>
>
রণাঙ্গনে আধ্যাত্মিক দুর্গ - একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্গের নাম মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ
রণাঙ্গনে আধ্যাত্মিক দুর্গ - একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্গের নাম মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ
সব ধর্মীয় গোষ্ঠী পাকিস্তানি জান্তার সহযোগী ছিল না। বরং চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে উৎসারিত বিশ্বখ্যাত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ এবং এর বিস্তৃত সুফি নেটওয়ার্ক একাত্তরে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য 'আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও লজিস্টিক ফ্রন্ট'। মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও এর অধীনস্থ শাখা দরবারগুলো একাত্তরের অবরুদ্ধ দিনগুলোতে স্বাধীনতাকামী হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার জন্য হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল, খাদ্য ও রসদ সরবরাহের মূল ঘাঁটি এবং রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির অবিনাশী উৎস।

TruthBangla

“অধিকার কেউ সহজে দেয় না, কেড়ে নিতে হয়। শোষকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই হলো ইসলামের সত্য পথ। স্বাধীন মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার অধিকার অর্জন করতে হলে রক্ত দিতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে।” - শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (রহ.) [১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে মুক্তিসেনাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বাণী]
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যখনই আমরা পর্যালোচনা করি, আমাদের দৃষ্টি প্রধানত নিবদ্ধ থাকে মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সশস্ত্র বাহিনী, সেক্টর বিভাজন, বীর উত্তম ও বীর বিক্রমদের রণকৌশল এবং সম্মুখ সমরের রক্তক্ষয়ী ঘটনার ওপর। নিঃসন্দেহে এগুলোই ছিল ৯ মাসের মুক্তিসংগ্রাম ও চূড়ান্ত বিজয়ের মূল উপজীব্য। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ফ্রন্ট বা রাজনৈতিক মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের এক প্রলয়ঙ্করী ‘জনযুদ্ধ’ (People's War)। এই জনযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে যেমন কৃষকের লাঙ্গল আর শ্রমিকের হাত স্টেনগানে রূপান্তরিত হয়েছিল, তেমনই সুফি আস্তানা ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোও গড়ে তুলেছিল এক দুর্ভেদ্য ও অলিখিত প্রতিরোধের দুর্গ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান সামরিক জান্তা এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী ধর্মকে চরমভাবে অপব্যবহার করছিল। তারা গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগকে ‘ইসলাম রক্ষা’ ও ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা’ রক্ষার নামে বৈধতা দেওয়ার জন্য শত শত মনগড়া ফতোয়া জারি করে। যখন ধর্মের এই বিষাক্ত অপব্যাখ্যা দিয়ে বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্ত করার নগ্ন চেষ্টা চলছিল, তখন বাংলার সুফি সাধক ও দরবারগুলো কী ভূমিকা পালন করেছিল? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সব ধর্মীয় গোষ্ঠী পাকিস্তানি জান্তার সহযোগী ছিল না। বরং চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে উৎসারিত বিশ্বখ্যাত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ এবং এর বিস্তৃত সুফি নেটওয়ার্ক একাত্তরে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য 'আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও লজিস্টিক ফ্রন্ট'।
মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও এর অধীনস্থ শাখা দরবারগুলো একাত্তরের অবরুদ্ধ দিনগুলোতে স্বাধীনতাকামী হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার জন্য হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল, খাদ্য ও রসদ সরবরাহের মূল ঘাঁটি এবং রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির অবিনাশী উৎস। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সেই অনালোচিত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
সুফি সাহিত্য, ‘মুলকে বাঙ্গাল’ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক শিকড়
একাত্তরে মাইজভাণ্ডার দরবারের দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়াটি কোনো আকস্মিক বা সাময়িক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদুল্লাহ (ক.) কর্তৃক প্রবর্তিত এবং পরবর্তীতে হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (ক.) কর্তৃক বিকশিত মাইজভাণ্ডারী সুফি দর্শনের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহাসিক চেতনার এক স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।
দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতে বাঙালি সত্তার লালন: ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ভারতবর্ষ ত্যাগ করার সময় যে ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)-এর ভিত্তিতে ধর্মের নামে দেশভাগ করেছিল, মাইজভাণ্ডারী সুফি সাধকরা শুরু থেকেই সেই গোঁড়া ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যাখান করেছিলেন। মাইজভাণ্ডারী দর্শনের মূল স্তম্ভ হলো ‘তাওহীদে ادیان’ বা সকল ধর্মের মর্মবাণীর মানবিক ঐক্য এবং অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেম।
পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালি জাতিকে ‘নাকচ’ করে এক কৃত্রিম ‘মুসলিম পাকিস্তান’ গড়তে চেয়েছিল, তখন মাইজভাণ্ডার দরবার সুফি সংগীত, জিকির ও মাহফিলের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের হাজার বছরের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক পরিচয়কে টিকিয়ে রেখেছিল।
সুফি সাহিত্যে ‘মুলকে বাঙ্গাল’ ও সরাসরি ‘বাংলাদেশ’ শব্দের ব্যবহার
বিখ্যাত গবেষক ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিম শাহ্ এবং লেখক মো. মাহবুব উল আলমের ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে যখন সরকারি খাতাপত্রে এই অঞ্চলের নাম ছিল ‘বেঙ্গল’ বা ‘পূর্ব পাকিস্তান’, তখন মাইজভাণ্ডারী সুফি সাধক ও গবেষকেরা তাঁদের রচিত পুঁথি, জিকিরের কাসিদা, মারফতি গান ও পুস্তকে অত্যন্ত সচেতনভাবে এই ভূখণ্ডকে ‘মুলকে বাঙ্গাল’ বা ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে অভিহিত করতেন।
বিশেষ করে, প্রখ্যাত মাইজভাণ্ডারী সুফি সাধক হযরত শাহসুফি সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী (রহ.) তাঁর লিখিত দুর্লভ পুস্তকে কোনো প্রকার অস্পষ্টতা না রেখে সরাসরি ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল সাহিত্যিক শব্দচয়ন মনে হতে পারে, কিন্তু একটি রাজনৈতিক ও সামরিক শাসনের অধীনে থেকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটিকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের মাতৃভূমিকে ‘বাংলাদেশ’ নামে ডাকা ছিল এক সুদূরপ্রসারী আদর্শিক বিদ্রোহ। এই সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক সাধনাই একাত্তরের গণমানুষকে মানসিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে সাহায্য করেছিল।
৫ এপ্রিল ১৯৭১ রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে চট্টগ্রাম শহর ও ঢাকার রাজপথে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়। মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মেজর জিয়াউর রহমান, ক্যাপ্টেন হারুন এবং মেজর রফিক সাহেবের নেতৃত্বে বাঙালি সৈনিক ও জোয়ানরা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও, পাক বাহিনীর বিমান হামলা ও ভারী অস্ত্রের মুখে তাঁদের পিছু হটতে হয়েছিল। সর্বত্র তখন কারফিউ, আগুন আর গণহত্যা। সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ও দিশেহারা অবস্থা।
ঠিক এই ভয়াল ও অনিশ্চিত সময়ে ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল (বাংলা ২২ চৈত্র) ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত হয় গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ ‘বাবাভাণ্ডারী’ (ক.)-এর বার্ষিক পবিত্র ওরশ শরীফ।
ক) পরাধীন দেশে লাল-সবুজ পতাকার মিছিল
অবরুদ্ধ ও আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে তৎকালীন মাইজভাণ্ডার দরবারের সাজ্জাদানশীন ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ ভক্তদের প্রতি এক অভাবনীয় ও সাহসী বার্তা জারি করেন। নির্দেশ দেওয়া হয়:
“পরাধীন দেশে এবার ওরশ পালন হবে না। যে ভক্ত বা মুরিদ ওরশে সমবেত হবেন, তাঁদের অবশ্যই হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে মিছিলসহকারে দরবারে আসতে হবে।”
এপ্রিলের ৫ তারিখ সকালে ফটিকছড়ি ও আশপাশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে হাজার হাজার মাইজভাণ্ডারী অনুসারী হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে সুফি জিকির তুলতে তুলতে দরবার শরীফে সমবেত হতে থাকেন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও পাহারার মুখে হাজার হাজার মানুষের হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকার এই দৃশ্য ছিল এক অসীম সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
জনযুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক প্রভাব
মাইজভাণ্ডার দরবার প্রাঙ্গণে সেদিন প্রকাশ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দরবারের সরাসরি ‘প্রকাশ্য বিদ্রোহ’।
গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ, যারা ধর্মের নামে পাকিস্তানি প্রচারণায় দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, দরবার শরীফে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়তে দেখে তারা স্পষ্ট বার্তা পেয়ে যায়। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলন কোনো অধর্ম নয়, বরং এটি স্বাধিকার ও ন্যায়ের যুদ্ধ। এই একটি ঘটনাই হাজার হাজার গ্রামীণ যুবককে কোনো দ্বিধা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল।

প্রতিরোধের পরিকাঠামো: ‘সেফ হাউজ’, রসদভাণ্ডার ও আত্মত্যাগী মুরিদ নেটওয়ার্ক
যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের সাফল্য নির্ভর করে কেবল অস্ত্রের ওপর নয়, বরং রসদ সরবরাহ (Logistics) এবং নিরাপদ আশ্রয়ের (Safe House) ওপর। ১৯৭১ সালে সেক্টর-১ এর অধীনে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যখন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবহরের ওপর অতর্কিত হামলা চালাতেন, তখন তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপদ আশ্রয় এবং খাবারের সংস্থান। মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও এর অনুসারীরা নিজেদের বিশাল জমিজমা ও অবকাঠামোকে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় উন্মুক্ত করে দিয়ে সেই অভাব পূরণ করেছিলেন।
ময়ূরখিল ও খিরামের কৃষি খামার
খাগড়াছড়ি জেলার ময়ূরখিল এবং ফটিকছড়ির খিরাম এলাকায় মাইজভাণ্ডার দরবারের বিশাল কৃষি খামার, বাগান ও মৎস্য খামার ছিল। দরবারের বিশিষ্ট অনুসারী সৈয়দ লকিয়ত উল্লাহ (রহ.) এবং স্থানীয় সাজ্জাদানশীনদের তত্ত্বাবধানে এই খামারগুলোকে একাত্তরে পরিণত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট ক্যাম্প ও সেফ হাউজে।
বিশ্রাম ও পরিকল্পনা: ভারতগামী তরুণ মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে আসা গেরিলা দলগুলো এই গোপন খামারগুলোতে আশ্রয় নিত। রাতের আঁধারে অপারেশন শেষ করে গেরিলারা এই খামারগুলোতে ফিরে এসে লুকিয়ে থাকতেন এবং পরবর্তী আক্রমণের পরিকল্পনা করতেন।
অস্ত্র ও বার্তা সংরক্ষণ: দরবারের খামারগুলোর গোপন ঘর এবং খড়কুটোর স্তূপের নিচে মুক্তিসেনাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখা হতো।
মুক্তিসেনাদের উন্মুক্ত খাদ্যের জোগান
গেরিলাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল ক্ষুধা। অবরুদ্ধ গ্রামে কেনাকাটা করা বা খাবার তৈরি করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ থেকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, দরবারের অধীনে থাকা পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ধান ও সবজি এবং খামারের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে।
মায়েরা রাতে খিচুড়ি বা ভাত রান্না করে লুকিয়ে পাহাড়ি খামারে পৌঁছাতেন। হাজার হাজার মুক্তিসেনা মাসের পর মাস মাইজভাণ্ডার দরবারের রসদে জীবন বাঁচিয়ে রণাঙ্গনে লড়াই চালিয়ে গেছেন।
অনুসারীদের ত্যাগ ও পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা
মুক্তিবাহিনীকে এভাবে আশ্রয় ও খাবার দেওয়ার খবর গোপন থাকেনি। রাজাকার ও পিস কমিটির দালালরা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে একাধিকবার মাইজভাণ্ডার দরবারের অনুসারীদের বাড়িঘর এবং খামারগুলোতে হামলা চালায়।
দরবারের বহু মুরিদ ও ভক্তকে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করার অপরাধে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও মাইজভাণ্ডারের ‘প্রতিরোধের অবকাঠামো’ (Infrastructure of Resistance) একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি।
ফটিকছড়ির মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ: একাত্তরের অলিখিত সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার
মুক্তিযুদ্ধে মাইজভাণ্ডারী সুফি ঘরানার প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাটস্থ মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ। একাত্তরে এই দরবারটি কার্যত মুক্তি বাহিনীর একটি পূর্ণাঙ্গ সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার বা সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
সাজ্জাদানশীনদের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত: মতিভাণ্ডার দরবার শরীফের তৎকালীন সাজ্জাদানশীন সুফি মওলানা আবুল ফয়েজ শাহ (রহ.) এবং মওলানা আবুল কাসেম মিয়া শাহ (রহ.) নিজেদের পীর পদবী বা সামাজিক নিরাপত্তার পরোয়া না করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁরা দরবার শরীফের হুজরাখানা ও খানেকাহকে মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেন।
জোনাল কমান্ডার মির্জা মনসুর ও মতিভাণ্ডারের মেলবন্ধন
ফটিকছড়ি ও আশপাশের এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা জোনাল কমান্ডার মির্জা মনসুর ছিলেন মতিভাণ্ডার দরবার শরীফের একজন পরম ভক্ত এবং দরবারের ওরশ পরিচালনা কমিটির সভাপতি। ফলে সামরিক কমান্ডের সাথে আধ্যাত্মিক সুফি দরবারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে।
লঞ্চিং প্যাড (Launching Pad): মির্জা মনসুরের নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনী মতিভাণ্ডার দরবারকে ভিত্তি (Base) বানিয়ে নাজিরহাট, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের ব্রিজ-কালভার্ট ধ্বংসের বহু সফল অপারেশন পরিচালনা করে।
তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক: দরবারের চত্বরে সাধারণ ভক্ত সেজে আসা মুক্তিসেনারা পাকিস্তানি বাহিনীর মুভমেন্ট এবং রাজাকারের অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করে জোনাল কমান্ডারের কাছে পৌঁছে দিতেন।
নাজিরহাটের মতো কৌশলগত স্থানে মতিভাণ্ডার দরবার যদি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে কাজ না করত, তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১ নম্বর সেক্টরের বহু গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত।
‘অধিকার কেড়ে নেওয়ার’ বৈপ্লবিক ডাক
একটি দীর্ঘস্থায়ী অসম যুদ্ধে যখন শত্রুপক্ষ আধুনিক ট্যাংক, বিমান ও কামান নিয়ে আক্রমণ চালায়, তখন খালি গায়ে স্টেনগান হাতে লড়াই করা তরুণদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় ‘মনোবল’ এবং ‘নৈতিক বৈধতা’। পাকিস্তানিরা যখন কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলছিল, “পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফরি”, তখন মাইজভাণ্ডার দরবারের সুফি সাধকেরা সেই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হকের বৈপ্লবিক বাণী: মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (রহ.) যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে যে ঐতিহাসিক বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন, তা রণাঙ্গনে বারুদের মতো কাজ করেছিল। তিনি বলেছিলেন:
“অধিকার কেউ সহজে দেয় না, কেড়ে নিতে হয়।”
এই বাক্যটি প্রথাগত নিষ্ক্রিয় আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের এক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। এর ফলে সাধারণ ভক্ত ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে তৈরি হওয়া সব ধরনের ধর্মীয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারেন যে, স্বাধীন মাতৃভূমির অধিকার অর্জনে অস্ত্র তুলে নেওয়া কোনো পাপ নয়, বরং পরম ইবাদত।
‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ – পোস্টার সংরক্ষণ
একাত্তরে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যতম বিখ্যাত পোস্টার ছিল ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’। পাকিস্তানি জান্তার শোষণের চিত্র সংবলিত এই পোস্টারটি রাখা ছিল মাইজভাণ্ডার দরবারের সীমানায়।
একবার বৃষ্টির ঝাপটায় ও কুয়াশায় পোস্টারটি ভিজে ছিঁড়ে গেলে দরবারের প্রবীণ খাদেম ও বুজুর্গরা নিজেরা আঠা তৈরি করে অত্যন্ত যত্ন সহকারে পোস্টারটি আবার দরবারের দেয়ালে টাঙিয়ে দেন। এই ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে দরবারের অবস্থান কতটা সুদৃঢ় ও অকম্পিত ছিল।
সুফি মওলানা মতিউর রহমান শাহের ভবিষ্যদ্বাণী ন্যারেটিভ
এছাড়াও তৎকালীন সময়ে অন্যতম সুফি সাধক মওলানা মতিউর রহমান শাহ (শাহ সাহেব কেবলা) যুদ্ধের বহু আগেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয় নিয়ে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বার্তা প্রদান করেছিলেন।
আধুনিক যুক্তিভিত্তিক ইতিহাসের আলোকেও যদি দেখা হয়, তবে বলতে হয়—চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিসেনাদের কাছে এসব বার্তা ছিল আত্মিক বল বলীয়ান হওয়ার এক বিশাল হাতিয়ার। তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, আউলিয়া ও সুফি সাধকদের দোয়া তাঁদের সাথে রয়েছে; সুতরাং পাক বাহিনীর পরাজয় ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অনিবার্য।
একনজরে মুক্তিযুদ্ধে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও অনুসারীদের ভূমিকা
মহান মুক্তিযুদ্ধে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ, এর শাখা আস্তানা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বহুমুখী অবদান সংক্ষেপে বোঝার জন্য নিচে একটি তথ্যবহুল তালিকা তুলে ধরা হলো:
বিষয়/ক্ষেত্র | মূল কেন্দ্র/স্থান | মূল ব্যক্তিত্ব/সংগঠক | অবদানের ধরন ও ঐতিহাসিক প্রভাব |
আদর্শিক ও রাজনৈতিক বার্তা | মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম | গদিনশীন সাজ্জাদানশীন ও প্রবীণ বুজুর্গগণ | ১. সুফি সাহিত্যে ‘মুলকে বাঙ্গাল’ ও ‘বাংলাদেশ’ শব্দ ব্যবহার। ২. ৫ এপ্রিল ১৯৭১-এ পরাধীন দেশে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলনের সাহসী নির্দেশ। |
সেফ হাউজ ও লজিস্টিক বেস | ময়ূরখিল (খাগড়াছড়ি) ও খিরাম (ফটিকছড়ি) খামার | সৈয়দ লকিয়ত উল্লাহ (রহ.) ও স্থানীয় অনুসারীবৃন্দ | ১. ভারতগামী ও ভারত ফেরত মুক্তিসেনাদের গোপন ট্রানজিট ক্যাম্প। ২. খামারের ধান, গবাদিপশু, পুকুরের মাছ ও সবজি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্তকরণ। |
সামরিক হেডকোয়ার্টার (সাব-সেক্টর) | মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ, নাজিরহাট, ফটিকছড়ি | সুফি মওলানা আবুল ফয়েজ শাহ (রহ.), মওলানা আবুল কাসেম মিয়া শাহ (রহ.) ও জোনাল কমান্ডার মির্জা মনসুর | ১. ১ নম্বর সেক্টরের অলিখিত সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহার। ২. গেরিলা আক্রমণ পরিচালনার লঞ্চিং প্যাড, অস্ত্রাগার ও বার্তা কেন্দ্র। |
মনোবল ও আধ্যাত্মিক প্রেরণা | মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ | শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (রহ.) | ১. “অধিকার কেউ সহজে দেয় না, কেড়ে নিতে হয়” বাণীর মাধ্যমে রণাঙ্গনে নৈতিক বৈধতা প্রদান। ২. ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ পোস্টার সংরক্ষণ ও প্রচার। |
তথ্য ও সহায়তা নেটওয়ার্ক | চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও ফেনী অঞ্চলের শাখা খানেকাহসমূহ | মাইজভাণ্ডারী ভক্ত ও মুরিদ নেটওয়ার্ক | ১. সাধারণ ছদ্মবেশে পাকিস্তানি বাহিনীর মুভমেন্টের গোপন সংবাদ সরবরাহ। ২. আহত চিকিৎসাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মগোপন ও সেবাদান। |
ইতিহাস ও মূল আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বগণ
মাইজভাণ্ডারী তরীকার প্রবর্তন ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে। এটি কাদেরীয়া, চিশতীয়া, নকশবন্দীয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া এই চার প্রধান সূফী ধারার মূল নির্যাস গ্রহণ করে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বিত হয়ে গড়ে ওঠে।
গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮২৬–১৯০৬]
তিনি মাইজভাণ্ডারী তরীকার মূল প্রতিষ্ঠাতা। ১৮২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি মাইজভাণ্ডার গ্রামে তাঁর জন্ম। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের পর তিনি সেখানে শিক্ষকতা ও বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন এবং কাদেরীয়া ধারার বিখ্যাত সাধক হযরত শেখ সৈয়দ আবু শাহমা ছালেহ আল-কাদেরী লাহোরী (রহ.)-এর কাছ থেকে খিলাফত লাভ করেন।
তিনি প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমের ওপর জোর দেন। ১৯০৬ সালে তাঁর ওফাতের পর মাইজভাণ্ডার দরবার একটি পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে রূপ নেয়।
গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ ‘বাবাভাণ্ডারী’ (ক.) [১৮৬৫–১৯৩৭]
হযরত সৈয়দ আহমদুল্লাহ (ক.)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র ও প্রধান খলিফা হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান ‘বাবাভাণ্ডারী’ নামে সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত। তাঁর মাধ্যমে মাইজভাণ্ডারী তরীকা পূর্ব বাংলা ছড়িয়ে সমগ্র ভারতে বিস্তৃত হয়। তাঁর আধ্যাত্মিক আকর্ষণ ও অলৌকিক প্রভাবের কারণে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সকল ধর্মের মানুষ তাঁর দরবারে সমবেত হতো।
হযরত শাহসুফি সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (রহ.) [১৯১০–১৯৮২]
তিনি মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রধান তাত্ত্বিক ও দর্শনের নিয়মতান্ত্রিক রূপকার। তিনি প্রথাগত সূফীবাদকে আধুনিক যুগোপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। মাইজভাণ্ডারী তরীকার মূল দর্শনের ওপর তিনি রচনা করেন কালজয়ী গ্রন্থ ‘বেল্লায়েতে মতোলকা বা গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী’। তাঁর লিখিত বইগুলো মাইজভাণ্ডারী দর্শনের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়।
শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (রহ.) [১৯২৮–১৯৮৮]
তিনি একাধারে উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক সাধক এবং সমাজসংস্কারক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ প্রেরণাদাতা এবং যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবতার সেবায় বিস্তৃত ট্রাস্ট গঠন করে জনকল্যাণে ভূমিকা রাখেন।
মাইজভাণ্ডারী সূফী দর্শন: ‘উসূল-ই-সবআ’ বা সপ্ত-পদ্ধতি
হযরত দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (রহ.) আত্মশুদ্ধি এবং মানবকল্যাণের জন্য কোরআন ও হাদিসের আলোকে মাইজভাণ্ডারী তরীকার ‘উসূল-ই-সবআ’ বা ৭টি বিশেষ মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন। প্রতিটি মূলনীতিই মানুষের নফ্স বা রিপুকে দমন করার জন্য বিন্যস্ত:
ফানা আনিল খালক (সৃষ্টির মুখাপেক্ষিতা ত্যাগ): জাগতিক কোনো মানুষের প্রশংসা বা ভয়ের ওপর নির্ভর না করে কেবল সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করা।
ফানা আনিথ তমা (লোভ বর্জন): ধন-সম্পদ ও পদের অন্যায্য লোভ থেকে মনকে মুক্ত রাখা।
ফানা আনিল কিবর (অহংকার দমন): বংশ, পদবী, বিদ্যা বা সম্পদের কোনো ধরনের অহংকার না করা।
ফানা আনিল উজব (আত্মতুষ্টি ত্যাগ): নিজের ভালো কাজ বা ইবাদত নিয়ে নিজে বড়াই না করা।
ফানা আনিল হাসাদ (হিংসা বর্জন): অন্যের সাফল্য বা সম্পদে ঈর্ষান্বিত না হয়ে মনকে নির্মল রাখা।
ফানা আনির রিয়া (লোকদেখানিপনা বর্জন): যেকোনো ইবাদত বা ভালো কাজ মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে না করে খাঁটি মনে করা।
ফানা আনিল বুখল (কৃপণতা ত্যাগ): কৃপণতা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে মানবসেবা ও দানে আত্মনিয়োগ করা।
বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে ‘মাইজভাণ্ডারী গান’
বাংলা লোকসংগীতের ধারায় ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, লালনগীতি ও মারফতি গানের মতো ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ একটি স্বীকৃত ও সমৃদ্ধ পৃথক গানের ধারা। আধ্যাত্মিক প্রেম, আত্মানুসন্ধান, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুর্শিদের প্রতি ভক্তির রসে এই গানগুলো রচিত।
কবিয়াল রমেশ শীল: একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি কবিয়াল মাইজভাণ্ডারী তরীকায় অনুপ্রাণিত হয়ে ৩৫০-এরও বেশি গান রচনা করেন। তিনি সূফীবাদকে সাধারণ মেহনতী মানুষের কাছে পৌছে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন।
আব্দুল গফুর হাদী: চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের লোকসংগীতের অন্যতম প্রধান সুরকার ও গীতিকার, যিনি মাইজভাণ্ডারী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে কালজয়ী সব গান তৈরি করেছেন (যেমন: "সুজন ওরে, পীর প্রীতি অনুরাগে...")।
গানের মূল উপজীব্য: এই ধারার গানগুলোতে ঈশ্বরপ্রেম, রাসূলের (সা.) শান, আউলিয়াদের প্রতি ভক্তি, এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমঅধিকারের কথা সহজ-সরল আঞ্চলিক ও প্রমিত বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়।
আধুনিক বাংলাদেশ ও বিশ্বপ্রেক্ষাপটে সামাজিক তাৎপর্য
আজকের যুগে যখন ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদ এবং হিংস্রতা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন মাইজভাণ্ডারী দর্শন নিচের ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ দেখাচ্ছে:
উগ্রবাদ প্রতিরোধ: মাইজভাণ্ডারী তরীকার নমনীয় ও সুফী ভাবধারা বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ বা জঙ্গীবাদের মানসিকতা তৈরিতে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
দাতব্য ও মানবিক সেবা: বর্তমানে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের পরিচালনাধীন বিভিন্ন ট্রাস্ট (যেমন: শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্ট) বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, দুঃস্থদের আবাসন, বৃত্তি প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ: মাইজভাণ্ডারী তরীকা আজ কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; মধ্যপ্রাচ্য (সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার), মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে এই দর্শন আন্তর্জাতিক সূফী অঙ্গনেও নিজস্ব স্থান করে নিয়েছে।
মূলধারার ইতিহাসচর্চায় অবহেলা ও সুফি ধারার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
স্বাধীনতার ৫ দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় এক ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত শ্রেণীকরণ ও পক্ষপাত দৃশ্যমান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমরা প্রায়শই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর (যেমন: জামায়াতে ইসলামী, নেজাম-ই-ইসলাম, মুসলিম লীগ) স্বাধীনতাবিরোধী নগ্ন ভূমিকার কথা বিস্তারিত আলোচনা করি। এটি ইতিহাসের সত্য এবং তা আলোচনা করা আবশ্যক।
পাইকারি হারে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়নের ভুল: কিন্তু এই স্বাধীনতাবিরোধী মোল্লাদের নেতিবাচক ভূমিকা আলোচনা করতে গিয়ে মূলধারার অনেক প্রথাগত ইতিহাসবিদ অসাবধানতাবশত একটি ভুল সাধারণীকরণ (Generalization) করে ফেলেন। মনে করা হয়, একাত্তরে হয়তো সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। এই সরলীকরণের ফলে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের মতো ঐতিহ্যবাহী সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ও বীরত্বপূর্ণ অবদান ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে।
সুফি দর্শনের প্রকৃত রূপ বনাম রাজনৈতিক ইসলাম: পাক জান্তা ও তাদের রাজাকারেরা যে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ (Political Islam)-কে শোষণের হাতিয়ার বানিয়েছিল, মাইজভাণ্ডার দরবার তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘সুফি মানবিক ইসলাম’-এর প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রূপটি তুলে ধরেছিল।
তারা প্রমাণ করেছিল যে প্রকৃত সুফি ও আউলিয়াদের পথ কখনো শোষক, খুনি ও ধর্ষক জান্তার পক্ষে হতে পারে না। মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও শোষিতের মুক্তির জন্য লড়াই করা সুফি ভাবধারারই এক অমলিন অঙ্গ।
তাই আজ যখন আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ ও সর্বজনীন করার চেষ্টা করছি, তখন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ এবং এর অনুসারীদের এই অলিখিত মহাকাব্যকে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের দলিলে উপযুক্ত স্থান দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। পাঠ্যপুস্তকে এই অনালোচিত ঐতিহাসিক তথ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি, যেন নতুন প্রজন্ম জানতে পারে যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুফি সাধক ও তাঁদের লাখ লাখ ভক্তও ছিলেন এক একজন সাহসী নিভৃতচারী যোদ্ধা।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণে মাইজভাণ্ডারী দর্শনের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অর্জিত হয় আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই রক্তস্নাত বিজয়ের পেছনে যেমন ছিল বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ, গেরিলা মুক্তিসেনাদের রক্তের দাগ, তেমনই ছিল মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের মতো আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের নীরব সমর্থন, খাদ্য, আশ্রয় ও প্রাতিষ্ঠানিক আশীর্বাদ।
একাত্তরের ৫ এপ্রিলে অবরুদ্ধ দেশের মাটিতে বীরদর্পে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানো থেকে শুরু করে ময়ূরখিল ও খিরামের খামারে ক্ষুধার্ত মুক্তিসেনাদের মুখে ভাত তুলে দেওয়া; কিংবা ফটিকছড়ির মতিভাণ্ডার দরবারকে সাব-সেক্টর বানিয়ে পাকিস্তানি সেনাবহরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া এসবই ছিল একাত্তরের সেই মহান জনযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজকের এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে, যখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে আবারও মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদের কালো ছায়া ফেলার চেষ্টা করা হয় তখন ১৯৭১ সালে মাইজভাণ্ডার দরবারের অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মানবিক অবস্থান আমাদের জন্য এক মহা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ প্রমাণ করে গেছে যে, বাংলা ও বাঙালির মুক্তি কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতায় নয়; বরং অসাম্প্রদায়িক সাম্য, সুফি মানবতাবাদ এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত। মহান মুক্তিযুদ্ধে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও এর অনুসারীদের অবদান লাল-সবুজের পতাকায় এক অবিনশ্বর নক্ষত্র হয়ে চিরকাল দ্যুতি ছড়াবে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নীরব কিন্তু বীর দুর্ভেদ্য ঘাঁটি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ এবং এর শহীদ ও অনুসারী মুক্তিসেনাদের প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা ও লাল সালাম!















