বাংলাদেশের চিরশত্রু হেনরি কিসিঞ্জার - বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা করেছিলো যে
বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

TruthBangla

বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বাধিকার সংগ্রামের ইতিহাস একদিকে যেমন বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও অসীম সাহসিকতার মহাকাব্য, অন্যদিকে তা বৈশ্বিক শক্তির নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছকে বলির পাঁঠা বানানোর এক করুণ আলেখ্য। একাত্তরের রণাঙ্গনে বাঙালি যখন পাকিস্তানি জান্তার কামানের গোলার সামনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিচ্ছিল, তখন বিশ্বের মানচিত্রে এক অশুভ অক্ষশক্তি আপ্রাণ চেষ্টা করছিল সেই রক্তস্নাত স্বাধীনতাসংগ্রামকে নস্যাৎ করে দিতে। এই বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার।
বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন। কম্বোডিয়ার কার্পেট বোম্বিং, চিলির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে পিনোচেতের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা, সাইপ্রাসের গৃহযুদ্ধ কিংবা পূর্ব তিমুরের গণহত্যা প্রতিটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে কিসিঞ্জারের নাম যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যায় মদদ দেওয়া, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি করা এবং পরিশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার নেপথ্য চক্রান্তেও তাঁর ভূমিকাই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
১৯৭১ এর প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন-বেইজিং-ইসলামাবাদ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভেতরের কোনো গৃহযুদ্ধ ছিল না; এটি স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) চূড়ান্ত পর্বে তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে কিসিঞ্জারের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্ব রাজনীতিতে একঘরে করা। আর এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তিনি সাময়িকভাবে কমিউনিস্ট চীনের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বরফ গলানোর এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী বা 'দূতিয়াল' হিসেবে ভূমিকা রাখছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। ইসলামাবাদ ছিল ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যবর্তী গোপন যোগাযোগের মূল সেতু। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরের ভান করে পেটের অসুখের অজুহাতে রাওয়ালপিন্ডির কাছের এক পাহাড়ি রিসোর্টে আত্মগোপন করেন এবং সেখান থেকে গোপনে বেইজিং উড়াল দেন। সেখানে তিনি চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
এই প্রেক্ষাপটে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন কিসিঞ্জারের এই গোপন ‘পিছনের দরজার কূটনীতি’ বা 'Ping-Pong Diplomacy'-র জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিসিঞ্জার মনে করেছিলেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পাকিস্তানকে চাপ দিলে জেনারেল ইয়াহিয়া অসন্তুষ্ট হতে পারেন, যা ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে, এক কোটি শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং লাখ লাখ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা জেনেও কিসিঞ্জার ও নিক্সন পাকিস্তানকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে যান। বাঙালি জাতির মুক্তির আকাঙ্খাকে কিসিঞ্জার তাঁর মহাজাগতিক দাবার চালের এক সামান্য বিঘ্ন হিসেবে দেখেছিলেন।
অপারেশন সার্চলাইট ও গণহত্যায় কিসিঞ্জারের প্রত্যক্ষ মদদ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ঢাকা শহরসহ পুরো বাংলাদেশে ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ শুরু করে, তখন হোয়াইট হাউস কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেনি, বরং তারা এই গণহত্যাকে ত্বরান্বিত করার মানসিক ও কৌশলগত ইন্ধন যুগিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের ঐতিহাসিক গবেষণা এবং উন্মুক্ত হওয়া মার্কিন গোপন নথি পর্যালোচনা করলে কিসিঞ্জারের এই কসাইসুলভ মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ৬ই মার্চ ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ‘সিনিয়র রিভিউ গ্রুপ’-এর একটি গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাকিস্তানের সাময়িক উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সভার নথি অনুযায়ী:
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা অ্যালেক্সিস জনসন যখন মন্তব্য করেন,
“পাকিস্তান যদি (বাঙালিদের ওপর) শক্তি প্রয়োগ করে, তবে আমাদের তা নিরুৎসাহিত করা উচিত বলে মনে করি।”
জনসনের এই মানবতাবাদী প্রস্তাবের তাৎক্ষণিক বিরোধিতা করে কিসিঞ্জার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে ওঠেন:
“কেন? আমাকে শয়তানের পক্ষে ওকালতি করতে দাও। আমাদের কেন কোনো কিছু বলতেই হবে?”
অর্থাৎ, ২৫শে মার্চের পৈশাচিক গণহত্যার আগেই কিসিঞ্জার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন যে, পাকিস্তানি সেনা জান্তা যদি বাঙালির ওপর শক্তি প্রয়োগ বা হত্যাকাণ্ডও চালায়, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার বা বারণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও গবেষক মফিদুল হকের মতে,
“আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আলোকেই স্পষ্ট যে, গণহত্যার ক্ষেত্রে সরাসরি গুলি চালানো ঘাতক এবং সেই ঘাতককে অস্ত্র, অর্থ, সাহস ও আইনি সুরক্ষা প্রদানকারী সমানভাবে দোষী। কিসিঞ্জারের ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত প্রতিটি বর্বরোচিত অপরাধের সরাসরি সহযোগীর।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আশফাক হোসেন এই প্রসঙ্গে বলেন,
“পাকিস্তানি জান্তা যে বর্বরতা চালিয়েছিল, তার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি, রসদ এবং নৈতিক সাহস জুগিয়েছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। এমনকি যুদ্ধের শেষভাগে যখন পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয়ের মুখে, তখনো তিনি ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকদের মানবতাবাদী প্রতিবেদন দেখে ক্ষুব্ধ হতেন।”
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড যখন ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বিখ্যাত 'ব্লাড টেলিগ্রাম' (Blood Telegram)-এর মাধ্যমে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ ওয়াশিংটনে পাঠান এবং মার্কিন সরকারকে এর বিরোধিতা করার আকুল আবেদন জানান, তখন কিসিঞ্জার চরম ক্ষুব্ধ হন। তিনি ব্লাডকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং তাঁর কূটনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেন। অধ্যাপক আশফাক হোসেনের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেটের প্রতিবেদনগুলো দেখে চরম বিরক্ত হয়ে কিসিঞ্জার তাঁর স্বভাবসুলভ গালাগালি করে জিজ্ঞেস করেছিলেন:
"What are our bastards sending from Dhaka?" (ঢাকা থেকে আমাদের হাভাতে শুয়োরের বাচ্চারা এসব কী পাঠাচ্ছে?)
ওভাল অফিসের ঘৃণ্য টেপ ও কিসিঞ্জার-নিক্সন অক্ষের বর্ণবাদ
২০১৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত শিক্ষক গ্যারি জে. বাস মার্কিন ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে হোয়াইট হাউজের তৎকালীন প্রকাশিত নথি ও টেপের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয় যে, ওভাল অফিসে বসে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার তৎকালীন ভারতীয়দের ওপর ব্যাপক দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে মন্তব্য করেছিলেন। এমনকি কিসিঞ্জার সেই সময় মরতে থাকা ও নিপীড়িত বাঙালিদের জন্য সামান্যতম দরদ বা সমবেদনা দেখানো মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের প্রতি চরম কটূক্তি ও বিদ্রূপ করেছিলেন।
ভারতীয়দের প্রতি বিদ্বেষ: পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা থেকে বাঁচতে যখন এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয় এবং ভারত খাদ্য সংকটে পড়ে, তখন ওভাল অফিসের টেপে নিক্সনকে বলতে শোনা যায়, ভারতীয়দের জন্য "ব্যাপক দুর্ভিক্ষ" (Mass Famine) হওয়া দরকার। কিসিঞ্জার তা শুনে সমর্থন জানান।
বাঙালিদের মৃত্যুতে বিদ্রূপ: মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের যেসকল কর্মকর্তা গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মরতে থাকা বাঙালিদের জন্য মানবিক সাহায্যের কথা বলছিলেন, কিসিঞ্জার তাঁদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি বারবার বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই "রক্তক্ষরা হৃদয়" (Bleeding hearts) বা দরদ দেখানো স্রেফ ভণ্ডামি এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা।
কিসিঞ্জারের এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষের জীবনকে স্রেফ সংখ্যা হিসেবে গণনা করতেন। কোনো নীতিগত বা নৈতিক বাধা তাঁর মাথায় কাজ করেনি।
বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর ও কিসিঞ্জারের পরাজয়
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় অবধারিত হয়ে পড়ে, তখন কিসিঞ্জার তাঁর কূটনীতির শেষ ও সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্রটি প্রয়োগ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চরম ঝুঁকি নেন।
১০ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে কিসিঞ্জারের নির্দেশে মার্কিন পরমাণুবাহী রণতরী ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’-এর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরকে (7th Fleet / Task Force 74) বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল দুটি:
১. ভারতীয় বাহিনীকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভীত করা এবং ঢাকামুখী যৌথ বাহিনীর অগ্রগতি থামানো।
২. অবরুদ্ধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বঙ্গোপসাগর দিয়ে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার রাস্তা তৈরি করা।
তবে কিসিঞ্জারের এই চরমপত্র ও হুমকি ব্যর্থ হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টা পদক্ষেপে। সোভিয়েত অ্যাডমিরাল ভাসিলি আরখিপভের নেতৃত্বে ১০ম অপারেটিভ ব্যাটল গ্রুপের সোভিয়েত পরমাণু সাবমেরিন ও রণতরী বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌবহরের গতিপথ রোধ করে দাঁড়ায়।
অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা মানচিত্রে স্থান করে নেয়। বাংলাদেশের এই বিজয় ছিল বিশ্বমঞ্চে হেনরি কিসিঞ্জারের অহংকারী পররাষ্ট্রনীতির এক করুণ ও ঐতিহাসিক পরাজয়। এই পরাজয় কিসিঞ্জার কোনোদিন সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি।
‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা 'Bottomless Basket' কুৎসার নেপথ্য প্রতিশোধ
১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, কিসিঞ্জারের ভেতরের আক্রোশ ও প্রতিহিংসা প্রশমিত হয়নি। মার্কিন প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে কিসিঞ্জারের অবস্থান এই পরাজয়ের কারণে অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এর প্রতিশোধ হিসেবে তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে অপাংক্তেয় ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রচারে নেমে পড়েন।
১৯৭১ সালের শেষভাগে, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক কূটনৈতিক বৈঠকে কিসিঞ্জার ও তাঁর অনুসারী মার্কিন কর্মকর্তারা বাংলাদেশকে বিদ্রূপ করে ‘বাস্কেট কেস’ (Basket Case) বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (Bottomless Basket) বলে আখ্যায়িত করেন।
এই কুৎসিত তকমাটি কেবল একটি কথার কথা ছিল না; এটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। কিসিঞ্জার বোঝাতে চেয়েছিলেন, এই দেশকে যত সাহায্যই দেওয়া হোক না কেন, তা কোনো কাজে আসবে না এবং দেশটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে (Failed State) পরিণত হবে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে একা করে দেওয়াই ছিল কিসিঞ্জারের মূল এজেন্ডা।
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সাহায্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর কিসিঞ্জারীয় চক্রান্ত
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, খাদ্যঘাটতি এবং কোটি কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের মতো হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছিল, ঠিক তখনই ১৯৭৪ সালে দেশে এক ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এক নজিরবিহীন মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ে রূপান্তর করার পেছনে সবচেয়ে বড় খলনায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার।
১৯৭৪ সালে চরম খাদ্যসংকটের মুখে বাংলাদেশ সরকার মার্কিন সরকারের কাছে 'Public Law 480' (PL-480) চুক্তির আওতায় জরুরি খাদ্য সহায়তার (গম ও চাল) আবেদন জানায়। চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন খাদ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিক সেই চরম মুহূর্তে কিসিঞ্জারের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অত্যন্ত নৃশংসভাবে সেই খাদ্য সাহায্য আটকে দেয়।
কিউবা ইস্যুতে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ও মার্কিন ব্ল্যাকমেইল: খাদ্য সাহায্য আটকে দেওয়ার অজুহাত হিসেবে কিসিঞ্জারের দপ্তর মার্কিন আইনের একটি ধারার কথা উল্লেখ করে। তাদের দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈরিতা থাকা দেশ কিউবার সাথে বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করেছে (বাংলাদেশ কিউবার কাছে মাত্র ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পাটের চট বা জুট ব্যাগ রপ্তানি করেছিল)।
অথচ সত্য হলো, মিসরসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশ তৎকালীন সময়ে সরাসরি কিউবার সাথে বড় ধরনের বাণিজ্য অব্যাহত রাখা সত্ত্বেও মার্কিন সরকার তাদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করেনি বা ছাড় (Waiver) দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিসিঞ্জার কোনো ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বাংলাদেশকে যদি মার্কিন খাদ্য সাহায্য পেতে হয়, তবে কিউবার সাথে করা সমস্ত বাণিজ্যিক চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং ভবিষ্যতে কোনোদিন সমাজতান্ত্রিক দেশের সাথে বাণিজ্য করা যাবে না।
খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জনগণের অন্নসংস্থানের তাগিদে মার্কিন ব্ল্যাকমেইলের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং কিউবায় পাট রপ্তানি বাতিল করেন। কিন্তু ততক্ষণে কিসিঞ্জার তাঁর কৌশলগত চাল চেলে দিয়েছেন। চুক্তি বাতিলের পর মার্কিন খাদ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েক মাস বিলম্ব করা হয়।
১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাস ছিল বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংকটময় সময়। ঠিক এই দুই মাসে মার্কিন খাদ্যবাহী প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন চাল ও গমের জাহাজ আটকে রাখার ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মজুতদাররা খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং চালের দাম সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বহুদূর বাইরে চলে যায়। নগদ বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত বাজার থেকে তাৎক্ষণিক খাদ্য কেনাও সম্ভব হয়নি।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষটি স্রেফ খাদ্যের অভাবের কারণে হয়নি; এটি হয়েছিল খাদ্য পাওয়ার ক্ষমতার (Entitlement) বিপর্যয়ের কারণে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সাহায্য আটকে দেওয়ার খামখেয়ালী ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মহিউদ্দিন আলমগীরের গবেষণাতেও উঠে এসেছে কীভাবে কিসিঞ্জারের এই খাদ্য-কূটনীতি বাংলাদেশে ১.৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষের অনাহারজনিত করুণ মৃত্যুর পথ প্রস্তুত করেছিল।
এই খাদ্য সাহায্য আটকে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল:
চরম খাদ্য সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস ছিল দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। ঠিক এই সংকটলগ্নে খাদ্যবাহী জাহাজ আটকে দেওয়ায় বাজারে চালের তীব্র সংকট ও কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি হয়, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায়। বাংলাদেশ সে সময় নগদ বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তাৎক্ষণিক চাল আমদানি করতেও ব্যর্থ হয়।
ব্যাপক প্রাণহানি: খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবে প্রায় ছাব্বিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও মহিউদ্দিন আলমগীরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষকদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে সেই দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ১.৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
অবশ্য ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে শুধুমাত্র মার্কিন নীতিই একমাত্র কারণ ছিল না সে বছর বাংলাদেশে হওয়া প্রলয়ংকরী বন্যা, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সীমান্ত চোরাচালান, মজুতদারি এবং তৎকালীন অভ্যন্তরীণ খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থার দুর্বলতাও কিছুটা দায়ী ছিল। তবে যখন দেশের লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছিল, তখন নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য খাদ্য সাহায্য বন্ধ বা বিলম্বিত করার অমানবিক ও ঐতিহাসিক দায় সম্পূর্ণরূপে হেনরি কিসিঞ্জারের ওপরই বর্তায়।
পরাজিত পাকিস্তান পক্ষের সমর্থক কিসিঞ্জার খাদ্যকে স্রেফ একটি কৌশলগত রাজনৈতিক অস্ত্র (Food as a Political Weapon) হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকারের ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছিলেন এবং জনগণের মনে অসন্তোষের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তীব্র আক্রোশ ও কিসিঞ্জারের ‘হিট লিস্ট’
১৯৭৪ সালের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ দিয়ে যে ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়েছিল, তার চূড়ান্ত ও পৈশাচিক রূপায়ণ ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাতে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার নেপথ্যে যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত কাজ করেছিল, তার সুতাগুলো শক্ত হাতে বাঁধা ছিল হেনরি কিসিঞ্জারের দফতরে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে হত্যা করার ঘটনাটি যে কেবল খন্দকার মোশতাক, মেজর ফারুক, মেজর রশিদ বা ডালিমদের মতো গৃহপালিত কিছু দেশদ্রোহীর চক্রান্ত ছিল না, তা আজ ইতিহাসের দালিলিক প্রণেতাদেদের বিশ্লেষণে প্রমাণিত। এটি ছিল অত্যন্ত পাকা হাতের তৈরি একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, যার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন সিআইএ (CIA)।
সত্তরের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বাধা এবং কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত ‘শত্রু তালিকায়’ তিনটি প্রধান নাম শীর্ষে অবস্থান করছিল:
১. সালভাদর আলেন্দে (চিলির নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট)
২. আর্চবিশপ ম্যাকারিয়োস (সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট)
৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি)
(উল্লেখ্য, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট উয়েন ভান থিউ কিংবা কম্বোডিয়া-সাইপ্রাস সংকটের নেপথ্য নায়করাও কিসিঞ্জারের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন।)
এই তিনজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিসিঞ্জারের মার্কিন আধিপত্যবাদী নীতি ও গোপন পরিকল্পনার পথে বারবার বিশাল প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কিসিঞ্জারের দর্শন ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার: নিজের ভূ-রাজনৈতিক নকশা সফল করতে এই জাতীয়তাবাদী নেতাদের যেভাবেই হোক উৎখাত করতে হবে। ১৯৭৩ সালে চিলিতে প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র সহায়তায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হত্যা করে জেনারেল পিনোচেতের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। একই নীলনকশা প্রয়োগ করা হয়েছিল বাংলাদেশের মাটিতেও।
ক্রিস্টোফার হিচেন্সের উন্মোচন ও 'দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার'
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পর, ২০০১ সালে ব্রিটিশ-আমেরিকান অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক ক্রিস্টোফার এরিক হিচেন্স (Christopher Eric Hitchens) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই 'দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার' (The Trial of Henry Kissinger) প্রকাশ করেন। হিচেন্স এই বইয়ে নথিপত্র বিশ্লেষণ করে কিসিঞ্জারকে একজন "বংশগত মিথ্যাবাদী" (Pathological Liar) এবং আন্তর্জাতিক আইনের চোখে একজন অঘোষিত "যুদ্ধাপরাধী" হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন।
হিচেন্স লিখেছেন, কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে অত্যন্ত 'ব্যক্তিগত' আক্রোশ হিসেবে গ্রহণ করতেন। তাঁর কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। হিচেন্সের স্পষ্ট বক্তব্য:
"বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে অত্যন্ত 'ব্যক্তিগত' শত্রুতার পর্যায়ে গ্রহণ করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত ইগো এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার মাশুল দিতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে।"
"কিসিঞ্জারের পথচলায় যেসব ব্যক্তি অসুবিধা বা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের কিসিঞ্জার নির্দ্বিধায় পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন চিলির সালভাদর আলেন্দে এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান।"
লরেন্স লিফশুলজের গবেষণা ও সিআইএ সংযোগ
মার্কিন প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ (Lawrence Lifschultz) তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানী গ্রন্থ 'বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভোলিউশন' (Bangladesh: The Unfinished Revolution)-এ দেখিয়েছেন কিভাবে ১৯৭৪ সালের শেষদিক থেকেই ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার (Eugene Boster) এবং সিআইএ স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি (Philip Cherry)-র সাথে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও বিদ্রোহী মেজরদের নিয়মিত গোপন যোগাযোগ চলছিল।
কিসিঞ্জারের গ্রীন সিগন্যাল ছাড়া ঢাকায় সিআইএ স্টেশন এতটা দুঃসাহসিক চক্রান্ত বাস্তবায়ন করতে পারত না। কিসিঞ্জার চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে এমন একটি সরকার বসাতে, যা হবে চরম দক্ষিণপন্থী, পাকিস্তানঘেঁষা এবং ওয়াশিংটনের অনুগত। ১৫ই আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডি ছিল কিসিঞ্জারের সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন।
পেশাদার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত বনাম স্থানীয় দাবার ঘুটি
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে যদি কেবল খন্দকার মোশতাক আহমেদ, জেনারেল জিয়াউর রহমান, মেজর ফারুক, মেজর রশিদ কিংবা মেজর ডালিমদের মতো কতিপয় উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সামরিক পথভ্রষ্ট কর্মকর্তার মস্তিষ্কপ্রসূত বলে মনে করা হয়, তবে ইতিহাসের ভয়াবহ ভুল ব্যাখ্যা করা হবে।
১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, পেশাদার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশিক্ষিত নেটওয়ার্কের তৈরি। একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়:
স্থানীয় দাবার ঘুটি: মোশতাক, ফারুক, রশিদ বা ডালিমরা ছিলেন এই মহাসমারোহে সাজানো দাবা খেলার স্রেফ স্থানীয় চাল বাস্তবায়নকারী বা 'পন' (Pawn)।
আন্তর্জাতিক মাস্টারমাইন্ড: সিআইএ এবং কিসিঞ্জারের নেটওয়ার্ক, যারা লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বহু নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত ও হত্যা করে হাত পাকিয়েছিল, তারাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের নিখুঁত চক তৈরি করেছিল।
১৯৭৪ সালের নভেম্বরে কিসিঞ্জারের ঢাকা সফর
১৯৭৪ সালের নভেম্বরের শেষভাগে হেনরি কিসিঞ্জার স্বল্প সময়ের জন্য ঢাকা সফরে আসেন এবং গণভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। মুখে হাসিমুখ ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার প্রদর্শন করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিসিঞ্জারের এই সফরটি ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি ‘রেকি’ বা ক্ষেত্র পরিদর্শনের অংশ।
তিনি স্বচক্ষে দেখে গিয়েছিলেন ১৯৭৪-এর কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক স্থায়িত্ব কতটা নড়বড়ে হয়েছে এবং কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী (যেমন মোশতাক চক্র) কতদূর অগ্রসর হয়েছে। এই সফরের ঠিক ৯ মাসের মাথায় সংঘটিত হয় ১৫ই আগস্টের ট্র্যাজেডি।
এক নজরে বাংলাদেশে কিসিঞ্জারের কালো অধ্যায়
নিচে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে হেনরি কিসিঞ্জারের নেপথ্য ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রভাবের একটি পূর্ণাঙ্গ সময়ক্রমিক সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
সময়কাল / ঘটনা | কিসিঞ্জারের ভূমিকা ও গোপন পদক্ষেপ | ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য | বাংলাদেশের ওপর ঐতিহাসিক প্রভাব ও পরিণতি |
৬ই মার্চ ১৯৭১ (সিনিয়র রিভিউ গ্রুপ) | গণহত্যা নিরুৎসাহিত করার প্রস্তাবের জবাবে “শয়তানের পক্ষে ওকালতি” করে নীরব সায় প্রদান। | পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে অক্ষত রাখা ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। | ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ও ৩০ লাখ বাঙালি নিধনের সবুজ সংকেত। |
এপ্রিল ১৯৭১ (ব্লাড টেলিগ্রাম বাতিল) | কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডকে প্রত্যাহার ও ঢাকা কূটনীতিকদের “Bastards” বলে গালি দেওয়া। | ওয়াশিংটন-বেইজিং গোপন যোগাযোগ রক্ষা করতে গণহত্যার তথ্য চেপে রাখা। | মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ এবং পাকিস্তানি গণহত্যা অব্যাপ্তি। |
জুলাই ১৯৭১ (গোপন বেইজিং সফর) | পাকিস্তান জান্তার সহায়তায় গোপনে চীন সফর ও মার্কিন-চীন অক্ষ গঠন। | সোভিয়েত ইউনিয়নকে একঘরে করা ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আনা। | বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে বলির পাঁঠা বানানো। |
ডিসেম্বর ১৯৭১ (সপ্তম নৌবহর প্রেরণ) | বঙ্গোপসাগরে ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’ প্রেরণ করে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বাঁধানোর হুমকি। | যৌথ বাহিনীর অগ্রগতি থামানো ও পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ থেকে রক্ষা। | সোভিয়েত সাবমেরিনের জবাবে মার্কিন চেষ্টা ব্যর্থ; ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়। |
১৯৭১-১৯৭২ (তলাবিহীন ঝুড়ি স্টেনসিল) | বাংলাদেশকে "Basket Case" বা "Bottomless Basket" বলে আন্তর্জাতিক কুৎসা রটনা। | নিজস্ব কূটনৈতিক পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং নতুন দেশের প্রতি বৈশ্বিক সাহায্য বন্ধ করা। | বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। |
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭৪ (কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি) | PL-480-র আওতায় ২২০,০০০ টন খাদ্যবাহী জাহাজ আটকে দেওয়া (কিউবা বাহানায়)। | খাদ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শেখ মুজিব সরকারকে দুর্বল করা। | অনাহারে ১.৫ থেকে ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু; দেশে চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। |
নভেম্বর ১৯৭৪ (ঢাকা সফর) | ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে কূটনৈতিক বৈঠক ও হাসিমুখে ছবি তোলা। | অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ভঙ্গুরতা পর্যবেক্ষণ ও কায়েমি চক্রের প্রস্তুতি মূল্যায়ন। | অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত অনুঘটক তৈরি ও ষড়যন্ত্রকারীদের সবুজ সংকেত প্রদান। |
১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ (বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড) | সিআইএ ও স্থানীয় মোশতাক-ফারুক-রশিদ চক্রের মাধ্যমে পৈশাচিক অভ্যুত্থানের নেপথ্য সায়। | মার্কিন বিরোধী ও জোটনিরপেক্ষ নীতির কট্টর সমর্থক শেখ মুজিবকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। | সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা; ২১ বছরের জন্য বিচারহীনতা ও সেনাশাসনের অন্ধকার যুগে প্রবেশ। |
কিসিঞ্জারের পরিচিতি ও নীতিহীন 'রিয়েলপলিটিক'
১৯২৩ সালে জার্মানিতে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করা হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৩৮ সালে নাৎসি বাহিনীর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ১৯৪৩ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভের পর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং দ্রুতই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নীতি নির্ধারণী মহলে মনোযোগ আকর্ষণ করেন। ১৯৬৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ক্ষমতায় এসে কিসিঞ্জারকে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে তিনি একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (Secretary of State) দায়িত্বও পালন করেন।
মার্কিন রাজনীতিতে কিসিঞ্জার এমন এক একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবাধিকার কিংবা সার্বজনীন মূল্যবোধের কোনো স্থান ছিল না। তাঁর উদ্ভাবিত ও প্রয়োগ করা 'রিয়েলপলিটিক'-এর সারকথা ছিল:
“জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন বা মানবতা রক্ষা করার কোনো বাধ্যবাধকতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই।”
এই নির্দয় দর্শনের ওপর ভর করেই কিসিঞ্জার আট বছর ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন। এই আট বছরে তিনি যেসব চরমপন্থী শাসকরূপী হন্তারকদের সমর্থন জুগিয়েছিলেন এবং যেসব সামরিক সংঘাত উসকে দিয়েছিলেন, তাতে বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের কান্না ও লাশের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ওয়াশিংটনের কূটনীতি পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, নিজের এই মানবতাবিরোধী অপকর্মের জন্য তিনি জীবনদ্দশায় কখনো সামান্য অনুশোচনা বা অপরাধবোধ প্রকাশ করেননি; বরং ক্ষমতার দম্ভে ইতিহাসকে নিজের মতো করে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছেন।
কিসিঞ্জারের অনুশোচনাহীন জীবন, ইতিহাস বিকৃতি এবং মহাকালের বিচার
১৯৭৭ সালে সরকারি পদ ছাড়ার পরও কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছিলেন। বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও বিশ্বনেতারা আন্তর্জাতিক সংকটে তাঁর পরামর্শ নিতেন। তবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের অপরাধ আড়াল করতে মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতির আশ্রয় নিয়ে গেছেন।
২০০৭ সালের ১ই এপ্রিল এক সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি নির্লজ্জের মতো মিথ্যাচার করে বলেছিলেন:
"১৯৭১ সালে আমাদের নীতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল না; এটি ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, যাতে ভারতীয় সেনারা পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণ করে তা ভেঙে না ফেলে। যাতে চীনারা বা ভারতীয়রা যুদ্ধ বাড়াতে না পারে।"
কিসিঞ্জারের এই বক্তব্য ছিল ইতিহাসের এক চরম ও নির্লজ্জ বিকৃতি। ১৯৭১ সালের মার্কিন নথিপত্র এবং ওভাল অফিসের ডিক্লাসিফাইড অডিও টেপ প্রমাণ করে যে, তিনি শুরু থেকেই বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং ভারতের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে চেয়েছিলেন।
২০২৩ সালের ২৯শে নভেম্বর ১০০ বছর বয়সে কিসিঞ্জার মৃত্যুবরণ করেন। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এবং মার্কিন একক আধিপত্যের কারণে জীবনদ্দশায় তাঁকে হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি কিংবা কাঠগড়ার আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শাস্তি পেতে হয়নি। কিন্তু মহাকালের বিচার এড়ানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার (১৯৭৩ সালের ভিয়েতনামের যুদ্ধবিরতির জন্য) কিসিঞ্জারকে দেওয়া হয়েছিল, তা নোবেল কমিটির ইতিহাসেও এক চরম কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। নোবেল কমিটির দুজন সদস্য কিসিঞ্জারকে এই পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন। আজ বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকর্মী, ইতিহাসবিদ ও নতুন প্রজন্মের কাছে কিসিঞ্জারের নাম কোনো সফল কূটনীতিকের নাম নয়; বরং তিনি কোটি কোটি মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে প্রাসাদ গড়া এক নিষ্ঠুর ‘যুদ্ধাপরাধী’ (War Criminal)।
‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নজিরবিহীন অসন্তোষ
১৯৭১ সালের এপ্রিলে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড যখন তৎকালীন হোয়াইট হাউসের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বিখ্যাত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ (Blood Telegram) পাঠান, তা ছিল মার্কিন কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
টেলিগ্রামের মূল বার্তা: ৬ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রেরিত 'Dissent Channel Message' বা ভিন্নমত জ্ঞাপনকারী এই বার্তাটিতে আর্চার ব্লাড এবং ২০ জন মার্কিন কূটনীতিক লিখেছিলেন:
"আমাদের সরকার গণতন্ত্রের বিনাশ প্রত্যক্ষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা চরমতম নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি, অথচ পশ্চিম পাকিস্তানি অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে বাঙালি নিধন চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।"
কিসিঞ্জারের চরম প্রতিশোধ: এই বার্তার জবাবে কিসিঞ্জার ও রিচার্ড নিক্সন চরম ক্ষুব্ধ হন। কিসিঞ্জার কনসুলেটের এই নিরপেক্ষ প্রতিবেদনকে “আমলাতান্ত্রিক বিদ্রোহ” (Bureaucratic Rebellion) বলে আখ্যা দেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আর্চার ব্লাডকে ঢাকা থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং তাঁর ভবিষ্যৎ ডিপ্লোম্যাটিক ক্যারিয়ার চিরতরে ধ্বংস করে দেন। ব্লাডের স্থানে হেনরি কিসিঞ্জার নিয়োগ দেন হার্বার্ট স্পিভাক (Herbert Spivack)-কে, যিনি ওয়াশিংটনের নির্দেশ অনুযায়ী ঢাকায় বসে পাকি বাহিনীর গণহত্যার তথ্য চেপে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেন।
‘অপারেশন মারকো পোলো’ ও গোপন বেইজিং সফর
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে বিশ্ব রাজনীতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া কিসিঞ্জারের গোপন বেইজিং সফরের ছকটি তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বসেই। এই গোপন মিশনের সাংকেতিক নাম ছিল 'অপারেশন মারকো পোলো'।
নাটকীয় ছদ্মবেশ ও পাকিস্তান তোষণ: ১৯৭১ সালের ৮ই জুলাই কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে গিয়ে হঠাৎ ঘোষণা দেন যে তিনি পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাঁকে সুস্থতার জন্য নাতানিয়া গালির (Nathia Gali) পাহাড়ি রিসোর্টে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। অথচ পুরো বিষয়টি ছিল কিসিঞ্জারের সাজানো নাটক।
৯ই জুলাই ভোররাতে কিসিঞ্জার টুপি ও কালো চশমা দিয়ে মুখ ঢেকে রাওয়ালপিন্ডির চকলোগা বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (PIA) একটি বিশেষ বোয়িং ৭০৭ বিমানে চেপে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বেইজিংয়ে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সাথে বৈঠকে কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে একটি "বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সোভিয়েত ঘেঁষা ঝামেলা" হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি চৌ এন লাইকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব করবে এবং চীন যেন ভারতের সীমান্তে সেনা সমাবেশ করে বাংলাদেশকে চাপ সৃষ্টি করে। এই সফরের একমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়া খান কিসিঞ্জারের চোখে অতিমানবে পরিণত হন, যার বিনিময়ে বাংলাদেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়াকেও কিসিঞ্জার বৈধ মনে করেছিলেন।
মার্কিন আইন লঙ্ঘন করে জর্ডান ও ইরান থেকে অস্ত্র পাচার
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ওপর গণহত্যা শুরু হলে মার্কিন কংগ্রেস (US Congress) পাকিস্তানের ওপর সব ধরনের সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহে আইনি নিষেধাজ্ঞা (Arms Embargo) জারি করে। কিন্তু কিসিঞ্জার এই আইনকে তোয়াক্কা না করে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে অবৈধভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে অস্ত্র পাঠাতে থাকেন।
গোপন নথি থেকে জানা যায়, কিসিঞ্জার ব্যক্তিগতভাবে জর্ডানের বাদশাহ হুসেন এবং ইরানের শাহ-কে অনুরোধ করেছিলেন তারা যেন তাদের মার্কিন নির্মিত F-104 Starfighter যুদ্ধবিমান ও গোলাবারুদ পাকিস্তান বিমান বাহিনীকে সরবরাহ করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আইনজীবীরা যখন কিসিঞ্জারকে সতর্ক করে বলেন যে এটি মার্কিন আইনের চরম লঙ্ঘন (Illegal Third-Party Transfer), তখন কিসিঞ্জার তোয়াক্কা না করে ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিলেন:
"আইন কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না, পাকিস্তানকে এই মুহূর্তে অস্ত্র পেতেই হবে।"
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট: সিআইএ ও ঢাকা স্টেশনের গোপন ট্রায়াঙ্গেল
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পেছনে কিসিঞ্জারের পররাষ্ট্র দফতর এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র ঢাকা স্টেশনের প্রত্যক্ষ সংযোগের যে তথ্য সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তুলে ধরেছিলেন, পরবর্তীতে তা আরও বিভিন্ন মার্কিন নথিতে সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
ফিলিপ চেরি ও রোম সেশন: ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে রোমে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ও কিসিঞ্জার উভয়েই উপস্থিত ছিলেন। ঠিক একই সময়ে রোমে ও ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফিলিপ চেরি মোশতাক চক্রের প্রতিনিধি (বিশেষ করে জহুরুল হাসান ভূঁইয়া) সাথে গোপন বৈঠক করেন।
কিসিঞ্জারের নীতি ছিল "আমেরিকার বন্ধুভাবাপন্ন নয় এমন কোনো জাতীয়তাবাদী নেতাকে দক্ষিণ এশিয়ায় টিকতে না দেওয়া।" কিসিঞ্জার ও সিআইএ জানত যে বাংলাদেশ যদি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জোটনিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব খর্ব হবে। সেই সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক হিসাব থেকেই ১৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস পরোক্ষ ইন্ধন ও নিশ্চয়তা প্রদান করেছিল।
কিসিঞ্জারের বিশ্বব্যাপী রক্তের দাগ: একই প্যাটার্নের নির্মম পুনরাবৃত্তি
বাংলাদেশের অভ্যুদয় রোধ এবং বঙ্গবন্ধুকে উৎখাত করার যে ছক কিসিঞ্জার এঁকেছিলেন, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল সারা বিশ্বজুড়ে কিসিঞ্জারের প্রয়োগ করা "কিসিঞ্জার ডকট্রিন" (Kissinger Doctrine)-এরই অংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিনি ঠিক একইভাবে নির্বাচিত সরকার ফেলে দিয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছেন:
১. কম্বোডিয়া (Operation Menu): ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কিসিঞ্জার কম্বোডিয়ার নিরপেক্ষ ভূখণ্ডে ৫ লাখ ৪০ হাজার টন বোমা ফেলেছিলেন। এতে আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ সাধারণ কৃষক ও নাগরিক নিহত হয়।
২. চিলি (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর কিসিঞ্জারের সরাসরি পরিকল্পনায় সিআইএ চিলির নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করে এবং কুখ্যাত স্বৈরাচারী জেনারেল অগাস্টো পিনোচেতকে ক্ষমতায় বসায়।
৩. পূর্ব তিমুর (১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে কিসিঞ্জার ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় গিয়ে প্রেসিডেন্ট সুহার্তোকে পূর্ব তিমুর দখলের নির্দেশ দেন। কিসিঞ্জারের সম্মতিতে ইন্দোনেশীয় সামরিক বাহিনী সেখানে প্রবেশ করে পূর্ব তিমুরের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ২ লাখ মানুষ) হত্যা করে।
২০২৩ সালে কিসিঞ্জারের মৃত্যু ও বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া
২০২৩ সালের ২৯শে নভেম্বর ১০০ বছর বয়সে হেনরি কিসিঞ্জার মৃত্যুবরণ করেন। আন্তর্জাতিক আইনি ও বিচার ব্যবস্থা তাঁকে জীবদ্দশায় কোনো সাজা দিতে না পারলেও, তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্ব গণমাধ্যম তাঁকে যেভাবে চিত্রায়িত করেছে, তা কোনো সম্মানজনক বিদায় ছিল না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী Rolling Stone কিসিঞ্জারের মৃত্যুর পর প্রধান শিরোনাম করে: "Henry Kissinger, War Criminal Beloved by America's Ruling Class, Finally Dies" (অবশেষে মারা গেলেন মার্কিন শাসকগোষ্ঠীর প্রিয় যুদ্ধাপরাধী হেনরি কিসিঞ্জার)।
বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিকেরা একযোগে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে কিসিঞ্জার শত বছর বাঁচলেও ইতিহাসের আদালতে তিনি ৩০ লাখ বাঙালির রক্তে হাত রাঙানো এক অঘোষিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।
ইতিহাস থেকে মোছা যায় না রক্তের দাগ
হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার কেবল একটি নাম নন; তিনি ছিলেন ক্ষমতার অন্ধ মোহ, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং নীতিহীন ভূ-রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতীক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধ্বংস করতে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে অস্ত্র ও নৈতিক সাহস যুগিয়েছিলেন; স্বাধীনতার পর এদেশের খেটে খাওয়া মানুষকে অনাহারে মারতে খাদ্য সাহায্য আটকে দিয়ে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছিলেন; এবং পরিশেষে এই দেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার আন্তর্জাতিক চক্রান্তের নীলনকশা তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের পরম সত্য হলো, প্রতিক্রিয়াশীল ও গণবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্রই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিসিঞ্জারের সমস্ত কুটিল চাল, সপ্তম নৌবহরের হুমকি এবং কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের ষড়যন্ত্রকে তুচ্ছ প্রমাণ করে রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ আজ বিশ্ব মানচিত্রে নিজস্ব মর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। যে বাংলাদেশকে কিসিঞ্জার বিদ্রূপ করে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন, সেই বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের অনন্য এক দৃষ্টান্ত।
কিসিঞ্জার ইতিহাসে থাকবেন একজন পরাজিত কূটনীতিবিদ ও কোটি মানুষের রক্তে হাত রাঙানো এক অভিশপ্ত চরিত্র হিসেবে। আর স্বাধীন বাংলাদেশ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মহাকালের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবে বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও জয়ের প্রতীক হিসেবে। কিসিঞ্জারের অপরাধের খতিয়ান ইতিহাস কোনোদিন মুছে ফেলবে না; যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে মুক্তিকামী মানুষ এই কুখ্যাত কূটনীতিককে ধিক্কার জানিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ ইন ব্লাড অ্যান্ড টিয়ারস: জ্যোতি সেনগুপ্ত
বাংলাদেশ: ষড়যন্ত্রের রাজনীতি - পরেশ সাহা
বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন - লরেন্স লিফশুলজ, দ্য লিগ্যাসি অব ব্লাড - অ্যান্টনি ম্যাসকারেনহাস















