একাত্তরের গণহত্যা ও ধর্মের অপব্যবহার – জামায়াতে ইসলামীর অন্ধকার দলিল
পাকিস্তান সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা যে বিভেদ আর ধ্বংসের রাজনীতি শুরু করেছিল, তার মূলে ছিল ধর্মের জঘন্য অপব্যবহার। একাত্তরের ঘাতক ও তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী ইসলাম ধর্মকে ঢাল বানিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য।

TruthBangla
Oct 7, 2025
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে মুক্তির এক অবিস্মরণীয় উত্থান। কিন্তু এই পবিত্র সংগ্রামে পাকিস্তান সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা যে বিভেদ আর ধ্বংসের রাজনীতি শুরু করেছিল, তার মূলে ছিল ধর্মের জঘন্য অপব্যবহার। একাত্তরের ঘাতক ও তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী ইসলাম ধর্মকে ঢাল বানিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য। আজ যখন সেই ঘাতকদের উত্তরাধিকারীরা নিজেদের অতীত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ‘আপনি কি একাত্তরে ছিলেন?’ বা ‘প্রমাণ কী?’ বলে কুতর্ক করে, তখন তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজন সেই সময়ের ঐতিহাসিক দলিল ও প্রামাণ্য তথ্যগুলো হাতের মুঠোয় রাখা। এই প্রবন্ধটি সেই অন্ধকার সময়ের দলিল, যেখানে ধর্মের নামে গণহত্যা চালানো হয়েছিল এবং মুসলিম পরিচয়ের অপব্যবহার করা হয়েছিল বাঙালি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া জেনোসাইডকে ঢাকার জন্য।
কুতর্কের বিপরীতে প্রামাণ্য দলিল
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক ও অপপ্রচার বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি চলমান সমস্যা। বিশেষত, জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো এবং তাদের অনুসারীরা যখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তারা সরাসরি জবাব না দিয়ে আবেগী ও ভিত্তিহীন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে সত্যকে আড়াল করতে চায়। প্রশ্ন আসে - ‘একাত্তরে তুই ছিলি?’ বা ‘নিজের চোখে দেখছিস?’ এ ধরনের কুতর্ক জামাত শিবিরের কিছু অনুসারী বা আবেগী যুবকের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও, সভ্য সমাজে এর কোনো স্থান নেই।
একাত্তরের ভয়াবহ গণহত্যাকে অস্বীকার করা বা তার সঙ্গে যুক্তদের মানবিক করার চেষ্টা করা শুধু ইতিহাসের প্রতি নয়, ৩০ লাখ শহীদের প্রতিও চরম অবমাননা। আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ কেবল 'চাক্ষুষ দেখা'র মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা দলিল, সংবাদপত্র, সরকারি নথি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেও প্রতিষ্ঠিত। এই প্রবন্ধে আমরা সেইসব ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং তৎকালীন প্রচারণার কৌশল বিশ্লেষণ করব, যেখানে ধর্মের অপব্যবহার ছিল মূল হাতিয়ার।
গোলাম আযম ও মিথ্যা ‘অধ্যাপক’ উপাধি – মূল ক্রীড়নক
একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিলে তাদের এদেশীয় দোসররা যে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল, তার প্রধান রাজনৈতিক ক্রীড়নক ছিলেন গোলাম আযম (গোআ)।
উপাধির অপব্যবহার: মজার বিষয় হলো, জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীরা গোলাম আযমের নামের আগে ‘অধ্যাপক’ উপাধি ব্যবহার করত। অথচ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে শিক্ষকতা করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তার ছিল না। এই উপাধি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শিক্ষিত সমাজের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং তার ফতোয়া ও বক্তব্যকে বিদ্বান মানুষের মতামত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
ধর্মের ঢাল: গোলাম আযমের নেতৃত্বে পরিচালিত গণহত্যার মূল প্রচারণার কৌশল ছিল ধর্মকে ঢাল বানানো। তাদের প্রপাগান্ডার মূল কথা ছিল:
"পূর্ব পাকিস্তান হিন্দুস্তান হয়ে যাবে।"
"এই যুদ্ধ হিন্দুস্তানি চাল।"
"হিন্দুত্ববাদের হাত থেকে পাকিস্তানের ইসলামকে রক্ষা করতে হবে।"
এই প্রচারণার মাধ্যমে তারা মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে ভারত ও হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে একটি অস্তিত্ব রক্ষার জেহাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যাতে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা বিভ্রান্ত হয়ে তাদের পক্ষে যোগ দেয়।
ধর্মের নামে বিভেদ ও গণহত্যার নির্দেশ
গোলাম আযম শুধু সাধারণ প্রচারণা চালাননি, তিনি সরাসরি সামরিক জান্তার গণহত্যার পক্ষে জনমত তৈরি করতে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ জারি করেছিলেন।
কুষ্টিয়া সম্মেলন ও শান্তি কমিটি গঠন
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সম্মেলনে গোলাম আযম অত্যন্ত উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন।
শত্রু চিহ্নিতকরণ: তিনি বলেন - "হিন্দুরা মুসলমানদের শত্রু, তারা সবসময় পাকিস্তানকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে।" এর মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ভারতীয় বা হিন্দু মদদপুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান।
সশস্ত্র প্রতিরোধ: ওই সম্মেলনেই গোআ প্রতি গ্রামে শান্তি কমিটি গঠন করে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে রুখে দেওয়া ও নির্মূল করার নির্দেশ দেন। এই শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীই ছিল মূলত পাকিস্তানি বাহিনীর স্থানীয় ঘাতক সহযোগী, যারা তথ্য সরবরাহ, লুটপাট, ধর্ষণ ও হত্যায় সরাসরি অংশ নিত।
ধর্মীয় অপব্যাখ্যা – গণহত্যার পক্ষে জনমত সৃষ্টি
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জামায়াতের বিভিন্ন সম্মেলন, সভা, বক্তৃতা, সেমিনার ও আলোচনায় বারবার ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক চালিত গণহ:ত্যার পক্ষে সমর্থন তৈরী করার চেষ্টা করা হয়েছিল। নিচে তারিখ ও সূত্র ধরে সেইসব প্রচারণার প্রমাণ তুলে ধরা হলো:
'পাকিস্তান রক্ষার জন্য গোলাম আজমের মোনাজাত' –[দৈনিক সংগ্রাম, ১৩ এপ্রিল ১৯৭১]: এই শিরোনাম প্রমাণ করে, তারা পাকিস্তানকে ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলমানদের’ রক্ষাকবচ হিসেবে উপস্থাপন করে একটি জাতীয়তাবাদী যুদ্ধকে একটি ধর্মীয় আবরণে মুড়ে দিতে চেয়েছিল।
'ভারত মুসলমানদের হিন্দু বানাতে চাচ্ছে তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নৃশংসতা চালাচ্ছে বলে গুজব ছড়াচ্ছে' – [দৈনিক সংগ্রাম, ১৬ এপ্রিল ১৯৭১]: এর মাধ্যমে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার মতো চরম সত্যকেও অস্বীকার করে, সেটিকে ভারতীয় প্রপাগান্ডা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
সংবাদপত্র ও দলিলের ভিত্তিতে জামায়াতের কুখ্যাত স্লোগান ও প্রচার
দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক আজাদী-এর মতো তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণার প্রধান মাধ্যম ছিল। এই দলিলগুলোই তাদের একাত্তরের ভূমিকার অকাট্য প্রমাণ।
আল-বদর ও ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে জেহাদ
জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতৃত্বে গঠিত হয় কুখ্যাত আল-বদর বাহিনী, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবী নির্মূল করা।
কুখ্যাত স্লোগান (২২ এপ্রিল ১৯৭১): 'যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী সেখানেই আলবদর' এই স্লোগান নিয়ে আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। (সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ ২২/২৩ এপ্রিল)। এর মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ‘তথাকথিত’ বা ‘ভুয়া’ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নির্মূলে আল-বদরকে সামরিক ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করেছিল।
ইসলামী স্লোগান প্রতিস্থাপন (১২ মে ১৯৭১): জামায়াতের মতে, 'আল্লাহ আকবরের জায়গায় জয় বাংলা দখল করে নিয়েছে' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)। এর মাধ্যমে তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকী স্লোগান ‘জয় বাংলা’-কে ইসলাম বিরোধী বলে প্রচার করে, যা সাধারণ মানুষের মনে বিভেদ সৃষ্টি করে।
ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা (১-৫ জুলাই ১৯৭১): তারা প্রচার করে যে, 'জয় বাংলা স্লোগানে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ বাতাস কলুষিত হয়েছে। তথাকতিত ধর্মনিরপেক্ষদের ধর্মবিরোধী অত্যাচার শুরু হয়েছে।' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)। এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ধর্মনিরপেক্ষতা বা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তারা ধর্মবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
রাজাকার বাহিনী গঠন ও মুসলিম পরিচয়ের অপব্যবহার
জামায়াত নেতারা গ্রামে গ্রামে স্বেচ্ছাসেবী দল ও রাজাকার বাহিনী গঠনে সরাসরি মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আব্দুল খালেকের আহ্বান (৩ ও ৯ জুলাই ১৯৭১): জামায়াত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক আহ্বান জানান: 'গ্রামে গ্রামে রক্ষীদল গঠন করুন' (সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান)। পরে তিনি গর্বের সঙ্গে প্রচার করেন: 'জনগণ এখন স্বেচ্ছায় রাজাকারের ট্রেনিং নিচ্ছে' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)। এর মাধ্যমে তারা রাজাকার বাহিনীকে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বাহিনী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল।
কোরআন ছুঁয়ে শপথ: মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর শপথ গ্রহণ করানো হতো পবিত্র কোরানকে ছুঁয়ে। এই ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল, রাজাকারদের কর্মকাণ্ডকে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের অপরাধকে ধর্মীয় নৈতিকতা দিয়ে আড়াল করা। এই কোরআন ছুঁয়েই তারা পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম গণহত্যাটি চালিয়েছিল।
শহীদ মিনার ও সাংস্কৃতিক বিরোধ – সাংস্কৃতিক নির্মূল অভিযান
ধর্মের অপব্যবহার শুধু গণহত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল বাঙালি সংস্কৃতি ও চেতনার বিরুদ্ধেও একটি যুদ্ধ।
শহীদ মিনার ধ্বংস (১৬ জুলাই ১৯৭১): দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে (১৬ জুলাই ১৯৭১) লেখা হয় - 'সেনাবাহিনী কুখ্যাত শহীদ মিনারটি ধ্বংস করে মসজিদ গড়েছে।' এই সংবাদটির মাধ্যমে তারা বোঝাতে চেয়েছিল যে, শহীদ মিনার হলো ইসলাম বিরোধী প্রতীক এবং এর ধ্বংস ছিল ইসলামের বিজয়। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা এভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিটি প্রতীককে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল।
মতিউর রহমান নিজামী ও অন্যদের প্রোপাগান্ডা – জেহাদি চেতনা
জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রনেতা মতিউর রহমান নিজামী (পরবর্তীতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী) গণহত্যার পক্ষে সবচেয়ে উগ্র প্রচারণাকারীদের অন্যতম ছিলেন।
পাকিস্তানি সেনাদের 'ভাই' আখ্যা
নিজামী পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতাকে অস্বীকার করে তাদের ‘জেহাদি চেতনা’য় উজ্জীবিত বলে প্রচার করেন।
'পাক সেনারা আমাদের ভাই' (৩ আগস্ট ১৯৭১): নিজামী বলেন - 'পাক সেনারা আমাদের ভাই, তারা জেহাদি চেতনায় উজ্জীবিত।' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)। গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করছে, তাদের ‘ভাই’ এবং ‘জেহাদি’ আখ্যা দিয়ে তিনি সাধারণ মুসলিমদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন।
ইসলাম ও পাকিস্তানের অভিন্নতা প্রচার
জামায়াত নেতারা ইসলামকে পাকিস্তানের সঙ্গে এমনভাবে এক করে ফেলেছিলেন যে, পাকিস্তানের বিরোধিতা করা মানে ইসলামের বিরোধিতা করা।
'ইসলামকেই উৎখাত করতে চায়' (৩০ আগস্ট ১৯৭১): নিজামী প্রচার করেন - 'পাকিস্তানকে যারা বিচ্ছিন্ন করতে চায়, তারা ইসলামকেই উৎখাত করতে চায়' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)।
'এক ও অভিন্ন মনে করে' (১৬ নভেম্বর ১৯৭১): গোলাম আযমও বারবার জোর দেন - 'জামায়াতে ইসলামী ইসলাম ও পাকিস্তানকে এক ও অভিন্ন মনে করে' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)।
এই কৌশলটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে, যারা স্বাধীনতা চাইছিল, তাদের উপর ‘কাফের’ বা ‘ইসলামের শত্রু’র তকমা লাগানো সহজ হয়ে গিয়েছিল এবং জামায়াত গণহত্যার পক্ষে ফতোয়া দেওয়াকে যৌক্তিক মনে করেছিল।
হিন্দু বিরোধী প্রোপাগান্ডা – গণহত্যার লক্ষ্য নির্ধারণ
জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল হিন্দু ও ভারতীয় বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো। এই প্রচারণার মাধ্যমে তারা গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দিত।
হিন্দুদের দুশমন আখ্যা
গোলাম আযম তার প্রচারণায় বারবার হিন্দুদের মুসলমানদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতেন।
'ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন' (১২ আগস্ট ১৯৭১): গোলাম আজম প্রচার করেন - 'তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলনের সমর্থকরা ইসলাম, পাকিস্তান ও মুসলমানদের দুশমন' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)।
'আওয়ামী লীগ হিন্দু ভারতের প্রচারক' (৩০ আগস্ট ১৯৭১): দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয় - 'হিন্দু ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের প্রচারক আওয়ামীলীগ' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদকীয়)। এর মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তি সংগ্রামকে ভারত ও হিন্দুদের এজেন্ডা হিসেবে চিহ্নিত করত।
মুক্তিবাহিনীর পরিচয় বিকৃতি
হিন্দু বিরোধী এই প্রোপাগান্ডা সরাসরি গণহত্যার টার্গেটকে প্রভাবিত করেছিল।
'৯০জন হিন্দু' (১৩ অক্টোবর ১৯৭১): দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদকীয়তে লেখা হয় - 'তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর শতকরা ৯০জন হিন্দু'। এর মাধ্যমে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে বার্তা দিত যে, যারা মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতার পক্ষে আছে, তারা মূলত হিন্দু। এর ফলস্বরূপ, পাকিস্তানি বাহিনী বেছে বেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর গণহত্যা ও অত্যাচার চালায়।
আব্বাস আলী খানের উগ্রতা
জামায়াতের নেতারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার উগ্র আহ্বান জানান।
'কলকাতা ও দিল্লিতে নামাজ' (১০ নভেম্বর ১৯৭১): আব্বাস আলী খান উগ্র মন্তব্য করেন - 'ভারত আক্রমণ করলে কলকাতা ও দিল্লিতে নামাজ পড়বো' (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম)। এই ধরনের উগ্র ও বাস্তবতাবিবর্জিত বক্তব্য প্রমাণ করে, তারা শেষ পর্যন্ত জেহাদি জিগির তুলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিল।
মুসলিম আইডেন্টিটি অপব্যবহারের দায়ভার
একাত্তরের ঘাতকদের বিচারে মুসলিম আইডেন্টিটির অপব্যবহার ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের এক চরম উদাহরণ। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসররা যে ধর্মকে ঢাল বানিয়েছিল, তার প্রমাণ কেবল ৩০ লাখ শহীদের রক্ত নয়, বরং তাদের নিজেদের প্রকাশিত সংবাদপত্র, বক্তৃতা এবং তৎকালীন দলিলপত্রের মধ্যেই স্পষ্ট। যারা আজ ‘প্রমাণ নেই’ বলে কুতর্ক করে, তারা আসলে এই ঐতিহাসিক দলিলগুলো উপেক্ষা করতে চায়:
রাজাকার বাহিনী গঠন এবং কোরআন ছুঁয়ে শপথ করানো ছিল ধর্মের অপব্যবহারের সরাসরি প্রমাণ।
পাকিস্তানি সৈন্যদের ‘জেহাদি’ ও ‘ভাই’ আখ্যা দেওয়া ছিল গণহত্যার পক্ষে নৈতিক সমর্থন।
শহীদ মিনারকে ‘কুখ্যাত’ বলে মসজিদ গড়ার প্রচার ছিল সাংস্কৃতিক নির্মূল অভিযানের ধর্মীয় সমর্থন।
মুক্তিযোদ্ধাদের হিন্দু ও ভারতের দালাল আখ্যা দেওয়া ছিল গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দেওয়া।
উপসংহার
এই দলিলগুলো প্রমাণ করে, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতারা সজ্ঞানে, সুপরিকল্পিতভাবে এবং ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে একাত্তরের গণহত্যায় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই ঐতিহাসিক দায়ভার অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই তথ্যসূত্রগুলোই তাদের মুখের উপর ঝামা ঘষে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, যারা নিজেদের রাজাকারের বাচ্চা মনে করেন না, কিন্তু ইতিহাস বিকৃতিকে প্রশ্রয় দেন।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















