ওসমান হাদীর ট্র্যাজেডির নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক সত্য কথন
বাংলাদেশী রাজনীতির পটভূমি সবসময়ই নাটকীয়তা, সংঘাত এবং অপ্রত্যাশিত মোড় দিয়ে ঘেরা। কিন্তু ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে’র প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা-৮ আসনের এমপি পদপ্রার্থী ওসমান হাদীর ওপর ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনামাত্র নয়; বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, সাংগঠনিক শিথিলতা এবং ক্ষমতার অন্ধত্বের এক জ্বলন্ত দলিল। ওসমান হাদীর ট্র্যাজেডির নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক সত্য কথন।

TruthBangla

Jul 10, 2026
বাংলাদেশি রাজনীতির আকাশে ধূমকেতুর মতো কিছু চরিত্রের উদয় হয়, যারা তীব্র আলো ছড়িয়ে আবার আকস্মিকভাবেই অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কখনো থাকে নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, আবার কখনো থাকে সুগভীর রাজনৈতিক চক্রান্ত। বাংলাদেশী রাজনীতির পটভূমি সবসময়ই নাটকীয়তা, সংঘাত এবং অপ্রত্যাশিত মোড় দিয়ে ঘেরা। কিন্তু ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে’র প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা-৮ আসনের এমপি পদপ্রার্থী ওসমান হাদীর ওপর ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনামাত্র নয়; বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, সাংগঠনিক শিথিলতা এবং ক্ষমতার অন্ধত্বের এক জ্বলন্ত দলিল। ওসমান হাদীর ট্র্যাজেডির নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক সত্য কথন।
এই ঘটনাটি একই সাথে যেমন আমাদের নিরাপত্তার চরম গলদকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তেমনি মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস কীভাবে তার নির্মম প্রতিশোধ নেয়। একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী এবং নাগরিক হিসেবে এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ, এর পেছনের মনস্তত্ত্ব এবং এর থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক বার্তাটি বিশদভাবে আলোচনা করা আজ সময়ের দাবি।
একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং এই দেশের সমাজ ও রাজনীতির একজন সচেতন পর্যবেক্ষক এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে এই ঘটনাটি আমাকে কিছু মৌলিক ও রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাজনীতিতে সাময়িক ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যারা ইতিহাসকে অস্বীকার করে এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার উন্মাদনায় মাতে, শেষ পর্যন্ত নিয়তির পরিহাস তাদের কীভাবে নিজস্ব বলয়ের মধ্যেই অরক্ষিত করে তোলে—ওসমান হাদীর ঘটনাটি তারই এক নির্মম দৃষ্টান্ত।
ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সেই সাত দিন
ওসমান হাদীর ওপর হামলার পর যে তথ্যগুলো গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সূত্রে বেরিয়ে আসছে, তা শুধু আশ্চর্যজনকই নয়, বরং চরম রহস্যজনক। যে তথ্যটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা হলো তাকে গুলি করা ব্যক্তিটি নাকি বিগত এক সপ্তাহ ধরে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে নিয়মিত আসা-যাওয়া করছিল। এই একটি তথ্যই পুরো ঘটনাটিকে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
ওসমান হাদীকে গুলি করা শুটার ফয়সাল নাকি হামলার আগের পুরো এক সপ্তাহ ধরে প্রতিনিয়ত হাদীর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে’ আসা-যাওয়া করতো।
একটি মৌলিক প্রশ্ন: ওসমান হাদীর মতো একজন হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ঢাকা-৮ আসনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁর কার্যালয়ে এক জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি টানা এক সপ্তাহ ধরে যাতায়াত করল, অথচ বিষয়টি কারও নজরে এল না এটি ভাবলে আক্ষরিক অর্থেই অবাক হতে হয়।
একটি রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যেখানে একজন উদীয়মান এবং অত্যন্ত আলোচিত নেতা নিয়মিত বসেন, সেখানে একজন অপরিচিত ব্যক্তি টানা সাত দিন ধরে ঘুরঘুর করলো, অথচ সেন্টারের কেউ সেটা লক্ষ্য করলো না? হাদী নিজে কিংবা তাঁর আশেপাশের কোনো কর্মী-সমর্থক তা লক্ষ্য করল না? এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?


যদি কেউ লক্ষ্য করে থাকে, তবে কেন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো না যে সে কে? তার পরিচয় কী? সে কেন প্রতিদিন কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়া সেখানে বসে থাকে?
রাজনীতিতে বা যেকোনো পাবলিক স্পেসে নিরাপত্তা সচেতনতা একটি মৌলিক বিষয়। ওসমান হাদীর মতো একজন মানুষ, যিনি প্রতিনিয়ত বিতর্কিত ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে লাইমলাইটে থাকেন, তাঁর চারপাশে থাকা সহযোদ্ধা বা নিরাপত্তারক্ষীরা এতটা উদাসীন কীভাবে হলেন? নাকি এই উদাসীন্যের পেছনে অন্য কোনো গল্প লুকিয়ে আছে? হাদীর কাছের সাথীরা কি ফয়সালকে আগে থেকেই ভালোভাবেই চিনতেন? আর চিনতেন বলেই কি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে ফয়সালের অবাধ যাতায়াতে তাদের কোনো আপত্তি বা সন্দেহ ছিল না?
যদি আমরা বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকাই, তবে এই উদাসীনতা কোনোভাবেই মেলানো যায় না। বর্তমান সময়ে যেকোনো স্তরের রাজনৈতিক নেতার আশেপাশে একদল অন্ধ অনুসারী এবং কর্মী থাকে, যাদের মূল কাজই হলো নেতার চারপাশের পরিবেশের ওপর নজর রাখা।
এখানে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যাক। যদি ওই ব্যক্তিটি বিরোধী কোনো শিবিরের বা ধরা যাক ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী হতো, তবে কি ওসমান হাদীর কর্মীবাহিনী তাকে এক সপ্তাহের জন্য ফ্রিতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দিত?
সাধারণ রাজনৈতিক স্ক্রিনিং: ছাত্রলীগের কোনো সাধারণ কর্মীর উপস্থিতি টের পেলে যেখানে রাজনৈতিক নেতারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার বংশপরিচয়, অতীত ইতিহাস এবং আসার উদ্দেশ্য ডিটেইলসসহ বের করে ফেলে, সেখানে একজন সশস্ত্র বা সম্ভাব্য আক্রমণকারী সাত দিন ধরে তাদের সাথে বসলো, চা খালো, রেকি করল অথচ কেউ তার পরিচয় জানতে চাইল না!
অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা: এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ওসমান হাদীদের তথাকথিত ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ আসলে কোনো সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক কেন্দ্র নয়, বরং এটি এক গভীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের আখড়া। যখন কোনো দল বা নেতৃত্ব শুধুমাত্র প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চিন্তায় মগ্ন থাকে, তখন তারা নিজেদের পেছনের দরজাটি পাহারা দিতে ভুলে যায়।
রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বনাম সাংগঠনিক নজরদারি
ওসমান হাদীর এই নিরাপত্তা সংকট এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক নজরদারির মধ্যকার পার্থক্যটি নিচে একটি ছকের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হলো:
সাংগঠনিক সূচক | আদর্শ রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব | ওসমান হাদী ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার |
সচেতনতা ও নজরদারি | কার্যালয়ে আগত প্রতিটি নতুন ব্যক্তির পরিচয় ও উদ্দেশ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা হয়। | একজন অপরিচিত ব্যক্তি টানা ৭ দিন ধরে অবাধে যাতায়াত করার পরও কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। |
গোয়েন্দা ও তথ্য অনুসন্ধান | প্রতিপক্ষের সামান্যতম সন্দেহজনক নড়াচড়াও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডিটেইলসসহ বের করা হয়। | নিজের নাকের ডগায় সাত দিন ধরে আক্রমণকারী বসে থাকলেও কোনো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। |
নেতৃত্বের প্রোটোকল | ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের অবস্থান ও নির্বাচনী আসনের গুরুত্ব বুঝে প্রোটোকল ব্যবহার করা। | জনবিচ্ছিন্নতা এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে কোনো ধরনের ন্যূনতম প্রোটোকল বা নিরাপত্তা না রাখা। |
রাজনৈতিক আচরণ | বিনয়, ধৈর্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন। | অল্প বয়সে ক্ষমতার আস্ফালন, উগ্র বক্তব্য এবং আঞ্চলিক বিদ্বেষ ছড়ানো। |
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও রহস্যের দেয়াল তৈরি হয়েছে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যকলাপে। হাদী হত্যার বা তাঁর ওপর হামলার এতগুলো দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও কোনো গোয়েন্দা সংস্থা কি সুনির্দিষ্টভাবে বের করতে পেরেছে যে, কার মাধ্যমে বা কার ইশারায় শুটার ফয়সাল হাদির এত কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিল? কে বা কারা এই ফয়সালকে ওসমান হাদীর পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিল বা তাকে নিয়োগ করেছিল?
তখন একটি চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক যোগসূত্র নিউজের মাধ্যমে সামনে এসেছিলো। একটি জাতীয় সংবাদে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছিল যে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের ছেলে সালমানই নাকি ওসমান হাদীর সাথে এই শুটার ফয়সালের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। শুধু পরিচয়ই নয়, সালমানই ফয়সালকে হাদীর রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর টিমে নিয়োগ দিয়েছিল। পরবর্তীতে সংবাদটি ডিলেট করা হয়। এতে বিষয়টা পরিস্কার হয় যে হাদী হত্যায় অনেক বড় বড় বিগফিস জড়িত, যারা দিনের পর দিন হাদী হত্যার বিচার চেয়ে রাজনীতি করে যাবে, কিন্তু হাদী হত্যার বিচার কখনো হতে দিবে না।
যদি এই তথ্য সত্যি হয়ে থাকে, তবে সমীকরণটি কোন দিকে মোড় নেয়? এই ফয়সাল যদি ছাত্রলীগের কোনো চুনোপুঁটি নেতাও হতো, তবে জামায়াত ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো চিল্কার করে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিত। তারা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ফয়সালের চৌদ্দ গোষ্ঠীর ডিটেইলস বের করে দেশবাসীর সামনে হাজির করতো। কিন্তু এখানে ফয়সাল সাত দিন ধরে তাদের চোখের সামনে ঘুরল, তাদের নেতার ছেলের মাধ্যমে পরিচয় হয়ে টিমে ঢুকল, অথচ তারা একদিনের জন্যও তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার প্রয়োজন বোধ করল না? এটা বিশ্বাস করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। এই রহস্যময় নীরবতাই প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে গভীর কোনো চক্রান্ত সচল ছিল।
‘প্রজেক্ট হাদী’ এবং জামায়াতের নির্বাচনী বাণিজ্য
ওসমান হাদী আসলে কোনো তৃণমূল থেকে উঠে আসা বা নিজস্ব আদর্শে বলীয়ান হওয়া রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট ‘প্রজেক্ট’। জামায়াত এই তরুণকে ব্যবহার করে এদেশের আবেগপ্রবণ সাধারণ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মন জয় করতে চেয়েছিল। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নিজেদের বিশাল অনলাইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ওসমান হাদীর জনপ্রিয়তা এই দেশে আকাশচুম্বী করিয়েছিল তাঁকে ভালোবাসত বলে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজেদের দলীয় স্বার্থে।
তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই জাতীয় নির্বাচনে। ঢাকা-৮ আসনের মতো একটি ভিভিআইপি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসনে ওসমান হাদীকে তারা এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে আসনে জামায়াতের মতো একটি দলের সাংগঠনিক ভোট বা স্বাভাবিক জনসমর্থনের হিসাবে ৩০টি ভোটও পাওয়ার কথা না, সেখানে তারা এই ‘হাদী কার্ড’ খেলে রাজনীতিতে ফায়দা লুটেছে। পুরো দেশে যেখানে তাদের অস্তিত্ব সংকটে, সেখানে তারা ওসমান হাদীর এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং পরবর্তীতে তাঁর ওপর ঘটা এই ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে, সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বিক্রি করে জাতীয় নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক (৭৭টি) আসন বাগিয়ে নিয়েছে!
হাদীকে বেচে বেচে যারা আজ ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের আসন পাকা করল, তারা কি আসলেই হাদীর ভালো চেয়েছিল? নাকি হাদী কেবলই তাদের একটি পণ্য ছিলেন, যার মেয়াদ ফুরানো বা অপব্যবহারের পর তাকে কবরে শুতে হয়েছে?
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং বঙ্গবন্ধু ট্রাজেডি থেকে শিক্ষা
ওসমান হাদী এবং তার রাজনৈতিক গুরুরা আজীবন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তীব্র ঘৃণা ও অপছন্দ করে এসেছেন। তারা বঙ্গবন্ধুকে কখনোই বাংলাদেশের স্থপতি বা স্বাধীনতার মহান নেতা হিসেবে স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু তারা যদি অন্ধত্বের দেয়াল সরিয়ে একটু বাস্তব ইতিহাস জানতেন, তবে হয়তো আজ ওসমান হাদীর এই দশা হতো না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা এমন এক স্তরে ছিল যে, তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন "এই বাংলার মানুষ আমাকে এত ভালোবাসে যে, আমার ঘরে কোনো পাহারাদার বা নিরাপত্তার দরকার নেই।" এই অগাধ আত্মবিশ্বাস আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি বিলাসবহুল বঙ্গভবন ছেড়ে সাধারণ মানুষের মতো থাকতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের অতি সাধারণ একটি বাড়িতে।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্মমতা কী ছিল? সেই বঙ্গবন্ধুকে তাঁর অতি বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে, সপরিবারে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল গুটিকয়েক বাঙালি সেনা অফিসারের হাতে। যদিও ওই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের পেছনে আন্তর্জাতিক পরাশক্তি আমেরিকা ও পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদ ও ব্লু-প্রিন্ট ছিল, তবুও মাঠপর্যায়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছিল এদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার বাঙালি সেনা অফিসার।
ওসমান হাদী তো আর বঙ্গবন্ধুর পর্যায়ের বা তাঁর নখের যোগ্য কোনো নেতা হয়ে যাননি। তিনি ছিলেন স্রেফ একটি দলের তৈরি করা সাময়িক প্রজেক্ট।
যখন তিনি ঢাকা-৮ আসনের মতো একটা স্পর্শকাতর আসনে এমপি পদপ্রার্থী হলেন, তখন তাঁর উচিত ছিল অতীতে ঘটে যাওয়া ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। রাজনীতিতে শত্রু থাকবেই, আর জামায়াতের মতো একটি উগ্র ও সুবিধাবাদী দলের প্রথম সারির মুখ হয়ে যখন কেউ মাঠে নামে, তখন তার চারপাশটা শতভাগ নিরাপদ রাখা জরুরি। তাঁর উচিত ছিল প্রোটোকল ব্যবহার করা, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হওয়া। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর কিছুই হবে না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার এই চড়া মূল্যই আজ তাকে দিতে হচ্ছে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই নির্মম ইতিহাসটি লিখতে গিয়ে একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে আমার বুকটা ভেঙে যায়, আমি খানিকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, জামায়াত-শিবির এবং তাদের সমমনা অন্যান্য চরমপন্থী ধর্মীয় সংগঠনগুলো উগ্র উন্মাদনায় মেতে উঠে বঙ্গবন্ধুর সেই স্মৃতিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শুধু ভাঙেইনি, তারা সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘর ভাঙার পক্ষে এক ধরণের বিকৃত ‘বৈধতা’ বা ন্যারেটিভ উৎপাদন করেছে।
আজ তাদের কাছে আমার প্রশ্ন কারো স্মৃতিবিজড়িত ঘর ভাঙা, কারো ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা কি কোনো ভালো মানুষের কাজ হতে পারে? এটা কি ইসলামের শিক্ষা? নিজের গায়ের জোর বা রাজনৈতিক সুবাতাস দেখে আজ যারা শক্তি প্রদর্শন করছেন, তারা ভুলে গেছেন যে উপরে একজন পরম সৃষ্টিকর্তা আছেন। মানুষের শক্তি চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা চিরন্তন। যিনি আজ ঘর ভাঙার উল্লাস করছেন, কাল যে তাঁর নিজের ঘরই অন্য কারো দ্বারা ভাঙা হবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা সবসময়ই তাঁর নিখুঁত ফয়সালা যথাসময়ে বুঝিয়ে দেন।
রাজনৈতিক বিনয় বনাম প্রতিহিংসার হিংস্রতা
রাজনীতিতে বিনয়ী হওয়া এবং মুখের ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা অত্যন্ত জরুরি একটি গুণ। বাংলাদেশে একটি বহু পুরনো ও চিরন্তন প্রবাদ আছে: "অল্প বয়সে পাকিলে বাল, দুঃখ থাকিবে চিরকাল।" রাজনীতিতে বা সমাজে যারা অল্প পানিতে পড়া পুঁটি মাছের মতো বেশি লাফঝাঁপ করে, চট করে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে, ইতিহাস সাক্ষী তাদের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।
ওসমান হাদী যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন, তখন তাঁর মুখের ভাষা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাউয়া-মাউয়া ছিড়ে ফেলাইতে চাইছিলো ওসমান হাদী। তিনি এতটাই অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলেছিলেন। তিনি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে গোপালগঞ্জ জেলাকে চিরতরে মুছে ফেলে দেওয়া হবে!
একটি স্বাধীন দেশের একটি নির্দিষ্ট জেলা বা অঞ্চলের মানুষের প্রতি এমন তীব্র ঘৃণা ও উগ্রতা ছড়ানো কোনো সুস্থ রাজনৈতিক নেতার কাজ হতে পারে না। কিন্তু যখন ওসমান হাদী গুলি খেলেন, যখন তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে হাসপাতালের আইসিইউতে কাতরাচ্ছিলেন, তখন এক অদ্ভুত ও শিক্ষণীয় দৃশ্য দেখল এদেশের মানুষ। যে গোপালগঞ্জের মানুষকে তিনি মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলেন, সেই গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষই ফেসবুকে, সমাজে ওসমান হাদীর এই করুণ দশায় দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে।
এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় প্রকৃত রাজনৈতিক বিনয় ও ভদ্রতা কাকে বলে। আপনি যখন ক্ষমতায় থাকবেন বা জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকবেন, তখন আপনার আচরণ যেমন হবে; আপনি যখন বিপদে পড়বেন, প্রতিপক্ষের আচরণই বলে দেবে সমাজ কতটা মানবিক।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই কোনো পলিটিক্যাল অপোনেন্ট বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যু কামনা করি না। এটা আমাদের সুস্থ রাজনৈতিক শিক্ষা নয়, আর সবচেয়ে বড় কথা—এটি আমার পারিবারিক শিক্ষা নয়। কারো মৃত্যু কামনা করা, কাউকে মেরে ফেলা বা কারো ওপর শারীরিক আক্রমণকে সমর্থন করা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। রাজনীতিতে যুদ্ধ হবে কথায়, যুক্তিতে, আদর্শে। মানুষের মনুষ্যত্ব থাকবে তার চিন্তায়, মননে ও প্রজ্ঞায়। আপনি আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আমার সাথে যত বড় বিধ্বংসী আচরণই করুন না কেন, আমি আমার পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার কারণে আপনার সাথে সেই একই হিংস্র আচরণ করতে পারি না।
ওসমান হাদী সংক্রান্ত ঘটনার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ওসমান হাদীর উত্থান, তাঁর ওপর হামলা এবং এর পেছনের সুক্ষ্ম রাজনৈতিক সমীকরণগুলো নিচের ছকের মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
বিষয়ের ক্ষেত্র | ওসমান হাদীর অবস্থান ও ঘটনা | প্রকৃত রাজনৈতিক শিক্ষা ও বাস্তবতা |
উত্থান ও পরিচয় | জামায়াতে ইসলামীর একটি সুপরিকল্পিত 'প্রজেক্ট'। রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয় করা হয়। | দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তরুণদের আবেগ বিক্রি করার সস্তা কর্পোরেট রাজনীতি। |
শুটার ফয়সালের ভূমিকা | হামলার পূর্বে টানা ৭ দিন হাদীর 'ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে' অবাধ যাতায়াত ছিল। | চরম অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা অথবা কাছের মানুষদের সুক্ষ্ম যোগসাজশের ইঙ্গিত। |
নেপথ্যের রাজনৈতিক যোগসূত্র | জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের ছেলে সালমান ফয়সালকে হাদীর টিমে অন্তর্ভুক্ত করে। | ঘটনাটি কোনো বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের ভেতরের কোন্দল বা ষড়যন্ত্রের দিকে বেশি নির্দেশ করে। |
ঐতিহাসিক অজ্ঞতা | বঙ্গবন্ধু ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ইতিহাসকে অবজ্ঞা করে নিজের নিরাপত্তা প্রোটোকল উপেক্ষা করা। | "জনগণ আমাকে ভালোবাসে তাই আমি নিরাপদ"—এই অতি-আত্মবিশ্বাস রাজনৈতিক নেতাদের জন্য আত্মঘাতী। |
আক্রমণাত্মক রাজনীতি | শেখ হাসিনাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং গোপালগঞ্জকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার উগ্র হুংকার। | অল্প বয়সে সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া নেতাদের পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। |
জামায়াতের রাজনৈতিক ফায়দা | হাদীর ট্র্যাজেডি ও জনপ্রিয়তা পুঁজি করে জাতীয় নির্বাচনে ৩০ ভোটের আসনে ৭৭টি আসন লাভ। | ব্যক্তিকেন্দ্রিক ট্র্যাজেডিকে নিজেদের রাজনৈতিক ইশতেহারে রূপান্তর করে ফায়দা লোটার চরম উদাহরণ। |
রাজনৈতিক বলির পাঁঠা এবং আমাদের প্রার্থনা
আজ ওসমান হাদীর এই ট্র্যাজেডি আমাদের দেশের তরুণ সমাজের জন্য এক মস্ত বড় সতর্কবার্তা। যারা বড় বড় রাজনৈতিক দলের চটকদার কথায়, ধর্মের অপব্যাখ্যায় এবং সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে অন্ধ হয়ে মাঠের ফ্রন্টলাইনার বা বক্তা হিসেবে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন, তাদের বোঝা উচিত দল আপনাকে কেবল একটি ‘প্রজেক্ট’ হিসেবেই ব্যবহার করছে। যেদিন আপনার উপযোগিতা ফুরিয়ে যাবে, কিংবা যেদিন আপনাকে বলির পাঁঠা বানালে দলের বড় কোনো রাজনৈতিক ফায়দা বা আসন লাভ হবে, সেদিন দল আপনাকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।
ওসমান হাদী নামের এই সম্ভাবনাময় তরুণটি এভাবে নোংরা ও কুৎসিত রাজনীতির শিকার হয়ে যাবেন, তা আমি বা এদেশের কোনো সুস্থ চিন্তার মানুষ কখনো ভাবেনি। দল হয়তো আজ তাঁর রক্ত বিক্রি করে ৭৭টি আসন পেয়ে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে, কিন্তু হাদী হারিয়েছেন তাঁর স্বাভাবিক জীবন, তাঁর পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয় সন্তানকে।
আমি মন থেকে ওসমান হাদীর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে জান্নাত কামনা করি। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং যদি তিনি বেঁচে থাকেন তবে তাকে সুস্থ ও সঠিক সুন্দর বুঝ দান করুন। একই সাথে এদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুরোধ করব আসুন, আমরা অন্ধ দলকানা রাজনীতি পরিহার করি। ক্ষমতার লোভে যারা অন্যের ঘর ভাঙে, যারা ধর্মের নামে পকেট ভারী করে এবং মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তাদের চিনে রাখি। যুদ্ধ হোক কেবলই কথায় ও যুক্তিতে, আর আমাদের মননে বেঁচে থাকুক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব।
লেখক: ডা. সারোয়ার আলম, চিকিৎসক ও ছাত্রনেতা














