>

>

অপারেশন জ্যাকপট ১৯৭১ - সাগরের বুকে দুঃসাহসী এক আত্মঘাতী মিশন

অপারেশন জ্যাকপট ১৯৭১ - সাগরের বুকে দুঃসাহসী এক আত্মঘাতী মিশন

১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট রাত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে দখলদার বাহিনী যখন উল্লাসে মত্ত এবং নিজেদের কর্তৃত্ব জাহিরে ব্যস্ত, ঠিক তখনই চারপাশের ঘোর অন্ধকারের বুক চিরে কেঁপে উঠেছিল প্রধান দুই সমুদ্রবন্দর ও নদীবন্দরগুলো। বিকট শব্দে বিকল হতে থাকে একের পর এক অস্ত্র ও রসদবাহী বিশাল সব আন্তর্জাতিক জাহাজ, তলিয়ে যেতে থাকে নদীর গভীর তলদেশে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি কেবল একটি সাধারণ অভিযান ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসী, নিখুঁত ও সফলতম 'আত্মঘাতী' নৌ-গেরিলা অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে ঘটেছিল এমন এক ঘটনা, যা কেবল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের গতিপথকেই আমূল বদলে দেয়নি, বরং স্তম্ভিত করে দিয়েছিল বিশ্ব সম্প্রদায়কে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন বিশ্বজুড়ে প্রচার করছিল "পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে" ঠিক তখনই চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে একযোগে কেঁপে ওঠে পানির নিচের মাটি।

সমুদ্র ও নদীর অন্ধকার পানির নিচে নিঃশব্দে সাঁতরে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ তাদের রসদ ও অস্ত্রবাহী জাহাজগুলোতে 'লিমপেট মাইন' ফিট করে দেয় একদল দুঃসাহসী বাঙালি যুবক। বিস্ফোরণে একে একে তলিয়ে যায় হাজার হাজার টন মাইন, অস্ত্র ও রসদবোঝাই দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ। বিকল হয়ে পড়ে নদী ও সমুদ্র বন্দরগুলো। স্তব্ধ হয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহের জলপথ।

এই ঐতিহাসিক ও সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’ (Operation Jackpot)

মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌ-সেক্টর (সেক্টর-১০)-এর অধীনে পরিচালিত এই দুঃসাহসী নৌ-গেরিলা অভিযানটি কেবল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আস্থার মেরুদণ্ডই ভেঙে দেয়নি, বরং বহির্বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছিল। বন্ধ করে দিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে আসা বিদেশি সাহায্য ও সামরিক সরঞ্জামের গতি। ইতিহাসবিদদের মতে, অপারেশন জ্যাকপট হলো বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের অন্যতম সফল ও দুঃসাহসী সুইসাইডাল নৌ-গেরিলা মিশন।

তুলন থেকে জেনেভা: ৮ জন সাবমেরিনারের দুঃসাহসী পলায়নকাব্য

অপারেশন জ্যাকপটের বীজ রোপিত হয়েছিল মাতৃভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, সুদূর দক্ষিণ ফ্রান্সের সামরিক বন্দর নগরী তুলনে (Toulon)

তুলন ডকইয়ার্ডের পেছনের প্রেক্ষাপট: ১৯৭১ সালের শুরুতে ফ্রান্সের তুলন ডকইয়ার্ডে পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘পিএনএস ম্যাংরো’ (PNS Mangro)-তে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন ৪৫ জন পাকিস্তানি ক্রু। এদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি সাবমেরিনার। মার্চ মাসে যখন তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত ঘৃণ্য ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ও গণহত্যার খবর পান, তখন তাদের রক্তে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

সাবমেরিনার মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী নিশ্চিত বুঝতে পারেন যে, এই বাহিনীর হয়ে কাজ করা আর নিজের জাতির রক্তে হাত রাঙানো একই কথা। তিনি গোপনে অন্য বাঙালি ক্রু-দের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। কৌশলগত কারণে তিনি সবাইকে একসাথে ডেকে কথা বলেননি; অত্যন্ত গোপনে এক এক করে সহকর্মীদের সাথে কথা বলে তাঁদের স্বাধীনতায় যোগ দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

সিন্দুক চুরি ও রোমাঞ্চকর পলায়ন: আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী ছিলেন জরুরি ও গোপন নথিপত্রের সিন্দুকের নিরাপত্তার দায়িত্বে। তিনি সুযোগ বুঝে সিন্দুক খুলে সব ক্রুর পাসপোর্ট নিজের দখলে নেন। তিনি জানতেন, কেবল ১৩ জন বাঙালির পাসপোর্ট নিলে মুহূর্তে বিষয়টি ধরে ফেলবে পাকিস্তানি অফিসাররা।

২৯ মার্চ ১৯৭১, আটজন বাঙালি সাবমেরিনার দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে তুলন সামরিক ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যান। এই আট বীর হলেন:

১. মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী
২. মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন
৩. মোঃ রহমতউল্লাহ
৪. মোঃ শেখ আমানউল্লাহ
৫. মোঃ আবদুর রকিব মিয়া
৬. মোঃ আহসানউল্লাহ
৭. মোঃ বদিউল আলম
৮. মোঃ আবদুর রহমান আবেদ

ফ্রান্স থেকে স্পেনের লিঁও (Lyon) এবং সেখান থেকে বার্সেলোনা পৌঁছে তারা মাদ্রিদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা তাঁদের পেছনে লোক লাগালেও রোম ও জেনেভা হয়ে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) এবং অবশেষে তাঁরা নিরাপদে দিল্লিতে পৌঁছান।

দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সিদ্ধান্ত হয় এই প্রশিক্ষিত সাবমেরিনারদের ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে বাংলাদেশের প্রথম আত্মঘাতী নৌ-কমান্ডো বাহিনী।

ভাগীরথীর তীরে ক্যাম্প 'সি-টু-পি': কঠোরতম আত্মঘাতী প্রশিক্ষণ

ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাবমেরিনারকে কেন্দ্র করে এবং ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে বাছাই করা উচ্চমনোবলসম্পন্ন সাড়ে তিনশো বাঙালি তরুণকে নিয়ে শুরু হয় নৌ-কমান্ডোদের কঠোর প্রশিক্ষণ।

ক্যাম্প 'সি-টু-পি' (C2P): ১৯৭১ সালের ২৩ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার পলাশীর ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রের পাশে, ভাগীরথী নদীর তীরে একটি অত্যন্ত গোপন সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হয়। এর সাংকেতিক নাম ছিল ‘সি-টু-পি’ (Camp C2P)

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই নৌ-কমান্ডোরা কোনো নির্দিষ্ট সেক্টর কমান্ডারের অধীনে ছিলেন না। তাঁরা গঠিত হয়েছিলেন ‘সেক্টর-১০’ হিসেবে এবং সরাসরি মুজিবনগর সরকারের সেনাপ্রধান কর্নেল এ. জি. ও. ওসমানী-র প্রত্যক্ষ নির্দেশে কাজ করতেন।

মৃত্যুর মুচলেকায় স্বাক্ষর ও ১৮ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ: নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ মোটেই সাধারণ কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি আত্মঘাতী মিশন (Suicidal Mission)। তাই প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার আগেই প্রতিটি যোদ্ধাকে লিখিতভাবে এক ঐতিহাসিক মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে হতো:

"আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু হলে কেউ দায়ী থাকবে না।"

প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা করে টানা তিন মাস চলেছিল এই অমানসিক প্রশিক্ষণ:

সাঁতার ও ডুব-সাঁতার: খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে বুকে ৫-৬ কেজি ওজনের পাথর বেঁধে সাঁতার কাটা, চিৎ সাঁতার দেওয়া, কেবল নাক ভাসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিকে থাকা এবং স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

মাইনিং ও কেবল কাটিং: পানির নিচে ডুব সাঁতার দিয়ে শত্রুর জাহাজের গায়ে লিমপেট মাইন স্থাপন করা এবং জাহাজ যাতে সহজে বন্দর ত্যাগ করতে না পারে সে জন্য তার নোঙরের ভারী কেবল কাটার কৌশল শেখানো হতো।

টানা ৪৮ ঘণ্টা টিকে থাকা: পানির নিচে একটানা ৪৮ ঘণ্টা টিকে থাকার প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ করে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এই বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

গোপন সংকেত: আকাশবাণী কলকাতা ও দুটি কালজয়ী গান

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রশিক্ষণ শেষে নৌ-কমান্ডোদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে সতর্কতার সাথে বাংলাদেশের ভেতরে বিভিন্ন ‘সেফ হাউসে’ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মূল আক্রমণের তারিখ বা সময় কোনটি, তা দলনেতারাও জানতেন না। এমনকি সেনাপ্রধান জেনারেল ওসমানীও চূড়ান্ত দিনক্ষণ জানতেন না। এ গোপনীয়তার কারণ ছিল যদি কোনো বীর যোদ্ধা শত্রুর হাতে ধরা পড়েন, তবে চরম নির্যাতনের মুখেও যেন মিশনের চূড়ান্ত নির্দেশ ফাঁস না হয়ে যায়।

আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল এক অভূতপূর্ব মাধ্যম আকাশবাণী কলকাতা বেতার কেন্দ্র। একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুটি বিশেষ গান প্রচার করে কমান্ডোদের বার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

১৩ আগস্ট প্রচারিত হয় প্রথম গানটি "আমার পুতুল যাবে শ্বশুরবাড়ি"। এটি শুনেই গা ঢাকা দিয়ে থাকা দলনেতারা তাঁদের সঙ্গীদের নিয়ে প্রস্তুত হন। আর ১৪ আগস্ট রাতে বাজে দ্বিতীয় গানটি "আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান"। এর সাথেই সাথে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ১৫ আগস্ট গভীর রাতে (১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে) একযোগে চার বন্দরে আঘাত হানতে হবে।

চার বন্দরে নরক গুলজার: ১৫-১৬ আগস্টের রাতের দুঃসাহসী অভিযান

১৫ আগস্ট ১৯৭১, রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিট থেকে ২টা ১৫ মিনিটের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ৪টি প্রধান জলপথে একযোগে নেমে আসে ধ্বংসের তাণ্ডব।

১. চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশন

চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ৬০ জনের নৌ-কমান্ডো দলকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। মূল নেতৃত্ব ছিলেন সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ৩১ জন বীর কমান্ডো কর্ণফুলী নদীর মারাত্মক স্রোত অতিক্রম করে টার্গেটে পৌঁছান।

রাত ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম মাইনটি বিস্ফোরিত হয়। একের পর এক বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো চট্টগ্রাম শহর।

ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ: অস্ত্র ও সরঞ্জামবোঝাই বিশাল দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমভি আল-আব্বাস’ এবং ‘এমভি হরমুজ’। এছাড়া ধ্বংস হয় ওরিয়েন্ট বার্জ নম্বর-৬

ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ১৯,০০০ টন ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক রসদ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। পাশাপাশি আরও ৭টি ছোট-বড় নৌযান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. মংলা বন্দর অপারেশন

মংলা বন্দরের অপারেশনটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও বিশাল। এখানে কমান্ডো আমিনুর রহমান খসরু-র নেতৃত্বে মোট ২৬০ জনের একটি বিশাল বহর (নৌ-কমান্ডো ও কভারিং সি-অ্যান্ড-সি কমান্ডো) দায়িত্ব পালন করে।

পথপ্রদর্শকের ভুলের কারণে কমান্ডোদের পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু চরম সাহসিকতা দেখিয়ে ২৪ জন নৌ-কমান্ডো ৬টি দলে ভাগ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন।

ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ: সোমালীয় জাহাজ ‘এসএস লাইটং’, একটি মার্কিন, একটি জাপানি, একটি পাকিস্তানি এবং দুটি চীনা জাহাজসহ মোট ৬টি বিশাল বিদেশি ও দেশি জাহাজ ধ্বংস করা হয়।

ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ৩০,০০০ টন যুদ্ধ সরঞ্জাম ও খাদ্যপণ্য পশুর নদীতে ডুবে যায়। এই অপারেশনে দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে নিখোঁজ হন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

৩. চাঁদপুর বন্দর অপারেশন

সাবমেরিনার বদিউল আলম-এর নেতৃত্বে ১৮ জন নৌ-কমান্ডো চাঁদপুর নদীবন্দরে অপারেশন পরিচালনা করেন। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তারা লিমপেট মাইন বসিয়ে দেন শত্রুর নৌযানে।

ক্ষয়ক্ষতি: বিস্ফোরণে ৩টি বিশাল স্টিমার, গানবোট এবং বেশ কয়েকটি অস্ত্রবাহী বার্জ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে যায় চাঁদপুরের নৌ-যোগাযোগ।

৪. নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর অপারেশন

রাজধানী ঢাকার একেবারেই কাছে নারায়ণগঞ্জ বন্দরে অপারেশন চালানো ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। সাবমেরিনার আবেদুর রহমান-এর নেতৃত্বে ২০ জনের দল নারায়ণগঞ্জের গুদাম ও ঘাটে নোঙর করা জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালান।

ক্ষয়ক্ষতি: ৪টি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ ও বার্জ পুরোপুরি ডুবিয়ে দিয়ে সফলতার সাথে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে আসেন বীর কমান্ডোরা।

অপারেশন জ্যাকপটের কৌশলগত ও সামরিক পরিসংখ্যান

অপারেশন জ্যাকপট বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সর্ববৃহৎ সমন্বিত সামরিক অভিযান। নিচে এই অপারেশনের সার্বিক চিত্র একটি সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

অপারেশনের ক্ষেত্র

চট্টগ্রাম বন্দর

মংলা বন্দর

চাঁদপুর বন্দর

নারায়ণগঞ্জ বন্দর

কমান্ডার / দলনেতা

আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী

আমিনুর রহমান খসরু

বদিউল আলম

আবেদুর রহমান

অংশগ্রহণকারী কমান্ডো

৩১ জন নৌ-কমান্ডো

২৪ জন (কভারিং সি&সি সহ ২৬০)

১৮ জন নৌ-কমান্ডো

২০ জন নৌ-কমান্ডো

ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান জাহাজ

এমভি আল-আব্বাস, এমভি হরমুজ, ওরিয়েন্ট বার্জ-৬

এসএস লাইটং (সোমালিয়া), মার্কিন, জাপানি, চীনা জাহাজ

৩টি বড় স্টিমার, গানবোট ও বার্জ

৪টি বড় অস্ত্রবাহী বার্জ ও জাহাজ

নিমজ্জিত সরঞ্জাম

১৯,০০০ টন অস্ত্র ও বিস্ফোরক

৩০,০০০ টন অস্ত্র ও রসদ

বিপুল সামরিক জ্বালানি ও খাদ্য

সামরিক রসদ ও মালামাল

কৌশলগত প্রভাব

চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক নৌপথ বন্ধ, বিদেশি সাহায্য স্থগিত।

অভ্যন্তরীণ নৌ-রসদ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন।

ঢাকার নিকটবর্তী প্রধান সামরিক রসদ কেন্দ্র স্তব্ধ।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অপারেশনের প্রভাব ও বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা

অপারেশন জ্যাকপট কেবল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শত শত কোটি টাকার সামরিক ক্ষতিই করেনি, বরং বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল।

বিশ্ব গণমাধ্যম ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

১. আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনাম: বিবিসি (BBC), ভয়েস অফ আমেরিকা (VOA), রয়টার্স এবং টাইম পত্রিকার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে অপারেশন জ্যাকপটের খবর ফলাও করে প্রচারিত হয়।

২. বিদেশি জাহাজের বীমা বাতিল: আন্তর্জাতিক নৌ-বীমা কোম্পানিগুলো পূর্ব পাকিস্তানের কোনো বন্দরে নোঙর করা জাহাজের জন্য বীমা ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করে। ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পূর্ব পাকিস্তানে আসতে অস্বীকৃতি জানায়।

৩. পাকিস্তানের প্রচারণার কফিনে পেরেক: পাকিস্তান সরকার সারা বিশ্বে দাবি করে আসছিল যে ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক’। কিন্তু এই একদিনের অভিযানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চিত হয় যে, এটি কেবল একটি ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়, বরং একটি সুসংগঠিত, প্রশিক্ষিত স্বাধীনতাকামী জাতি লড়াই করছে।

রাষ্ট্রীয় খেতাব ও চিরন্তন শ্রদ্ধা

স্বাধীনতার পর এই দুঃসাহসী আত্মঘাতী অভিযানের বীরত্বগাথাকে স্বীকৃতি জানিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নৌ-কমান্ডোদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করে।

বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীরগণ: আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহ আলম, মোশাররফ হোসেন, মোজাহার উল্লাহ, শেখ মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ এবং আবেদুর রহমান।

বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক: মোহাম্মদ খবিরউজ্জামান (বীর বিক্রম), মমিন উল্লাহ পাটোয়ারী (বীর প্রতীক), শাহজাহান কবীর (বীর প্রতীক), ফারুক-এ-আজম (বীর প্রতীক), মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ (বীর প্রতীক), মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন (বীর প্রতীক), আমির হোসেন (বীর প্রতীক) এবং মোহাম্মদ খোরশেদ আলম (বীর প্রতীক)।

লিমপেট মাইন ও ওয়াটারপ্রুফ টাইমার: প্রযুক্তির অদ্ভুত রসায়ন

নৌ-কমান্ডোরা শত্রু জাহাজে আঘাত হানতে যে মাইন ব্যবহার করতেন, তাকে বলা হতো ‘লিমপেট মাইন’ (Limpet Mine)। নাম সামুদ্রিক 'লিমপেট' নামক এক ধরণের শামুক থেকে এসেছে, যা পাথরের গায়ে শক্তভাবে আটকে থাকে।

চুম্বকীয় শক্তি: এই মাইনের চারপাশে অত্যন্ত শক্তিশালী চুম্বক (Magnets) বসানো থাকত। স্টিলের জাহাজের গায়ে এটি ছোঁয়ানো মাত্রই তা প্রচণ্ড শক্তিতে আটকে যেত।

ওয়াটারপ্রুফ ডেটোনেটর ও সময় নিয়ন্ত্রক: পানির নিচে সাধারণ টাইমার কাজ করে না। তাই এতে ব্যবহৃত হতো এক ধরণের কেমিক্যাল ও কনডম-সুরক্ষিত ফিউজ প্রসেস। পানি যাতে ফিউজের ভেতর ঢুকতে না পারে, সে জন্য কপার বা বিশেষ প্লাস্টিক সিল ব্যবহার করা হতো।

টাইমার মেকানিজম: মাইন চালু করার জন্য কমান্ডোকে একটি বিশেষ সেফটি পিন টেনে খুলে ফেলতে হতো। এতে করে কেমিক্যালের একটি ছোট ক্যাপসুল ভেঙে গিয়ে ভেতরে থাকা এসিডের সাথে বিক্রিয়া শুরু হতো। ধাতব স্প্রিং গলে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় নিত। এই ৪৫ মিনিট সময়ই ছিল কমান্ডোদের নিরাপদে সাঁতরে কূলে ফিরে আসার একমাত্র সময়।

‘ফেজ-২’ ও ‘ফেজ-৩’: আগস্ট-পরবর্তী ধারাবাহিক নৌ-আঘাত

সাধারণত মনে করা হয় অপারেশন জ্যাকপট কেবল ১৫-১৬ আগস্ট রাতের ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু কৌশলগতভাবে এটি ছিল তিন ধাপের এক দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের প্রথম ধাপ (Phase-1)।

আগস্টের মূল আঘাতের পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নৌ-কমান্ডোরা পূর্ব পাকিস্তানের নদী ও সমুদ্রপথে আরও অন্তত ৪০টিরও বেশি ছোট-বড় অপারেশন পরিচালনা করেন।

দ্বিতীয় ফেজ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর): নদীপথের অভ্যন্তরীণ লাইনগুলো বিচ্ছিন্ন করা শুরু হয়। কাঁচপুর, গোয়ালন্দ ঘাট, দৌলতপুর, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ এবং ফরিদপুরে খাদ্য ও জ্বালানিবাহী অসংখ্য ট্রলার ও গানবোট ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

তৃতীয় ফেজ (নভেম্বর): দ্বিতীয়বারের মতো চট্টগ্রাম ও চালনা/মংলা বন্দরে হামলা চালানো হয়। এবার কৌশল ছিল কেবল জাহাজ ডুবানো নয়, বরং চ্যানেলের সরু মুখে জাহাজ ডুবিয়ে পলি পড়ে যাতে পুরো চ্যানেলই অকার্যকর হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা করা।

‘অপারেশন হট প্যান্টস’ এবং স্বাধীন বাংলার প্রথম গানবোট

নৌ-কমান্ডোদের ডুব-সাঁতারের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের অক্টোবরের দিকে মুক্তিবাহিনী নিজেদের একটি ভাসমান নৌ-বহর গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বিশেষ নৌ-অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন হট প্যান্টস’ (Operation Hot Pants)

কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের উপহার: কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট বাংলাদেশকে দুটি টাগবোট (Tugboat) উপহার দেয় ‘এমভি তাভোর’ এবং ‘এমভি পানভেল’

গানবোটে রূপান্তর: ভারতের খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে এই টাগবোট দুটিকে ৪-ইঞ্চি বফোর্স গান এবং ৪০ মিমি বিমান-বিধ্বংসী কামান ও ৫৭ মিমি রকেট লঞ্চার বসিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধজাহাজে রূপান্তর করা হয়। এদের নতুন নাম দেওয়া হয় ‘এমভি পদ্মা’ এবং ‘এমভি পলাশ’

অধিনায়কত্ব: এই দুটি গানবোটের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরাসি প্রবাসী সেই সাবমেরিনার ও নৌ-কমান্ডোদের হাতে।

১০ ডিসেম্বরের চালনা ট্র্যাজেডি ও বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের শাহাদাত

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১, যৌথবাহিনীর অভিযানের অংশ হিসেবে 'পদ্মা' ও 'পলাশ' রূপসা নদী ধরে চালনা ও মংলা বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যবশত, ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান শত্রুপক্ষের জাহাজ মনে করে নিজেদের গানবোট 'পদ্মা' ও 'পলাশ'-এর ওপর ভুলবশত বোমাবর্ষণ করে (Friendly Fire)।

বোমার আঘাতে 'পলাশ' জাহাজে আগুন ধরে যায়। জাহাজের ইঞ্জিন রুমের আর্টিফিসার স্কোয়াড্রন ডিরেক্টর মো. রুহুল আমিন গুরুতর আহত অবস্থায় নদী সাঁতরে তীরে ওঠেন। কিন্তু তীরে পৌঁছানোর পর স্থানীয় রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে নির্মমভাবে বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে শহীদ করে। পরবর্তীতে তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

ভারতীয় নৌবাহিনীর মাস্টারমাইন্ড: কমান্ডার এম. এন. সামন্ত

অপারেশন জ্যাকপটের সার্বিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণে ভারতীয় নৌবাহিনীর তৎকালীন ৩ জন কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

১. কমান্ডার এম. এন. সামন্ত (M.N. Samant): তিনি ছিলেন 'ক্যাম্প C2P'-এর প্রধান সমন্বয়ক ও মাস্টারমাইন্ড। নৌ-কমান্ডো গঠন ও অপারেশনের নীলকশা তৈরিতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে এবং ভারত সরকার তাঁকে ‘মহাবীর চক্র’ প্রদান করে। ২. লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম. এ. মার্টিস (M.A. Martis): তিনি কমান্ডোদের সাঁতার ও লিমপেট মাইনের প্রত্যক্ষ ট্রেনিং দিতেন। ৩. ক্যাপ্টেন সামন্ত ও সেক্টর-১০: তাঁদের নির্দেশনায় নৌ-কমান্ডোরা এমন এক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন, যার মাধ্যমে কোনো ভারতীয় সৈন্যের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই বাংলাদেশিরা নিজেদের জলসীমা নিজেরা মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।

পাকিস্তান নৌবাহিনীর চরম মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়

অপারেশন জ্যাকপটের ফলে পাকিস্তানি সামরিক কমান্ডের মধ্যে যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন।

পাকিস্তানের তৎকালীন রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ-এর মন্তব্য: "আমরা ধারণা করেছিলাম মুক্তিবাহিনীর কেবল কিছু ছোটখাটো পদাতিক স্কোয়াড রয়েছে। কিন্তু ১৫ আগস্টের মধ্যরাতে আমাদের পুরো নৌ-সাপ্লাই চেইন যেভাবে চোখের সামনে কয়েক ঘণ্টায় পানিতে তলিয়ে গেল, আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এটি কোনো সাধারণ অশিক্ষিত গেরিলা দলের কাজ ছিল না, এটি ছিল চরম পেশাদার নৌ-কমান্ডোদের কাজ।"

প্রধান প্রভাবসমূহ:

জাহাজ আগমন বন্ধ: পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় জলসীমাকে আন্তর্জাতিক শিপিং এজেন্সিগুলো "High Risk War Zone" ঘোষণা করে। বিদেশি কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ করাচি থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র বা খাদ্যপণ্য আনতে অস্বীকৃতি জানায়।

‘পিএনএস গাজী’র পাঠদান: জলপথে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় নৌবাহিনীর এই বাধার কারণেই পাকিস্তান বাধ্য হয়ে তাদের সবচেয়ে আধুনিক সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজী’-কে বঙ্গোপসাগরে পাঠায় (যা পরবর্তীতে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিশাখাপত্তনম উপকূলে ধ্বংস হয়)।

স্বাধীন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সূচনা

৭১-এর আগস্টে যে ৮ জন সাবমেরিনার ফ্রান্স থেকে পালিয়ে এসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন জ্যাকপটের সূচনা করেছিলেন, তাঁরাই স্বাধীন বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ নৌবাহিনী’ (Bangladesh Navy) প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

গাজী আবদুর রহমান, মমিন উল্লাহ পাটোয়ারী এবং ওয়াহেদ চৌধুরী-সহ এই বীর সেনানীরা স্বাধীনতার পর নতুন নৌঘাঁটি নির্মাণ, যুদ্ধজাহাজ সংগ্রহ এবং নৌবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে মূল ভূমিকা পালন করেন।

অপারেশন জ্যাকপট এবং ১৯৭১-এর নৌ-গেরিলা যুদ্ধের এই অপ্রকাশিত দিকগুলো আপনার এই বিষয়ক সার্বিক ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে আশা করি।

ইতিহাসের পাতায় অমর আত্মঘাতী বীরত্ব

কোনো নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ না থাকা সত্ত্বেও, কোনো ভারী নৌ-বহর ছাড়া কেবল একটি করে পানির নিচের লিমপেট মাইন, বুকভরা সাহস আর এক জোড়া ফিন্স পায়ে দিয়ে যারা সমুদ্র ও নদীর তলদেশে মৃত্যুবাণ নিয়ে নেমে গিয়েছিলেন তাঁরা কেবল মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন বীরত্বের জীবন্ত কিংবদন্তি।

অপারেশন জ্যাকপটের নৌ-কমান্ডোরা প্রমাণ করেছিলেন যে, মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য বাঙালি যুবকরা বুকে মাইন বেঁধে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্টের সেই অন্ধকার রাতে বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা-পশুর নদীর পানিতে যে বিস্ফোরণের ঢেউ জেগেছিল, তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের সুপ্রভাতে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নৌ-কমান্ডোদের এই বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও অদম্য সাহসিকতা চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jul 25, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 2, 2026

/

Post by

বিগত ৫৪-৫৫ বছর ধরে একদল পঙ্গপাল প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যে, ১৯৭১ সালে ভারত নাকি বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি, বরং পাকিস্তান ভেঙে এদেশকে লুটপাট করেছে। এমনকি অতি অবাস্তব দাবি করা হয় যে, এদেশের কলকারখানা, কোটি কোটি টাকার অস্ত্র, এমনকি বদনা পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনী লুট করে নিয়ে গেছে!

Jun 30, 2026

/

Post by

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটি) সারা দেশকে একটি বিশাল বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিশেষ করে ‘গণহত্যা নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’-এর মাঠপর্যায়ের জরিপ ও নথিপত্র গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও সামরিক প্যাটার্ন বা বিন্যাস আমাদের চোখে পড়ে। সেটি হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জেলাগুলোর তুলনায় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বধ্যভূমি ও গণকবরের সংখ্যা এবং নথিভুক্ত গণহত্যার হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

Jun 18, 2026

/

Post by

বংশপরম্পরায় বা চায়ের আড্ডায় বাঙালি পরিবারের মাঝে মাঝে এমন কিছু বিতর্ক তৈরি হয়, যা আপাতদৃষ্টে সরল মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ইতিহাস, রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। উদ্দীপকে উল্লিখিত ভাতিজা এবং ৬০ বছরের চাচার মধ্যকার কথপোকথনটি কেবল একটি পারিবারিক যুক্তিতর্ক নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিহাসের খণ্ডিত ধারণার একটি জীবন্ত প্রতিফলন।

May 2, 2026

/

Post by

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই প্রিয় ভূখণ্ডের এমন কোনো জনপদ, এমন কোনো গ্রাম বা মহল্লা নেই যেখানে একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) তাদের খুনে থাবা বসায়নি। মানচিত্রের ওপর কম্পাস ঘুরিয়ে যেখানেই বৃত্ত এঁকেছি, সেখান থেকেই বের হয়ে এসেছে গণকবর আর বধ্যভূমির হাহাকার।

Apr 27, 2026

/

Post by

২৫ মার্চ, ১৯৭১। বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত। সেই রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক এক নৃশংস নিধনযজ্ঞের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এই যজ্ঞের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। সেই রাতে হানাদার বাহিনী কেবল সাধারণ মানুষকেই হত্যা করেনি, তারা বেছে বেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর চালিয়েছিল বর্বরোচিত আক্রমণ।

Jul 25, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 2, 2026

/

Post by

বিগত ৫৪-৫৫ বছর ধরে একদল পঙ্গপাল প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যে, ১৯৭১ সালে ভারত নাকি বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি, বরং পাকিস্তান ভেঙে এদেশকে লুটপাট করেছে। এমনকি অতি অবাস্তব দাবি করা হয় যে, এদেশের কলকারখানা, কোটি কোটি টাকার অস্ত্র, এমনকি বদনা পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনী লুট করে নিয়ে গেছে!

Jun 30, 2026

/

Post by

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটি) সারা দেশকে একটি বিশাল বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিশেষ করে ‘গণহত্যা নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’-এর মাঠপর্যায়ের জরিপ ও নথিপত্র গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও সামরিক প্যাটার্ন বা বিন্যাস আমাদের চোখে পড়ে। সেটি হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জেলাগুলোর তুলনায় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বধ্যভূমি ও গণকবরের সংখ্যা এবং নথিভুক্ত গণহত্যার হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

Jun 18, 2026

/

Post by

বংশপরম্পরায় বা চায়ের আড্ডায় বাঙালি পরিবারের মাঝে মাঝে এমন কিছু বিতর্ক তৈরি হয়, যা আপাতদৃষ্টে সরল মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ইতিহাস, রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। উদ্দীপকে উল্লিখিত ভাতিজা এবং ৬০ বছরের চাচার মধ্যকার কথপোকথনটি কেবল একটি পারিবারিক যুক্তিতর্ক নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিহাসের খণ্ডিত ধারণার একটি জীবন্ত প্রতিফলন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.