মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ – দ্বিজাতি তত্ত্বের ট্র্যাজেডি, পূর্ব পাকিস্তান ও 'পরাজিত বিজয়ী'
১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট বিশ্বের মানচিত্রে ধর্মের ওপর ভিত্তি করে 'পাকিস্তান' নামক রাষ্ট্রের জন্ম হলেও, তার জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর শেষ ১৪ মাসের জীবন কাটান এক গভীর বিষাদ, একাকীত্ব, মোহভঙ্গ এবং নীরব অনুশোচনার মধ্য দিয়ে। যে দ্বিজাতি তত্ত্বের (Two-Nation Theory) উপর দাঁড়িয়ে জিন্নাহ ভারত ভাগ করেছিলেন, তা যে কেবল একটি অদূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল ছিল এ সত্য তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রাষ্ট্র গঠনের পরপরই।

TruthBangla

উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো বৈপরিত্যময় ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। একদিকে তিনি পাকিস্তানের সমর্থকদের কাছে 'কায়েদে আজম' বা মহান নেতা, অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তিনি এমন এক 'পরাজিত বিজয়ী' (Victorious Loser), যিনি জীবনের সায়াহ্নে এসে নিজের গঠিত রাষ্ট্রের ভিত্তি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চরম ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ করে গিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট বিশ্বের মানচিত্রে ধর্মের ওপর ভিত্তি করে 'পাকিস্তান' নামক রাষ্ট্রের জন্ম হলেও, তার জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শেষ ১৪ মাসের জীবন কাটান এক গভীর বিষাদ, একাকীত্ব, মোহভঙ্গ এবং নীরব অনুশোচনার মধ্য দিয়ে।
যে দ্বিজাতি তত্ত্বের (Two-Nation Theory) উপর দাঁড়িয়ে জিন্নাহ ভারত ভাগ করেছিলেন, তা যে কেবল একটি অদূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল ছিল এ সত্য তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রাষ্ট্র গঠনের পরপরই। পাঞ্জাব ও বাংলার রক্তক্ষয়ী বিভাজন, কোটি কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটদের বিমাতাসুলভ আচরণ জিন্নাহর মনে এক গভীর 'উইনার্স রিমোর্স' (Winner's Remorse) বা বিজয়ীর খেদ তৈরি করেছিল।
উপমহাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিন্নাহর জীবনকথা কেবল একটি নতুন দেশের জন্মের গল্প নয়; বরং এটি একটি আদর্শিক বিচ্যুতি, ব্যাক্তিগত একাকীত্ব এবং একটি ভুল রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ট্র্যাজিক মহাকাব্য।
জিয়ারতের নির্জনতা ও শেষ জীবনের অনুশোচনা
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর জীবনের শেষ দিনগুলোর কথা ভাবলে জিয়ারতের (বালুচিস্তান) সেই স্যাঁতসেঁতে শীতল আবহাওয়া এবং কোয়েটার নির্জন কুটির ভেসে ওঠে। যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত জিন্নাহ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি, তখন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. এলাহী বখশের সাথে তাঁর যে সংলাপ হয়েছিল, তা ইতিহাসের অন্যতম এক হৃদয়বিদারক দলিল।
মোহাম্মদ মোদাব্বেরের লেখা এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক জুন ১৯৮১ সালে প্রকাশিত “ইতিহাস কথা কয়” গ্রন্থে ড. এলাহী বখশের সাথে জিন্নাহর সেই ঐতিহাসিক কথোপকথনটি লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিজের জীবনের চরম ব্যর্থতা ও পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে জিন্নাহ ক্ষোভ ও অনুশোচনা প্রকাশ করে ড. এলাহী বখশকে বলেছিলেন:
“দেখ ডাক্তার, আমি জীবনে দুটি ভুল করেছি তাও পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে। প্রথম ভুল করেছি লাহোর প্রস্তাবকে বিকৃত করে, যা দেশের একজন নেতা হিসেবে আমার পক্ষে আদৌ উচিত হয় নি। আমি দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব মানবে না। তারা নিশ্চয়ই স্বাধীন হয়ে যাবে। আর এর অন্যতম কারন হচ্ছে, ওদের ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ। পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে ওদের ত্যাগের জন্যই এসেছে, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা ওদের প্রতি অবিচার করছে।”
“…আমার দ্বিতীয় ভুল, আমি ঢাকায় গিয়ে করেছি। গভর্ণর জেনারেল হিসেবে ভাষা সমস্যা নিয়ে কথা বলা আমার উচিত হয়নি। আসলে ভাষা প্রশ্নের মীমাংসা পার্লামেন্ট করতে পারত। কিন্তু আমি কয়েকজন পূর্ব পাকিস্তানী নেতার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে ভাষার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্র ও জনগনের যে দৃঢ় মনোভাব লক্ষ্য করেছি তাতে আমি বিশ্বাস করি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র-ভাষা করার দাবী তাদের অযৌক্তিক নয়।”
এই উক্তিটি কেবল একটি মৌখিক স্বীকারোক্তি নয়, এটি ছিল ভবিষ্যৎ দর্শনের মতো এক নির্মম সত্য। জিন্নাহ মৃত্যুর আগেই টের পেয়েছিলেন, যে পূর্ব বাংলার মুসলিমদের বিপুল জনসমর্থন তাঁকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের আসনে বসিয়েছিল, সেই বাঙালিদের ভাষার ওপর আঘাত হেনে এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের স্বায়ত্তশাসনের মূল চেতনাকে বিকৃত করে তিনি মূলত পাকিস্তানের ধ্বংসের বীজ বুনে দিয়েছেন।
অনুরূপ সুর পাওয়া যায় ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ভন টানজেলম্যানের (Alex von Tunzelmann) বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ Indian Summer-এ। ব্রিটিশ নথিপত্র এবং তৎকালীন লিয়াকত আলী খানের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্র উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, জীবনের শেষভাগে জিয়ারতে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন জিন্নাহ ব্যক্তিগত আলাপে আক্ষেপ করে পাকিস্তান সৃষ্টিকে তাঁর জীবনের "সবচেয়ে বড় ভুল বা ব্লান্ডার" (Biggest Blunder) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যে পাকিস্তান তিনি তৈরি করেছিলেন, সেই পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তাঁর শেষ দিনগুলোতে জিন্নাহর সাথে একপ্রকার দুর্ব্যবহার শুরু করেছিলেন এবং জিন্নাহকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর 'বড় মানুষের দুঃখ' (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩০ মার্চ, ২০২০) নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, জিন্নাহ একবার ক্ষোভে লিয়াকত আলী খানকে বলেছিলেন:
"নিজেকে তুমি এখন মস্ত মানুষ মনে করছো তাই না? তুমি কে? কিচ্ছু না৷ আমিই তোমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছি। ...কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি যে, আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করে ফেলেছি।"
ব্যক্তিসত্তা, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও চরম স্ববিরোধিতা
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসের খুব কম নেতার মধ্যেই দেখা যায়। ধর্মান্ধ মুসলিমদের কায়েদে আজম হলেও, জিন্নাহর নিজস্ব জীবনযাপন ছিল সম্পূর্ণরূপে পশ্চিমা ও সেক্যুলার।
পশ্চিমা জীবনধারা ও বৈপরীত্য: জিন্নাহর জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছিল ইংল্যান্ডে। নিখুঁত ইংরেজি উচ্চারণ, দামী সাহেবি স্যুট, চুরুট আর পশ্চিমা আদবকায়দা ছিল তাঁর মজ্জাগত। তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন শিয়াপন্থী খোজা সম্প্রদায়ের সদস্য (যাদের পূর্বপুরুষেরা হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন)। দ্বিজাতি তত্ত্বের মাধ্যমে যারা মুসলমানদের জন্য আলাদা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন, সেই জিন্নাহ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা শরিয়া আইন সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞই ছিলেন।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ১৯৪৭ সালের ১৩ই আগস্ট। বিজয়ী যখন পরাজিত, রাষ্ট্র ভাগ তখন সুনিশ্চিত ১৪ই আগস্ট আত্মপ্রকাশ করবে পাকিস্তান। জিন্নাহ ১৩ই আগস্ট দুপুরে তাঁর ঘনিষ্ঠ কিছু অনুসারী ও কূটনৈতিকদের মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু খাবারের টেবিলে বসার পর হঠাৎ একজন মনে করিয়ে দিল যে তখন পবিত্র রমজান মাস চলছে এবং উপস্থিত অনেকেই রোজা রেখেছেন! চরম বিব্রত জিন্নাহ দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ বাতিল করে রাতে নৈশভোজের ব্যবস্থা করেন। যে মানুষটি ধর্মের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি মানুষকে আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখালেন, তিনি নিজেই রমজানের খবর রাখতেন না!
স্ত্রীর মৃত্যু ও একমাত্র কন্যা দিনা ওয়াড়িয়ার ত্যাগ: জিন্নাহর পারিবারিক জীবন ছিল গভীর ট্র্যাজেডিতে ভরা। তিনি বিয়ে করেছিলেন তাঁর চেয়ে ২৪ বছরের ছোট পার্সি ধনকুবেরের কন্যা রতনবাই পেটিটকে (রুটি জিন্নাহ)। কিন্তু জিন্নাহর চরম রাজনৈতিক ব্যস্ততা ও একগুঁয়ে স্বভাবের কারণে এই বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। ১৯২৯ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে রতনবাই মারা যান।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর জিন্নাহর একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেন তাঁর বোন ফাতেমা জিন্নাহ। কিন্তু জিন্নাহর জীবনের সবচেয়ে বড় পারিবারিক আঘাতটি আসে তাঁর একমাত্র কন্যা দিনা জিন্নাহর (Dina Wadia) কাছ থেকে।
দিনা যখন বোম্বাইয়ের এক ধনাঢ্য পার্সি ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াডিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ধ্বজাধারী জিন্নাহ তীব্র আপত্তি জানান। তিনি দিনাকে একজন মুসলিম পাত্র বিয়ে করার নির্দেশ দেন। জবাবে দূরদর্শী ও স্বাধীনচেতা কন্যা দিনা বাবাকে এক ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন:
"বাবা, ভারতে লাখ লাখ মুসলিম মেয়ে থাকা সত্ত্বেও তুমি কেন একজন পার্সি মেয়েকেই বিয়ে করেছিলে?"
জিন্নাহ তাঁর এই কথার কোনো উত্তর দিতে পারেননি। পরিণতিতে পিতা-কন্যার সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়। জিন্নাহ মেয়েকে ত্যাগ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর দিনা পাকিস্তানে যাননি; তিনি ভারতের বোম্বাইয়ে নিজের প্রিয় ভিটেবাড়িতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যে জিন্নাহ লক্ষ লক্ষ মুসলিম পরিবারের জন্য 'পাকিস্তান' উপহার দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের কন্যাই সেই নতুন রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করে ভারতে থেকে গিয়েছিলেন।
বোম্বাইয়ের মোহ এবং অখণ্ড পাঞ্জাব ও বাংলা নীতির স্ববিরোধী রাজনীতি
জিন্নাহর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে মতাদর্শের চেয়ে বেশি কাজ করেছিল কৌশলগত রাজনৈতিক চাল এবং ব্যক্তিগত ইগো (Ego)।
বোম্বাইয়ের মালাবার হিলস ও ভারতীয় পরিচয়ের আকুতি
জিন্নাহর হৃদয়ের অন্তস্তলে সবসময় একটি শহরই বাস করত বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই)। সেখানকার অভিজাত মালাবার হিলসে অবস্থিত তাঁর সাধের বাংলোটি ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। জিন্নাহ কখনো ভাবেননি যে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভারতের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক শত্রুভাবাপন্ন হবে। তিনি আশা করেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তান আমেরিকা ও কানাডার মতো বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে এবং তিনি যখন খুশি বোম্বাইয়ের বাড়িতে ফিরে এসে ছুটি কাটাবেন।
প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তাঁর আত্মজীবনী Beyond the Lines এবং Of Leaders and Icons, from Jinnah to Modi গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দেশভাগের পর ভারতে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার ও প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে জিন্নাহ আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন বোম্বাইয়ে তাঁর মালাবার হিলসের বাড়িটি অধিগ্রহণ বা ভেঙে ফেলা না হয়। জিন্নাহ নেহরুকে লিখেছিলেন, এটি তাঁর প্রাণের বাড়ি এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি সেখানে ফিরবেন।
এমনকি ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিল'-এর অধিবেশনে জিন্নাহ উপস্থিত নেতাদের চমকে দিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন:
"I tell you that I still consider myself to be an Indian." (আমি আপনাদের বলছি, আমি এখনো নিজেকে একজন ভারতীয় বলেই মনে করি।)
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে মানুষটি ভারতের মানচিত্র খণ্ড-বিখণ্ড করলেন, তিনিই মৃত্যুর কয়েক মাস আগে নিজেকে 'ভারতীয়' বলে দাবি করছেন!
পাঞ্জাব ও বাংলা বিভাজনের দ্বিচারিতা
দ্বিজাতি তত্ত্ব অনুযায়ী যদি হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি হয়, তবে তো পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশকেও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু জিন্নাহ যখন দেখলেন যে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করা হচ্ছে, তখন তিনি তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন।
ল্যারি কলিন্স ও ডোমিনিক লাপিয়েরের বিখ্যাত গ্রন্থ Mountbatten and the Partition of India-তে উল্লেখ আছে, পাঞ্জাব বিভাজনের বিরুদ্ধে গিয়ে গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে জিন্নাহ যুক্তি দিয়েছিলেন:
"আপনি বুঝতে পারছেন না কেন, পাঞ্জাব একটি জাতি।" (Punjab is a nation.)
যদি পাঞ্জাবিরা ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে 'একটি জাতি' হতে পারে, তবে পুরো ভারতের হিন্দু-মুসলিম কেন 'এক জাতি' হতে পারল না? এই প্রশ্নের কোনো যুক্তিপূর্ণ উত্তর জিন্নাহর কাছে ছিল না।
একইভাবে বাংলার ক্ষেত্রেও জিন্নাহ চরম সুযোগ সন্ধানী রাজনীতি করেছিলেন। তিনি খণ্ডিত বাংলা চাননি। খণ্ডিত বাংলাকে তিনি 'ক্ষতবশত ও পোকা-খাওয়া পাকিস্তান' (Moth-eaten Pakistan) বলে অভিহিত করেছিলেন।
২০১৭ সালে পাকিস্তানের নামকরা ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল 'Herald'-এর জন্য দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক গবেষক আলি উসমান কাসমিকে বলেছিলেন:
"Similarly, when the United Bengal Plan was floated, Jinnah said it was better that Bengal remained united. He said what was Bengal without Calcutta? It was like asking a man to live without his heart."
অর্থাৎ, জিন্নাহ বুঝেছিলেন কলকাতাকে ছাড়া বাংলা একটি অচল সত্তা। কলকাতা ছিল বাংলার 'হৃদপিন্ড'। তাই যখন শরৎচন্দ্র বসু এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিলে 'স্বাধীন সার্বভৌম সংযুক্ত বাংলা' (United Bengal Plan) প্রস্তাব আনেন, জিন্নাহ তাত্ক্ষণিকভাবে তাতে সমর্থন জানান। জিন্নাহর গোপন আশা ছিল, সম্পূর্ণ বাংলা যদি ভারতের বাইরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকে, তবে সেখানে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের কারণে ভবিষ্যতে গণভোটের মাধ্যমে পুরো বাংলা (কলকাতাসহ) পাকিস্তানের পেটে ঢোকানো সহজ হবে। এটি কোনো বাঙালি প্রীতি ছিল না, ছিল জিন্নাহর ভূরাজনৈতিক কৌশল।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, "পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানকে ভালোবেসে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত হেনে এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের স্বায়ত্তশাসনকে অস্বীকার করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা মূলত নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছেন।"
জাতীয়তাবাদী নেতা থেকে 'কায়েদে আজম': কংগ্রেসের ভুল ও জিন্নাহর ইগো
ইতিহাসে একটি সত্য বারবার উচ্চারিত হয় জিন্নাহ জন্মসূত্রে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' ছিলেন না; তাকে কায়েদে আজম বানিয়েছিল তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং নেহরু-জিন্নাহর মধ্যকার ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্বের সংঘাত।
'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত' থেকে প্রস্থান
রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে জিন্নাহ ছিলেন দাদাভাই নৌরজী, গোপালকৃষ্ণ গোখলে এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের অন্ধ ভক্ত। ১৯০৬ সালে যুক্তরাজ্যে দাদাভাই নৌরজীকে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে বিজয়ী করার জন্য তরুণ জিন্নাহ দিনরাত খেটেছিলেন। গোখলে জিন্নাহ সম্পর্কে বলেছিলেন, "জিন্নাহর মধ্যে কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িকতা নেই, তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেরা দূত।"
কিন্তু ১৯২০-এর দশকে মহাত্মা গান্ধীর রাজনীতিতে আগমন এবং কংগ্রেসের মুসলিম নীতির পরিবর্তনের সাথে সাথে জিন্নাহ দৃশ্যপট থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকেন। গান্ধী যখন খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগের প্রবেশ ঘটালেন, তখন ধর্মনিরপেক্ষ ও আইনমুখী জিন্নাহ তার বিরোধিতা করেছিলেন। জিন্নাহ সতর্ক করেছিলেন যে, রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগ আনলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। কিন্তু কংগ্রেস তাঁর কথায় কান দেয়নি।
দেশভাগের বিপর্যয় প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধী বলেন, "ভারতকে ব্যবচ্ছেদ করা মানে আমার জীবন্ত শরীরকে কেটে দু'টুকরো করা। জিন্নাহ ভাই যে ধর্মভিত্তিক আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তা এই উপমহাদেশে কোনো স্থায়ী শান্তি আনবে না; বরং আগামী প্রজন্মের জন্য বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপণ করবে।"
নেহরুর অবজ্ঞা এবং জিন্নাহর অহংকার (Ego)
১৯২৮ সালের 'নেহরু রিপোর্ট' (মতিলাল নেহরু প্রণীত) এবং ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর জওহরলাল নেহরুর দাম্ভিক মনোভাব জিন্নাহকে চরমভাবে আঘাত করে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ বাজেভাবে হারার পর জিন্নাহ কংগ্রেসের সাথে যৌথ মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু নেহরু তা চরম অবজ্ঞায় প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, "ভারতে আজ দুটি মাত্র শক্তি আছে একটি কংগ্রেস, অন্যটি ব্রিটিশ সরকার।"
ক্ষুব্ধ জিন্নাহ পাল্টা জবাবে বলেছিলেন, "ভারতে তৃতীয় একটি শক্তি আছে, তা হলো মুসলিম লীগ।"
কংগ্রেসের অন্ধ নেহরু-প্রেম, জিন্নাহর ওপর অবজ্ঞা এবং জিন্নাহর নিজের বিশাল 'ইগো' (Ego) তাঁকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পথ থেকে সরিয়ে মুসলিম লীগের একক কাণ্ডারীতে পরিণত করে। জিন্নাহ কংগ্রেসের সাথে রাজনৈতিক দড়কষাকষির একটি বাহু বা 'বার্গেইনিং চিপ' (Bargaining Chip) হিসেবে 'পাকিস্তান' বা মুসলিমদের জন্য আলাদা স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু সেই জিনটি যে বোতল থেকে বেরিয়ে সত্যি সত্যি রক্তক্ষয়ী দেশভাগে রূপ নেবে, তা জিন্নাহ নিজেও ১৯৪০ সালের দিকে ধারণ করতে পারেননি।
জিন্নাহর রাজনীতি ও ইগো প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহরু বলেন, "জিন্নাহর মূল সমস্যা হলো তিনি আধুনিক ভারতের গণতন্ত্র বা গণমানুষের মানসিকতা বোঝেন না, বোঝেন কেবল আইনি দড়কষাকষি ও নিজের একক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। পাকিস্তানের দাবি মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের সার্বিক স্বার্থরক্ষার চেয়ে তাঁর নিজস্ব অহংবোধ এবং কংগ্রেস বিরোধিতার ফল।"
রক্তের হোলিখেলা ও 'উইনার্স রিমোর্স': "আমি এ কী করলাম?"
১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশভাগের সাথে সাথে উপমহাদেশজুড়ে নেমে আসে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা ও শরণার্থী সংকট। পাঞ্জাব ও বাংলায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়, আর দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়।
এই ভয়াবহ নির্মমতা দেখে জিন্নাহর রাজনৈতিক অহংকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। কুলদীপ নায়ার তাঁর আত্মজীবনী Beyond the Lines-এ এক মর্মান্তিক দৃশ্য বর্ণনা করেছেন। দেশভাগের পর জিন্নাহ যখন আকাশপথে দিল্লি থেকে করাচি যাচ্ছিলেন, তখন সামরিক বিমানের জানালা দিয়ে নিচে পাঞ্জাবের জ্বলন্ত গ্রাম, রাস্তায় পড়ে থাকা লাশের স্তূপ আর লাখ লাখ রিফুজি মানুষের দীর্ঘ সারি দেখে জিন্নাহ কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি নিজের মাথায় হাত দিয়ে বার বারবার বিলাপ করে বলে উঠেছিলেন:
"আমি এ কী করলাম! ঈশ্বর, আমি এ কী করলাম!" (What have I done?)
একই তথ্য নিশ্চিত হয় কুলদীপ নায়ারের অপর গ্রন্থ Of Leaders and Icons-এ। জিন্নাহ জীবনে মাত্র দুবার জনসমক্ষে বা ব্যক্তিগতভাবে চোখের জল ফেলেছিলেন। প্রথমবার ফেলেছিলেন ১৯২৯ সালে প্রিয় স্ত্রী রতনবাইয়ের মৃত্যুর পর, কবরস্থানে মাটি দেওয়ার সময়। আর দ্বিতীয়বার ফেলেছিলেন ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরপরই, যখন তিনি লাহোরে গিয়ে ডাকোটা অঞ্চলে হিন্দু ও শিখ শরণার্থীদের করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। হাজার হাজার গৃহহীন, রক্তাক্ত মানুষের দিকে তাকিয়ে কায়েদে আজমের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল অশ্রু। এটিই ছিল জিন্নাহর 'উইনার্স রিমোর্স' বা বিজয়ীর খেদ।
ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল জিন্নাহকে নিয়ে মন্তব্য করেন, "পাকিস্তান মূলত জিন্নাহর জন্য অখণ্ড ভারতে মুসলিমদের অধিকার আদায়ের একটি 'দরকষাকষির হাতিয়ার' (Bargaining Chip) ছিল। কিন্তু জিন্নাহ যখন বুঝতে পারলেন সেই হাতিয়ারটিই একটি খণ্ডিত ও অচল ভূখণ্ডে রূপ নিয়েছে, ততক্ষণে ইতিহাস তাঁর হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।"
পূর্ব পাকিস্তান ও বাঙালিদের প্রতি জিন্নাহর বিমাতাসুলভ আচরণ এবং উক্তির বিশ্লেষণ
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) বাঙালি মুসলিমদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাব বা সিন্ধু অঞ্চলে মুসলিম লীগ এককভাবে জিততে না পারলেও, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বাংলাতেই মুসলিম লীগ সবচেয়ে বড় বিজয় অর্জন করেছিল। অর্থাৎ, জিন্নাহকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়েছিলেন মূলত বাঙালিরা।
কিন্তু ক্ষমতায় বসেই জিন্নাহ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও ঔপনিবেশিক মনোভাব প্রদর্শন করতে শুরু করে।
১৯৪৮ সালের ঢাকা সফর ও ভাষার ওপর বর্বর আঘাত
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে গভর্নর জেনারেল হিসেবে জিন্নাহ জীবনে মাত্র একবারের জন্য পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ১৯ মার্চ ঢাকায় পৌঁছে ২১ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) এক বিশাল জনসভায় তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
"উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। কোনো জাতি একটি সাধারণ রাষ্ট্রভাষা ছাড়া শক্ত ভিত্তির ওপর ঐক্যবদ্ধ হতে এবং কাজ করতে পারে না।"
বাঙালিরা ভেবেছিল রেসকোর্সের প্রতিবাদ হয়তো জিন্নাহর কানে পৌঁছায়নি। কিন্তু ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি যখন একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বললেন, "আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে যাচ্ছে উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই..." তখন উপস্থিত ছাত্রসমাজ ও তরুণ যুবকেরা জিন্নাহর মুখের ওপর সোচ্চার কণ্ঠে "নো! নো!" (না! না!) বলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ওঠেন।
স্মরণীয় যে, জিন্নাহর এই একরোখা ও স্বৈরাচারী আচারের মাধ্যমেই মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর পোঁতা হয়ে গিয়েছিল।
'পঞ্চম বাহিনী'র তকমা ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
বাঙালিদের ন্যায্য দাবিকে জিন্নাহ কোনোদিন ইতিবাচক চোখে দেখেননি। ভাষা আন্দোলনকে তিনি ভারতের চক্রান্ত বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন:
"পাকিস্তানের মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য একটি 'পঞ্চম বাহিনী' (Fifth Column) এবং শত্রুর এজেন্টরা এই ভাষা বিতর্ককে উসকে দিচ্ছে। যারা প্রাদেশিকতার কথা বলে, তারা পাকিস্তানের শত্রু।"
জিন্নাহ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সিভিল-সামরিক আমলাতন্ত্র বিশ্বাস করত যে, বাঙালিদের বাংলা সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা "ইসলামিক নয়", বরং তা "হিন্দু সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত"। ব্রিটিশদের তৈরি 'মার্শাল রেস' (Martial Race বা যুদ্ধবাজ জাতি) তত্ত্ব মাথায় রেখে জিন্নাহ মনে করতেন বাঙালিরা খাটো, শারীরিকভাবে দুর্বল এবং সামরিক বাহিনী বা উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরির অনুপযুক্ত। জিন্নাহর এই বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীতে পঁচিশ বছরের জন্য বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে রেখেছিল।
আবুল আলা মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামী: 'কাফের-এ-আজম' ফতোয়া থেকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ
বর্তমান বাংলাদেশে অতি-উগ্রবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের প্রচারকরা প্রায়শই একটি বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ বা গল্প তৈরি করার চেষ্টা করে যে: "জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান হতো না, আর পাকিস্তান না থাকলে বাংলাদেশ হতো না।" এই গোষ্ঠীটি জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী বা জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জিন্নাহর ছবি ছড়িয়ে দেয় এবং সম্প্রতি ডাকসুর সংগ্রহশালায় পর্যন্ত জিন্নাহর ছবি টানানোর অপচেষ্টা চালিয়েছে।
অথবা, এটি ইতিহাসের চরম সত্য যে, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী ১৯৪৭ সালের আগে জিন্নাহকে ইসলামবিরোধী এবং চরম বিভ্রান্ত নেতা মনে করতেন।
'কাফের-এ-আজম' ও 'জামায়াত-ই-জাহিলিয়াত'
১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে মওদুদী তাঁর একাধিক লেখায় এবং 'তর্জুমানুল কোরআন' সাময়িকীতে জিন্নাহ ও তাঁর মুসলিম লীগকে তীব্র আক্রমণ করেন:
কাফের-এ-আজম ফতোয়া: মওদুদীর মতে, জিন্নাহর লক্ষ্য ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করা, কোনো ইসলামি অনুশাসনের রাষ্ট্র নয়। তাই তিনি জিন্নাহকে 'কায়েদে আজম' (মহান নেতা) না বলে 'কাফের-এ-আজম' (মহাপাপী বা সর্বশ্রেষ্ঠ কাফের) বলে অভিহিত করেছিলেন।
জামায়াত-ই-জাহিলিয়াত: মওদুদী জিন্নাহর মুসলিম লীগকে সরাসরি 'জামায়াত-ই-জাহিলিয়াত' (অজ্ঞতার দল) বা 'নামেমাত্র মুসলমানদের দল' বলতেন। কারণ জিন্নাহ 'ইসলামের হুকুমত' (God's Kingdom) না চেয়ে কেবল 'মুসলমানদের শাসন' (Muslim Nationalism) চেয়েছিলেন।
মওদুদী দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান সৃষ্টির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান তৈরি হয়ে যাওয়ার পর মওদুদী তাঁর অবস্থান বদলে পাকিস্তানে হিজরত করেন এবং সেখানে গিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুবিধা ভোগ করতে শুরু করেন। আজ যারা জামায়াত-শিবিরের ব্যানারে জিন্নাহর বন্দনা করে, তারা মূলত মওদুদীর ঐতিহাসিক ভণ্ডামি ও নিজস্ব অতীত ইতিহাসকেই অস্বীকার করে।
জিন্নাহ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধা থেকে মোহভঙ্গ
বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে জিন্নাহর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির এক চমৎকার ও ঐতিহাসিক বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
তরুণ ছাত্রনেতা ও মুসলিম লীগের দিনগুলো: বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' পাঠ করলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের আগে তরুণ শেখ মুজিব ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ ও অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে তরুণ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য রাতদিন খেটেছেন। তখন জিন্নাহ ছিলেন তাঁদের স্বপ্নের নেতা।
১৯৪৮-এর মোহভঙ্গ ও রাজপথে প্রতিবাদ: কিন্তু ১৯৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহ যখন ঢাকায় এসে রেসকোর্স ও কার্জন হলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিলেন, তখন তরুণ শেখ মুজিবের মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। জিন্নাহর এই একরোখা ডিক্টেটরসুলভ আচরণের প্রতিবাদে শেখ মুজিব তৎক্ষণাৎ অন্য ছাত্রদের সাথে রাজপথে নেমে আসেন।
১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। জিন্নাহর মৃত্যুর পর যখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকদের বৈষম্যমূলক আচরণ সুস্পষ্ট রূপ নেয়, তখন শেখ মুজিব উপলব্ধি করেন যে, কেবল ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি এই রাষ্ট্র বাঙালিদের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি দিতে পারবে না।
পূর্ব পাকিস্তানের শাসন প্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, "ধর্মের দোহাই দিয়ে বেশিদিন বাঙালির পেট ভরানো যাবে না, সংস্কৃতিকেও মুছে ফেলা যাবে না। জিন্নাহ যে বিমাতাসুলভ শাসনের বীজ বুনে গেছেন, তা একদিন এই পাকিস্তানকে ভেঙে দুই টুকরো করবে।"
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সচেতন দূরত্ব
বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জিন্নাহর অতীত অবদানকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি, কিন্তু জিন্নাহর শোষক নীতিকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন।
ছবি না রাখা: প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কখনোই জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে রাখতেন না। তবে কেন্দ্র থেকে কোনো পশ্চিম পাকিস্তানি প্রতিনিধি বা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বৈঠক হলে সৌজন্যতার খাতিরে সাময়িকভাবে ছবি টাঙানো হতো।
দিবস পালন না করা: আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধু কখনোই জিন্নাহর জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতেন না।
মাজার জিয়ারত: তবে রাজনৈতিক সৌজন্যের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু যতবার রাজনৈতিক কাজে বা গোলটেবিল বৈঠকে করাচি গেছেন, তিনি জিন্নাহর মাজার (Mazar-e-Quaid) জিয়ারত করেছেন। যেমন ১৯৬৯ সালের আগস্টে করাচি সফরকালে তিনি জিন্নাহর মাজারে গিয়ে গায়েবানা দোয়া করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর এই আচরণ প্রমাণ করে যে, তিনি ইতিহাসকে জানতেন, কিন্তু জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের রাজনীতিকে বহু আগেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।
করাচির ধূলিমলিন রাজপথ: জিন্নাহর করুণ পরিণতি ও পাকিস্তানের পতন
পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান বা গভর্নর জেনারেল হিসেবে জিন্নাহর শেষ পরিণতি ছিল শেক্সপীয়ারের কোনো ট্র্যাজেডির চেয়েও নির্মম।
শেষ যাত্রা ও মাছির উপদ্রব: ১৯৪৮ সালের শুরুতে জিন্নাহর যক্ষ্মা রোগ চরম আকার ধারণ করে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে বালুচিস্তানের পাহাড়ঘেরা জিয়ারতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। তাঁর শরীরের ওজন কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৪০ কেজিতে। যক্ষ্মা পরবর্তীতে ফুসফুসের ক্যান্সারে রূপ নিয়েছিল।
১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর জিন্নাহকে অত্যন্ত মুমূর্ষু অবস্থায় একটি সামরিক বিমানে করে কোয়েটা থেকে করাচিতে আনা হয়। কিন্তু করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর রাজকীয় কোনো অভ্যর্থনা বা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। জিন্নাহকে যে পুরনো অ্যাম্বুলেন্সে করে গভর্নর হাউসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, করাচির প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছে সেই অ্যাম্বুলেন্সের পেট্রোল শেষ হয়ে যায়!
তৎকালীন তীব্র গরমে করাচির ধূলিমলিন রাজপথে গভর্নর জেনারেলের গাড়ি এক ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকে। জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহ তাঁর স্মৃতিকথা My Brother-এ সেই করুণ দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন:
"সেদিন করাচিতে প্রচণ্ড গরম ছিল। অসুস্থ জিন্নাহ নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে বাতাস ছিল না। আর জিন্নাহর নিস্তেজ শরীরের ওপর অগণিত মাছি এসে ঘুরছিল ও বসছিল... আমি তোয়ালে দিয়ে মাছি তাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। কায়েদে আজম অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।"
একটি রাষ্ট্রের জনক, যার ইশারায় কোটি কোটি মানুষ স্থানান্তরিত হলো, সেই জিন্নাহ করাচির রাস্তায় এক ঘণ্টা ধরে পেট্রোলহীন অ্যাম্বুলেন্সে মাছির কামড় খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার অপেক্ষায় ছিলেন! ঘটনার পেছনের কারণ আজও রহস্যময় কেউ জানতে চায়নি কেন শেষ মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সের তেল শেষ হলো, নাকি এটি লিয়াকত আলী খানের সরকারের কোনো পরিকল্পিত অবহেলা ছিল!
গভর্নর হাউসে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাত ১০টা১৫ মিনিটে জিন্নাহ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। গোলাপী মার্বেল পাথরে তাঁর বিশাল সমাধি তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু যে রাষ্ট্রের ভিত্তি তিনি গড়েছিলেন, তা ততক্ষণে ধসে পড়তে শুরু করেছে।
জিয়ারতে জিন্নাহর মানসিক অবস্থা নিয়ে ড. এলাহী বখশ মন্তব্য করেন, "জীবনের শেষ দিনগুলোতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক হিসেবে তাঁর মধ্যে কোনো আত্মতৃপ্তি ছিল না; ছিল এক বিষাদময় অনুশোচনা। তিনি বুঝেছিলেন, যে ক্ষমতার রাজনীতি তিনি শুরু করেছিলেন, তা তাঁকেই শেষ বয়সে একাকী ও নিঃসঙ্গ করে ফেলেছে।"
লিয়াকত আলী খান ও সংখ্যালঘুদের অধিকার ছাঁটাই
জিন্নাহ মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে (১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট) পাকিস্তানের গণপরিষদে এক বিখ্যাত ধর্মনিরপেক্ষ ভাষণ দিয়েছিলেন:
"You may belong to any religion, caste or creed that has nothing to do with the business of the State... We are starting in the days where there is no discrimination, no distinction between one community and another."
জিন্নাহ তাঁর প্রথম ক্যাবিনেটে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের মতো একজন নিম্নবর্ণের হিন্দুকে আইনমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কিন্তু জিন্নাহর মৃত্যুর ৬ মাসের মধ্যেই লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের মার্চে গণপরিষদে 'উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব' (Objectives Resolution) পাস করেন। এর মাধ্যমে জিন্নাহর সেই নামেমাত্র সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিকে চিরতরে ছুড়ে ফেলে পাকিস্তানকে একটি উগ্র ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
গণপরিষদে লিয়াকত আলী খানের এই সাম্প্রদায়িক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সেদিন মাত্র একজন মুসলিম সদস্য শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি মিঞা ইফতিকারউদ্দিন। কিন্তু সংখ্যালঘুদের অধিকার ছেঁটে ফেলার সেই প্রক্রিয়া থামেনি। পরিণামে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকেও জীবন বাঁচাতে পাকিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্রে লিখেছিলেন, "জিন্নাহ সাহেব আমাকে যে অসাম্প্রদায়িক ও ন্যায়ভিত্তিক পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই সেই ধারণার সমাধি ঘটেছে। বর্তমান পাকিস্তান অমুসলিম ও বাঙালিদের জন্য একটি বন্দিশালা ছাড়া আর কিছু নয়।"
জিন্নাহর জীবন, স্ববিরোধিতা ও রাজনৈতিক পরিণতি
উপমহাদেশের রাজনীতিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভূমিকা, বক্তব্য ও পরিণতি একনজরে বোঝার জন্য নিচে একটি সংক্ষেপিত সারণী প্রদান করা হলো:
ঐতিহাসিক ক্ষেত্র | জিন্নাহর অবস্থান ও ঘটনা | ঐতিহাসিক উৎস / বইয়ের রেফারেন্স | বাস্তব পরিণতি ও মূল্যায়ন |
পূর্ব পাকিস্তান ও ভাষা | উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; বাঙালিদের আন্দোলন 'পঞ্চম বাহিনীর' কাজ। | রেসকোর্স ও কার্জন হলের ভাষণ (মার্চ ১৯৪৮); মোদাব্বেরের ইতিহাস কথা কয় | ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়। |
শেষ জীবনের অনুশোচনা | পাকিস্তান সৃষ্টি জীবনের 'সবচেয়ে বড় ভুল'; লাহোর প্রস্তাব বিকৃতি অন্যায় ছিল। | ড. এলাহী বখশের স্মৃতিকথা; Alex von Tunzelmann-এর Indian Summer | মৃত্যুর আগে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চরম অনুশোচনা। |
অখণ্ড বাংলা ও পাঞ্জাব | পাঞ্জাব এক জাতি; অখণ্ড বাংলা স্বাধীন থাক, কারণ কলকাতা হলো 'হৃদপিণ্ড'। | Collins & Lapierre-এর Mountbatten & Partition; Ayesha Jalal (Herald) | স্ববিরোধী নীতি; দ্বিজাতি তত্ত্বের নিজস্ব অসারতা প্রমাণ। |
ভারতের সাথে সম্পর্ক | বোম্বাইয়ে ফেরা; "I still consider myself to be an Indian." | Kuldip Nayar-এর Beyond the Lines; করাচি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ সেশন (১৯৪৭) | চিরশত্রুতার জন্ম; নিজের সাধের বোম্বাইয়ের বাড়িতে আর কোনোদিন ফিরতে না পারা। |
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার | পশ্চিমা পোশাক, চুরুট; কন্যা দিনা ওয়াড়িয়ার পার্সি বিয়েকে প্রত্যাখ্যান। | দিনা ওয়াড়িয়ার জীবনী ও ঐতিহাসিক সাক্ষ্য | পরিবারের বিচ্ছিন্নতা; কন্যা দিনা কর্তৃক পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান ও ভারতে অবস্থান। |
মওদুদী ও জামায়াত | জিন্নাহ হলেন 'কাফের-এ-আজম'; মুসলিম লীগ হলো 'জামায়াত-ই-জাহিলিয়াত'। | মওদুদীর তর্জুমানুল কোরআন (১৯৩৯-৪৫) | রাজনৈতিক সুবিধাবাদ; পরবর্তীতে জামায়াত কর্তৃক জিন্নাহর মিথ্যা বন্দনা। |
বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি | শুরুতে মুসলিম লীগ কর্মী; ১৯৪৮-এর পর থেকে কঠোর বিরোধী ও ভাষা সৈনিক। | শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী | দ্বিজাতি তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ। |
করুণ মৃত্যু | করাচির রাজপথে তেলের অভাবে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্সে মাছি তাড়ানোর দৃশ্য। | ফাতেমা জিন্নাহর My Brother | রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম অবহেলা ও এক বিষাদময় নিঃসঙ্গ প্রস্থান। |
জিন্নাহ, দেশভাগ ও ইতিহাসের আড়ালে থাকা কিছু দলিল
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ভারত ভাগ ও তৎকালীন ভূরাজনীতি সম্পর্কিত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নথিভিত্তিক তথ্য নিচে উল্লেখ করা হলো।
ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান (১৯৪৬) ও জিন্নাহর শেষ নমনীয়তা: জিন্নাহ শুরু থেকেই পৃথক রাষ্ট্রের প্রশ্নে পুরোপুরি অনমনীয় ছিলেন না। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশদের আনা 'ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান'-এ কেন্দ্রকে দুর্বল রেখে স্বায়ত্তশাসিত তিন গুচ্ছের (Group A, B, C) এক অখণ্ড ভারতের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেখানে বাংলা ও আসাম ছিল 'গ্রুপ সি'-তে। জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ শুরুতে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ১০ই জুলাই ১৯৪৬ সালে জওহরলাল নেহরু এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে কংগ্রেস স্বাধীন গণপরিষদে গিয়ে এই পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে পারে। নেহরুর এই বক্তব্যের পরেই জিন্নাহ চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং ১৬ই আগস্ট 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'-র ডাক দেন।
যক্ষ্মার গোপনীয়তা ও মাউন্টব্যাটেনের অনুশোচনা: জিন্নাহর গুরুতর যক্ষ্মা রোগ ও ফুসফুসের ক্ষয়ের তথ্যটি তাঁর বম্বেভিত্তিক চিকিৎসক ড. জল প্যাটেল ছাড়া সবার কাছে পরম গোপনে রাখা হয়েছিল। লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর পরবর্তী সাক্ষাৎকারগুলোতে (যা ল্যারি কলিন্স ও ডোমিনিক লাপিয়েরে-র Freedom at Midnight গ্রন্থে বর্ণিত) স্বীকার করেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার বা কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি জানত যে জিন্নাহর আয়ু আর মাত্র কয়েক মাস, তবে তারা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের প্রক্রিয়াটি কিছুদিন পিছিয়ে দিত।
জিন্নাহর গোপন অসুস্থতা প্রসঙ্গে লর্ড মাউন্টব্যাটেন বলেন, "আমি যদি জানতাম জিন্নাহ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন, তবে আমি দেশভাগের প্রক্রিয়াটি অন্তত কয়েক মাস পিছিয়ে দিতাম। জিন্নাহ ছাড়া মুসলিম লীগকে এক সুতোয় বেঁধে পৃথক পাকিস্তান তৈরি করার মতো দ্বিতীয় কোনো নেতা ছিল না।"
র্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিতর্ক: সীমানা নির্ধারণকারী স্যার সাইরিল র্যাডক্লিফ কোনো প্রকার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ছাড়াই মাত্র ছয় সপ্তাহে ভারতের সীমান্ত আঁকেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম (CHT): ৯৭% অমুসলিম (বৌদ্ধ ও পাহাড়ি) জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তার যুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দিয়ে দেওয়া হয়।
মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ার বিনিময়: বিপরীতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ার কিছু অংশ কলকাতার গঙ্গার নাব্যতা রক্ষার সুবিধার্থে ভারতে রেখে দেওয়া হয়।
পোশাকের প্রতীকী রাজনীতি (১৯৩৭): রাজনৈতিক জীবনের প্রথমার্ধে খাঁটি বিলাতী স্যুটে অভ্যস্ত জিন্নাহ ১৯৩৭ সালের মুসলিম লীগের লখনউ অধিবেশনে এসে হঠাৎ নিজের পোশাক পরিবর্তন করেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী সাফা, শেরওয়ানি এবং 'কারাকুল টুপি' (যা পরে 'জিন্নাহ টুপি' নামে পরিচিত হয়) পরা শুরু করেন। এটি ছিল মূলত সাধারণ মুসলিম জনমানুষ ও আলেম সমাজের কাছে নিজেকে ধর্মের প্রতীকী 'কায়েদে আজম' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের আশাভঙ্গ ও পদত্যাগপত্র (১৯৫০): জিন্নাহ পাকিস্তানকে অসাম্প্রদায়িক দেখাতে বঙ্গীয় নিম্নবর্ণের (দলিত) নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের সভাপতি এবং পরবর্তীকালে প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী করেছিলেন। কিন্তু জিন্নাহর মৃত্যুর পর ১৯৫০ সালেই যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। তাঁর ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন যে, জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তান পুরোপুরি সংখ্যালঘুবিদ্বেষী ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ নিয়েছে, যেখানে দলিত ও বাঙালিদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা ও আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা
আজকের বাংলাদেশে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য বা ইতিহাসকে বিকৃত করার জন্য জিন্নাহকে নতুন করে নায়ক বানানোর চেষ্টা করছে, তারা মূলত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্যটিকে চেপে যেতে চায়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়:
১. জিন্নাহ নিজেই তাঁর শেষ জীবনে বুঝে গিয়েছিলেন যে দ্বিজাতি তত্ত্ব একটি চরম ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
২. জিন্নাহ নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের আচরণ ছিল 'বিমাতাসুলভ'।
৩. ১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বকে ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছে।
জিন্নাহর জীবন ইতিহাসবিদদের জন্য এক মহতী শিক্ষা। ধর্মের নাম ভাঙিয়ে, কৃত্রিম আবেগ তৈরি করে এবং জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পাকিস্তান আজও একটি ব্যর্থ, সামরিক নিয়ন্ত্রিত এবং অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া রাষ্ট্র হিসেবে ধুঁকছে, আর জিন্নাহর প্রত্যাখ্যান করা বাঙালি জাতি আজ বিশ্বের বুকে এক স্বাধীন স্বকীয়তায় ভাস্বর।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক পরাজিত বিজয়ী, যার তৈরি করা পাকিস্তান তাঁর নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে রয়ে গেছে। ইতিহাস তাঁকে কোনোদিন ক্ষমা করেনি, করবেও না।















