>

>

শরিফুল হক ডালিম - ছদ্মবেশী পাকিস্তানী এজেন্ট নাকি বিভ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা?

শরিফুল হক ডালিম - ছদ্মবেশী পাকিস্তানী এজেন্ট নাকি বিভ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা?

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

TruthBangla

শরিফুল হক ডালিম - ছদ্মবেশী পাকিস্তানী এজেন্ট নাকি বিভ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা?

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক সেনা অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এক কালিমালিপ্ত অধ্যায়। বিশ্ব ইতিহাসে বিভিন্ন সময় অনেক বেশি অত্যাচারী ও নির্মম স্বৈরশাসকও ছিল, কিন্তু তাদের কারো পুরো পরিবারকে হত্যা করার নজির নাই, এমন নিকৃষ্ট ইতিহাস একমাত্র বাংলাদেশেরই রয়েছে। তাই এটা শুধুমাত্র একটা সেনা অভ্যুত্থান ছিল না, এটা সবসময়ই চিরশত্রু পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র ও নিকৃষ্ট অপকর্ম হিসেবেই ইতিহাসে সবসময় লেখা থাকবে। বাঙালিদের কাছে পরাজয়ের পর প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানের আইএসআই ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধু হত্যার নীলনকশা তৈরি করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় প্রবাসী এক সাংবাদিকের অনলাইন সাক্ষাৎকারে সাক্ষাৎকার প্রদান করে মেজর ডালিম মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তৎকালীন সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে একগুচ্ছ বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদান করেন। এই সাক্ষাৎকারে একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে শেখ মুজিব হত্যার পেছনে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যর্থতাকে ঢাকার মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই দীর্ঘ নিবন্ধে ডালিমের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যগুলোর ব্যবচ্ছেদ, তাঁর সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ ও চাকরিচ্যুতির নেপথ্য কারণ, কুমিল্লায় তাঁর অত্যাচারী ভূমিকা, শেখ মুজিব হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং তাঁর পাকিস্তানপন্থী ভাবাদর্শকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও দলিলের নিরিখে বিশ্লেষণ করা হলো।

২০২৫ সালের সাক্ষাৎকারে ডালিমের ছয়টি বিতর্কিত দাবি

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে শরীফুল হক ডালিম বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে বঙ্গবন্ধুর ওপর দায় চাপানোর বদলে আত্মপক্ষ সমর্থনের চরম ব্যর্থতাই ফুটে উঠেছে। ডালিমের উত্থাপিত প্রধান ছয়টি দাবি এবং তার বিপরীতে ঐতিহাসিক সত্য নিচে তুলে ধরা হলো:

জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ও সরাসরি সম্পৃক্ততা

ডালিমের দাবি: জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানকারীদের একজন ছিলেন এবং এই গভীর ষড়যন্ত্রের সূচনা থেকেই তিনি তাঁদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

ঐতিহাসিক সত্য ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ: ডালিমের এই বক্তব্য তৎকালীন সেনাবাহিনীতে বিদ্যমান শৃঙ্খলার চরম অবনতি, সামরিক উচ্চাভিলাষ এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার ভয়াবহ বাস্তবতা উন্মোচন করে। তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে লেফট্যানেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের আইনবহির্ভূত তৎপরতা ও রাষ্ট্রপতিকে উৎখাতের পরিকল্পনার বিষয়টি সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অবহিত ছিলেন।

বাংলাদেশ সামরিক আইন ও শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ অথবা রাষ্ট্রপ্রধানকে তৎক্ষণাৎ অবহিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা তাঁর আইনি দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তিনি তা না করে নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন, যার সমর্থনে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজের অনুসন্ধান এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের 'বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ' গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। ডালিমের স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকারোক্তি এটিই নিশ্চিত করে যে, ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক সেনা-ক্ষোভের ফল ছিল না; বরং তা ছিল পাকিস্তানীদের সাথে গোপন আতাত এবং সেনাবাহিনীর পদলোভী গোষ্ঠীর এক সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত।

জিয়াউর রহমানের শাসনকালে সেনা হত্যা ও ডালিম পরিবারের সুবিধাভোগিতা

ডালিমের দাবি: জিয়াউর রহমান পরবর্তীকালে তাঁর ক্ষমতা সংহত করতে সেনাবাহিনীর প্রায় ৪,০০০ সেনাসদস্যকে ফায়ারিং স্কোয়াড ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে নির্মূল করেছিলেন। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমান ডালিমের পিতাকে (শামসুল হক) নিজের মন্ত্রিসভায় সিনিয়র মন্ত্রী বানিয়েছিলেন এবং জিয়া ঠিকমতো বাংলা বলতে বা লিখতেও পারতেন না।

ঐতিহাসিক সত্য ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ: ডালিমের এই বক্তব্য তাঁর নিজস্ব অবস্থানের চরম বৈপরীত্য ও পারিবারিক সুবিধাভোগিতার চিত্র ফুটিয়ে তোলে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের শাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং তা দমনে হাজার হাজার সামরিক সদস্যের সামারি সামরিক আদালতে বিচার ও ফাঁসি হয়, যা সামরিক ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

অথচ সেই রক্তক্ষয়ী পটভূমির মাঝেই ডালিমের নিজের পরিবার জিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাঁর পিতাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় আসীন করা হয় এবং ডালিম সহ অন্যান্য অভ্যুত্থানকারীদের রাষ্ট্রীয় কূটনীতিবিদ হিসেবে বিদেশের দূতাবাসে পুনর্বাসিত করা হয়। পরবর্তীতে ক্ষমতার সমীকরণে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা হ্রাস পাওয়ার পরই ডালিম এই বৈপরীত্যমূলক ও ব্যক্তিগত আক্রোশপ্রসূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যা তাঁর অবস্থানকে সম্পূর্ণ স্ববিরোধী করে তোলে।

১৯৭১ সালে 'কোরআন ছুঁয়ে' ২৫ বছরের ষড়যন্ত্রের শপথ

ডালিমের দাবি: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই সেনা পরিষদের সদস্যরা গোপন পরিকল্পনা করে কোরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিলেন যে, তারা শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করবেন; কারণ শেখ মুজিব ছিলেন "ভারতপন্থী"

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে ১৫ই আগস্টের খুনি চক্র এবং পাকিস্তানের গুপ্ত দোসররা দাবি করে আসছিল যে, ১৯৭৫ সালের আগস্টের ঘটনাটি ছিল সামরিক সদস্যদের তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে ঢাকা লেডিজ ক্লাবে গাজী গোলাম মোস্তফার সাথে ডালিমের স্ত্রীকে অপমানের ঘটনা, ডালিমসহ কয়েকজন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতি এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার দরুন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।

কিন্তু ডালিমের এই বক্তব্য সেই সমস্ত পূর্ববর্তী অজুহাতকে মিথ্যা প্রমাণ করে। তিনি নিজেই প্রকাশ করে ফেলেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ড কোনো প্রশাসনিক বা সামাজিক ক্ষোভের প্রতিক্রিয়া ছিল না; বরং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে থেকেই তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করছিল। হয়তো পাকিস্তান নিজেরা হত্যা না করে এই দেশের দোসরদের দ্বারা এ হত্যাকান্ড ঘটাতে চেয়েছিল।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রাখছিল এবং ত্রিশ লক্ষ মানুষ আত্মাহুতি দিচ্ছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের আড়ালে এই বিশ্বাসঘাতক গোষ্ঠীটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে লিপ্ত ছিল। সেনা পরিষদের নামে গঠিত এই গোপন গোষ্ঠী মূলত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-র মতাদর্শ বহন করছিল। এটি নিশ্চিত করে যে, ডালিমসহ এই চক্রটি প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী ছিল না; বরং তারা ছিল মুক্তিবাহিনীর ভেতরে মিশে থাকা ছদ্মবেশী চক্রান্তকারী ও পাকিস্তানের অনুগত এজেন্ট।

ডালিম একদিকে দাবি করেছেন "২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা", আবার অন্যদিকে মাত্র ৪ বছরের মাথায় (১৯৭৫ সালে) সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলছেন। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, এটি তাঁদের ঐতিহাসিক অপরাধ ঢাকতে এবং নিজেদের পক্ষে সমর্থন জোগাতে ধর্মীয় আবেগ (কোরআন স্পর্শ) ও ভারতবিরোধী জিকিরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার একটি অপচেষ্টা মাত্র। এটি স্পষ্ট করে যে, তারা কোনো "বাঙালির মুক্তিবাহিনীর সেনা" ছিল না, বরং ১৯৭১ থেকেই তারা মুক্তিযুদ্ধে মিশে থাকা ছদ্মবেশী পাকিস্তানি এজেন্ট ছিল।

বঙ্গবন্ধু পরিবারকে হত্যার পেছনের কারণ বিশ্লেষণে ব্যর্থতা

ডালিমের দাবি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পেছনে ডালিম কোনো যুক্তিসঙ্গত, আইনি বা জনকল্যাণমুখী কারণ খাড়া করতে পারেননি। তারা বাকশাল গঠন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, "ক্ষমতা দখল" এবং "ভারতবিরোধিতা"কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রে সরকারের গৃহীত নীতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা বাকশাল ব্যবস্থার বিরোধিতা করার অধিকার নাগরিকদের থাকে। কিন্তু নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে তাঁর সহধর্মিণী, তিন পুত্র, দুই অন্তঃসত্ত্বা বধূ এবং ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলসহ পরিবারের ১৭ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করার কোনো রাজনৈতিক, নৈতিক বা আইনি সমর্থন থাকতে পারে না। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সামরিক আইন ও সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে সাঁজোয়া যান নিয়ে চালানো এই বর্বর হামলা একটি স্পষ্ট গণহত্যা ও চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

ডালিমের বক্তব্য ও তৎকালীন ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁদের মূল চালিকাশক্তি ছিল কেবলই সামরিক উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতা দখল এবং বৈদেশীক চক্রান্ত। ১৫ই আগস্টের পর তারা খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পুতুল রাষ্ট্রপতি বানিয়ে ক্ষমতার পেছনে থেকে মূল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে অসাংবিধানিক 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' জারির মাধ্যমে নিজেদের বিচারপ্রক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখা এবং বিদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে উচ্চপদে চাকরি হাসিল করা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো জাতীয় স্বার্থের "বিপ্লব" ছিল না; বরং তা ছিল ব্যক্তিগত পদ-পদবি ও সুবিধাপ্রাপ্তির এক রক্তক্ষয়ী লেনদেন।

একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামীর জবানবন্দিতে রাজনৈতিক অসন্তোষের কথা বলে আত্মপক্ষ সমর্থনের এই চেষ্টা ঐতিহাসিক তথ্য ও আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অসার ও দেউলিয়া হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তানের দোসরদের সাথে বন্ধুত্ব

ডালিমের দাবি ও অবস্থান: শরীফুল হক ডালিমের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শেখ মুজিব ছিলেন জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তানের দোসর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রধান শত্রু, আর ডালিম ও তাঁর সহযোগী খুনিরা যেহেতু শেখ মুজিবকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন, তাই রাজনৈতিক সমীকরণে ডালিম এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো একে অপরের বন্ধু।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: একজন তথাকথিত 'মুক্তিযোদ্ধা' কীভাবে ১৯৭১ সালের গণহত্যা, ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ বীরাঙ্গনার রক্তক্ষরণকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানের গোলাম জামায়াতে ইসলামীর সহযোগীতে পরিণত হতে পারেন? ১৯৭১ সালের ঘাতক ও পাকিস্তানপন্থীদের সাথে ডালিমদের এই মনস্তাত্ত্বিক অক্ষ বাংলাদেশ গঠনের মূল চেতনার চরম পরিপন্থী।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ১৯৭১ সালে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী দলগুলো পুনরায় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। অন্যদিকে, ডালিমসহ ১৫ই আগস্টের আত্মস্বীকৃত খুনিরা পরবর্তীতে 'ফ্রিডম পার্টি' গঠন করে রাজনৈতিক ময়দানে উগ্র ডানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সাথেই প্রকাশ্য ঐক্য গড়ে তোলে। ডালিমের কথাবার্তা ও ইতিহাস বিকৃতি পুরোপুরি পাকিস্তানের গোলাম জামায়াতে ইসলামীর অপপ্রচারের মূল সুর পুরোপুরি মিল রয়েছে।

একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর উত্তম মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও ডালিম কীভাবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত নারকীয় গণহত্যা, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির ঘটনাকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সহযোগী হতে পারলেন, তা এক বিরাট প্রশ্ন। এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে, যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরতান্ত্রিক সংস্কৃতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদবিরোধী মনোভাব এবং পরাজিত পাকিস্তানিদের মগজধোলাই উগ্রতা মনস্তত্ত্ব ডালিমদের চেতনা থেকে কখনোই মুছে যায়নি। এটি প্রমাণ করে যে, ডালিমের ভেতরে কখনোই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ছিল না, তাঁর ভেতরে বাস করত এক পরাজিত পাকিস্তানি উগ্র সামরিক মানসিকতা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভারতভীতি ছড়ানোর চেষ্টা

ডালিমের দাবি: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠনের সময় প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের সাথে একটি গোপন ৭ দফা চুক্তি সই করেছিলেন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতের অনুগত করদরাজ্যে রূপান্তর করা হয়েছিল।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: ডালিমের এই বক্তব্য ভিত্তিহীন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অপমান করার উদ্দেশ্যে পুরনো মিথ্যাচার। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন কিংবা যুদ্ধোত্তর কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা বা আন্তর্জাতিক নথিতে এ ধরনের কোনো গোপন চুক্তির সত্যতা কখনো পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭১ সালের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

ডালিমের এই কল্পিত দাবিকে মিথ্যে প্রমাণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো ভারতীয় মিত্রবাহিনীর অভূতপূর্ব ও দ্রুততম সময়ের মধ্য নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন। আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে কোনো বিজয়ী দেশের সেনাবাহিনী বিজয়ের পর এত দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্য একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যাওয়ার নজির নেই বললেই চলে। কিন্তু ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সুদৃঢ় কূটনৈতিক নেতৃত্ব ও তোফায়েল আহমেদের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের শেষ দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

ঢাকার ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই সমাপনী বিদায়ী কুচকাওয়াজে শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে মিত্রবাহিনীর এই স্বদেশে প্রত্যাবর্তনই প্রমাণ করে বাংলাদেশ কোনো দেশের অনুগত বা পুতুল সরকার ছিল না। এছাড়া ১৯৭২ সালের ১৯শে মার্চ যে ২৫ বছর মেয়াদী 'বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সমবায় ও শান্তি চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা ছিল দুটি স্বাধীন ও সমমর্যাদাপূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। এই চুক্তির প্রতিটি অনুচ্ছেদে উভয় দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একে অপরের হস্তক্ষেপ না করার নীতি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তদুপরি, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ কোনো বৈদেশিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) এবং ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি আদায় করেছিল। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা, জামাতি প্রোপাগান্ডাবাজ এবং সুবিধাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো 'ভারতভীতি' তৈরি ও 'দেশ বিক্রির' কাল্পনিক গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে বিষাক্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল, ডালিম তাঁর সাক্ষাৎকারে মূলত সেই পুরনো মিথ্যাচারকেই পুনরাবৃত্তি করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা বিকৃতি

ডালিমের দাবি: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হননি; বরং নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ লক্ষ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই সংখ্যা অতিরঞ্জিতভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: একাত্তরের নয় মাসের গণহত্যায় ৩০ লাখ শহীদের তথ্য কোনো রাজনৈতিক অতিরঞ্জন নয়, বরং এটি বিশ্ব স্বীকৃত ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালেই আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে নিহতের বিপুল সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি, অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে পদার্পণ করার এক সপ্তাহ আগেই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী মুখপত্র 'প্রাভদা' (Pravda) তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, বাংলাদেশে ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে 'নিউ ইয়র্ক টাইমস', 'দ্য গার্ডিয়ান', 'ওয়াশিংটন পোস্ট' এবং 'টাইম' ম্যাগাজিনের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো নিহতের সংখ্যা কয়েক লাখ থেকে শুরু করে ৩০ লাখ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে উল্লেখ করে।

পাকিস্তানি দোসর ও জামাতি বিহারীরা প্রায়ই দাবি করে থাকেন যে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইংরেজিতে কথা বলার সময় ভুলবশত "থ্রি লাখ (3 Lakhs)"-কে "থ্রি মিলিয়ন (3 Million)" বলেছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর দেশে আসার পূর্বেই বিশ্ব গণমাধ্যমে '৩০ লাখ' সংখ্যাটি সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি বিবিসি (BBC)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং পরবর্তী বিভিন্ন বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সচেতনভাবে "থ্রি মিলিয়ন" (৩০ লাখ) সংখ্যাটি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

বিশ্ববিখ্যাত গণহত্যা বিশেষজ্ঞ লিও কুপার (Leo Kuper) তাঁর সমাদৃত গ্রন্থ Genocide-এ বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ৩০ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর. জে. রামেল (R. J. Rummel) তাঁর Death by Government গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ১২.৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়, যা বিংশ শতাব্দীর দ্রুততম গণহত্যাগুলোর একটি। এছাড়া কম্পটনস এনসাইক্লোপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া অ্যামেরিকানা এবং ১৯৮১ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনেও এই গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

শেখ কামালের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির মিথ্যাচার

ডালিমের দাবি: শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা লেডিজ ক্লাবে ডালিমের স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের চরিত্রহননের লক্ষ্যে পাকিস্তানি দোসর ও গুপ্ত জামাতি গোষ্ঠী সবচেয়ে বড় যে ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালিয়েছিল, তা হলো ১৯৭৩ সালের ব্যাংক ডাকাতির কাহিনী। প্রকৃত সত্য হলো, ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের রাতে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন নিষিদ্ধ 'পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি' ঢাকায় সন্ত্রাস ও বোমা হামলার মাধ্যমে নাশকতার ডাক দিয়েছিল। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে এবং সাদা পোশাকের পুলিশের টহলকে সহায়তা করতে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বের হন শেখ কামাল।

মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকটবর্তী মোড়ে দায়িত্ব পালনরত সাদা পোশাকের পুলিশ গাড়িটিকে দুষ্কৃতকারীদের মাইক্রোবাস ভেবে ভুল করে কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই গুলিবর্ষণ করে (যা সামরিক পরিভাষায় 'Friendly Fire' নামে পরিচিত)। গুলিতে শেখ কামাল কাঁধে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং তাঁকে দ্রুত তত্কালীন পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এই মর্মান্তিক ভুল বোঝাবুঝির ঘটনাকে পরদিনই 'দৈনিক গণকণ্ঠ' ও 'হক কথা'-র মতো তীব্র সরকারবিরোধী পত্রিকাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিকৃত করে "শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ" বলে সংবাদ পরিবেশন করে। তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা (যেমন এসপি বাহাউদ্দিন) এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) তাঁদের স্মৃতিকথা ও অফিসিয়াল রিপোর্টেও নিশ্চিত করেছেন যে এটি ব্যাংক ডাকাতি ছিল না, বরং ভুল বোঝাবুঝির কারণে পুলিশের সঙ্গে ঘটা আকস্মিক গুলির ঘটনা ছিল।

বারবার সেনা শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং কুমিল্লায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে মেজর ডালিমকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। ডালিম নিজের অপেশাদার আচরণ, আইন অমান্য ও সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার চরম আক্রোশ ঢাকতেই পরবর্তীতে শেখ কামাল ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরুদ্ধে এসব মনগড়া ও চরিত্রহননমূলক গল্প তৈরি করেন।

ডালিমের অপপ্রচার ও বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

মেজর ডালিম এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে যে সকল অভিযোগ বা বানোয়াট কাহিনী প্রচার করে থাকে, তার বিপরীতে প্রকৃত নথিজাত সত্য নিচে সারণীবদ্ধ করা হলো:

অপপ্রচার/বিতর্কিত দাবি

মেজর ডালিমের বক্তব্য

মূল ঐতিহাসিক তথ্য ও দাপ্তরিক প্রমাণ

১. ডালিমের স্ত্রী অপহরণ ও শেখ কামালের জড়িত থাকার গুজব

শেখ কামাল ডালিমের স্ত্রীকে ধর্ষণ/অপহরণ করেছিলেন। (ডানপন্থী ও পাকিস্তানপ্রেমীদের প্রচারিত গুজব)

শেখ কামাল এতে বিন্দুমাত্র জড়িত ছিলেন না। ১৯৭৪ সালে লেডিজ ক্লাবে কথা-কাটাকাটির জের ধরে গাজী গোলাম মোস্তফার লোকজন ডালিমের স্ত্রীকে তুলে নেয়। ডালিম তাঁর নিজস্ব বই ‘যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি’-তেও শেখ কামালের জড়িত থাকার কথা বলেননি।

২. ১৫ই আগস্টের তাৎক্ষণিক কারণ

১৯৭৪ সালে চাকরিচ্যুতি এবং লেডিজ ক্লাবের ঘটনাই শেখ মুজিবকে হত্যার প্রধান কারণ।

ডালিম ২০২৫-এর সাক্ষাৎকারে নিজেই স্বীকার করেন, ১৯৭১ সাল থেকেই তারা শেখ মুজিবকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিলেন। এটি কোনো আকস্মিক পারিবারিক অসন্তোষ ছিল না।

৩. ভারতীয় বাহিনী অবস্থান ও করদরাজ্য দাবি

বাংলাদেশ ভারতের কাছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছিল এবং ভারতের অধীনস্থ রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চের মধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশে অবস্থান গুটিয়ে ভারতে ফেরত যায়।

৪. ১৯৭২-৭৫ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোর করে জয়ী হয়েছিল এবং জনগণ শেখ মুজিবকে ঘৃণা করত।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জনগণের বিপুল জনমতে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।

৫. ঢাকা বেতার থেকে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' ঘোষণা

১৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা হয়েছিল।

১৫ই আগস্ট ভোরে রেডিওতে প্রথম ভাষণে ডালিম বাংলাদেশকে "ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ" বলে ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তানি উর্দু সঙ্গীত সম্প্রচার করেন, যা তাঁর পাকিস্তানপন্থী মানসিকতার নগ্ন প্রমাণ।

লেডিজ ক্লাবের ঘটনা, শেখ কামালের নামে গুজব, সেনা শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং ডালিমের চাকরিচ্যুতি

১৯৭৪ সালের লেডিজ ক্লাবের ঘটনা এবং তৎপরবর্তী মেজর ডালিমসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বরখাস্ত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

লেডিজ ক্লাবের অপ্রীতিকর ঘটনা

১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ঢাকার ধানমন্ডি লেডিজ ক্লাবে মেজর শরীফুল হক ডালিমের খালাতো বোন তাহমিনার (পরবর্তীতে যার সাথে কর্নেল রেজার বিবাহ হয়) বিয়ে উপলক্ষে এক নৈশ সংসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবারসহ অন্যান্য সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পরিবার।

অনুষ্ঠানে ডালিমের কানাডা ফেরত শ্যালক বাপ্পির বড় চুল টানা এবং আসন গ্রহণ নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার দুই কিশোর ছেলের সাথে কথা কাটাকাটি বাক্যবিতণ্ডা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই তর্কবিতর্ক চরম উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং হাতাহাতি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ডালিমের স্ত্রী তাহমিনা হাসান নিম্মী ও শ্যালক বাপ্পি কর্তৃক গাজী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ও দুই ছেলে অপমান ও শ্লীলতাহানীর শিকার হয়। ডালিমের পরিবার সামরিক ও গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবার রাজনৈতিক এ সংক্রান্ত কটুবাক্য বিনিময় হয়।

গাজী গোলাম মোস্তফা এই অনুষ্ঠানে ছিলেন না, কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলেদের শ্লীলতাহানীর কথা শুনে তার লোকজন নিয়ে মাইক্রোবাসে লেডিজ ক্লাবে উপস্থিত হন এবং অস্ত্রের মুখে মেজর ডালিম, তার স্ত্রী নিম্মী, শ্যালক বাপ্পি এবং তাঁদের এক খালাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। অপহরণের পর গাজী গোলাম মোস্তফা তাঁদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে উভয়পক্ষ ঘটনা তুলে ধরলে বঙ্গবন্ধু পুরো ঘটনাটি শুনে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ডালিমদের মুক্ত করে দেন। একই সাথে গাজী গোলাম মোস্তফাকে শাসিয়ে উভয়পক্ষকে তিনি শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।

শেখ কামালের নাম জড়িয়ে গুজব ও মিথ্যাচার

এই ঘটনায় শেখ কামালের কোনো দূরতম সম্পৃক্ততাও ছিল না। কিন্তু ঘটনার পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্বাধীনতাবিরোধী ‍গুপ্ত রাজাকার চক্র এবং মাওবাদী জাসদপন্থী প্রচারমাধ্যমগুলো এই ব্যক্তিগত বিরোধকে পুঁজি করে শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রটানো হয় যে, বঙ্গবন্ধু-পুত্র শেখ কামাল মেজর ডালিমের স্ত্রীকে অপহরণ কিংবা ধর্ষণ করার সাথে জড়িত ছিলেন। এই মনগড়া মিথ্যাচারটি তৎকালীন সময়ে কিছু বিভ্রান্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

তবে আদালতের নথি, সামরিক গোয়েন্দা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিকথা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই অপপ্রচারের কোনো সত্যতা ছিল না। স্বয়ং মেজর ডালিম তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'যা দেখেছি যা বুঝেছি, যা করেছি' তে উক্ত ঘটনার আদ্যোপান্ত বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, লেডিজ ক্লাবের ঘটনাটি সম্পূর্ণরূপে গাজী গোলাম মোস্তফা, তাঁর দুই ছেলে ও তাঁদের অনুসারীদের সাথে সংঘটিত হয়েছিল। এই ঘটনার সাথে শেখ কামালের দূরতম কোনো সম্পর্ক বা সম্পৃক্ততা ছিল না। মূলত শেখ কামালের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে বিদ্বেষ ছড়াতে স্বাধীনতাবিরোধী মহল এই বানোয়াট কাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে এসেছে।

শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বাধ্যতামূলক অবসর

ঢাকা লেডিজ ক্লাব থেকে ডালিম ও তাঁর পরিবারকে অপহরণের খবর সেনানিবাসে পৌঁছালে জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। সামরিক আইনের চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ অমান্য করে ডালিম তার সেনা পরিষদের কয়েকজন অফিসার (যার মধ্যে মেজর ডালিম, মেজর নূর চৌধুরী এবং মেজর শাহরিয়ার যুক্ত ছিলেন) ও কিছু সেনা সদস্য সেনা শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করেন। তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছাড়াই দুটি সেনা ট্রাকে করে সশস্ত্র সেনাসদস্য নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার বাসভবনে হাজির হয় এবং সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। একই সাথে তারা গাজী গোলাম মোস্তফা ও তার লোকজনকে খুজতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বেআইনিভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে বেসামরিক যানবাহনে তল্লাশি চালাতে শুরু করেন।

বঙ্গবন্ধু মিমাংসা করে দেয়ার পরেও আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে অস্ত্র হাতে বেসামরিক ব্যক্তির বাসায় হামলা চালানো সামরিক শৃঙ্খলা বিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীতে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যমূলক আচরণে অত্যন্ত বিরক্ত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত আদালতের সুপারিশক্রমে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ১৯৭৪ সালে মেজর ডালিম, মেজর নূর এবং কয়েকজন সেনাসদস্যকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক বরখাস্ত ও অবসরে পাঠানো হয়। এই চাকরিচ্যুতির পর থেকেই ডালিমের মনে শেখ মুজিবের প্রতি গভীর ব্যক্তিক্রোধ ও হিংসা দানা বাঁধে।

গণতন্ত্রের সুযোগে সেনা কর্মকর্তাদের পদলোভ ও উশৃঙ্খল আচরণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাঁদের সন্তানতুল্য মনে করতেন। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সেনা বাহিনীর অভ্যন্তরে চরম শৃঙ্খলাহীনতা, অফিসারদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি এবং আইন অমান্য করার প্রবণতায় তিনি চরম বিরক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সময়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল। তাঁর পরবর্তী সামরিক শাসকগণ মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের শৃঙ্খলাহীনতাকে মৃত্যুদন্ড ও কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে সমাধান করলেও বঙ্গবন্ধু কোন সেনা অফিসার ও সেনা সদস্যকে মৃত্যুদন্ড ও কোর্ট মার্শাল করেননি, বরং বারবার শৃঙ্খলাভঙ্গে অতিষ্ঠ হয়ে কয়েকজনকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তৎকালীন লে. কর্নেল এম এ হামিদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কাদা ছোড়াছুড়ি ও পদোন্নতির তদবির দেখে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন:

“কর্নেল সাহেব কী বলব! আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে complain করে। অমুক এই করেছে - সে এই করেছে। আমার পোস্টিং, আমার প্রোমোশন... বলুন তো কী হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়াকামড়ি করলে, ডিসিপ্লিন না রাখলে এই আর্মি দিয়ে আমি কী করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো না দেশ চালাবো? আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবাই খাই খাই শুরু করেছে। কোথা থেকে আমি দেব, তা কেউ ভাবতে চায় না।”

মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন সময় সামরিক নিয়মকানুন বারবার অমান্য করা এবং বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার কারণে আইনানুযায়ী ১৯৭৪ সালে মেজর ডালিমসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বারবার বঙ্গবন্ধু নিজ বাসভবনে ডেকে সতর্ক করেছিলেন।

কুমিল্লায় ডালিমের ক্ষমতা প্রয়োগ ও আওয়ামীলীগ নেতাদের ওপর নির্যাতন

মেজর শরীফুল হক ডালিমের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে কুমিল্লায়। ছাত্রজীবনে কুমিল্লাতেই অবস্থানকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে স্থানীয় ছাত্র ও যুব নেতাদের সাথে তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতার সূচনা ঘটে। তৎকালীন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আফজল খানসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে ডালিম ছাত্রজীবন থেকেই নিজের চরম প্রতিপক্ষ বলে গণ্য করতেন।

১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন এবং পরবর্তীকালে ১৯৬৫ সালে সেখান থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে স্থানান্তরিত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত হয়ে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে ১ম ফিল্ড আর্টলারি রেজিমেন্ট ও 'আর্মি স্কুল অব ফিজিক্যাল ট্রেনিং'-এ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে কুমিল্লার সামরিক প্রশাসন, স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তাঁর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ও প্রভাব তৈরি হয়েছিল।

১৯৭৪ সালের 'অপারেশন সিলভার লাইনিং' ও চরম নির্যাতন

১৯৭৪ সালের ২৮শে এপ্রিল দেশব্যাপী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, দুষ্কৃতকারী দমন ও চোরাচালানবিরোধী বিশেষ সামরিক অভিযান 'অপারেশন সিলভার লাইনিং' শুরু হয়। এই অভিযানের অংশ হিসেবে কুমিল্লা অঞ্চলে সেনাসদস্যদের পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পান মেজর ডালিম। কিন্তু রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের নামে ডালিম তাঁর অর্পিত সামরিক পদের চরম অপব্যবহার শুরু করেন।

সরকারি ক্ষমতার আড়ালে তিনি মূলত তাঁর ছাত্রজীবনের পুরনো ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রোশ মেটানোর সুযোগ গ্রহণ করেন। এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি পেশাদারি সামরিক শৃঙ্খলা বিসর্জন দিয়ে চরম ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে মাঠে নামেন।

কুমিল্লায় অস্ত্র উদ্ধারের নামে পরিচালিত এই অভিযানে মেজর ডালিম কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি পরোয়ানা বা নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের অবৈধভাবে গ্রেপ্তার করতে থাকেন। আটককৃতদের ওপর তিনি ও তাঁর অনুগত সেনাসদস্যরা চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহর পরবর্তী লেখনিতেও উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ১৯৭৪ সালের ওই অভিযানে কুমিল্লায় ডালিম যে বিশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংকটের সৃষ্টি করেছিলেন, তা সেনাবাহিনী ও তৎকালীন সরকারের ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছিল।

মেজর ডালিমের সরাসরি আদেশে ও পরিচালনায় যেসকল স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তি নির্মম নির্যাতনের শিকার হন:

আফজল খান: কুমিল্লার বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রবীণ রাজনীতিক, যিনি ছাত্রজীবন থেকেই ডালিমের ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন।
আব্দুল আজিজ খান: স্থানীয় প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক।
অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ: কুমিল্লা অঞ্চলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠক।
মাইনুল হুদা: কুমিল্লার স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও আওয়ামী লীগ নেতা।
কমান্ডার ইকবাল আহমেদ বাচ্চু: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার।
বদরুল হুদা জেনু: স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সংগঠক।
নাজমুল হাসান পাখি: কুমিল্লার প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী।

এদের পাশাপাশি কুমিল্লার বহু সাধারণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তুলে এনে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক লাঞ্ছনা করা হয়।

আইন প্রয়োগের নামে মেজর ডালিমের এই নির্বিচার ও অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কুমিল্লার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও ভুক্তভোগীরা এই চরম নির্যাতন ও ব্যক্তিগত আক্রোশের সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পৌঁছান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষা ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধে অবিলম্বে ডালিমকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় প্রত্যাহার (Recall) করার নির্দেশ দেন।

কুমিল্লা থেকে অপসারণের ঘটনা এবং পরবর্তীকালে ঢাকার 'লেডিস ক্লাব' ঘটনায় রেড ক্রসের চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়িঘর ভাংচুর, পরিবারের সাথে সংঘর্ষ ও সেনা সদস্য নিয়ে রমনা থানায় চড়াও হওয়ার ঘটনায় সেনাবাহিনীতে তীব্র শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। এর প্রেক্ষিতে মেজর ডালিম, মেজর নূরসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে সেনা তদন্তের মুখোমুখি হতে হয় এবং পরবর্তীতে তাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

কুমিল্লায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্যাতন চালানো, সেখান থেকে অপমানজনক প্রত্যাহার এবং পরবর্তীতে সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কারের ঘটনা ডালিমকে একজন চরম প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তিতে পরিণত করে। এই ব্যক্তিগত আক্রোশ ও শৃঙ্খলাহীন মানসিকতা পরবর্তীতে তাঁকেও সেনাদলচ্যুত অন্যান্য উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত করে এবং পাকিস্তান-আমেরিকার বঙ্গবন্ধু হত্যার গোপন আতাতে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের জঘন্যতম ষড়যন্ত্র ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

রেডিওতে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' ঘোষণা এবং পাকিস্তান প্রীতির প্রমাণ

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর, খুনি চক্রের অন্যতম প্রধান চক্রান্তকারী শরীফুল হক ডালিম শাহবাগে অবস্থিত তৎকালীন ঢাকা বেতার কেন্দ্রে (বাংলাদেশ বেতার) সশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করেন।

বেতার কেন্দ্রের প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং কল্যাণপুর সম্প্রচার কেন্দ্র চালু করতে বাধ্য করে ডালিম স্বকণ্ঠে ঘোষণা দেন:

"আমি মেজর ডালিম বলছি... শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে... সেনাসভা ক্ষমতা দখল করেছে এবং বাংলাদেশকে একটি 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' (Islamic Republic of Bangladesh) হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে..."

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ডালিমের এই সংক্ষিপ্ত বেতার ঘোষণাটি কেবল তৎকালীন ক্ষমতার পটপরিবর্তনের বার্তা ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পুনরায় পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার এক সুসংগঠিত নীল নকশার প্রকাশ্য সূচনা।

১৯৭২ সালের সংবিধান ও চার মূলনীতির ওপর আঘাত

১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসেবে 'ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র' সংযুক্ত করে একটি অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। ডালিম ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশকে "ইসলামী প্রজাতন্ত্র" (Islamic Republic of Bangladesh) হিসেবে ঘোষণা করে সংবিধান ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলে কুঠারাঘাত করতে চেয়েছিলেন।

যদিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন ও কূটনৈতিক আইনি জটিলতার কারণে পরবর্তীতে খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রজ্ঞাপনে "গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ" নামটিই বহাল রাখতে বাধ্য হলেও, বাস্তবে ১৫ই আগস্টের পর থেকেই পাকিস্তানঘেঁষা ভাবধারা প্রয়োগ শুরু হয়। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে 'বাংলাদেশ বেতার' এর নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তানি আদলে 'রেডিও বাংলাদেশ' (Radio Bangladesh) করা হয়।

দিনভর রেডিওতে পাকিস্তানি উর্দু গান

১৫ই আগস্ট সকাল থেকে পুরো দিনজুড়ে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল সামরিক চক্রান্তকারীদের হাতে। সেদিন রেডিওতে কোনো দেশাত্মবোধক বাংলা গান কিংবা রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের স্বাধীনতাসংগ্রামের অনুপ্রেরণাদায়ী কোনো সৃষ্টি বাজাতে দেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে দিনভর সম্প্রচার করা হয় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অনুসরণে মার্চিং মিউজিক, সামরিক বাজনা এবং তৎকালীন পাকিস্তান আমলের পরিচিত উর্দু গান।

স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় একজন তথাকথিত 'মুক্তিযোদ্ধা' সেনা কর্মকর্তার নির্দেশনায় জাতীয় বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহ্যকে পদদলিত করে পাকিস্তানি সামরিক সুর বাজানো হয়েছিল। এটি নিশ্চিত করে যে, ডালিম ও তাঁর সহযোগী ঘাতকেরা ১৯৭১ সালে কৌশলগত কারণে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলেও, মানসিকভাবে তারা কখনো স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব গ্রহণ করতে পারেনি। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছিল না; বরং পোশাক পরিবর্তন করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভাবাদর্শকেই ধারণ করছিল।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পাকিস্তানের তাৎক্ষণিক উচ্ছ্বাস

ডালিম কর্তৃক রেডিওতে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' ঘোষণার সাথে সাথেই সবচেয়ে দ্রুত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া দেখায় পাকিস্তান। ১৫ই আগস্টের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কালবিলম্ব না করে খন্দকার মোশতাক ও খুনি চক্রের সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা দেন। একই সাথে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে ৫০ হাজার টন চাল এবং ৫০ লাখ গজ কাপড় উপহার হিসেবে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।

একজন রাষ্ট্রপ্রধান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের এই দ্রুততম উদযাপিত প্রতিক্রিয়া এবং আর্থিক-আদর্শিক সহায়তা প্রদান প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পরাজিত হওয়ার পর পাকিস্তান যে ছদ্মবেশী চক্রান্তের বীজ বুনে গিয়েছিল, ডালিম ছিলেন সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নেরই মূল রূপকার।

পরবর্তীতে পাকিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের প্রমাণ

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অভ্যুত্থানকারীদের বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে কূটনৈতিক চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হলেও পরবর্তীতে দেশে ফিরতে ব্যর্থ হয়ে ডালিম দীর্ঘ বছর ধরে পাকিস্তানেই অত্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করে থাকেন।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছায়াতলে ডালিমের এই দীর্ঘকালীন অবস্থান প্রমাণ করে যে, তাঁর পাকিস্তানপ্রীতি কেবল কোনো সাময়িক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই বিদ্যমান একটি গভীর মেলবন্ধন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ও চলাকালীন সময়ে যে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রতি আনুগত্য লালন করতেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ঘাতকবৃত্তি এবং পরবর্তী জীবনপঞ্জি তারই প্রামাণ্য দলিল।

১৯৭২-১৯৭৫ এর ইতিহাস বিকৃতি ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অপপ্রচার

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতা দখল করেন এবং পরবর্তীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এবং বিএনপি-জামায়াত জোট টানা ২১ বছর (১৯৭৫-১৯৯৬) বাংলাদেশ শাসন করে। এই দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র, গণমাধ্যম ও শিক্ষাক্রম ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়ার সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ মানুষের কাছে খলনায়ক বানানোর উদ্দেশ্যে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও অপপ্রচারকারী সেল নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়।

১৯৭৫-পরবর্তী শাসকরা এবং জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রিত অপপ্রচার সেল মূলত তিনটি কৌশলে ইতিহাস বিকৃত করেছিল:

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালকে ব্যর্থ প্রমাণের অপচেষ্টা

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, তখন দেশটি ছিল একটি চরম ধ্বংসস্তূপ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যাওয়ার সময় দেশের অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর ও অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে যায়। কোনো ব্যাংক বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল না। এমন একটি চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু মাত্র ৩ বছর ৭ মাসে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে সমৃদ্ধির শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করান। স্বাধীনতা লাভের মাত্র ১০ মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর বিশ্বমানের একটি প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

যেকোনো সদ্য স্বাধীন দেশে বিদেশি মিত্রবাহিনী দীর্ঘদিন অবস্থান করার নজির থাকলেও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনৈতিক দক্ষতায় মাত্র তিন মাসের মধ্যে (১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ) ভারতীয় সৈন্যদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে জাতিসংঘ (১৯৭৪), কমনওয়েলথ (১৯৭২), ওআইসি (১৯৭৪) ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ পায় বাংলাদেশ। বিশ্ব মানচিত্রে ১৩০টিরও বেশি দেশ বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও ভৈরব ব্রিজ পুনর্নির্মাণ করে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৯ই আগস্ট বিদেশি কোম্পানি শেল অয়েলের কাছ থেকে তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, রশিদপুর ও কৈলাশটিলা এই ৫টি গ্যাসক্ষেত্র মাত্র ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে জাতীয় মালিকানায় আনা হয়, যা আজও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মূল ভিত্তি।

৭৫-পরবর্তী ইতিহাস বিকৃতির প্রধান কৌশল ছিল বঙ্গবন্ধুর এই অভূতপূর্ব অর্জনগুলোকে আড়াল করা এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রায়িত করা। অথচ খাদ্যবাহী মার্কিন জাহাজ আটকে দেওয়ার পেছনের ভূ-রাজনীতি (তৎকালীন কিউবায় বাংলাদেশের পাট রপ্তানির অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পিএল-৪৮০ চুক্তির খাদ্যশস্য আটকে দেওয়া) সম্পর্কে সত্য তথ্য জনসম্মুখে প্রচার করতে দেওয়া হয়নি।

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর সপরিবারে আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার থেকে সুরক্ষা দিতে ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর তৎকালীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ জঘন্য 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' (অধ্যাদেশ নং ৫০, ১৯৭৫) জারি করেন।

পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান ও চতুর্থ জাতীয় সংসদে সংবিধানে বিতর্কিত 'পঞ্চম সংশোধনী' পাসের মাধ্যমে এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সাংবিধানিক বৈধতা দেন। এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর বাংলাদেশে সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার ও বিচার পাওয়ার পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

মেজর ডালিম, মেজর রশীদ, মেজর ফারুক, শরিফুল হোসেন, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এসএইচএমবি নূর চৌধুরীসহ ১৫ই আগস্টের খুনিদের বিদেশের বিভিন্ন বাংলাদেশ দূতাবাসে (বেইজিং, পাকিস্তান, ব্যাংকক, কায়রো, ত্রিপোলি, বুয়েনস আইরেস) উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক দায়িত্ব ও সুবিধা দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ আমলেও খুনি ফারুক-রশীদকে 'ফ্রিডম পার্টি' গঠন করতে দেওয়া হয় এবং তাদের রাজনৈতিক পদচারণা ও সংসদে প্রবেশের সুযোগ প্রদান করে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্তকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়।

খুনিদের 'বীর' সাজানোর চেষ্টা ও পলাতক জীবনের বাস্তবতা

৭৫-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র বিটিভি ও রেডিওতে মুক্তিযুদ্ধের মূল স্লোগান 'জয় বাংলা' নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খুনিদের কর্মকাণ্ডকে "জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন" বা "বিপ্লব" হিসেবে বৈধতা দেওয়ার অপপ্রচার চালানো হতো।

তবে এই অপপ্রচারের মূল ভিত্তি ছিল চরম বৈপরীত্যপূর্ণ। খুনি গোষ্ঠী যদি দেশের কোনো মহৎ কল্যাণ বা বিপ্লব সাধন করেই থাকত, তবে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে কেন তাদেরকে 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' জারির মাধ্যমে আইনি সুরক্ষা নিতে হয়েছিল? কেন তারা দেশের আইন ও আদালতের মুখোমুখি হতে সাহস পায়নি?

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১২ই নভেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে সাধারণ আদালতে হত্যা মামলা পুনঃসূচিত হয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খুনিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ২০১০ ও ২০২০ সালে কয়েকজনের সাজা কার্যকর হয়। সত্য প্রকাশ্যে আসার সাথে সাথে ডালিম, রশীদ, নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীদের মতো স্বঘোষিত 'বীরেরা' সারাজীবনের জন্য বিদেশের মাটিতে নাম ও পরিচয় গোপন করে ফেরারী অপরাধী হিসেবে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়।

ছদ্মবেশী এজেন্ট নাকি বিভ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা?

শরীফুল হক ডালিমের সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনের নানা বাঁক এবং পরবর্তীতে সংঘটিত রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল মূলত একটি কৌশলগত অবস্থান। বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেও, তাঁর ভেতরের আনুগত্য কখনোই স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি ছিল না। মূলত প্রবল ভারতবিদ্বেষকে রাজনৈতিক ঢাল বানিয়ে তিনি অন্তরে লালন করতেন পাকিস্তানপ্রেম, যা স্বাধীনতার প্রাক্কালেই তাঁর বিভিন্ন পদক্ষেপে আঁচ করা যেত।

ডালিম ছিলেন এক চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী, চরম শৃঙ্খলাহীন এবং পদলোভী সামরিক ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় থেকেই তাঁর চরম স্বেচ্ছাচারিতা এবং সামরিক রীতিনীতি অবমাননার প্রবণতা তৎকালীন জ্যেষ্ঠ অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডারদের নজরে আসে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সাম্য ও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান নির্দেশিত মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনাস্থা। এই আদর্শিক বিচ্যুতি পরবর্তীকালে তাঁর লিখিত বিভিন্ন বই, প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্য এবং সেনাবাহিনীতে ঘটিত একের পর এক চক্রান্তে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

একটি রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার চেয়ে ডালিমের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত অহংবোধ সবসময়ই বড় ছিল। ঢাকা লেডিজ ক্লাবের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত ঘটনা এবং পরবর্তীতে কুমিল্লায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ১৯৭৪ সালে তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। নিয়মমাফিক শৃঙ্খলামূলক শাস্তির প্রতি সম্মান জানানোর পরিবর্তে এই বরখাস্তের ঘটনাটি তাঁর মনে এক তীব্র আক্রোশ ও প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। এই ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও ক্ষমতা হারানোর আক্রোশকেই তিনি রূপ দিয়েছিলেন একটি পুরো জাতির স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করার নৃশংস রাষ্ট্রবিরোধী বিশ্বাসঘাতকতার চক্রান্তে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই কালো রাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ বেতারে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শে বেতার থেকে উর্দু গান ও বার্তা প্রচারের ঘটনা তাঁর দীর্ঘদিনের লুকিয়ে রাখা রূপটি উন্মোচন করে দেয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনি আদতে ছিলেন পাকিস্তানি ভাবাদর্শের এক সুচতুর ছদ্মবেশী অনুসারী।

ঐতিহাসিক মূল্যায়নে ডালিম কোনো বীর, বিপ্লবী কিংবা রাষ্ট্র সংস্কারক নন; বরং তিনি বাংলাদেশের সংঘাতময় ইতিহাসের অন্যতম এক নিকৃষ্ট সুবিধাবাদী ও জাতিদ্রোহী চরিত্র। সেনা পোশাকের আড়ালে তিনি কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই আঘাত হানেননি, বরং পরাজিত পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন।

তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ (Bangladesh: A Legacy of Blood) – অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (১৫ই আগস্টের চক্রান্ত, সামরিক উচ্চাভিলাষ ও জিয়াউর রহমানের নীরব ভূমিকা)।
২. বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভোলিউশন (Bangladesh: The Unfinished Revolution) – লরেন্স লিফশুলৎজ (জিয়াউর রহমানের পূর্বাবগতি ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত)।
৩. যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি – মেজর (অব.) শরীফুল হক ডালিম (ডালিমের নিজস্ব আত্মজীবনী; লেডিজ ক্লাবের ঘটনা এবং এতে শেখ কামালের অসংপৃক্ততার প্রমাণ)।
৪. তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা – লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ (সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও কাদা ছোড়াছুড়ি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য)।
৫. এক সাধারণ সোলজারের স্মৃতিকথা – মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী (১৯৭৩ সালে সর্বহারা পার্টি দমনে শেখ কামালের অভিযান এবং পুলিশের ভুল গুলিবর্ষণে 'ফ্রেন্ডলি ফায়ার'-এর সত্যতা)।
৬. বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-১৯৮১ – ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন (৭৫-পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন)।
৭. সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বরখাস্ত সংক্রান্ত সামরিক রেকর্ড (১৯৭৪)।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Jul 27, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.