শেখ কামালের ১৯৭৩ সালের 'ব্যাংক ডাকাতি'র মিথ্যা রটনা ও সত্যের উদঘাটন
বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও নির্মমভাবে অপপ্রচারের শিকার হওয়া সবচেয়ে বড় ভিকটিম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ার অপরাধে তাঁকে স্বাধীনতার পর থেকেই দেশবিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্বাধীনতাবিরোধী গুপ্ত রাজাকার চক্র এবং মাওবাদী জাসদপন্থী প্রচারমাধ্যমগুলোর হিংসাত্মক অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হতে হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর এই অপপ্রচার আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

TruthBangla

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও নির্মমভাবে অপপ্রচারের শিকার হওয়া সবচেয়ে বড় ভিকটিম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ার অপরাধে তাঁকে স্বাধীনতার পর থেকেই দেশবিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্বাধীনতাবিরোধী গুপ্ত রাজাকার চক্র এবং মাওবাদী জাসদপন্থী প্রচারমাধ্যমগুলোর হিংসাত্মক অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হতে হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর এই অপপ্রচার আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। খুনি চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা দখল ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতিকে জায়েজ করতে শেখ কামালের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত মিথ্যাচার ছড়িয়ে দিয়েছিল।
তার বিরুদ্ধে করা সবচেয়ে পরিকল্পিত, নিকৃষ্ট ও স্পর্শকাতর অপপ্রচারটি ছিল ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগের রাতে (১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে) ঢাকার মতিঝিলে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি’ করতে গিয়ে তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই এই রাজনৈতিক গুজবটিকে জিইয়ে রাখা হয়েছিল। তবে সমসাময়িক ইতিহাস, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ঘটনার সময় উপস্থিত দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের তদন্ত এবং দেশি-বিদেশি পত্রিকার প্রামাণ্য দলিল বিশ্লেষণ করলে সত্যটা পরিষ্কার ফুটে ওঠে। এটি কোনো ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ছিল না, বরং বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও সাবোটাজকারীদের ধাওয়া করতে গিয়ে পুলিশের ভুল বোঝাবুঝির (Mistaken Identity) কারণে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।
১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার সংকট
১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাস ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও স্পর্শকাতর এক সময়। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেন্জ, অন্যদিকে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সশস্ত্র শাখা 'গণবাহিনী'র দেশব্যাপী সহিংস ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড। জাসদের নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, মেজর (অব.) এম এ জলিল, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ এবং পরবর্তীতে হাসানুল হক ইনু। অন্যদিকে ছাত্রলীগের ছাত্ররাজনীতি দ্বিখণ্ডিত হয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে তরুণদের অস্ত্র তুলে দেওয়ার উসাকনি দেওয়া হচ্ছিল।
জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও মাওবাদী সংগঠন সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে 'কালো দিবস' ঘোষনা দিয়ে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী বিজয় দিবস বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং লিফলেট বিলি করে তারা ঘোষণা করে জাতীয় প্রেসক্লাব, পত্রিকা অফিস, কমলাপুর রেলস্টেশন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ বোমা মেড়ে উড়িয়ে দেয়ার।
এই হুমকির বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ঘটনার দুই দিন আগে, ১৯৭৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর। ঐ দিন ঢাকায় দুটি স্থানে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয় একটি 'দৈনিক বাংলার বাণী' অফিসে (যার মালিক ছিলেন শেখ কামালের ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল হক মনি) এবং অপরটি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স অফিসে। দুটি বোমাই ছোঁড়া হয়েছিল একটি চলন্ত লাল রঙের টয়োটা গাড়ি থেকে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বিপরীতে তৎকালীন ঢাকা শহরের নিরাপত্তার চিত্র ছিল অত্যন্ত করুণ। পুরো ঢাকা মহানগরে তখন থানা ছিল মাত্র ৮টি। প্রতিটি থানায় পুলিশ সদস্য ছিলেন গড়ে মাত্র ২৪ জন। পুলিশ লাইনেও অস্ত্রধারী অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য খুব বেশি ছিল না। এই স্বল্পসংখ্যক বলপ্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে সমগ্র রাজধানীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় বিজয় দিবসের জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় জাতীয়তাবাদী তরুণরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সাধারণ পোশাকে টহল ও পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে গিয়ে অনেকেই তাদের গাড়ির নম্বর ও নাম নিবন্ধিত করে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ মধ্যরাতের ঘটনা
১৫ ডিসেম্বর রাত তখন প্রায় ১১টা। পরদিন স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিজয় বার্ষিকী। পুরো ঢাকা শহর আলোয় ঝলমল করছিল, মানুষের মাঝে ছিল ঈদের মতো আমেজ। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। সেদিন রাতে শেখ কামাল প্রথমে ঢাকা কলেজের সামনে এবং পরবর্তীতে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিপরীতে ৩০ নম্বর মিরপুর রোডে অবস্থিত ছাত্রলীগ কার্যালয়ে সহযোদ্ধা ও বন্ধুদের সাথে মিলিত হন। সর্বহারা পার্টির নাশকতার খবর পেয়ে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে তারা মতিঝিল অভিমুখে রওয়ানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের বহরে ছিল দুটি গাড়ি একটি ৯ সিটের সাদা ভক্সওয়াগন (Volkswagen) মাইক্রোবাস এবং একটি সাপোর্ট জিপ।
শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা আবাহনী ক্লাবের ব্যবহার করা একটি ৯ সিটের সাদা ভক্সওয়াগন (Volkswagen) মাইক্রোবাস এবং পেছনে একটি জিপ গাড়ি নিয়ে বের হন।
সাদা ভক্সওয়াগন মাইক্রোবাস (১০ জন আরোহী):
চালক: শাহান চৌধুরী (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী শমসের মবিন চৌধুরীর ছোট ভাই)।
সামনের সিট (মাঝখানে): কাজী আনোয়ারুল হক তারেক (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি; পরবর্তীতে আবাহনী ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক)।
সামনের সিট (ডানে): শহীদ শেখ কামাল (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি)।
দ্বিতীয় সারি (বাম): আবুল ফজল মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি; যিনি পরবর্তীতে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করেন)।
দ্বিতীয় সারি (মাঝখানে): রুহুল আমিন খোকা (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি; পরবর্তীতে শুল্ক বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট)।
দ্বিতীয় সারি (ডানে): মুনির (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি; পরবর্তীতে কানাডা প্রবাসী)।
তৃতীয় সারি (বাম): ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি; পরবর্তীতে বিএনপির প্রবীণ নেতা ও প্রতিমন্ত্রী)।
তৃতীয় সারি (মাঝখানে): বরকত-ই-খোদা (শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু; পরবর্তীতে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার)।
তৃতীয় সারি (ডানে): কাজী সিরাজ (চুয়াডাঙ্গা থেকে আগত বন্ধু)।
লাগেজ স্পেস: খোকা (আকারে ছোটখাটো এক বন্ধু)।
পেছনের জিপ গাড়িতে ছিলেন ৫ জন:
রেজাউল করিম (ব্যবসায়ী), শাহেদ রেজা (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা), শেখ রফিক (ব্যবসায়ী), আক্কাস (ব্যবসায়ী) এবং মন্টু। এই জিপ গাড়িটি ছিল রেজাউলের পারিবারিক গাড়ি এবং এটি ড্রাইভ করছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু/রেজাউল স্বয়ং।
সন্দেহভাজন গাড়ি ধাওয়া ও কমলাপুরের ভুল বোঝাবুঝি
মাইক্রোবাসটি ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সংসদ ভবন এলাকা, ফার্মগেট, বাংলা মোটর, মালিবাগ ও রাজারবাগ হয়ে রাত বারোটার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরের দিকে এগোতে থাকে। এমন সময় বিপরীত দিক থেকে মুখ চাদর ও মাফলারে ঢাকা যাত্রীসহ একটি লাল রঙের গাড়ি দ্রুত বেগে অতিক্রম করতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়। দুই দিন আগের 'বাংলার বাণী' অফিসের বোমা হামলায় ব্যবহৃত লাল রঙের টয়োটা গাড়ির তথ্যের সাথে মিল পেয়ে শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা ধরে নেন, এরা নির্ঘাত সিরাজ সিকদারের সন্ত্রাসী বাহিনী।
তারা তৎক্ষণাৎ মাইক্রোবাস ঘুরিয়ে লাল গাড়িটিকে ধাওয়া করেন এবং কমলাপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন চিটাগং হোটেলের সামনে গিয়ে সেটিকে গতিরোধ করেন। তবে তল্লাশি চালিয়ে এবং যাত্রীদের সাথে কথা বলে তারা জানতে পারেন, যাত্রীরা সাধারণ পথচারী এবং শীতের তীব্রতার কারণে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। ভুল বুঝতে পেরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এসবি ফাঁড়ির মোড় এবং অতর্কিত গুলিবর্ষণ
কমলাপুরে প্রথম গাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার পরই ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও অন্যরা দেখতে পান, আল হেলাল হোটেলের সামনে আরেকটি লাল রঙের টয়োটা গাড়ি তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে। গাড়িটি আলো নিভিয়ে কমলাপুরের দিক থেকে কবি জসীমউদ্দীন রোডের ছোট পুল পার হয়ে দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে চলে যায়।
প্রকৃতপক্ষে, ঐ লাল টয়োটা গাড়িতে টহলে ছিলেন পুলিশের সার্জেন্ট শামীম কিবরিয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশেই অবস্থিত ছিল মুসলিম লীগের প্রাক্তন এমএনএ ওয়াহিদুজ্জামানের অধিগ্রহণকৃত বাসভবন, যা তৎকালীন সময়ে 'স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) ২ নম্বর ফাঁড়ি' হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সার্জেন্ট কিবরিয়া ধাবমান ভক্সওয়াগন ও জিপটিকে সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র হামলাকারী মনে করে দ্রুত ফাঁড়িতে ঢোকেন। তিনি সাথে সাথে ওয়াকিটকিতে ফাঁড়ির সব বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং ছাদ ও বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে থ্রি-নট-থ্রি (.303) rifle সহ পুলিশ সদস্যদের প্রস্তুত থাকার আদেশ দেন।
শেখ কামালের মাইক্রোবাসটি পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে সরাসরি পুলিশ ফাঁড়ির সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। কোনোপ্রকার আগাম সতর্কবার্তা বা সংকেত না দিয়েই ছাদ ও চারপাশ থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের উপর্যুপরি ফায়ারিং শুরু হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফাঁড়ি প্রাঙ্গণ রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং থ্রি-নট-থ্রি বুলেট মাইক্রোবাসের ছাদ ও বডি ভেদ করে ভেতরে থাকা যাত্রীদের বিদ্ধ করে।
শেখ কামাল সহ ৫ জন গুলিবিদ্ধ
গুলির মুখে শেখ কামালের কাঁধে ও কলার বোনে ৪টি বুলেট বিদ্ধ হয়। ভ্যানে থাকা আরও ৫ জন বন্ধু মারাত্মকভাবে জখম হন; একজনের হাতের ৪টি আঙুল উড়ে যায় এবং অন্যদের পিঠ ও পায়ে গুলি লাগে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু চিৎকার করে ওঠেন, "এটা তো স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিস!"
রক্তাক্ত অবস্থায় শেখ কামাল ধোঁয়াটে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলতে থাকেন: "আমি শেখ কামাল! আমি শেখ কামাল!"
শেখ কামালের কণ্ঠস্বর শুনে এবং তাঁকে চিনতে পেরে সার্জেন্ট শামীম কিবরিয়া ও সাব-ইনস্পেক্টর নিয়ামত আলী আতঙ্কিত ও স্তম্ভিত হয়ে হাতের অস্ত্র ফেলে দেন। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন এবং শেখ কামালকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “স্যার ভুল হয়ে গেছে! আমরা ভেবেছিলাম এটা সিরাজ সিকদারের সন্ত্রাসীদের গাড়ি!”
দুর্ঘটনার সাথে সাথেই পুলিশ ও ঘটনাস্থলে থাকা সহকর্মীরা রক্তাক্ত শেখ কামাল ও আহত বন্ধুদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি চিকিৎসায় শেখ কামালের শরীর থেকে গুলি বের করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হন। পরবর্তীতে কাঁধের গভীরের ৪র্থ বুলেটটি অপসারণের জন্য তাঁকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোতে নিয়ে যেতে হয়েছিল। তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার জাস্টিস শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত পরিচালিত হয়।
তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঘটনাটি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারিত 'ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা' ছিল না; বরং সেটি ছিল সর্বহারা পার্টির নাশকতার আতঙ্কের মুখে পুলিশ ও শেখ কামালের নেতৃত্বাধীন যুব দলের পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঘটা একটি মর্মান্তিক "ফ্রেন্ডলি ফায়ার" (Friendly Fire) ঘটনা।
প্রশাসনিক তদন্ত ও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শীতা
ঢাকার তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) মাহবুব উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং সিটি এডিশনাল এসপি আব্দুস সালাম তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘটনার তদন্ত পরিচালনা করেন। এসপি মাহবুব নিজেই পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাক্ষাৎকারে পুরো বিবরণ দেন।
১৬ ডিসেম্বর সকালবেলা এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমদ সোজা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে পুলিশের ভুলের দায় স্বীকার করেন। তিনি বলেন,
"স্যার, আমার পুলিশ অফিসাররা না বুঝে কামালের ওপর গুলি চালিয়েছে। সব দায় আমার। শাস্তি দিতে হলে আমাকে দিন।"
বঙ্গবন্ধু একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিস্থিতি বুঝেছিলেন। তিনি এসপি মাহবুবকে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করেন এবং বলেন:
"তোর ভাবী শুনলে ভীষণ চটে যাবে। যারা গুলি করেছে তাদের আপাতত ক্লোজ করে রাখ। ছাত্রলীগের পোলাপানের কাছ থেকে ওদের দূরে রাখিস। ক'টা দিন গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু যখন গোপনে হাসপাতালে শেখ কামালকে দেখতে যান, তখন পাশে বসে থাকা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ক্ষুব্ধ ও বেদনার্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
"তোমার রাজত্বে তোমার ছেলে তোমার পুলিশের গুলি খায়! আমি আর এ দেশে থাকব না, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিদেশে চলে যাব।"
বঙ্গবন্ধু কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেননি, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রকাশ করেননি বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি।

অপপ্রচারের জন্ম ও গণমাধ্যমের হলুদ সাংবাদিকতা
১৯৭২-১৯৭৫ মেয়াদে বঙ্গবন্ধু সরকারকে অস্থিতিশীল করতে যেসব সংবাদপত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল, তার মধ্যে শীর্ষে ছিল জাসদের মুখপত্র 'দৈনিক গণকণ্ঠ' এবং মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর সমর্থিত পত্রিকা 'হক কথা'।
ঘটনাটি ঘটেছিল মতিঝিল, বাংলাদেশ ব্যাংক ও তৎকালীন আইয়ুব খানের মন্ত্রী ওহিদুজ্জামানের বাড়ির সংলগ্ন এলাকায়। স্থানটি ব্যাংক পাড়ার কাছাকাছি হওয়ায় সরকারবিরোধী চরমপন্থী ও অতিবাম দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে রাতারাতি একে 'ব্যাংক ডাকাতি'র রূপ দেয়।
'দৈনিক গণকণ্ঠ' ও 'হক কথা'র মিথ্যাচার: ১৭ ডিসেম্বর ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ কোনো প্রশাসনিক তদন্ত বা পুলিশের অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট ছাড়াই কেবল "মতিঝিল ও বাংলাদেশ ব্যাংক এলাকা" নামটি ব্যবহার করে মনগড়া একটি ডেসক্রিপটিভ স্টোরি বানায়। তারা মূল শিরোনাম করে শেখ কামালকে অভিযুক্ত করে।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৩, বিজয় দিবসের সকালে জাসদের মুখপত্র এবং কবি আল মাহমুদ সম্পাদিত ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ এবং মওলানা ভাসানী ও জাদুমিয়া পরিচালিত ‘হক কথা’ পত্রিকায় চরম মিথ্যাচার করে বিশাল ব্যানার হেডলাইন করা হয়:
"প্রধানমন্ত্রীর পুত্র শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত"
তারা কোনো তথ্যপ্রমাণ বা প্রশাসনিক বক্তব্য ছাড়াই কাল্পনিক এই সংবাদটি পরিবেশন করে সারাদেশে রটিয়ে দেয়।
মূলধারার পত্রিকা ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের সাক্ষ্য
অন্যদিকে সে সময়ের মূলধারার দায়িত্বশীল সংবাদপত্রগুলো প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছিল:
দৈনিক ইত্তেফাক (১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৩): ইত্তেফাক স্পষ্টভাবে তাদের প্রতিবেদনে লিখেছিল যে, সিরাজ সিকদারের দুষ্কৃতকারী গাড়ি মনে করে পুলিশ ভুল বোঝাবুঝির কারণে শেখ কামালের গাড়িতে গুলি চালায়। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত খবরের মূল বক্তব্য হলো:
“সিরাজের গাড়ি ভেবে শেখ কামালের গাড়িতে পুলিশের গুলিবর্ষণে শেখ কামাল গুলিবিদ্ধ হয়।” “শেখ কামালের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।”
“একটি মাইক্রোবাসে করে শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা যাওয়ার সময় পুলিশের টহল দলের (কিবরিয়া বাহিনী) সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়। পুলিশ গাড়িটিকে সিরাজের বাহিনী সন্দেহ করে গুলি চালালে শেখ কামাল পায়ে ও কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন। পরে ভুল ভেঙে গেলে পুলিশই তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।“
দৈনিক মর্নিং নিউজ: প্রখ্যাত সাংবাদিক এ বি এম মুসার সম্পাদনায় প্রকাশিত 'দৈনিক মর্নিং নিউজ' দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায় যে এটি পুলিশের সিকিউরিটি মিসফায়ার।
পিটার হেজেলহার্স্ট (Peter Hazelhurst): 'গণকণ্ঠ' ও 'হক কথা'র খবরগুলো ভিত্তি করে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিককে মিসইনফর্ম করা হয়েছিল। লন্ডনের বিশ্বখ্যাত ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি পিটার হেজেলহার্স্ট তখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। যখন অপপ্রচারকারীরা এই খবরটি বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে, তখন তিনি কালজয়ী একটি মন্তব্য করেছিলেন:
"প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ব্যাংক ডাকাতি করার কোনো প্রয়োজন হয় না। তিনি টাকা চাইলে ব্যাংকের ম্যানেজাররাই তা বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতেন।"
তথ্যভিত্তিক তুলনা ও সত্যের মুখোমুখি অপপ্রচার
ঐতিহাসিক তথ্য, পুলিশের ডায়েরি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে অপপ্রচার ও সত্যের একটি স্পষ্ট তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয় | অপপ্রচারকারীদের কাল্পনিক দাবি | নিরপেক্ষ দলিল ও ঐতিহাসিক সত্য |
ঘটনার উদ্দেশ্য | শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন। | বিজয় দিবসে সর্বহারা পার্টির নাশকতার হুমকি ঠেকাতে স্বেচ্ছাসেবী টহল। |
ঘটনাস্থল | বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট বা প্রধান ফটক। | বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১০০ গজ দূরে মতিঝিল স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) ফাঁড়ি। |
ব্যবহৃত বাহন | ডাকাত দলের ব্যবহৃত গোপন গাড়ি। | আবাহনী ক্লাবের সুপরিচিত সাদা ভক্সওয়াগন মাইক্রোবাস ও জিপ। |
সঙ্গীদের পরিচয় | সশস্ত্র ডাকাত দল। | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্রলীগ নেতা (যেমন: টুকু, হান্নান, তারেক)। |
অস্ত্রের উপস্থিতি | আাগ্নেয়াস্ত্র ও ডাকাতির সরঞ্জাম। | গাড়িতে কোনো ধরনের অস্ত্র, তালা ভাঙার চাবি বা শাবল পাওয়া যায়নি। |
গুলিবর্ষণের কারণ | ব্যাংক গার্ড ও পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধ। | সিরাজ সিকদারের গাড়ি মনে করে স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশের 'ভুল পরিচয়'জনিত ফায়ারিং। |
তদন্ত রিপোর্ট | কোনো আইনি তদন্ত ছাড়াই রাজনৈতিক প্রচারণা। | এসপি মাহবুব ও এডিশনাল এসপি আব্দুস সালামের তদন্তে পুলিশের ভুলের সত্যতা প্রমাণিত। |
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত সাক্ষ্য
শেখ কামালের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ দলিল পাওয়া যায় একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তির লেখায় ও জবানবন্দিতে:
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (বীর বিক্রম): তাঁর বিখ্যাত গবেষণা ও স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ 'এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক' (পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬)-এ তিনি লিখেছেন:
"প্যারেড শেষে আমি পিজিতে যাই শেখ কামালকে দেখতে। হাসপাতালে বেগম মুজিব শেখ কামালের পাশে বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ছেলের ওই রাতের অবাঞ্ছিত ঘোরাফেরায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং শেখ কামালকে হাসপাতালে দেখতে যেতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানান। পরে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে যান।”
জেনারেল মইন তাঁর বইতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আরও উল্লেখ করেছেন, "এদিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা এই ঘটনাকে ভিন্নরূপে প্রচার করে। 'ব্যাংক ডাকাতি' করতে গিয়ে কামাল পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে তারা প্রচারণা চালায় এবং দেশে বিদেশে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। যদিও এসব প্রচারণায় সত্যের লেশমাত্র ছিল না।"
এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম): তৎকালীন ঢাকা জেলা পুলিশ প্রধান হিসেবে এসপি মাহবুব যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে ব্যাংক ডাকাতির দাবিটি কতটা হাস্যকর:
"বাংলাদেশ ব্যাংকে ডাকাতি করতে হলে হাজার টন বোমা ফেলে ব্যাংকের ভল্টে ঢুকতে হবে। একাধিক ভারী লোহার দরজা ও বিশাল তালা ভাঙতে হেভি মর্টার ফায়ার করতে হবে। কিন্তু ডাকাতির কোনো সরঞ্জাম, চাবি বা শাবল কিছুই তো ঐ গাড়িতে ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো গার্ডের সাথেও কোনো গোলাগুলি হয়নি। যারা এই প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে, তারা সম্পূর্ণ জ্ঞানপাপী।"
লস অ্যাঞ্জেলেস প্রবাসী আবুল ফজল মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান: ২০০৬ সালে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর বার্তা সংস্থা 'এনা'র (ENA) কাছে ঘটনার বিশদ বিবরণ দেন ঘটনার সময় গাড়িতে থাকা শেখ কামালের সহপাঠী ও বন্ধু আব্দুল হান্নান। তিনি বলেন,
"ঐ রাতে আমরা যারা কামালের সাথে ছিলাম, তারা রাজনৈতিকভাবে পরবর্তীতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছি (যেমন টুকু বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন)। কিন্তু ঐতিহাসিক এই সত্যকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। ইতিহাস থেকে এই নিকৃষ্ট মিথ্যা মুছে ফেলার দায়িত্ব থেকেই আমি মুখ খুলেছি।"
আব্দুল হান্নান উক্ত ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে সবার মাঝে ঈদের আমেজ ছিল। তার মাঝেও ঢাকায় আতংক অবস্থা ছিল। কারণ এর আগে ১৪ ডিসেম্বর সিরাজ ঢাকায় বোমা মেরেছিল। যে লাল টয়োটা থেকে বোমা মেরেছিল ওই গাড়িটিই ১৫ তারিখ রাতে আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো, ভিতরে কয়েকজন মুখ বাধা অবস্থায়। এই গাড়িটিকেই আমরা ধাওয়া করি।”
“পুলিশ আমাদের গাড়িকে সিরাজের গাড়ি ভেবে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। তাতে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়। একজনের তিনটি আঙুল উড়ে যায়। শেখ কামাল গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করে নিজের পরিচয় দিলে পুলিশ গুলি করা থামায়।”
মেজর ডালিমের স্ত্রী নিম্মীকে অপহরণ ও ধর্ষণের কাল্পনিক গল্প
শেখ কামালের নামে আরেকটি কুখ্যাত রসালো অপপ্রচার স্বাধীনতার চিরশত্রুরা করে থাকে, তা হলো তিনি নাকি শরীফুল হক ডালিমের স্ত্রী নিম্মীকে ঢাকা লেডিস ক্লাব থেকে অপহরণ করেছিলেন! রসালো গল্প পছন্দ করা একশ্রেণীর ধর্মান্ধ বাঙালি সমাজে এই মিথ্যা অপপ্রচারটি দীর্ঘদিন ছড়িয়ে রাখা হয়।
সত্য ঘটনা ও ইতিহাসের দলিল: স্বয়ং মেজর ডালিম (যে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘাতক হয়েছিল) তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি'-তে এই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে গেছেন। ডালিমের নিজের লেখা বইতেই শেখ কামালের নির্দোষ হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে:
ঘটনার পটভূমি: ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ঢাকার ধানমন্ডি লেডিজ ক্লাবে মেজর শরীফুল হক ডালিমের খালাতো বোন তাহমিনার (পরবর্তীতে যার সাথে কর্নেল রেজার বিবাহ হয়) বিয়ে উপলক্ষে এক নৈশ সংসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবারসহ অন্যান্য সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পরিবার।
অনুষ্ঠানে ডালিমের কানাডা ফেরত শ্যালক বাপ্পির বড় চুল টানা এবং আসন গ্রহণ নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার দুই কিশোর ছেলের সাথে কথা কাটাকাটি বাক্যবিতণ্ডা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই তর্কবিতর্ক চরম উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং হাতাহাতি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ডালিমের স্ত্রী তাহমিনা হাসান নিম্মী ও শ্যালক বাপ্পি কর্তৃক গাজী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ও দুই ছেলে অপমান ও শ্লীলতাহানীর শিকার হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ডালিমের পরিবার এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত বেশিরভাগ অতিথি সামরিক পরিবারের হওয়ায় গাজী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ও ছেলেদের চরম অপমান ও কটুবাক্যের শিকার হতে হয়।
গাজী গোলাম মোস্তফা এই অনুষ্ঠানে ছিলেন না, কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলেদের শ্লীলতাহানীর কথা শুনে তার লোকজন নিয়ে মাইক্রোবাসে লেডিজ ক্লাবে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন এবং অস্ত্রের মুখে মেজর ডালিম, তার স্ত্রী নিম্মী, শ্যালক বাপ্পি এবং তাঁদের এক খালাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। অপহরণের পর গাজী গোলাম মোস্তফা তাঁদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে নিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপ: বঙ্গবন্ধু উভয়পক্ষের বক্তব্যে পুরো ঘটনাটি শুনে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ডালিমদের মুক্ত করে দেন। একই সাথে গাজী গোলাম মোস্তফাকে শাসিয়ে উভয়পক্ষকে তিনি শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
এই ঘটনায় শেখ কামালের কোনো দূরতম সম্পৃক্ততাও ছিল না। কিন্তু ঘটনার পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্বাধীনতাবিরোধী গুপ্ত রাজাকার চক্র এবং মাওবাদী জাসদপন্থী প্রচারমাধ্যমগুলো এই ব্যক্তিগত বিরোধকে পুঁজি করে শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রটানো হয় যে, বঙ্গবন্ধু-পুত্র শেখ কামাল মেজর ডালিমের স্ত্রীকে অপহরণ কিংবা ধর্ষণ করার সাথে জড়িত ছিলেন। এই মনগড়া মিথ্যাচারটি এখনো বিএনপি ও জামায়াতের মিথ্যাবাদীরা ছড়িয়ে শেখ পরিবারের চরিত্রহনন করার চেষ্টা করে।
নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও 'ম্যাসেজিং ব্ল্যাকআউট'
মতিঝিলের সেই রাতের গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও স্থানীয় টহল দলের চরম সমন্বয়হীনতা। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজের সামনে থেকে শেখ কামাল ও তাঁর সঙ্গীরা সাধারণ পোশাকে মাইক্রোবাসে ওঠার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেন্ট্রাল পুলিশ কন্ট্রোল রুমে তাঁদের গাড়ির নম্বর প্লেট ও নাম সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করেননি। টহল পুলিশ একটি অজ্ঞাত ভক্সওয়াগন মাইক্রোবাসকে মতিঝিলের দিকে নামতে দেখে ওয়্যারলেসে বার্তা দেয়: "একটি সন্দেহজনক মাইক্রোবাস ব্যাংক পাড়ার দিকে এগোচ্ছে।"
এসবি ফাঁড়ির প্যানিক প্রতিক্রিয়া: মুসলিম লীগের সাবেক নেতা ওহিদুজ্জামানের বাজেয়াপ্ত বাড়িতে স্থাপিত স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) ফাঁড়িতে তখন দায়িত্বে ছিলেন সার্জেন্ট শামীম কিবরিয়া। ১৪ তারিখে ইত্তেফাক ও বাংলার বাণী অফিসে বোমা হামলার কারণে পুরো এসবি টিম এমনিতেই চরম আতঙ্কে ছিল। ওয়্যারলেস বার্তা পাওয়া মাত্রই তারা ধরে নেয় সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশ ব্যাংকে হামলা চালাতে আসছে।
ফায়ারিং প্রোটোকল লঙ্ঘন: আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে মাইকে সতর্কবার্তা বা শূন্যে গুলি করার কথা থাকলেও, আতঙ্কের মুখে এসবি সদস্যরা সরাসরি যানবাহনটি লক্ষ্য করে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল থেকে ব্রাশফায়ার শুরু করেন। শেখ কামাল রক্তাক্ত অবস্থায় নিজে গাড়ি থেকে নেমে আত্মপরিচয় না দিলে সেই রাতে গাড়িতে থাকা ১০ জনের সবাই নিহত হতে পারতেন।
শহীদ শেখ কামালের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব ও জীবন দর্শন
শেখ কামালকে নিয়ে এই অপপ্রচারের মূল কারণ ছিল তাঁর বহুমাত্রিক ও প্রতিশ্রুতিশীল নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে ধূলিসাৎ করা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের তরুণ ও যুবসমাজের তৎকালীন আইকন।
মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক জীবন: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি (Aide-de-Camp) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে কমিশন লাভ করে সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদ অর্জন করেন। পরবর্তীতে সামরিক পদ ছেড়ে দিয়ে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় ফিরে আসেন।
ক্রীড়া বিপ্লব (আবাহনী ক্রীড়া চক্র): শেখ কামাল ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের রূপকার। ১৯৭২ সালে তিনি ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’ প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবল, ক্রিকেট ও হকি খেলার সূচনা করেন। বিদেশি কোচ আনা, আধুনিক ট্র্যাকিং ও ক্লাবের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়নে তাঁর অবদান ছিল যুগান্তকারী।
সংস্কৃতি ও রাজনীতি: তিনি ছিলেন 'স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী'র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, 'ঢাকা থিয়েটার'-এর প্রাণপুরুষ, একজন চমৎকার সেতার বাদক ও মঞ্চ অভিনেতা। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সততা ও বিনয়ের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণার কাজে আমি যখন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আহম্মদ বাবুর (ধানমন্ডির ৭ নম্বর রোডের বাসিন্দা এবং শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু) মুখোমুখি হয়েছিলাম, তখন তিনি শেখ কামালের সাদামাটা জীবনযাপনের একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ করেছিলেন।
১৯৭২ সালে তারা দুজন সরকারি প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে মিউনিখ অলিম্পিকে গিয়েছিলেন। রুহুল আহম্মদ বাবু বলেন:
"মিউনিখে গিয়ে শত চেষ্টা করেও তাঁকে সরকারি টাকায় অতিরিক্ত কিছু কিনে দিতে পারিনি। তিনি কোনো নাইটক্লাব বা বিলাসবহুল জায়গাতেও যাননি। আমি কামালকে বলেছিলাম, 'তুই দেশের প্রেসিডেন্টের ছেলে, একটু ফিটফাট পোশাক-আশাক তো পরতে পারিস!' জবাবে কামাল খুব সাধারণ ভঙ্গিতে বলেছিল 'বাবু, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশের গরিব প্রেসিডেন্টের ছেলে।'"
সাদাসিধে জীবনযাপন করা, অহংকারহীন ও দেশপ্রেমিক এই তরুণ নেতাকে নিয়ে পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক ও অগণতান্ত্রিক শাসকরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত ছিল। তারা জানত, শেখ কামালের মতো বহুমাত্রিক গুণসম্পন্ন ও সৎ যুবনেতার চরিত্র যদি দেশের তরুণ সমাজ সঠিকভাবে জানতে পারে, তবে তারা পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হবে। সেই ভয় থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে একজন বীর সন্তানকে 'ব্যাংক ডাকাত' হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
উপসংহার
ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মেই সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। কোনো রাজনৈতিক চক্রান্ত বা গোয়েবলসীয় প্রোপাগান্ডা দিয়ে সত্যকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না। শেখ কামালের ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বরের ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ একটি দুর্ঘটনা ও পুলিশের ভুলের ফসল, যার সাথে ব্যাংক ডাকাতির দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। ঐতিহাসিক নথিপত্র, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন, তৎকালীন নিরপেক্ষ সংবাদপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য আজ সন্দেহাতীতভাবে তা প্রমাণ করেছে।
শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল তাঁর মাত্র ২৬ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে (৫ আগস্ট ১৯৪৯ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫) ক্রীড়া, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও সংগঠক হিসেবে যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরভাস্বর। রাজনৈতিক কালিমা মুছে ফেলে এই বীর সেনানায়ককে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদায় স্মরণ করাই হোক আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র:
১. এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬) – মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (বীর বিক্রম)।
২. যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি – মেজর (অব.) শরীফুল হক ডালিম (বীর উত্তম)।
৩. দৈনিক ইত্তেফাক (১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৩ সংস্করণ)।
৪. দৈনিক মর্নিং নিউজ (ডিসেম্বর ১৯৭৩) – সম্পাদক এ বি এম মুসার সম্পাদনায় প্রকাশিত প্রতিবেদন।
৫. দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ (Daily Telegraph, London) – তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি পিটার হেজেলহার্স্টের (Peter Hazelhurst) প্রতিবেদন ও মন্তব্য (ডিসেম্বর ১৯৭৩)।
৬. ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (ENA) – ২০০৬ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রদেয় আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বিশেষ রিপোর্ট।
৭. দৈনিক গণকণ্ঠ (১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩) এবং হক কথা (১৬/১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩) – তৎকালীন অপপ্রচারের উৎস হিসেবে উল্লেখিত পত্রিকা।
৮. ঢাকা জেলা পুলিশের প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদন (১৯৭৩)
৯. আবুল ফজল মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান – ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ রাতে দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসের প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী ও শেখ কামালের সহপাঠী (২০০৬ সালে প্রদত্ত জবানবন্দি)।
১০. এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) – তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ প্রধানের সাক্ষাৎকার ও বক্তব্য।















