বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে কিছু গুজব, প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারের জবাব
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুজব, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ভিকটিম হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আর কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলার পর খুনীচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

TruthBangla

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুজব, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ভিকটিম হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আর কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলার পর খুনীচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানি এজেন্ট জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন ছড়ানো অপপ্রচারগুলোকেও নতুন আঙ্গিকে কুৎসা রটিয়ে উনার রাজনৈতিক অর্জন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টা করছে।
মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে বড় হওয়া প্রজন্ম হিসেবে আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন নেতা নন, তিনি একটি জাতির আত্মপরিচয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও চিরশত্রু পাকিস্তানের নিয়োগকৃত দালাল মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে বিতর্কিত করার জন্য নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করে চলেছে। এই প্রবন্ধটি ঐতিহাসিক দলিল, আন্তর্জাতিক তথ্য এবং প্রামাণিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রধান কয়েকটি অভিযোগের অকাট্য জবাব দেবে।
এসব গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ায় কারা?
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে চিরশত্রু পাকিস্তানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত গোলাম জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের তৈরি করা সহযোগী সশস্ত্র সংগঠনগুলো যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সাথে মিলে বাঙালি গণহত্যা, লুটপাট ও ধর্ষণে জড়িত ছিল। স্বাধীনতার এত বছর পরেও তারা এখনো পাকিস্তানের প্রতি এখনো বিশ্বস্ত গোলামীর প্রমাণ দিয়ে আসছে।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ: একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে ও সশস্ত্রভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল। জামায়াতে ইসলামী এখনো পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আসছে এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তানের গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে আসছে।
আল-বদর / ইসলামী ছাত্রশিবির: জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) ক্যাডাররাই মূলত আল-বদর ও আল-শামস নামে ঘাতক বাহিনী গঠন করেছিল। এরা বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় নেতৃত্ব দেয়। স্বাধীনতার পরও এরা আদর্শগতভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী।
পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (ISI)-এর মদদপুষ্ট এক্টিভিটিস্ট: বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে দুর্বল করতে পাকিস্তানপন্থী কিছু গোষ্ঠী ও সামরিক-বেসামরিক চক্র তথা এক্টিভিটিস্ট এখনো সক্রিয়।
অস্থিরতা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক পক্ষ (বিশেষত এককালের জাসদ ও কিছু বামপন্থী অংশ): যদিও এরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই মাওবাদী পন্থায় সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এরা সরকার এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যাচার ও উস্কানিমূলক তথ্য ছড়িয়েছিল। তাদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু ও উনার উত্তরাধিকারদের নিয়ে নানা কুৎসা ও মিথ্যা খবর ছাপাতো, যা সারাদেশে রাতারাতি ছড়িয়ে পড়তো।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): বর্তমানকালের নব্য রাজাকার গোষ্ঠী এনসিপি জামায়াত-শিবিরেরই একটা অঙ্গশাখা দল, যাদের উদ্দেশ্য তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। তরুণ প্রজন্মের কাছে অকারণে ভারত-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পাকিস্তান প্রেম তৈরি করারও অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর খুনীচক্র কর্নেল ফারুকের ফ্রীডম পার্টিরই নব্যরূপ এনসিপি। এ দলের শীর্ষ নেতারা ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে উস্কানিমূলক ভাষণ দিয়ে ভারতকে ক্ষেপিয়ে বাংলাদেশকে একটা প্রক্সিযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল।
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট: বর্তমান সময়ে এই মিথ্যাচারগুলো ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হলো সোশ্যাল মিডিয়া। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই গুজবগুলো উৎপাদন ও প্রচার করে।
মিথ্যাচার #১ - শেখ মুজিব কি পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন না?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চিরশত্রুরা প্রায়শই অপপ্রচার করে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না, তিনি নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে চাননি। তারা একদিকে বলে “শেখ মুজিব পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন না, শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন”, আবার তারাই বলে বেড়ায় “শেখ মুজিব পাকিস্তানকে দুই টুকরো করেছিলেন”।
বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা: পাকিস্তান সরকার প্রথম থেকেই শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সাজিয়ে বছরের পর বছর বিনাবিচারে কারাগারে আটকে রাখার ষড়যন্ত্র করেছিলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। বিভিন্ন বিদেশী সংবাদমাধ্যম তাঁকে বারবার জিজ্ঞাসা করত, তিনি কি পাকিস্তানের অখণ্ডতা চান, নাকি বিচ্ছিন্নতা?
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা: বঙ্গবন্ধু কখনোই নিজেকে সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে ঘোষণা করেননি, কারণ তিনি জানতেন সরাসরি ঘোষণা দিলে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই বঙ্গবন্ধুকে বিনাবিচারে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখতে পারবে এবং বাঙালি জাতির উপর সামরিক আক্রমণ করে দমন নিপীড়ন করে দিতে পারে। বর্তমানেও আমরা কাশ্মীর ও বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অত্যাচার ও নিপীড়নের খবর দেখি।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতির ন্যায্য অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর কৌশল ছিল জনগণের ম্যান্ডেটকে ভিত্তি করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা অর্জন করা। দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট পাওয়ার পরই তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।
তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছয় দফা কর্মসূচির মাধ্যমে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বঙ্গবন্ধু জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তখন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন অনেক বেশি ছিল, যার কারণে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানাতে পারেনি।
৭ মার্চের জবাব: এই চক্রান্তের চূড়ান্ত জবাব তিনি দেন তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে। পাকিস্তান সরকারের সাথে আলোচনা শেষে, বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন:
"তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো... রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, তবুও এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!"
এই ভাষণই প্রমাণ করে, তিনি কেবল পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক। যারা তাঁর এই বক্তব্যকে মিসইউজ করে, তারা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
মিথ্যাচার #২ - মুক্তিযুদ্ধের পর তাজউদ্দীন বা ভাসানী কেন প্রেসিডেন্ট হলেন না?
মুক্তিযুদ্ধের পরে কেন মাওলানা ভাসানী বা তাজউদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্ট না হয়ে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট হলেন এই প্রশ্নটিও প্রায়শই বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যবহৃত হয়।
তাজউদ্দীনের অবস্থান: তাজউদ্দীন আহমদ নিজেই মুজিবের অধীনস্থ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকার-এর সাংবিধানিক কাঠামোতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা: শেখ মুজিব ছিলেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের নির্বাচিত সংসদীয় নেতা। গণতান্ত্রিক দেশের অংশ হিসেবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফিরে এসে তিনি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
ভাসানীর অবস্থান: মাওলানা ভাসানী অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নেতা হলেও, তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বের অংশ ছিলেন না। স্বাধীনতার প্রশ্নে মাওলানা ভাসানী সবসময়ই শেখ মুজিবকে প্রধান নেতা হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন।
সুতরাং, স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের প্রেসিডেন্ট হওয়া বা পরে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং মুজিবনগর সরকারের কাঠামোরই ফল, যা তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যান্য জাতীয় নেতারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মিথ্যাচার #৩ - বঙ্গবন্ধু বাকশালের মাধ্যমে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন?
১৯৭৫ সালে দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে গৃহীত ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বা বাকশাল ব্যবস্থাকে জাতীয় ঐক্যের সাময়িক কাঠামোর পরিবর্তে একদলীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত হিসেবে অপপ্রচার করা হয়। অথচ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমকালীন গবেষকদের মতে, বাকশাল কোনো চিরস্থায়ী একদলীয় একনায়কতন্ত্র বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার চক্রান্ত ছিল না। সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধতুল্য বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা করার জরুরি ব্যবস্থা।
১৯৭৩-৭৪ সালের বৈশ্বিক তেল সংকট, ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া খাদ্য সংকট এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষ দেশকে এক চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। একই সময়ে সদ্য স্বাধীন দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক বিস্তার, চোরাচালান, মজুদদারি এবং কালোবাজারির কারণে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করে।
এমন সময় জাসদের গণবাহিনী ও সিরাজ সিকদারের উগ্রপন্থী দলের সশস্ত্র তৎপরতা, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস, পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ, জনপ্রতিনিধিদের হত্যা এবং নাশকতা দমনে একটি কঠোর ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল মূলত একটি জাতীয় মোর্চা বা সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম। সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং কৃষক-শ্রমিককে একটি একক মঞ্চে এনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা ছিল এর লক্ষ্য।
দ্য বাংলাদেশ অবজারভার, দ্য বাংলাদেশ টাইমস, দৈনিক বাংলা এবং দৈনিক ইত্তেফাক এই চারটি বড় দৈনিক সংবাদপত্র রেখে দৈনিক গণকন্ঠ সহ সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে জাসদ ও অতিবামপন্থীরা পরবর্তীতে রাজনৈতিক উস্কানি ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সুযোগ পায়নি।
বাকশাল ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু নিজেই সংসদে দেওয়া ভাষণে অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, “এটি তার সারাজীবনের রাজনৈতিক আদর্শের পরিপন্থি, কিন্তু দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং স্বাধীনতা রক্ষা করার বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে এই কঠোর পথ বেছে নিতে হয়েছে।”
বাকশালের আওতায় তৎকালীন মহকুমাগুলোকে উন্নীত করে ৬১টি জেলা গঠন করা হয়।বাকশালের কল্যাণে দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটাতে শুরু করে এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও চোরাচালান কমে যেতে শুরু করে। কিন্তু বাকশালের সুফল পাওয়ার আগেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হন। পরবর্তীতে খুনীচক্র ও ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা সরকারগুলো তাদের অবৈধ শাসনকে বৈধ করতে বাকশালকে ‘চিরস্থায়ী স্বৈরতন্ত্র’ বলে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার ছড়াতে থাকে যা আজও বিদ্যমান।
মিথ্যাচার #৪ - পাকিস্তানি অস্ত্র কেন ভারত নিয়ে গেল, বাংলাদেশে থাকল না?
অনেকে অভিযোগ করে যে, মুক্তিযুদ্ধের পরে পাকিস্তান আর্মির সব অস্ত্র গোলাবারুদ কেন ভারতীয় আর্মি নিয়ে গেল এবং কেন সেগুলো বাংলাদেশে থেকে গেল না। এই অভিযোগের মাধ্যমে ভারতীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করা হয়।
আত্মসমর্পণের নিয়ম: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মে ভারতীয় বাহিনীর কাছে "আত্মসমর্পণ" করে। ফলস্বরূপ, আত্মসমর্পণকারী বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়।
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা: বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন ও অস্থির অবস্থা বিরাজমান। দেশে কোনো স্থায়ী সেনা বা আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এত বিপুল অস্ত্র (লক্ষ লক্ষ সামরিক অস্ত্র) রেখে দিলে দেশে বড় ধরনের গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা বা দুষ্কৃতকারীদের হাতে চলে যাওয়ার চরম আশঙ্কা ছিল।
জাসদ ও ডাকু সিরাজের উদাহরণ: ১৯৭২ সালে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন করে মাওবাদী পন্থায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে এবং গণতন্ত্র বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করে। অপরদিকে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিও ক্ষমতা দখল করে চীনপন্থী সমাজতান্ত্র কায়েমের চেষ্টা করে। এই দুই সশস্ত্র বাহিনী সেসময় সারাদেশে বোমা বিস্ফোরণ করতো, নাশকতা করতো, থানা আক্রমন করে অস্ত্র লুটপাট করতো, ব্যাংক ডাকাতি করতো এবং সারাদেশে লিফলেট বিলি করে আতংক ছড়াতো। যদি সেই সময়ে পাকিস্তান আর্মির বিপুল অস্ত্র জাসদের গণবাহিনী বা ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টির হাতে যেত, তবে দেশে আরেকটি গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হতো।
পরবর্তীতে ভারত ও অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। অস্ত্রগুলো হস্তান্তরের এই সিদ্ধান্ত ছিল সেই সময়ের সদ্য স্বাধীন দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গৃহীত একটি অপরিহার্য সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
মিথ্যাচার #৫ - ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য কি শেখ মুজিব দায়ী?
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার চালানো হয়। তাঁকে এই দুর্ভিক্ষের জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়, যা নির্লজ্জ মিথ্যাচার। ইতিহাসবিদরা এবং অর্থনীতিবিদরা প্রমাণ করেছেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল বহুমাত্রিক এবং এর পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও ছিল:
যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি: মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের কৃষি, অবকাঠামো, পরিবহন এবং পুরো অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়। পাকিস্তান সামরিক জান্তা পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাংকগুলো থেকে সমস্ত টাকা ও রিজার্ভ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ১৯৭৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা হয়। এই বন্যায় দেশের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং দেশের ধানক্ষেত ও খাদ্য মজুদ নষ্ট হয়ে যায়, যা খাদ্য উৎপাদনকে তীব্রভাবে কমিয়ে দেয়। তার উপর জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি ও আক্রমণ করে খাদ্যশস্য লুট করে নিতো। এসব খাদ্যদ্রব্য চোরাবাজারে চড়ামূল্যে বিক্রি করে তারা পার্টির ফান্ড কালেকশন করতো।
আমেরিকার ষড়যন্ত্র (PL-480): মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত সরকার সহযোগিতা করায় আমেরিকা ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবে আমেরিকা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক অবরোধ দেয় এবং PL-480 খাদ্য সহায়তা (যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল) বন্ধ করে দেয়। এটাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা অনেকগুণ বৃদ্ধি করেছিল।
কিসিঞ্জারের ষড়যন্ত্র: বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে যোগদান করলেও, পাকিস্তানের অনুরোধে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা আটকে রাখেন। কিসিঞ্জার ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ ও শেখ মুজিবের প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন এবং বাংলাদেশকে 'বটমলেস বাস্কেট' বলে উপহাস করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নীতি: স্বাধীনতার পর গোলাম আজমের নেতৃত্বে পাকিস্তানের অন্যান্য জামায়াত নেতারা সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মুসলিম দেশ ঘুরে বাংলাদেশকে “হিন্দু রাষ্ট্র”, “ইসলাম বিপন্ন রাষ্ট্র”, “ভারতের অঙ্গরাজ্য” আখ্যায়িত করে অপপ্রচার করতে থাকে। গোলাম আজম চিঠি লিখে ও সরাসরি দেখা করে সৌদির বাদশাহকে সাতবার অনুরোধ করেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে এবং কোনো প্রকার সাহায্য না করতে। এতে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল মুসলিম দেশ বন্যা ও দুর্ভিক্ষের সময় বাংলাদেশকে কোন প্রকার সাহায্য করেনি এবং শ্রমবাজারেও বাংলাদেশীদের নেয়নি।
সৌদি সরকার মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘে যোগ দিতে পারেনি। শেখ মুজিব যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন সৌদি আরবের শ্রমবাজার বন্ধ ছিল, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা থেকেও বাংলাদেশ বঞ্চিত ছিল। আর বর্তমানকালে তো আমরা সবাই জানি বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের চিরকালের একমাত্র চালিকাশক্তি ছিলো, আছে এবং থাকবে।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, শেখ মুজিব এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী নন, কারণ তিনি তখন দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের কাছে অসহায়ের মতো তার দেশকে সাহায্য করতে অনুরোধও করেছিলেন। মূলত পাকিস্তানের চক্রান্ত এবং আমেরিকা ও সৌদি আরবের অসহযোগিতাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকে অনেক ভয়াবহ করেছিলো।
তবে এতগুলো আন্তর্জাতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকার ব্যর্থ ছিলো এই সমালোচনা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু তাঁকে সরাসরি 'দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী' হিসেবে দায়ী করা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার।
মিথ্যাচার #৬ - দুর্ভিক্ষের মধ্যে কি মুজিব তাঁর ছেলেদের বিয়ে দিয়েছিলেন?
এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জনপ্রিয় মিথ্যাচার, যা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় মুজিবপুত্রের বিয়ের গল্পকে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া এই দাবিটি সম্পূর্ণ গুজব ও মিথ্যাচার, যা ঐতিহাসিক সময়রেখা দিয়ে সহজেই debunk করা যায়:
দুর্ভিক্ষের সময়কাল: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান-এর লেখা এবং বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিল মার্চ মাসে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসের দিকে স্বাভাবিক হওয়া শুরু করেছিল আমন ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের পর দুর্ভিক্ষ-সংক্রান্ত কোনো খবর পত্র-পত্রিকায় পাওয়া যায়নি।
বিয়ের তারিখ: শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ে ও তার অনুষ্ঠান হয় ১৯৭৫ সালের ১৭ই জুলাই।
ভুয়া দাবি: সুতরাং, ১৯৭৪ সালের মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের সময়কাল পার হয়ে যাওয়ার প্রায় ৮ মাস পরে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ফেসবুকের পোস্টগুলোতে '১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের মধ্যে মুজিবপুত্রের বিয়ে' হয়েছিল এই দাবিটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার। (সূত্র: Fact Watch, বাংলাপিডিয়া)।
মিথ্যাচার #৭ - জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে কি শেখ মুজিব খুন করেছিলেন?
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাসদ এবং তার সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর সঙ্গে তৎকালীন সরকারের সংঘাতকে কেন্দ্র করে এই অতিরঞ্জিত অভিযোগটি ছড়ানো হয়।
জাসদ সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী গঠন করে, যা সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। এই গণবাহিনী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ, নাশকতা ও ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। জাসদের গণবাহিনী আওয়ামী লীগ সদস্য এবং থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশকে আহত করতো ও পুলিশের অস্ত্র লুটপাট করে নিতো। এর জবাবে রক্ষীবাহিনীও ধরপাকড় ও দমননীতি গ্রহণ করে।
সহিংসতা: রক্ষী বাহিনী ও জাসদের গণবাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সহিংসতা ও দমনপীড়ন ঘটেছে। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা করে ও বোমা বিস্ফোরণ করে। ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে আবারও তারা নাশকতা শুরু করে। ১৭ মার্চ জাসদের একটি মিছিল থেকে গণবাহিনীর কর্মীরা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ করে এবং কয়েকটি স্থানে ভাংচুর চালায়।
মিছিলটি ঢাকা রমনা ও পল্টন এলাকায় আসলে জাসদের কর্মীরা রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। এ সময় রক্ষীবাহিনীর গুলিতে কিছু জাসদ কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
দাবি ও ভিন্নতা: সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্ক এবং জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকন্ঠে জাসদ কর্মীদের নিহতের সংখ্যা ৫০ বা তার বেশি দাবি করা হলেও, প্রধান সংবাদমাধ্যমের নথিতে সংখ্যাটি কম উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন দৈনিক ইত্তেফাকে ৬ জন নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী সেদিনের গুলিবর্ষণে জাসদের ৬ জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারান। আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিক নথিতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১২ জন বা তার বেশি বলা হয়েছে।

সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক: জাসদপন্থী কিছু সূত্র দাবি করেছে যে, হাজার হাজার নেতাকর্মী নিহত হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের নির্দেশে ৩০ হাজার জাসদ কর্মীকে হত্যা করেছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান নেই। ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকরা এই সংখ্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত এবং জাসদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার মনে করেন।
এটি ছিল সে সময়ের সদ্য স্বাধীন দেশের চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ফল, যেখানে একপক্ষ সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমেছিল এবং সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছিল। তবে ৩০ হাজার মৃত্যুর দাবিটি প্রমাণবিহীন।
মিথ্যাচার #৮ - মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শেখ মুজিব কি পাকিস্তান সরকার থেকে বেতন ভাতা পেতেন?
একটি বহুল প্রচলিত অপপ্রচার হলো, বঙ্গবন্ধু নাকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নয় মাস পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা পেতেন। এর সোজা উত্তর হলো, না, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকার থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাননি। তবে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক পদে তথা মন্ত্রী বা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) থাকার কারণে পাকিস্তান সরকার থেকে বেতন-ভাতা পেতেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করে, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান।
গ্রেফতার ও কারাবাস: গ্রেফতারের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমে ঢাকায় রাখা হলেও পরবর্তীতে দ্রুতই তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মিয়ানওয়ালি কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো নয় মাস ধরে যখন তাঁর নামে এবং তাঁর নির্দেশনায় বাংলাদেশে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তখন তিনি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি নির্জন কারাগারে, যেখানে তাঁর ওপর মৃত্যুদণ্ডের খড়গ ঝুলছিল।
বেতন-ভাতার প্রশ্ন: যেহেতু তিনি একটি শত্রু রাষ্ট্রের কারাগারে বন্দি ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা চলছিল, তাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের বেতন বা ভাতা পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। একজন বন্দি নেতা, যাঁর দল রাষ্ট্রবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ করছে, তাঁর প্রতি শত্রুপক্ষের বেতন-ভাতা প্রদান করা কেবল অযৌক্তিকই নয়, সামরিক এবং প্রশাসনিক দিক থেকেও তা অসম্ভব।
গুজব ও মিথ্যাচারের শিকার পরিবার: বঙ্গবন্ধুর বেতন পাওয়ার বিষয়টি যেমন অসম্ভব ছিল, তেমনি তাঁর পরিবারকে ঘিরেও কিছু সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ছড়ানো হয়, যা মূলত গুজব ও মিথ্যাচার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল এবং অন্যদের ঢাকায় ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে গৃহবন্দি ছিলেন। তাঁরা নিরাপত্তা ও খাদ্য সংকটে দিন কাটিয়েছেন, পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা তাঁদের কড়া পাহারায় রেখেছিল যেন তাদের কেউ উদ্ধার করতে না আসে।
ভাতার অভিযোগের গুজব: স্বাধীনতার চিরশত্রুরা অভিযোগ করে যে, পাকিস্তান সরকার বন্দি থাকা সত্ত্বেও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কিছু সুযোগ-সুবিধা ও মাসিক ভাতা, প্রদান করেছিল। এই ধরনের ভাতার অভিযোগের সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই এবং এটা অসম্ভব বিষয় ছিল।
বন্দিদশার প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাদ্য বা ওষুধ সরবরাহ করতেও পাকিস্তানি সেনারা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। শেখ হাসিনা যখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন, তখন তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যও সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অনুনয় করতে হয়েছিল।
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা সেই নয়টি মাস অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কিছু বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মী, ব্যবসায়ী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা ছদ্মবেশে বা গোপনে পাকিস্তানি সেন্ট্রিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অথবা তাদের মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে বাড়ির পেছনের দেয়াল দিয়ে টাকা বা খাবার ভেতরে ছুঁড়ে দিতেন। কিন্তু ৫ আগস্ট শেখ জামাল এই অবরুদ্ধ বাড়ি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর এই সুযোগও পাকিস্তানি সেনারা বন্ধ করে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে শেখ মুজিবের আয়-উৎস: মুক্তিযুদ্ধকালীন বেতন না পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, এই গুজব রটনাকারীরা প্রায়শই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে বঙ্গবন্ধুর আয়ের উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপিএ/এমএনএ) ছিলেন। এসব পদে থাকার কারণে তিনি সরকারি বেতন-ভাতা পেতেন। যেমন, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে অন্যান্য সদস্যদের মতো তিনিও নির্ধারিত বেতন গ্রহণ করতেন। তবে এই বেতন-ভাতা তাঁর আয়ের একমাত্র বা প্রধান উৎস ছিল না।
তাঁর ব্যক্তিগত আয় আসত ব্যবসা, কৃষিখাত (পিতা শেখ লুৎফর রহমানের পৈতৃক সম্পত্তি) এবং রাজনৈতিক অনুদান থেকেও। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ অংশ কারাগারে কাটিয়েছেন। ১৯৬৮ সালের 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'সহ বিভিন্ন সময়ে তিনি দীর্ঘ কারাবাস করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই, যখন তিনি কারারুদ্ধ থাকতেন, তখন সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ থাকত।
মিথ্যাচার #৯ - "সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি"
১৯৭১ সালের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্বসমাজ থেকে পাওয়া ত্রাণসামগ্রী ও পুনর্বাসনের সম্পদ আত্মসাৎকারী কালোবাজারি, অবৈধ মজুতদার ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন। এই আক্ষেপের পাশাপাশি তিনি প্রায়ই বলতেন, "সবাই পায় কম্বল, আমার কম্বলটা কই?" কিংবা "চাটার দল সব খেয়ে ফেলল।"
কোনো রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক নিজের ব্যবস্থার ভেতরের অপকর্মের বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া কোনো ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি ছিল না, বরং তা ছিল অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাঁর বিরল রাজনৈতিক সাহস ও অসীম সততার প্রমাণ। বঙ্গবন্ধু কেবল মুখে ক্ষোভ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি, দুর্নীতি দমন ও চোরাচালান রোধে একাধিক কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন:
ত্রাণ কমিটি বাতিল: স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ামাত্র তিনি সারা দেশের সব ভুয়া ও অসাধু ত্রাণ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
দলীয় শুদ্ধি অভিযান: দুর্নীতির অভিযোগে নিজ দল আওয়ামী লীগের তৎকালীন বহু নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রায় এক ডজন গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্যকে পদচ্যুত করা হয়।
সেনাবাহিনী দিয়ে অভিযান: ১৯৭৪ সালে চোরাচালান, কালোবাজারি ও খাদ্যশস্য মজুতদারদের রুখতে তিনি সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে যৌথ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।
বিশেষ ক্ষমতা আইন: চোর, চোরাকারবারি ও কালোবাজারিদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে ১৯৭৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন করা হয়।
১৫ই আগস্ট পরবর্তী স্বৈরশাসকদের তদন্ত ও সত্য: বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অপপ্রচার যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ট্র্যাজেডির পর। ক্ষমতাদখলকারী সামরিক জান্তা ও খন্দকার মোশতাক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিল।
সুইজারল্যান্ড বা বিশ্বের অন্য কোনো দেশের ব্যাংকে বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারের কোনো গোপন, অবৈধ বা বেনামি অ্যাকাউন্টের অস্তিত্ব কোনো নিরপেক্ষ ও সামরিক তদন্তকারী দল খুঁজে পায়নি। সামরিক সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েও বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো বিপুল অর্থকড়ি, বিলাসবহুল গোপন ফ্ল্যাট বা অতিরিক্ত সম্পত্তির হদিস বের করতে ব্যর্থ হয়।
লোভাতীত জীবনযাপন: রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু বিলাসবহুল সরকারি বাসভবন বা প্রাসাদে না থেকে সাধারণ নাগরিকের মতো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাড়িটিতেই বসবাস করতেন। সরকারি তহবিল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যক্তিগত সুবিধার বিন্দুমাত্র ব্যবহার না করা এবং সাধারণ পোশাক ও জীবনযাত্রা বজায় রাখা প্রমাণ করে যে, তিনি নিজে সম্পূর্ণ লোভাতীত ছিলেন। একজন পুরোপুরি সৎ ও আপসহীন নেতা বলেই তিনি নিজের দল বা দেশের ভেতরের চোর-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্য হুঙ্কার দিতে পেরেছিলেন।
মিথ্যাচার #১০ - বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চের রাতে স্বেচ্ছায় 'আত্মসমর্পণ' করেছিলেন?
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর নির্মম গণহত্যা শুরু করলে, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিরাপদ স্থানে আত্মগোপনে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখন আত্মগোপনে না গিয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন।
বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণিত হয় যে, “পাকিস্তানি সামরিক জান্তা একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক দলের প্রধানের ওপর অন্যায়ভাবে আক্রমণ চালিয়েছে।” বঙ্গবন্ধু জানতেন, তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী একজন নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি। তিনি পালিয়ে গেলে দেশের মুক্তিকামী মানুষ ও তরুণদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
তিনি যদি আত্মগোপনে চলে যান, তবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পুরো স্বাধীনতা সংগ্রামকে "বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসবাদ" বা "বেআইনি বিদ্রোহ" হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিত্রায়িত করার সুযোগ পাবে। এর ফলে বৈশ্বিক সমর্থন আদায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ত এবং পাকিস্তানি বিমান ও ট্যাংক বাহিনী ঢাকার লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে গণহত্যার অজুহাত পেয়ে যেত।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ছাত্র ও যুবনেতাদের জানিয়েছিলেন যে, তিনি যদি আত্মগোপনে চলে যান বা পালিয়ে যান, তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে খোঁজার বাহানায় পুরো ঢাকা শহরকে গুঁড়িয়ে দেবে এবং লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে হত্যা করবে। তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে, অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (রাত ১২:২০ থেকে ১২:৩০ মিনিটের মধ্যে) বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বার্তাটি চূড়ান্ত করেন। ইংরেজিতে লিখিত এই বার্তাটি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলেস (ইপিআর)-এর ওয়ারলেস ট্রান্সমিটার, টেলিগ্রাম এবং টেলিফোনের মাধ্যমে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
চট্টগ্রাম ইপিআর হেডকোয়ার্টারে প্রেরিত এই বার্তা পরবর্তীতে সাব-সেক্টর কমান্ডার সুবেদার মেজর শওকত আলীসহ স্থানীয় নেতাদের হাতে পৌঁছায়। ২৬শে মার্চ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান এবং পরবর্তীতে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে সামরিক কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নামেই স্বাধীনতার এই ঘোষণা পাঠ করেন।
গ্রেফতারের ঘটনা এবং পাকিস্তানি সামরিক নথি: ২৬শে মার্চ রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে (বাঙালিদের হিসাবে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ঘেরাও করে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তাঁর 'উইটনেস টু সারেন্ডার' (Witness to Surrender) গ্রন্থে এবং পরবর্তীতে রাও ফরমান আলীর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় স্বীকার করেছেন,
“শেখ মুজিব কোনো পালানোর চেষ্টা করেননি, বরং অত্যন্ত শান্ত ও অবিচলভাবে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন।” তিনি জানতেন, তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর নির্দেশনা ও আদর্শই পুরো বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিচালিত করবে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আইনি বৈধতা: বঙ্গবন্ধুর এই কৌশলগত অবস্থান পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) আন্তর্জাতিক আইনি ও গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে পাঠানো তাঁর গোপন কূটনৈতিক টেলিগ্রামে উল্লেখ করেছিলেন যে,
“শেখ মুজিবুর রহমান স্বেচ্ছায় গ্রেফতার বরণ করার মাধ্যমে নিজের ওপর আক্রমণের সমস্ত দায় পাকিস্তান সামরিক সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।”
“এটি কোনো আত্মসমর্পণ ছিল না; বরং এটি ছিল দখলদার বাহিনীকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে 'আক্রমণকারী' হিসেবে চিহ্নিত করার এবং বাঙালি জাতিকে স্বাধীন সংগ্রামের সর্বোচ্চ নৈতিক ভিত্তি দেওয়ার এক দূরদর্শী রাজনৈতিক চাল।”
মিথ্যাচার #১১ - বঙ্গবন্ধু কি কেবল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, বাঙালির স্বাধীনতা চান নি?
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি ও অধিকার আদায়ই ছিল তাঁর আজীবন সংগ্রামের মূল লক্ষ্য। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক কাঠামোর বিরুদ্ধে তিনি যে দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তোলেন, তা ছিল স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা।
২৪ বছরের ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস: ১৯৪৮-১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়। ১৯৫৪সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফা দাবির মাধ্যমে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক রূপরেখা সুনির্দিষ্ট করা হয়।
১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন ছিল কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীলনকশা। পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থা, নিজস্ব শুল্ক ও কর নীতি এবং আধাসামরিক বাহিনী গঠনের দাবিগুলো পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো ভেঙে বাঙালির সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছিল। ১৯৬৮-র আগরতলা মামলায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছিল ৬-দফার শেষ পরিণতি স্বাধীনতা। তাই সশস্ত্র উপায়ে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়, যা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বঙ্গবন্ধুর জন্য পাকিস্তানের ক্ষমতার লোভ ছিল না, বরং এটি ছিল বিশ্ব দরবারে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের একটি আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি (Legal Mandate) তৈরি করার কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
নাইজেরিয়ার 'বিয়াফ্রা' বা কঙ্গোর 'খাতাঙ্গা' সংকটের মতো বঙ্গবন্ধুও যদি নির্বাচনের আগে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেখ মুজিবকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী দেশদ্রোহী' হিসেবে চিহ্নিত করত। ফলে পাকিস্তান সামরিক শক্তি দিয়ে আন্দোলন দমন করলে বৈশ্বিক সহানুভূতি পাওয়ার সুযোগ থাকত না। নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয় পেয়ে শেখ মুজিব সমগ্র পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হন। বিজয়ী জনপ্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতা পাওয়ার পর যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে পাকিস্তানিরাই অন্যায্য ও অবৈধ আচরণ করছে।
১৯৭১ এর মার্চ ও চূড়ান্ত স্বাধীনতা: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ থেকে পরিচালিত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তান তখন থেকেই কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পরিচালিত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের কার্যত প্রধানমন্ত্রী। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গণহত্যা শুরু করার সাথে সাথেই ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শীর্ষ এই নেতার স্বাধীনতা ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে একটি বৈধ ও নৈতিক লড়াই হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মিথ্যাচার #১২ - ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি গোলামি চুক্তি করেছিলো?
১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৫ বছর মেয়াদি 'ভারত-বাংলাদেশ শান্তি, সহযোগিতা ও মৈত্রী চুক্তি' স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারচক্র, বিহারী ও জাসদের ষড়যন্ত্রকারীরা এই চুক্তিকে "গোলামি চুক্তি" বা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রির দলিল হিসেবে অপপ্রচার করা হলেও এটি ছিল সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের ওপর ভিত্তি করে গঠিত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সমমর্যাদাপূর্ণ চুক্তি।
চুক্তির মূল ধারা ও সারভৌমত্বের প্রতি সম্মান: চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল একে অপরের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে উভয় দেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি মেনে চলবে এবং কোনো দেশই অন্য দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো সামরিক জোটে যোগ দেবে না।
ধারা ৯ এর প্রকৃত ব্যাখ্যা: চুক্তির নবম ধারা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল, যেকোনো এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে বা আক্রমণের হুমকি থাকলে উভয় দেশ আলোচনা করে হুমকি দূর করার পদক্ষেপ নেবে। এটি কোনো একটি দেশকে সামরিকভাবে বাধ্য করার শর্ত ছিল না, বরং পারস্পরিক পরামর্শের একটি কূটনৈতিক বিধান ছিল।
ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার: সামরিক ইতিহাসে কোনো পরাশক্তি বা মিত্র বাহিনী বিজয়ের পর এত দ্রুত সৈন্য প্রত্যাহার করার দৃষ্টান্ত বিরল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ বা কোরিয়ায় এবং পরবর্তীতে আফগানিস্তানে বিদেশি সেনা দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থান করলেও বাংলাদেশ ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান ও সফল আলোচনার কারণে ১৯৭২ সালের ১২ মার্চ (চুক্তি স্বাক্ষরের এক সপ্তাহ আগেই) ভারতীয় মিত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা স্টেডিয়ামে বিদায় কুচকাওয়াজের মাধ্যমে নিজ দেশে ফিরে যায়। যদি মৈত্রী চুক্তিটি গোলামির চুক্তি হতো, তবে চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করতো না।
চুক্তির মেয়াদ শেষ: চুক্তিটির সুনির্দিষ্ট মেয়াদ ছিল ২৫ বছর। ১৯৯৭ সালের ১৯ মার্চ এই চুক্তির মেয়াদ স্বাভাবিক নিয়মেই শেষ হয়। তৎকালীন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এবং ভারত সরকারের কেউই চুক্তিটি নবায়নের উদ্যোগ নেয়নি। ২৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর চুক্তিটির আইনগত অস্তিত্ব স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হয়, যা প্রমাণ করে এটি কোনো চিরস্থায়ী পরাধীনতার চুক্তি ছিল না।
মিথ্যাচার #১৩ - বঙ্গবন্ধু কি সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন?
বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকে অবিশ্বাস করেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে রক্ষীবাহিনী দিয়ে সেনাবাহিনী প্রতিস্থাপন করতে চান এমন একটা নিকৃষ্ট মিথ্যাচার তথ্য ছড়িয়ে তৎকালীন সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়। এই অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি করা।
মুক্তিযুদ্ধোত্তর দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় লক্ষাধিক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্ত পাচার রোধ, চরমপন্থী দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' গঠন করা হয়েছিল। এটি কোনো সমান্তরাল বা বিকল্প সেনাবাহিনী ছিল না, বরং একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী (প্যারামিলিটারি ফোর্স) হিসেবে কাজ করত।
রক্ষীবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৬,০০০ এবং বাংলাদেশের মূল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ এরও বেশি। একটি প্যারামিলিটারি ফোর্স দিয়ে পুরো সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপনের দাবি ভিত্তিহীন ও অবাস্তব।
তৎকালীন জাসদের গণবাহিনীর শীর্ষ নেতারা ও ডাকু সিরাজের অনুসারীরা ভাষণ ও লিফলেট বিতরণ করে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে উসকানি দিত। রক্ষীবাহিনীর বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি এমন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সেনাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করা হতো, যা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সার্বিক অর্থ ও সরঞ্জামের সংকট ছিল। সেনাবাহিনীর জন্য বুট, ইউনিফর্ম ও আধুনিক আবাসন সরবরাহে বাজেট ঘাটতিকে সরকারের অবহেলা হিসেবে প্রচার করে নিম্নপদস্থ জওয়ানদের উসকে দেওয়া হয়েছিল।
সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করতে চক্রান্তকারীরা অপপ্রচার ছড়িয়েছিল যে রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি বাজেট পায়। প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন প্রতিরক্ষা বাজেটে সেনাবাহিনীর বরাদ্দ ছিল ৯২ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১২২ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। অন্যদিকে রক্ষীবাহিনীর মোট বরাদ্দ ছিল সেনাবাহিনীর বাজেটের সামান্য ভগ্নাংশ মাত্র।
রক্ষীবাহিনীর ইউনিফর্মের অলিভ গ্রিন রঙের সাথে ভারতীয় বাহিনীর ইউনিফর্মের মিল থাকায় জাসদ ও সিরাজের অনুসারীরা প্রচার করতো, ভারতীয় প্রভাবে সাধারণ সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এই নিয়মিত অপপ্রচারটি সশস্ত্র বাহিনীর নিম্নপদস্থ জওয়ানদের মাঝে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে, যা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডির পরোক্ষ ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।
বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকে ধ্বংস বা দুর্বল করতে চাননি, বরং একটি আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার জন্য মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৯৭৪ সালে কুমিল্লার ময়নামতিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA) প্রতিষ্ঠা করেন। পার্বত্য অঞ্চলে দীঘিনালা, রুমা ও আলীকদমে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ছাউনি নির্মাণ করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সামরিক অনুদান হিসেবে ১২টি অতিস্বনক (Supersonic) মিগ-২১ যুদ্ধবিমান, এএন-২৪ ও এএন-২৬ পরিবহন বিমান, ভিআইপি ও ইউটিলিটি এমআই-৮ হেলিকপ্টার এবং পি-১৫ ও পি-৩৫ রাডার এনে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালী করেন।
মিশর থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া টি-৫৪ ট্যাংকের মাধ্যমে সেনাপরিষদে আর্মার্ড কোরের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়। নৌবাহিনীর মূল ভিত্তি হিসেবে বানৌজা ঈসা খান, বানৌজা হাজী মহসিন এবং বানৌজা তিতুমীর কমিশন লাভ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সীমিত বাজেট সত্ত্বেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা সেনানিবাস পুনর্গঠন করেন।
শুধু বঙ্গবন্ধুই না, উনার উত্তরাধিকার শেখ কামালকে নিয়েও নিকৃষ্ট প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচার করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
মিথ্যাচার #১৪ - শেখ কামাল কি ব্যাংক ডাকাতি করেছিলেন?
১৯৭৩ সালের শেষের দিকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছিল। বিশেষ করে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি এবং জাসদের গণবাহিনীর মতো সশস্ত্র আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা আক্রমণ, ব্যাংক ডাকাতি এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছিল।
সত্য ঘটনা ও প্রামাণ্য নথিপত্র: এই ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ও সত্য বিবরণ পাওয়া যায় সাবেক সেনাকর্তা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর (বীর বিক্রম) লেখা খ্যাতনামা বইয়ে 'এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক' (পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬)।
১৫ ডিসেম্বর রাতের প্রকৃত ঘটনা: জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও মাওবাদী সংগঠন সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে 'কালো দিবস' ঘোষনা দিয়ে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী বিজয় দিবস বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং লিফলেট বিলি করে তারা ঘোষণা করে জাতীয় প্রেসক্লাব, পত্রিকা অফিস, কমলাপুর রেলস্টেশন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ বোমা মেড়ে উড়িয়ে দেয়ার।
১৪ ডিসেম্বর সর্বহারা পার্টি ঢাকায় দুটি বোমা বিস্ফোরণ করেছিল, একটি বাংলার বাণী অফিসে (যার মালিক ছিলেন শেখ কামালের ফুফাত ভাই শেখ মণি) এবং অপরটি বিস্ফোরিত হয় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স অফিসে।
বিজয় দিবসের আগের রাতে (১৫ ডিসেম্বর রাতে) গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের লোকজন সশস্ত্র অবস্থায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল দিচ্ছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তখন রাজধানী ঢাকায় ছিল মোট আটটি থানা এবং প্রতিটি থানায় মাত্র ২৪ জন করে পুলিশ সদস্য ছিলো। পুলিশ লাইনেও অস্ত্রধারী পুলিশের সংখ্যা খুব বেশী ছিলো না। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ ও স্থানীয় জাতীয়তাবাদী তরুণরাও সাধারণ পোশাকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে টহল ও পাহারা দেয়া শুরু করে।
১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে নাশকতার সংবাদ পেয়ে শেখ কামাল তাঁর বন্ধুদের নিয়ে (যার মধ্যে ছিলেন রেজাউল করিম, সাহেদ রেজা, আক্কাস, মিন্টু প্রমুখ) একটি ৯ সিটের সাদা মাইক্রোবাস ও একটি জিপে করে নাশকতারোধে ও দুষ্কৃতকারীদের ধাওয়া করতে মতিঝিল এলাকায় বের হন। একটি লাল টয়োটা গাড়িতে কয়েকজন মুখ বাধা দেখে শেখ কামালের বন্ধুরা ওই গাড়িটিকে ধাওয়া শুরু করে। মতিঝিল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকটবর্তী গলির কাছে টহলরত পুলিশ দলটি একটি সাদা মাইক্রোবাস এবং তার পেছনে আরেকটি গাড়ির উপস্থিতি দেখে সেটিকে সন্ত্রাসীদের গাড়ি মনে করে সতর্ক অবস্থান নেয়।
পুলিশের ভুলবশত গুলিবর্ষণ: ডাকু সিরাজের সন্ত্রাসী দল ভেবে পুলিশ কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কসংকেত না দিয়েই শেখ কামালদের গাড়ি লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণে শেখ কামাল ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী আহত হন। দুটি গুলি শেখ কামালের কাঁধে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দরজা খুলে শেখ কামাল চিৎকার করে বলতে থাকে, "আমি শেখ কামাল, আমি শেখ কামাল।" সার্জেন্ট শামীম কিবরিয়া ও এসআই নিয়ামত আলী গুলি করা বন্ধ করে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন এবং শেখ কামালকে বলেন, “স্যার ভুল হয়ে গেছে, আমরা ভেবেছি সিরাজের গাড়ি।” সাথে সাথে শেখ কামালকে ঢাকা মেডিকেল ও পরবর্তীতে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য ও সরকারি নথি: ঢাকার তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) মাহবুব উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং সিটি এডিশনাল এসপি আব্দুস সালাম ঘটনাটির বিস্তারিত তদন্ত করেন। এসপি মাহবুব পরবর্তীতে একাধিক সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন, “এটি সম্পূর্ণ পুলিশি ভুলের কারণে ঘটেছিল। পুলিশ সিরাজের গাড়ি মনে করে শেখ কামালের গাড়িতে গুলিবর্ষণ করে।”
ঘটনার পর এসপি মাহবুব নিজেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে উপস্থিত হয়ে পুলিশের ভুলের দায় স্বীকার করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, “তোর ভাবী শুনলে ভীষণ চটে যাবে। যারা গুলি করেছে তাদের আপাতত ক্লোজ করে রাখ। ক'টা দিন গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
গুজব সৃষ্টি ও রাজনৈতিক অপপ্রচার: গুজব সৃষ্টি ও রাজনৈতিক মিথ্যাচার: এই ঘটনাটিকে রাতারাতি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে তৎকালীন অতিবামপন্থী ও সরকারবিরোধী কিছু গোষ্ঠী ও গণমাধ্যম। এই গুলিবর্ষণের ঘটনাটি ব্যাংক পাড়া বা মতিঝিলের কাছাকাছি (কাকরাইল-পল্টন এলাকায়) ঘটায় তৎকালীন বিরোধী দলগুলো এটিকে প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করে।
জাসদের মুখপত্র কবি আল মাহমুদ সম্পাদিত 'দৈনিক গণকণ্ঠ' এবং মওলানা ভাসানী ও মশিউর রহমান যাদু মিয়া পরিচালিত 'হক কথা' পত্রিকা দুটি পরদিন বানোয়াট শিরোনাম প্রকাশ করে "প্রধানমন্ত্রীর পুত্র শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত"।
দৈনিক ইত্তেফাক ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর এবং তার পরবর্তী দিনগুলোতে দৈনিক যে খবর ছাপে, তার মূল বক্তব্য ছিল: “সিরাজের গাড়ি ভেবে শেখ কামালের গাড়িতে পুলিশের গুলিবর্ষণে শেখ কামাল গুলিবিদ্ধ হয়।” “শেখ কামালের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।”
“একটি মাইক্রোবাসে করে শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা যাওয়ার সময় পুলিশের টহল দলের (কিবরিয়া বাহিনী) সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়। পুলিশ গাড়িটিকে সিরাজের বাহিনী সন্দেহ করে গুলি চালালে শেখ কামাল পায়ে ও কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন। পরে ভুল ভেঙে গেলে পুলিশই তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।“
কিন্তু পরবর্তীতে রাষ্ট্রবিরোধী গাদ্দার জামায়াতে ইসলামী ও বিভিন্ন জঙ্গি মাওবাদী গ্রুপের সমর্থকরা ওই গণকণ্ঠের নিউজকেই অপপ্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং এখনো ব্যবহার করে আসছে।
যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সুরক্ষিত রাষ্ট্রীয় ভল্ট ভাঙতে বিশাল বিস্ফোরক বা ভারি যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। শেখ কামালের গাড়িতে কোনো ধরনের তালা ভাঙার যন্ত্র, চাবি বা চুরির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। শেখ কামাল ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র, মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর কর্মকর্তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা। ব্যক্তিগত বা আর্থিক কোনো কারণেই গভীর রাতে ব্যাংক ডাকাতি করার কোনো প্রয়োজনীয়তা তাঁর ছিল না।
মিথ্যাচার #১৫ - শেখ কামাল কি মেজর ডালিমের স্ত্রী নিম্মীকে অপহরণ ও ধর্ষণ করেছিলেন?
শেখ কামালের নামে সবচেয়ে কুখ্যাত ও রসালো যে অপপ্রচারটি বাজারে চালানো হয়েছিল, তা হলো তিনি নাকি শরীফুল হক ডালিমের স্ত্রী নিম্মীকে ঢাকা লেডিস ক্লাব থেকে অপহরণ করেছিলেন! রসালো গল্প পছন্দ করা একশ্রেণীর ধর্মান্ধ বাঙালি সমাজে এই মিথ্যা অপপ্রচারটি দীর্ঘদিন ছড়িয়ে রাখা হয়।
সত্য ঘটনা ও ইতিহাসের দলিল: স্বয়ং মেজর ডালিম (যে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘাতক হয়েছিল) তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি'-তে এই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে গেছেন। ডালিমের নিজের লেখা বইতেই শেখ কামালের নির্দোষ হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে:
ঘটনার পটভূমি: ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ঢাকার ধানমন্ডি লেডিজ ক্লাবে মেজর শরীফুল হক ডালিমের খালাতো বোন তাহমিনার (পরবর্তীতে যার সাথে কর্নেল রেজার বিবাহ হয়) বিয়ে উপলক্ষে এক নৈশ সংসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবারসহ অন্যান্য সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পরিবার।
অনুষ্ঠানে ডালিমের কানাডা ফেরত শ্যালক বাপ্পির বড় চুল টানা এবং আসন গ্রহণ নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার দুই কিশোর ছেলের সাথে কথা কাটাকাটি বাক্যবিতণ্ডা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই তর্কবিতর্ক চরম উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং হাতাহাতি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ডালিমের স্ত্রী তাহমিনা হাসান নিম্মী ও শ্যালক বাপ্পি কর্তৃক গাজী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ও দুই ছেলে অপমান ও শ্লীলতাহানীর শিকার হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ডালিমের পরিবার এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত বেশিরভাগ অতিথি সামরিক পরিবারের হওয়ায় গাজী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ও ছেলেদের চরম অপমান ও কটুবাক্যের শিকার হতে হয়।
গাজী গোলাম মোস্তফা এই অনুষ্ঠানে ছিলেন না, কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলেদের শ্লীলতাহানীর কথা শুনে তার লোকজন নিয়ে মাইক্রোবাসে লেডিজ ক্লাবে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন এবং অস্ত্রের মুখে মেজর ডালিম, তার স্ত্রী নিম্মী, শ্যালক বাপ্পি এবং তাঁদের এক খালাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। অপহরণের পর গাজী গোলাম মোস্তফা তাঁদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে নিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপ: বঙ্গবন্ধু উভয়পক্ষের বক্তব্যে পুরো ঘটনাটি শুনে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ডালিমদের মুক্ত করে দেন। একই সাথে গাজী গোলাম মোস্তফাকে শাসিয়ে উভয়পক্ষকে তিনি শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
এই ঘটনায় শেখ কামালের কোনো দূরতম সম্পৃক্ততাও ছিল না। কিন্তু ঘটনার পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্বাধীনতাবিরোধী গুপ্ত রাজাকার চক্র এবং মাওবাদী জাসদপন্থী প্রচারমাধ্যমগুলো এই ব্যক্তিগত বিরোধকে পুঁজি করে শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রটানো হয় যে, বঙ্গবন্ধু-পুত্র শেখ কামাল মেজর ডালিমের স্ত্রীকে অপহরণ কিংবা ধর্ষণ করার সাথে জড়িত ছিলেন। এই মনগড়া মিথ্যাচারটি এখনো বিএনপি ও জামায়াতের মিথ্যাবাদীরা ছড়িয়ে শেখ পরিবারের চরিত্রহনন করার চেষ্টা করে।
মিথ্যাচার #১৬ - শেখ জামাল কি সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণ জমা রেখেছিলেন?
শেখ জামাল ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্য সদস্যরা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণ জমা রেখেছেন এমন একটা কাল্পনিক প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর খুনীচক্র ও পরবর্তী সুবিধাভোগী সামরিক জান্তা সরকারের সময়। তারা শেখ কামাল ও শেখ জামালসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের চরিত্রহনন এবং তাদের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের কল্পকাহিনী ও অপপ্রচার চালিয়েছিল।
যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার চিরশত্রু জামায়াত-শিবির ও অন্যান্য জঙ্গিবাদী উগ্রবাদী দলগুলো রসিয়ে রসিয়ে প্রচার করে বিভিন্ন সময়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ লেফট্যানেন্ট শেখ জামালের সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বা স্বর্ণ জমা রাখার কোনো ঐতিহাসিক বা দাপ্তরিক প্রমাণ নেই। এটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি অপপ্রচার।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সেনা সমর্থিত ও পরবর্তী সরকারগুলো শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেশে-বিদেশে কোনো অবৈধ সম্পদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। তবে সুইজারল্যান্ড বা বিশ্বের অন্য কোনো ব্যাংকে শেখ জামাল বা বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য কারো নামে এ ধরনের কোনো অ্যাকাউন্টের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শেখ জামাল তাঁর মৃত্যুর আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা (লেফটেন্যান্ট) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে শহীদ হওয়া এই তরুণ সেনা কর্মকর্তার পক্ষে সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বা সোনা পাচার করার দাবিটি বাস্তবসম্মত নয়, বরং অসম্ভবও ছিল।
মিথ্যাচার #১৭ - বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কি সোনার মুকুট পড়ে ঘুরে বেড়াতেন?
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নাকি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে সোনার মুকুট তৈরি করেছিলেন এবং তা পরে ঘুরে বেড়াতেন এমন কুরুচিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন গুজব রটানো হয়েছিল জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকায়। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক একটি রাজনৈতিক অপপ্রচার ছিল।
প্রকৃতপক্ষে, সোনার মুকুটের এই গুজবটি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সাথে নয়, বরং মূলত ছড়ানো হয়েছিল তাঁর দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়েকে কেন্দ্র করে।
ঐতিহাসিক সত্য হলো, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ শেষ হওয়ার প্রায় ৭ মাস পর, ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে দুই ভাইয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয় (১৪ জুলাই শেখ কামাল এবং ১৭ জুলাই শেখ জামাল)।
বিয়েতে কোনো রাজকীয় আয়োজন বা সোনার মুকুটের ব্যবহার ছিল না। অতি উৎসাহী এক ধনী আত্মীয় বিয়ের উপহার হিসেবে রূপার ওপর সোনার জল করা একটি টোপর বা মুকুট উপহার দিয়েছিলেন।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের তথ্যমতে, বিয়েতে অনেক মূল্যবান উপঢৌকন আসলেও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এবং বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তার সিংহভাগই সরকারি তোষাখানায় জমা দেওয়া হয়। কেবল একটি সোনার নৌকা এবং একটি ছোট মুকুট স্মৃতিচিহ্ন বা প্রতীক (As a symbol) হিসেবে দম্পতিকে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এক নজরে অপপ্রচার বনাম ঐতিহাসিক সত্য
নিচে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং তার বিপরীতে ঐতিহাসিক সত্যের একটি প্রামাণিক সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হলো:
প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে গঠিত সারসংক্ষেপ টেবিল:
অপপ্রচার / মিথ্যাচার | অপপ্রচারের মূল দাবি | ঐতিহাসিক সত্য ও প্রকৃত তথ্য |
পাকিস্তান বিরোধী অবস্থান | তিনি পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন না, কেবল প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন বা বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন। | ৬ দফা ও ৭০-এর গণম্যান্ডেটের মাধ্যমে কৌশলগত ও গণতান্ত্রিক উপায়ে স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করেন এবং ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার স্পষ্ট ঘোষণা দেন। |
রাষ্ট্রপতি / সরকারপ্রধান নির্বাচন | মুক্তিযুদ্ধের পর তাজউদ্দীন বা ভাসানীকে বাদ দিয়ে নিজেই ক্ষমতার শীর্ষে বসেন। | ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের সাংবিধানিক কাঠামো এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ধারাবাহিকতায় তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত হন। |
বাকশাল গঠন | আজীবন ক্ষমতায় থাকা ও একদলীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত। | যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক সংকট, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, অরাজকতা, অস্ত্র চোরাচালান ও উগ্রপন্থীদের সশস্ত্র সহিংসতা রুখতে নেওয়া সাময়িক সর্বজনীন জাতীয় ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম। |
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অস্ত্র স্থানান্তর | ভারতীয় বাহিনী অন্যায়ভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে গেছে। | আন্তর্জাতিক নিয়মে বিজয়ী যৌথ বাহিনীর (ভারতীয় সেনা) কাছে পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে। তৎকালীন ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল দেশে বিপুল অস্ত্র থাকলে তা উগ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে গিয়ে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতো। |
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ | ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য শেখ মুজিব সরাসরি দায়ী। | মূল কারণ ছিল ১৯৭১-এর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি, ১৯৭৪-এর ভয়াবহ বন্যা, মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক অবরোধ (PL-480 বন্ধ), উগ্রপন্থীদের খাদ্য লুট এবং আন্তর্জাতিক অপপ্রচার ও অসহযোগিতা। |
দুর্ভিক্ষের মধ্যে সন্তানদের বিয়ে | ১৯৭৪ সালের মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের মধ্যে শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ে দেওয়া হয়। | ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ শেষ হয় ১৯৭৪ সালের শেষে; আর শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রায় ৮ মাস পর, ১৯৭৫ সালের ১৭ই জুলাই। |
জাসদ নেতাকর্মী হত্যা | শেখ মুজিবের নির্দেশে ৩০,০০০ জাসদ কর্মীকে হত্যা করা হয়। | জাসদের সশস্ত্র শাখা 'গণবাহিনী'র সহিংসতা ও থানা-ব্যাংক আক্রমণের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ৩০ হাজার নিহতের দাবিটি ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত। |
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভাতা গ্রহণ | ৯ মাস পাকিস্তানে বন্দি থাকাকালে শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবার পাকিস্তান সরকারের ভাতা পেতেন। | শেখ মুজিব মিয়ানওয়ালি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি ছিলেন এবং তাঁর পরিবার ঢাকায় কড়া পাহারা ও চরম কষ্টে দিন কাটাতেন। ভাতার দাবিটি সম্পূর্ণ অবাস্তব গুজব। |
"চোরের খনি" উক্তি | "সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি"—উক্তিটি ব্যর্থতার প্রকাশ ও দুর্নীতির প্রমাণ। | এটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে তাঁর সততা, ক্ষোভ ও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ। পরবর্তী সামরিক অনুসন্ধানেও তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোনো গোপন সম্পদ মেলেনি। |
২৫শে মার্চের রাতে অবস্থান | ২৫শে মার্চ রাতে আত্মগোপন না করে তিনি স্বেচ্ছায় 'আত্মসমর্পণ' করেছিলেন। | সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা কমানো, স্বাধীনতা আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে 'বিচ্ছিন্নতাবাদ' হিসেবে চিহ্নিত হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং স্বাধীনতার বার্তা প্রচারের পরই কৌশলগত গ্রেফতার বরণ করেন। |
কেবল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা | তিনি কেবল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, বাঙালিদের স্বাধীনতা চাননি। | ২৪ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম (৬ দফা, আগরতলা মামলা) ছিল স্বাধীনতার রূপরেখা। ৭০-এর নির্বাচন ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বাধীনতার দাবির আইনি বৈধতা (Legal Mandate) অর্জনের পদক্ষেপ। |
২৫ বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি | ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি ছিল একটি "গোলামি চুক্তি"। | জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে গঠিত সমমর্যাদাপূর্ণ চুক্তি। চুক্তির মেয়াদ (২৫ বছর) ১৯৯৭ সালে শেষ হওয়ার আগেই ১২ মার্চ ১৯৭২ সালেই ভারতীয় সেনা বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল। |
সেনাবাহিনী বিলুপ্তির অপপ্রচার | রক্ষীবাহিনী গঠন করে সেনাবাহিনী ধ্বংস বা প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। | রক্ষীবাহিনী ছিল ১৬,০০০ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ প্যারামিলিটারি ফোর্স। বিপরীতে ৫০,০০০+ সদস্যের সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং মিগ-২১ যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ইত্যাদি সংযোজন করা হয়। |
শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতি | শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। | বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের অরাজকতা রুখতে পুলিশের টহল দলকে সহায়তা করতে গিয়ে গোলাগুলিতে তিনি আহত হন, যা পরবর্তীতে ব্যাংক ডাকাতির মিথ্যা গুজব হিসেবে ছড়ানো হয়। |
এসব গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য কী?
এই গুজব ও মিথ্যাচারগুলো ছড়ানোর পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য রয়েছে। এই উদ্দেশ্যগুলো বহুস্তরিক। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধ্বংস করাই অপপ্রচারকারীদের প্রধানতম লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করতে হলে এর মূল নেতা এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আঘাত করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করা: শেখ মুজিবকে ব্যর্থ, দুর্বল, দুর্নীতিপরায়ণ বা স্বৈরাচারী প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে জাতির কাছে স্বাধীনতার স্থপতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা: যদি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ভুল বা দুর্বল প্রমাণ করা যায়, তবে পুরো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। যেমন, ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো, গণহত্যার ভয়াবহতা লঘু করে মুক্তিযুদ্ধের ন্যায্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আঘাত: মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এই গুজবগুলো ছড়িয়ে তারা দেশের মানুষকে আদর্শিকভাবে বিভক্ত করতে চায়।
ইতিহাসের দায় লঘু করা: একাত্তরের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াত ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা দায়ী। বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে তারা নিজেদের ঐতিহাসিক অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পেতে চায়।
পাকিস্তান প্রীতি জাগিয়ে তোলা: পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে পুনরায় পাকিস্তানপন্থী আদর্শ বা ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার ঘটাতে চায়।
ক্ষমতা দখলের পথ তৈরি: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে শুরু হওয়া সামরিক শাসন ও পাকিস্তানপন্থীদের রাজনৈতিক উত্থান মূলত এই মিথ্যাচারের ওপর ভর করেই টিকে ছিল। গুজব ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে অস্থিরতা ও অনাস্থা সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করাই ছিল তাদের কৌশল।
তারুণ্যের বিভ্রান্তি: নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে তাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে আনা হয়। এতে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
ইতিহাস রক্ষায় তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধ
বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ছড়ানো এসব গুজব ও মিথ্যাচারগুলো কেবল রাজনৈতিক বিদ্বেষের ফসল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ।
আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্প এবং ঐতিহাসিক দলিলগুলোর ভিত্তিতে এই প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, এই মিথ্যাচারগুলোকে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা। শেখ মুজিব ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নন, আপোষহীন স্বাধীনতার নেতা। তাজউদ্দীন তাঁকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি অস্ত্র দেশের নিরাপত্তার জন্য ভারত নিয়ে গিয়েছিল। দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল বন্যা ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, তাঁর ছেলের বিয়ে হয়েছিল দুর্ভিক্ষের অনেক পরে। এবং ৩০ হাজার জাসদ কর্মীকে হত্যার দাবিটি চরমভাবে অতিরঞ্জিত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই আমরা ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে পারি।
তথ্যসূত্র:
১. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (UPL)।
২. মঈদুল হাসান, মূলধারা '৭১, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (UPL)।
৩. Siddiq Salik, Witness to Surrender, Oxford University Press, 1977.
৪. Gary J. Bass, The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide, Vintage Books, 2013.
৫. ইউনেস্কো (UNESCO): "Memory of the World Register" (২০১৭ সালে ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতিসংক্রান্ত দলিল)।
৬. ইন্সট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার (Instrument of Surrender): ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল।
৭. Amartya Sen, Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation, Oxford University Press, 1981 (Chapter 6: "The Great Bengal Famine and Bangladesh Famine of 1974")।
৮. দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলা: ১৮ জুলাই ১৯৭৫ সংখ্যা (১৭ জুলাই ১৯৭৫ তারিখে অনুষ্ঠিত শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ের বিস্তারিত সংবাদ ও ছবি)।
৯. Fact Watch (ফ্যাক্ট-ওয়াচ): "১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে শেখ কামালের বিয়ের অপপ্রচার সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন"।














