পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘দেশপ্রেম’ বনাম ‘ভূমিলিপ্সা’ - বুটের নিচে গণতন্ত্র
১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।

TruthBangla
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং বহিরাগত শত্রু থেকে সীমান্ত রক্ষা করা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এমন একটি রাষ্ট্র রয়েছে, যেখানে সেনাবাহিনী কেবল রাষ্ট্র রক্ষা করে না বরং রাষ্ট্রকেই পরিচালনা ও ভোগ করে। সেই দেশটি হলো পাকিস্তান।
১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর দৌরাত্ম্যের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নির্ধারিত ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। বেসামরিক সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে এবং বিচার বিভাগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আজ এক অনন্য "এক্স-ফ্যাক্টর" বা "গভীর রাষ্ট্রে" (Deep State) পরিণত হয়েছে।
তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতাই আঁকড়ে ধরেনি; সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের পরিণত করেছে এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সাম্রাজ্যে এবং দেশের সবচেয়ে বড় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানে। এই বৈপরীত্যই আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে: পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি আসলে কোনটি দেশপ্রেম, নাকি সীমাহীন 'ভূমিপ্রেম' ও বাণিজ্যপ্রীতি?
রাজনীতির মাস্টারমাইন্ড: পাঁচ দশকের প্রত্যক্ষ শাসন ও ছায়া-সরকার
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে রাজনীতি কীভাবে একটি স্থায়ী রূপ লাভ করেছে, তা বুঝতে হলে দেশটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার স্বৈরাচার (১৯৫৮-১৯৭১)
১৯৫৮ সালে মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ও জেনারেল আইয়ুব খান যৌথভাবে সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠোকেন। আইয়ুব খানের ১১ বছরের শাসনকালে সেন অফিসারদের আমলাতন্ত্র ও অর্থনীতিতে অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে সামরিক জান্তা বাঙালি জাতির ওপর বর্বর গণহত্যা চালায় এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানের এক লজ্জাজনক পরাজয় ডেকে আনে।
জিয়া-উল-হকের ধর্মীয় রাজনীতিকরণ (১৯৭৭-১৯৮৮)
প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন জেনারেল জিয়া-উল-হক। তিনি সেনাবাহিনীকে কেবল একটি রক্ষক শক্তি হিসেবেই দেখেননি, বরং রাষ্ট্রকে চরমপন্থী আদর্শের দিকে ঠেলে দিয়ে এবং বিচার বিভাগ ও রাজনীতিতে সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী করে দিয়ে যান।
পারভেজ মোশাররফের 'হাইব্রিড' মডেল (১৯৯৯-২০০৮)
নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ আবারও সামরিক শাসন জারি করেন। তিনি "Controlled Democracy" বা হাইব্রিড মডেল চালু করেন, যার মূল নির্যাস ছিল বেসামরিক মুখ থাকবে সামনে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে সামরিক জান্তা।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সেনাবাহিনী কখনোই ক্ষমতা বেসামরিক শক্তির হাতে তুলে দিতে চায়নি। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এড়াতে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে।
কেস স্টাডি: জেনারেল বাজওয়ার ৫৬ মিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অলিখিত 'ইমিউনিটি'
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে শীর্ষ জেনারেলদের দায়িত্ব পালন এবং অবসরে যাওয়ার পেছনে যে সুবিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক কাজ করে, তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও সুস্পষ্ট উদাহরণ হলেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া।
২০১৬ সালে জেনারেল রাহিল শরীফের অবসরের পর সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন জেনারেল বাজওয়া। তিনি দুই মেয়াদে মোট ৬ বছর (২০১৬-২০২২) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। এই ছয় বছরে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে যে বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছিল। কিন্তু দায়িত্ব থেকে অবসরে যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এক আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে তাঁর পরিবারের রূপকথার মতো সম্পত্তি বৃদ্ধির চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জবাবদিহিতাহীন অলিখিত 'ইমিউনিটি'
বিশ্বের অন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক বা সভ্য দেশে সেনাপ্রধান পদে থাকাকালীন পরিবারের সম্পদ কয়েকশো কোটি টাকা বা ৫৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেলে সেটি একটি ঐতিহাসিক স্ক্যান্ডাল হিসেবে গণ্য হতো। এর জন্য সেনাপ্রধানকে আদালতের মুখোমুখি হতে হতো, বসতে হতো কঠোর জবাবদিহিতার আওতায়।
কিন্তু পাকিস্তানে ঘটেছিল ঠিক তার উল্টোটা। এই বিশাল আর্থিক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও জেনারেল বাজওয়ার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনো তদন্ত কমিশন গঠিত হয়নি, কোনো আদালত তাঁকে তলব করেনি। বরং তিনি মেয়াদ শেষে পূর্ণ সামরিক সম্মান ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার সাথে অবসরে যান।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের শীর্ষ জেনারেলরা আইনের ঊর্ধ্বে। তাঁরা রাষ্ট্রের ভেতরে এমন এক ইমিউনিটি বা অলিখিত ছাতা ভোগ করেন, যা তাঁদের যেকোনো অপরাধ বা দুর্নীতি থেকে রক্ষা করে।
'মিলবাস' (Milbus) বা সামরিক অর্থসাম্রাজ্য: ২৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক রাক্ষস
জেনারেল বাজওয়ার এই বিপুল সম্পদ অর্জনের প্রেক্ষাপট হঠাৎ করে একদিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত গত সাত দশক ধরে গড়ে তোলা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুসংগঠিত 'সামরিক কর্পোরেট সাম্রাজ্যের' ফল। পাকিস্তান বিষয়ক গবেষক আয়েশা সিদ্দিকা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Military Inc.: Inside Pakistan's Military Economy'-তে এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যকে অভিহিত করেছেন ‘মিলবাস’ (Milbus) নামে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই বাণিজ্য সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৪ সালে জেনারেল আইয়ুব খান ও মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার হাতে ‘ফৌজি ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
সশস্ত্র বাহিনীর ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশনের নেটওয়ার্ক
বর্তমানে পাকিস্তানের প্রতিটি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ট্রাস্ট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে:
ফৌজি ফাউন্ডেশন (Fauji Foundation): সেনাবাহিনীর প্রধান অর্থনৈতিক উইং।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট (Army Welfare Trust - AWT): স্থলবাহিনীর কল্যাণ ও বাণিজ্যের তত্ত্বাবধানকারী।
শাহিন ফাউন্ডেশন (Shaheen Foundation): পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বাণিজ্যিক ট্রাস্ট।
বাহরিয়া ফাউন্ডেশন (Bahria Foundation): পাকিস্তান নৌবাহিনীর পরিচালিত কর্পোরেট গ্রুপ।
ডিফেন্স হাউজিং অথরিটি (Defence Housing Authority - DHA): রিয়েল এস্টেট খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
অর্থনৈতিক ব্যাপ্তি ও জিডিপিতে অবদান
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেসব খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে, তার তালিকা দীর্ঘ। সার, সিমেন্ট, স্টিল মিলস, কসমেটিকস, পেট্রোল পাম্প, ফার্নিচার, ওষুধ কারখানা, রুটি-দুধ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে বড় বড় হাসপাতাল ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে।
বার্ষিক ব্যবসা: সামরিক ট্রাস্ট ও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা পরিচালিত হয়।
জিডিপির অনুপাত: এটি পাকিস্তানের মোট জাতীয় উৎপাদনের (GDP) প্রায় ১০ শতাংশ।
বৈশ্বিক রেকর্ড: জাতীয় জিডিপির সাথে শতকরা হিসেবে তুলনা করলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও কর্পোরেট সত্তা।
ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় সেবার বাণিজ্যিকীকরণ
কর্পোরেট ব্যবসায়ের বাইরেও সরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বা কর্মরত অফিসারদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যেমন ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (WAPDA), ন্যাশনাল লজিস্টিকস সেল (NLC), এবং স্পেশাল কমিউনিকেশনস অর্গানাইজেশন (SCO)।
ব্যাংকিং খাতে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত মজবুত। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর অধীনে অন্তত ৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে প্রখ্যাত হলো আসকারি ব্যাংক (Askari Bank)। কেবল আসকারি ব্যাংক এবং ফৌজি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই সেনাবাহিনী প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উপার্জন ও লেনদেন করে।
নৈতিক অধঃপতন, হামিদুর রহমান কমিশন ও 'অবসরকালীন সুবিধার' সাম্রাজ্য
সামরিক বাহিনীর বিপুল ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা কীভাবে সেনাকর্তাদের নৈতিকতাকে ধ্বংস করে এবং পেশাদারিত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে, তা বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের ইতিহাসে উঠে এসেছে।
১৯৭১ সালের পরাজয় ও হামিদুর রহমান কমিশন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয় ও ৯৩ হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণের কারণ অনুসন্ধান করতে গঠিত হয়েছিল 'হামিদুর রহমান কমিশন'।
কমিশনের গোপন রিপোর্টে উঠে এসেছিল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। যুদ্ধ পরিচালনার বদলে পাকিস্তানি জেনারেলরা কীভাবে মদ, নারী এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতির আখড়ায় মজেছিলেন, তা সেখানে বিস্তারিতভাবে লেখা হয়। এই তদন্তে বেরিয়ে আসে 'জেনারেল রানি' (আকলিম আক্তার) ছদ্মনামের এক প্রভাবশালী নারীর নাম, যিনি অর্থ ও দেহতস্করির বিনিময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সিনিয়র অফিসারদের বদলি, প্রমোশন এবং পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করতেন।
কমিশন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে, বাণিজ্যপ্রীতি এবং নীতিহীন সুযোগ-সুবিধা অর্জনের দৌড়ই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।
হামুদুর রহমান কমিশনের পর্যবেক্ষণ:
"সামরিক কর্তাদের অতিরিক্ত ব্যবসায়িক আগ্রহ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন তাদের পেশাগত দক্ষতা ও যুদ্ধক্ষেত্রের মনোযোগ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল।"
অবসরকালীন সুবিধার নীলকশা
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে কর্মরত সিনিয়র অফিসারদের জন্য সার্ভিস শেষ হওয়া মানে অবসর নয়, বরং আরও বড় আর্থিক সুযোগের দুয়ার উন্মোচিত হওয়া।
কর্পোরেট হাউজে নিয়োগ: অবসরে যাওয়া কোর কমান্ডারদের প্রায় ৫০ শতাংশ সরাসরি যুক্ত হন সেনাবাহিনী পরিচালিত বিশাল বিশাল কর্পোরেট হাউজ বা ফৌজি ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে।
কূটনৈতিক পোস্টিং: অবসরে যাওয়া একটি বড় অংশের স্থান হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানের 'রাষ্ট্রদূত' বা হাই কমিশনার পদে।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান: সিভিল সার্ভিস, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, কিংবা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনের প্রধান হিসেবে নিয়মিত বসানো হয় অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের।
সার্ভিসে থাকা অবস্থায় অর্থনৈতিক সুযোগ এবং অবসরের পর নিশ্চিত কর্পোরেট চাকরি ও জমির মালিকানা এসব মিলেই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও সম্পদ অর্জনকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে এক স্বাভাবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রূপ দিয়েছে।
'মার্শাল রেস' থেকে আইয়ুব খানের জমি বন্টন প্রথা
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই ভূ-সম্পত্তি ও জমি অর্জনের মানসিকতা কেবল স্বাধীন পাকিস্তানের আবিষ্কার নয়; এর মূল প্রোথিত রয়েছে ১৯ শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতরে।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও ব্রিটিশ নীতি
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকরা তাদের অনুগত একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। তারা তথাকথিত 'মার্শাল রেস' (Martial Races) বা 'যোদ্ধা জাতি' তত্ত্ব উদ্ভাবন করে এবং পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখোয়ার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে সৈন্য সংগ্রহ শুরু করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন বিপুল সংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন ব্রিটিশ সরকার জমিকে একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে:
জোরজুলুম ও জমি বাজেয়াপ্তকরণ: যে গ্রামগুলো থেকে ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দিতে পুরুষ পাঠানো হতো না, সেই গ্রামের অধিবাসীদের জমি বাজেয়াপ্ত করা হতো এবং নারীদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতো।
পুরস্কার হিসেবে জমি: আবার যেসব পুরুষ সেনাবাহিনীতে যোগ দিত, তাদের প্রদান করা হতো বেতন, সরকারি পেনশন এবং স্থায়ী আবাদযোগ্য জমির মালিকানা।
১০ শতাংশ সংরক্ষিত জমি: ঔপনিবেশিক আমলে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের মোট কৃষি ও আবাদযোগ্য জমির প্রায় ১০ শতাংশ কেবল সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
আইয়ুব খানের আমলে জমি বন্টনের সরকারি ক্যাটাগরি
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান এই ঔপনিবেশিক প্রথাকে বাতিল তো করেইনি, বরং সেনাসর্বাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব খান তাঁর সামরিক শাসনকে টিকিয়ে রাখতে ও অফিসারদের আনুগত্য কিনতে জমি বন্টন ব্যবস্থাকে একটি স্থায়ী সরকারি নীতিতে রূপ দেন।
আইয়ুব খানের আমলে সামরিক অফিসারদের পদমর্যাদা (Rank) অনুযায়ী আবাদযোগ্য কৃষি জমি বরাদ্দ দেওয়ার যে তালিকা তৈরি করা হয়, তা ছিল নিম্নরূপ:
মেজর জেনারেল: ২৪০ একর আবাদযোগ্য জমি।
ব্রিগেডিয়ার ও কর্নেল: ১৫০ একর জমি।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল: ১২৪ একর জমি।
মেজর থেকে নিচে (লেফটেন্যান্ট পর্যন্ত): ১০০ একর জমি।
জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (JCO): ৬৪ একর জমি।
নন-কমিশন্ড অফিসার (NCO): সাধারণ পদাতিক সদস্যদের জন্যও নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষি জমি বরাদ্দ ছিল।
উল্লেখ্য, এই জমি বন্টন ব্যবস্থা কেবল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসারদের নামে বিপুল জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
ডিফেন্স হাউজিং অথরিটি (DHA): সাধারণ ভূমি থেকে সাম্রাজ্য বিস্তার
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের কৌশল পরিবর্তন করলেও, তাদের ভূ-সম্পত্তির ক্ষুধা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং আশির দশক থেকে কৃষি জমির জায়গা দখল করে নেয় শহুরে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা। আর এই ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ডিফেন্স হাউজিং অথরিটি (DHA)।
শুরুতে ডিএইচএ (DHA) গঠিত হয়েছিল কেবল সামরিক বাহিনীর সদস্যদের আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু খুব দ্রুত এটি বেসামরিক নাগরিকদের কাছেও প্লট বিক্রির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বর্তমানে পাকিস্তানের রিয়েল এস্টেট খাতের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী Monopoly হলো এই ডিএইচএ।
কম দামে কেনা, আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি
ডিএইচএ-র ব্যবসার কৌশল অত্যন্ত সহজ অথচ ভয়াবহ। তারা সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রাদেশিক সরকারগুলোর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে শত শত একর খাস জমি বা কৃষি জমি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে সেই জমিতে বিলাসবহুল রাস্তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও আধুনিক নাগরিক সুবিধা যুক্ত করে উচ্চমূল্যে বেসামরিক নাগরিক, ব্যবসায়ী ও অনাবাসী পাকিস্তানিদের কাছে বিক্রি করে।
১৯৬৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার নিজস্ব সদস্যদের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ একর জমি বন্টন করেছে। শহর কেন্দ্রিক এই রিয়েল এস্টেটের বাণিজ্যিক প্লটগুলো মূলত জেনারেল ও সিনিয়র অফিসারদের নাগালের মধ্যে থাকে।
র্যাংকভিত্তিক হাউজিং প্লট ও একনজরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক চিত্র
বর্তমান আধুনিক যুগে একজন সেনাকর্তা কীভাবে পদোন্নতির সাথে সাথে মিলিয়ন মিলিয়নেয়ার বনে যান, তার একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ রয়েছে।
মেজর পদমর্যাদা: চাকরি জীবনে প্রথম মেজর পদে পদোন্নতি পেলে তিনি শহরের প্রাইম লোকেশনে একটি আবাসিক প্লট নেওয়ার অধিকার পান।
কর্নেল পদমর্যাদা: প্রমোশন পেয়ে কর্নেল হলে তিনি পান দ্বিতীয় প্লট।
ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদা: ব্রিগেডিয়ার হলে তাঁর ঝুলিতে যুক্ত হয় আরও দুটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্লট।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল: এই পদে পৌঁছালে কোটি রুপি মূল্যের প্রিমিয়াম প্লট বরাদ্দ পান।
কোর কমান্ডার (Lt. Gen): আর যারা বিভিন্ন অঞ্চলের 'কোর কমান্ডার' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তারা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে অর্ধকোটি রুপির বেশি মূল্যের সম্পদ ও ভাতা লাভ করেন।
নিচে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য, জমি বরাদ্দ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাতের নিয়ন্ত্রণ একনজরে সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয়াবলি | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
মূল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান | ফৌজি ফাউন্ডেশন, আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট (AWT), শাহিন ও বাহরিয়া ফাউন্ডেশন, DHA। |
বার্ষিক বাণিজ্য ও জিডিপি | বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ব্যবসা; যা পাকিস্তানের মোট জিডিপির ১০%। |
নিয়ন্ত্রণাধীন বাণিজ্যিক খাত | সার, সিমেন্ট, স্টিল, কসমেটিকস, ফার্নিচার, ওষুধ, পেট্রোলিয়াম, খাদ্য ও ব্যাংকিং। |
ব্যাংকিং খাত | আসকারি ব্যাংক সহ ৫টি ব্যাংক পরিচালনা; বার্ষিক লেনদেন ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। |
আইয়ুব আমলের জমি বরাদ্দ | মেজর জেনারেল: ২৪০ একর; ব্রিগেডিয়ার/কর্নেল: ১৫০ একর; মেজর-লেফটেন্যান্ট: ১০০ একর। |
ডিএইচএ (DHA)-র সীমানা | ৫০টির বেশি প্রজেক্ট; ইসলামাবাদে ১৬,০০০ একর এবং করাচিতে ১২,০০০ একর জমি। |
মোট জমি বন্টন (১৯৬৫-২০০৩) | সামরিক অফিসারদের মধ্যে আনুমানিক ২০ লাখ একর (2 Million Acres) জমি বন্টন। |
জেনারেল বাজওয়ার কেস স্টাডি | ৬ বছরের মেয়াদে পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। |
'ভূমিপ্রেম' বনাম জনস্বার্থ: সাধারণ নাগরিক ও বিচার বিভাগের সাথে সংঘাত
পাকিস্তানের ভূমি অসীম নয়। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সামরিক বাহিনীর এই অনিয়ন্ত্রিত জমি দখল সাধারণ মানুষের সাথে নিয়মিত সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। ডিএইচএ-র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সফল করতে গিয়ে অনেক সময় সাধারণ ক্ষুদ্র কৃষক, দরিদ্র জনগণ এবং বিধবাদের জমি জোরপূর্বক অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
পাঞ্জাবের ক্ষুদ্র কৃষকদের জমি দখল (১৯৯৩ - ২০০৬)
১৯৯৩ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকারের সাহায্যে ডিএইচএ ৩৩,৮৬৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এর মধ্যে এক ক্ষুদ্র কৃষকের সেচের তিনটি খালের জমি জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৩ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৬ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ডিএইচএ-কে আদেশ দেন সেই ক্ষুদ্র কৃষকদের জমি ফেরত দিতে।
ইসলামাবাদের বিধবাদের জমি কেড়ে নেওয়া
ইসলামাবাদে ডিএইচএ-র একটি বিশাল হাউজিং প্রজেক্টের সীমানা বর্ধিত করার সময় দুই অসহায় বিধবার জমি বেআইনিভাবে দখল করে নেওয়া হয়। সেই সাধারণ নাগরিকদের জমি ফেরত পেতে হাইকোর্ট পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
বিচার বিভাগের ঐতিহাসিক স্লেশ ও ক্ষোভ
ডিএইচএ করাচির পক্ষ থেকে যখন সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চল ভরাট করে সামরিক অফিসারদের জন্য প্লট তৈরির কাজ চলছিল, তখন সুপ্রিম কোর্ট সেই বেআইনি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
করাচির এই ভূমিলিপ্সায় বিরক্ত হয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি আদালত কক্ষে তীব্র বিদ্রূপের সুরে মন্তব্য করেছিলেন:
"আপনারা পুরো সাগর দখল করে নিন, সাগরে আমেরিকা পর্যন্ত আপনাদের দখল বর্ধিত করুন, এবং পুরো জায়গায় আপনাদের সামরিক বাহিনীর পতাকা লাগিয়ে দিন।"
প্রধান বিচারপতির এই একটি মন্তব্যই প্রমাণ করে দেয় যে, পাকিস্তানের শীর্ষ বিচার বিভাগও সামরিক বাহিনীর এই অনিয়ন্ত্রিত ও লোভী আচরণে কতটা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল।
ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও ভেঙে পড়া অর্থনীতি
যে সামরিক বাহিনী ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি, রিয়েল এস্টেটের প্লট কেনাবেচা এবং কোটি কোটি ডলারের কর্পোরেট লভ্যাংশ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই সামরিক বাহিনীর কাছে সীমান্ত রক্ষা বা পেশাদার যুদ্ধ পরিচালনা দ্বিতীয় সারির বিষয়ে পরিণত হতে বাধ্য।
বেসামরিক উদ উদ্যোক্তাদের ধ্বংস
সাধারণ বেসরকারি উদ্যোক্তারা সামরিক পরিচালিত ব্যবসাগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। কারণ, সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর ছাড় পায়, সরকারি জমি নামমাত্র মূল্যে পায় এবং প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এর ফলে পাকিস্তানের সাধারণ অর্থনীতি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব
পাকিস্তান যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে ঋণের জন্য হাত পাতছে, সাধারণ মানুষ যখন আটা ও গ্যাসের জন্য রাস্তায় যুদ্ধ করছে তখনও সামরিক বাজেট এবং জেনারেলদের পেনশন-প্লট বরাদ্দে বিন্দুমাত্র কাটছাঁট করা হয় না। প্রতিরক্ষা খাতের বিশাল ব্যয় কোনো সংসদীয় জবাবদিহিতার আওতায় আসে না।
তথ্যযুদ্ধ ও প্রচারমাধ্যম দখল: আইএসপিআর (ISPR)-র ভূমিকা
পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের ইমেজ রক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মকে সেনাবাহিনীর প্রতি অনুগত রাখতে 'ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস' (ISPR)-কে কেবল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া প্রযোজনা সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
'সফট পাওয়ার' ও পপ-কালচার প্রোপাগান্ডা
টিভি নাটক ও চলচ্চিত্র: আইএসপিআর সরাসরি অর্থায়ন ও চিত্রনাট্য তৈরি করে Alpha Bravo Charlie, Ehd-e-Wafa, Sinf-e-Aahan-এর মতো জনপ্রিয় মেগা ড্রামা এবং Waar-এর মতো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকে সেনাবাহিনীকে 'নায়ক' এবং বেসামরিক রাজনৈতিক নেতাদের 'দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য' হিসেবে ফুটিয়ে তোলা।
সংগীত ও দেশাত্মবোধক গান: পাকিস্তান জাতীয় দিবসে পপ গায়কদের দিয়ে সামরিক বাহিনীর অর্থায়নে গান প্রকাশ করা হয়, যা মূলধারার সংস্কৃতিতে সামরিক প্রাধান্যকে স্বাভাবিক করে তোলে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও সেন্সরশিপ
যেসব সাংবাদিক বা টিভি চ্যানেল সেনাবাহিনীর ব্যবসায়িক স্বার্থ, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে কথা বলেন, তাঁদের ওপর নেমে আসে কঠোর খড়্গ:
সাংবাদিক গুম ও হত্যাকাণ্ড: কেনিয়ায় রহস্যজনকভাবে নিহত অনুসন্ধানী সাংবাদিক আর্শাদ শরীফ, অপহৃত সাংবাদিক মতিউল্লাহ জান এবং হামিদ মীরের ওপর প্রাণঘাতী হামলা এসবেরই পেছনে সেনাবাহিনীর সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা দমনের ইতিহাস রয়েছে।
টেলিভিশন চ্যানেল ব্ল্যাকআউট: সেনাকর্তাদের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করলে Geo News বা ARY News-এর মতো শীর্ষ টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার সামরিক গোয়েন্দাদের নির্দেশে কেবল ক্যাবল নেটওয়ার্ক থেকে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আইএসআই (ISI)-র পলিটিক্যাল উইং ও 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং'
পাকিস্তানের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ISI)-এর একটি নির্ধারিত 'পলিটিক্যাল উইং' রয়েছে, যা সরাসরি দেশের নির্বাচন, সংসদ সদস্য কেনাবেচা এবং সরকার গঠন ও পতন নিয়ন্ত্রণ করে।
মেহরান ব্যাংক স্ক্যান্ডাল (Mehran Bank Scandal)
১৯৯০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আসলাম বেগ এবং আইএসআই প্রধান জেনারেল আসাদ দুররানি বেনজীর ভুট্টোর 'পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)'-কে হারাতে বিরোধী দলগুলোর জোট 'ইসলামী জামহুরি ইত্তেহাদ (IJI)'-এর মধ্যে কোটি কোটি টাকা বিতরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে 'আসগর খান মামলায়' এটি প্রমাণিত হয় এবং সামরিক বাহিনীর নির্বাচন চক্রান্তের নগ্ন রূপ উন্মোচিত হয়।
২০১৮ ও ২০২৪-এর 'নির্বাচনী কারচুপি'
২০১৮: নওয়াজ শরীফকে আদালতের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষণা করে ইমরান খানকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল আইএসআই।
২০২৪: সাধারণ নির্বাচনে জেলবন্দী ইমরান খানের সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ব্যাপক জয় পেলেও, রাতের অন্ধকারে 'ফর্ম ৪৭' (Form 47) জালিয়াতি করে সেনাসমর্থিত জোটকে (PML-N ও PPP) ক্ষমতায় বসানো হয়।
মেগা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও সিপিইসি (CPEC)-এ সেনাকর্তৃত্ব
পাকিস্তানের মেগা স্ট্রাকচারাল প্রজেক্টগুলোতে বেসামরিক ঠিকাদার বা সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, বরং তা পরিচালনা করে দুটি সামরিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান:
১. ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (FWO): হাইওয়ে, টানেল ও ব্রিজ নির্মাণের জন্য সেনাবাহিনীর তৈরি প্রতিষ্ঠান। জাতীয় মহাসড়কের টোল আদায়ের একচ্ছত্র ব্যবসা তাদের হাতে। ২. ন্যাশনাল লজিস্টিকস সেল (NLC): এটি দেশের বৃহত্তম পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান, যা বেসরকারি ট্রাক মালিকদের ব্যবসা একপ্রকার দখল করে নিয়েছে।
সিপিইসি অথরিটি ও 'পাপা জন্স' স্ক্যান্ডাল
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) চালুর পর এর শত শত কোটি ডলারের প্রজেক্ট দেখভালের জন্য গঠিত 'CPEC Authority'-র প্রধান পদে বসানো হয় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল অসিম সলিম বাজওয়া-কে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয় যে, আসিম বাজওয়া ও তাঁর পরিবার আমেরিকায় ৯৯টি আউটলেট সহ বিশ্ববিখ্যাত Papa John's Pizza-র ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং শত কোটি টাকার রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এই স্ক্যান্ডাল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাধ্য হয়ে তিনি সিপিইসি প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এসআইএফসি (SIFC) ও 'কর্পোরেট এগ্রিকালচার': ভূমির নতুন আইনি দখল
সম্প্রতি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিজেদের ব্যবসায়িক প্রভাব ধরে রাখতে এক অভিনব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যার নাম Special Investment Facilitation Council (SIFC)।
রিকর্ড দিক (Reko Diq) ও খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ
বেলুচিস্তানের বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা ও তামার খনি 'রিকর্ড দিক'-এ বিনিয়োগের আলোচনা বেসামরিক সরকারের মাধ্যমে না হয়ে প্রধানত সেনা সদর দফতরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে খনির নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রকই সেনাবাহিনী।
৯ই মে-র ইতিহাস ও জেনারেল আসিম মুনির অধ্যায়
২০২৩ সালের ৯ই মে পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন কালপঞ্জি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর দেশটির সাধারণ জনগণ ও তাঁর সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সেনাপ্রধানের বাসভবন (লাহোরের জিন্নাহ হাউস) ও রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তরের (GHQ) গেটে হামলা চালায়।
অভাবনীয় বার্তা: পাকিস্তানের সাত দশকের ইতিহাসে বেসামরিক সাধারণ জনগণ সেনাবাহিনীর কোনো স্থাপনায় এইভাবে সরাসরি চড়াও হয়নি। এর মাধ্যমে ফুটে ওঠে যে, দেশের সাধারণ তরুণ সমাজ সেনাবাহিনীর ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ।
আসিম মুনিরের কঠোর প্রতিক্রিয়া
বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এর জবাবে সেনা আইনে সাধারণ নাগরিকদের বিচার করার সিদ্ধান্ত নেন, শত শত বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকে কারাগারে পাঠান এবং সেনাবিরোধী যেকোনো মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদ বৃদ্ধি
সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক লিপ্সা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে পাকিস্তানের সীমান্ত রাজ্যগুলোতে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে:
বেলুচিস্তানে সম্পদ লুণ্ঠন: বেলুচিস্তানের গ্যাস, সোনা ও বন্দরের বাণিজ্যিক লভ্যাংশ স্থানীয়দের না দিয়ে সামরিক বাহিনীর জেনারেল ও কোয়েটা কোর কমান্ডারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্বার্থে ব্যয় করা হয়। এর ফলে 'বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA)' সহ স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে।
গুমের সংস্কৃতি (Enforced Disappearances): হাজার হাজার ছাত্র, সামাজিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীকে নিরাপত্তা বাহিনী গুম করেছে, যার প্রতিবাদে মাহরং বেলুচের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে 'বেলুচ একজোট কমিটি (BYC)'।
পশতুন আন্দোলন: খাইবার পাখতুনখোয়ায় সেনাবাহিনীর তথাকথিত জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ পশতুনদের ওপর নির্যাতনের জবাবে মঞ্জুর পশতিনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে 'পশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট (PTM)'।
দেশপ্রেম নাকি চরম ভূমিপ্রেম?
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিকদের স্তরে সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের বহু উদাহরণ রয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষও দীর্ঘকাল ধরে এই বাহিনীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তব সত্য হলো শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব ও জেনারেলরা এই শ্রদ্ধাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে।
সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব যখন রিয়েল এস্টেট কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়, তখন ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’ কেবল একটি স্লোগানে রূপ নেয়।
৫০টিরও বেশি ডিএইচএ প্রজেক্ট,
২০ লাখ একর আবাদযোগ্য জমি বন্টন,
১০ শতাংশ জিডিপি নিয়ন্ত্রকারী 'মিলবাস' সাম্রাজ্য, এবং
জেনারেল বাজওয়ার মতো জেনারেলদের ৫৬ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি
এসবের উত্তর একটাই দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আজ কেবল একটি সশস্ত্র বাহিনী নয়; এটি একটি সুসংগঠিত, স্বায়ত্তশাসিত এবং লোভী বাণিজ্যিক কর্পোরেশন।
দিনশেষে এই ঐতিহাসিক সত্যটিই উদভাসিত হয় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ স্তরে আজ জাতীয় স্বার্থের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থই প্রধান। তাই বিশ্বমঞ্চে আজ এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে: পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছে আসলে কোনটি বড় দেশের ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষা বা দেশপ্রেম, নাকি কোটি টাকার প্লট ও 'ভূমিপ্রেম'?















