বিএনপির গ্রুপিং রাজনীতির বলি মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন একজন সফল রাজনীতিবিদ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে। কিন্তু রাজনীতির নির্মম পরিহাস এই যে, যে ব্যক্তি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, শেষ জীবনে তাকে নিজ দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। সাদেক হোসেন খোকা মূলত বিএনপির তারেক রহমান কেন্দ্রিক উগ্র রাজনীতির বিরোধিতা করে নিজ দলের ভেতরেই একঘরে হয়ে পড়েছিলেন।

TruthBangla

বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণমানুষের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে সাদেক হোসেন খোকা এক ক্ষণজন্মা ও অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল ঢাকাবাসীর অতি পরিচিত 'খোকা ভাই' বা অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘমেয়াদী সফল মেয়রই ছিলেন না; বরং তাঁর আসল পরিচয় তিনি ছিলেন ১৯৭১ সালের রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র থাকাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিপরীতে জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন যে ক'জন দুঃসাহসী তরুণ, সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন তাঁদের প্রথম সারির অন্যতম সৈনিক। বিখ্যাত 'ক্র্যাক প্লাটুনের' সদস্য হিসেবে ঢাকার রাজপথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে তটস্থ করে রাখা এই বীর সন্তানের রাজপথের লড়াই পরবর্তীতে তাঁকে রাজনীতিতেও এক গণভিত্তিক সর্বজনগ্রাহ্য নেতায় পরিণত করেছিল।
তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বা পরিহাস হলো যিনি যৌবনে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে নিজের প্রাণ তুচ্ছ করেছিলেন, জীবনের শেষভাগে এসে তাঁকেই শিকার হতে হয়েছিল নিজ দলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চরমপন্থী ষড়যন্ত্রকারীদের। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে থেকে তিনি ঢাকার রাজপথ গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু সেই দলেই একসময় তিনি পরবাসী হয়ে পড়েন। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর তারেক রহমান কেন্দ্রিক উগ্র ও প্রতিশোধের রাজনীতির সরাসরি প্রতিবাদ করে তিনি নিজ দলের ভেতরেই পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে যান।
আজ একটি স্বার্থান্বেষী মহল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী অপশক্তি সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও অন্তিম জীবনকে কেন্দ্র করে একপাক্ষিক ও মনগড়া বয়ান দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু নিরেট ইতিহাস ও নিরপেক্ষ নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় খোকা সাহেবকে রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ করেছিল বিএনপি দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, তারেক রহমানের 'হাওয়া ভবন' কেন্দ্রিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সঙ্গে বিএনপির আদর্শিক আপস।
নিচে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার গৌরবোজ্জ্বল জীবন, ১৯৭১-এর বীরত্ব, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে তাঁর সত্য ও দুঃসাহসী অবস্থান, বিএনপির অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বর্তমান অপপ্রচারের এক বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
বামপন্থী চেতনা থেকে 'ক্র্যাক প্লাটুন': এক গেরিলা বীর
১৯৫২ সালের ১২ মে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক ও আদর্শিক যাত্রা শুরু হয়েছিল সমাজপ্রগতির মহান চেতনা নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় থেকেই তিনি তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি এবং স্বাধিকার আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম ও বীরত্বগাথা
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন মুক্তিকামী বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তরুণ সাদেক হোসেন খোকা কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যাননি। তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যান এবং মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন ১ নম্বর সেক্টরে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ঢাকায় প্রেরিত দুঃসাহসী গেরিলা দল 'ক্র্যাক প্লাটুনে' অন্তর্ভুক্ত হন। সাদেক হোসেন খোকার নেতৃত্বে ঢাকা শহরের রাজারবাগ, মতিঝিল, গোপীবাগ ও পুরান ঢাকা এলাকায় একাধিক পাকিস্তানি সেনাচৌকি ও কৌশলগত স্থাপনায় গেরিলা হামলা চালানো হয়। রাজপথে হানাদার বাহিনীর সাজোয়া যান উড়িয়ে দেওয়া এবং ঢাকার বুকে স্বাধীন বাংলা পতাকার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বীরত্ব ছিল সর্বজনবিদিত।
অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ ও শিষ্টাচারের রাজনীতি
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বামপন্থী রাজনীতি থেকে তিনি পরবর্তীতে ভাসানী ন্যাপ হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। কিন্তু প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে সাদেক হোসেন খোকার মজ্জায় ছিল অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার।
তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতিতে আদর্শিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা শত্রুতায় বা প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারে না। এই অসাম্প্রদায়িক ও উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধই পরবর্তীতে তাঁকে ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষ ও সকল রাজনৈতিক দলের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বিভীষিকা এবং খোকার ঐতিহাসিক সত্য উচ্চারণ
সাদেক হোসেন খোকার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট, নীতিগত পরীক্ষা ও বাঁকবদল ঘটেছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সেদিন ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর চালানো হয়েছিল বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা। ২৪ জন তাজা প্রাণ ঝরে পড়েছিল এবং শেখ হাসিনাসহ শত শত নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন।
নয়াপল্টনে তারেক রহমানের প্রকাশ্যে সমালোচনা
২১ আগস্টের সেই রক্তাক্ত ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ঢাকার তৎকালীন মেয়র ও অবিসংবাদিত নেতা সাদেক হোসেন খোকা স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, এই ন্যাক্কারজনক হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হলো।
হামলার খবর পেয়ে তিনি অনতিবিলম্বে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছুটে যান। সেখানে দলের ভেতরে থাকা চরমপন্থী ও তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের উপস্থিতিতেই খোকা সাহেব চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি সরাসরি তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করে চিৎকার করে বলেছিলেন:
"তারেক রহমানের এই উগ্র, আত্মঘাতী ও প্রতিশোধের রাজনীতির কারণে বিএনপি দলের সর্বনাশ হয়ে গেল! রাজনীতিতে যে রক্তের হোলিখেলা শুরু হলো, এর খেসারত এই দলকে আজীবন দিতে হবে।"
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন
একজন দায়িত্বশীল প্রবীণ নেতা এবং সরকারের মন্ত্রী হিসেবে সাদেক হোসেন খোকা ঘটনাটি এড়িয়ে যাননি। ওইদিন সন্ধ্যায়ই তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর বাসভবনে যান।
সাক্ষাৎকারে খোকা সাহেব বেগম জিয়াকে রাজনীতিতে দূরদর্শিতা দেখানোর জোর অনুরোধ জানান। তিনি স্পষ্ট যুক্তি দিয়ে বলেন:
সরকারিভাবে দুঃখ প্রকাশ: এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পেছনে সরকারের ভেতরে থাকা বা দলের উগ্র অংশের যোগসাজশ যাই থাকুক না কেন, দেশের প্রধান বিরোধী দলের ওপর এই হামলার দায় সরকার এড়াতে পারে না। সুতরাং অনতিবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে জাতির কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া উচিত।
প্রতিশোধের রাজনীতির আশঙ্কা: তিনি বেগম জিয়াকে সতর্ক করে বলেছিলেন, "ম্যাডাম, আজ যদি আমরা এই অপরাধের দায় নিয়ে ক্ষমা না চাই এবং নিরপেক্ষ বিচার না করি, তবে দেশে এমন এক রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিএনপিকে নিঃশেষ করে দেবে।"
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তৎকালীন ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত 'হাওয়া ভবন' এবং তারেক রহমানের প্রভাবে বেগম খালেদা জিয়া খোকার সেই ঐতিহাসিক, মানবিক ও দূরদর্শী পরামর্শ কান দেননি। উল্টো খোকাকে দলের ভেতর ‘সন্দেহের চোখে’ দেখা শুরু হয়।
ঢাকা প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কাছে খোকার জবানবন্দি
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পেছনের কুশীলবদের সম্পর্কে সাদেক হোসেন খোকার অবস্থান কোনো অনুমান নির্ভর বিষয় ছিল না। তিনি নিজে ঢাকা প্রেসক্লাবের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই ঘটনার ভেতরের সত্য খোলামেলাভাবে বর্ণনা করেছিলেন।
প্রেসক্লাবের সেই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কাছে সাদেক হোসেন খোকা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেছিলেন:
"২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত এবং বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর একটি। এই পুরো ঘটনার নীল নকশা তৈরি করেছিলেন তারেক রহমান। বিএনপির সিনিয়র নেতাদেরকে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরপরেই আমি ছুটে যাই বিএনপির কার্যালয়ে, সেখানে আমি প্রকাশ্যে তারেক রহমানকে গালাগাল করেছিলাম। তারেক রহমানের কারণে বিএনপির সর্বনাশ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছিলাম।
এরপর আমি বেগম জিয়ার সঙ্গে সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ করি। এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষমা চাওয়ার জন্য আমি অনুরোধও করি। আমি আরো বলেছিলাম, এর মাধ্যমে রাজনীতিতে যে বিভাজনরেখা তৈরি হলো, তা প্রতিশোধের রাজনীতিকে উসকে দেবে, এর ফলে বিএনপিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বেগম জিয়া ঐ দুঃখ প্রকাশের কথা শোনেননি।"
এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাদেক হোসেন খোকা কোনো অন্যায় বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে আপস করেননি। তিনি নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও সন্ত্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে দলীয় ফোরামে সত্য বলতে দ্বিধা করেননি।
দলের অভ্যন্তরে কোণঠাসা হওয়া এবং 'হাওয়া ভবন'-এর গ্রুপিং রাজনীতি
২১ আগস্টের ঘটনার পর থেকে বিএনপির অভ্যন্তরে সাদেক হোসেন খোকার অবস্থান এক মারাত্মক মোড় নেয়। তারেক রহমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ 'হাওয়া ভবন' কেন্দ্রিক চক্রটি খোকাকে বিএনপি থেকে মাইনাস করার সুপরিকল্পিত ছক আঁকতে শুরু করে।
'আওয়ামী লীগের দালাল' ট্যাগ ও রাজনৈতিক চরিত্রহনন
বিএনপির ভেতরের যে সুবিধাবাদী গোষ্ঠীটি তারেক রহমানের অনুকম্পা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল, তারা খোকার অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ২১ আগস্টের প্রতিবাদের কারণে তাঁকে 'আওয়ামী লীগের দালাল' বা 'সন্দেহভাজন নেতা' হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে।
যে মানুষটি রাজপথে পুলিশি নির্যাতন সহ্য করে বিএনপিকে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁকেই নিজ দলের ভেতরে একঘরে করে ফেলার অপচেষ্টা চালানো হয়।
ঢাকা বিএনপিতে কৃত্রিম বিভাজন
সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির একচ্ছত্র ও সফল সভাপতি। কিন্তু তারেক রহমান ও তাঁর অনুসারীরা খোকার একক গ্রহণযোগ্যতা ভাঙার জন্য ঢাকার রাজনীতিতে বিকল্প বলয় তৈরি করে। কৃত্রিমভাবে দলের ভেতর চরম গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন।
মুক্তিযোদ্ধা ইমেজের কারণে অস্পৃশ্যতা
বিএনপির তৎকালীন উগ্র রাজনৈতিক কৌশলের সাথে সাদেক হোসেন খোকার 'বীর মুক্তিযোদ্ধা' পরিচয়টি খাপ খাচ্ছিল না। বিশেষ করে বিএনপি যখন ক্রমশ স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের তোষণ নীতি গ্রহণ করে, তখন খোকার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্ব দলে কমতে থাকে। তারেক রহমানের উগ্র এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে খোকার নীতি ও আদর্শই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় বাধা।
আওয়ামী লীগ বনাম সাদেক হোসেন খোকা: রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বনাম পারস্পরিক শ্রদ্ধা
আজ বিএনপির একটি নির্দিষ্ট অংশ এবং তাদের সোশ্যাল মিডিয়া সেল প্রচার করার চেষ্টা করে যে, আওয়ামী লীগ সরকারই নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত সাদেক হোসেন খোকাকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু নিরপেক্ষ রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বয়ানটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রাজনৈতিক লড়াইয়ের বাইরে সৌজন্যতা
আওয়ামী লীগের সাথে সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল রাজপথে, কিন্তু সেখানে ব্যক্তিগত হিংসা বা শত্রুতা ছিল না। আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ নেতারা খোকা সাহেবকে অত্যন্ত সম্মান করতেন, কারণ তাঁরা জানতেন যে খোকা একজন খাঁটি অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা এবং তিনি কখনও কুৎসিত বা নোংরা রাজনীতির আশ্রয় নেননি।
২০১১ সালের হামলা এবং আওয়ামী লীগের অবস্থান
২০১১ সালে একটি রাজনৈতিক হর তাল চলাকালে যখন সাদেক হোসেন খোকার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিন্দনীয় হামলা হয়, তখন আওয়ামী লীগের শীর্ষ সারির বহু নেতা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সেই হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খোকা সাহেবের প্রতি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সর্বদা মানবিক শিষ্টাচার বজায় রেখেছিলেন।
আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে খোকার এই অসাম্প্রদায়িক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে বিএনপির ভেতরের ষড়যন্ত্রকারীরা পরবর্তীতে খোকার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। মূলত নিজেদের ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ হিংসা এবং খোকাকে রাজনৈতিকভাবে মাইনাস করার চক্রান্ত ঢাকার জন্যই বিএনপি নেতারা আজ আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপানোর অপচেষ্টা চালায়।
সুবিধাবাদী অপশক্তির চক্রান্ত: শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ভণ্ডামি
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পর এবং সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ও করুণ রাজনৈতিক পরিহাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং তাদের ছাত্র সংগঠন জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের কর্মকাণ্ডে।
টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করার চেষ্টা
যে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদর ও তাদের আদর্শিক অনুসারী শিবিরের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে তরুণ সাদেক হোসেন খোকা স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছিলেন, আজ সেই শিবির ও উগ্র গোষ্ঠীটি রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য খোকা সাহেবের নাম ভাঙানোর অপচেষ্টা করছে।
তারা আওয়ামী লীগ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা খোকা সাহেবের প্রতি কৃত্রিম দরদ দেখাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন এটি হলো চরম সুবিধাবাদ। স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্রের কাছে খোকা সাহেবের আদর্শের কোনো মূল্য নেই; তারা কেবল নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে তাঁকে 'টিস্যু পেপারের' মতো ব্যবহার করতে চায়।
অকুতোভয় সত্য উচ্চারণকে আড়াল করার ষড়যন্ত্র
শিবির ও উগ্রপন্থী চক্রটি কৌশলগতভাবে সাদেক হোসেন খোকার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি চেপে যেতে চায়। তারা কোনোদিন আলোচনা করে না যে:
খোকা সাহেব ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন।
তিনি তারেক রহমানের উগ্র রাজনীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন।
তিনি সবসময় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাস করতেন।
সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের উচিত এই ছদ্মবেশী সুবিধাবাদী চক্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং সাদেক হোসেন খোকার প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে ধারণ করা।
এক নজরে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা
বিষয় / সূচক | ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য তথ্য |
নাম ও পরিচয় | সাদেক হোসেন খোকা (বীর মুক্তিযোদ্ধা); অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী। |
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা | ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় ১ নম্বর সেক্টর ও 'ক্র্যাক প্লাটুনের' অধীনে ঢাকার অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা। |
রাজনীতির সূচনা | প্রগতিশীল বামপন্থী ছাত্র সংগঠন (ছাত্র ইউনিয়ন) থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে আগমন ও সর্বজনগ্রাহ্য গণনেতা হিসেবে উত্থান। |
২১ আগস্ট ২০০৪-এর ভূমিকা | আওয়ামী লীগের ওপর গ্রেনেড হামলার তীব্র প্রতিবাদ, তারেক রহমানের পরিকল্পনার সরাসরি সমালোচনা ও বেগম জিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন। |
দলে একঘরে হওয়ার কারণ | তারেক রহমান ও 'হাওয়া ভবন'-এর উগ্র প্রতিশোধের রাজনীতির বিরোধিতা এবং অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযোদ্ধা ইমেজ বজায় রাখা। |
আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক | রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও অসাম্প্রদায়িক শিষ্টাচার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক। |
দলের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র | ঢাকা মহানগর বিএনপিতে বিভাজন তৈরি, খোকাকে 'আওয়ামী লীগের দালাল' ট্যাগ প্রদান এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে মাইনাস করা। |
সুবিধাবাদী শিবিরের চক্রান্ত | মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধা খোকার নাম ভাঙিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী ও শিবিরের ক্যাডারদের রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের অপচেষ্টা। |
সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন ছিল সংগ্রাম, বীরত্ব এবং রাজনৈতিক জটিলতার এক বিস্তৃত ক্যানভাস। প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রণাঙ্গনে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা যুদ্ধ, ঢাকা-৭ আসনে ঐতিহাসিক সংসদীয় বিজয়, মন্ত্রী হিসেবে জাতীয় দায়িত্ব পালন, অবিভক্ত ঢাকার সফল নগরপিতা হিসেবে ঢাকা শহর পুনর্গঠন এবং শেষ জীবনে রাজনৈতিক জটিলতা ও দূরারোগ্য ব্যাধিতে প্রবাসে অন্তিম দিন কাটানো সব মিলিয়ে তাঁর জীবনটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রামাণ্য ইতিহাস।
প্রারম্ভিক জীবন, শিক্ষা ও ছাত্র রাজনীতির শিকড়
সাদেক হোসেন খোকা ১৯৫২ সালের ১২ মে পুরান ঢাকার গোপীবাগে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা প্রকৌশলী এম এ করিম এবং মা সায়েরা খাতুন। পুরান ঢাকার গলিপথ ও ঢাকাইয়া সংস্কৃতির ভেতরে বেড়ে ওঠার কারণে ঢাকার সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সংকট তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
শিক্ষাজীবন: তিনি ঢাকার বিখ্যাত সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল ও জগন্নাথ কলেজ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে তিনি সফলভাবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে হাতেখড়ি: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে 'ছাত্র ইউনিয়ন'-এ যোগ দেন। ষাটের দশকের শেষভাগে বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ৬ দফা ও ১১ দফা গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে রাজপথে নেতৃত্ব দেন।
১৯৭১ এর 'ক্র্যাক প্লাটুন' ও ঢাকা শহরের গেরিলা তাণ্ডব
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করলে সাদেক হোসেন খোকা ভারতে চলে যান এবং ১ নম্বর ও ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার রাজপথে হানাদার বাহিনীকে তটস্থ করে রাখা বিশ্বখ্যাত 'ক্র্যাক প্লাটুন'-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।
ঢাকায় গেরিলা অভিযান
মেজর খালেদ মোশাররফ ও এ টি এম হায়দারের নির্দেশে গঠিত এই গেরিলা দলটির মূল কাজ ছিল ঢাকার ভেতরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা। খোকার নেতৃত্বে গোপীবাগ, মতিঝিল, রাজারবাগ ও পুরান ঢাকা এলাকায় একাধিক অপারেশন পরিচালিত হয়:
টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস: হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করতে ঢাকার বিভিন্ন সাব-স্টেশন ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জে সফল বোমা হামলা।
রাজারবাগ ও মতিঝিলে ঝটিকা আক্রমণ: পাকিস্তানি টহল বাহিনীর ওপর গ্রেনেড ও স্টেনগান নিয়ে হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে নিমেষেই পুরান ঢাকার সরু গলিতে আত্মগোপন।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: ঢাকার ভেতরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা সংবলিত লিফলেট বিতরণ এবং পাকিস্তানি পতাকায় অগ্নিসংযোগ করা।
যুদ্ধে তাঁর সাহসিকতার কারণে তিনি সহযোদ্ধাদের কাছে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংগঠক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।
সংসদীয় রাজনীতি ও ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন
স্বাধীনতার পর সাদেক হোসেন খোকা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ভাসানী ন্যাপে কিছুদিন রাজনীতি করার পর ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে বিএনপি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দেন।
১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় টার্নিং পয়েন্ট। ঢাকা-৭ (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি-গোপীবাগ) আসন থেকে বিএনপি তাঁকে প্রার্থী করে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
ফলাফল: ওই নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে তরুণ নেতা সাদেক হোসেন খোকা আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক তাৎপর্য: এই একটি বিজয়ের মাধ্যমে সাদেক হোসেন খোকা নিজেকে জাতীয় পর্যায়ের এক হেভিওয়েট নেতায় পরিণত করেন এবং ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে নিজের অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
প্রশাসনিক সাফল্য: ক্রীড়া ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন
সাদেক হোসেন খোকা কেবল একজন রাজপথের রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি একাধিকবার সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী (১৯৯১–১৯৯৬)
১৯৯৩ সাফ গেমস পরিচালনা: ১৯৯৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সাফ গেমস (SAFF Games) অত্যন্ত সফলভাবে আয়োজন করার ক্ষেত্রে খোকা মূল সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।
ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন: পুরান ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ঢাকার ফুটবলে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর (যেমন ব্রাদার্স ইউনিয়ন, ভিক্টোরিয়া) অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি নিজে দীর্ঘদিন ব্রাদার্স ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী (২০০১–২০০৬)
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠিত হলে খোকাকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মেয়াদে ইলিশ মাছ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং গবাদিপশু উৎপাদনে স্থানীয় খামারিদের সরকারি সহায়তার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র
২০০২ সালে সাদেক হোসেন খোকা অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (DCC) মেয়র নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন এবং ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকাবাসী তাঁকে ভালোবেসে 'নগরপিতা' বা 'খোকা ভাই' বলে ডাকত।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রাস্তার নামকরণ
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খোকা তাঁর মেয়র পদকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা ও পুরান ঢাকার শতাধিক রাস্তার নাম বাংলাদেশের বীর শ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম এবং ১৯৭১-এর শহীদদের নামে নামকরণ করেন।
আধুনিক যোগাযোগ ও ফ্লাইওভার পরিকল্পনা
ঢাকার যানজট নিরসনে তিনি খিলগাঁও ফ্লাইওভার নির্মাণের তদারকি করেন এবং ঢাকার সর্ববৃহৎ 'যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার' (যা পরবর্তীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নামে চালু হয়) প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও চুক্তি তাঁর আমলেই সম্পন্ন হয়েছিল।
সর্বজনীন নাগরিক সেবা
কমিউনিটি সেন্টার ও পার্ক: ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নতুন আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার ও খেলার মাঠ পার্ক হিসেবে সংস্কার করেন।
জনসাধারণের নাগালের ভেতর মেয়র: খোকার মেয়োরশিপের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল নগর ভবনে সর্বস্তরের মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার। তিনি যেকোনো সাধারণ নাগরিকের সাথে সরাসরি দেখা করতেন এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিতেন।
'হাওয়া ভবন' বনাম প্রবীণ নেতৃত্ব: দলের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দলে দুটি স্পষ্ট ধারার সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে ছিলেন প্রবীণ, গণভিত্তিসম্পন্ন ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের মুক্তিযোদ্ধারা (যেমন সাদেক হোসেন খোকা, সাইফুর রহমান, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া); অন্যদিকে ছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন 'হাওয়া ভবন' কেন্দ্রিক নতুন উগ্র ও আমলাতান্ত্রিক ধারা।
ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র 'হাওয়া ভবন'
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি প্রবীণ ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নেতাদের পাশ কাটিয়ে দল ও সরকারের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা শুরু করে। সাদেক হোসেন খোকা এই প্রক্রিয়ার চরম বিরোধী ছিলেন। তিনি বহুবার দলীয় ফোরামে সতর্ক করেছিলেন যে, তৃণমূলের সাথে সম্পর্কহীন ব্যক্তিদের হাতে দলের ভার তুলে দিলে বিএনপি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বিস্ফোরক প্রতিবাদ
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর খোকার সাথে হাওয়া ভবনের দূরত্ব চূড়ান্ত রূপ নেয়। প্রবীণ নেতাদের না জানিয়ে চালানো এই হামলার পর খোকা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, নয়াপল্টন কার্যালয়ে গিয়ে চড়াও হন এবং সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে সরকারিভাবে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন।
এই ঘটনার পর থেকেই হাওয়া ভবনের অনুসারীরা খোকাকে 'আওয়ামী লীগের লোক' বা 'দলবিরোধী' বলে প্রচার শুরু করে এবং তাঁকে ঢাকার রাজনীতি থেকে মাইনাস করার কাজ শুরু করে।
১/১১-এর সময়কাল, মামলা ও নির্বাসিত জীবন
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ১/১১-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে দেশের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে।
মাইনাস টু ফর্মুলা ও খোকার ভূমিকা: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খোকা দলের ঐক্য ধরে রাখতে এবং বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তবে বিএনপির কিছু সংস্কারপন্থী নেতার সাথে সম্পর্ক নিয়ে দলটির ভেতরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
২০০৯ পরবর্তী আওয়ামী লীগ আমল ও মামলা: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং রাজউক কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি দুর্নীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের মামলা দায়ের করা হয়। খোকার সমর্থকদের দাবি ছিল—এসব মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সিটি কর্পোরেশন বিভক্তকরণ (২০১১): ২০১১ সালের নভেম্বরে জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে সাদেক হোসেন খোকার দীর্ঘ ৯ বছরের মেয়োরশিপের অবসান ঘটে।
অন্তিম দিনগুলো: নিউ ইয়র্কে অবস্থান ও ট্র্যাজিক বিদায়
২০১৪ সালের মে মাসে সাদেক হোসেন খোকা উন্নত চিকিৎসার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর কিডনিতে ক্যানসার ধরা পড়ে।
নিউ ইয়র্কে নির্বাসিত জীবন ও পাসপোর্টের জটিলতা
নিউ ইয়র্কের 'মেমোরিয়াল স্লোয়ান কেটারিং ক্যানসার সেন্টার'-এ দীর্ঘদিন তাঁর চিকিৎসা চলে। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশে তাঁর অনুপস্থিতিতেই কয়েকটি মামলায় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
একই সময়ে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে খোকা ও তাঁর স্ত্রীর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। ফলে অন্তিম সময়ে দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও তিনি নিজ স্বাধীন দেশে ফিরতে পারেননি। এটি ছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হওয়া মানুষের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতি।
মৃত্যু
দীর্ঘ পাঁচ বছর ক্যানসারের সাথে লড়াই করার পর ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।
সর্বদলীয় শ্রদ্ধা ও জানাজা: এক অসাম্প্রদায়িক জননেতার পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় দলিল
মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের ইস্যুকৃত 'ট্রাভেল পারমিট' (এককালীন ভ্রমণ ছাড়পত্র) নিয়ে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর সাদেক হোসেন খোকার মৃতদেহ নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। দেশের মাটিতে তাঁর শেষ বিদায় রূপ নিয়েছিল এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের চিত্রে।
৭ নভেম্বর ২০১৯ ঢাকায় তাঁর মরদেহ পৌঁছানোর পর এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ জনগণ তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নেন:
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা: প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার: তাঁর কফিন রাখা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখানে ১৯৭১-এর সহযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ জনগণ ফুল দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা খোকাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (নগর ভবন): নগর ভবনে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও কর্পোরেশনের কর্মচারীরা তাঁদের প্রিয় সাবেক মেয়রকে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানান।
নয়াপল্টন ও পুরান ঢাকা: নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জানাজা শেষে ধূপখোলা মাঠ ও গোপীবাগে একাধিক জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জুরাইন কবরস্থান: সামরিক মর্যাদায় (গ Guard of Honour) গান স্যালুট প্রদানের পর তাঁকে জুরাইন কবরস্থানে তাঁর মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও পরিবারের বর্তমান অবস্থান
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও পুরান ঢাকার জনপ্রিয়তার ধারা বহন করছেন তাঁর বড় ছেলে ইশরাক হোসেন।
ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক উত্থান: ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইশরাক হোসেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি প্রকৌশলবিদ্যায় উচ্চশিক্ষিত হলেও বাবার মতো অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও গণভিত্তিক ধারায় বিশ্বাসী।
খোকার রাজনৈতিক শিক্ষা: সাদেক হোসেন খোকার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ক্ষমতার লোভ বা দলীয় অন্ধত্ব কখনোই একজন মুক্তিযোদ্ধার মূল আদর্শকে ধ্বংস করতে পারে না। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, নিজের দলের ভেতরে ভুল সিদ্ধান্ত বা সন্ত্রাসবাদ দেখা দিলে তার বিরুদ্ধে কথা বলাই প্রকৃত বীরের কাজ।
কেন সাদেক হোসেন খোকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন?
সাদেক হোসেন খোকা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন এক চরিত্র, যাঁকে একটি নির্দিষ্ট দলের ফ্রেমে বা মতাদর্শের ভেতরে আটকে রাখা অসম্ভব।
রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাদেক হোসেন খোকা আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না; ইতিহাস তার সঠিক নায়ককে ঠিকই চিনে নেয়। সাদেক হোসেন খোকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনটি প্রধান কারণে চিরকাল স্মরণীয় ও ভাস্বর হয়ে থাকবেন।
১৯৭১-এর বীরত্বগাথা: কোনো দলীয় পরিচয়ের আগে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি দেশের জন্য জীবন বাজি রাখা একজন অকুতোভয় 'ক্র্যাক প্লাটুন' গেরিলা যোদ্ধা।
ঢাকার গণমানুষের নেতা: অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে তিনি ঢাকার ঘরে ঘরে 'খোকা ভাই' হিসেবে যে মানবিক সেবা ও উন্নয়ন পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা দলমত নির্বিশেষে আজও ঢাকাবাসী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
সত্য ও নীতির প্রতি অটল অবস্থান: নিজ দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ক্ষমতার দাপট দেখালেও, ২১ আগস্টের বর্বরোচিত ঘটনার পর তিনি সত্য বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস হবে জেনেও তিনি বেগম খালেদা জিয়ার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন।
আগামীর রাজনীতির শিক্ষা
সাদেক হোসেন খোকার জীবনী ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি থেকে আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য অনেক বড় শিক্ষা রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর যখন গুন্ডাতন্ত্র, স্বৈরাচারী মনোভাব, উগ্রতা এবং 'হাওয়া ভবন'-এর মতো বিকল্প ক্ষমতার কুচক্রী মহল গড়ে ওঠে, তখন খোকা সাহেবের মতো নীতিবান, উদার ও মুক্তিযোদ্ধা নেতারা ধ্বংস হয়ে যান। আর সেই ফাঁকে রাজনীতিতে রাজত্ব কায়েম করে সুবিধাবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা আজ ইতিহাসের পাতায় এক পরম শ্রদ্ধার নাম। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, তারেক রহমানের যে উগ্র ও রক্তক্ষয়ী রাজনীতির প্রতিবাদ খোকা সাহেব ২০০৪ সালে করেছিলেন, সেই উগ্র রাজনীতির মাশুলই আজ বিএনপিকে দিতে হচ্ছে।
আমরা সাদেক হোসেন খোকার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আগামীর বাংলাদেশে উগ্রতা, গ্রুপিং, সন্ত্রাস ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির তোষণ নয়; বরং সাদেক হোসেন খোকার মতো বীরত্ব, রাজনৈতিক শিষ্টাচার, উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের রাজনীতি জয়যুক্ত হোক।
লেখক: ড. জামিল আহমেদ, প্রবীণ শিক্ষক















