>

>

একাত্তরে রণাঙ্গনে জালেমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর গোলাম আলেম সমাজ

একাত্তরে রণাঙ্গনে জালেমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর গোলাম আলেম সমাজ

একাত্তরে আল্লাহর গোলামরা যেমন আল্লাহর ইবাদতও করতেন, তেমনই দেশের হানাদার শত্রুদের এবং দেশ ও জাতির চিরশত্রু রাজাকার, আল-বদর ও গাদ্দারদেরও মারতেন। আলেম সমাজের একটি বৃহৎ অংশ স্বাধীনতার পক্ষে ফতোয়া জারি করে এই যুদ্ধকে 'জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

TruthBangla

একাত্তরে রণাঙ্গনে জালেমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর গোলাম আলেম সমাজ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস হলো শোষণের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা এবং স্বাধিকার আদায়ের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে এদেশের ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে একটি নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী ও পরাভূত রাজনৈতিক মহল সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাস বিকৃতির চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে এই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার ছড়িয়ে দিতে চায় যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নাকি ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং আলেম সমাজ স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন।

ঐতিহাসিক সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ১৯৭১ সালে এদেশের প্রকৃত খোদাভীরু ও আধ্যাত্মিক আলেমরা নিষ্ক্রিয় দর্শক ছিলেন না। তাঁরা একদিকে যেমন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন, অন্যদিকে স্বাধীন মাতৃভূমিকে পাকি হানাদার মুক্ত করতে এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর হাত থেকে নিরপরাধ মানুষকে রক্ষা করতে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে নেমেছিলেন। দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম সমাজ সেদিন স্পষ্ট ভাষায় ফতোয়া জারি করে বলেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই শোষণ ও গণহত্যা সম্পূর্ণ অনৈসলামিক এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম হলো 'জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের অবধারিত লড়াই'

একাত্তরে ধর্ম বনাম ধর্মব্যবসার সংকট

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, তখন এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সামনে এক জটিল নৈতিক পরীক্ষা উপস্থিত হয়েছিল। একদল ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক গোষ্ঠী (যেমন: তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীর একাংশ) ইসলামের পবিত্র নাম ব্যবহার করে পাকিস্তানি পৈশাচিকতাকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করে। তারা এই যুদ্ধকে 'ইসলাম রক্ষার যুদ্ধ' এবং 'ভারতের চক্রান্ত' বলে বিভ্রান্তি ছড়াতে চেয়েছিল।

কিন্তু প্রকৃত ইসলামি পণ্ডিত এবং মূলধারার আলেম সমাজ এই চাল ধরে ফেলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ইসলামকে তাদের রাজনৈতিক শোষণ ও ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

আলেমগণ অনুধাবন করেন, যে শাসকশ্রেণী লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করে, গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং খাদ্যাভাব সৃষ্টি করে মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় তারা আর যাই হোক, ইসলামের প্রতিনিধি হতে পারে না। ফলে আলেমদের সামনে দুটি পথ ছিল:

১. ধর্মের লেবাসধারী জালেমদের অন্যায় মেনে নেওয়া; অথবা
২. কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশে জালেমের বিরুদ্ধাচরণ করে মজলুমের পাশে দাঁড়ানো।

বাংলাদেশের মহান আলেম সমাজ দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।

'জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই': শরীয়তের দৃষ্টিতে একাত্তর

কোরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষা হলো সমাজে ন্যায়বিচার (আদল) প্রতিষ্ঠা করা এবং যেকোনো ধরনের অনাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ৭৫ নম্বর আয়াতে নির্যাতিত পুরুষ, নারী ও শিশুদের রক্ষায় সংগ্রাম করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, অত্যাচারীর হাত চেপে ধরা এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মোমিনের ওপর অর্পিত অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা ও অত্যাচার শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের দেওবন্দি ধারার শীর্ষ আলেম সমাজ এবং বিভিন্ন দরবারের পীর-মাশায়েখগণ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট শরঈ অবস্থান গ্রহণ করেন। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হাফেজ্জী হুজুর (রহ.), চরমোনাইয়ের পীর মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক (রহ.) এবং আল্লামা সিদ্দিক আহমদের মতো বরেন্য ব্যক্তিত্বগণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণকে 'জুলুম' হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তারা ফতোয়া প্রদান করেন যে, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর পরিচালিত গণহত্যা ও নির্যাতন সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কবিরা গুনাহ। ফলে এই রক্তচোষা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা শরীয়তের দৃষ্টিতে আবশ্যক হয়ে পড়ে।

মজলুমের অধিকার রক্ষা: পাকিস্তানি জান্তা এখানে 'জালেম' এবং এদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ 'মজলুম'। ইসলামে জালেমের বিরুদ্ধে লড়াই করা ফরজ।

আত্মরক্ষা ও সম্পদের নিরাপত্তা: ইসলামি আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) একটি মৌলিক নীতি হলো 'দফউস সায়েম' যার অর্থ হলো জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম বিনাশকারী কোনো অন্যায় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা। শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যগুলোর (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) অন্যতম হলো পাঁচটি মৌলিক বিষয় রক্ষা করা: জীবন (নফ্‌স), দ্বীন, বুদ্ধি (আকল), বংশধারা (নসল) ও সম্পদ (মাল)। ২৫শে মার্চের কালরাতে যখন নিরীহ বাঙালির জীবন ও সম্ভ্রম আক্রান্ত হয়, তখন ইসলামি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী নিজ ও নিজ জাতির আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র ধারণ করা আইনানুগ ও ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬-দফা আন্দোলন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি যৌক্তিক প্রতিবাদ। ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ কুক্ষিগত করা, অপরের হক আত্মসাৎ করা এবং শোষণের উদ্দেশ্যে কোনো জাতিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ইসলাম সমতা, ইনসাফ ও ন্যায্য বণ্টনের কথা বলে। পাকিস্তানি জান্তার এই পদ্ধতিগত অর্থনৈতিক শোষণ ছিল শরিয়তের দৃষ্টিতে 'গসব' বা অবৈধ দখলাদারিত্ব, যা প্রতিহত করা ও স্বাধিকার আদায় করা শরিয়তসম্মত অধিকার ছিল।

সুতরাং, আলেম সমাজ ঘোষণা করেন যে, এদেশের মুক্তিসংগ্রাম কোনো ধর্মযুদ্ধ নয়, বরং এটি শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এবং জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের শরিয়তসম্মত জিহাদ।

রণাঙ্গন ও রাজনীতিতে শীর্ষ আলেম ও আধ্যাত্মিক নেতারা

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের খ্যাতনামা আলেম, মুফতি, শায়খুল হাদিস এবং সুফি সাধকগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামকে মদদ জুগিয়েছেন।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

মওলানা ভাসানী ছিলেন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক কালজয়ী রাজনীতিবিদ ও সুফি সাধক। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তিনিই প্রথম তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের অস্পষ্ট পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা কমিটির সর্বজ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্রধান আরব দেশগুলোর বিশ্বনেতাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যাকে অনৈসলামিক ও জঘন্য অপকর্ম হিসেবে তুলে ধরেন। যুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি বিশ্ব জনমত গঠনে কাজ করার পাশাপাশি তাঁর অনুসারী ও যুবসমাজকে সরাসরি রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)

বুখারী শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী ও বিশ্ববরেণ্য হাদিস বিশারদ আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকি বাহিনীর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি জান্তা যখন এই যুদ্ধকে ‘ইসলাম রক্ষার যুদ্ধ’ বলে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছিল, তখন আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, নিরীহ বাঙালি মুসলিমদের ওপর জুলুম ও গণহত্যা চালানো কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়। লালবাগ ক্যাডেট মাদ্রাসা ও বড় কাটরা মাদ্রাসায় অবস্থানকালে তিনি তাঁর ছাত্র ও অনুসারীদের পাকি বাহিনীর শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর অগণিত ছাত্র ও ভক্ত সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন।

হাফেজ্জি হুজুর [মাওলানা মুহাম্মদউল্লাহ] (রহ.)

তৎকালীন দেওবন্দি ধারার অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হাফেজ্জি হুজুর (রহ.) ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের শুরু থেকেই হানাদার বাহিনীর অত্যাচারকে প্রকাশ্যে 'জুলুম' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি পাকি বাহিনীর সঙ্গে কোনো রূপ আপস না করে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের পক্ষে সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নেন। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর ও লালবাগ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ ছিল একাত্তরে খাদ্যবঞ্চিত ও ভিটেমাটিহারা মজলুম মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবার জোগান দিতেন এবং হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকার দোয়া ও সাহস জুগিয়েছিলেন।

পীর-মাশায়েখ ও আধ্যাত্মিক দরবারসমূহ

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সুফি সাধক ও দরবারগুলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রেখেছিল:

দেওয়ানবাগী পীর ও সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা: মুক্তিযুদ্ধকালে দেওয়ানবাগী পীর হিসেবে পরিচিত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা ৩ নম্বর সেক্টরে সরাসরি প্ল্যাটুন কমান্ডার হিসেবে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

মুফতি মাহমুদ (রহ.): মুফতি মাহমুদসহ বহু প্রখ্যাত মুফতি পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন।

ওলামায়ে কেরামের ফতোয়া ও প্রতিরোধ: তৎকালীন কওমি ও দেওবন্দি ঘরানার শীর্ষ মুফতিগণ পাকি বাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তৎকালীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মাহমুদসহ প্রখ্যাত আলেমগণ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক অভিযানকে অনৈসলামিক আখ্যা দিয়ে ফতোয়া দেন এবং বাঙালিদের স্বাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

খানকাহ ও দরবারের লজিস্টিক সহায়তা: গ্রামীণ অঞ্চলের শত শত খানকাহ ও আস্তানা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প, খাদ্য কেন্দ্র ও আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। আলেম ও পীরদের অনুসারীরা গোপনে কার্তুজ-অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ সরবরাহ করা এবং পাকি সেনাদের চলাচলের খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।

শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান: প্রথম সারির আলেম শহীদ

মাওলানা অলিউর রহমান ছিলেন আলেম সমাজের মধ্য থেকে স্বাধীনতাকামী এক বীর ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধিকার আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্রথম থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর যখন পাকিস্তানি সেনারা সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে, তখন মাওলানা অলিউর রহমান প্রকাশ্যে জুমার খুতবা ও সামাজিক মাহফিলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতাকে 'অনৈসলামিক ও জালেমের কাজ' বলে তীব্র নিন্দা জানান।

এই অপরাধে রাজাকার ও পাকি ঘাতক দল তাঁকে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আলেম সমাজের আত্মত্যাগের ইতিহাসে তিনি অন্যতম প্রথম সারির শহীদ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

একাত্তরে আলেম সমাজ ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদের ঐতিহাসিক অবদান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইসলামি ব্যক্তিত্ব, সংগঠন এবং সাধারণ মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকদের ভূমিকা নিচে সারণীবদ্ধ করা হলো:

ব্যক্তিত্ব / গোষ্ঠী

রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান

মুক্তিযুদ্ধে অবদান ও কর্মকাণ্ড

ঐতিহাসিক তাৎপর্য

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিপীড়নবিরোধী অবস্থান।

প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা; আন্তর্জাতিক দরবারে পাকি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

নিপীড়িত জনগণের মাঝে স্বাধীনতা সংগ্রামের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করেন।

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)

জালেমের বিরুদ্ধে ও মজলুমের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান।

পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ফতোয়া প্রদান; ছাত্র ও অনুসারীদের মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহিত করা।

আলেম সমাজের জন্য সত্য ও ইনসাফের পথ নির্দেশ করেন।

হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)

পাকিস্তানি জান্তার নীতিকে শরিয়তবিরোধী ঘোষণা।

মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় প্রদান, খাবার সরবরাহ এবং নৈতিক সমর্থনদান।

সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের মনে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেন।

শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান

প্রকাশ্যে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান ও প্রতিবাদ।

পাক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও ভাষণদান; পরবর্তীতে শাহাদাত বরণ।

প্রমাণ করে যে আলেম সমাজ স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ রক্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন।

কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক

সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ।

সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে যোগাদান; ক্যাম্প পরিচালনা; গেরিলা আক্রমণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ।

গ্রামের পর গ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাধারণ আলেমদের কার্যকরী অবদান।

জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার চক্র

পাকিস্তানপন্থী, উগ্র ও অপব্যবহারকারী দল।

রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস গঠন; গণহত্যা, ধর্ষণ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সহায়তা।

ধর্মের লেবাস পরে দেশের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও ইতিহাসিক কলঙ্ক।

সরাসরি রণাঙ্গনে আলেমরা: ইবাদতের পাশাপাশি সশস্ত্র প্রতিরোধ

মুক্তিযুদ্ধে আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়। ‘আলেমরা কেবল দোয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন’ এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে কওমি ও আলিয়া উভয় ধারার হাজার হাজার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

সিলেটের গাছবাড়ী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, ঢাকা লালবাগ মাদ্রাসা এবং সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত ছাত্র-শিক্ষক ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৫ ও ১১ নম্বর সেক্টরসহ দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, এসএলআর ও গ্রেনেড হাতে পাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তাঁরা। এছাড়া মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের মতো বর্ষীয়ান আলেম রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেন এবং বহু আলেম মুজিব বাহিনী ও স্থানীয় স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র দলগুলোর নিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

অনেক মাদ্রাসা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের গোপন দুর্গ

একাত্তরের ৯ মাস দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলো কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র ছিল না, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক অপারেশনের জন্য গোপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা: পাকি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহু শিক্ষক নিজেদের জীবন বাজি রেখে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ মুক্তিযোদ্ধাদের সেফ হাউস হিসেবে উন্মুক্ত করে দেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের এসব মাদ্রাসায় গোপনে রেখে সেবা-শ্রূষা ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হতো। মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের খাদ্য ও শিক্ষকদের ব্যক্তিগত খাবার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত সরবরাহ করা হতো।

অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংরক্ষণ: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাকিস্তানি সেনারা শুরুতে সরাসরি মাদ্রাসাগুলোতে তল্লাশি চালাতে কিছুটা ইতস্তত করত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাদ্রাসার ভূগর্ভস্থ কক্ষ, ধান রাখার গোলা, কুতুবখানা (পাঠাগার) এবং ছাদের নির্জন অংশে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারী অস্ত্র, মাইন ও গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখা হতো।

ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের বুদ্ধিমত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম: গ্রামবাংলার অসংখ্য মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনরা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান ‘ইনফর্মার’ বা তথ্যদাতা। পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পের গতিবিধি, সৈন্য সংখ্যা এবং আক্রমণের সময়সূচির সঠিক তথ্য তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। রাতে দুর্গম পথ দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আজানের সুর বা বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করার কাজও তাঁরা সাহসিকতার সাথে করেছেন।

আদর্শিক প্রতিরোধ ও ফতোয়া: পাকি বাহিনীর জুলুম ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বহু আলেম সামাজিকভাবে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে তাঁরা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াজিব বা আবশ্যক হিসেবে ঘোষণা করেন। পাকি সেনাদের তথাকথিত ‘শান্তি কমিটি’র প্রস্তাব অনেক আলেম সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন, যার খেসারত হিসেবে তাঁদের জীবন দিতে হয়েছিল।

শহীদ আলেম ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান: যেসব মাদ্রাসা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়কেন্দ্র বা গোপন অস্ত্রাগার হিসেবে কাজ করত, সেগুলোর সন্ধান পেলেই পাকি বাহিনী সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে দিত। বরিশালের মাঝগ্রাম মাদ্রাসা, সিলেট ও কুমিল্লার একাধিক মাদ্রাসা আগুনে ভস্মীভূত করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে অসংখ্য আলেম, হাফেজ ও মাদ্রাসা ছাত্রকে পাকি সেনারা নির্মমভাবে গুলি ও বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে শহীদ করে।

ধর্মের নামে 'ফাসাদ ফিল আরদ': রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর মুখোশ উন্মোচন

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নারকীয় গণহত্যা ও নিপীড়ন বাস্তবায়ন করতে গড়ে তোলা হয়েছিল 'রাজাকার', 'আল-বদর' এবং 'আল-শামস' নামের কিছু আধা-সামরিক বাহিনী। ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ. কে. এম. ইউসুফ ৯৬ জন সদস্য নিয়ে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন 'ইসলামী ছাত্রসংঘ'-এর ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত হয় 'আল-বদর' ও 'আল-শামস'। আল-বদর বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় বিশেষ ঘাতক স্কোয়াড হিসেবে, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও সাহিত্যিকদের মতো দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে হত্যা করা।

ইসলামের দৃষ্টিতে 'ফাসাদ ফিল আরদ' বা বিশৃঙ্খলা

ইসলামে সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অন্যতম মূল নীতি, আর সমাজে বিশৃঙ্খলা, লুণ্ঠন ও গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করাকে 'ফাসাদ ফিল আরদ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

“যখন সে প্রস্থান করে, তখন সে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এবং শস্যক্ষেত্র ও মানবজাতিকে ধ্বংস করতে সচেষ্ট হয়। আর আল্লাহ বিশৃঙ্খলা পছন্দ করেন না” (সূরা আল-বাকারা: ২০৫)

তৎকালীন দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসরেরা ইসলামের নাম ব্যবহার করলেও তাদের প্রতিটি কাজ ছিল কোরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট অবমাননা।

রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর জঘন্য অপরাধ ও শরিয়তের বিধান

গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা: পবিত্র কোরআনের এরশাদ হয়েছে: “যে ব্যক্তি কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল” (সূরা মায়িদা: ৩২)। আল-বদর বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে যে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি ইসলামের চোখে জঘন্যতম অপরাধ। যুদ্ধের নামে কোনো অসামরিক, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন: ইসলামে জেনা ও ধর্ষণকে অত্যন্ত জঘন্য ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ (হদ্দ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী (সা.) যুদ্ধের সময়ও নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর হামলা চালাতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অথচ পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা হাজার হাজার বাঙালি নারীর ওপর যে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে, তা ছিল সুন্নাহর চরম লঙ্ঘন।

লুটতরাজ ও 'গনিমতের মাল' ধারণার অপব্যাখ্যা: সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জমিজমা দখল এবং লুটপাটকে তারা 'গনিমতের মাল' বলে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, গনিমতের মাল কেবল অমুসলিম সশস্ত্র যুদ্ধরত শত্রু বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। নিজ দেশের বেসামরিক নাগরিক বা মুসলিম প্রতিবেশীর সম্পদ ছিনতাই করা ইসলামে 'ঘাসব' (অবৈধ দখল) এবং চুরি, যা স্পষ্ট হারাম।

অমুসলিমদের ওপর নির্যাতন: ইসলামে অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মি) জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হাদিস শরিফে এসেছে: “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুবাসও পাবে না” (সহিহ বুখারি)। কিন্তু রাজাকার বাহিনী হিন্দু সম্প্রদায়সহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, সম্পত্তি দখল ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার যে ভণ্ডামি করেছিল, তা কোরআনের বাণী “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)-এর সরাসরি পরিপন্থী।

মূলধারার আলেমদের অবস্থান

তৎকালীন সময়ে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, মাওলানা আসাদ মাদানি সহ দেওবন্দি ধারার প্রখ্যাত আলেম ও সাধারণ উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, আল-বদর ও রাজাকারদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে ইসলামের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। তারা ফতোয়া ও বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন যে, একটি অত্যাচারী ও জুলুমকারী শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে নিজের দেশের নিরস্ত্র মানুষের রক্ত ঝরানো 'জিহাদ' নয়, বরং তা চরম পাপাচার ও স্বৈরাচারের দাসত্ব। ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল বানিয়ে করা এই গণহত্যা ইতিহাস ও ধর্মের দৃষ্টিতে 'ফাসাদ ফিল আরদ' বা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চরম অপরাধ হিসেবে গণ্য।

ইসলামি মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। এই তিনটি নীতি ইসলামি আদর্শের মূল স্তম্ভ।

১. সাম্য: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের 'দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক' মনে করত। ইসলাম সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলে।

২. মানবিক মর্যাদা: 'বনমানুষ' বা 'কাফের' আখ্যা দিয়ে বাঙালি হত্যা ছিল মানবতাবিরোধী। কোরআন অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা বনি আদমকে (সব মানুষকে) মর্যাদা দিয়েছেন।

৩. সামাজিক ন্যায়বিচার: পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করা হচ্ছিল। ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বঞ্চিত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

অতএব, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার যুদ্ধ ছিল না; তা ছিল কোরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক বাস্তব লড়াই।

অপপ্রচার নিরসন ও সত্যিকারের ইতিহাস চর্চা

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে, দেশপ্রেম এবং ইসলাম কখনো মুখোমুখি দাঁড়ায় না; বরং তারা একে অপরের পরিপূরক।

'হুব্বুল ওয়াতানি মিনাল ঈমান' (দেশপ্রেম ঈমানের অংশ)

নিজের জন্মভূমিকে ভালোবাসা, তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং দেশের মানুষকে অত্যাচারীর হাত থেকে বাঁচানো একজন ঈমানদার মুসলমানের দায়িত্ব। একাত্তরের আলেম সমাজ এই মূলনীতিটিই তাদের জীবনের বিনিময়ে প্রমাণ করে গেছেন।

বর্তমানেও যারা জামায়াত-শিবির বা অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিভ্রান্তিকর প্রচারে প্রলুব্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, তাদের সামনে একাত্তরের প্রকৃত মহান আলেমদের আদর্শ তুলে ধরতে হবে। শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) কিংবা মওলানা ভাসানীর মতো ব্যক্তিত্বরা প্রমাণ করে গেছেন যে, প্রকৃত ঈমানদার কখনো স্বাধীনতাবিরোধী হতে পারে না।

ইতিহাসের পাতায় আলেমদের অক্ষয় নাম

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে নীতিগত অবস্থান সবখানেই আমাদের আলেম সমাজ এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। ধর্মের লেবাস পরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের দোসরদের মিথ্যাচারকে আলেমগণ ঈমানী প্রজ্ঞা দিয়ে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন।

আল্লাহর যে বান্দারা দিনে ও রাতে সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন, তাঁরাই বুঝেছিলেন যে সেই সিজদার পূর্ণতা পেতে হলে দেশের কোটি কোটি মজলুম মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে, অত্যাচারী জান্তাকে প্রতিহত করতে হবে। তারা পরম নিষ্ঠায় ওজু করে অস্ত্র কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তারা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, আবার তাদের দোসর আল-বদর, রাজাকার ও গাদ্দারদের হাত থেকে নিজ দেশের নিরপরাধ মানুষদের রক্ষা করেছেন।

একাত্তরের রণাঙ্গনে আলেমদের রক্তের দাগ, ত্যাগ এবং সাহসিকতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হিসেবে চিরকাল জাজ্বল্যমান থাকবে। দেশপ্রেম, ন্যায়বিচার ও ঈমানের যে অপূর্ব সমন্বয় তাঁরা দেখিয়ে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক যুগান্তকারী ও অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই সকল মহান আলেম, ছাত্র ও শহীদদের প্রতি জাতীয় ও ধর্মীয়ভাবে আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.