রাও ফরমান আলীর বর্ণনায় একাত্তরের ২৫শে মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং আত্মত্যাগের রক্তে রঞ্জিত এক মহা অধ্যায়। কালরাত্রির সেই অন্ধকার প্রহরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি মুক্তিকামী জাতিকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার এক নারকীয় ও নজিরবিহীন নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছিল, সামরিক পরিভাষায় যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা। ঢাকার গভর্নর হাউজ থেকে সামরিক কৌশল নিয়ন্ত্রণ, বুদ্ধিজীবী নিধনের নীলনকশা এবং সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চালনায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত তার বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ (How Pakistan Got Divided) বইয়ে তিনি ২৫শে মার্চের অপারেশন সার্চলাইটের প্রেক্ষাপট, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তহীনতা এবং অপারেশনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। তবে একজন প্রত্যক্ষ অপরাধী ও নীতিনির্ধারক হিসেবে তার বর্ণনায় যেমন স্থান পেয়েছে বাহিনীর ভেতরে থাকা ভয়, আশঙ্কা ও পরিকল্পনার নানা বিবরণ; তেমনি ফুটে উঠেছে আত্মপক্ষ সমর্থনের এক চরম অপচেষ্টা এবং বাস্তব গণহত্যার ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়ার ধৃষ্টতা। রাও ফরমান আলীর লিখিত গ্রন্থ ও ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে একাত্তরের ২৫শে মার্চের সেই ভয়াল ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক চালচিত্র এবং পরবর্তীতে সংঘটিত সত্যের অপলাপের এক বিস্তারিত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো।

How Pakistan Got Divided বইয়ের প্রচ্ছদ;
রাও ফরমান আলী: পরিচয় ও একাত্তরে তার ভূমিকা
রাও ফরমান আলীর জন্ম ১৯২৩ সালে, ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের রোহতাকে। ১৯৪৭ সালের বিভাজনের পর তিনি নবগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অপারেশন সার্চলাইটের প্রত্যক্ষ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পরবর্তী নয় মাস বাঙালিদের ওপর চালানো নির্মম নিপীড়ন এবং বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ই ডিসেম্বর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের (বুদ্ধিজীবী) হত্যার যে ঘৃণ্য ছক তৈরি হয়েছিল, তার পেছনেও ফরমান আলীর ডায়েরি ও পরিকল্পনার স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। দেশ স্বাধীনের পর তিনি অন্যান্য পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বাংলাদেশে বন্দী হন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে শিমলা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানে ফিরে যান। ২০০৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে এই বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করেন।
নির্বাচনের ফলাফল এবং সেনা সদর দপ্তরের দোলাচল (২২শে মার্চ পর্যন্ত)
রাও ফরমান আলী তার ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ গ্রন্থে দাবি করেছেন যে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ, বিশেষ করে ২২শে মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট হাউস (ইয়াহিয়া খান ও তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা দল) এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যকার আলোচনার ভেতরের খবর সম্পর্কে প্রায় অন্ধকারেই ছিলেন।
সেনাবাহিনীর প্রাথমিক অবস্থান
ফরমান আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ নীতিগতভাবে ফলাফল মেনে নেওয়ার পক্ষেই ছিল। তাদের প্রাথমিক মনোভাব ছিল- ১৯৭০-এর নির্বাচনে জনগণের স্পষ্ট রায় এসেছিল। বিজয়ী দল হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেই শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করা ছিল যৌক্তিক। রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ তখনো বিদ্যমান ছিল।
এই সামরিক কর্মকর্তার দাবি, সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ কর্মকর্তা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই ২২শে মার্চ পর্যন্ত সেনাবাহিনী কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। কিন্তু পর্দার আড়ালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, সামরিক জান্তা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো আলোচনার নামে আসলে সময়ক্ষেপণ করছিলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সৈন্য এনে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিলেন যা ফরমান আলী তার বইয়ে কৌশলগতভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
জেনারেল টিকাক খানের নির্দেশ ও সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি
২২শে মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা থাকলেও ২৩শে মার্চ হঠাৎ করেই সামরিক বাহিনীর ওপরের তলার দৃশ্যপট পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তৎকালীন ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান এবং পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গভর্নর জেনারেল টিকাক খান শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামরিক পদক্ষেপের সংকেত দেন।
২৩শে মার্চের মোড় পরিবর্তন
২৩শে মার্চ ভোরে রাও ফরমান আলী এবং ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে জেনারেল টিকাক খান জরুরি তলব করেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দেন:
"কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, নিজেদের প্রস্তুত করো।"
এই নির্দেশের পরপরই অপারেশনাল হেডকোয়ার্টারে চরম ব্যস্ততা শুরু হয়। রাতারাতি একটি রাজনৈতিক সংকটকে সামরিকভাবে দমন করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা বা 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর রূপরেখা চূড়ান্ত রূপ পেতে থাকে।
రావు ফরমান আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা শহরকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা এবং শেখ মুজিবুর রহমান সহ অন্যান্য রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার বা দমন করা। আর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকার বাইরের ক্যান্টনমেন্টগুলো এবং সমগ্র প্রদেশের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্রীকরণ ও মূল পয়েন্টগুলো দখলের।
অপারেশনের পরিকল্পনায় ভয়, আশঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ
অপারেশন সার্চলাইটের নীল নকশা তৈরির সময় পাকিস্তানি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কেমন ছিল, তার একটি চিত্র রাও ফরমান আলীর বর্ণনায় পাওয়া যায়। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ ও মারাত্মক আশঙ্কা কাজ করছিল:
সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা (Numerical Imbalance)
পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের কাছে সবচেয়ে বড় ভয় ছিল বাঙালি সেনাসদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যাধিক্য।
ইপিআর ও মুজাহিদ বাহিনী: পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (EPR)-এর প্রায় ১২,০০০ সশস্ত্র বাঙালি সদস্য ছিল। এছাড়া প্রায় এক লাখের মতো মুজাহিদ ও পুলিশ সদস্য ছড়িয়ে ছিল প্রদেশ জুড়ে।
পাকিস্তানি সেনা: সেই মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পশ্চিম পাকিস্তানি খাঁটি সৈন্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ এর কাছাকাছি।
ফরমান আলীর ভাষায়, বাঙালি সশস্ত্র সদস্যরা যদি একযোগে বিদ্রোহ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তবে এই সামান্য পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে পুরো প্রদেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা বা টিকে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব।
কমান্ডারদের ব্রিফিংয়ে জটিলতা
অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে দ্রুততম সময়ে বিভিন্ন সেক্টরের নন-বাঙালি কমান্ডারদের ব্রিফিং দেওয়া ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। তৎকালীন সময়ে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান বন্ধ ছিল। বাধ্য হয়ে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়োর মধ্যে হেলিকপ্টারে করে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারগুলোতে গিয়ে কমান্ডারদের অভিযানের নির্দেশিকা পৌঁছে দেন রাও ফরমান আলী ও তার দল।
রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের ব্যর্থতা
রাও ফরমান আলী তার গ্রন্থে দাবি করেন, রক্তপাত এড়াতে তারা সকল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একযোগে গ্রেপ্তার করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন রাজপথে যুদ্ধ না করে শীর্ষ নেতাদের যৌথভাবে বন্দী করে পরিস্থিতি স্তব্ধ করে দিতে। তবে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে সেই প্রস্তাবের পুরো অনুমোদন দেওয়া হয়নি; কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজন শীর্ষ নেতার একটি তালিকা তৈরি করতে বলা হয়।
ফরমানের দাবি, পরিকল্পনাটি কোনোভাবে ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে ২৫শে মার্চ রাতের অভিযান শুরুর আগেই বেশিরভাগ বাঙালি রাজনৈতিক নেতা গা ঢাকা দিতে সক্ষম হন। ফলে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী কেবল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকেই গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ ও গোপনীয়তার নাটক
২৫শে মার্চ অপারেশন শুরুর সময়টি সূক্ষ্মভাবে সমন্বয় করা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।
কেন ইয়াহিয়াকে ঢাকা ত্যাগ করতে হলো?
রাও ফরমান আলী দাবি করেন, স্থানীয় সেনা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ঢাকায় অবস্থান করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে ইসলামাবাদ ও ঢাকার জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকরা যুক্তি দেখান যে, আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং কূটনৈতিক চাপ সামলাতে ইয়াহিয়ার পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা জরুরি। ঢাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হলে রাষ্ট্রপ্রধানের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ঢাকা ত্যাগ ও বিশেষ নির্দেশনা
২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে অত্যন্ত গোপনে এবং নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। কোনো ফ্ল্যাগ কার বা অফিসিয়াল প্রটোকল ব্যবহার করা হয়নি; একটি সাধারণ ছোট গাড়িতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেনাবাহিনীকে অত্যন্ত কঠোর একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল: "প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বোয়িং বিমানটি করাচির ৪০ মাইলের মধ্যে নিরাপদে না পৌঁছানো পর্যন্ত এবং বার্তা না আসা পর্যন্ত অপারেশনের কোনো মূল অ্যাকশনে যাওয়া যাবে না।" প্রেসিডেন্ট যেন আকাশে থাকা অবস্থায় কোনো প্রতিরোধের মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতেই এই নির্দেশনা জারি করা হয়।
তবে এই চরম গোপনীয়তার মাঝেও বাঙালিদের গোয়েন্দা তৎপরতা সফল হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিমানঘাঁটির তৎকালীন উইং কমান্ডার এ. কে. খন্দকার (পরবর্তীতে একাত্তরের বিমান বাহিনীর উপ-প্রধান) বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে ইয়াহিয়ার এই গোপন প্রস্থান প্রত্যক্ষ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে এই বার্তা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পৌঁছে দেন যে, ইয়াহিয়া করাচির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছেন এবং রাত নেমে এলেই আঘাত আসবে।

বাঙালি জাতির প্রতিরোধ প্রস্তুতি ও ২৫শে মার্চের মধ্যরাতের তাণ্ডব
রাও ফরমান আলীর লেখায় ২৫শে মার্চ রাতে বাঙালি ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের চিত্রও পরোক্ষভাবে ফুটে উঠেছে।
রাজপথের ব্যারিকেড ও বাঙালিদের প্রস্তুতি
২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে সেনা কনভয়গুলো যখন ব্যারাক থেকে বের হতে শুরু করে, তখন তারা ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে অভূতপূর্ব প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ফরমান লিখেছেন:
রাস্তার ওপর বিশাল বিশাল গাছ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছিল।
পুরান ঢাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাস্তার ওপর আলকাতরা, কয়লা ও কাঠের গুঁড়ি জ্বালিয়ে সুবিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেনা যান চলাচল থমকে যায়।
পাকিস্তানি গোয়েন্দারা আশঙ্কা করেছিল যে, আওয়ামী লীগ বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিমানবন্দর দখলের উদ্দেশ্যে একটি নিজস্ব অভিযান চালাতে পারে।
অপারেশনের সূচনা ও প্রথম প্রহার
সন্ধ্যা ৬টায় চূড়ান্ত সংকেত পাওয়ার পর রাত ১টা (২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে) নির্ধারণ করা হয় অভিযানের মূল সময় হিসেবে।
রাত ১টা ৩০ মিনিট: স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপ (SSG)-এর একটি কমান্ডো প্লাটুন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ঘেরাও করে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে।
রাত ২টা: কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যাতে ঢাকা বাইরের পৃথিবীর সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলে।
রাত ২টা ৩০ মিনিট: পিলখানা ইআরপি (EPR) সদর দপ্তর এবং রাজাবাগ পুলিশ লাইন্সে হামলা চালানো হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাঙালি সদস্যরা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে পাকিস্তানি ভারী সাঁজোয়া বহরের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কয়েক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পিলখানার প্রায় আড়াই হাজার এবং রাজারবাগের দুই হাজার সদস্যকে হত্যা ও নিরস্ত্রীকরণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ
ভোর ৫টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), লিয়াকত হল এবং জগন্নাথ হলে নির্বিচারে ট্যাংক, মর্টার ও অটোমেটিক অস্ত্র দিয়ে গোলাবর্ষণ করা হয়। শিক্ষক ও ঘুমন্ত শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
সত্যের অপলাপ: রাও ফরমান আলীর আত্মপক্ষ সমর্থন ও বিভ্রান্তিকর দাবি
রাও ফরমান আলী তার বই ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’-এ ২৫শে মার্চের বাস্তব হত্যাযজ্ঞকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তা আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এটি ছিল মূলত একজন অপরাধীর নিজেকে ও নিজ সামরিক বাহিনীকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে দায়মুক্ত করার অপকৌশল।
"হুমকি প্রদর্শন মাত্র, গণহত্যা নয়"
ফরমান আলী দাবি করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে ভয় দেখিয়ে ঘরে আটকে রাখা, হত্যা করা নয়। তিনি লিখেছেন:
জিপের ওপর এলএমজি উঁচিয়ে আকাশে ট্রেইসার বুলেট ফায়ার করা হয়েছিল কেবল মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য। রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছিল রাস্তার ব্যারিকেড ভাঙতে, মানুষের ওপর আঘাত হানতে নয়।
বাস্তবতা: এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য। ২৫শে মার্চের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এবং পিলখানায় হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছিল। ট্যাংকের গোলার আঘাতে বহু আবাসন ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়।
ছাত্রদের মৃত্যুর অযৌক্তিক সাফাই
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শত শত ছাত্র ও অধ্যাপককে নৃশংসভাবে হত্যার বিষয়ে ফরমান আলী এক অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
"একজন ছাত্র কখন আর ছাত্র থাকে না? তখনই একজন ছাত্র আর ছাত্র থাকে না, যখন সে অস্ত্র বহন করে।"
তিনি দাবি করেন, যেহেতু ছাত্ররা অস্ত্র হাতে সেনাবাহিনীর দিকে গুলি ছুড়ছিল এবং আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তাই আর্মি আত্মরক্ষার্থে তাদের হত্যা করতে বাধ্য হয়।
বাস্তবতা: ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে ঘুমান্ত ছাত্রদের ওপর ভারী অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্যের মতো প্রথিতযশা নিরপরাধ শিক্ষাবিদদের হত্যা করা হয়েছিল, যারা কোনো অস্ত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন না।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ওপর দোষারোপ
ফরমান আলী দাবি করেন যে, ২৫শে মার্চের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম (যেমন: বিবিসি, টাইম ম্যাগাজিন, নিউইয়র্ক টাইমস) মিলিটারির এই "সামান্য কৌশলগত পদক্ষেপকে" অতিশয়োক্তি করে ‘গণহত্যা’ (Genocide) হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিবেশন করেছিল।
বাস্তবতা: পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ কৌশলগতভাবে ২৫শে মার্চের আগেই সাইমন ড্রিং সহ ২০০ জন বিদেশী সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবরুদ্ধ করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। কিন্তু সাইমন ড্রিং ও দ্য ডেইল টেলিগ্রাফের সাংবাদিকরা আত্মগোপন করে কালরাতের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ছবি ও প্রতিবেদন বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন, যা পরে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের 'দ্য রেপ অব বাংলাদেশ' প্রতিবেদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।
এক নজরে রাও ফরমান আলীর দাবি বনাম ২৫শে মার্চের প্রকৃত বাস্তবতা
নিচে রাও ফরমান আলীর লিখিত বইয়ের বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে প্রকৃত সত্যের একটি সারসংক্ষেপ সারণী আকারে উপস্থাপন করা হলো:
বিষয় | রাও ফরমান আলীর বইয়ের দাবি | ঐতিহাসিক মূল বাস্তবতা ও সত্য |
অভিযানের মূল উদ্দেশ্য | জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে গৃহযুদ্ধ ঠেকানো ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত করা। | বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে রক্তে ডুবিয়ে নিঃশেষ করা এবং 'অপারেশন সার্চলাইটের' মাধ্যমে জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করা। |
হতাহতের সংখ্যা | রাজপথে ও হলের ভেতরে অত্যন্ত সামান্য রক্তপাত হয়েছে, গণমাধ্যমের দাবি অতিরঞ্জিত। | কেবল ২৫শে মার্চের কালরাতেই ঢাকায় আনুমানিক ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ নিরপরাধ মানুষ ও সেনাসদস্যকে হত্যা করা হয়। |
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ | সশস্ত্র শিক্ষার্থীদের গোলাবর্ষণের জবাবে কেবল আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। | ঘুমন্ত ছাত্র, কর্মচারী ও বিশিষ্ট জ্ঞানতাপস অধ্যাপকদের ওপর ট্যাংক, ভারী মর্টার ও ব্রাশফায়ার চালিয়ে গণহত্যা। |
রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার | পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ায় শেখ মুজিব ছাড়া সবাই পালিয়ে যান, সেনা ব্যর্থতা ছিল না। | অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা কৌশলগত কারণেই আত্মগোপন করে প্রতিরোধ যুদ্ধ (মুক্তিযুদ্ধ) সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন। |
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ | রাজপথে বিশৃঙ্খলা এড়াতে ও রাষ্ট্রীয় কাজ অব্যাহত রাখতে স্বাভাবিক প্রস্থান। | সামরিক আগ্রাসন শুরুর সংকেত দিয়ে এবং নিজের জীবন নিরাপদ রেখে আঁধার রাতে চোরের মতো ঢাকা ত্যাগ। |
১৮ই মার্চ ১৯৭১: ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর গোপন খসড়া তৈরির নেপথ্য ইতিহাস
২৫শে মার্চের গণহত্যার যে নীলনকশা বাস্তবায়িত হয়েছিল, তা একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়েই পাকিস্তান সেনাবাহিনী গোপনে সামরিক সমাধানের পথ বেছে নেয়।
মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তার আত্মজীবনী ‘আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ (A Stranger in My Own Country) গ্রন্থে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন কীভাবে ১৮ই মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউজে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মূল পরিকল্পনা লেখা হয়।
খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলীর ভূমিকা: ১৮ই মার্চ সকালে জেনারেল টিকাক খান খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলীকে ডেকে পাঠান এবং সামরিক অভিযানের খসড়া তৈরির নির্দেশ দেন।
হস্তলিখিত নীলনকশা: রাও ফরমান আলী এবং খাদিম হোসেন রাজা ক্যান্টনমেন্টের একটি ঘরে বসে আকাশি রঙের প্যাডে হাত দিয়ে এই পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেন। ফরমান আলী অভিযানের মূল নীতি ও রাজনৈতিক দিকগুলো লেখেন, আর খাদিম হোসেন রাজা সামরিক কৌশল ও বাহিনীর বণ্টনের দায়িত্ব নেন।
পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য: ১. একযোগে প্রদেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। ২. আওয়ামী লীগের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ছাত্র নেতাদের গ্রেপ্তার করা। ৩. পিলখানার ইআরপি (EPR) এবং রাজারবাগের বাঙালি পুলিশদের সম্পূর্ণ নিরস্ত করা। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল প্রতিরোধ কেন্দ্র ধরে নিয়ে সেখানে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র-শিক্ষকদের দমন করা। ৫. টেলিযোগাযোগ, রেডিও ও টিভি স্টেশন এবং ব্যাংক হস্তগত করা।
রাও ফরমান আলীর হস্তলিখিত ডায়েরি ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রাও ফরমান আলীর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে।
গভর্নর হাউজে উদ্ধারকৃত বিতর্কিত ডায়েরি
১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর ঢাকার গভর্নর হাউজ (বর্তমান বঙ্গভবন) থেকে রাও ফরমান আলীর ব্যবহৃত একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। এই ডায়েরিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু তথ্য ও নাম পাওয়া যায়:
ডায়েরির পাতা থেকে: ফরমান আলীর হস্তাক্ষরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক এবং সংস্কৃতিসেবীর নাম লেখা ছিল। পরবর্তীতে দেখা যায়, তালিকায় নাম থাকা অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীকেই ১৪ই ডিসেম্বরের কালো রাতে আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সহায়তায় তুলে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়।
আল-বদর বাহিনী ও মেকানিক্যাল লজিস্টিকস
আন্তর্জাতিক তদন্ত ও নথিপত্র অনুযায়ী, রাও ফরমান আলী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন থেকে গঠিত 'আল-বদর' ও 'আল-শামস' মিলিশিয়া বাহিনীর মূল সমন্বয়ক ও সামরিক অভিভাবক। বুদ্ধিজীবীদের চোখ বেঁধে তুলে আনার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যে জিপ ও পরিবহন সরবরাহ করা হয়েছিল, তা গভর্নরের সিভিল অ্যাডভাইজার হিসেবে ফরমান আলীর দপ্তর থেকেই অনুমোদিত হতো।
পরবর্তীকালে ফরমান আলী দাবি করেছিলেন যে ডায়েরির নামগুলো ছিল কেবল "গাড়ি বা রেশন বরাদ্দের তালিকার অংশ", যা বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে একটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট: পাকিস্তানি জেনারেলদের দায় স্বীকার ও কাদা ছোড়াছুড়ি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তান সরকার বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে ‘হামুদুর রহমান কমিশন’ (Hamoodur Rahman Commission) গঠন করে। এই কমিশনের উদ্দেশ্যে ছিল পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা।
ফরমান আলীর সাক্ষ্য ও দোষারোপ
কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে পাকিস্তানি জেনারেলরা একে অপরের ওপর দায় চাপাতে শুরু করেন:
জেনারেল নীয়াজীর বক্তব্য: জেনারেল এ. এ. কে. নীয়াজী কমিশনকে জানান যে রাও ফরমান আলী ঢাকায় এক ধরনের "সমান্তরাল সরকার" চালাতেন এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও ২৫শে মার্চের সহিংসতায় তার সরাসরি হাত ছিল।
ফরমান আলীর আত্মপক্ষ সমর্থন: ফরমান আলী কমিশনকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি কেবল একজন সিভিল উপদেষ্টা ছিলেন এবং সামরিক কমান্ডের কোনো অপারেশনের আদেশ তিনি দেননি। তবে কমিশন তাদের গোপনীয় রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করে যে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত শীর্ষ জেনারেলরা নীতিগত, কৌশলগত এবং নৈতিক সকল দিক থেকেই চরম অপরাধে লিপ্ত ছিলেন।
পঁচিশে মার্চের গণহত্যার প্রধান প্রধান কেন্দ্রসমূহ
পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল, তার স্থানভিত্তিক বিবরণ তৎকালীন নিষ্ঠুরতার ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তোলে:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: মেধা ও চেতনার ওপর প্রহার
২৫শে মার্চ রাত ১২টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনার ১৮ ও ২২ নম্বর বালুচ রেজিমেন্ট এবং ৩২ নম্বর পঞ্জাব রেজিমেন্ট।
জগন্নাথ হল: সবচেয়ে বেশি গণহত্যা চালানো হয় সংখ্যালঘু ছাত্র অধ্যুষিত জগন্নাথ হলে। ট্যাংক ও মর্টার হামলা চালিয়ে হল চত্বরে ছাত্রদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে নিহত ও আহত ছাত্রদের দিয়েই গণকবর খোঁড়ানো হয়।
শিক্ষকদের বাসস্থান: অধ্যাপক ড. জিসি দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. ফজলুর রহমান এবং অধ্যাপক আতাউর রহমানকে তাদের নিজ নিজ বাসভবনে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পিলখানা ও রাজারবাগ: প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স: থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রথম প্রতিরোধ বুলেট ছোড়েন। কিন্তু সাঁজোয়া যান, ভারী মেশিনগান ও রকেটের মুখে সেই প্রতিরোধ বেশি সময় টেকেনি। পুলিশ লাইন্সের ব্যারাকগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে শত শত পুলিশ সদস্যকে জ্যান্ত ও গুলিতে হত্যা করা হয়।
পিলখানা ইআরপি (EPR): পিলখানায় বাঙালি জওয়ানদের ঘুমান্ত অবস্থায় বা আচমকা ঘিরে ফেলে হত্যা করা হয়। বহু সদস্যকে হাত বেঁধে গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
পুরান ঢাকা ও সাধারণ নাগরিক নিধন
শাঁখারীবাজার, তাতীবাজার এবং রমনা কালীমন্দিরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শত শত নিরপরাধ পুরুষ, নারী ও শিশু প্রাণ হারায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মিডিয়ায় 'দ্য রেপ অব বাংলাদেশ'
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২৫শে মার্চের আগেই ঢাকা থেকে تمام বিদেশী সাংবাদিকদের বের করে দিয়ে তথ্য গোপন করতে চেয়েছিল। তবে কয়েকজন সাংবাদিকের অসীম সাহসিকতায় বিশ্ববাসী একাত্তরের গণহত্যার প্রকৃত চিত্র জানতে পারে।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন
পাকিস্তানের সরকারি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে সেনাবাহিনী তাদের স্বপক্ষে রিপোর্ট লেখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর বর্বরতা দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি গোপনে পাকিস্তান থেকে লন্ডনে পালিয়ে যান এবং ১৩ই জুন ১৯৭১ সালে দ্য সান্ডে টাইমস পত্রিকায় ‘Genocide’ (গণহত্যা) শিরোনামে এক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
মাসকারেনহাসের এই একক প্রতিবেদন বিশ্বজনমতকে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে নিয়ে আসতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
ইতিহাস বিকৃতি বনাম প্রকৃত দলিল: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অপকৌশল
রাও ফরমান আলী তার ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ গ্রন্থে এবং অন্যান্য পাকিস্তানি লেখক ও সামরিক কর্মকর্তারা গত কয়েক দশক ধরে কতগুলো নির্দিষ্ট দাবি করে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চালিয়েছেন:
"শেখ মুজিব সমঝোতা চাননি": ফরমান আলীর দাবি, ১৬ থেকে ২৪শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনায় শেখ মুজিব চরমপন্থা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তাই সমঝোতার নাটক করে সময়ক্ষেপণ করছিল এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্রবাহী জাহাজ (যেমন: সোয়াত) এনে সেনা সমাবেশ ঘটাচ্ছিল।
"খুব কম মানুষ মারা গেছে": পাকিস্তানি পক্ষের দাবি, ২৫শে রাতে মাত্র কয়েকশো মানুষ মারা গিয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘের রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক রেডক্রস এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ২৫শে মার্চের কালরাতেই হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল এবং পরবর্তী নয় মাসে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখে।
"আর্মি কেবল শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করছিল": ৯ মাসের যুদ্ধে প্রায় ১ কোটি মানুষের ভারতে শরণার্থী হওয়া, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং ২ লাখেরও বেশি নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান ছিল না; এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও উপসংহার
মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ গ্রন্থটি একাত্তরের ২৫শে মার্চের সামরিক পরিকল্পনা, পাকিস্তানি জেনারেলদের মানসিক দ্বন্দ্ব এবং সিদ্ধান্তহীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে এটি একই সাথে বিজয়ী বাঙালি জাতির সামনে বিজিত ও অপরাধী এক সামরিক মানসিকতার নির্লজ্জ আত্মপক্ষ সমর্থনের স্মারক।
ফরমান আলী তার বইয়ে সেনাবাহিনীর কৌশলগত ভুল, তাদের মধ্যকার ভীতি ও আংশিক সত্য তুলে ধরলেও, ২৫শে মার্চের মূল ট্র্যাজেডি অর্থাৎ বাঙালি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পিত গণহত্যাকে (Planed Genocide) ঢেকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
ইতিহাস প্রমাণ করেছে, ২৫শে মার্চের সেই কালরাতে রাও ফরমান আলী, জেনারেল টিক্কা খান ও খাদিম হোসেন রাজারা যে আগ্নেয়গিরির জন্ম দিয়েছিলেন, তাতেই ভস্মীভূত হয়েছিল অখণ্ড পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ। অস্ত্র দিয়ে বুলেট ছুড়ে মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করা গেলেও একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে যে দমন করা যায় না, একাত্তরের ২৫শে মার্চ এবং পরবর্তী নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ বিশ্ব মানচিত্রে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে রয়েছে।















