প্রিয় ভারতীয় জেন-জি, বাংলাদেশের মতো ডিপস্টেটের ফাঁদে পা দিবেন না
২০২৬ সালের জুলাই মাস। গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামে দেখছি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কিংবা নানাবিধ ছাত্র সংগঠনের ব্যানার নিয়ে হাজার হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছ। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের একটি নিরীহ দাবি দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজ তা হঠাৎ করেই ভারতের পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাও এবং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক সরকার পতনের এক চরমপন্থী রূপ নিচ্ছে। তোমাদের এই উত্তপ্ত মিছিল, তোমাদের স্লোগান, আর ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া তোমাদের বৈপ্লবিক আবেগ দেখে আমার আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

TruthBangla

“যেকোনো পপুলিস্ট বিপ্লবের সবচেয়ে বড় নির্মমতা হলো তরুণেরা যখন বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করে, তখন নেপথ্যের ডিপস্টেট, চরমপন্থী দল ও আন্তর্জাতিক মাস্টারমাইন্ডরা সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা শুরু করে।”
প্রিয় ভারতীয় জেন-জি (Gen-Z) তরুণ বন্ধুরা,
আমি যখন আজ এই নিবন্ধটি লিখছি, তখন আমার বুক কেঁপে উঠছে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ২০২৬ সালের জুলাই মাস। গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামে দেখছি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কিংবা নানাবিধ ছাত্র সংগঠনের ব্যানার নিয়ে হাজার হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছ। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের একটি নিরীহ দাবি দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজ তা হঠাৎ করেই ভারতের পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাও এবং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক সরকার পতনের এক চরমপন্থী রূপ নিচ্ছে।
তোমাদের এই উত্তপ্ত মিছিল, তোমাদের স্লোগান, আর ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া তোমাদের বৈপ্লবিক আবেগ দেখে আমার আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমরাও ঠিক এভাবেই বাংলাদেশের রাজপথে নেমেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম আমরা ইতিহাস গড়ছি। আমরা ভেবেছিলাম আমরা রাষ্ট্রকে স্বৈরাচার মুক্ত করছি, এক নতুন, বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলছি।
কিন্তু আজ দুই বছর পর, ধূলিসাৎ হওয়া অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভীতি নিয়ে এবং উগ্রপন্থীদের ভয়ে নিজেদের জীবন হাতে নিয়ে আমি তোমাদের সাবধান করতে এসেছি।
আমাদের মতো আবেগ আর অন্ধ ছাত্রশক্তির সুযোগ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ডিপস্টেট (Deep State) এবং কতিপয় সুযোগসন্ধানী এজেন্ট কীভাবে পুরো দেশকে একটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে আমরা তার জীবন্ত প্রমাণ। আমাদের মতো ভুল তোমরা কোরো না। বৈপ্লবিক আবেগের চরম মূল্য আজ আমরা চড়া দামে পরিশোধ করছি।
২০২৪ এর বাংলাদেশের ‘স্বপ্ন বিক্রি’ ও আমাদের অন্ধ আবেগ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, তখন আমাদের কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটার একটি যৌক্তিক সংস্কার। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আন্দোলনকে একটি চরমপন্থী সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দেওয়া হলো। আন্দোলন চলাকালীন ও সরকার পতনের সন্ধিক্ষণে আমাদের এমন কিছু স্বপ্নের কথা বলা হয়েছিল, যা শুনে যেকোনো তরুণ রক্ত টগবগ করে উঠবে।
আমদেরকে মিষ্টি মিষ্টি কথায় যে স্বপ্নগুলো গেলানো হয়েছিল, তার একটি দীর্ঘ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
বৈষম্যহীন সমাজ: সমাজে আর কোনো উচ্চ-নিচ, প্রভাবশালী আর সাধারণের ব্যবধান থাকবে না।
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন: ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও স্বজনপ্রীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
সরকারি চাকরিতে শতভাগ ফেয়ার নিয়োগ: কোনো মামা-খালুর জোর লাগবে না, মেধার ভিত্তিতে চাকরি হবে।
বহুত্ববাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: সব ধর্ম, সব মতের মানুষের সমান অধিকার থাকবে; গণমাধ্যম হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: সেশনজট থাকবে না, শিক্ষার পরিবেশ হবে বিশ্বমানের।
বাইনারি রাজনীতির অবসান: আওয়ামী লীগ-বিএনপির যে ঐতিহ্যবাহী শত্রুতামূলক দ্বি-পাক্ষিক রাজনৈতিক ট্যাগিং, তা চিরতরে শেষ হবে।
শিক্ষাঙ্গনে নোংরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ: লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি আর ক্যাম্পাসে থাকবে না, শিক্ষার্থীরা শুধু পড়ালেখা করবে।
উগ্রবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূল: ধর্মভিত্তিক কোনো উগ্রবাদী শক্তি বা জঙ্গিবাদকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না।
ঐতিহাসিক রাজাকার ও গাদ্দারদের স্থান না হওয়া: ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী কোনো শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে দেওয়া হবে না।
আমরা ভেবেছিলাম, আমরা এক নতুন ভোরের সূর্য দেখছি। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি, এই স্বপ্নগুলো ছিল স্রেফ একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ও দেশের ভেতরের ডিপস্টেটের তৈরি করা এক মহা-ভাঁওতাবাজি।
দুই বছর পরের বাস্তব চিত্র: স্বপ্নের কফিনে নির্মম পেরেক
সরকার পতন হলো। হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী যাদের আমরা রাজপথের নায়ক মনে করতাম, তারা আন্দোলনকে নিজেদের ক্ষমতার সিঁড়ি বানাল। আর সরকার পতনের সাথে সাথেই আমাদের সেই স্বপ্নের বেলুন কীভাবে ফুটো হয়ে গেল, তা আজ তোমাদের জানা দরকার।
দ্বিগুণ মাত্রার বৈষম্য ও ক্ষমতাশালীদের পকেট ভারী
যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছিলাম, আজ তা রূপ নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যে। হাসনাত আবদুল্লাহর মতো চরিত্র যখন এমপিও হননি, অথচ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার সুবাদে শুধু তাঁর নিজের নির্দিষ্ট একটি উপজেলার বরাদ্দের জন্য এক লহমায় নিয়ে গেছেন ২৫ কোটি টাকা! অথচ দেশের অন্য সাধারণ বাদবাকি প্রতিটি উপজেলা পায় মাত্র ১৫ লাখ টাকা! এই কি তবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ?
সাবেক ‘সমন্বয়ক’ ও বর্তমান ‘নতুন কোটিপতি’
আন্দোলনের সময় যারা জরাজীর্ণ শার্ট পড়ে ঘুরত, টিউশনি করে প্রতিদিনের খাবার জোগাত, আন্দোলনে বিজয়ের পর তারা রাতারাতি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেল! আসিফ মাহমুদ, যিনি ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হলেন দুই বছর ধরে পত্রিকা খুললেই তাঁর ও তাঁর বাবার দুর্নীতির রূপকথা আমরা পড়ছি। ক্ষমতার দাপটে বাপ-বেটা মিলে টাকার পাহাড় বানিয়েছে। ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে তাদের মতো ব্যক্তিদের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর আজ দেশের মানুষের মুখে মুখে।
সারা দেশের প্রতিটা জেলা ও উপজেলায় আজ "সমন্বয়ক" পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য এবং সরকারি ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর এই চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ পৌঁছে গেছে শীর্ষ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও আসিফ মাহমুদদের পকেটে।
সরকারি চাকরিতে ‘নতুন দলীয়করণ’ ও বিসিএস জালিয়াতি
আমরা চেয়েছিলাম মেধার মূল্যায়ন। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে? সরকারি চাকরিতে এখন দলীয় চামচা ও পছন্দের লোকজন ছাড়া কেউ চাকরি পাচ্ছেন না। অবাক করার মতো বিষয় হলো, গত এক থেকে দেড় বছরে দেশে টানা তিনটি বিসিএস (BCS) পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছে! উদ্দেশ্য একটাই আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি করে ‘জুলাইয়ের খনিকের পোলাদের’ বিসিএস ক্যাডার বানিয়ে সরকারি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসিয়ে দেওয়া!
উগ্রবাদের উত্থান, আইনশৃঙ্খলা ধ্বংস ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়
সরকার পতনের পর দেশের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তার ক্ষতি আগামী ৫০ বছরেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
পুলিশি অবকাঠামো ধ্বংস ও অস্ত্র লুট
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক রাতে ধসে পড়ে। সারাদেশে থানাসহ মোট ৪৬০টি পুলিশ স্থাপনায় জঘন্য হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর মধ্যে কেবল ২২৪টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল।
থানাগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও কম্পিউটার নষ্ট করা হয়েছে।
পুলিশের যানবাহন লুট বা ধ্বংস করা হয়েছে।
সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়, থানাগুলো থেকে শত শত অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট হয়ে যায়। যার বিরাট একটি অংশ আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং সেগুলো এখন সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীদের হাতে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা হানি ও অবাধ লুটপাট
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে যেভাবে হাজার হাজার মানুষ প্রবেশ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করল, তা ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জার। আসবাবপত্র, ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম, এমনকি গৃহপালিত হাঁস-মুরগি পর্যন্ত লুট করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই ধ্বংসলীলা ঢাকা পড়েছে কারণ যারা এসব ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছিল, তারাই এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ারে উপবিষ্ট!
উগ্রবাদী জামায়াত-শিবির ও জংগিবাদীদের ত্রাস
আজ বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর দাপটে সাধারণ মানুষের পথচলা মুশকিল হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছদ্মবেশে বা প্রকাশ্যে জামায়াত-শিবিরের অবাধ ত্রাস চলছে।
তৌহিদি জনতার নামে কওমী ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী সারা দেশে মাজার শরীফ, পীর-দরবার ও বাউল শিল্পীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে লোকজ সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চাকে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
বহুত্ববাদের নামে সমকামী বা হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষকে রাস্তায় প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে লাগাতার হামলা হয়েছে, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের টার্গেট কিলিং আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
ডিপস্টেটের খেলা: অ্যান্টি-ইন্ডিয়া ন্যারেটিভ ও প্রক্সি ওয়ারের ফাঁদ
তোমরা কি জানো, আমাদের আন্দোলনের সময় যেভাবে "দিল্লি না ঢাকা" স্লোগান তুলে ভারতের বিরুদ্ধে এক অন্ধ বিদ্বেষ ও অ্যান্টি-ইন্ডিয়া (Anti-India) ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হয়েছিল, তার পেছনে কারা ছিল?
আজ উন্মোচিত হয়েছে যে, এই গোষ্ঠীটি আসলে আন্তর্জাতিক ডিপস্টেট এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছিল। ভারতবিরোধী মনোভাব জাগিয়ে তুলে, ভারতের সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এই ভূ-খণ্ডে একটি প্রক্সি যুদ্ধ (Proxy War) বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই ছিল জুলাই আন্দোলনের পেছনের অদৃশ্যের কারিগরদের মূল লক্ষ্য।
আমদের বলা হয়েছিল, "আমরা আর কারও গোলামি করব না, আমরা সার্বভৌম।" কিন্তু আজ দুই বছর পর তাকালে দেখা যায় আমরা দিল্লির গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার নাটক করে আসলে আমেরিকা ও পশ্চিমাদের বড় গোলামে পরিণত হয়েছি। সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ ভৌগোলিক কৌশলগত সুবিধা হাতানোর জন্য বাংলাদেশকে আজ বিশ্বশক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতি, মিডিয়া ও শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়
আমরা রাজনৈতিক সংস্কার চেয়েছিলাম, কিন্তু আমরা পেয়েছি চরম এক রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের নতুন রূপ:
ট্যাগিং ও ডিজিটাল ট্রোলিং: বাইনারি রাজনীতি বাদ দেওয়ার কথা থাকলেও আজ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কেউ যদি বর্তমান নৈরাজ্য দেখে আক্ষেপ করে বলে "এর চেয়ে তো আগের সরকারেই ভালো ছিলাম", অমনি তাকে 'আওয়ামী লীগ', 'র'-এর এজেন্ট বা 'গাদ্দার' ট্যাগ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় বা জেলখানায় পুরে দেওয়া হয়।
‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র আড়ালে নোংরা ছাত্ররাজনীতি: বলা হয়েছিল ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি থাকবে না। কিন্তু আজ সবাই সাধারণ শিক্ষার্থীর মুখোশ পরে চরম নোংরা রাজনীতি করছে। আগের চেয়েও নিম্নমানের ও নোংরা ভাষায় স্লোগান দেওয়া হচ্ছে রাজপথে।
শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপ: শিক্ষাব্যবস্থা আজ সম্পূর্ণ অচল। পরীক্ষা বন্ধ, সেশনজট চরমে, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কেবল জুলাই আন্দোলনের কথিত সমন্বয়কদের আশীর্বাদপুষ্টদের।
ডেটা ও পরিসংখ্যানে ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশ
বাংলাদেশের আন্দোলনের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি বাস্তবসম্মত তথ্যচিত্র নিচে একটি ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
মূল খাত / সূচক | ২০২৪ আন্দোলনের পূর্বে প্রতিশ্রুতি | ২০২৬ সালের বাস্তব পরিস্থিতি |
দুর্নীতি ও স্বচ্ছতা | শূন্য সহনশীলতা ও শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন | সমন্বয়কদের শত কোটি টাকার সম্পত্তি, ইউনুস সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কেলেঙ্কারি। |
আইনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষা | নিরাপদ রাষ্ট্র ও আইনের শাসন | ৪৬০টি থানা পুড়িয়ে ছাই, বিপুল অস্ত্র লুট, পুলিশি ব্যবস্থার চরম নিষ্ক্রিয়তা। |
অর্থনীতি ও অবকাঠামো | দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্যহীন বণ্টন | সরকারি কোষাগার শূন্য, রাজস্ব আদায়ে ধস, নতুন বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ। |
সংখ্যালঘু ও সংস্কৃতি | সর্বজনীন বহুত্ববাদ ও সম্প্রীতি | হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে হামলা, শত শত মাজার ধ্বংস, বাউল ও শিল্পীদের ওপর হামলা। |
নিয়োগ ব্যবস্থা | শতভাগ মেধাভিত্তিক বিসিএস ও চাকরি | নিয়ম ভেঙে ১ বছরে ৩ বিসিএস আয়োজন করে নিজেদের অনুসারীদের ক্যাডার নিয়োগ। |
কূটনীতি ও সার্বভৌমত্ব | স্বাধীন ও মর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি | পশ্চিমাদের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও পাকিস্তানের আইএসআই-এর গোপন নিয়ন্ত্রণ। |
‘বিপ্লব তার নিজের সন্তানদের গিলে খায়’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রেন ব্রিনটন (Crane Brinton) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Anatomy of Revolution’-এ ইতিহাসের প্রধান প্রধান বিপ্লবগুলোর (যেমন ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব) একটি সুনির্দিষ্ট চার-ধাপের জীবনচক্র ব্যাখ্যা করেছেন। তরুণ ও জেন-জি পরিচালিত আধুনিক আন্দোলনগুলোতেও ঠিক এই চার-ধাপের পুনরাবৃত্তি ঘটছে:
১. ক্ষোভ ও পপুলিস্ট জোয়ার ➔ ২. ক্ষমতা দখল ও উদার মোড়ক ➔ ৩. প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও চরমপন্থা ➔ ৪. থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া / নয়া স্বৈরাচার
পপুলিস্ট জোয়ার (The Idealistic Phase): অর্থনৈতিক অনটন, বৈষম্য এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ একজোট হয়। দাবিগুলো থাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সর্বজনীন (যেমন দুর্নীতিমুক্তি, বাকস্বাধীনতা, সমতা)।
ক্ষমতা পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক ধস (The Power Vacuum): পুরাতন শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর হঠাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। সংবিধান ও শাসনকাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ে।
চরমপন্থা ও নতুন কায়েমী স্বার্থ (Radicalization): "নেতাহীন" আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নেয় সংগঠিত চরমপন্থী গোষ্ঠী, আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক দল এবং নেপথ্যের বৈশ্বিক শক্তিগুলো। উদারপন্থী ছাত্রনেতারা ধীরে ধীরে সুবিধাবাদী অথবা চরমপন্থীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে।
থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া (Thermidorian Reaction): অরাজকতা ও অর্থনৈতিক সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ যখন স্থিতিশীলতা খুঁজতে থাকে, তখন নতুন কোনো কট্টর বা পপুলিস্ট শক্তি ক্ষমতার চূড়ায় বসে এবং আগের চেয়েও বেশি কঠোর দমনপীড়ন শুরু করে।
বিশ্বজুড়ে তরুণ আন্দোলন: সাফল্য বনাম মোহভঙ্গের ইতিহাস
জেন-জি আন্দোলন কিংবা গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি দেশে সীমাবদ্ধ নয়। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের এই ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ কীভাবে শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রূপ নিয়েছে, তার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
দেশ ও বছর | আন্দোলনের প্রকৃতি ও স্লোগান | ক্ষমতা পরবর্তী প্রাথমিক রূপ | দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি ও মোহভঙ্গ |
মিশর (২০১১) (আরব বসন্ত) | "রুটি, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার"-হসনি মোবারকের পতন। | ইখওয়ানুল মুসলিমিন (মুসলিম ব্রাদারহুড)-এর ক্ষমতায় আরোহণ। | চরম প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেল সিসির সামরিক স্বৈরাচারের সূচনা। |
শ্রীলঙ্কা (২০২২) (আরাগালয়া আন্দোলন) | "গোটা গো গামা"-রাজাপাকসে পরিবারের পতন ও অর্থনৈতিক স্বস্তি। | রেনিল বিক্রমেসিংহে ও পরবর্তীতে পপুলিস্ট বামপন্থী শক্তির উত্থান। | আইএমএফ (IMF)-এর কঠোর শর্ত, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিভাজন। |
তিউনিসিয়া (২০১১) (যাসমিন বিপ্লব) | বেকারত্ব ও স্বৈরাচার নিরসন; আধুনিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। | দীর্ঘদিনের সংসদীয় বিতর্ক ও দুর্বল রাজনৈতিক জোট। | কায়েস সাঈদের উত্থান, সংবিধান বাতিল এবং পুনরায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা। |
বাংলাদেশ (২০২৪-২০২৬) (জুলাই বিপ্লব) | কোটা সংস্কার, বৈষম্যহীন সমাজ এবং ফ্যাসিবাদ মুক্তকরণ। | 'নেতাহীন' সমন্বয়কদের প্রভাব, প্রশাসন ও আইনি কাঠামোর ধস। | চরম মূল্যস্ফীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও ভূ-রাজনৈতিক দাসত্ব। |
কালার রেভোলিউশন ও হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার
আধুনিক যুগের বিপ্লবগুলো কেবল রাজপথের আন্দোলন নয়; এটি মূলত হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার (Hybrid Warfare)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো সরাসরি সামরিক হামলা না চালিয়ে কোনো একটি দেশকে অস্থিতিশীল করতে জেন-জি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে:
ইমোশনাল অ্যালগোরিদম অপটিমাইজেশন: টিকটক, ফেসবুক ও এক্স (টুইটার)-এর অ্যালগরিদম এমনভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়, যাতে সাধারণ তরুণদের মানসিক ক্ষোভ ও ঘৃণা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। ইতিবাচক বা গঠনমূলক আলোচনা ফিড থেকে গায়েব হয়ে যায়।
‘নেতাহীন’ আন্দোলনের বিভ্রম: আন্দোলনের কোনো একক সুনির্দিষ্ট শীর্ষ নেতৃত্ব থাকে না। এর সুবিধা হলো সরকার সহজেই আন্দোলন স্তব্ধ করতে পারে না। কিন্তু এর মূল ক্ষতিকর দিক হলো ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় সুনির্দিষ্ট ও দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে যেকোনো বিদেশি এজেন্সি বা সংগঠিত মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।
এনজিও ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন: 'মানবাধিকার', 'গণতন্ত্র' ও 'বাকস্বাধীনতা'র নামাবলি গায়ে দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও থিঙ্কট্যাংক তরুণদের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি ধ্বংসের কারণ হয়।
‘মবোক্রেসি’ (Mobocracy) ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ধস
যখন একটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সংস্থা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে, তখন সমাজে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মবোক্রেসি’ বা উত্তপ্ত জনতার শাসন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে চিহ্নিত করে বিচার এবং রাজপথে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
বিনিয়োগ ও পুঁজির পলায়ন: আইনি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে কলকারখানা বন্ধ হয়, বেকারত্ব বাড়ে এবং মুদ্রা স্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।
ভীতি বনাম মুক্তচিন্তা: এক স্বৈরাচারের পতনের পর যদি মব জাস্টিস চালু হয়, তবে সমাজে স্বাধীন চিন্তার জায়গা আরও সংকুচিত হয়। সমাজের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বরা প্রাণভয়ে বা মানহানির ভয়ে নীরবতা পালন করেন।
বাংলাদেশি তরুণদের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ প্রতিবেশী ভারতের জেন-জি বা তরুণ সমাজকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সতর্কবার্তা দেওয়া জরুরি। কারণ, যে ফাঁদে বাংলাদেশ পা দিয়েছিল, আজ ঠিক একই সুতোয় ভারতকে বাঁধার এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।
ডিপস্টেটের প্রক্সি ডিজাইন এবং 'কালার রেভোলিউশন'
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ইন্টেলিজেন্স স্টাডিতে যাকে 'কালার রেভোলিউশন' বা রঙিন বিপ্লব বলা হয়, তার কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:
ধাপ ১: অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে উসকে দেওয়া: যেকোনো ছোট অভ্যন্তরীণ বিষয় (যেমন কোটা সংস্কার বা শিক্ষা ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো নীতি) নিয়ে তরুণদের মনে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া।
ধাপ ২: ইমোশনাল প্ল্যাটফর্ম ও হিরো তৈরি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে রাতারাতি সাধারণ কিছু মুখকে তথাকথিত 'জাতীয় নায়ক' বা 'মসিহা' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
ধাপ ৩: মূল দাবি থেকে সরে এসে সরকার পতনের ফাঁদ: প্রাথমিক দাবি যতই যৌক্তিক হোক না কেন, ধীরে ধীরে সেটিকে উসকে দিয়ে পুরো সিস্টেম বা সরকার উৎখাতের দিকে চালিত করা।
ধাপ ৪: প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও উগ্রবাদীদের পুনর্বাসন: সরকার পতনের পর যখন আইনি শূন্যতা তৈরি হয়, তখন পর্দার আড়ালে থাকা উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, ধর্মীয় চরমপন্থী এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (যেমন পাকিস্তানের আইএসআই) সরাসরি ক্ষমতার নাড়াচাড়া নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
প্রক্সি যুদ্ধের হাতিয়ার: আইএসআই-এর গোপন নেটওয়ার্ক ও ন্যারেটিভ ডিজাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক সত্য উন্মোচিত হয়েছে। তা হলো "দিল্লি না ঢাকা" এই কৃত্রিম ন্যারেটিভের পেছনে সরাসরি কাজ করেছিল আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্টকারী শক্তিগুলো।
পাকিস্তানের আইএসআই (ISI)-এর মদদে একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী ভারতের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী প্রক্সি যুদ্ধ লাগানোর চক্রান্ত করেছিল।
তরুণদের মনে এই ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, প্রতিবেশী দেশকে শত্রু বানালেই দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। অথচ এর চূড়ান্ত ফল হিসেবে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তো দূরের কথা, আমেরিকার বড় ভূ-রাজনৈতিক গোলামিতে পরিণত হয়েছে। সেন্ট মার্টিন্স বা আঞ্চলিক কৌশলগত বন্দরগুলোর ওপর বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিসর্জনের মাধ্যমে দেশকে এক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক কলোনিতে রূপান্তর করা হয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদল বনাম 'টোকাই থেকে কোটিপতি' সিন্ডিকেট
একটি বিপ্লব তখনই ব্যর্থ হয়, যখন এর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা নৈতিক স্খলনের শিকার হন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার সবচেয়ে করুণ দিকটি হলো তথাকথিত 'নেতা' ও 'সমন্বয়কদের' নৈতিক পতন:
আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার: যারা একসময় টিউশনি করে বা সাধারণ জীবনযাপন করে নিজেদের সৎ প্রমাণ করতে চেয়েছিল, তারা ক্ষমতা পাওয়ার দুই বছরের মধ্যেই শত-হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছে।
বরাদ্দে নগ্ন স্বজনপ্রীতি: নিজ উপজেলার জন্য এক লাফে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ নেওয়ার মতো নজিরবিহীন দুর্নীতি প্রমাণ করে যে, এই তথাকথিত বৈষম্যবিরোধীরা নিজেরাই বৈষম্যের নতুন ও সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও অস্ত্র লুট: ৪৬০টি থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট এবং গণভবন-সংসদ ভবনের মতো জাতীয় প্রতীকে তাণ্ডব চালিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রকে রক্ষার চেয়ে নিজেদের আখের গোছানোই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
উগ্রবাদের পুনরুত্থান এবং বহুত্ববাদের কবর রচনা
যে অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের রাজপথে নামানো হয়েছিল, আজ তার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো:
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও টার্গেট কিলিং: জুলাই আন্দোলনের পর থেকে হিন্দু সম্প্রদায়সহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যেভাবে নির্যাতন, বাড়িঘর দখল এবং টার্গেট কিলিংয়ের মাত্রা বেড়েছে, তা আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।
মাজার ও সংস্কৃতির ওপর হামলা: 'তৌহিদি জনতা' বা উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ব্যানারে দেশের শত শত বাউল শিল্পী, পীর-দরবার এবং মাজার শরিফে যেভাবে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে, তা বাঙালি সংস্কৃতির শিকড়কে আক্রান্ত করেছে।
লিঙ্গীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন: হিজড়া ও সমকামীদের ধরে রাস্তায় পিটিয়ে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটানো হয়েছে।
ভারতীয় জেন-জি ডিপস্টেটের ফাঁদে পা দিও না!
প্রিয় ভারতীয় জেন-জি তরুণ বন্ধুরা,
আজ তোমরা যারা ভারতের রাজপথে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা অন্য নামে আন্দোলন করছ, নিজেদের দেশের প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করার চক্রান্তে পা দিচ্ছ তোমাদের উদ্দেশে বলছি:
আবেগে অন্ধ হয়ে রাষ্ট্রকে অচল কোরো না: কোনো দেশের সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক উপায়ে তার প্রতিবাদ করো, নির্বাচনে তার জবাব দাও। কিন্তু আন্দোলনকে ‘সরকার পতন’ কিংবা ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংসের’ দিকে নিয়ে যেও না।
আন্দোলনের পেছনের আসল কারিগরদের চেনো: তোমরা যাদের আজ নিজেদের ‘সংগ্রামী নেতা’, ‘ত্রাতা’ বা ‘বৈপ্লবিক সমন্বয়ক’ ভাবছ, একটু ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখো। তারা হয়তো কোনো বিদেশি ফান্ডিং, কোনো আন্তর্জাতিক শক্তি বা ভারতের অভ্যন্তরীণ ডিপস্টেটের পেয়াদা হিসেবে কাজ করছে।
ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা ধ্বংস কোরো না: বাংলাদেশে আমরা সরকার পতন ঘটিয়ে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিকে ৩০ বছর পেছনে ঠেলে দিয়েছি। ভারতের অর্থনীতি আজ বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে; এই স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করার জন্যই বিশ্বমোড়লরা তোমাদের ছাত্রশক্তিকে উসকে দিচ্ছে।
ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈরাজ্যকে সুযোগ দিও না: একটি নির্বাচিত সরকার পড়ে গেলে দেশের ভেতরের লুকিয়ে থাকা উগ্রবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রথম সুযোগটা নেবে। বাংলাদেশে জামায়াত-শিবির যা করেছে, ভারতেও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো ঠিক একই তাণ্ডব চালাবে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নাও
আমরা ভুল করেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম রাজপথে ইট-পাটকেল ছোড়া, পুলিশ পেটানো আর সরকার পতনের স্লোগান দেওয়াটাই বুঝি দেশপ্রেম। কিন্তু আজ ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে আমরা বুঝতে পারছি তৈরি করা সহজ নয়, কিন্তু অশুভ রাজনৈতিক চক্রান্তে পড়ে একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়া মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপার।
আজ আমরা বাংলাদেশে কোটা বাতিলের আন্দোলন করেছিলাম, কিন্তু কোটার চরম অপব্যবহার ঠিকই রয়ে গেছে, সাথে যুক্ত হয়েছে টোকাই ও সুবিধাবাদীদের কোটিপতি হওয়ার মহোৎসব!
ভারতীয় জেন-জি, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নাও। আবেগের স্রোতে ভাসিও না। রাষ্ট্র টিকে থাকলে, দেশের নিয়ম-নীতি ও গণতন্ত্র টিকে থাকলে তোমাদের দাবি আজ হোক কাল হোক আদায় হবে। কিন্তু ডিপস্টেটের ফাঁদে পড়ে ভারতকে যদি আজ অস্থিতিশীল করে তোলো, তবে আগামীকাল আফসোস করার জন্য তোমাদের হাতে একটা সার্বভৌম দেশও অবশিষ্ট থাকবে না!
আমাদের ভুল থেকে শেখো। ভারতের শান্তি, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা করো।
ইতি,
ভুল শুধরাতে না পারা, প্রতারিত এক বাংলাদেশি জেন-জি।















