতিরোধ যুদ্ধের কিংবদন্তী গেরিলা এবং ফ্রান্সের সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী অঁদ্রে মালরো (André Malraux)। ১৯৭১ সালে, যখন তাঁর বয়স ৭০, তখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অধীনে একটি ট্যাংক ইউনিটে অংশগ্রহণ করে জীবনের শেষ লড়াইটি লড়তে চান।

TruthBangla
Dec 6, 2025
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কজন মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা বা বার্ধক্যের ক্লান্তি ভুলে কেবল ন্যায় ও মানবিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে ভিন্ন এক মহাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছেন? সেই বিরলতম মানুষদের একজন হলেন বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক, ফরাসি প্রতিরোধ যুদ্ধের কিংবদন্তী গেরিলা এবং ফ্রান্সের সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী অঁদ্রে মালরো (André Malraux)। ১৯৭১ সালে, যখন তাঁর বয়স ৭০, তখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অধীনে একটি ট্যাংক ইউনিটে অংশগ্রহণ করে জীবনের শেষ লড়াইটি লড়তে চান। এই ঘোষণা ছিল কেবল একটি বিবৃতি নয়, এটি ছিল বিশ্বজুড়ে মানবতার বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক প্রচণ্ড হুঙ্কার। এই প্রবন্ধে আমরা সেই কিংবদন্তী যোদ্ধা, লেখক ও মানবতাবাদী অঁদ্রে মালরোর সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধনের গল্প তুলে ধরব।
অঁদ্রে মালরো – কালের সীমানা পেরোনো এক বিপ্লবী
অঁদ্রে মালরোর জীবন ছিল সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর। তিনি কোনো আরামদায়ক অ্যাকাডেমিক ছিলেন না, ছিলেন না কেবল সাহিত্যের রচয়িতা। তিনি নিজেই ছিলেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
১৯০১ সালে প্যারিসে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি যৌবনে স্পেনের গৃহযুদ্ধে রিপাবলিকানদের পক্ষে লড়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধ যুদ্ধের গেরিলা ছিলেন তিনি। যখন তাঁর দেশ স্বাধীনতা পেল, তিনি ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করে শিল্প ও ইতিহাসের পুনর্জাগরণ ঘটালেন।
কিন্তু ১৯৭১ সালে যখন বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ, তখনো তাঁর রক্তে তারুণ্যের আগুন। হাজার মাইল দূরের একটি জাতির ওপর গণহত্যা তাঁকে নীরব থাকতে দেয়নি। তিনি যেন প্রমাণ করে দিতে চেয়েছিলেন - ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াইয়ে মানবতাবাদী যোদ্ধার অবসর নেই।
যুদ্ধ ঘোষণার প্রেক্ষাপট – সেপ্টেম্বরের হুঙ্কার
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন বিশ্বের বহু দেশ পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে নীরব ছিল, তখন মালরো তাঁর কণ্ঠস্বরকে কামানের চেয়েও শক্তিশালী করে তোলেন।
পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডার চ্যালেঞ্জ
সে সময় পাকিস্তান সরকার বিশ্বজুড়ে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছিল। তারা বলছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযোদ্ধারা নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং 'ইহুদিদের সাহায্যপুষ্ট'। এই মিথ্যাচারে আন্তর্জাতিক জনমত বিভ্রান্ত হচ্ছিল। মালরো চুপ থাকতে পারলেন না।
তিনি প্যারিসে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসে বললেন:
"পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে 'না' বলতে পারে, তাদের পক্ষ নেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।" এই বক্তব্যটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা গৃহযুদ্ধের তকমা থেকে মুক্ত করে আন্তর্জাতিক নৈতিকতার প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরে।
৭০ বছর বয়সে ট্যাংক যুদ্ধের ঘোষণা
১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটন নিউজ পত্রিকায় এ প্রসঙ্গে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল 'অঁদ্রে মালরো অফারস টু এইড বেঙ্গালিজ'। মালরোর হুঙ্কার ছিল স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন:
"ফাঁকা বুলি আওড়াবার অভ্যাস আমার নেই। ট্যাংক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমার আছে। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর অধীনে একটি ট্যাংক ইউনিটে অংশগ্রহণে আমি অটল।"
শুধু ঘোষণাই নয়, তিনি ফ্রান্স সরকারের কাছে একটি যুদ্ধবিমান চাইলেন। বললেন:
"আমাকে একটি বিমান দাও, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমার জীবনের শেষ লড়াইটা লড়ব।"
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
মালরোর এই ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করল। ৭০ বছর বয়সী একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বের এমন যুদ্ধ ঘোষণার অর্থ ছিল - বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে বিশ্ববাসী আর উপেক্ষা করতে পারবে না। তাঁর এই একটি কথা হাজারো মুক্তিযোদ্ধার মনে বারুদের মতো সাহস জুগিয়েছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে এমন একজন বন্ধু আছেন, যিনি আমাদের জন্য নিজের প্রাণ দিতে প্রস্তুত।
রণাঙ্গনে না আসার কারণ – কূটনীতি ও অসুস্থতা
মালরো চেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ব্রিগেড তৈরি করে সরাসরি রণাঙ্গনে নামতে। ভারতের বিশিষ্ট নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তাঁকে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁর রণাঙ্গনে আসা সম্ভব হয়নি।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা: বার্ধক্য এবং অসুস্থতার ভার মালরোর শরীরের ওপর চেপে বসেছিল। সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে ট্যাংক চালিয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা তাঁর পক্ষে বাস্তবে অসম্ভব ছিল।
কূটনৈতিক কৌশল: তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হয়তো ভেবেছিলেন, সরাসরি রণাঙ্গনে মালরোর উপস্থিতি যতটা না সামরিক সুবিধা দেবে, তার চেয়ে বেশি দেবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে। তাঁর কলম, তাঁর বিবৃতি এবং তাঁর নৈতিক অবস্থান কামানের চেয়েও শক্তিশালী ছিল। তাঁর জীবন ঝুঁকিতে ফেলার চেয়ে তাঁর কণ্ঠস্বর ব্যবহার করা ছিল বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
থেমে না থাকা: যদিও তিনি রণাঙ্গনে আসতে পারেননি, তবুও থেমে থাকেননি তিনি। তিনি বেছে নেন তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র - কণ্ঠস্বর ও কলম।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে কড়া ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন। পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে বলেছিলেন।
ইউরোপের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীদের তিনি এককাট্টা করেন। তাঁর প্রতিটি বিবৃতি, প্রতিটি সাক্ষাৎকার ছিল একেকটি শেল, যা আঘাত করেছিল পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডার দেয়ালে। তিনি বিশ্বকে বোঝালেন—এটা কোনো গৃহযুদ্ধ নয়, এটা একটা জাতির অস্তিত্বের লড়াই।
স্বাধীন বাংলাদেশে মালরোর আগমন
যুদ্ধ শেষ হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। মালরোর জন্য এটি ছিল এক ব্যক্তিগত বিজয়। স্বাধীনতার প্রায় দেড় বছর পর তিনি এলেন তাঁর প্রিয় 'বাংলাদেশ' দেখতে।
ঐতিহাসিক অবতরণ: ১৯৭৩ সালের ২১ এপ্রিল। ঢাকার বিমানবন্দরে নামল একটি বিমান। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন সেই ৭০ বছরের বৃদ্ধ। পরনে সাধারণ পোশাক, কিন্তু চোখেমুখে এক বিজয়ের দীপ্তি। তিনি অঁদ্রে মালরো।
জনসমুদ্রের বরণ: বিমানবন্দরে তাঁকে বরণ করতে এসেছিল হাজারো জনতা। শাহীন স্কুলের বাচ্চারা ফুল দিয়ে বরণ করল তাঁকে। মালরো আবেগে আপ্লুত হয়ে একটি শিশুকে কোলে তুলে নিলেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন:
"তোমাদের মুক্তিই আমার মুক্তি।" এই বাক্যটি প্রমাণ করে, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিকে নিজের মানবিক সংগ্রামেরই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ
স্বাধীন বাংলাদেশে মালরোর সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের সামনে তাঁর ভাষণ। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই ১৯৭১ সালের গণহত্যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: তিনি গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁকে দেওয়া হলো সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি।
চট্টগ্রাম: গেলেন চট্টগ্রামে, যেখানে অলিয়ঁস ফ্রঁসেজের উদ্যোগে সংবর্ধনা দেওয়া হলো তাঁকে।
জীবিতের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি বললেন এক ঐতিহাসিক কথা। শিক্ষক-ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন:
"আজ আমি পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে জীবিতদের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি।"
তাঁর এই কথায় নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো মিলনায়তন। অনেকের চোখেই তখন ১৯৭১ সালের সেই কালো রাতের স্মৃতি ভেসে উঠেছিল এবং তারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এই বাক্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের যে অপরিমেয় আত্মত্যাগ, তার এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছিল।
বন্ধুত্বের কোনো সীমানা নেই
অঁদ্রে মালরো ১৯৭৬ সালের ২৩ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন।
তিনি ছিলেন এমন এক যোদ্ধা, যাঁর হাতে অস্ত্র ছিল না, কিন্তু যাঁর কণ্ঠস্বর ছিল কামানের চেয়েও শক্তিশালী। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সেই বিদেশি বন্ধু, যিনি আমাদের বিপদে কেবল সমবেদনা জানাননি, বরং আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, বন্ধুত্বের কোনো সীমানা নেই, কোনো বয়স নেই। একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধও যে একটি তরুণ জাতির স্বাধীনতার জন্য ট্যাংক চালাতে চাইতে পারেন, তা কেবল মালরোর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
মালরোর এই দুঃসাহসিকতা আমাদের শিখিয়েছে, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের অঙ্গীকার বয়স বা ভৌগোলিক দূরত্ব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ
আমরা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই মানুষটিকে, যিনি প্যারিসের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে বাংলার কাদামাটিতে মিশে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মিক সংযোগ কেবল একজন বিদেশির সহানুভূতি ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ব মানবতার শ্রেষ্ঠতম দৃষ্টান্ত।
অঁদ্রে মালরো - বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, এক চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা। তাঁর এই বীরত্বগাথা আমাদের প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় যে, যখন মানবতা হুমকির মুখে পড়ে, তখন ধর্ম, বর্ণ বা জাতীয়তা নির্বিশেষে প্রতিরোধ করাই একজন প্রকৃত মানুষের ধর্ম।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















