>

>

সাধারণ ক্ষমার মাশুল ও বঙ্গবন্ধুর শেষের দিনগুলি - জাতির রক্তাঙ্কিত অধ্যায়

সাধারণ ক্ষমার মাশুল ও বঙ্গবন্ধুর শেষের দিনগুলি - জাতির রক্তাঙ্কিত অধ্যায়

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

TruthBangla

সাধারণ ক্ষমার মাশুল ও বঙ্গবন্ধুর শেষের দিনগুলি - জাতির রক্তাঙ্কিত অধ্যায়

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে পা রাখার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে এক বিশাল ও গভীর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, যেখানে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল, সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি যেন কেবল একজন প্রথাগত রাষ্ট্রনায়ক বা রাজনৈতিক নেতা থাকেননি; তিনি রূপান্তরিত হয়েছিলেন এক চরম মানবতাবাদী ও দার্শনিক রাষ্ট্রপুরুষে।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লাখেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে তিনি বারবার পরম মমতায় ও গভীর বেদনায় বলেছিলেন-

“বাঙালির অনেক রক্ত গেছে, আমি আর রক্তপাত দেখতে চাইনে।”

এই এক বাক্যের গভীর মানবিক উচ্চারণই ছিল স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর গৃহীত প্রধান নীতিমালার মূল চালিকাশক্তি। তিনি চেয়েছিলেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধজর্জর সহিংসতা এবং বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর সত্য হলো, রাজনীতির ময়দানে সর্বজনীন ক্ষমা কিংবা অতিরিক্ত মহানুভবতা অনেক সময় চরম কালসাপে পরিণত হয়।

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

সাধারণ ক্ষমা ও কালসাপের পুনরুত্থান: একটি ভুলের মাশুল

১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সরকার 'দালাল আইন' (Collaborators Act 1972) প্রণয়ন করে স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেন। তবে ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে দেশজুড়ে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং সামাজিক নিরাময়ের (Social Healing) উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু জঘন্য অপরাধ (যেমন গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট) ব্যতীত সাধারণ রাজাকার-আলবদরদের জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ (General Amnesty) ঘোষণা করা হয়।

এই ক্ষমার ফলে প্রায় ২৫ হাজার আটককৃত রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী মুক্ত আলো-বাতাসে বেরিয়ে আসে। দুর্ভাগ্যবশত, মুক্ত হওয়া এই রাজাকারেরা ছিল তৎকালীন সমাজের তথাকথিত ‘এলিট’ বা সুবিধাবাদী শ্রেণির অংশ। কেবল সাধারণ রাজাকারেরাই নয়, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে সরাসরি সহযোগিতা করা বহু উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা এবং বিচারকও বঙ্গবন্ধুর ক্ষমা ও উদারতার সুযোগ নিয়ে তাদের পুরনো সরকারি চাকরিতে পুনর্বাসিত হয়।

সাধারণ ক্ষমার পরিণতি ও প্রশাসনিক পুনরুত্থান

১. প্রায় ২৫,০০০ এলিট রাজাকার ও আলবদর সদস্যের নিঃশর্ত মুক্তি।
২. পাকিস্তানপন্থী আমলা, বিচারক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক পদে বহাল।
৩. রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে স্বাধীনতাবিরোধী 'ফিফথ কলাম' (Fifth Column)-এর সৃষ্টি।
৪. গোপন অপপ্রচার ও সরকারবিরোধী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পুনরুত্থান।

আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো জাতি যখন রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পরাজিত শত্রু ও তাদের দোসরদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিকভাবে পুরোপুরি দেউলিয়া করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই অপশক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে 'ফিফথ কলাম' (Fifth Column) হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমা করার পর ঐসব দেশদ্রোহী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে মনে নতুন সাহস সঞ্চয় করেছিল। তারা আমলাতন্ত্র, খাদ্য বিভাগ, সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ছদ্মবেশ ধারণ করে শেখ মুজিব এবং তাঁর সরকারকে ধাপে ধাপে নিঃসঙ্গ ও ব্যর্থ প্রমাণ করার বিষাক্ত নীলক নকশা প্রণয়ন করতে থাকে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ: ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক অসম্ভব লড়াই

১৯৭২ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বঙ্গবন্ধু সরকার যে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়েছিল, তা কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্র ছিল না; তা ছিল এক মহাশ্মশান ও ধ্বংসস্তূপ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে যাওয়ার পর এই দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে শত বছর পেছনে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল।

অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের চিত্র

যোগাযোগ ব্যবস্থা: দেশের ৩ শতাধিক রেলসেতু, সড়ক সেতু ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরে মাইন পুঁতে এবং জাহাজ-লঞ্চ ডুবিয়ে জলপথ পুরোপুরি অচল করে রাখা হয়। (পরবর্তীতে রিয়ার অ্যাডমিরাল জুরেনকোর নেতৃত্বে সোভিয়েত নৌবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ করে)।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি: গ্রামের পর গ্রাম আগুনে ভস্মীভূত করা হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে ১৯৭১ সালে চাষীরা মাঠে ফসল ফলাতে পারেনি। ফলে দেশের খাদ্যভাণ্ডার বা ধানের গোলাগুলো ছিল শূন্য।

শরণার্থী সংকট: ভারত থেকে ফিরে আসা প্রায় এক কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের মাথার ওপর ছাদ ছিল না। লুটপাটকারীরা তাদের বাড়িঘর, গবাদিপশু ও পরনের কাপড় পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছিল।

আর্থিক দেউলিয়াত্ব: সরকারি চালের গুদামগুলো ছিল দগ্ধ ও লুণ্ঠিত। ব্যাংক থেকে আগের সরকারের আমলে পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের নেওয়া ওভারড্রাফটের কোনো হদিস ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল একেবারে শূন্য।

এই অভূতপূর্ব ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মধ্যে খাদ্য ও অর্থ সাহায্য পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করা ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের সামনে কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। সে সময় ঢাকাস্থ অনেক অভিজ্ঞ বিদেশী সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়ে বলেছিলেন যে, চরম অনাহার ও খাদ্যসংকটে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অন্তত এক কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

কিন্তু সেই কোটি মানুষের মৃত্যুর মুখ থেকে দেশকে রক্ষা করে দাঁড়িয়েছিলেন কেবল একজন মানুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর কাছ থেকে দ্রুত ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করার ফলেই সেই কোটি মানুষের সম্ভাব্য প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল।

ভারত-বিরোধীতার রাজনীতি: অপপ্রচারের পুরনো বিষাক্ত হাতিয়ার

পাকিস্তান আমলে ২৪ বছর ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক টিকিটের একমাত্র সর্বরোগের দাওয়াই বা কৌশল ছিল "ভারত- বিরোধিতা"। যেকোনো ন্যায্য দাবি, অধিকার বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে তারা 'ভারতের ষড়যন্ত্র' বলে চালিয়ে দিত। ১৯৭২ সালের শুরু থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত শক্তি এবং কতিপয় অতি-বাম ও চরমপন্থী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে সেই একই পুরনো হাতিয়ার পুনঃব্যবহার করতে শুরু করে।

অথবা, কিছুদিন আগেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে যে ভারতের সাধারণ মানুষ ও সরকার এক কোটি বাঙালিকে আশ্রয় দিয়েছিল, রক্ত দিয়ে মিত্রবাহিনীর জওয়ানরা আমাদের সাথে জীবন উৎসর্গ করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম বিদ্বেষ ছড়ানো শুরু হয়।

অপপ্রচারের মূল লক্ষ্যসমূহ:

মিত্রবাহিনীর নামে মিথ্যাচার: ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও ত্রাণ সামগ্রী ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে বিভ্রান্তিকর গুজব ছড়ানো।

বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করা: বঙ্গবন্ধু যেহেতু ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী ও বন্ধুত্বের মূল প্রতীক ছিলেন, তাই ভারত-বিরোধী হাওয়া জোরালো করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভিত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে দুর্বল করা।

সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প পুনরুজ্জীবিত করা: অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবধারার ধর্মীয় উন্মাদনা ফিরিয়ে আনা।

স্বাধীনতার শত্রুরা অনুধাবন করেছিল যে, বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি আক্রমণ করার আগে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের সাথে তাঁর প্রগাঢ় বন্ধুত্বকে জনগণের চোখে সন্দেহজনক করে তুলতে হবে। এই বিষাক্ত অপপ্রচার পরবর্তীতে সরকারবিরোধী তরুণ সমাজ ও অসন্তুষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের মনোজগতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

১৯৭৪ এর কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ: ভূ-রাজনীতি, সিআইএ ও খাদ্য-অস্ত্রের নিষ্ঠুর খেলা

১৯৭৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যা এবং পরবর্তী দুর্ভিক্ষ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়। সরকারি হিসাবে সে সময় প্রায় ২৭ হাজার মানুষ অনাহারে ও মহামারীতে মারা যায়। কিন্তু এই দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করেছিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র।

আমেরিকার ‘খাদ্য-অস্ত্র’ (Food as a Weapon) ও সিআইএ-র ভূমিকা: ১৯৭৪ সালে যখন বাংলাদেশ মারাত্মক খাদ্যসংকটে পড়ে, তখন আমেরিকার কাছ থেকে পিএল-৪৮০ (PL-480) চুক্তির আওতায় খাদ্যশস্য পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও আমেরিকার প্রশাসন বাংলাদেশকে শাস্তি দেওয়ার জন্য খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেয়। আমেরিকার অহেতুক অজুহাত ছিল বাংলাদেশ তৎকালীন কিউবার কাছে কিছু পাট ও চটের থলে রপ্তানি করেছে!

আমেরিকার মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক ও জোটনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে প্রমাণিত যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) চালিত কয়েকটি তথাকথিত আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মধ্যে বিতরণের নাম করে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ চাল কিনে নেয়। পরবর্তীতে সেই চাল ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে না পৌঁছে নদী কিংবা সমুদ্রে ফেলে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যাতে শেখ মুজিব সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়।

অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত-মোমেন খান ও মারুফ মোর্শেদ চক্র: বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকট থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অত্যন্ত কষ্টে প্রায় ৬ লক্ষ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করেছিলেন সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করার জন্য। কিন্তু এই খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন এমন দুজন ব্যক্তি, যারা ছিলেন মনে-প্রাণে স্বাধীনতাবিরোধী।

১. আবদুল মোমেন খান: খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব। তিনি ছিলেন সাবেক ইপিসিএস (EPCS) কর্মকর্তা এবং মুসলিম লীগের অন্ধভক্ত সমর্থক।
২. ইঞ্জিনিয়ার মারুফ মোর্শেদ: খাদ্য পরিদপ্তরের সাইলো পরিচালক। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন আলবদর বাহিনীর সক্রিয় সদস্য।

এই মোমেন খান এবং মারুফ মোর্শেদ স্বাধীনতাবিরোধীদের ‘পেইড এজেন্ট’ হিসেবে দুর্ভিক্ষকে প্রখর রূপ দিতে মূল ভূমিকা পালন করেন। তারা চরম চতুরতার সাথে যেখানে তীব্র খাদ্যাভাব ছিল (যেমন কুড়িগ্রাম, রংপুর, জামালপুর), সেখানে খাদ্যশস্য না পাঠিয়ে অপ্রয়োজনীয় স্থানে সরবরাহ করতেন। খাদ্যশস্য গুদামে পচানো এবং আত্মসাতের মাধ্যমে তারা কৃত্রিম আকাল তৈরি করেন।

অপকর্মের রাজনৈতিক পুরষ্কার

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যখন জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি এই জঘন্য অপকর্মের পুরষ্কারস্বরূপ সাবেক খাদ্যসচিব আবদুল মোমেন খানকে সরাসরি তাঁর সরকারের খাদ্যমন্ত্রী বানিয়েছিলেন! অপরদিকে, মোমেন খানের সহযোগী আলবদর সদস্য মারুফ মোর্শেদকে পদোন্নতি দিয়ে খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক (DG Food) করা হয়।

পরবর্তীতে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও মোমেন খানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁর পুত্র ড. মঈন খানকে তাঁর মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ইতিহাসই বলে দেয় ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ কতটা পরিকল্পিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।

ঘরের শত্রু বিভীষণ: আমলাতান্ত্রিক তোষণ, ‘চাটার দল’ ও মোশতাক-মঈন খানদের ভূমিকা

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে কেবল আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তই নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর সুবিধাবাদী মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় নেতাদের সীমাহীন লোভ ও দুর্নীতি বড় ভূমিকা রেখেছিল।

বঙ্গবন্ধু যখন বিশ্বময় ঘুরে ঘুরে দেশের মানুষের খাদ্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন, তখন তাঁরই দলের ভেতরে থাকা একশ্রেণীর চোর-কারবারি ও কালোবাজারি সেই ত্রাণ সামগ্রী বিদেশে পাচার ও চুরি করছিল। ক্ষোভে, দুঃখে ও চরম হতাশায় ভেঙে পড়ে বঙ্গবন্ধু সে সময় তাঁর ঐতিহাসিক ও বহুল আলোচিত আক্ষেপটি করেছিলেনL

“সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি! দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে আমি ভিক্ষা করে আনি, আর চাটার দল সেগুলো চেটে চেটে খায়।”

মোশতাক ও ফণিভূষণ মজুমদারের দায়িত্বহীনতা

১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও ফণিভূষণ মজুমদার।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ: তিনি ছিলেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানিসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী। ১৯৭৩ সালে দেশজুড়ে যখন আগাম বন্যা দেখা দেয়, তখন মোশতাক কোনো কার্যকরী বন্যা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির সুযোগ করে দেন।

ফণিভূষণ মজুমদার: তিনি ছিলেন খাদ্য ও বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী। বন্যা-পরবর্তী সময়ে খাদ্য মজুদ ও সুষ্ঠু বণ্টন নীতি গ্রহণে তিনি ছিলেন চরমভাবে ব্যর্থ ও উদাসীন।

এই দুই মন্ত্রী তাঁদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও চক্রান্তের মাধ্যমে দেশের খাদ্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি গিয়ে পড়েছিল জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাঁধে।

লবণের কৃত্রিম সংকট ও আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তের প্রমাণ

আমলাতন্ত্রের এক বড় অংশ কীভাবে সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজ নস্যাৎ করত, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ১৯৭৪ সালের শুরু দিকের ‘লবণের সংকট’।

হঠাৎ করে সারা দেশে লবণের চরম হাহাকার পড়ে যায়। প্রতি সের লবণের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় ৬০ টাকায় (যা তৎকালীন সময়ে ছিল আকাশচুম্বী)। অথচ সে সময় চট্টগ্রাম বন্দর ও গুদামগুলোতে হাজার হাজার টন লবণ মজুদ ছিল। বঙ্গবন্ধু যখন এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আমলাদের কৈফিয়ত তলব করলেন, তখন আমলারা এক অজুহাত খাড়া করে বললেন:

"রেলওয়ের ওয়াগনের (Wagon) চরম অভাব, তাই চট্টগ্রামে লবণ থাকা সত্ত্বেও তা সারাদেশে পাঠানো যাচ্ছে না।"

বঙ্গবন্ধু আমলাদের এই খোঁড়া অজুহাতে ভরসা না রেখে নিজেই সরাসরি লবণের সরবরাহ তদারকির দায়িত্ব নেন। তিনি জরুরি ভিত্তিতে দেশের সমস্ত রেল-ওয়াগন ‘রিকুইজিশন’ (Requisition) করার নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপে চট্টগ্রামের গুদামজাত লবণ মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে সারা দেশে পৌঁছে যায় এবং লবণের দর স্বাভাবিক অবস্থায় নেমে আসে।

কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছিল। আমলাদের ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করার এই কৌশলে ততদিনে মুজিববিরোধী চক্র লবণের এই সংকটকে পুঁজি করে গ্রামের সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে সরকারবিরোধী তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

একজন নিঃসঙ্গ রাষ্ট্রনায়কের রক্তক্ষরণ ও অশ্রু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির পিতা। দেশের মানুষের অনাহার ও কষ্ট তাঁকে কতটা গভীরভাবে ব্যাকুল করত, তা তৎকালীন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গবন্ধু অনেক রাতে ঘুমোতে পারতেন না। সিগার (চুরুট) মুখে নিয়ে তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনের বারান্দায় সারা রাত ব্যাকুল হয়ে পায়চারি করতেন। দেশের মানুষের এই দুর্দশা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি খাদ্যমন্ত্রী মোমেন খানকে ডেকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন:

“কিছুই লুকিয়ো না। না খেতে পেয়ে আমার বাংলার কত লোক মরেছে, তার সত্য হিসাব জাতীয় সংসদে পেশ করো।”

একজন রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি সত্য গোপন করতে চাননি। তিনি চাননি মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখিয়ে রাজনীতি করতে। পরবর্তীতে তিনি যখন নিজে সরাসরি দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা সফরে যান, তখন কুড়িগ্রাম ও রংপুরের হাড্ডিসার ক্ষুধাক্লিষ্ট মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে শিশুদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন। মানুষের এই অসীম কষ্ট ও নিজের সরকারের লোকজনের দুর্নীতি দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরম দেশপ্রেমিক শেখ মুজিব নাকি সে সময় পরিজনদের কাছে আক্ষেপ করে আত্মহত্যার চিন্তার কথাও প্রকাশ করেছিলেন!

আইনের শাসন ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে, একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন চারপাশের চক্রান্ত, আমলাতান্ত্রিক অন্তর্ঘাত এবং সহকর্মীদের বিশ্বাসঘাতকতায় ঘেরাও হয়ে পড়েন, তখন তাঁর ভেতরের মহানুভবতা ও দেশপ্রেম এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যিক রূপ নেয়। বঙ্গবন্ধুর শেষের দিনগুলো ছিল তেমনই এক অসীম নিঃসঙ্গতা ও বেদনার গল্প।

এক নজরে বঙ্গবন্ধুর শেষ মেয়াদের সংকট, আমলাতান্ত্রিক অন্তর্ঘাত ও প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্ত

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের (১৯৭২-১৯৭৫) সংকটের মূল ক্ষেত্রসমূহ, নেপথ্যের অনুঘটক এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সংক্ষেপে সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সংকটের ক্ষেত্র

মূল অনুঘটক/ষড়যন্ত্রকারী

অন্তর্ঘাত ও অপপ্রচারের প্রকৃতি

দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

১. সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসন

২৫,০০০ রাজাকার, আলবদর ও প্রোপাক আমলা/পুলিশ।

সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর অবস্থান নিয়ে 'ফিফথ কলাম' হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র।

স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডির পথ সুগম হওয়া।

২. ভারত-বিরোধী অপপ্রচার

পরাজিত পাকিস্তানি দোসর ও চরমপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি ও সাহায্য নিয়ে মিথ্যা গুজব ছড়ানো; বঙ্গবন্ধুকে ভারতের মুখাপেক্ষী প্রমাণ করার চেষ্টা।

মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার অবক্ষয় এবং জনগণের একটি অংশের মধ্যে সরকারবিরোধী মনস্তত্ত্ব তৈরি।

৩. ১৯৭৪-এর কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ

- আমেরিকা (PL-480 আটক)



- খাদ্যসচিব মোমেন খান



- সাইলো পরিচালক মারুফ মোর্শেদ

খাদ্যশস্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি, অযোগ্য স্থানে চাল প্রেরণ, সিআইএ কর্তৃক চাল কিনে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া।

২৭,০০০ মানুষের প্রাণহানি; বিশ্বমঞ্চে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া এবং পরবর্তীতে ষড়যন্ত্রকারীদের রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার লাভ (জিয়া ও খালেদা জিয়া আমলে)।

৪. কৃত্রিম লবণ ও পণ্য সংকট

পাক-তোষামোদকারী আমলাতন্ত্র ও অসাধু ব্যবসায়ী।

চট্টগ্রাম বন্দরে লবণ থাকা সত্ত্বেও ওয়াগন সংকটের অজুহাতে দাম ৬০ টাকায় তোলা; ফাইল আটকে রাখা।

গ্রামীণ সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি এবং বঙ্গবন্ধুর উন্নয়নমূলক কাজগুলোকে ধীরগতির করে দেওয়া।

৫. অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি

ক্ষমতাসীন দলের একাংশ (সুবিধাবাদী এমপি ও নেতা ‘চাটার দল’)।

ত্রাণ সামগ্রী চুরি, কালোবাজারি ও সীমান্ত দিয়ে ভারতে পণ্য পাচার; বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ: "আমি পেয়েছি চোরের খনি!"

শেখ মুজিব সরকারের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হওয়া এবং রক্ষীবাহিনী ও সরকারের নীতির ওপর জনআস্থা হ্রাস পাওয়া।

শূন্য থেকে শাসনতন্ত্র ও রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ

স্বাধীন বাংলাদেশে দেশ পরিচালনার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় সাড়ে তিন বছর (যথাযথভাবে প্রায় ৩ বছর ৫ মাস বা ৪৩ মাস) সময় পেয়েছিলেন। একটি নতুন রাষ্ট্রের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরিতে বঙ্গবন্ধু যে গতি ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

মাত্র ১০ মাসে সংবিধান উপহার (৪ নভেম্বর ১৯৭২): পৃথিবীর বহু দেশ স্বাধীনতার দশকের পর দশক পার করলেও একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি (উদাহরণস্বরূপ: পাকিস্তানের সংবিধান তৈরিতে সময় লেগেছিল ৯ বছর)। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মাত্র ৯ মাসের মাথায় গণপরিষদে সংবিধান খসড়া উত্থাপন করেন এবং ১৯৭২ সালের ৪ই নভেম্বর বাংলাদেশকে একটি বিশ্বমানের গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেন, যা কার্যকর হয় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে।

চার মূলনীতি: জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র (শোষণহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা), গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা।

শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কার

প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ: ১৯৭৩ সালে এক আদেশে বঙ্গবন্ধু দেশের ৩৭,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন এবং ১ লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারি করেন।

কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন: একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদাকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন: ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়, যাতে মুক্তবুদ্ধির চর্চা অব্যাহত থাকে।

প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩–১৯৭৮)

যেহেতু পাকিস্তানি অবাঙালি মালিকরা শিল্পকারখানার মূলধন ও নথিপত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, বঙ্গবন্ধু অর্থনীতিকে সচল করতে প্রধান প্রধান শিল্পকারখানা, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. নূরুল ইসলাম ও অধ্যাপক রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।

পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

বঙ্গবন্ধুর একক ব্যক্তিত্ব ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করে:

জাতিসংঘে ভাষণ (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪): জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করেন।

ওআইসি (OIC) সম্মেলন (১৯৭৪): পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (OIC) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM): ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা ছিল "বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।"

জাসদ, গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির তাণ্ডব ও অস্থিতিশীলতা

বঙ্গবন্ধুর সরকার যখন ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত, তখন স্বাধীনতার মূল চেতনাবিরোধী ও বিভ্রান্ত উগ্র-বামপন্থী দলগুলো দেশের অভ্যন্তরে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে।

জাসদ (JSD) ও 'গণবাহিনী'র সশস্ত্র তাণ্ডব: ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে ছাত্রলীগ ভেঙে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হয়। জাসদের সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে দেশজুড়ে চরম সহিংসতা শুরু করে। জাসদ গণবাহিনীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুট করে, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে, খাদ্য গুদামে আগুন দেয় এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করতে থাকে। ১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ জাসদের মিছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

সিরাজ সিকদার ও 'পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি': সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে 'সর্বহারা পার্টি' ব্যাংক ডাকাতি, হাটে-বাজারে সশস্ত্র হামলা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা করাকে তাদের বিপ্লবের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। তারা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছিল।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী (Jatiya Rakkhi Bahini) গঠন: স্বাধীনতার পর সারা দেশে প্রায় ১ লাখেরও বেশি অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে ছিল। পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা না থাকায় এসব উগ্রপন্থী, ডাকাত ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের দমন করতে ১৯৭২ সালে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়।

তবে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালাতে থাকে। তারা রটায় যে, সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে রক্ষীবাহিনীকে মূল বাহিনী করা হচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক গুজব সামরিক বাহিনীর তরুণ অফিসার ও জোয়ানদের মনে অসন্তোষ সৃষ্টিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

আমেরিকা-চীন অক্ষের বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন। পাকিস্তান ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এই দুই পরাশক্তি বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি।

হেনরি কিসিঞ্জারের 'তলাবিহীন ঝুড়ি' (Bottomless Basket) ন্যারেটিভ

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অঙ্গনে এক দেউলিয়া ও ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া ছিলেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় মার্কিন ‘খাদ্য-অস্ত্র’ (Food Weapon) নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভাতে মারার চেষ্টা করা হয়, যার বিস্তারিত আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি।

চীনের ভেটো (Veto) প্রয়োগ: চীন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের আবেদনের ওপর একাধিকবার ভিটো (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এর ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ পেতে বিলম্বিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা আইনি জটিলতায় পড়ে।

'দ্বিতীয় বিপ্লব' ও বাকশাল (BAKSAL): উদ্দেশ্য, বিভ্রান্তি ও প্রকৃত বাস্তবতা

১৯৭৪ সালের শেষদিকে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, চরমপন্থী সহিংসতা, অর্থনৈতিক চোরাচালান এবং প্রশাসনিক স্থবিরতায় দেশ যখন চরম সঙ্কটে, তখন বঙ্গবন্ধু প্রচলিত ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা আমূল বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এটিই ইতিহাসে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ এবং ‘বাকশাল’ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) নামে পরিচিত।

বাকশাল কী ছিল? ১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু সকল রাজনৈতিক দলকে একটি একক জাতীয় মঞ্চে রূপান্তর করে 'বাকশাল' গঠন করেন। এটি কোনো প্রথাগত একদলীয় একনায়কতন্ত্র ছিল না; এটি ছিল জাতীয় ঐক্যের একটি সাময়িকভাবে গঠিত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সামরিক কর্মকর্তা এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

বাকশালের মূল চার নীতি: ১. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: মহকুমাগুলোকে বিলুপ্ত করে দেশকে ৬০টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি জেলায় একজন করে 'জেলা গভর্নর' (District Governor) নিয়োগ দেওয়া হয়, যার অধীনে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষ সরাসরি শাসনকাজে অংশ নেবে। ২. বাধ্যতামূলক বহুমুখী সমবায় (Compulsory Cooperatives): জমির মালিকানা কৃষকেরই থাকবে, কিন্তু উৎপাদন ও যন্ত্রপাতি হবে যৌথ সমবায়ের অধীনে। উৎপাদিত শস্যের এক-তৃতীয়াংশ পাবে জমির মালিক, এক-তৃতীয়াংশ কৃষক/শ্রমিক এবং এক-তৃতীয়াংশ পাবে রাষ্ট্র। ৩. উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা: কেরানি তৈরির শিক্ষা বন্ধ করে কর্মমুখী শিক্ষা চালু করা। ৪. দুর্নীতি নির্মূল ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার: সাধারণ মানুষ যাতে স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত বিচার পায়, তার ব্যবস্থা করা।

ফলাফল ও ষড়যন্ত্রকারীদের আতঙ্ক: বাকশাল কর্মসূচি চালুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবারের মতো লবণের দাম কমে যায়, চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে আসতে থাকে, এবং ১৯৭৫ সালের গ্রীষ্মে দেশে রেকর্ড পরিমাণ বাম্পার ফলন হয়।

পরাজিত দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা অনুধাবন করেছিল যে, বাকশাল যদি পুরোপুরি সফল হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী ও পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বাকশাল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত মুহূর্তেই ঘাতক চক্র ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ ইতিহাসের কালরাত ও নারকীয় গণহত্যা

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের প্রাক্কালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন ছিল চিরদিনের মতোই অরক্ষিত ও সাধারণ। পরম ভালোবাসায় দেশবাসীকে বিশ্বাস করা বঙ্গবন্ধু নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে বরাবরই ছিলেন চরম উদাসীন।

কালরাতের নারকীয় ঘটনাবলী: ১৫ই আগস্টের সূর্য ওঠার আগেই মেজরের পোশাক পরা কিছু পথভ্রষ্ট সেনা কর্মকর্তা ও ঘাতক দল তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ চালায়।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর (বঙ্গবন্ধুর বাসভবন): ঘাতকেরা প্রথমে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালকে গুলি করে হত্যা করে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়।

এরপর ঘাতকেরা একে একে হত্যা করে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ জামাল, নবপরিণীতা দুই বধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরকে। ১০ বছরের অবোধ শিশু শেখ রাসেলের আকুতি "আমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে চলো" শুনে তাকে মায়ের মৃতদেহের কাছে নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

মিন্টো রোড ও আরজোপাড়া: তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোডের বাসভবনে আক্রমণ চালিয়ে তাঁকেও তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যসহ হত্যা করা হয়। যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে তাঁদের আরজোপাড়ার বাসায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (Indemnity Ordinance) ও বিচারহীনতার কালো অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। ১৫ই আগস্টের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার যাতে কোনোদিন না হতে পারে, সে জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইনি কলঙ্ক লেপন করা হয়।

মোশতাকের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ (Ordinance No. 50 of 1975) জারি করে। এই অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি ফারুক, রশীদ, ডালিম, শাহরিয়ারদের যে কোনো আইনি বিচার থেকে চিরতরে দায়মুক্তি (Immunity) দেওয়া।

জিয়াউর রহমানের আইনি বৈধতা ও ঘাতকদের পুরস্কৃত করা: ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের পর ক্ষমতায় আসা সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে কেবল টিকিয়েই রাখেননি, বরং ১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল জাতীয় সংসদে পঞ্চম সংশোধনীর (5th Amendment) মাধ্যমে এই অমানবিক অধ্যাদেশকে বাংলাদেশের সংবিধানে আইনি বৈধতা দান করেন।

আইন ও বিচারহীনতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি দেন এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে উচ্চপদে পদায়ন করেন:

খুনি ফারুক ও রশীদ: ফ্রিডম পার্টি গঠনের মাধ্যমে রাজনীতি করার সুযোগ প্রদান।
খুনি শরিফুল হক ডালিম, শাহরিয়ার, রশেদ চৌধুরী, নূর চৌধুরী, কিসমত হাশেম: চীন, লিবিয়া, সুদান, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া ও কেনিয়ার দূতাবাসে কূটনৈতিক পদে চাকরি ও পদোন্নতি।

দীর্ঘ ২১ বছর (১৯৭৫–১৯৯৬) বাংলাদেশে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের একটি এফআইআর (FIR) করার অধিকারও তাঁর পরিবার বা দেশের কোনো নাগরিকের ছিল না। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনি নীতি Rule of Law (আইনের শাসন) এবং মানবাধিকারের চরম লংঘন।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের সাফল্য, সংকট ও চক্রান্ত

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের (১৯৭২–১৯৭৫) গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী, এর নেপথ্য কারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বছর/সময়কাল

ঐতিহাসিক ঘটনা/পদক্ষেপ

নেপথ্য অনুঘটক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

১৯৭২ (মার্চ-নভেম্বর)

সংবিধান প্রণয়ন, ৩৭,০০০ স্কুল জাতীয়করণ ও রক্ষীবাহিনী গঠন।

পাকিস্তানি ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ; অস্ত্র উদ্ধারে রক্ষীবাহিনী গঠন।

মাত্র ১০ মাসে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সংবিধান লাভ।

১৯৭২–১৯৭৪

জাসদ গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র সহিংসতা ও থানা আক্রমণ।

অতি-বাম বিপ্লবী চিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারার বাইরের রাজনৈতিক অসন্তোষ।

দেশজুড়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও রক্ষীবাহিনীকে বিতর্কিত করা।

১৯৭৩ (আগস্ট)

আলজিয়ার্স ন্যাম (NAM) সম্মেলন ও ওআইসি (OIC) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ।

জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি; শোষিতের পক্ষে ঢাকার সুদৃঢ় অবস্থান।

বিশ্বমঞ্চে শেখ মুজিবের উচ্চ রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও আরব বিশ্বের স্বীকৃতি লাভ।

১৯৭৪ (জুলাই-আগস্ট)

কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও কিসিঞ্জারের 'খাদ্য-অস্ত্র' প্রয়োগ।

মার্কিন PL-480 জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়া; সচিব মোমেন খান ও সাইলো পরিচালক মারুফ মোর্শেদের সাবোটাজ।

২৭,০০০ মানুষের অনাহারে মৃত্যু; বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা।

১৯৭৫ (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি)

'দ্বিতীয় বিপ্লব' ও 'বাকশাল' (BAKSAL) গঠন।

চরম অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব, চোরাচালান ও উগ্র রাজনীতি দমনে জাতীয় ঐক্যের ডাক।

চাল ও লবণের দাম হ্রাস, বাম্পার ফলন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সূচনা।

১৯৭৫ (১৫ই আগস্ট)

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা ও বঙ্গমাতাসহ পরিবারের নারকীয় হত্যাকাণ্ড।

মোশতাক-ফারুক-রশীদ চক্র, সিআইএ (CIA) ও পরাজিত পাকিস্তানের যৌথ চক্রান্ত।

মুক্তিযুদ্ধের ধারার পতন; অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জায়গায় সামরিক ও ধর্মান্ধ শাসনের পুনরুত্থান।

১৯৭৫ (২৬ সেপ্টেম্বর)

খন্দকার মোশতাক কর্তৃক 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' জারি।

ঘাতকদের আইনি বিচার থেকে রক্ষা করা ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা।

বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির সূচনা (যা কার্যকর ছিল ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত)।

১৯৭৯ (৯ই এপ্রিল)

জিয়াউর রহমান কর্তৃক ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটিকে সংবিধানভুক্ত করা।

খুনিদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি ও দূতাবাসে পদায়ন করে রাজনৈতিক তোষণ।

সংবিধানে কালঙ্ক লেপন এবং ২১ বছর ধরে বিচার বিভাগকে অবরুদ্ধ রাখা।

ইতিহাসের শিক্ষা ও চিরঞ্জীব শেখ মুজিব

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল ১৯৭৫ সালের আগস্টে নেওয়া হয়নি। এর বীজ বপন করা হয়েছিল ১৯৭২ সালের সাধারণ ক্ষমার পরপরই, যখন পরাজিত পাকি-বান্ধব গোষ্ঠী ক্ষমা পেয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে নতুন করে শিকড় গজাতে শুরু করেছিল।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভুলটি ছিল শত্রু ও মিত্রকে চিনতে পেরেও শত্রু মনোভাবাপন্নদের প্রতি অতিরিক্ত সদয় হওয়া। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, পরম ভালোবাসায় ও ক্ষমার মহানুভবতায় বুঝি পাষাণ হৃদয়ও গলে যায়। কিন্তু কালসাপ তার বিষাক্ত দন্ত ত্যাগ করে না।

আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত, আমেরিকান সরকারের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিশোধ, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি, চাল ও লবণের বাজার অস্থির করা এবং নিজ দলের ভেতরের সুবিধাবাদীদের সীমাহীন লোভ সবকিছু মিলে বঙ্গবন্ধুর চারিদিকে এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই কালরাতে বাঙালি জাতিকে পিতৃহারা করেছিল।

তবে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যেসব মোমেন খান, মারুফ মোর্শেদ, খন্দকার মোশতাক কিংবা জিয়াউর রহমানেরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর গায়ে দাগ লাগাতে চেয়েছিল এবং ঘাতকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল, ইতিহাসের ডাস্টবিনে তারা আজ বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ঘৃণিত। আর সমস্ত অন্তর্ঘাত, ষড়যন্ত্র, দুঃখ ও বেদনার সমুদ্র পেরিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ কোটি বাঙালির হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ও অমর আলো হয়ে চির ভাস্বর।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 15, 2025

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 15, 2026

/

Post by

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

May 8, 2026

/

Post by

১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

Aug 15, 2025

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.