>

>

যুদ্ধ থেকে আমেরিকা কিভাবে লাভবান হয় - রক্তের বিনিময়ে ডলার

যুদ্ধ থেকে আমেরিকা কিভাবে লাভবান হয় - রক্তের বিনিময়ে ডলার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

TruthBangla

যুদ্ধ থেকে আমেরিকা কিভাবে লাভবান হয় - রক্তের বিনিময়ে ডলার

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসের দিকে নজর দিলে একটি অত্যন্ত বিষ্ময়কর এবং প্যারাডক্সিকাল চিত্র ফুটে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের সর্বাধিনায়ক এবং একক পরাশক্তি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি।

২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে। এমনকি বর্তমান গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি কোনো আমেরিকান সেনা না পাঠালেও তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মুনাফা লুটে নিচ্ছে।

আমেরিকান নীতিনির্ধারক ও করপোরেট দানবদের কাছে আন্তর্জাতিক সংঘাত কোনো মানুষের আর্তনাদ বা মানবিক বিপর্যয় নয়; বরং এটি অবাধে বিলিয়ন ডলার কামানোর এক অন্যতম লাভজনক এবং টেকসই ব্যবসা। এই ব্যবসার পোশাকি নাম মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (Military-Industrial Complex) বা 'স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি'।

মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (MIC) এবং 'স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি'

আমেরিকার যুদ্ধভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো Military-Industrial Complex (MIC)। ১৯৬১ সালে নিজের বিদায়ী ভাষণে আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রখ্যাত জেনারেল ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার (Dwight D. Eisenhower) আমেরিকান জনগণকে একটি মারাত্মক বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:

"আমাদেরকে মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অন্যায্য প্রভাব থেকে সতর্ক থাকতে হবে। এই ক্ষমতার অবৈধ বিকাশ আমাদের গণতন্ত্র ও সামাজিক স্বাধীনতার জন্য এক চরম হুমকি।"

ত্রিপক্ষীয় জোট বা 'আইরন ট্রায়াঙ্গল' (Iron Triangle)

আইজেনহাওয়ারের সেই আশঙ্কা আজ শতভাগ সত্যে পরিণত হয়েছে। আজ পেন্টাগন (মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর), আমেরিকান অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রাইভেট করপোরেটসমূহ এবং মার্কিন কংগ্রেসীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এক অদৃশ্য ও শক্তিশালী ত্রিভূজ গড়ে উঠেছে।

অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলো পেন্টাগনের কাছ থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি সামরিক চুক্তি পায়।

সেই মুনাফার একটি বড় অংশ তারা ঢালে কংগ্রেস সদস্যদের নির্বাচনী ফান্ডের 'লবিস্ট' (Lobbyist) হিসেবে, যাতে প্রতিনিধিরা প্রতি বছর পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে পাস করেন।

পেন্টাগন ও রাজনীতিবিদরা অস্ত্র তৈরি কারখানাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি ও বজায় রাখে।

এই চক্রের কারণেই জন্ম নিয়েছে আমেরিকার 'Permanent War Economy' (স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি)। এই নীতি অনুসারে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে পেন্টাগনের বাজেট কমে যাবে এবং করপোরেট মুনাফায় ধস নামবে। তাই অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে আমেরিকার প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও চিরস্থায়ী যুদ্ধ।

বিশ্ব অস্ত্রবাজারের 'বিগ ফাইভ' (Big Five) ও আমেরিকান একচ্ছত্র আধিপত্য

গ্লোবাল আর্মস ট্রেড বা বিশ্ব অস্ত্র বাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো বিশ্বের অর্ধেকের কাছাকাছি অস্ত্র কেবল একটি দেশ আমেরিকা থেকেই সরবরাহ করা হয়। আর এই আমেরিকান অস্ত্র সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে মাত্র পাঁচটি বৃহৎ বেসরকারি করপোরেট দৈত্য। এদেরকে বলা হয় 'বিগ ফাইভ' (The Big Five)।

বিগ ফাইভ-এর পরিচয় ও ক্ষমতার দাপট

লকহীড মার্টিন (Lockheed Martin): বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি। এরা তৈরি করে F-35 লাইটনিং II, F-16 যুদ্ধবিমান এবং উচ্চ ক্ষমতার হাইমার্স (HIMARS) রকেট সিস্টেম।

আরটিএক্স বা রেথিওন টেকনোলজিস (RTX / Raytheon): এরা মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ও মিসাইল ডিফেন্স প্রযুক্তির সম্রাট। প্যাট্রিওট মিসাইল সিস্টেম (Patriot Missile System) এবং জ্যাভলিন (Javelin) অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল এদের তৈরি।

বোয়িং (Boeing): এভিয়েশন জায়ান্ট বোয়িং কেবল বেসামরিক বিমানই বানায় না; তাদের ডিফেন্স বিভাগ তৈরি করে অ্যাপাচি (Apache) অ্যাタック হেলিকপ্টার এবং F/A-18 সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান।

নর্থ্রপ গ্রুম্যান (Northrop Grumman): এদের মূল শক্তি দূরপাল্লার স্টিলথ বোমারু বিমান (যেমন B-2 Spirit ও নতুন B-21 Raider) এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM)।

জেনারেল ডায়নামিক্স (General Dynamics): মার্কিন পেন্টাগনের অন্যতম ভরসা। এরা তৈরি করে M1 অ্যাব্রামস (Abrams) মূল যুদ্ধ ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং পারমাণবিক সাবমেরিন।

২০২৩-২০২৪ সালের সামরিক হিসাব অনুসারে, এই অস্ত্র প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা সামলেছে। এর মধ্যে রেকর্ড ৭৬৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব এসেছে সরাসরি মার্কিন সরকারের প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে। অর্থাৎ, মার্কিন সরকার নিজেই নিজ দেশের প্রাইভেট অস্ত্র কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

ইউক্রেন ও গাজা: প্রত্যক্ষ সেনা ছাড়া আমেরিকান লাভের নতুন মডেল

সরাসরি নিজেদের বুট মাঠে না নামিয়ে কীভাবে যুদ্ধের লাভ শতভাগ তুলে নেওয়া যায়, তার নিখুঁত উদাহরণ হলো ইউক্রেন ও গাজা সংঘাত। এখানে মার্কিন সৈন্যদের রক্ত ঝরছে না, কিন্তু আমেরিকান অস্ত্র কারখানাগুলোতে তিন শিফটে দিনরাত কাজ চলছে।

ইউক্রেন সংঘাত: যুদ্ধক্ষেত্র যখন অস্ত্রের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনী (Showcase)

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমেরিকা ইউক্রেনকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে। এই যুদ্ধ আমেরিকান অস্ত্র কোম্পানিগুলোর জন্য এক বিশাল 'লাইভ ক্যাটালগ ও বিজ্ঞাপন' হিসেবে কাজ করছে।

ইউক্রেনে যখন Patriot Missile System রাশিয়ান কিঞ্জাল হাইপারসনিক মিসাইল ঠেকিয়ে দেয়, কিংবা HIMARS দিয়ে রাশিয়ান গোলাবারুদের ডিপো উড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন বিশ্ববাজারের অন্যান্য দেশগুলো এগুলো কেনার জন্য লাইন ধরে।

ন্যাটোর (NATO) ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো (যেমন পোল্যান্ড, জার্মানি, ফিনল্যান্ড) তাদের পুরনো সোভিয়েত যুগের অস্ত্র ইউক্রেনকে দিয়ে দিচ্ছে এবং আমেরিকার কাছ থেকে নতুন প্রযুক্তির F-35, HIMARS এবং অ্যাব্রামস ট্যাংক অর্ডার করছে।

একে বলা হয় Foreign Military Sales (FMS)। ইউক্রেন যুদ্ধের দোহাই দিয়ে বিগত কয়েক বছরে আমেরিকার এফএমএস (FMS) বা বৈদেশিক সামরিক বিক্রয় সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে।

গাজা যুদ্ধ: ইসরায়েলকে সহায়তা এবং মার্কিন ক্যাশব্যাক

গাজা সংঘাতে ইসরায়েলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবিরাম সামরিক সাহায্য সরবরাহ করছে। ইসরায়েল গাজায় যে হাজার হাজার পাউন্ডের বোমা, স্মার্ট মিউনিশন ও স্পাইস বোম্ব বর্ষণ করছে, তার সিংহভাগই বোয়িং ও লকহীড মার্টিনের কারখানা থেকে তৈরি।

যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য নতুন করে গোলাবারুদ ও আয়রন ডোমের (Iron Dome) ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের চাহিদা তত বাড়ছে, আর তা সরাসরি ওয়াশিংটনের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পকেটে ডলার ঢালছে।

'সামরিক সহায়তা'র মোড়কে রাষ্ট্রীয় প্রতারণা ও চক্রাকার ইকোসিস্টেম

বিশ্ববাসী যখন সংবাদ শিরোনামে দেখে "আমেলিকা ইউক্রেনকে ৬০ বিলিয়ন ডলার কিংবা ইসরায়েলকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিল" তখন সাধারণ মানুষের ধারণা হয় যে মার্কিন সরকার বিশাল ব্যাগভর্তি নগদ ডলার ওই দেশগুলোর অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই অর্থ সাহায্যের রূপটি একদম আলাদা এবং একটি সুপরিকল্পিত ইকোসিস্টেম।

বৈদেশিক সহায়তার অভ্যন্তরীণ চক্রসূত্র

১. মার্কিন কংগ্রেস যখন ইউক্রেন, ইসরায়েল বা অন্য কোনো দেশের জন্য সাহায্য অনুমোদন করে, সেই ক্যাশ টাকা কখনোই ওই সাহায্যগ্রহীতা দেশের হাতে তুলে দেওয়া হয় না।

২. আইনের শর্তানুসারে, পাস হওয়া বাজেটের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ ওয়াশিংটন ছেড়ে বেরই হয় না। পেন্টাগন সেই টাকা জমা দেয় অ্যারিজোনা, টেক্সাস, পেনসিলভানিয়া বা ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত লকহীড মার্টিন, রেথিওন বা বোয়িং-এর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

৩. মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারকরা সেই অর্থ দিয়ে নতুন অস্ত্র তৈরি করে সহায়তা গ্রহণকারী দেশে পাঠায়। অথবা পেন্টাগনের কাছে থাকা নিজেদের কিছুটা পুরনো বা মজুদকৃত অস্ত্র ওই দেশকে দিয়ে দেওয়া হয় এবং পাস হওয়া নতুন বাজেট দিয়ে আমেরিকান পেন্টাগন নিজেদের জন্য আরও অত্যাধুনিক নতুন অস্ত্র বানায়।

ইসরায়েলের উদাহরণ: ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমেরিকা ইসরায়েলকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক সাহায্য দিয়েছে। কিন্তু শর্ত হলো, এই অর্থের সিংহভাগ দিয়ে ইসরায়েলকে আমেরিকার থেকেই F-35, F-15, কিংবা যৌথ প্রযুক্তির অস্ত্র কিনতে হবে।

সহজ কথায়, আমেরিকা নিজের করদাতাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে নিজের দেশের বেসরকারি অস্ত্র কোম্পানিগুলোকে লাভবান করার জন্য এই 'সামরিক সহায়তা'কে একটি আইনি মোড়ক হিসেবে ব্যবহার করে।

মার্কিন অস্ত্রশিল্প ও যুদ্ধ অর্থনীতির সামগ্রিক পরিসংখ্যান

আমেরিকান যুদ্ধ অর্থনীতির নিখুঁত চিত্র তুলে ধরতে নিচে একটি তথ্যবহুল প্রামাণ্য সারণী প্রদান করা হলো:

বিচার্য খাত / ইন্ডিকেটর

বার্ষিক পরিমাণ / পরিসংখ্যান

বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেট (FY 2024-25)

~$৮৫০ থেকে $৮৮০ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বের পরবর্তী ৯টি দেশের সম্মিলিত সামরিক বাজেটের চেয়েও বড়।

বিশ্ব অস্ত্র বাজারে আমেরিকার একক শেয়ার

প্রায় ৪২% – ৪৫%

বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করা অস্ত্রের প্রায় অর্ধেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।

অস্ত্র কোম্পানিগুলোর মোট রাজস্ব (২০২৩-২৪)

প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ($১,০০০,০০০০০,০০০)

এর মধ্যে ৭৬৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে সরাসরি মার্কিন সরকারের চুক্তি থেকে।

পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা ঠিকাদারের সংখ্যা

২,০০,০০০+ ছোট-বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান

আমেরিকার প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে অস্ত্র কারখানার সাব-কন্ট্রাক্টর ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করা হয়।

ইসরায়েলকে মার্কিন ঐতিহাসিক সহায়তা (১৯৪৮-বর্তমান)

$৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও সামরিক মহড়া বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার।

ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন মোট বাজেট বরাদ্দ (২০২২-২৪)

$১৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি

যার প্রায় ৮০% অর্থ আমেরিকার নিজস্ব প্রতিরক্ষা কারখানা ও অস্ত্র ভাণ্ডারে ফিরে এসেছে।

‘ঘূর্ণায়মান দরজা’: পেন্টাগন ও করপোরেট বোর্ডের অশুভ আঁতাত

আমেরিকান মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো 'The Revolving Door' বা ঘূর্ণায়মান দরজা নীতি। এর অর্থ হলো পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ সেনাপ্রধান, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং মার্কিন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা চাকরি শেষে সরাসরি প্রধান প্রধান অস্ত্র কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে (Board of Directors) যোগ দেন, অথবা অস্ত্র কোম্পানির সিইও ও লবিস্টরা এসে পেন্টাগনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেন।

বাস্তব উদাহরণ:

লয়েড অস্টিন (Lloyd Austin): বর্তমান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন পেন্টাগনের প্রধান হওয়ার ঠিক আগেই অস্ত্র প্রস্তুতকারী দৈত্য RTX (Raytheon Technologies)-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন।

জিম ম্যাটিস (Jim Mattis): সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস পেন্টাগনে আসার আগে এবং পরবর্তীতে পেন্টাগন ছাড়ার পর General Dynamics-এর পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন।

প্রভাব: যখন একজন নীতি-নির্ধারক জানেন যে সামরিক অবসরের পর তাঁর আয়ের মূল উৎস হবে লকহীড বা রেথিওনের মতো কোম্পানি, তখন তিনি সরকারে থাকা অবস্থায় কখনোই শান্তি বজায় রাখার পক্ষে নীতি গ্রহণ করেন না। তিনি সর্বদা এমন সিদ্ধান্ত নেন যাতে পেন্টাগন থেকে অস্ত্রের নতুন নতুন বিশাল অর্ডার তৈরি হয়।

প্রাইভেট মিলিটারি কন্ট্রাক্টর (PMC) ও ‘ছায়া সেনাবাহিনী’র অসীম ব্যবসা

বিশ্বজুড়ে সরাসরি মার্কিন সৈন্য পাঠানোর রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে ওয়াশিংটন এখন ব্যবহার করে প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি (PMC) বা বেসরকারি ভাড়াটে সেনাবাহিনী।

আমেরিকান করদাতাদের কাছে এটি সরকারি সামরিক বাজেট হিসেবে দৃশ্যমান হলেও, বাস্তবে সরকারি অর্থ গোপনে চলে যায় বেসরকারি সিকিউরিটি করপোরেশনগুলোর হাতে।

বিপুল বাজেটের খেলা: ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন সেনা সংখ্যা যখন কমানো হয়, তখন পেন্টাগন হাজার হাজার বেসরকারি সেনাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। আফগানিস্তানে অনেক সময় মূল মার্কিন সেনার চেয়ে বেসরকারি কন্ট্রাক্টরের সংখ্যা বেশি ছিল।

লজিস্টিক সাম্রাজ্য: কেবল যুদ্ধ করাই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক ঘাঁটির খাবার সরবরাহ, তেল পরিবহন, ড্রাইভিং, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর মতো কাজের জন্য KBR (Kellogg Brown & Root)-এর মতো আমেরিকান কোম্পানিগুলো পেন্টাগন থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছে।

ডার্পা (DARPA) ও রাষ্ট্রীয় খরচে বাণিজ্যিক প্রযুক্তির বিকাশ

সাধারণ মানুষ মনে করে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি (Apple, Google, Amazon, GPS) তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তিতে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি ছিল পেন্টাগনের সামরিক গবেষণা শাখা DARPA (Defense Advanced Research Projects Agency)

ট্যাক্সের টাকায় ঝুঁকি, কোম্পানির পকেটে লাভ: নতুন এবং উচ্চ-ঝুঁকির বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিজের টাকা বিনিয়োগ করতে চায় না। মার্কিন সরকার তাদের পেন্টাগন বাজেটের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ডার্পার মাধ্যমে গবেষণায় ঢালে।

প্রযুক্তির জন্ম: ইন্টারনেট (ARPANET), জিপিএস (GPS), আধুনিক ড্রোন, নাইট-ভিশন, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন, ভয়েস রিকগনিশন (Siri), এমনকি আধুনিক টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি এগুলোর মূল উদ্ভাবন হয়েছিল পেন্টাগনের সামরিক প্রয়োজনে।

বাণিজ্যিক আধিপত্য: পেন্টাগন যখন এই প্রযুক্তিগুলোকে সফলভাবে তৈরি করে ফেলে, তখন নামমাত্র মূল্যে সেগুলো তুলে দেওয়া হয় আমেরিকার প্রাইভেট করপোরেশনগুলোর হাতে। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তি দিয়ে তারা সারা বিশ্বে বাণিজ্যিক মনোপলি বা একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার উপার্জন করে।

‘পেট্রোডলার’ থেকে ‘ইউরোপীয় এলএনজি (LNG) আধিপত্য’: ইউক্রেন যুদ্ধের নেপথ্য মুনাফা

ইউক্রেন যুদ্ধ আমেরিকান এনার্জি জায়ান্টগুলোর (ExxonMobil, Chevron) জন্য এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

নর্ড স্ট্রিম (Nord Stream) ধ্বংস ও ইউরোপের পরাধীনতা: ইউক্রেন যুদ্ধের পূর্বে জার্মানি সহ পুরো ইউরোপ রাশিয়ার সস্তা পাইপলাইন গ্যাসের ওপর নির্ভর করত। যুদ্ধের ফলে সেই রাশিয়া-ইউরোপ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মার্কিন এলএনজি (LNG) রফতানি: এর ফলে রাতারাতি ইউরোপ বাধ্য হয় আমেরিকার থেকে বহুগুণ চড়া দামে জাহাজে করে আসা Liquefied Natural Gas (LNG) কিনতে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আমেরিকা বিশ্বের এক নম্বর এলএনজি রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য শতভাগ ওয়াশিংটনের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।

সিআইএ (CIA)-র গোপন অপারেশন ও রিসোর্স কন্ট্রোল (Regime Change)

আমেরিকা যেসব সংঘাতের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে, তার একটি বড় অংশের উদ্দেশ্য থাকে ওই দেশের খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ মার্কিন করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণে আনা। একে বলা হয় Regime Change (ক্ষমতা পরিবর্তন) নীতি

ইরান (১৯৫৩): ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন দেশের তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেন, তখন সিআইএ 'অপারেটর অ্যাজাক্স'-এর মাধ্যমে তাঁকে উৎখাত করে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনে এবং তেলের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকান ও ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেয়।

সিরিয়ার তেল ক্ষেত্র (বর্তমান): বর্তমানে সিরিয়ার মূল তেল সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলে (দেইর এজ-জর) সরাসরি আমেরিকান সেনা ঘাঁটি বসানো রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করে সেই তেল তুলছে আমেরিকান সমর্থিত শক্তি ও পেন্টাগনের মিত্ররা।

প্রাতিষ্ঠানিক ঋণজাল: বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও যুদ্ধোত্তর অবকাঠামো দখল

যুদ্ধ যখন শেষ হয়, তখন বিজয়ী বা পরাজিত দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলতে এগিয়ে আসে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আইএমএফ (IMF)।

কঠিন শর্তাবলী (Structural Adjustment): যুদ্ধের পর পুনর্গঠনের জন্য ঋণ দেওয়ার সময় শর্ত দেওয়া হয় যে, ওই দেশকে তাদের সরকারি খাত, বিদ্যুৎ, টেলিকম এবং কৃষি বাজার উন্মুক্ত ও বেসরকারীকরণ (Privatization) করতে হবে।

কম দামে সম্পদ কেনা: এই সুযোগে আমেরিকার বিশাল বিশাল বিনিয়োগকারী ফান্ড (যেমন: BlackRock, Vanguard) অতি সস্তা দামে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের এয়ারপোর্ট, বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও খনিজ খনি কিনে নেয়। ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষি জমির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন পশ্চিমা বৃহৎ কৃষিপণ্য কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে।

মিডিয়া-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স: যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা

মার্কিন বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব 'Manufacturing Consent'-এ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আমেরিকান মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সাধারণ মানুষের মনকে যুদ্ধের পক্ষে চালিত করে।

টেলিভিশনের পর্দার নেপথ্য পরিচয়: যখন সিএনএন, ফক্স নিউজ বা বিবিসি-তে কোনো প্রাক্তন আমেরিকান জেনারেলকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে আনা হয়, তখন স্ক্রিনের নিচে কেবল লেখা থাকে "অবসরপ্রাপ্ত সামরিক জেনারেল"। কিন্তু টিভিতে গোপন রাখা হয় যে, ওই সাবেক জেনারেল একই সাথে লকহীড মার্টিন বা রেথিওনের একজন বড় বেতনভুক্ত কনসালটেন্ট বা শেয়ারহোল্ডার!

মানবিক ছদ্মবেশ: তারা টিভিতে এসে এমনভাবে পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন যেন মনে হয় আমেরিকা যুদ্ধ না করলে বিশ্বের সব গণতন্ত্র ও মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে সাধারণ আমেরিকান করদাতারা নিজেদের চিকিৎসার টাকা বা শিক্ষার বাজেট কমিয়ে যুদ্ধের পেছনে বিলিয়ন ডলার খরচ করাকেও সমর্থন জানায়।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) ও সুইফট (SWIFT) নেটওয়ার্কের অস্ত্রায়ন

আমেরিকাকে সবসময় বোমা বা মিসাইল ছুড়তে হয় না। অর্থনৈতিক সংঘাত বা Financial Warfare থেকেও তারা বিশাল লাভ তুলে নেয়।

সুইফট (SWIFT) নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বব্যাপী ব্যাংক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হলো সুইফট। ডলারের আধিপত্য বজায় রেখে আমেরিকা যেকোনো প্রতিপক্ষ দেশকে (যেমন ইরান, রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা) সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।

অন্যান্য দেশের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা: যুদ্ধের দোহাই দিয়ে আমেরিকা রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ফ্রিজ বা সিজ করেছে। আফগানিস্তান থেকে বের হওয়ার সময় তারা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ বিলিয়ন ডলার আটকে দিয়েছিল। এই আটকে রাখা বিপুল সম্পদ আমেরিকান ব্যাংকিং সিস্টেমে মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এক আত্মঘাতী কিন্তু টেকসই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা

আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও অর্থনৈতিক মডেল এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, সেখানে "যুদ্ধই হলো শ্রেষ্ঠ ব্যবসা"

আমেরিকান অর্থনীতি কোনো সাধারণ উৎপাদনের ওপর নয়, বরং বৈশ্বিক যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিরতার ওপর দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নেয়। বিশ্বশান্তি স্থাপিত হলে পেন্টাগনের বাজেট সংকুচিত হয়, অস্ত্র কোম্পানির শেয়ারের পতন ঘটে এবং হাজার হাজার মানুষের চাকরি সংকটে পড়ে।

কিন্তু পৃথিবীর কোথাও একটি যুদ্ধ লাগলে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতা, বৈজ্ঞানিক ল্যাব, প্রাইভেট অস্ত্র কারখানা, মিডিয়া হাউজ এবং এনার্জি জায়ান্ট সবার ক্যাশ রেজিস্টার একসাথে বেজে ওঠে।

যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন: সংঘাতের দ্বিমুখী অর্থনৈতিক মুনাফা (Double Dipping)

আমেরিকান যুদ্ধ অর্থনীতির শয়তানি চক্র কেবল অস্ত্র বিক্রিতেই থেমে থাকে না। এটি কাজ করে দুই ধাপে একে বলা হয় 'Double Dipping' বা দ্বিমুখী অর্থনৈতিক মুনাফা।

ইরাক ও আফগানিস্তানের করুণ বাস্তবতা

আমেরিকান স্ট্র্যাটেজির প্রথম ধাপ হলো যুদ্ধ বাঁধিয়ে তাদের তৈরি অস্ত্র ও বোমা দিয়ে প্রতিপক্ষের ভৌত অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং সেতু সম্পূর্ণ গুড়িয়ে দেওয়া।

আর দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় যুদ্ধ শেষে। ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই দেশকে পুনরায় গড়ার জন্য মার্কিন সরকার 'পুনর্গঠন ফান্ড' (Reconstruction Fund) তৈরি করে। আর সেই পুনর্গঠন কাজের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের কনট্রাক্ট বা ঠিকাদারি পায় আমেরিকারই প্রকাণ্ড সব কনস্ট্রাকশন, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এনার্জি কোম্পানি।

হ্যালিবার্টন (Halliburton) ও বেচটেল (Bechtel): ইরাক যুদ্ধের পর মার্কিন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোম্পানি 'হ্যালিবার্টন' এবং বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফার্ম 'বেচটেল' যুদ্ধোত্তর ইরাক পুনর্গঠন, তেল ক্ষেত্র পুনরুদ্ধার ও অবকাঠামো নির্মাণের নামে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হাতিয়ে নেয়।

অর্থাৎ, প্রথমে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি করে একটি দেশকে মাটির সাথে মিশিয়ে দাও, আর পরে আমেরিকান বিল্ডার্স কোম্পানি পাঠিয়ে সেই দেশ পুনঃনির্মাণের নামে সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় তহবিল লুটে নাও। সংঘাতের উভয় প্রান্তেই ডলার কেবল ওয়াশিংটনের দিকেই প্রবাহিত হয়।

ভূ-রাজনীতি, তেলের বাজার ও মার্কিন ডলারের আধিপত্য (Petrodollar)

আমেরিকার পেন্টাগন এবং মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স কেন বিশ্বজুড়ে সংঘাত টিকিয়ে রাখতে চায়, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো 'পেট্রোডলার' (Petrodollar) ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা।

তেলের বাজার ও পেট্রোডলারের প্রতিরক্ষা

১৯৭০-এর দশকে সাউদি আরবসহ ওপেক (OPEC)ভুক্ত দেশগুলোর সাথে আমেরিকা একটি চুক্তি করে: আমেরিকা তাদের রাজপরিবারকে সামরিক সুরক্ষা দেবে, আর বিনিময়ে বিশ্বজুড়ে তেল বিক্রি করতে হবে একমাত্র মার্কিন ডলারে।

যদি কোনো বিশ্বনেতা তেলের বাজার থেকে মার্কিন ডলারকে হটানোর চেষ্টা করেছে কিংবা পেট্রোডলারের বাইরে গিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় বা স্বর্ণে তেল বিক্রি করতে চেয়েছে, তখনই মার্কিন সামরিক মেশিনারি তার ওপর চড়াও হয়েছে।

ইরাকের সাদ্দাম হোসেন: ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ইরাকের তেল ইউরোতে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। ২০০৩ সালে অলীক মিথ্যা 'গণবিধ্বংসী অস্ত্রের' (WMD) দোহাই দিয়ে ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামকে উৎখাত করা হয়।

লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি: গাদ্দাফি আফ্রিকার জন্য একটি একক স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রা (Gold Dinar) তৈরি করে তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ন্যাটো আক্রমণের মাধ্যমে লিবিয়াকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও অস্থিরতা বজায় রেখে আমেরিকা নিশ্চিত করে যেন প্রতিটি দেশ তাদের সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্য যেন বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন ডলারেই সম্পন্ন হয়।

আমেরিকান অর্থনীতিতে অস্ত্রের ঘরোয়া প্রভাব ও রাজনীতি

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বিশ্বজুড়ে এত মানুষের মৃত্যুর পর আমেরিকান জনগণ বা তাদের প্রতিনিধিরা কেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় না? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কর্মসংস্থানের কৌশলে।

'অস্ত্রের রাজনীতি' বা পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

লকহীড মার্টিন যখন কোনো নতুন যুদ্ধবিমান (যেমন F-35) তৈরি করে, তখন তারা ইচ্ছা করলেই সম্পূর্ণ বিমানটি একটি নির্দিষ্ট কারখানায় বানাতে পারে। কিন্তু তারা তা করে না। তারা F-35 বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৪৬টি অঙ্গরাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।

এর ফলে কী হয়?

যেকোনো পলিটিশিয়ান বা কংগ্রেস সদস্য (তিনি ডেমোক্র্যাট হন বা রিপাবলিকান) যখন সংসদে পেন্টাগনের সামরিক বাজেট কমানোর বা কোনো যুদ্ধ বন্ধের কথা বলতে যান, তখন অস্ত্র প্রস্তুতকারীরা তাঁকে মনে করিয়ে দেয়: "বাজেট কমলে আপনার অঙ্গরাজ্যের F-35 কারখানার ২০,০০০ মানুষের চাকরি চলে যাবে!"

নিজের ভোটব্যাংক ও স্থানীয় কর্মসংস্থান বাঁচানোর ভয়ে কোনো সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্য সামরিক বাজেট কমানোর পক্ষে ভোট দিতে পারেন না।

এভাবে পেন্টাগন ও বিগ ফাইভ আমেরিকান সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সাথে যুদ্ধ শিল্পকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।

রক্তভেজা ডলার ও এক রক্তচোষা বৈশ্বিক সমীকরণ

আমেরিকার যুদ্ধনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি নির্মম সত্য পরিষ্কার হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কোনো আদর্শিক মানবিকতা, মানবাধিকার কিংবা গণতন্ত্র রক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক ঠান্ডা মাথায় ক্যালকুলেট করা লাভের খাতা দিয়ে।

যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ায় পরিণত হলো নাকি আফগানিস্তান তালিবানের হাতে ফিরে গেল; কিংবা ইউক্রেনের লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রাণ হারালো কি না তা পেন্টাগন বা ওয়াশিংটনের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে একেবারেই গৌণ বিষয়। তাদের আসল হিসাব হলো: চলতি ত্রৈমাসিকে লবিস্ট ফান্ডের বিপরীতে লকহীড মার্টিন বা রেথিওনের শেয়ারের দাম কত শতাংশ বাড়ল!

বিশ্বশান্তি হলো পেন্টাগন ও ডিফেন্স করপোরেটগুলোর জন্য চরম এক ব্যবসায়িক মন্দা। আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংঘাত, রক্তপাত ও সাধারণ মানুষের আর্তনাদ হলো তাদের ট্রিলিয়ন ডলার ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি।

যতদিন বিশ্বরাজনীতিতে এই Military-Industrial Complex এবং পেট্রোডলারের আধিপত্য বহাল থাকবে, ততদিন রক্ত ঝরবে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও, আর ওয়াশিংটনের কফিনে জমা হবে বিশ্ববাসীর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রক্তভেজা ডলার!

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 25, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Jul 25, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।

Jul 25, 2026

/

Post by

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, মিশর কিংবা গ্রিস) তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস অত্যন্ত নতুন। মাত্র পৌনে তিনশত বছর আগের একটি ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ১৩টি ছোট ও বিক্ষিপ্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু হওয়া একটি দেশ আজ পৃথিবীর একক পরাশক্তি (Global Hegemon)। কীভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনে থাকা একটি ভূখণ্ড পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

Jul 25, 2026

/

Post by

সম্প্রতি ভারতে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র নেতৃত্বে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি নিয়ে ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি একটি অরাজনৈতিক, যৌক্তিক ও সময়োপযোগী ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই আন্দোলনটি তার লক্ষ্যচ্যুত হয়ে এমন এক জটিল ও আত্মঘাতী গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বা বিজয় ছিনিয়ে আনা কার্যত অসম্ভব।

Jul 25, 2026

/

Post by

বিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রের সরকার পতন কিংবা কোনো অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য যে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন, ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমানের মহড়া চালানো হতো বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেই কৌশল প্রায় অপ্রচলিত। সামরিক আক্রমণের বদলে এখন জায়গা করে নিয়েছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্যের কারসাজি এবং তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের মোড়কে রাষ্ট্র ধ্বংসের সূক্ষ্ম চক্রান্ত। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা চলে ‘মেটিউকুলাস ডিজাইন’ (Meticulous Design)।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 25, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Jul 25, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।

Jul 25, 2026

/

Post by

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, মিশর কিংবা গ্রিস) তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস অত্যন্ত নতুন। মাত্র পৌনে তিনশত বছর আগের একটি ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ১৩টি ছোট ও বিক্ষিপ্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু হওয়া একটি দেশ আজ পৃথিবীর একক পরাশক্তি (Global Hegemon)। কীভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনে থাকা একটি ভূখণ্ড পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.