>

>

১৯৭২-৭৫ ইতিহাস বিকৃতি ও অপপ্রচার – মুজিবহত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার ষড়যন্ত্র

১৯৭২-৭৫ ইতিহাস বিকৃতি ও অপপ্রচার – মুজিবহত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার ষড়যন্ত্র

১৯৭২–৭৫-এর ইতিহাস নিয়ে সীমাহীন বিকৃতি ও অপপ্রচার করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ করার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বছরের পর বছর। সাম্প্রতিক সময়ে একদল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, অতি-বামপন্থী দল এবং কথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ একটি বিশেষ ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের সেই চতুর ন্যারেটিভটি হলো: “আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জন্য শেখ মুজিবকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ‘অপশাসন ও স্বৈরাচারের’ জন্য তাঁকে ঘৃণা করি এবং তাঁর ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ মনে করি।”

TruthBangla

১৯৭২-৭৫ ইতিহাস বিকৃতি ও অপপ্রচার – মুজিবহত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার ষড়যন্ত্র

১৯৭২–৭৫-এর ইতিহাস নিয়ে সীমাহীন বিকৃতি ও অপপ্রচার করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ করার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বছরের পর বছর। সাম্প্রতিক সময়ে একদল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, অতি-বামপন্থী দল এবং কথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ একটি বিশেষ ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের সেই চতুর ন্যারেটিভটি হলো: “আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জন্য শেখ মুজিবকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ‘অপশাসন ও স্বৈরাচারের’ জন্য তাঁকে ঘৃণা করি এবং তাঁর ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ মনে করি।”

এই কুচক্রী মহলটি চায় মুক্তিযুদ্ধ থেকে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অস্তিত্বকে পুরোপুরি মুছে দিতে। তাদের নিয়োজিত সোশ্যাল মিডিয়া বট এবং তথ্যসন্ত্রাসীরা ১৯৭২–৭৫ সময়কালকে কেবলই 'স্বৈরাচার' বলে চালিয়ে দিতে চায়, কিন্তু যখনই তাদের কাছে এই তথাকথিত অপশাসনের বস্তুনিষ্ঠ উদাহরণ কিংবা তথ্য-প্রমাণ চাওয়া হয়, তখন তারা নিরুত্তর হয়ে যায়। প্রোপাগান্ডাবাজরা এমনকি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে কোনো প্রকার ঐতিহাসিক রেফারেন্স ছাড়াই মিথ্যাচার ছড়িয়ে যাচ্ছে।

এই আর্টিকেলের মূল উদ্দেশ্য হলো সেই মিথ্যাচার ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করা। শূন্যেরও নিচ থেকে একটি স্বাধীন দেশকে দাঁড় করাতে শেখ মুজিব ঠিক কী করেছিলেন, কেমন পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন এবং কেন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড কোনো ‘স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থান’ ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত তার একটি প্রামাণ্য ইতিহাস তুলে ধরা।

সময়ের হিসাব ও ‘শূন্যের নিচের’ বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রথমেই সময়ের হিসাবটা মেপে নেওয়া যাক। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে পরিবার ও স্বজনসহ তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

সময়কাল: ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন (মোট ১,৩১২ দিন)।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের এই সময়সীমার বিচার করতে হলে আগে দেখতে হবে শেখ মুজিব ঠিক কেমন একটি দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন দেশ মুক্ত হয়, তখন বাংলাদেশের অবস্থা কেবল ‘শূন্য’ ছিল না, বরং তা ছিল ‘শূন্যেরও নিচে’

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও রাষ্ট্রের অবস্থা নিরূপণে ১৯৭২ সালে পরিচালিত বিশ্বব্যাংকের জরিপ রিপোর্টের ১২টি প্রধান স্তম্ভ নিচে দেওয়া হলো:

শূন্য রিজার্ভ ও মুদ্রা শূন্যতা: ৯ মাসের যুদ্ধশেষে সরকার গঠনের সময়ে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো মুদ্রা ছিল না, সেন্ট্রাল ব্যাংকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা (Foreign Reserve) বা রিজার্ভ স্বর্ণ ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী যাওয়ার আগে ব্যাংকব্যবস্থা দেউলিয়া করে সমস্ত টাকা পুড়িয়ে ও লুট করে নিয়ে গিয়েছিল।

ভয়াবহ খাদ্য ঘাটতি: টানা ৯ মাস কোনো খাদ্যদ্রব্য আমদানি না হওয়া এবং কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হওয়ায় দেশে তাৎক্ষণিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যের ঘাটতি ছিল।

বীজ শস্যের অভাব: পাকিস্তানি হানাদাররা প্রধান খাদ্য গুদামগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছিল। খাদ্যাভাবে সাধারণ মানুষ প্রজনন ও উৎপাদনের জন্য সংরক্ষিত ‘শস্যবীজ’ পর্যন্ত খেয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল। দেশ দাঁড়িয়ে ছিল এক মহাসংকটের দ্বারপ্রান্তে।

আবাসন ধ্বংসযজ্ঞ: যুদ্ধের সময় কেবল গ্রামাঞ্চলেই ৪৩ লাখ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছিল। শহরগুলোতে ব্যাপক বোমাবর্ষণে অফিস-আদালত ও সরকারি ইমারত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

যোগাযোগ ব্যবস্থার পক্ষাঘাত: দেশের ছোট-বড় ৪০০টিরও বেশি সেতু, কালভার্ট, সমস্ত রেললাইন, সড়কপথ ও ফেরিঘাট ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। পরিবহন ব্যবস্থা বলতে বাস্তবে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

বৃহৎ শিল্পের বিনাশ: দেশজুড়ে ২৩৭টি বৃহৎ শিল্পকারখানার মধ্যে ১৯৫টি কারখানা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং বাকিগুলো আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুরোপুরি বন্ধ পড়েছিল।

পরিত্যক্ত কলকারখানা: শিল্পকারখানার বড় একটি অংশের মালিক ছিল অ-বাঙালিরা (পাকিস্তানি)। যুদ্ধের পর তারা পালিয়ে যাওয়ায় মালিকহীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিপর্যয়: দেশের ৬৬৩টি ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানার প্রতিটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কাঁচামাল ও পুঁজির অভাবে কোনো উৎপাদন ছিল না, লাখ লাখ শ্রমিক ছিল বেকার।

শিক্ষা ব্যবস্থার ধস: যুদ্ধের সময় ৯ শতাধিক কলেজ এবং ৬,০০০ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বোমাবর্ষণে ও আগুনে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও অচল হয়ে পড়েছিল। শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবহারের কোনো জ্বালানি ছিল না।

১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন: ভারত থেকে দেশে ফিরে আসা প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। তারা মাত্র দুই সপ্তাহের রেশনের খাবার নিয়ে দেশে ফিরেছিল। তাদের খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও বাসস্থান নিশ্চিত করা ছিল এক অবিশ্বাস্য মানবিক চ্যালেঞ্জ।

আটকে পড়া জনগোষ্ঠী: পাকিস্তানে আটকে পড়া প্রায় ৪ লাখ বাঙালিকে ফিরিয়ে আনা এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত অ-বাঙালি (বিহারী) জনসংখ্যার পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল একটি বড় প্রশাসনিক সংকট।

সাড়ে তিন বছরে শেখ মুজিবের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় অর্জন

এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব যে অবিশ্বাস্য গতিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠন শুরু করেছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রধান মাত্র ৩ বছর ৭ মাসে তা করে দেখাতে পারেননি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও আইনি পদক্ষেপ

শেখ মুজিব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করেননি।

  • ১৯৭২ সালে বিশেষ অর্ডিন্যান্স (নং ৮০৭) জারি করা হয়।

  • ১৯৭৩ সালে পাশ করা হয় ‘দালাল আইন’ (The Collaborators Ordinance, 1973)

  • যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারের জন্য সারাদেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

  • জাতিসংঘের ভিয়েনা কনভেনশনের ৪-এর ‘ক’ ধারায় উল্লেখিত ১৮ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ৩৭,৪৭১ জন দালাল ও যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের আওতায় এনে ৩৪,০০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

  • এদের মধ্যে ৭৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৪ জনের নাগরিকত্ব বাতিল, ৬৮ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ প্রায় ১১,০০০ অপরাধীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন

মাত্র দুই বছরের মধ্যে ৪০০টিরও বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট, সব রাস্তাঘাট, ফেরিঘাট, লঞ্চ টার্মিনাল ও বিমানবন্দর মেরামত করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রাম ও চালনা সমুদ্রবন্দরে মাইন পুতে রেখেছিল, যাতে বাংলাদেশে কোনো বিদেশি জাহাজ ভিড়তে না পারে। শেখ মুজিব বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার (তৎকালীন সোভিএত ইউনিয়ন) নৌবাহিনীর সহায়তায় জীবনবাজি রেখে মাইন অপসারণ করান এবং বন্দর দুটিকে সচল করেন।

শিক্ষা খাতে বিপ্লব

ক্ষতিগ্রস্ত ৯০০ কলেজ ও ৬,০০০ স্কুল পুনর্নিমাণ করা হয়। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা জোরদার করতে নতুন করে ৭০,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও স্থাপন করা হয়। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ঘোষণা করা হয় এবং নিখরচায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।

বীরাঙ্গনা, যুদ্ধশিশু ও এতিম পুনর্বাসন

পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত লক্ষাধিক নারীর মধ্য থেকে জন্মগ্রহণ করা প্রায় ৪০ হাজার ‘যুদ্ধশিশু’ এবং সমাজে অবহেলিত বীরাঙ্গনাদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করেন শেখ মুজিব। তৎকালীন উগ্র ধর্মভিত্তিক ও রক্ষণশীল সমাজ যখন বীরাঙ্গনাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করছিল, তখন শেখ মুজিব ঘোষণা করেছিলেন: "ওদের বাবার নামের জায়গায় শেখ মুজিবুর রহমান লিখে দাও, আর ঠিকানায় লিখে দাও ধানমন্ডি ৩২।"

বিধবা ও পিতৃমাতৃহীন এতিম শিশুদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র ও সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, ভূমি ও জাতীয় সংস্কৃতি

নতুন সচিবালয় ও সংসদ ভবন: ১৯৭৪ সালে আমেরিকার ডেভিড উইজডম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সাথে চুক্তি করে লুই আই কানের মূল নকশায় আসাদ গেটের উত্তরে ৪২ একর জমির ওপর ৯ তলাবিশিষ্ট আধুনিক নতুন সচিবালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনের কাজ ত্বরান্বিত করা হয়।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলকে সম্মাননা: ভারতে অসুস্থ ও মর্যাদাহীন অবস্থায় থাকা কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে এনে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তাঁকে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা প্রদান করা হয়।

স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার: সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং ঢাকা মেডিকেলের পাশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আধুনিক মূল নকশা ও নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়।

কৃষি ও ভূমি সংস্কার: "লাঙ্গল যার জমি তার" নীতি বাস্তবায়নে লাখ লাখ একর পতিত জমি দরিদ্র কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট: ১৯৭২ সালের ১৫ই ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব ঘোষণা করা হয় এবং তাঁদের চিকিৎসার জন্য ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়।

আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, দেশীয় সশস্ত্র সন্ত্রাস এবং ‘রক্ষীবাহিনী’র প্রকৃত সত্য

একটি স্বাধীন দেশকে অকার্যকর করার জন্য ভেতরে ও বাইরে থেকে কীভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তা বুঝতে না পারলে ১৯৭২–৭৫ এর শাসনব্যবস্থাকে বোঝা সম্ভব নয়।

পাকিস্তানি অপপ্রচার ও আন্তর্জাতিক অবরোধ

পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে লবিং করছিল যাতে কোনো মুসলিম ও পশ্চিমা দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়লে আমরা যেন বাধ্য হয়ে পুনরায় পাকিস্তানের সাথে ‘কনফেডারেশন’ বা কলোনি হিসেবে যুক্ত হতে আরজি জানাই। কিন্তু শেখ মুজিবের দূরদর্শী কূটনীতির কারণে ১৯৭২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে।

দেশীয় সশস্ত্র সন্ত্রাস ও উগ্র বামপন্থী তাণ্ডব

যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ এবং দেশের শত্রু রাজাকার-আলবদরদের হাতের বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র জমা পড়েনি। সিরাজ সিকদারের 'সর্বহারা পার্টি' এবং জাসদের 'গণবাহিনী' নামে একদল উগ্রপন্থী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার জন্য সশস্ত্র পথ বেছে নেয়।

তারা খাদ্য গুদাম, পাটের গুদামে আগুন দেয়, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে এবং থানা ও ব্যাংকে ডাকাতি শুরু করে। সাড়ে তিন বছরে ৪০০টিরও বেশি ব্যাংক ও থানায় সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এই সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের হাতে আওয়ামী লীগের ১০ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য (MP) এবং প্রায় ৬,০০০ নেতাকর্মী নৃশংসভাবে নিহত হন।

"যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। যখন থানা লুট হচ্ছিল, এমপিদের হত্যা করা হচ্ছিল এবং সরকারের খাদ্যবাহী ট্রেনে হামলা চালানো হচ্ছিল, তখন সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাশাপাশি বিশেষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে 'জাতীয় রক্ষী বাহিনী' (JRB) গঠন করা হয়েছিল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনের জন্য।"

শরণার্থীদের বেদখল জমি উদ্ধার

ভারত থেকে ১ কোটি শরণার্থী যখন ফিরে আসে, তখন দেখা যায় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মাতব্বর ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের ঘরবাড়ি ও জমি দখল করে নিয়েছে। বর্তমান যুগেও দেখা যায় প্রভাবশালী দখলদারদের উচ্ছেদ করা কত কঠিন। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে কঠোর হাতে সেই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে অসহায় হিন্দু ও বাঙালি শরণার্থীদের তাঁদের নিজ ভিটেমাটিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন।

১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ: সত্য ইতিহাস বনাম 'ডাস্টবিন প্রোপাগান্ডা'

আজকের দিনে অপপ্রচারকারীরা সবচেয়ে বেশি মিথ্যাচার করে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে। তথাকথিত কিছু ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বট চেল্লাচেল্লি করে বলে যে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে নাকি “১৫ লাখ মানুষ মারা গেছে”! এই ১৫ লাখের তত্ত্বের পক্ষে তারা আজ পর্যন্ত কোনো অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক বা দেশীয় রিপোর্টের রেফারেন্স তুলে ধরতে পারেনি।

৭৪ এর দুর্ভিক্ষের প্রকৃত চিত্র

প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ১৯৭৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা হয়। ফলে আউশ ও আমন ধান পুরোপুরি জলে ভেসে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল: বাংলাদেশ তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চাল কেনার জন্য ‘PL-480’ চুক্তির অধীনে খাদ্যের জাহাজের জন্য পেমেন্ট করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ কিউবার কাছে পাট রপ্তানি করেছিল এই অজুহাতে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানো খাদ্যের জাহাজ মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নেন। এটি ছিল একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক দুর্ভিক্ষ তৈরির নগ্ন চক্রান্ত।

সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ: পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখ মুজিব সারাদেশে ৫,৭০০টি লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। এই লঙ্গরখানাগুলোতে প্রতিদিন ৪০ লাখ মানুষকে বিনামূল্যে একবেলা খাবার দেওয়া হতো।

মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা: সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও খাদ্যাভাব ও মহামারীতে সরকারি হিসাবে ২৭,৫০০ জন মানুষ মারা যান (আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী যা ২৭ থেকে ৩০ হাজার)।

ফায়ার সার্ভিস অ্যানালজি (Fire Service Analogy)

প্রোপাগান্ডাবাজদের যুক্তিকে বুঝতে একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক:

মনে করুন, আপনার বাড়িতে দুষ্কৃতকারীরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর খবর পেয়ে 'ফায়ার সার্ভিস' এলো। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জীবন বাজি রেখে চেষ্টা করা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যবশত বাড়িটির কিছু অংশ পুড়ে গেল।

এখন আপনি যদি অগ্নিকাণ্ডের সমস্ত দোষ আসল আগুন লাগানো দুষ্কৃতকারীদের না দিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে দেন এবং বলেন- "ফায়ার সার্ভিস এসেছিল বলেই বাড়ি পুড়ল, তাই ফায়ারের অফিসারকে হত্যা করা জায়েজ!" তবে তা যেমন উন্মাদনা, শেখ মুজিবের ওপর দুর্ভিক্ষের দায় চাপিয়ে হত্যাকে জায়েজ করাও ঠিক তেমনই একটি দেউলিয়া মানসিকতা।

'বাকশাল' (BAKSAL): একদলীয় স্বৈরাচার নাকি জাতীয় ঐক্যের দ্বিতীয় বিপ্লব?

শেখ মুজিবকে স্বৈরাচার প্রমাণের জন্য প্রোপাগান্ডাবাজদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ১৯৭৫ সালের ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল)। তারা প্রচার করে বাকশাল নাকি ছিল একদলীয় রাজতন্ত্র বা স্বৈরাচার। কিন্তু ইতিহাস ও বাকশালের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করলে সত্যটি ভিন্নভাবে ফুটে ওঠে:

বাকশালের মূল উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য

রাজনৈতিক দল নয়, জাতীয় প্ল্যাটফর্ম: বাকশাল কোনো একক দল ছিল না; এটি ছিল সকল দল ও পেশাজীবীর সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’। এতে ন্যাপ (মুজাফফর), সিপিবিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।

ক্ষমতার চরম বিকেন্দ্রীকরণ: শেখ মুজিব ক্ষমতার একক কেন্দ্র ঢাকাকে ভেঙে দিয়ে দেশের ৬১টি মহকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা ঘোষণা করেন এবং ৬১ জন জেলা গভর্নর নিয়োগ দেন।

সকল পেশাজীবীর অন্তর্ভুক্তি: এই জেলা গভর্নর ও বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ৩ প্রধান, বিডিআর প্রধান, পুলিশ প্রধান, রক্ষীবাহিনীর প্রধান, তিনটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (VC), প্রখ্যাত পত্রিকার সম্পাদক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যুক্ত করা হয়েছিল।

সমবায়ভিত্তিক অর্থনীতি: এর লক্ষ্য ছিল ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ পদ্ধতিতে গ্রামের কৃষক ও শ্রমিকের হাতে ক্ষমতার সুফল পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি গ্রামে সমবায় গঠনের মাধ্যমে দুর্নীতি, চোরাচালান ও মজুতদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা।

১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ এবং ১৫ই আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডি

১৯৭৫ সালের ২১শে জুলাই নবনিযুক্ত ৬১ জন জেলা গভর্নরের প্রশিক্ষণে শেখ মুজিব স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ১৯৭৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে এই গভর্নরদের হাতে সামরিক, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের দায়িত্ব হস্তান্তরিত হবে। প্রশাসন আর ঢাকা বা একক ব্যক্তির হাতে থাকবে না, তা চলে যাবে জনগণের দোরগোড়ায়।

খুনি ও চক্রান্তকারীরা ভালো করেই জানত যদি ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ থেকে বাকশালের গভর্নর পদ্ধতি চালু হয়ে যায়, তবে সেনাকুদেতা (Coup) করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ তখন পাওয়ার সেন্টার ঢাকা থেকে ছড়িয়ে ৬১টি জেলায় বিস্তৃত হয়ে যাবে। তাই ১লা সেপ্টেম্বর আসার মাত্র ১৫ দিন আগে, ১৫ই আগস্টের অন্ধকার রাতে সপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যা করে সেই গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়।

ক্ষেত্রভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ: তথ্য ও অপপ্রচারের খতিয়ান

নিচে ১৯৭২–৭৫ সময়কালের প্রকৃত ঘটনা, শেখ মুজিব সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ এবং আধুনিক প্রোপাগান্ডাবাজদের তৈরি মিথ্যাচারকে একটি ছকের মাধ্যমে তুলনা করা হলো:

বিষয় / ক্ষেত্র

মুক্তিযুদ্ধের পর প্রকৃত অবস্থা (১৯৭২)

শেখ মুজিব সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সাফল্য

আধুনিক বিরোধীদের অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা

ঐতিহাসিক সত্য ও বাস্তব মূল্যায়ন

অর্থনীতি ও খাদ্য

শূন্য রিজার্ভ, ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্প, ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি।

৪,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি সামলে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি, ৫,৭০০ লঙ্গরখানা পরিচালনা।

"৭৪-এর দুর্ভিক্ষে ১৫ লাখ মানুষকে শেখ মুজিব না খাইয়ে মেরে ফেলেছেন।"

দুর্ভিক্ষে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখে মৃত্যু ২৭,৫০০। খাদ্য সংকট সামাল দিতে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিল।

আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা

দেশজুড়ে কোটি কোটি অবৈধ অস্ত্র, থানা লুট ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

'জাতীয় রক্ষী বাহিনী' গঠন, বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী দমন।

"রক্ষীবাহিনী দিয়ে ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।"

রক্ষীবাহিনী ছিল অস্ত্র উদ্ধার ও ডাকাতি দমনের জন্য গঠিত বাহিনী। জাসদ ও সর্বহারার সশস্ত্র হামলায় ১০ জন এমপি ও ৬,০০০ আওয়ামী লীগ কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

চিহ্নিত রাজাকার, আলবদর ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের অবস্থান।

১৯৭৩ সালে দালাল আইন পাস, ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন, ৩৪,০০০ গ্রেপ্তার, ৭৫২ জনের ফাঁসির আদেশ।

"শেখ মুজিব সব রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীকে সাধারণ ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন।"

সাধারণ ক্ষমা ছিল কেবল ছোট অপরাধীদের জন্য। খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার সচল ছিল।

শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল)

অস্থিতিশীল রাজনীতি, চোরাচালান ও অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ৬১ জেলা গভর্নর নিয়োগ, সকল পেশাজীবী ও ৩ বাহিনী প্রধানকে যুক্তকরণ।

"বাকশাল ছিল একদলীয় রাজতন্ত্র ও শেখ মুজিবের স্বৈরাচারী শাসনের প্রতীক।"

বাকশাল ছিল জাতীয় ঐক্যের একটি সাময়িক ফ্রন্ট, যার বাস্তবায়ন ১লা সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা ছিল।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী মনোভাব, স্বীকৃতির অভাব।

জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন (১৯৭৪), ওআইসি সম্মেলন, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য চুক্তি ও স্বীকৃতি।

"শেখ মুজিব দেশকে ভারতের পাপেট বা দাস বানিয়ে রেখেছিলেন।"

ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ ভারতীয় সৈন্য ফেরত পাঠাতে বাধ্য করেন যা বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক সত্যকে ঢাকতে প্রোপাগান্ডাবাজরা যে ধোঁয়াজাল তৈরি করেছে, তাকে গুঁড়িয়ে দিতে আমাদের প্রয়োজন আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য, ভূ-রাজনৈতিক দলিল এবং অর্থনৈতিক নথিপত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কেন নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল এবং কেন ১৫ই আগস্টের ট্র্যাজেডি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না তার নেপথ্যের গোপন ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা, আইনি সংস্কার এবং নথিবদ্ধ ঐতিহাসিক সত্যসমূহ:

৩ মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার ও ১০ মাসে সংবিধান

স্বাধীনতার পর যেকোনো মিত্র দেশ বা পরাশক্তি যখন কোনো নতুন রাষ্ট্রে সামরিক সহায়তা দিয়ে প্রবেশ করে, তখন সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া।

শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক সাহসিকতা: ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেই শেখ মুজিব সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন: "ম্যাডাম, আপনি কবে বাংলাদেশ থেকে আপনার সৈন্য ফেরত নেবেন?" ইন্দিরা গান্ধী স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু শেখ মুজিবের দৃঢ়তার মুখে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চের মধ্যেই সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ত্যাগ করে। এটি কোনো পাপেট বা পুতুল সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করে সংবিধান প্রণয়ন: একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য মাত্র ১০ মাসের মাথায় (৪ নভেম্বর ১৯৭২) বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল। ভারত সংবিধান তৈরি করতে সময় নিয়েছিল ৩ বছর, আর পাকিস্তান সময় নিয়েছিল ৯ বছর। যে নেতা মাত্র ১০ মাসে দেশকে গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেন, তাঁকে ‘প্রথম দিন থেকেই স্বৈরাচার’ বলা রাজনৈতিক মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

শিল্প কারখানা জাতীয়করণ: সমাজতান্ত্রিক বিলাসিতা নাকি বাঁচার বাধ্যবাধকতা?

অপপ্রচারকারীরা দাবি করে যে, ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব অযৌক্তিকভাবে প্রাইভেট সেক্টর ধ্বংস করে সব মিল-কারখানা জাতীয়করণ (Nationalization) করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস কী বলে?

কেন জাতীয়করণ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না?

মালিকদের পলায়ন: ১৯৭১ সালের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানের ৮৫% শিল্পকারখানার মালিক ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি ২২টি পরিবার (আদমজী, ইস্পাহানী, বাওয়ানী ইত্যাদি)। ১৬ই ডিসেম্বরের পর তারা ব্যাংকের সমুদয় ক্যাশ তুলে নিয়ে এবং সমস্ত কাগজপত্র ধ্বংস করে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়।

শ্রমিকদের অনাহার ও কারখানা বন্ধের ঝুঁকি: মালিকহীন, মূলধনহীন এসব কারখানায় হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছিল। যদি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এগুলোকে 'জাতীয়করণ' না করত, তবে দেশের পুরো শিল্পখাত অচলাবস্থায় পড়ে যেত এবং দেশজুড়ে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিত।

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩–১৯৭৮): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. নুরুল ইসলাম ও ড. রহমান সোবহানের নেতৃত্বে পরিকল্পনা কমিশন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করে। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের দিকে অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে সরকার ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করে এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করে।

১৯৭৪-এর কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ: মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নগ্ন প্রতিশোধ

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে শেখ মুজিবের "ব্যর্থতা" হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে প্রোপাগান্ডাবাজরা। কিন্তু নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ আমার্ত্য সেন (Amartya Sen) তাঁর বিখ্যাত গবেষণা "Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation" গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ কোনো 'খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতির' দুর্ভিক্ষ ছিল না, এটি ছিল একটি 'কৃত্রিম ও ভূ-রাজনৈতিক' দুর্ভিক্ষ।

হেনরি কিসিঞ্জারের ভূ-রাজনৈতিক ব্লাকমেইল: বাংলাদেশ তখন অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খাদ্য চুক্তির (PL-480) ওপর নির্ভরশীল ছিল। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়কে নিজের ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে করতেন।

কিউবার কাছে পাট রপ্তানির অছিলা: স্বাধীন বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশ কিউবার কাছে পাটের চট/বস্তা রপ্তানি করেছিল। কিসিঞ্জার এই অজুহাতে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আসা মার্কিন চালবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে যান।

মানবিক বিপর্যয়: যখন দেশের মানুষের খাদ্যের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক খাদ্য ব্ল্যাকমেইল পরিচালনা করে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি করা হয়, যেন শেখ মুজিব সরকার দেউলিয়া হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা নত করে।

জাসদ গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টি ও থানা লুট: আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পেছনের নির্মম সত্য

অপপ্রচারকারীরা জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে (JRB) একটি "ঘাতক বাহিনী" হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু তারা কখনোই বলে না যে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব

জাসদের গণবাহিনী ও সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি: মুক্তিযুদ্ধের পর এই উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো গণতান্ত্রিক ধারাকে অস্বীকার করে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয়। তারা থানা আক্রমণ করে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে অস্ত্র লুট করা শুরু করে।

সংসদ সদস্য ও ইউপি চেয়ারম্যানদের হত্যা: সাড়ে তিন বছরে সিরাজুল আলম খান ও আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন গণবাহিনী এবং সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র ক্যাডাররা আওয়ামী লীগের ১০ জন নির্বাচিত এমপি (যেমন- গাজী ফজলুর রহমান, আমজাদ হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রমুখ) এবং প্রায় ৪০০ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

অর্থনৈতিক সাবোটাজ: তারা পাটের গুদামে আগুন দেওয়া, চলন্ত ট্রেনে বোমা হামলা, ব্রিজে ডিনামাইট মারা এবং ব্যাংকে ডাকাতিকে "বিপ্লবী কাজ" বলে চালিয়ে দিতে থাকে।

"যে দেশে ৪ শতটিরও বেশি ব্যাংকে ডাকাতি হয়, ১০ জন সংসদ সদস্যকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় এবং শত শত থানা থেকে অস্ত্র লুট করা হয় সেখানে কোনো সরকার যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকত, তবে দেশ ১৯৭৩ সালেই একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত 'ফেইল্ড স্টেটে' (Failed State) পরিণত হতো। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী গঠন করে সেই সশস্ত্র নৈরাজ্যবাদকে প্রতিহত করেছিলেন।"

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় কূটনৈতিক সাফল্য: ওআইসি ও জাতিসংঘ

একটি প্রচলিত কথা ছড়ানো হয় যে, শেখ মুজিবের আমলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে ছিল। এটি চরম মিথ্যাচার। ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, এই ৩ বছর ৭ মাসেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সবচেয়ে বড় লাফটি দিয়েছিল।

ওআইসি (OIC) লাহোর সম্মেলন (১৯৭৪): পাকিস্তান চক্রান্ত করেছিল যাতে মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশকে মেনে না নেয়। কিন্তু শেখ মুজিব কূটনীতি দিয়ে এমন অবস্থা তৈরি করেন যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাধ্য হয়ে ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোর সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানান এবং বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

জাতিসংঘে ঐতিহাসিক প্রথম বাংলা ভাষণ: ১৯৭৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে শেখ মুজিব প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।

জুলিও কুড়ি শান্তি পদক (১৯৭৩): সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অবিচল লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ শেখ মুজিবকে মর্যাদাপূর্ণ ‘জুলিও কুড়ি’ (Joliot-Curie) শান্তি পদকে ভূষিত করে।

‘বাকশাল’ (BAKSAL): ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ এবং ১৫ই আগস্টের রাজনৈতিক টাইমিং

১৫ই আগস্ট কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল? এটি কোনো সাধারণ সেনা অভ্যুত্থান ছিল না; এটি ছিল সময় মেপে করা একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

বাকশালের প্রকৃত রূপরেখা (Four Pillars of BAKSAL)

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ─> ৬১ মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর ও জেলা গভর্নর শাসন।

বাধ্যতামূলক বহুমুখী সমবায় ─> ফসলের ৩ ভাগ (১/৩ কৃষক, ১/৩ ভূমিমালিক, ১/৩ সরকার)।

বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ─> মহকুমা ও থানা পর্যায়ে দ্রুত বিচারিক মোবাইল কোর্ট।

জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি ─> রাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দল বন্ধ করে এক ছাতার নিচে উন্নয়ন।

গভর্নর ব্যবস্থার সূচনা (১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৫): বাকশালের অধীনে ৬১ জন জেলা গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। ১৯৭৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে তাঁদের স্ব-স্ব জেলায় গিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করার কথা ছিল।

সেনাবাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ: বাকশাল বাস্তবায়িত হলে সেনানিবাস থেকে সেনা কর্মকর্তাদের এসে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার সব পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। কারণ ক্ষমতা তখন সেনাসদর বা ঢাকা কেন্দ্রিক না থেকে ৬১টি জেলায় বিস্তৃত জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে চলে যেত।

মার্শাল ল'-এর চক্রান্তকারীদের তাগিদ: মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ (Lawrence Lifschultz) তাঁর বিখ্যাত বই "Bangladesh: The Unfinished Revolution" এ নথিপত্রসহ প্রমাণ করেছেন যে, সিআইএ (CIA) এবং খন্দকার মোশতাক-ফারুক-রশীদ চক্র ভালো করেই জানত যদি ১লা সেপ্টেম্বর পার হয়ে যায়, তবে বাকশালের প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে এবং শেখ মুজিবকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা আর কখনোই সম্ভব হবে না। তাই তারা ১৫ই আগস্টের অন্ধকার রাতকে বেছে নিয়েছিল।

১৯৭২–১৯৭৫-এর প্রামাণ্য তথ্যচিত্র ও ঘটনাপঞ্জি

নিচে ১৯৭২–৭৫ সময়ের প্রধান ঘটনা, সেগুলোর পেছনের প্রকৃত কারণ এবং তথাকথিত অপপ্রচারের কাউন্টার পয়েন্টসমূহ ছক আকারে দেওয়া হলো:

সাল ও তারিখ

মূল ঐতিহাসিক ঘটনা

পেছনের প্রকৃত কারণ ও প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা

অপপ্রচারকারীদের ন্যারেটিভ

তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত জবাব

১২ মার্চ, ১৯৭২

ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগ।

শেখ মুজিবের একক ও সরাসরি হস্তক্ষেপে ৩ মাসের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার।

"বাংলাদেশ ভারতের অধীনে একটি স্যাটেলাইট স্টেটে পরিণত হয়েছিল।"

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো মিত্র দেশ এত দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করেনি। এটি শেখ মুজিবের অসামান্য কূটনীতির ফসল।

৪ নভেম্বর, ১৯৭২

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গ্রহণ।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে মাত্র ১০ মাসে বিশ্বমানের প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন।

"শেখ মুজিব শুরু থেকেই সংবিধান ভেঙে একনায়কতন্ত্র চালাতে চেয়েছেন।"

ভারত ৩ বছর এবং পাকিস্তান ৯ বছর নিয়েছিল। ১০ মাসে সংবিধান দেওয়া প্রাগmatic গণতন্ত্রের প্রমাণ।

২৬ মার্চ, ১৯৭৩

১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ৩০০ আসনে স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠান।

"নির্বাচনে কারচুপি করে আওয়ামী লীগ সব আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল।"

যুদ্ধের পরপরই শেখ মুজিব জনগণের আমানত নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী প্রথম নির্বাচন দেন।

১৯৭৩-১৯৭৪

জাসদ গণবাহিনী ও সর্বহারার সহিংসতা।

থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি, ১০ জন এমপি হত্যা এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস।

"সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে রক্ষীবাহিনী বানিয়েছিল।"

সশস্ত্র নৈরাজ্যবাদ থেকে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

জুলাই-আগস্ট, ১৯৭৪

দেশে বন্যা ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ।

বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বৃদ্ধি, বন্যা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের PL-480 চালের জাহাজ আটক।

"শেখ মুজিবের অদক্ষতার কারণে ১৫ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা গেছে।"

মৃতের সংখ্যা ছিল সরকারি হিসাবে ২৭,৫০০। দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ ছিল আমেরিকান ভূ-রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল।

২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫

সংবিধানে ৪র্থ সংশোধনী (বাকশাল)।

অপশাসন, দুর্নীতি, চোরাচালান ও উগ্র সশস্ত্র সন্ত্রাস রোখে 'দ্বিতীয় বিপ্লবের' ঘোষণা।

"এটি ছিল গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ।"

বাকশাল কোনো একক দল ছিল না; এটি ছিল সকল পেশাজীবী ও সামরিক-বেসামরিক আমলাদের জাতীয় ঐক্যমঞ্চ।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড।

১লা সেপ্টেম্বর বাকশালের জেলা গভর্নর ব্যবস্থা চালুর ঠিক ১৫ দিন আগে চক্রান্তমূলক হত্যা।

"স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এটি ছিল ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ও সেনাবাহিনীর স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান।"

এটি ছিল সিআইএ, মোশতাক ও পাকিস্তানি পন্থী চক্রের সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

কেন এই মিথ্যাচার? অপপ্রচারের নেপথ্য রাজনৈতিক এজেন্ডা

আজকে যারা ১৯৭২–৭৫ সময়কালকে কেবলই "অপশাসন" বলে প্রচার করতে চায়, তাদের পেছনে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা কাজ করছে:

গণহত্যাকে জায়েজ করা: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে কেবল একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়নি; সাথে তাঁর গর্ভবতী পুত্রবধূ, শিশু রাসেলসহ অবুঝ স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই জঘন্য অপরাধকে সামাজিকভাবে জায়েজ করার জন্যই তারা "মুজিব অত্যন্ত খারাপ ছিলেন, তাই তাঁকে হত্যা করা ঠিক ছিল" নামক একটি বিকৃত সাইকোলজিক্যাল ন্যারেটিভ তৈরি করতে চায়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কিত করা: তারা জানে, শেখ মুজিবকে যদি খাটো করা যায়, তবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকেও বিতর্কিত করা যাবে। কারণ মুক্তিযুদ্ধ এবং শেখ মুজিব অভিন্ন সত্তা।

বট ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রোপাগান্ডা: আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পেইড বট (Paid Bots) এবং স্পনসরড ভিডিও বানিয়ে কাল্পনিক সংখ্যা (যেমন- ১৫ লাখ মৃত্যু, ৩০ হাজার রক্ষীবাহিনীর হত্যা) ছড়িয়ে দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যার পেছনে কোনো বস্তুনিষ্ঠ দলিল নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২-৭৫ সালের শাসনকাল কোনো ত্রুটিহীন স্বর্গীয় রাজ্য ছিল না; কারণ শূন্যের নিচের একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে নিয়ে অলৌকিক কিছু করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সেখানে ভুলভ্রান্তি ছিল, আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা ছিল, রাজনৈতিক অপকৌশল ছিল।

কিন্তু সেই বাস্তবতাকে আড়াল করে, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সশস্ত্র তাণ্ডবকে অস্বীকার করে শেখ মুজিবকে "স্বৈরাচার" আখ্যা দেওয়া এবং তাঁর পরিবারের নির্মম গণহত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করা এক ধরনের ঐতিহাসিক দেউলিয়াপনা ও স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধ

অপপ্রচারের জবাব ও চূড়ান্ত রাজনৈতিক কাউন্টার

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও তথাকথিত সুশীল সমাজের প্রতি আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন:

১৯৭১ বনাম ১৯৭২-৭৫ এর বিভাজন কেন?

তারা ১৯৭১-এর শেখ মুজিবকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতাকে একটি ‘কৈশিক দুর্ঘটনা’ হিসেবে দেখাতে চায়। কিন্তু সত্য হলো, শেখ মুজিব না থাকলে ১৯৭১ তৈরি হতো না, আর ১৯৭১ না থাকলে ১৯৭২-এর বাংলাদেশ তৈরি হতো না। ১৯৭১ এবং ১৯৭২–৭৫ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একই নেতার অধীনে রাষ্ট্র সৃষ্টি এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ধারাবাহিক মহাকাব্য।

৩ বছর ৭ মাসের অর্জনের সমকক্ষ কেউ আছে?

যে নেতা শূন্য হাতে শুরু করে মাত্র সাড়ে তিন বছরে দেশের সংবিধান প্রণয়ন করেন, সাড়ে সাত কোটি মানুষকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখেন, ৭০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় বানান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেন, বিশ্বের স্বীকৃতি এনে দেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠান তাঁকে ‘স্বৈরাচার’ বলার চেয়ে বড় রাজনৈতিক অকৃতজ্ঞতা আর হতে পারে না। বিশ্ব ইতিহাসে আর কোনো নেতা এত কম সময়ে এত বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে এত বিশাল কাজ করতে পারেননি।

উপসংহার

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা কোনো স্বৈরাচারী শাসকের পতন ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরাশক্তির এক নির্মম ভূ-রাজনৈতিক প্রতিশোধ। চক্রান্তকারীরা চেয়েছিল বাংলাদেশ যেন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পুনরায় পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য হয়।

যে নেতা ৩ বছর ৭ মাসে দেশকে সংবিধান দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছেন, ১ কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসিত করেছেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করেছেন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে চেয়েছেন তিনি ইতিহাসজুড়ে স্বৈরাচার হিসেবে নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী জাতির পিতা হিসেবেই অম্লান হয়ে থাকবেন। তথ্য ও প্রমাণের এই দেয়ালকে প্রোপাগান্ডার কোনো ডিজিটাল বট কখনোই ভেঙে ফেলতে পারবে না।

আজকে যারা ১৯৭২–৭৫-এর কাল্পনিক ‘অপশাসনের’ দোহাই দিয়ে শেখ মুজিব, তাঁর পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করার স্বপ্ন দেখছে, তারা মূলত ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে। শেখ মুজিব যদি ১৯৭৫ সালে বাকশালের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সফল করতে পারতেন, তবে বাংলাদেশ বহু আগেই একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় পরিণত হতো। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না তথ্যসন্ত্রাসীদের সমস্ত মিথ্যাচার ভেঙে চুরমার হয়ে সত্যের এই ঐতিহাসিক খতিয়ান চিরকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 8, 2026

/

Post by

১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

Mar 7, 2026

/

Post by

৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মুক্তির মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা করেছিলেন, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।

Feb 2, 2026

/

Post by

বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় একটি বিতর্ক প্রায়শই ডান-বাম বা বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী থেকে ছুড়ে দেওয়া হয় "মুজিব তো স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে।" এই একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ দশকে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করি এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনের প্রকৃত জনআকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এই অভিযোগটি আসলে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়, বরং এটি ছিল একটি আইনি ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়।

Jan 30, 2026

/

Post by

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শূন্য হাতে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় দেশে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না, রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল বৈদেশিক মুদ্রাশূন্য, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল প্রায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, চালুকৃত শিল্পকারখানাগুলো ছিল মালিকহীন ও বন্ধ, এবং প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ভারত থেকে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করছিল (World Bank, 1972; UN Reports)।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 8, 2026

/

Post by

১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

Mar 7, 2026

/

Post by

৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মুক্তির মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা করেছিলেন, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.