>

>

মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিব - কলকাতার দাঙ্গাবিরোধী সভায় দুই জাতির পিতা

মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিব - কলকাতার দাঙ্গাবিরোধী সভায় দুই জাতির পিতা

প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধী যখন সম্প্রীতি ও শান্তির ঝাণ্ডা হাতে রাজপথে নেমেছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর পাশে বা পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে এক তরুণ ছাত্রনেতা নিঃশব্দে প্রত্যক্ষ করছিলেন ইতিহাসের অন্যতম প্রধান অধ্যায়। সেই তরুণ ছাত্রনেতা আর কেউ নন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মহাত্মা গান্ধীর শান্তি প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রায় তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কেবল কোনো আকস্মিক ঐতিহাসিক ঘটনা বা সাধারণ দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; এটি ছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

TruthBangla

মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিব - কলকাতার দাঙ্গাবিরোধী সভায় দুই জাতির পিতা

১৯৪৭ সাল ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তাল, ট্র্যাজিক এবং যুগান্তকারী একটি বছর। প্রায় দুই শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের প্রাক্কালে সমগ্র উপমহাদেশে একদিকে বইছিল স্বাধীনতার আনন্দ, অন্যদিকে ভাসছিল দেশভাগের করুণ সুর এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার করুণ অশ্রুজল। সেই চরম সংকটের দিনে, একদিকে প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধী যখন সম্প্রীতি ও শান্তির ঝাণ্ডা হাতে রাজপথে নেমেছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর পাশে বা পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে এক তরুণ ছাত্রনেতা নিঃশব্দে প্রত্যক্ষ করছিলেন ইতিহাসের অন্যতম প্রধান অধ্যায়।

সেই তরুণ ছাত্রনেতা আর কেউ নন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৪৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মহাত্মা গান্ধীর শান্তি প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রায় তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কেবল কোনো আকস্মিক ঐতিহাসিক ঘটনা বা সাধারণ দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; এটি ছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। তৎকালীন কলকাতার রাজনৈতিক আবহে মুসলিম লীগের ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কীভাবে গান্ধীজির শান্তির বাণীতে সাড়া দিয়েছিলেন, তা আজ সরকারি ও বেসরকারি আর্কাইভে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক ছবি, বই এবং দলিলে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।

আজকের বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করব ১৯৪৬-৪৭ সালের কলকাতার সেই অন্ধকার পটভূমি, বেলেঘাটা ও কলকাতার অন্যান্য স্থানে মহাত্মা গান্ধীর ঐতিহাসিক শান্তি মিশন, সেখানে তরুণ শেখ মুজিবের সক্রিয় উপস্থিতি এবং কীভাবে এই অভিজ্ঞতা উনার পরবর্তী অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক জীবনদর্শন গঠনে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছিল।

১৯৪৬ সালের 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' ও কলকাতার ভয়াবহতা

১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি সভা এবং সেখানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে হলে ১৯৪৬ সালের আগস্টের রক্তঝরা দিনগুলোতে ফিরে যেতে হয়। ১৯৪৬ সালের মে মাসে ব্রিটিশ কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' বা 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস'-এর ঘোষণা দেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নিখিল ভারত কংগ্রেসের একাধিপত্য প্রত্যাখ্যান করে পৃথক 'পাকিস্তান' রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে সর্বাত্মক শক্তি প্রদর্শন করা।

বাংলায় তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় ছিল। সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি সংবেদনশীল করে তোলে।

১৬ আগস্টের সংঘাত ও 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং'

১৬ আগস্ট সকালে কলকাতার গঙ্গার ঘাট ও প্রধান প্রধান রাস্তায় জনসমাবেশ হতে শুরু করে। বিকেলে কলকাতার অক্টারলোনি মনুমেন্টের (বর্তমান শহীদ মিনার) পাদদেশে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী বক্তৃতা দেন। সভা শেষ হতেই কলকাতার বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

রাজপথে শুরু হয় অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, দোকানপাট ও ঘরবাড়ি লুটপাট এবং নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড। যা ইতিহাসে 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' (Great Calcutta Killing) বা 'কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গা' নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

দাঙ্গার প্রসার ও প্রশাসনের ভূমিকা

প্রাশাসনিক ব্যর্থতা: তৎকালীন গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বারোজ এবং ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত পুলিশ প্রশাসন প্রথম কয়েক দিন চরম নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ফলে দাঙ্গাকারীরা কোনো বাধা ছাড়াই শহরজুড়ে তাণ্ডব চালায়।

সশস্ত্র প্রতিরোধ: প্রাথমিক ধাক্কার পর হিন্দু সম্প্রদায়ও সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিশেষ করে গোপাল মুখোপাধ্যায় (যিনি 'গোপাল পাঠা' নামে পরিচিত ছিলেন) এবং তাঁর সহযোগীরা পাল্টা সশস্ত্র প্রতিরোধ দল গড়ে তোলেন।

হতাহতের ভয়াবহতা: টানা চার-পাঁচ দিনের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় সরকারি হিসাবে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষ প্রাণ হারান এবং ১৫,০০০-এর বেশি গুরুতর আহত হন। তবে বেসরকারি ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে, নিহতের সংখ্যা ছিল ৮,০০০ থেকে ১০,০০০-এরও বেশি এবং গৃহহীন হয়েছিলেন লক্ষাধিক মানুষ।

"কলকাতার রাজপথ তখন লাশের স্তূপে পরিণত হয়েছিল, নর্দমাগুলো রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল এবং আকাশে ছিল কেবল ধোঁয়া ও আগুনের লেপন।"

দাঙ্গার দাবানল: নোয়াখালী ও বিহার ট্র্যাজেডি

কলকাতার দাঙ্গার বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া বাংলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা দ্রুত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।

নোয়াখালী দাঙ্গা (অক্টোবর ১৯৪৬): কলকাতায় মুসলিম হতাহতের খবর ও নানান গুজবের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর (কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন) পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী ও ত্রিপুরা (কুমিল্লা) জেলায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু হয়।

রাজনৈতিক নেতা গুলাম সরোয়ার হোসেনীর উসকানিতে দাঙ্গাকারীরা বহু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক লুটপাট, জোড়পূর্বক ধর্মান্তর এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই সহিংসতা থামাতে মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৬ সালের নভেম্বরে নোয়াখালী আসেন এবং প্রায় চার মাস ধরে খালি পায়ে গ্রাম থেকে গ্রামে হেঁটে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পদযাত্রা চালান।

বিহার দাঙ্গা (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৪৬): নোয়াখালীর ঘটনার সংবাদ বিহারের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশিত হলে এর প্রতিশোধ হিসেবে বিহারে ব্যাপকভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়।

এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৭,০০০ থেকে ২০,০০০ মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশু নিহত হন। এই দাঙ্গায় গোটা অঞ্চলের জনসংখ্যাগত চিত্র বদলে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ পশ্চিমবঙ্গে ও পূর্ব বাংলায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

এই রক্তক্ষয়ী অস্থিরতা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। বিভাজনের রেখাটি কেবল মানচিত্রে নয়, মানুষের অন্তরেও গভীরভাবে কেটে যায়।

দাঙ্গার দিনে সাহসী ত্রাণকর্তা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র শেখ মুজিব

১৯৪৬-৪৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজ) বি.এ-র ছাত্র। সেই সময় তিনি ঐতিহাসিক বেকার হোস্টেলের (Baker Hostel) ২৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তৎকালীন বেঙ্গল মুসলিম লীগ ও নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের এক অত্যন্ত সক্রিয়, বিচক্ষণ ও কর্মঠ তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেল ও বেকার হোস্টেলের ছাত্রদের সংগঠিত করা থেকে শুরু করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অগ্রণী ভূমিকা পালনে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গতদের উদ্ধার

দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর তরুণ শেখ মুজিব কেবল হোস্টেলের কামরায় বন্দি থাকেননি। উনার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন কীভাবে তিনি এবং তাঁর সহপাঠীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিলেন।

দাঙ্গার প্রথম প্রহর থেকেই শেখ মুজিব সহপাঠীদের নিয়ে অস্ত্র ও লাঠি হাতে টহল দিতে থাকেন, যাতে উন্মত্ত জনতা ছাত্রাবাস বা নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ করতে না পারে।প্রাণভয় উপেক্ষা করে তিনি দাঙ্গাকবলিত এলাকায় ঢুকে আটকা পড়া মানুষদের খুঁজে বের করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নেন।

মুসলিম ও হিন্দু উভয়কে উদ্ধার: রাজনীতিতে শেখ মুজিব মুসলিম লীগের সমর্থক হলেও, সংকটের মুহূর্তে তাঁর মানবিক পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাহায্য বাড়িয়ে দেন।

"মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন সে কেবলই একজন মানুষ তার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা পরিচয় থাকে না।" এই দর্শন থেকেই শেখ মুজিব কাজ পরিচালনা করতেন।

দাঙ্গার সময় যেসব হিন্দু পরিবার ও শিক্ষার্থী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় আটকা পড়েছিলেন, শেখ মুজিব ও তাঁর স্বেচ্ছাসেবক দল নিজেদের জীবন ঝুঁকি নিয়ে তাঁদের নিরাপদ হিন্দু এলাকায় বা পুলিশের কাছে পৌঁছে দেন। একইভাবে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ উপদ্রুত এলাকা থেকে অসহায় ও আহত মুসলিমদের উদ্ধার করে নিরাপদ ত্রাণ শিবিরে নিয়ে আসা হতো।

ইসলামিয়া কলেজ ত্রাণ শিবির: দাঙ্গার বিস্তৃতির সাথে সাথে ইসলামিয়া কলেজ প্রাঙ্গণকে একটি বিশাল ত্রাণ শিবিরে (Relief Camp) রূপান্তর করা হয়। হাজার হাজার গৃহহীন, স্বজনহারা ও বাস্তুচ্যুত মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নেয়। এই সুবিশাল ক্যাম্প পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ শেখ মুজিবের ওপর।

দাঙ্গার কারণে কলকাতায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিলে শেখ মুজিব শহরের বিভিন্ন চাল ব্যবসায়ী, মুসলিম লীগ নেতা এবং ধনবান ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাহায্য ও চাল-ডাল সংগ্রহ করেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য তিনি ড্রেসিং ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তৎকালীন চিকিৎসকদের অনুরোধ জানিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে আসেন।

ত্রাণ শিবিরে যাতে কোনো অশুভ শক্তি হামলা চালাতে না পারে, সে জন্য শেখ মুজিব নিজ হাতে স্বেচ্ছাসেবকদের শিফট ভাগ করে দিয়ে রাতে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিব - কলকাতার দাঙ্গাবিরোধী সভায় দুই জাতির পিতা

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আস্থাভাজন সহযোগী

তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবের অদম্য সাহস ও প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। ফলে দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতায় ত্রাণ বিতরণ ও শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে মুজিব ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর অন্যতম প্রধান সহযোগী।

সোহরাওয়ার্দীর গাড়ি, পুলিশের লরি কিংবা অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে শেখ মুজিব কলকাতার সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে ঘুরতেন এবং সরাসরি ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিতেন।কলকাতায় দাঙ্গার প্রভাব পার্শ্ববর্তী অঞ্চল আসানসোল এবং বিহারে ছড়িয়ে পড়লে শেখ মুজিব সেখানে গিয়েও ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে যুক্ত হন।

১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর কলকাতা আগমন ও 'বেলেঘাটা শান্তি মিশন'

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে যখন সমগ্র ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতার আনন্দে মুখরিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমান্ত এলাকায় জ্বলছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্টের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর পর থেকে কলকাতায় যে সহিংসতা শুরু হয়েছিল, তার রেশ ১৯৪৭ সালের আগস্টেও বিদ্যমান ছিল।

মমহাত্মা গান্ধী মূলত নোয়াখালীর দাঙ্গাপীড়িত হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ৯ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে তিনি যখন কলকাতায় পৌঁছান, তখন কলকাতার স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং তৎকালীন প্রাক্তন মেয়র মোহাম্মদ ওসমান তাঁকে কলকাতায় থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তাঁরা আশঙ্কা করছিলেন, ১৫ই আগস্টের পর কলকাতায় মুসলিমদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালানো হতে পারে।

গান্ধীজি তাঁদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে একটি বিশেষ শর্তে কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন- কলকাতার মুসলিম সমাজকে গ্যারান্টি দিতে হবে যে তারা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষতি করবে না। বিনিময়ে গান্ধীজি নিজের জীবন বাজি রেখে কলকাতার মুসলিমদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেবেন। এর ফলে নোয়াখালীর হিন্দুরাও সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিব - কলকাতার দাঙ্গাবিরোধী সভায় দুই জাতির পিতা

হায়দারী মঞ্জিল ও বেলেঘাটার অবস্থান

১৩ই আগস্ট ১৯৪৭ তারিখে গান্ধীজি মধ্য কলকাতার নিরাপদ এলাকা ছেড়ে কলকাতার পূর্ব প্রান্তের অত্যন্ত উপদ্রুত ও দাঙ্গাকবলিত বেলেঘাটার ‘হায়দারী মঞ্জিল’-এ (Hayderi Manzil) এসে ওঠেন। এই বাড়িটি ছিল এক দাউদি বোহরা মুসলিম ব্যবসায়ী শেখ আদম-এর পরিত্যক্ত ও ভাঙাচোরা একটি ভবন। ইতিহাসবিদরা বলেন,

“বাড়িটি ছিল সম্পূর্ণ অপরিচ্ছন্ন, নোংরা এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত। জানালার কাঁচগুলো ভাঙা ছিল এবং সেখানে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। গান্ধীজি নিরাপত্তার জন্য কোনো পুলিশ বাহিনী রাখতে অস্বীকৃতি জানান এবং মেঝেতে সামান্য একটি মাদুর পেতে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক ভবনটি ‘গান্ধী ভবন’ নামে সংরক্ষিত।”

১৪ই আগস্ট রাতে এবং ১৫ই আগস্টের সূচনায় একদল ক্ষুব্ধ হিন্দু যুবক হায়দারী মঞ্জিলের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা মহাত্মা গান্ধীর বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ তোলে এবং জানালার কাঁচ লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে। গান্ধীজি সম্পূর্ণ শান্ত থেকে এই ক্ষুব্ধ যুবকদের ডেকে পাঠান এবং তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন হিংসা ও রক্তপাত থামানো না গেলে তিনি এই বেলেঘাটাতেই অনশন করে প্রাণ বিসর্জন দেবেন। তাঁর লাশ বেলেঘাটা থেকে বের হবে, কিন্তু তিনি সত্য ও অহিংসার পথ থেকে সরবেন না।

সোহরাওয়ার্দীর সাথে গান্ধীজির ঐতিহাসিক জোট

কলকাতায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গান্ধীজি এক অভূতপূর্ব কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-কে তাঁর সাথে একই ছাদের নিচে এসে থাকার আমন্ত্রণ জানান। ১৯৪৬-এর কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করত, ফলে এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি রাজনৈতিক চাল। গান্ধীজি সোহরাওয়ার্দীর সামনে প্রধানত তিনটি শর্ত আরোপ করেন:

সোহরাওয়ার্দীকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে যে বিগত দাঙ্গাগুলোতে হিন্দুদের ওপরও অমানবিক অত্যাচার ও অন্যায় হয়েছে এবং তিনি তার দায় এড়াতে পারেন না।

কোনো প্রকার পুলিশ বা সামরিক নিরাপত্তা ছাড়া সোহরাওয়ার্দীকে গান্ধীজির সাথে হায়দারী মঞ্জিলে থাকতে হবে এবং একই খাবার খেতে হবে।

উভয় নেতাকে একসঙ্গে হাত ধরে কলকাতার প্রতিটি অলিগলিতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তির প্রচার চালাতে হবে।

সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক বাস্তবতা ও গান্ধীজির ব্যক্তিত্বের কাছে নতি স্বীকার করে এই শর্তগুলো মেনে নেন। ১৩ই আগস্ট থেকে তাঁরা একই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। ১৪ই আগস্ট যখন ক্ষুব্ধ হিন্দু জনতা বাড়িটি ঘেরাও করে সোহরাওয়ার্দীর শাস্তি দাবি করছিল, তখন সোহরাওয়ার্দী নিজে বারান্দায় এসে জনতার সামনে নিজের অতীত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং শান্তির আহ্বান জানান।

'অলৌকিক কলকাতা': ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট যখন দিল্লিতে জওহরলাল নেহেরু "ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি" ভাষণ দিচ্ছেন এবং ভারত স্বাধীনতার আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন গান্ধীজি বেলেঘাটার হায়দারী মঞ্জিলে ২৪ ঘণ্টার অনশন, প্রার্থনা এবং সূতা কেটে দিনটি উদযাপন করেন।

মিশনের প্রভাবে ১৫ই আগস্ট কলকাতায় এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। গত এক বছর ধরে যে শহরটি দাঙ্গা ও রক্তপাতে স্তব্ধ হয়েছিল, সেই শহরের রাস্তাগুলোতে হিন্দু ও মুসলিম যুবকরা একে অপরকে কোলাকুলি করতে শুরু করে। তারা যৌথ মিছিল বের করে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলনে অংশ নেয়। লর্ড মাউন্টব্যাটেন পাঞ্জাব ও বাংলার সীমান্ত পরিস্থিতির তুলনা করে মহাত্মা গান্ধীকে "ওয়ান ম্যান বাউন্ডারি ফোর্স" (One-Man Boundary Force) হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় দাঙ্গা তরঙ্গ ও আমরণ অনশন

১৫ই আগস্টের সাময়িক শান্তির পর আগস্টের শেষ দিকে পুনরায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ৩১শে আগস্ট হায়দারী মঞ্জিলে একদল যুবক আবার আক্রমণ চালায় এবং অভিযোগ করে যে মুসলিম সম্প্রদায় নাকি পুনরায় অস্ত্র জমা করছে। ১লা সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতায় ছোটখাটো সহিংসতার ঘটনা শুরু হয়।

পরিস্থিতি পুনরায় হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তারিখ রাত ৮টা ১৫ মিনিটে মহাত্মা গান্ধী তাঁর ঐতিহাসিক ‘আমরণ অনশন’ (Fast Unto Death) শুরু করেন।

অনশনের শর্ত: যতক্ষণ না কলকাতার দুই সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অস্ত্র ত্যাগ করবে এবং শান্তি ফিরিয়ে আনবে, ততক্ষণ তিনি একফোঁটা জলও গ্রহণ করবেন না।

ফলাফল: গান্ধীজির অনশনের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরো শহরে শোক ও অনুশোচনার ছায়া নেমে আসে। ৭৩ ঘণ্টা অনশনের পর, ৩রা সেপ্টেম্বর রাতে দাঙ্গাকারী বিভিন্ন দলের নেতারা গান্ধীজির চরণে অস্ত্র সমর্পণ করেন।

৪ঠা সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্র বসু, এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী, এবং কলকাতার সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ গান্ধীজিকে নিশ্চয়তা দেন যে কলকাতায় আর কোনো রক্তপাত হবে না। এরপর গান্ধীজি ডাবের জল পান করে অনশন ভঙ্গ করেন।

শান্তি প্রতিবাদ সভা, ঐতিহাসিক ছবি ও শেখ মুজিবের উপস্থিতি

সাম্প্রদায়িক সপ্রীতি রক্ষা এবং রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধী এবং বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একসঙ্গে যৌথ শান্তি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে তারা কলকাতায় একাধিক বিশাল শান্তি সমাবেশ, শোভাযাত্রা এবং সর্বধর্ম প্রার্থনাসভার আয়োজন করেন।

কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দান, বেলেঘাটা, বেলেঘাটা খালের পাড় এবং তৎকালীন কলকাতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব শান্তি সভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা এবং একটি শান্তিময় পরিবেশ গড়ে তোলাই ছিল এসব সমাবেশের মুখ্য উদ্দেশ্য।

শান্তি সভায় শেখ মুজিবের উপস্থিতি

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ও ডানহাত হিসেবে পরিচিত ইসলামিয়া কলেজের তৎকালীন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান এই প্রতিটি শান্তি সভা, শোভাযাত্রা ও কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কলকাতার রাস্তায় দাঙ্গা দমনে এবং মানুষের মধ্যে ঐক্যের বার বার্তা পৌঁছে দিতে তরুণ মুজিব দিনের পর দিন নিরলসভাবে কাজ করে যান।

শান্তি সভার প্রধান সমন্বয়কদের মধ্যে ২৭ বছর বয়সী শেখ মুজিব ছিলেন অন্যতম অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। তাঁর মূল দায়িত্বগুলো ছিল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন ও কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে শান্তি অভিযানে যুক্ত করা।

বেলেঘাটাসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত সংবেদনশীল জনসভাগুলোতে হাজার হাজার মানুষের ভিড় সামলানো ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো। মহাত্মা গান্ধী এবং সোহরাওয়ার্দী যখন যৌথভাবে বক্তব্য দিতেন ও অনশন পালন করতেন, তখন সভা স্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ছাত্র কর্মীদের দিকনির্দেশনা প্রদান।

মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিব - কলকাতার দাঙ্গাবিরোধী সভায় দুই জাতির পিতা

ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের প্রামাণিক দলিল

১৯৪৭ সালের আগস্টে কলকাতার এক ঐতিহাসিক মূহূর্তে ধারণকৃত একটি সাদাকালো আলোকচিত্র বর্তমানে ইতিহাসের প্রামাণিক দলিল হিসেবে বিবেচিত। আজকে বাংলাদেশের জাতীয় আর্কাইভস ও আর্কাইভস পরিদপ্তর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর (ধানমন্ডি৩২) এবং একাধিক ঐতিহাসিক পুস্তকে ১৯৪৭ সালের আগস্টে কলকাতায় ধারণকৃত একটি অত্যন্ত বিখ্যাত কালো-সাদা আলোকচিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। ছবির ভিজ্যুয়াল ও ঐতিহাসিক বিবরণ:

অগ্রভাগে মহাত্মা গান্ধী: আলোকচিত্রের সামনের দৃশ্যে দেখা যায় মহাত্মা গান্ধী জনসভায় অত্যন্ত শান্ত, ধ্যানমগ্ন এবং একাগ্র অবস্থায় উপবিষ্ট আছেন অথবা উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন।

পার্শ্বীয় ব্যক্তিত্ব সোহরাওয়ার্দী: গান্ধীজির ঠিক পাশেই গম্ভীর ও সজাগ ভঙ্গিতে উপবিষ্ট কিংবা দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায় বাংলার অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে।

পশ্চাৎপটে তরুণ শেখ মুজিব: ছবির পেছনের সারিতে সজাগ, সুঠামদেহী ও দীর্ঘকায় এক তরুণ অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পুরো সভাটি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ এবং শরীরী ভাষায় গভীর দায়িত্ববোধ প্রতিফলিত। ইতিহাসবিদদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, সময়ক্রম ও নথিপত্র অনুযায়ী, এই দাঁড়িয়ে থাকা তরুণটিই হলেন ২৭ বছর বয়সী ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান

এই ছবি কেবল একটি ফ্রেমবন্দি মুহূর্ত নয়; এটি ইতিহাসের এমন এক বিরল দলিল যা প্রমাণ করে যে, অবিভক্ত ভারতের সবচেয়ে বড় শান্তি আন্দোলনে তরুণ শেখ মুজিব কেবল দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেননি, বরং রাজপথে সরাসরি উপস্থিত থেকে ভূমিকা রেখেছেন।

শেখ মুজিবের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও ঐতিহাসিক দলিলসমূহে গান্ধীজির প্রভাব

শেখ মুজিবুর রহমান রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (Unfinished Memoirs)-তে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের উত্তাল দিনগুলোতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত শান্তি আন্দোলন এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার স্মৃতি অত্যন্ত স্পষ্ট ও আবেগঘনভাবে ফুটে উঠেছে।

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্মারকগ্রন্থে বেলেঘাটার সেই ঐতিহাসিক দিনগুলোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও আবেগ গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন:

"আমরা বেলেঘাটায় গান্ধীজির আশ্রমে যেতাম। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তো সেখানেই থাকতেন। গান্ধীজির সাথে আমাদের অনেক কথাবার্তা হতো। গান্ধীজি রাজনৈতিক কৌশল খুব ভালো বুঝতেন। উনার থাকার কারণে কলকাতার আবহাওয়া এক নিমেষে বদলে গেল। হিন্দু-মুসলিম একে অপরকে কোলাকুলি করতে শুরু করল।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সেখানে গান্ধীজি তরুণ মুসলিম লীগ ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে নিয়মিত দীর্ঘ আলোচনা করতেন। তাঁদের কাছ থেকে দাঙ্গার ভয়াবহতার সত্য বিবরণ শুনতেন এবং শান্তির বার্তা নিয়ে উপদ্রুত এলাকায় কাজ করার দিকনির্দেশনা দিতেন। অহিংসা, ধৈর্য এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে কীভাবে হিংসাত্মক রাজনৈতিক পরিবেশকে পরিবর্তন করা যায়, তরুণ মুজিব তা গান্ধীজির কাছ থেকে কাছ থেকে দেখে শিখেছিলেন।

সরকারি ও ঐতিহাসিক আর্কাইভে সংরক্ষিত তথ্য

বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (PIB) এবং জাতীয় আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস ম্যানুয়াল সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্রে ১৯৪৭ সালের অগাস্ট মাসে কলকাতার এই শান্তি মিশনে শেখ মুজিবুর রহমানের অংশগ্রহণের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আর্কাইভস দলিল: ১৯৪৭ সালের আগস্টে কলকাতার দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে বেলেঘাটা, পার্ক সার্কাস এবং রাজাবাজার অঞ্চলে গঠিত 'শান্তি কমিটি'র কার্যাবলীর নথিপত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সক্রিয় সংগঠক হিসেবে উঠে আসে। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা রাত জেগে পাহাড়া দেওয়া এবং আক্রান্ত মানুষদের উদ্ধারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ (ঐতিহাসিক গ্রন্থপুঞ্জি): দেশভাগের ঠিক প্রাক্কালে সোহ্‌রাওয়ার্দী-গান্ধী যৌথ শান্তি মিশনে অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের প্রতিনিধি এবং ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিবের সরাসরি ভূমিকার বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তৎকালীন সংবাদপত্র ও মিডিয়া রেকর্ড (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দ্য স্টেটসম্যান’ এবং ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায় যে, বেলেঘাটার হায়দার মঞ্জিলে মহাত্মা গান্ধীর প্রাতঃকালীন প্রার্থনাসভা এবং সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্প্রীতি সভায় তরুণ ছাত্রনেতারা নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। এসব প্রতিবেদনে মুসলিম ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা ও উপস্থিতি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল।

কীভাবে ১৯৪৭ এর শান্তি আন্দোলন শেখ মুজিবের ভবিষ্যৎ রাজনীতি গড়ে তুলেছিল

১৯৪৭ সালে কলকাতায় মহাত্মা গান্ধীর শান্তি প্রতিবাদ সভায় তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কেবল ইতিহাসের কোনো বিচ্ছিন্ন পাতায় আটকে থাকা ঘটনা নয়। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মূলত রোপিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরির অসাম্প্রদায়িক বীজ।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ: কৈশোর ও প্রথম যৌবনে দ্বিজাতি তত্ত্ব ও মুসলিম লীগের ছাত্ররাজনীতির সমর্থক হলেও, ১৯৪৬-৪৭ সালের বিভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শেখ মুজিবকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। অন্যদিকে, গান্ধীজির অহিংস আন্দোলন ও মানুষের জীবন রক্ষার সংগ্রাম তাঁকে উপলব্ধি করায় যে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পরিণতি কেবল বিভাজন ও সাধারণ মানুষের রক্তপাত।এই রাজনৈতিক উপলব্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায় পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোতে:

১৯৪৮ সাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি গড়ে তোলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’
১৯৪৯ সাল: তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণমানুষের অধিকার আদায়ে গঠিত হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’
১৯৫৫ সাল: অসাম্প্রদায়িক চেতনার পূর্ণ বিকাশে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল পূর্ব-পাকিস্তানিকে এক ছাতার নিচে আনতে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে গঠন করা হয় সর্বজনীন ‘আওয়ামী লীগ’

ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার মূল ভিত্তিই ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও সামাজিক ন্যায়বিচার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৪৭ সালে কলকাতায় গান্ধীজির পাশে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতির যে পাঠ তরুণ ছাত্রনেতা মুজিব গ্রহণ করেছিলেন, ১৯৭২ সালের স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সেটিকেই রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করেন।

একনজরে ১৯৪৭-এর কলকাতা শান্তি মিশন ও তরুণ শেখ মুজিব

ঐতিহাসিক এই ঘটনাটিকে সংক্ষেপে একনজরে দেখার জন্য একটি মাত্র প্রামাণিক সারসংক্ষেপ তথ্যসারণী নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয় ও মানদণ্ড

ঐতিহাসিক বিবরণ ও সংরক্ষিত তথ্য

ঘটনার সময়কাল

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস (দেশভাগের ঠিক আগে ও পরে)।

ভৌগোলিক স্থান

কলকাতা (বিশেষ করে বেলেঘাটার ‘হায়দারী মঞ্জিল’, পার্ক সার্কাস ও অন্যান্য উপদ্রুত এলাকা)।

ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৪৬ সালের ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ এবং তার পরবর্তী রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

প্রধান ব্যক্তিত্ব

মহাত্মা গান্ধী এবং তৎকালীন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

তরুণ শেখ মুজিবের ভূমিকা

ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রনেতা হিসেবে সভা আয়োজন, নিরাপত্তা বিধান ও সক্রিয় অংশগ্রহণ।

আর্কাইভাল প্রমাণ

জাতীয় আর্কাইভস ও বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে সংরক্ষিত দুর্লভ আলোচিত্র ও সোহরাওয়ার্দী-গান্ধী নথিপত্র।

শেখ মুজিবের নিজস্ব বিবরণ

উনার রচিত স্মারকগ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

ভবিষ্যৎ জীবনে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, 'আওয়ামী লীগ' গঠন ও ১৯৭২-এর সংবিধানের নীতি প্রণয়নে প্রভাব।

হায়দারী মঞ্জিলের নাটকীয়তা ও উগ্র জনতার মুখোমুখি তরুণ মুজিব

১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট মহাত্মা গান্ধী যখন বেলেঘাটার ‘হায়দারী মঞ্জিল’-এ পৌঁছান, তখন পরিস্থিতি মোটেও শান্ত ছিল না। সেটি ছিল একটি নোংরা, ভাঙাচোরা, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত এবং দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি।

উত্তেজিত জনতার পাথর নিক্ষেপ: গান্ধীজি ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন ওই বাড়িতে প্রবেশ করেন, তখন একদল উগ্র হিন্দু ও মুসলিম যুবকের দল বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তারা চিৎকার করে স্লোগান দিতে থাকে এবং জানালার কাঁচ লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ে।

তরুণ মুজিবের প্রতিরোধ ও বোঝাপড়া: তৎকালীন ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সহপাঠীরা (যেমন: নূরে আলম, সাজাহান ইত্যাদি) সেই উত্তেজিত জনতা এবং গান্ধীজির নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাঝখানে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। শেখ মুজিব ও তাঁর সঙ্গীরা উত্তেজিত তরুণদের শান্ত করার জন্য বারবার কথা বলেন এবং বোঝান যে:

“যদি সোহরাওয়ার্দীও গান্ধীজি একসাথে থাকেন, তবেই কলকাতার মুসলিম ও হিন্দু উভয়ের প্রাণ বাঁচবে।”

গান্ধীজির সেই ঐতিহাসিক বাক্য: যখন একদল হিন্দু যুবক সোহরাওয়ার্দীকে দাঙ্গার জন্য দায়ী করে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, তখন গান্ধীজি তাদের থামিয়ে বলেছিলেন,

"যদি তোমরা সোহরাওয়ার্দীকে আঘাত করতে চাও, তবে আগে আমাকে হত্যা করতে হবে। তিনি এখানে এসেছেন অনুশোচনা করতে এবং শান্তির জন্য হাত মেলাতে।"

তরুণ শেখ মুজিব অত্যন্ত কাছে দাঁড়িয়ে প্রবীণ রাজনীতিক গান্ধীর এই দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

‘মিরাকল অফ ক্যালকাটা’ ও মাউন্টব্যাটেনের স্বীকৃতি

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট যখন সমগ্র পাঞ্জাবে লাখ লাখ মানুষের রক্তে নদী লাল হয়ে যাচ্ছিল, সীমান্ত জুড়ে লাখ লাখ শরণার্থী বাস্তুচ্যুত হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে কলকাতায় ঘটেছিল এক অলৌকিক শান্তি! ইতিহাসে যাকে বলা হয় ‘Miracle of Calcutta’ (কলকাতার অলৌকিক ঘটনা)

১৫ আগস্ট রাতে কলকাতার রাজপথে যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য। যে হিন্দু ও মুসলিম তরুণেরা কয়েকদিন আগেও একে অপরকে হত্যার জন্য অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়াত, তারা একসাথে জয়ধ্বনি দিয়ে পতাকা হাতে মিছিল বের করে।

ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন মহাত্মা গান্ধীকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন, যা আজও ব্রিটিশ ও ভারতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত:

"In the Punjab, we have 55,000 soldiers and large-scale rioting. In Bengal, our force consists of one single man, and there is no rioting. As a serving officer, may I be allowed to pay my tribute to the One Man Boundary Force?"

(পাঞ্জাবে আমাদের ৫৫,০০০ সৈন্য থাকা সত্ত্বেও ব্যাপক দাঙ্গা হচ্ছে। আর বাংলায় আমাদের বাহিনী মাত্র একজন মানুষকে নিয়ে গঠিত, এবং সেখানে কোনো দাঙ্গা নেই। একজন কর্মরত সেনা কর্মকর্তা হিসেবে আমি কি এই 'ওয়ান ম্যান বাউন্ডারি ফোর্স'-কে আমার শ্রদ্ধা জানাতে পারি?)

এই "One Man Boundary Force"-এর পেছনের মূল লজিস্টিক ও মাঠপর্যায়ের শক্তি ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতারাই, যাদের সামনের সারিতে ছিলেন শেখ মুজিব।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে কিছু দুর্লভ ও কম-আলোচিত স্মৃতি

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে গান্ধীজির সাথে কাটানো দিনগুলোর কিছু অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মানবিক স্মৃতি তুলে ধরেছেন:

খাদ্য সংকট ও রিলিজ ক্যাম্প পরিচালনা: দাঙ্গার সময় কলকাতায় চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। শেখ মুজিব লিখেছেন, তারা পার্ক সার্কাস ও কলোটুলা এলাকা থেকে বিভিন্ন ব্যাকারি ও গুদাম থেকে আটা-চাল জোগাড় করে ট্রাকে করে হিন্দু ও মুসলিম উভয় রিলিফ ক্যাম্পে পৌঁছে দিতেন। রাতের পর রাত কারফিউর মধ্যে সশস্ত্র টহলের ঝুঁকি নিয়ে তারা এই কাজ করেছিলেন।

গান্ধীজির দিনলিপি পর্যবেক্ষণ: শেখ মুজিব লক্ষ্য করেছিলেন, গান্ধীজি কীভাবে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় সর্বধর্ম প্রার্থনাসভা করতেন, নিজে চরকায় সূতা কাটতেন এবং অত্যন্ত সাধারণ খাবার (ছাগলের দুধ ও সেদ্ধ সবজি) খেতেন। গান্ধীজির এই আত্মসংযম ও জনগণের সাথে সংযোগ স্থাপনের কৌশল তরুণ মুজিবকে মুগ্ধ করেছিল।

সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতি পর্যবেক্ষণ: সোহরাওয়ার্দী সাহেব যেভাবে নিজের ভুল বা সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে গান্ধীজির আশ্রমে মেঝেতে তোশক পেতে শুয়ে থাকতেন তা শেখ মুজিবকে শিখিয়েছিল যে, রাজনীতিকদের অহংকার ত্যাগ করে জনগণের প্রয়োজনে যেকোনো জায়গায় নেমে আসতে হয়।

১৯৪৭ এর কলকাতার অভিজ্ঞতা কীভাবে ঢাকার রাজনীতিকে বদলে দিল?

১৯৪৭ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের পর শেখ মুজিব বুঝতে পারেন যে উনার কলকাতার রাজনীতির অধ্যায় শেষ। পাকিস্তান অর্জিত হলেও তিনি দেখলেন, ঢাকায় তৎকালীন ক্ষমতাশীল মুসলিম লীগ নেতারা (যেমন: খাজা নাজিমুদ্দিন, মাওলানা আকরাম খাঁ) সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভাষার অধিকার নিয়ে চিন্তিত নন; বরং তারা একটি কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৈরি করছেন।

কলকাতার দাঙ্গার ভয়াবহতা এবং গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের অভিজ্ঞতা শেখ মুজিবকে তিনটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছিল, যা তিনি পূর্ব পাকিস্তানে এসে প্রয়োগ করেছিলেন:

১. ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র স্থায়ী হয় না: কেবল ধর্মের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র টিকতে পারে না, যদি না সেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তি থাকে।
২. অসাম্প্রদায়িক ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন: ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে তিনি অনুভব করলেন, উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে তরুণদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সংগঠিত করতে হবে। এই চেতনা থেকেই জন্ম নেয় ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলন
৩. সংস্কৃতিই আসল পরিচয়: দাঙ্গার বিভীষিকা দেখার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অনেক বেশি শক্তিশালী ও মানবিক।

সংক্ষেপে অপ্রকাশিত ঐতিহাসিক তথ্যের তালিকা

বেলেঘাটার যে বাড়িটিতে (হায়দারী মঞ্জিল) গান্ধী ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে শেখ মুজিব যেতেন, সেটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্মারক এবং তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গান্ধী ভবন’

দেশভাগের পর প্রথম কদিন যখন সীমান্ত পুরোপুরি সুনির্দিষ্ট ছিল না, তখন শেখ মুজিব ও তাঁর ছাত্র বন্ধুরা বেনাপোল ও বনগাঁ সীমান্তে অসহায় শরণার্থীদের যাতায়াত ও খাদ্য নিরাপত্তায় কাজ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দীন আহমেদের মতে,

"১৯৪৬ সালের দাঙ্গার শেখ মুজিব ছিলেন এক বীর প্রতিবাদী ছাত্রনেতা, কিন্তু ১৯৪৭-এর আগস্টের পর তিনি রূপান্তরিত হন একজন পরিণত ও দূরদর্শী জননেতায়।"

১৯৪৭-এর কলকাতা, মহাত্মা গান্ধীর শান্তি মিশন এবং সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা মূলত একটি সেতুর মতো যা অবিভক্ত ভারতের ছাত্র রাজনীতিকে স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত করেছিল।

ইতিহাস, সত্য ও চিরন্তন প্রেরণা

ইতিহাস কখনো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে সত্য, দলিল এবং প্রমাণের ওপর। ১৯৪৭ সালে কলকাতায় মহাত্মা গান্ধীর শান্তি প্রতিবাদ সভা ও অভিযানে তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কেবল একটি ঐতিহাসিক সত্যই নয়, এটি একটি জাতির অসাম্প্রদায়িক চেতনার সূচনাবিন্দু।

যে তরুণ একদিন কলকাতায় নিজের জীবন বাজি রেখে দাঙ্গাপীড়িত মানুষকে উদ্ধার করেছিলেন এবং গান্ধীজির অহিংস মূর্তির পেছনে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতির বাণী শুনেছিলেন, সেই তরুণই পরবর্তীকালে বিশ্ব মানচিত্রে তৈরি করেছিলেন একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বাংলাদেশ

আজকের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে, যখন আবার নতুন করে ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কালো ছায়া দেখা যায়, তখন ১৯৪৭ সালের সেই দূরদর্শী ঘটনা আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। মহাত্মা গান্ধীর সেই শান্তি মিশন এবং তাতে তরুণ শেখ মুজিবের উপস্থিতি আজও প্রতিটি বাঙালিকে শিক্ষা দেয় মানবতার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই, আর শান্তির চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক বিজয় হতে পারে না।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.