আজাদ কাশ্মীরের কান্না – শোষণের রাজনীতি, দমন-পীড়ন ও একাত্তরের পুনরাবৃত্তি
এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

TruthBangla

যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ডের নামের পূর্বে যখন ‘আজাদ’ বা ‘মুক্ত’ শব্দটি যুক্ত থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেখানে নাগরিকদের অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং সম্মানজনক জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠার কথা। কিন্তু পাকিস্তান-শাসিত 'আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর' (AJK)-এর বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালে সেই নামের মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ এক করুণ প্রহসনে রূপ নেয়। এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর" এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।
আজাদ কাশ্মীরের আপামর জনগণ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি নয়। তারা কোনো অন্যায্য, রাজনৈতিক চক্রান্ত বা অসংগত দাবি নিয়ে রাজপথে নামেনি। তাদের দাবিগুলো অত্যন্ত মৌলিক, সুনির্দিষ্ট এবং বেঁচে থাকার তাগিদে উত্থাপিত যেমন বিদ্যুতের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, গমের আটার ওপর ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং স্থানীয় নদ-নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আঞ্চলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। অথচ, এই অতি মানবিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা বাস্তবায়ন করছে ইসলামাবাদ।
আজাদ কাশ্মীরে সংকটের আসল উৎস অর্থনৈতিক শোষণ ও সম্পদের অপব্যবহার
আজাদ কাশ্মীরে (আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর) বিরাজমান গভীর অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ছড়িয়ে পড়া গণ-আন্দোলনের মূল কারণ নিহিত রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শোষণের গভীরে। ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পাকিস্তান সরকার বছরের পর বছর ধরে আজাদ কাশ্মীরের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ও জলবিদ্যুৎ সম্পদকে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করেছে, অথচ স্থানীয় কাশ্মীরি জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রদানে চরম অবহেলা প্রদর্শন করে এসেছে।
বিদ্যুতের দাম ও জলবিদ্যুৎ সম্পদের রাজনৈতিক বৈষম্য
আজাদ কাশ্মীরকে পাকিস্তানের জলবিদ্যুৎ (Hydel Power) উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিখ্যাত মংলা ড্যাম (Mangla Dam) এবং নীলম-ঝিলম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Neelum-Jhelum Hydropower Project) প্রতি বছর হাজার হাজার মেগাওয়াট অত্যন্ত সস্তা জলবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে।
উৎপাদন খরচ বনাম বিক্রয় মূল্য: প্রাকৃতিক জলপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত এই বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় গড়ে মাত্র ২ থেকে ৩ পাকিস্তানি রুপি (PKR)। এত সস্তায় বিদ্যুৎ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (WAPDA) এবং কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণের ওপর ইউনিট প্রতি ২০ থেকে ৩০ রুপিরও বেশি দাম নির্ধারণ করে। তদুপরি এর ওপর অতিরিক্ত জিএসটি (GST), ফুয়েল প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট (FPA) ও নানা ধরনের সারচার্জ চাপিয়ে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশ যেমন খাইবার পাখতুনখাওয়া যেভাবে 'নেট হাইডেল প্রফিট' (NHP) বা জলবিদ্যুতের রয়্যালটি পায়, আজাদ কাশ্মীরকে সেই সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
মংলা ড্যাম, ঐতিহাসিক বাস্তুচ্যুতির ট্র্যাজেডি ও নীলম-ঝিলম বিপর্যয়
১৯৬০-এর দশকে সিন্ধু পানি চুক্তির অধীনে মিরপুর জেলায় নির্মিত মংলা ড্যাম প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে স্থানীয়দের অবর্ণনীয় ত্যাগের ইতিহাস। ড্যাম নির্মাণের ফলে মিরপুর শহর ও তার আশপাশের বহু উর্বর গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়, যার ফলে ১ লক্ষেরও বেশি কাশ্মীরি নিজেদের ভিটেমাটি থেকে চিরতরে বাস্তুচ্যুত হন।
বাস্তুচ্যুত এসব পরিবার পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতকে সচল করার ভিত্তি স্থাপন করলেও, কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের উত্তরসূরিরা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা তাদের ভূমিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য সুফল পাননি। নিজস্ব ভূমির সম্পদ ব্যবহার করে দূরবর্তী লাহোর বা করাচীর শিল্পকারখানায় সস্তায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও স্থানীয় কাশ্মীরিদের বিদ্যুৎ কিনতে হয় আকাশছোঁয়া দামে।
নীলম-ঝিলম প্রকল্প ও পরিবেশগত বিপর্যয়: প্রায় ৫০০ কোটি পাকিস্তানি রুপিরও বেশি ব্যয়ে নির্মিত নীলম-ঝিলম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য নীলম নদীর পানিকে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে গতিপথ পরিবর্তন (Diversion) করার ফলে রাজধানী মুজাফফরাবাদ এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদীর প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
এর ফলে অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে তীব্র পানীয় জলের সংকট তৈরি হয়েছে এবং নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থের সিংহভাগ ইসলামাবাদ লাভ করলেও, প্রকল্পের পরিবেশগত দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি ও ক্ষতির সমস্ত দায়ভার বইতে হচ্ছে স্থানীয় কাশ্মীরিদের।
গমের আটার ওপর ভর্তুকি হ্রাসের সংকট
আজাদ কাশ্মীরের প্রধান খাদ্য সংকট ও সাম্প্রতিক গণ-ক্ষোভের আরেকটি প্রধান কারণ হলো গমের আটার দাম অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। পাহাড়-পর্বতে ঘেরা বন্ধুর ভূমিরূপের কারণে আজাদ কাশ্মীরে ধান ও গমের কৃষিভিত্তিক উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত। খাদ্যশস্যের জন্য অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণরূপে বহিরাগত সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চুক্তি অনুযায়ী এই অঞ্চলে সরকারি হ্রাসকৃত বা ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করার বিধান চালু ছিল।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা সামলাতে পাকিস্তান সরকার সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আজাদ কাশ্মীরে প্রদত্ত গমের আটার ভর্তুকি একতরফাভাবে বিপুল পরিমাণে কমিয়ে দেয়।
ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি গমের আটার দাম আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চরম আঘাত হানে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি অঞ্চলের অসচ্ছল পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে। পাকিস্তানের নিজস্ব অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের চাপ আজাদ কাশ্মীরের নাগরিকদের কাঁধে চাপানোর নীতিকে স্থানীয়রা এক ধরনের "অর্থনৈতিক শোষণ" হিসেবে গণ্য করে।
রাজনৈতিক পরাধীনতা ও অসাংবিধানিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
আজাদ কাশ্মীরকে কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বাস্তবে সেখানকার রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ১৯৭৪ সালের 'আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান আইন' (Act 1974) অনুযায়ী সেখানে একটি নির্বাচিত বিধানসভা (Legislative Assembly) এবং একজন প্রধানমন্ত্রী থাকেন।
তবে প্রকৃত নির্বাহী ও আর্থিক ক্ষমতার অধিকাংশ ন্যস্ত থাকে 'আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর কাউন্সিল'-এর হাতে। ১৪ সদস্যের এই কাউন্সিলের প্রধান হলেন স্বয়ং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এটি অর্থ বরাদ্দ, রাজস্ব আয়, আয়কর ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, যা স্থানীয় নির্বাচিত বিধানসভাকে কার্যকরভাবে ক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল করে রেখেছে।
আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য: আজাদ কাশ্মীরের মূল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র। অঞ্চলটির শীর্ষ প্রশাসনিক পদসমূহ যেমন চিফ সেক্রেটারি (Chief Secretary), ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (IGP), এবং অর্থ সচিব (Finance Secretary) সর্বদাই পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস থেকে প্রাক-মনোনীত হয়ে ইসলামাবাদ থেকে আসেন। স্থানীয় কাশ্মীরি কর্মকর্তাদের এসব নীতি-নির্ধারণী পদে আসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো জনগণের চাহিদা অনুসারে না হয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় বাস্তবায়িত হয়।
শরণার্থী আসন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব: আজাদ কাশ্মীর বিধানসভার মোট আসনগুলোর মধ্যে ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে পাকিস্তানে বসবাসরত জম্মু-কাশ্মীরের শরণার্থীদের জন্য। এই ১২টি আসনের ওপর স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণের সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং পাকিস্তানে অবস্থানরত রাজনৈতিক বিন্যাস দ্বারা এগুলো নির্ধারিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় শাসক দলগুলো এই ১২টি সংরক্ষিত আসনকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করে আজাদ কাশ্মীরে সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকে সংকুচিত করেছে।
জনবিস্ফোরণ ও জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (JAAC) ঐতিহাসিক প্রতিরোধ
অন্যায় ও চরম অর্থনৈতিক শোষণের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে যা হয়, আজাদ কাশ্মীরেও ঠিক তাই ঘটেছে। দল-মত নির্বিশেষে এই অঞ্চলে এক নজিরবিহীন বেসামরিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে 'জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি' (JAAC)।
বেসামরিক নাগরিক সমাজের অভূতপূর্ব ঐক্য: আজাদ কাশ্মীরের ইতিহাসে সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইস্যুতে বিভক্ত থাকলেও, সাম্প্রতিক এই আন্দোলনে ব্যবসায়ী, শিক্ষক, তরুণ শিক্ষার্থী, পরিবহন শ্রমিক এবং সাধারণ সিভিল সোসাইটি এক ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। JAAC কোনো সহিংস গোষ্ঠী নয়; তারা একটি অহিংস গণ-প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি তুলে ধরেছে।
আজাদ কাশ্মীরের জনগণের আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ- মংলা ড্যামের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় জনগণের জন্য বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। গমের আটার ওপর পূর্বের ন্যায় ন্যায্য ভর্তুকি বজায় রাখতে হবে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং এলিট শ্রেণীর বিলাসী সুবিধা ও অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় খরচ ছাঁটাই করতে হবে। নদীগুলোর নাব্য রক্ষা করতে হবে এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের রয়্যালটি আজাদ কাশ্মীরের উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু জনগণ যখন আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধানের আহ্বান জানায়, তখন ইসলামাবাদ আলোচনা টেবিল বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বেছে নেয় সামরিক বুটের হুঙ্কার।
পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর তান্ডব, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে পাকিস্তান সরকার যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তা কেবল স্বৈরাচারী নয়, বরং অমানবিক। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে পুরো অঞ্চলকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
পাঞ্জাব কনস্ট্যাবুলেরি ও রেঞ্জার্স মোতায়েন: স্থানীয় আজাদ কাশ্মীর পুলিশ যখন অহিংস বিক্ষোভকারী বেসামরিক নাগরিকদের ওপর তাণ্ডব চালাতে দ্বিধাবোধ করে, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে হাজার হাজার অতিরিক্ত পাঞ্জাব কনস্ট্যাবুলেরি (Punjab Constabulary), ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলেরি (FC) এবং পাকিস্তান রেঞ্জার্স দ্রুত অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়।
মুজাফফরাবাদ, মীরপুর, রাওয়ালকোট ও কোটলি অঞ্চলের মিছিলে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের পরিবর্তে আধুনিক ভারী অস্ত্র ও তাজা গুলি ব্যবহার করা হয়। সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে বহু বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান এবং শত শত মানুষ গুরুতর আহত হন। আন্দোলনকারীদের সাংবিধানিক অধিকার দাবির লড়াইকে সামরিক শক্তি দিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।
ইন্টারনেট বন্ধ ও তথ্য সেন্সরশিপ: জনগণের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং আন্দোলনকারীদের একত্রিত হওয়া রুখতে অঞ্চলজুড়ে ৪জি (4G), ৩জি ও ফাইবার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত বিশেষ টেলিকম সংস্থা (SCO) ব্যতীত সমস্ত বেসরকারি সংযোগ অচল করে দেওয়া হয়।
দেশি-বিদেশি স্বাধীন সাংবাদিকদের আন্দোলনকবলিত এলাকাগুলোতে চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই সাথে, মূলধারার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ব্যবহার করে মানবাধিকার আন্দোলনের নেতাদের "রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তকারী" বা "বিদেশি এজেন্ট" আখ্যা দিয়ে চরিত্রহননের অপচেষ্টা করা হয়, যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি মূল মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া যায়।
অবরুদ্ধ নগরী ও 'গাজা মডেল'-এর ছায়া: মুজাফফরাবাদমুখী আন্দোলনকারীদের 'লং মার্চ' থামানোর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেতু (যেমন নীলম ব্রিজ) এবং প্রধান প্রধান আন্তঃজেলা মহাসড়কে বিশালাকার শিপিং কনটেইনার, কাঁটাতারের বেড়া ও মাটির ঢিবি তুলে পুরো অঞ্চলকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়।
যে কৌশল অবলম্বন করে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, আজাদ কাশ্মীরেও ঠিক একইভাবে সাধারণ মানুষকে বন্দি করার পদ্ধতি অনুকরণ করা হয়। টানা কারফিউ এবং চাকা-বন্ধ (Wheel-jam) পরিস্থিতির ফলে ওষুধ, শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ফলে সামরিক বেষ্টনীতে আটকে পড়ে পুরো অঞ্চলের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন।
'কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান' মিথ্যাচার এবং ১৯৭১ এর স্মৃতি
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র কাশ্মীর ইস্যুতে নিজেকে 'উদ্ধারকর্তা' ও 'মুক্তিকামী কাশ্মীরিদের পরম অভিভাবক' হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করে আসছে। "কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান" (কাশ্মীর হবে পাকিস্তান) স্লোগানটিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সেনাশাসিত প্রচারযন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। তবে তথাকথিত 'আজাদ কাশ্মীর' (পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর) এবং গিলগিত-বালতিস্তানের প্রশাসনিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম দ্বিমুখী নীতি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ইসলামাবাদ থেকে পরিচালিত 'কাশ্মীর অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড গিলগিত-বালতিস্তান মন্ত্রণালয়' এবং অঘোষিতভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে এই অঞ্চলকে প্রায় সাত দশক ধরে মূল রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বললেও নিজ নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ডে কাশ্মীরিদের মৌলিক নাগরিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করে পাকিস্তান একটি ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। আজাদ কাশ্মীরের বর্তমান বাস্তবতা সেই প্রচারণাকে এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মিথ্যাচারে পরিণত করেছে।
১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান আজাদ কাশ্মীরের দমন-পীড়নের ভীতিকর সাদৃশ্য
আজাদ কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সেটির প্রতি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পরিচালিত পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দমনমূলক কর্মকাণ্ডের ঐতিহাসিক স্মৃতির সাথে হুবহু মিলে যায়।
অধিকারের আন্দোলনকে ‘দেশদ্রোহিতা’ হিসেবে তকমা দেওয়া: ১৯৭১ সালে বাঙালিরা যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অর্জিত গণতান্ত্রিক রায় মেনে নেওয়া এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার চরম বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়েছিল, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায্য দাবিসমূহকে সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা 'ভারতের চক্রান্ত', 'বিচ্ছিন্নতাবাদ' এবং 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' বলে আখ্যা দিয়েছিল।
আজ যখন আজাদ কাশ্মীরের জনগণ আটার ভর্তুকি, বিদ্যুতের ন্যায্য শুল্ক নির্ধারণ এবং স্থানীয় অধিকারের দাবি তুলছে, তখন পাকিস্তান সরকার তাদের দাবিগুলোকে 'বিদেশি চক্রান্ত' বা 'রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা' হিসেবে অভিহিত করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের এই আন্দোলন দমনে আন্দোলনকারীদের ওপর অ্যান্টি-টেররিজম অ্যাক্ট (ATA)-র অধীনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও আইনি হয়রানি চালানো হচ্ছে।
সামরিক শক্তি দিয়ে বেসামরিক দাবি দমনের নীতি: রাজনৈতিক দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে নিরীহ, অসংগঠিত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সামরিক বাহিনীর তাণ্ডব নামিয়ে আনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসসহ সারা দেশে নির্বিচারে গণহত্যা, টিয়ারশেল, কারফিউ এবং বিমান হামলা চালিয়ে বাঙালির কণ্ঠরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়।
অসামরিক জনগণের ওপর একইভাবে ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি (FC), পাঞ্জাব রেঞ্জার্স এবং স্পেশাল পুলিশ ফোর্স নামিয়ে চরম বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। লংমার্চ ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে তাজা গুলি, রাবার বুলেট, জলকামান ও টিয়ারশেল প্রয়োগ করা হচ্ছে, যার ফলে একাধিক বিক্ষোভকারী ও সাধারণ নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন। বিচারবহির্ভূত আটক ও বেপরোয়া সহিংসতার এই নীতি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো মানবিক ও গণতান্ত্রিক দাবির মুখোমুখি হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগকেই একমাত্র সমাধান মনে করে।
মোহভঙ্গের চূড়ান্ত পরিণতি
ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, বন্দুকের নল কিংবা ভুয়া আবেগ তৈরি করে কোনো ভূখণ্ডকে চিরকাল অবদমিত রাখা যায় না। পাকিস্তানি সামরিক শক্তি ১৯৭১ সালে বিপুল আক্রোশে বাঙালি জাতিকে মুছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের সুসংগঠিত প্রতিরোধ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে পাকিস্তান তার পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড হারায়। একইভাবে, আন্তর্জাতিক বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণে দীর্ঘ সাত দশক ধরে ব্যবহার করা "কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান" স্লোগানটির প্রকৃত রূপ আজ স্বয়ং কাশ্মীরিদের সামনে উন্মোচিত। ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল এবং কাশ্মীরি জনগণকে নিজেদের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণে রাখার এই রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার আজ আজাদ কাশ্মীরের ঘরে ঘরে ঘৃাপিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
আজাদ কাশ্মীর সংকটের বিভিন্ন মাত্রা
আজাদ কাশ্মীরের চলমান গণ-বিক্ষোভ, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং এর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি সংক্ষেপে অনুধাবনের জন্য নিচে একটি সমন্বিত সারণী প্রদান করা হলো:
সংকটের ক্ষেত্র | মূল সমস্যা ও জনগণের যৌক্তিক দাবি | পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবতা | ১৯৭১-এর সাথে ঐতিহাসিক সাদৃশ্য |
বিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ সম্পদ | মংলা ও নীলম-ঝিলম ড্যাম থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য উৎপাদনে ব্যবহৃত ২-৩ রুপিতে নির্ধারণ করা। | স্থানীয়দের ওপর ২৫-৩০ রুপি প্রতি ইউনিটে চড়া দাম ও ভারী কর চাপানো। | পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও সম্পদ থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যবহারের শোষক নীতি। |
খাদ্য নিরাপত্তা ও গমের আটা | ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার দরুন গমের আটার ওপর ঐতিহ্যগত সরকারি ভর্তুকি বজায় রাখা। | আইএমএফ (IMF)-এর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে হঠাৎ ভর্তুকি প্রত্যাহার ও কৃত্রিম সংকট তৈরি। | তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর চরম উদাসীনতা। |
রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক অধিকার | ১৯৭৪ সালের সংবিধানের 'কাশ্মীর কাউন্সিল'-এর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে স্থানীয় অ্যাসেম্বলিকে ক্ষমতা দেওয়া। | ইসলামাবাদ থেকে সিভিল সার্ভিস অফিসার (চিফ সেকেণ্ডারি, আইজিপি) পাঠিয়ে অঞ্চল শাসন। | তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানানো। |
মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা | শান্তিপূর্ণ মিছিল, বিক্ষোভ এবং সমাবেশ করার অধিকার সুনিশ্চিত করা। | পাঞ্জাব রেঞ্জার্স মোতায়েন, টিয়ারশেল মারার মাধ্যমে দমন, তাজা গুলি বর্ষণ ও গণগ্রেপ্তার। | ১৯৭১-এর 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মতো বেসামরিক জনতার ওপর সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর অভিযান। |
তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা | অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও স্থানীয় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। | ৪জি ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সেন্সরশিপ ও ব্ল্যাকআউট। | ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বহিষ্কার ও সত্য তথ্য গোপন করার চেষ্টা। |
প্রশাসনিক ও আইনি শাসন কাঠামো: ১৯৭৪ সালের অ্যাক্ট (Act 1974)
আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক বন্দিদশা বোঝার জন্য এর আইনি কাঠামো অনুধাবন করা সবচেয়ে জরুরি। ১৯৭৪ সালে কার্যকর হওয়া 'আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান আইন' (AJK Interim Constitution Act, 1974) অঞ্চলটিকে নামে স্বায়ত্তশাসন দিলেও বাস্তবে সমস্ত ক্ষমতা ইসলামাবাদের হাতে কুক্ষিগত করে দেয়।
কাশ্মীর কাউন্সিল (Kashmir Council): এই অ্যাক্টের অধীনে একটি 'কাশ্মীর কাউন্সিল' গঠন করা হয়, যার প্রধান স্বয়ং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। অর্থায়ন, কর আরোপ, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই কাউন্সিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বিধানসভার সীমাবদ্ধতা: আজাদ কাশ্মীরের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিধানসভা (Legislative Assembly) স্থানীয় উন্নয়নমূলক কিছু কাজ ছাড়া বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাদের যেকোনো বিল পাস করতে হলে বা কার্যকর করতে হলে ইসলামাবাদ-মনোনীত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ: আজাদ কাশ্মীরের শাসনযন্ত্রের শীর্ষ পদগুলো যেমন চিফ সেক্রেটারি (Chief Secretary), ইনস্পেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (IGP), অর্থ সচিব এবং ডিরেক্টর জেনারেল অব ইনফরমেশন সর্বদাই পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস (PAS) থেকে প্রাক-মনোনীত করে পাঠানো হয়। ফলে স্থানীয় জনগণ বা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারেন না।
অর্থনৈতিক শোষণের সুনির্দিষ্ট চিত্র ও জলবিদ্যুৎ বিতর্ক
আজাদ কাশ্মীরের গণ-আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সম্পদের বৈষম্য। পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতিতে আজাদ কাশ্মীরের অবদান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য হলেও, প্রতিদানে তারা পেয়েছে কেবল অবহেলা।
মংলা ড্যাম ও নীলম-ঝিলম প্রকল্পের প্রভাব
মংলা ড্যাম (Mangla Dam): ১৯৬০-এর দশকে সিন্ধু পানি চুক্তির অধীনে নির্মিত এই ড্যামের কারণে মিরপুর অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ নিজেদের উর্বর কৃষিজমি ও বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। এই ড্যাম থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ পুরো পাকিস্তানের শিল্পখাতকে গতিশীল করেছে, কিন্তু মিরপুর ও কাথুয়া অঞ্চলের মানুষ আজও ঘনঘন লোডশেডিং এবং চড়া বিদ্যুৎ বিলের ভুক্তভোগী।
জলবিদ্যুৎ রয়্যালটি (Net Hydel Profit - NHP): পাকিস্তান সংবিধানের ১৫৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের অন্যান্য প্রদেশ (যেমন খাইবার পাখতুনখাওয়া) জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত হারে রয়্যালটি পায়। কিন্তু আজাদ কাশ্মীর কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রদেশ না হওয়ায় তাদের এই 'নেট হাইডেল প্রফিট' বা ন্যায্য রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
আটার ভর্তুকি কাটছাঁট ও আইএমএফ-এর শর্ত
পাকিস্তানের অর্থনীতি যখন তীব্র মূল্যস্ফীতি এবং দেউলিয়াত্বের মুখে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ইসলামাবাদ এই বাজেট ছাঁটাইয়ের কোপ ফেলে আজাদ কাশ্মীরের গমের আটার ওপর। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ছিল, সেখানে হঠাৎ আটার দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় প্রান্তিক পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়ে।
আন্দোলনকারীদের ‘ভারতের এজেন্ট’ ট্যাগ ও দমন-পীড়ন নীতি
পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবেই নিজেদের ভূখণ্ডে ঘটে যাওয়া যেকোনো স্বাধিকার বা নাগরিক অধিকারের আন্দোলনকে দমন করতে নির্দিষ্ট কিছু কৌশল ব্যবহার করে থাকে। আজাদ কাশ্মীরেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
'ভারতের এজেন্ট' ট্যাগিংয়ের পুরনো কৌশল
পাকিস্তানি মিডিয়া ও সরকারি প্রচারযন্ত্রে প্রায়শই জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-র আন্দোলনকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (RAW)-এর অর্থায়নে চালিত বা 'রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত' হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ আন্দোলনের মূল দাবিগুলো ছিল কেবল বিদ্যুৎ বিলের রেট কমানো এবং গমের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। জনগণের পেটের দায়ে ওঠা দাবিকে 'দেশদ্রোহিতা' হিসেবে উপস্থাপন করার এই রাজনীতি আজ আজাদ কাশ্মীরের তরুণ সমাজের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে গেছে।
ফ্রন্টিয়ার কোর (FC) ও পাঞ্জাব রেঞ্জার্সের তাণ্ডব
আন্দোলন দমনে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর বিশ্বাস রাখতে না পেরে পাকিস্তান সরকার বহিরাগত প্যারা-মিলিটারি বাহিনী পাঠায়।
টিয়ারশেল ও তাজা গুলি: আবাসিক এলাকা, বাজার এবং মিছিল লক্ষ্য করে ব্যাপক মাত্রায় কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়া হয়। বেশ কিছু স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর তাজা গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে, যাতে হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
গণগ্রেপ্তার ও ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট: আন্দোলন সমন্বয়কারী তরুণ ও ব্যবসায়ী নেতাদের গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার কারণে নিছক সাধারণ নাগরিক নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রগুলো বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
আজাদ কাশ্মীরের প্রধান অঞ্চলভিত্তিক সংকটের চিত্র
আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন জেলায় এই সংকটের প্রভাব এবং আন্দোলনের তীব্রতা বোঝার জন্য নিচে একটি তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো:
জেলার নাম | মূল স্থানীয় সমস্যা ও কারণ | জনগণের আন্দোলনের ধরণ | রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা |
মুজাফফরাবাদ (Muzaffarabad) | রাজধানী শহর; প্রশাসনিক বৈষম্য, মেগা প্রকল্পের পরিবেশগত ক্ষতি ও আটার দাম বৃদ্ধি। | সচিবালয় অভিমুখে ঐতিহাসিক 'লং মার্চ' ও সড়ক অবরোধ। | শহরজুড়ে ভারী মিলিটারি মোতায়েন, ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ ও কারফিউ প্রয়োগ। |
মিরপুর (Mirpur) | মংলা ড্যামের কারণে ঐতিহাসিক বাস্তুচ্যুতি; চড়া বিদ্যুতের বিল ও অভিবাসী পরিবারের ওপর চাপ। | বিশাল সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স (বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করার আন্দোলন)। | পাঞ্জাব রেঞ্জার্স মোতায়েন, স্থানীয় বিক্ষোভকারীদের সাথে সরাসরি সংঘর্ষ। |
কোটলি ও রাওয়ালকোট (Kotli & Rawalakot) | বিদ্যুৎ সরবরাহ সমস্যা, চাকরি সংকট এবং যুবসমাজের ব্যাপক বেকারত্ব। | 'জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি' (JAAC)-র মূল সাংগঠনিক কেন্দ্র ও ধর্মঘট। | স্থানীয় নেতাদের গণগ্রেপ্তার, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও গণ-গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। |
পুনছ ও নীলম উপত্যকা (Poonch & Neelum) | সীমান্তবর্তী এলাকা; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। | স্থানীয় বাজার বন্ধ, পরিবহন ধর্মঘট ও বিশাল জনসভা। | সীমান্ত নিরাপত্তার অজুহাতে চলাচল সীমিত করা ও চেকপোস্ট বৃদ্ধি। |
আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আজাদ কাশ্মীরের এই চরম অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রার সমীকরণ তৈরি করেছে।
'দ্বিজাতি তত্ত্ব' ও পাকিস্তানের নৈতিক পরাজয়: ১৯৪৭ সালে যে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' (Two-Nation Theory)-এর ওপর ভিত্তি করে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের বয়ান তৈরি করা হয়েছিল এবং কাশ্মীরের জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, আজাদ কাশ্মীরের বর্তমান বাস্তবতা সেই তত্ত্বের চরম অন্তসারশূন্যতা তুলে ধরেছে। নিজ দেশের অংশ হিসেবে দাবি করা ভূখণ্ডের মুসলিম অধিবাসীদের ওপরই যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনী সামরিক চড়াও হয়, তখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে কথা বলার সমস্ত নৈতিক অধিকার পাকিস্তান হারায়।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর নিরাপত্তা ঝুঁকি: আজাদ কাশ্মীরের সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলগুলো চীনের কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগে তৈরি CPEC (China-Pakistan Economic Corridor) প্রকল্পের অত্যন্ত কাছাকাছি। এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ধর্মঘট এবং সেনা মোতায়েন চীনের কৌশলগত বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নজরদারি: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আজাদ কাশ্মীরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নকরণ এবং নির্বিচার গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা পাকিস্তান সরকারকে অবিলম্বে নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার এবং প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পাকিস্তানের দ্বিমুখী নীতি
আজাদ কাশ্মীরে পাকিস্তান সরকারের চালানো এই অমানবিক অপকর্মের ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের নৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
জাতিসংঘের মঞ্চে দ্বিমুখী অবস্থান: পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UNGA) এবং মানবাধিকার কাউন্সিলে (UNHRC) কাশ্মীরের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভাষণ দিয়ে এসেছে। তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে থাকে।
কিন্তু আজ যখন নিজেদের প্রত্যক্ষ শাসনে থাকা আজাদ কাশ্মীরের মানুষ ন্যূনতম অর্থনৈতিক অধিকারের জন্য চিৎকার করছে, তখন সেই একই পাকিস্তান সরকার নিজের দেশের নাগরিকদের ওপরই নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। এই দ্বিমুখী আচরণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাকিস্তানের সমস্ত কূটনৈতিক মুখোশ খুলে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ডায়াসপোরা (Diaspora)-র অসন্তোষ: যুক্তরাজ্য (UK), ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক কাশ্মীরি প্রবাসী (যাদের একটি বিশাল অংশ মীরপুর ও আজাদ কাশ্মীর অঞ্চল থেকে আগত) আজ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন। লন্ডন, ব্রাসেলস এবং জেনেভায় অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে প্রবাসীরা নিয়মিত বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। নিজেদের জন্মভূমির আত্মীয়স্বজনের ওপর চালানো এই নির্যাতন প্রবাসীদের মধ্যেও চরম ক্ষোভ ও মোহভঙ্গের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে পাকিস্তান সরকার তাদের ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন হারাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিণতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আজাদ কাশ্মীরের পরিস্থিতি যেভাবে দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে থাকবে না; এর ভূ-রাজনৈতিক তরঙ্গ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুবসমাজের চরম মৌলবাদ-বিরোধী ও স্বাধিকারমুখী রূপান্তর: আজাদ কাশ্মীরের তরুণ সমাজ আজ বুঝে গেছে যে রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা আর বাস্তবতার ব্যবধান কতটা বিশাল। ঐতিহাসিকভাবে যেসব কাশ্মীরি তরুণদের পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মূলধারার প্রতি কিছুটা সমর্থন ছিল, আজকের এই সহিংসতা ও ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা তাদের সম্পূর্ণ বিরোধী শিবিরে ঠেলে দিয়েছে। এই তরুণরা এখন আর কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর ভরসা করছে না; তারা নিজেদের ভুমি, সম্পদ এবং আত্মসম্মানের সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ধস: পাকিস্তান নিজেই বর্তমানে এক অভূতপূর্ব মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি। এমন অবস্থায় যদি তারা আজাদ কাশ্মীরের মতো স্পর্শকাতর ও কৌশলগত অঞ্চলে চিরস্থায়ী অশান্তি জিইয়ে রাখে, তবে তা তাদের নিজস্ব অর্থনীতিকে আরও গভীর খাদে ফেলে দেবে। সিপেক (CPEC) এবং চীন-পাকিস্তান বাণিজ্যিক করিডোরের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্যও এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি ছিল, যা আজ চরম হুমকির মুখে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষার আহ্বান
ইতিহাসের এক অদ্ভুত নির্মমতা হলো যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না, ইতিহাস তাদের একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে বাধ্য করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে সামরিক শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়ে নিজের পূর্বাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় হারিয়েছিল, যার শেষ পরিণতি ছিল ভূখণ্ডের বিভাজন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
আজ ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে, পাঁচ দশক পর, সেই একই ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র আজাদ কাশ্মীরেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। বুলেটের মাধ্যমে, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, গমের আটা ও বিদ্যুতের আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিয়ে কিংবা নিরপরাধ জনতার রক্তে হাত রাঙিয়ে কখনোই একটি জনগোষ্ঠীকে চিরকাল দাস বানিয়ে রাখা যায় না।
আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ কোনো অমূলক চাওয়া নিয়ে রাজপথে নামেনি। তারা বাঁচতে চায় মাথা উঁচু করে, নিজেদের সম্পদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে, একটি সম্মানজনক মানবিক জীবনের নিশ্চয়তা নিয়ে। পাকিস্তান সরকারকে অবিলম্বে তাদের অমানবিক ও স্বৈরাচারী সামরিক নীতি প্রত্যাহার করতে হবে। বুলেট ও টিয়ারশেল বন্ধ করে, বন্দীদের মুক্তি দিয়ে এবং JAAC-এর ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো মেনে নেওয়াই এই মুহূর্তে একমাত্র সমাধান।
অন্যথায়, বন্দুকের নলের মুখে চেপে রাখা এই ক্ষোভ ও কান্না যেদিন দাবানলে রূপ নেবে, সেদিন কেবল একটি রাষ্ট্রীয় বয়ান বা "কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান"-এর মতো কাল্পনিক স্লোগান দিয়ে সেই ধস থামানো সম্ভব হবে না। ইতিহাস সাক্ষী জনগণের অপ্রতিরোধ্য ক্ষোভের সামনে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও একদিন নতজানু হতেই হয়।















