বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা বনাম মওলানা ভাসানীর কু-রাজনীতি - সত্যের ব্যবচ্ছেদ
রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে '৭১-এর পরাজিত ও চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী পুনর্জন্ম লাভ করে, রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয় এবং ক্ষমতার অংশীদার পর্যন্ত হয়ে বসে। বর্তমানে (নব্বইয়ের দশকের প্রেক্ষাপট ও গোলাম আযমের নাগরিকত্ব আন্দোলনের সময়) যখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন করে তীব্র জনমত গড়ে উঠছে, তখনও একশ্রেণীর প্রগতিশীল রাজনীতিক সেই পুরোনো “এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের” নোংরা কৌশলে লিপ্ত হয়েছেন। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছেন বটে, কিন্তু একই মুখে মিথ্যাচার করছেন যে, ‘বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার কারণেই নাকি জামায়াত-শিবির ও রাজাকাররা রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে!’

TruthBangla

আরবীতে একটি অত্যন্ত প্রনিধানযোগ্য প্রবাদ রয়েছে “মা তালাবা কুল ফাতা কু” যার সরল বাংলা তর্জমা হলো: “যে সব পেতে চায়, সে সব হারায়।” স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আদিপর্ব, অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলে এই প্রবাদের সত্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গঠনের যে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তা মোকাবিলা করার মতো রাজনৈতিক পরিপক্কতা তৎকালীন বিরোধী দল ও প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত বহু রাজনীতিকের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। তারা এক ঢিলে সব পাখি শিকার করার এক অবাস্তব, আবেগসর্বস্ব ও অপরিনামদর্শী রাজনীতিতে মেতে উঠেছিলেন। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ‘আমও গেল, ছালাও গেল’ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।
সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে ব্যাংক লুট, সরকারি খাদ্য গুদামে অগ্নিসংযোগ, হাট-বাজার দখল, থানা লুট, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, এমনকি নতুন জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুখোমুখি সংগ্রেমে লিপ্ত হতেও তথাকথিত বিপ্লবীরা দ্বিধা করেননি। জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ে নির্বাচিত একটি বৈধ সরকারের বিরোধিতার ছদ্মাবরণে সেদিন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলেই কুঠারাঘাত করা হয়েছিল।
আমরা বা আমি কখনোই দাবি করছি না যে, তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের সকল পদক্ষেপই শতভাগ ভুলত্রুটিমুক্ত ছিল। কারণ কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নন, আর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও কোনো অতিমানব বা ফেরেশতা ছিলেন না। কিন্তু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, যার অর্থনীতি ছিল শূন্য, অবকাঠামো ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, সাড়ে সাত কোটি মানুষের আহার সংস্থানের তীব্র সংকট, এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন-চীন ব্লকের অন্ধ বৈরিতা এসব হাজারো প্রতিকূলতার অক্টোপাসের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেশ পরিচালনা করতে হচ্ছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সে সময়ের উগ্র বাম ও ডানপন্থী দলগুলো এই চরম নাজুক ও মানবিক সংকটকে বিবেচনাতেই নেয়নি। তাদের কর্মকাণ্ডে মনে হতো, বঙ্গবন্ধুর সরকারকে যেকোনো উপায়ে গদিচ্যুত করতে পারলেই তারা যেন ক্ষমতার মসনদে বসে স্বর্গ এনে দিতে পারবেন!
এই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতির চরম পরিণতিতেই ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংসতম ট্র্যাজেডি। পটপরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের মুখরোচক শ্লোগানের আড়ালে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সামরিকতন্ত্র। পরবর্তীতে ১৭ বছর ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের অধীনে দেশ শাসিত হয়েছে। আর এই দীর্ঘ সময় ধরে প্রগতিশীল রাজনীতিকরা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বদলে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলের অন্ধ সমালোচনায় মুখর থেকেছেন।
এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে '৭১-এর পরাজিত ও চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী পুনর্জন্ম লাভ করে, রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয় এবং ক্ষমতার অংশীদার পর্যন্ত হয়ে বসে। বর্তমানে (নব্বইয়ের দশকের প্রেক্ষাপট ও গোলাম আযমের নাগরিকত্ব আন্দোলনের সময়) যখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন করে তীব্র জনমত গড়ে উঠছে, তখনও একশ্রেণীর প্রগতিশীল রাজনীতিক সেই পুরোনো “এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের” নোংরা কৌশলে লিপ্ত হয়েছেন। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছেন বটে, কিন্তু একই মুখে মিথ্যাচার করছেন যে, ‘বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার কারণেই নাকি জামায়াত-শিবির ও রাজাকাররা রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে!’
এই ঐতিহাসিক মিথ্যাচার ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অপপ্রচারের সত্যতা নিরূপণ করাই আমাদের এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমাদের বুঝতে হবে তিনি কোন অভূতপূর্ব সামাজিক, আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, কেন এবং ঠিক কাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ও ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার রূপরেখা (১৯৭২-১৯৭৫)
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত নাজুক। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজিত হলেও তাদের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো দেশে। এর পাশাপাশি উগ্রপন্থী কিছু রাজনৈতিক দল ‘বিপ্লব’ ও ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কায়েমের নামে দেশে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করে ‘গণবাহিনী’ এবং সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। অন্যদিকে চীনাপন্থী বাম দলগুলোর মধ্যে আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, মতিন-আলাউদ্দিন, এবং সিরাজ সিকদারের ‘সর্বহারা পার্টি’ সরাসরি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা স্বাধীন বাংলাদেশকে বলত ‘ভারতের তাবেদার সরকার’ এবং ঘোষণা দিয়েছিল ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার।
প্রতিবিপ্লবীদের এই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের জীবন চরম আতঙ্কে দিন কাটছিল। প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতা খুললেই চোখ উঠত গুপ্তহত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও থানা লুটের সংবাদে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত মাত্র দেড় বছরের মধ্যে দেশজুড়ে:
২০৩৫টি রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা ঘটে।
৩৩৭টি অপহরণের ঘটনা ঘটে।
১৯০টি ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়।
১৯০৭টি সশস্ত্র ডাকাতি ও লুটতরাজের ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়।
সর্বোপরি, উগ্রপন্থী দুষ্কৃতকারীদের হাতে অন্তত ৪০২৫ জন নিরীহ নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারান।
এই রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ অরাজকতার সময় তৎকালীন বিরোধী দলগুলো সরকারকে সহযোগিতা করার বদলে উসকানি দেওয়ার রাজনীতিতেই ব্যস্ত ছিল। তারা মনে করেছিল, দেশের পরিস্থিতি যত বিশৃঙ্খল হবে, সরকারের পতন তত দ্রুত ঘটবে।
দালাল আইন (১৯৭২) ও বিচার ব্যবস্থার আইনি বাস্তবতা
স্বাধীনতার মাত্র এক মাসের মাথায়, হাজারো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু সরকার দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি জারি করা হয় ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২’ বা ‘দালাল আইন’।
যুদ্ধাপরাধী ও দালালদের দ্রুত বিচারের জন্য সারা দেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য ব্যাপক আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালে আইনটি প্রণয়নের পর থেকে ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশ থেকে ৩৭,৪৭১ জন অভিযুক্ত দালালকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিচারক সংকট, সাক্ষী না পাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার কারণে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অর্থাৎ দীর্ঘ ২২ মাসে মাত্র ২,৮৪৮টি মামলার বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এই বিচারের ফলাফলে দেখা যায়:
অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডিত হয় মাত্র ৭৫২ জন।
সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত থেকে বেকসুর খালাস পায় ২,০৯৬ জন।
অবশিষ্ট প্রায় ৩৪ হাজারেরও বেশি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার প্রক্রিয়া তখন ঝুলে ছিল। আইনি গতির এই হিসাব অনুযায়ী, সব বন্দীর বিচার সম্পন্ন করতেই আরও অন্তত ১২ থেকে ১৪ বছর লেগে যেত!
এদিকে এক অদ্ভূত রাজনৈতিক চরিত্র প্রত্যক্ষ করা গেল। যারা ১৯৭২ সালের শুরুতে দালাল আইনের প্রশংসা করেছিল, সেই বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই আইনের সমালোচনা শুরু করে দিলেন।
জাতীয় লীগের প্রধান আতাউর রহমান খান প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বললেন:
"সরকার দেশ পুনর্গঠনের কাজ বাদ দিয়ে সারা দেশে কাল্পনিক শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যস্ত রয়েছে। দালাল আইন জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং এই বিচার একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে।"
তিনি অবিলম্বে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের মুক্তি ও সর্বজনীন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার দাবি তোলেন। কেবল আতাউর রহমান নন, বিরোধীদের এক বড় অংশ সুকৌশলে জনমনে অপপ্রচার ছড়িয়ে দেয় যে, "এই দালাল আইন নাকি হিন্দু ভারতের প্ররোচনায় বাঙালিদের শাস্তি দেওয়ার জন্য করা হয়েছে!"
ভূ-রাজনীতি, বন্দি ৪ লক্ষ বাঙালি ও আন্তর্জাতিক চাপ
বঙ্গবন্ধুর সামনে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটই ছিল না, ছিল এক বিরাট ভূ-রাজনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়।
পাকিস্তানে আটক ৪ লক্ষ বাঙালির ট্র্যাজেডি
পাকিস্তানে তখন আটকে পড়েছিল প্রায় ৪ লক্ষ বাঙালি। এর মধ্যে ছিলেন:
১,৬০,০০০ জন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
৩৩,০০০ জন সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্য।
১৯৭২ সালের জুলাই মাস থেকেই পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো সরকার সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত বাঙালিদের বরখাস্ত করে পরিবারসহ বন্দী শিবিরে (Concentration Camps) স্থানান্তরিত করে। তাদের ওপর চালানো হচ্ছিল অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের স্বজনরা প্রতিদিন রাজপথে অনশন, মিছিল ও সমাবেশ করছিল। পরিবারের সদস্যদের অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর প্রবল সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল।
ভুট্টোর ব্ল্যাকমেইল ও ভারতের অর্থ সংকট
বাংলাদেশে বন্দী ছিল ৯০,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী (POW)। ভুট্টো এই ৯০,০০০ যুদ্ধবন্দীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য পাকিস্তানে আটক ৪ লক্ষ বাঙালিকে জিম্মি হিসেবে ব্যবহার করছিলেন।
অপরদিকে, এই ৯০,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের থাকা-খাওয়ার খরচ যোগাতে গিয়ে ভারতের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। ভারতের প্রতিদিন খরচ হচ্ছিল ৩ লাখ ২ হাজার ভারতীয় রুপি। ১৯৭৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৯ কোটি রুপি।
এর আগে ১৯৭১ সালের ৯ মাসে এক কোটি বাঙালি শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে ভারতকে খরচ করতে হয়েছিল ৩০৪ কোটি রুপি। যুদ্ধ ও যুদ্ধবন্দীদের এই বিপুল আর্থিক বোঝা ভারত সরকারের পক্ষে আর টানা সম্ভব হচ্ছিল না। তারা দ্রুত যুদ্ধবন্দী সমস্যার সমাধান চাইছিল।
চীনের ভেটো ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছেদ
১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্য রাষ্ট্রকে চিঠি লেখেন। কিন্তু ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে চীন প্রথম ভেটো প্রয়োগ করে।
চিন ও মার্কিন অক্ষের তৎকালীন নীতি ছিল নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে রাখা। চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পিকিংয়ে দাঁড়িয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য করেছিলেন যে:
"ভারতীয়রাই পাকিস্তানের ঘাড়ে তথাকথিত বাংলাদেশের পুতুল সরকারকে চাপিয়ে দিয়েছে।"
জাতিসংঘের সদস্যপদ না পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনকে চরম বাধার মুখে ফেলে।
মাওলানা ভাসানী ও বিরোধী রাজনীতির 'কু-রাজনীতি'
এই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, ইতিহাসের ভাষায় তাকে ‘কু-রাজনীতি’ বা দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতি ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না।
মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ও আত্মগোপনকারী উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে শুরু করেন মাওলানা ভাসানী। তিনি প্রকাশ্য জনসভায় 'মুসলিম বাংলা' ও 'হুকুমতে রব্বানী' কায়েমের স্লোগান তুলে সাম্প্রদায়িকতার সুড়সুড়ি দিতে থাকেন।
পাবলিক মিটিংয়ে তিনি হাত তুলে মোনাজাত করে বলতেন:
"যারা মুসলিম বাংলার জন্য কাজ করছে, আমি তাদের জন্য দোয়া করছি।"
তিনি ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন:
"বাংলাদেশকে আমি প্রয়োজনে ভিয়েতনাম বানিয়ে ছাড়ব!"
ভাসানীর এই উগ্র অবস্থান ও বক্তব্যের কারণে দেশীয় পিকিংপন্থী অতি-বাম সন্ত্রাসী ও আত্মগোপনকারী রাজাকার-আলবদররা এক ছাতার নিচে আসার সুযোগ পায়। তারা সমাজতন্ত্রের আড়ালে মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
মাওলানা ভাসানী এবং আতাউর রহমান খানের মতো নেতারা একদিকে কোর্টে দালালদের বিচারকে ‘প্রহসন’ বলে মুক্তি দাবি করছিলেন, আবার বাইরে এসে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করছিলেন যে কেন বিচার দ্রুত হচ্ছে না! এটিই হলো সেই "এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের নীতি" যার মাধ্যমে তারা একদিকে জামায়াত-রাজাকারদের সহানুভূতি পাচ্ছিলেন, অন্যদিকে সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংস করছিলেন।
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বরের সাধারণ ক্ষমা: আইনি শর্ত ও পরিধি
এমনি এক চরম সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকমেইলের মুখোমুখি হয়ে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে এই সাধারণ ক্ষমা ছিল সুনির্দিষ্ট, শর্তযুক্ত এবং অত্যন্ত সুচিন্তিত। এটি কোনো ঢালাও মুক্তি ছিল না।
ক্ষমার আদেশের মূল শর্তাবলী
정확히 সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, দণ্ডবিধির মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ক্ষমা কোনোভাবেই প্রযোজ্য হবে না।
যাদের ক্ষমা দেওয়া হয়নি, তাদের অপরাধের ধারাগুলো ছিল:
১. ধারা ৩০২: হত্যা (Murder)
২. ধারা ৩০৪: হত্যার চেষ্টা বা অনৈচ্ছিক নরহত্যা (Culpable Homicide)
৩. ধারা ৩৭৬: ধর্ষণ (Rape)
৪. ধারা ৪৩৫: অগ্নিসংযোগ বা বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে ক্ষতিসাধন (Arson by fire or explosive)
৫. ধারা ৪৩৮: জাহাজে অগ্নিসংযোগ বা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অপকর্মসাধন।
অর্থাৎ, যেসব দালাল বা রাজাকারের বিরুদ্ধে সরাসরি খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠন কিংবা মানবতাবিরোধী সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছিল, তাদের বিচার প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখা হয়।
ক্ষমা কেবল দেওয়া হয়েছিল তাদের, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো গুরুতর অভিযোগ ছিল না এবং যারা কেবল সাধারণ সহযোগী বা গৌণ অপরাধে আটক ছিল।
সাধারণ ক্ষমার রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য
আন্তর্জাতিক স্তরে জিম্মি বাঙালিদের উদ্ধার: ক্ষমার মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়কে দেখানো সম্ভব হয়েছিল যে বাংলাদেশ কোনো প্রতিশোধের রাজনীতি করছে না। এর সরাসরি ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তান বাধ্য হয় আটকে পড়া ৪ লক্ষ বাঙালিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে।
ভারতের ওপর বোঝা কমানো: যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের পথ সুগম হয় এবং সিমলা চুক্তি ও পরবর্তী ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ৯০০০০ পাক যুদ্ধবন্দীকে ফেরত পাঠিয়ে ভারতকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করা হয়।
জাতিসংঘের স্বীকৃতি: চীনের ভেটোর যৌক্তিকতা শেষ হয়ে যায় এবং ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে।
আদালতের মামলার জট কমানো: বিচার বিভাগকে সুনির্দিষ্ট খুন ও ধর্ষণের আসামিদের বিচারে মনোনিবেশ করার আইনি সুযোগ দেওয়া হয়।
সংবিধানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষাবলয়
অনেকে অজ্ঞতাবশত কিংবা উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে দাবি করেন যে, সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে নাকি স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনীতি করার অধিকার পেয়েছিল! এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য এবং ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ।
বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা করলেও দালাল ও রাজাকারদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণ খর্ব করে সংবিধানে শক্ত তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন:
১. সংবিধানের ১২ ও ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ: বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে দেশে ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ ইত্যাদি স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোর রাজনীতি করার কোনো বৈধ সুযোগ ছিল না।
২. সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদ: সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২)(জি) উপ-ধারায় স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছিল যে দালাল আইনে অভিযুক্ত, দণ্ডিত কিংবা মুক্তপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি কখনো জাতীয় সংসদের সদস্য হতে পারবেন না এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।
অর্থাৎ, সাধারণ ক্ষমার পর কারাগার থেকে বের হলেও কোনো রাজাকারের নির্বাচনে দাঁড়ানো বা রাজনৈতিক দল গঠন করার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ছিল না।
সাধারণ ক্ষমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও তৎকালীন নেতাদের দ্বিমুখী অবস্থান
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু যখন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন, তখন তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তাদের ভণ্ডামি পরিষ্কার ধরা পড়ে।
ভাসানী ন্যাপের প্রতিক্রিয়া: ক্ষমা ঘোষণার মাত্র একদিন পর, ১৯৭৩ সালের ১ ডিসেম্বর, মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলে: "ন্যাপ বহু আগেই নিরপরাধ বন্দীদের মুক্তি দাবি করেছিল।" তবে তারা এতেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা দালাল আইনের মূল ৮ ও ৫০ নম্বর ধারা বাতিলের জোর দাবি জানায়!
আতাউর রহমান খানের প্রতিক্রিয়া: জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন: "আরও আগেই দেশের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। এর ফলে দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হবে।"
আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্য: প্রবীণ রাজনীতিক ও প্রখ্যাত লেখক আবুল মনসুর আহমদ ২ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখেন:
"সরকার যখন অনুকম্পার দরজা খুলেছেন এবং ১৬ হাজার বন্দীকে মাফ করেছেন, তখন বাকি সবার ক্ষেত্রেও তেমনি উদারতা প্রদর্শন করুন। তা না হলে চারশ লোককে প্রমাণের অভাবে আজ যেভাবে খালাস দেওয়া হলো, ১৪ বছর পর বাকি ৩৭ হাজারকেও প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিতে হতে পারে।"
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ: তৎকালীন কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন ও অভিনন্দন জানায়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যেই নেতারা ১৯৭২-৭৩ সালে দালালদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, আজ তাদেরই রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা ইতিহাস বিকৃত করে বলছে যে, বঙ্গবন্ধু নাকি রাজাকারদের ক্ষমা করে ভুল করেছিলেন! এটিই হলো ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস।
বঙ্গবন্ধুর 'সাধারণ ক্ষমা (১৯৭৩)' বনাম জিয়াউর রহমানের 'দালাল আইন বাতিল (১৯৭৫)'
বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধীদের আইনি পুনর্বাসনের ব্যবধানটি এক নজরে অনুধাবনের জন্য নিচের টেবিলটি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি:
বিচারের মানদণ্ড ও বিবরণ | বঙ্গবন্ধুর নীতি (৩০ নভেম্বর, ১৯৭৩) | জিয়াউর রহমানের নীতি (৩১ ডিসেম্বর, ১৯৭৫) |
আইনি পদক্ষেপের প্রকৃতি | সুনির্দিষ্ট আংশিক ক্ষমা (Conditional Amnesty)। | দালাল আইন সম্পূর্ণ বাতিল অধ্যাদেশ (Full Repeal Ordinance)। |
খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের আসামি | সম্পূর্ণ ক্ষমার বাইরে রাখা হয়। (ধারা ৩০২, ৩০৪, ৩৭৬, ৪৩৫ ও ৪৩৮ বলবৎ ছিল)। | সকল দাগী খুনি, ধর্ষক ও যুদ্ধাপরাধীকে ঢালাও মুক্তি দেওয়া হয়। |
চলমান মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া | গুরুতর অপরাধীদের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অব্যাহত থাকে। | ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে চলমান সকল বিচার ও তদন্ত স্থগিত করা হয়। |
রাজনীতি ও ভোটাধিকার | সংবিধানের ১২, ৩৮ ও ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনীতি ও নির্বাচনে অযোগ্য। | সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। |
স্বাধীনতাবিরোধী নেতাদের পুনর্বাসন | গোলাম আযমসহ চিহ্নিত অপরাধীদের নাগরিকত্ব বাতিল ছিল। | গোলাম আযমকে দেশে ফেরার সুযোগ এবং শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। |
প্রধান ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য | ৪ লক্ষ আটকে পড়া বাঙালিকে পাকিস্তান থেকে নিরাপদ প্রত্যাবাসন। | মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলে রাষ্ট্রযন্ত্রে স্বাধীনতাবিরোধীদের স্থাপন। |
১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী পটপরিবর্তন ও স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রকৃত আইনি পুনর্বাসন
ইতিহাসের সত্য দলিল প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধু কোনো চিহ্নিত দালাল বা খুনিকে ক্ষমা করেননি। স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রকৃত আইনি ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি ক্ষমতার মসনদ চিরস্থায়ী করা এবং সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জারি করেন:
‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫’: এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক দালাল আইনটি এক কলমের খোঁচায় বাতিল করে দেওয়া হয়। এই বাতিল অধ্যাদেশে স্পষ্ট বলা হয়েছিল:
"উক্ত আদেশটি বাতিল হওয়ায় কোনো ট্রাইব্যুনাল, ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতে ঝুলন্ত থাকা সমস্ত বিচারকার্য বা মামলা এবং পুলিশ অফিসারদের পরিচালিত সকল তদন্তকার্য তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হয়ে যাবে।"
দালাল আইন বাতিলের কুফল
১. কারাগারে বন্দী থাকা খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের দায়ে দণ্ডিত এবং বিচারাধীন হাজার হাজার চিহ্নিত আলবদর, রাজাকারের মুক্তি ঘটে।
২. হত্যা ও ধর্ষণের মামলাগুলো এক রাতে গায়েব করে দেওয়া হয়।
৩. পাকিস্তান ও বিদেশে পালিয়ে থাকা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা বীরদর্পে দেশে ফিরে আসে।
৪. সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদ থেকে অসাম্প্রদায়িকতার নীতি মুছে ফেলেন। ফলে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি ধর্মভিত্তিক দলগুলো পুনরায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের আইনি বৈধতা পায়।
৫. পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে করাচিতে অবস্থান করা গোলাম আযমকে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে আসার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে এদেশের রাজনীতি করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়।
৬. '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে প্রতিনিধি দলে যাওয়া শাহ আজিজুর রহমানকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বানান জিয়াউর রহমান!
দালাল আইন, ১৯৭২: আইনি সূক্ষ্মতা, প্রক্রিয়া ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা
১৯৭১ সালের ঘাতক-দালালদের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২’ (President's Order No. 8 of 1972) জারি করা হয়। পরবর্তীতে আইনটিকে অধিকতর কার্যকর ও প্রশাসনিকভাবে নিরপেক্ষ করতে একাধিকবার সংশোধন করা হয় (যেমন: ১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ জারি করা PO No. 25 of 1972)।
আইনি কাঠামোর মূল বৈশিষ্ট্য
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: সারা দেশে বিচার কাজ পরিচালনার জন্য ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বিচারকদের সহায়তা করার জন্য প্রতিটি ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড সেশনস জজকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে ক্ষমতা দেওয়া হয়।
তদন্ত ও গ্রেফতার: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের অধীন বিশেষ পুলিশ টিমকে তদন্ত ও গ্রেফতারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অপরাধের শ্রেণীবিভাগ: আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে, যারা পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করেছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, অস্ত্র সরবরাহ করেছে, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর বা আল-শামস গঠন করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও তার কারণ
১৯৭২ সালের পর থেকে ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৭,৪৭১ জন ব্যক্তিকে দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর:
১. প্রশাসনিক ধ্বংসস্তূপ: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ স্টেশন এবং বিচার ব্যবস্থা পুরোপুরি পুনর্গঠিত হয়নি। অনেক নথিপত্র ও প্রমাণাদি পাকিস্তানি বাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছিল।
২. সাক্ষীর অভাব ও ভয়: স্থানীয় পর্যায় থেকে ভয়ে বা পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই ট্রাইব্যুনালে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে চাননি।
৩. হয়রানি ও ব্যক্তিগত শত্রুতা: বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জমিজমা সংক্রান্ত শত্রুতা, স্থানীয় কোন্দল বা প্রতিহিংসাবশত নির্দোষ মানুষকে 'দালাল' হিসেবে অভিযুক্ত করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রকৃত অপরাধী ও নির্দোষ ব্যক্তিদের আলাদা করতে ট্রাইব্যুনালের বিপুল সময় নষ্ট হয়।
ফলাফল হিসেবে, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ২,৮৪৮টি মামলার বিচার শেষ হয়। এর মধ্যে ৭৫২ জন দণ্ডিত হন এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে ২,০৯৬ জন বেকসুর খালাস পান। প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ কোনো প্রকার বিচার ছাড়াই কারাগারে আটক ছিলেন, যাদের বেশিরভাগেরই বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট খুনের প্রমাণ ছিল না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩ এবং ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী
বঙ্গবন্ধু সরকার কেবল দেশীয় দালালদের বিচারের ব্যবস্থাই করেননি, বরং শীর্ষ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য একটি বৈশ্বিক মানসম্পন্ন আইন প্রণয়ন করেন।
ICTA 1973 প্রণয়ন: ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘International Crimes (Tribunals) Act, 1973’ (ICTA 1973)। এটি ছিল বিশ্বে প্রথম এমন একটি সর্বাধুনিক আইন, যার মাধ্যমে জেনোসাইড (Genocide), মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes Against Humanity), এবং যুদ্ধাপরাধের (War Crimes) জন্য সরাসরি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের বিধান রাখা হয়। তৎকালীন আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞদের পরামর্শে এবং ড. কামাল হোসেনের সমন্বয়ে আইনটি তৈরি করা হয়।
১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী: বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পাকিস্তানের ১৯৫ জন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে (যার মধ্যে জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী, রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জামশেদ প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করে।
ভূ-রাজনীতি, দিল্লি চুক্তি (১৯৭৩) ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (১৯৭৪)
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ৯০,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী ও ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে মুক্ত করতে কৌশলগত ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আশ্রয় নেন।
পাকিস্তানের চাল:
১. বাঙালিদের জিম্মি করা: পাকিস্তানে আটকে রাখা ৪ লাখ বাঙালিকে (যার মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক পদস্থ কর্তারা ছিলেন) পরিবারসহ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি রাখা হয়। ভুট্টো সাফ জানিয়ে দেন, ১৯৫ জন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার বিচার বাংলাদেশে শুরু হলে আটকে পড়া ৪ লাখ বাঙালির ভাগ্য চরম অনিশ্চয়তায় পড়বে এবং তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার বিচার শুরু করা হবে।
২. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে বাধা: চীনকে দিয়ে জাতিসংঘে ভেটো দেওয়ানো এবং ওআইসি (OIC) দেশগুলোকে দিয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা হয়।
দিল্লি চুক্তি (২৮ আগস্ট, ১৯৭৩): ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রতিনিধিদল এবং পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় ভারত ও বাংলাদেশে আটকে থাকা সাধারণ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।
পাকিস্তানের জেলখানা থেকে ৪ লাখ আটকে পড়া বাঙালিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে। বাংলাদেশে অবস্থানরত নন-বাঙালি (বিহারি), যারা পাকিস্তানে যেতে চায়, তাদের পাকিস্তান গ্রহণ করবে।
ঢাকা-নয়াদিল্লি-ইসলামাবাদ ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (৯ এপ্রিল, ১৯৭৪)
১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান)।
পাকিস্তানের দুঃখ প্রকাশ: চুক্তির ১৪ অনুচ্ছেদে পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের সহিংসতার জন্য গভীর অনুশোচনা ও দুঃখ প্রকাশ করে।
বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি: পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দেয় যে ১৯৫ জন অভিযুক্ত সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তারা নিজ দেশে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও বিচারিক ব্যবস্থা নেবে।
বাঙালিদের মুক্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা: আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা এবং ৪ লাখ বাঙালির জীবন রক্ষার্থে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। (যদিও পাকিস্তান পরবর্তীতে কথা রাখেনি এবং তাদের বিচার করেনি)।
মাওলানা ভাসানী, 'হককথা' ও বিরোধী শিবিরের রাজনীতি
মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত মারমুখী ও জটিল।
সাপ্তাহিক 'হককথা' ও প্রপাগান্ডা: ১৯৭২ সালে ভাসানীর নির্দেশে ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে শুরু করে সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘হককথা’। এই পত্রিকা থেকে নিয়মিতভাবে শেখ মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার করা হতো।
ভারতীয় আগ্রাসনের ভুয়া খবর, 'মুসলিম বাংলা' পুনরুদ্ধারের আহ্বান এবং ভারতের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হতো। পরবর্তীতে অতিমাত্রায় উসকানিমূলক সংবাদ প্রকাশের দায়ে সরকার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।
আসামের মুসলিম সংকট ও 'মুসলিম বাংলা': ভাসানী একের পর এক জনসভায় 'মুসলিম বাংলা' কায়েমের কথা বলেন। তিনি বামপন্থী নীতি ত্যাগ করে উগ্র ডানপন্থী পরাজিত মুসলিম লীগ ও রাজাকারদের রাজনৈতিক ছত্রছ ছায়া দান করেন। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল যেভাবেই হোক মুজিব সরকারের পতন ঘটানো।
জাসদ, গণবাহিনী ও 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ ভেঙে গিয়ে সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।
গণবাহিনীর সহিংসতা: জাসদ তাদের সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ তৈরি করে, যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব:) আবু তাহের এবং হাসানুল হক ইনু। তারা গ্রামগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর হামলা চালায়।
অনেক থানা লুট, সরকারি ধান ও পাটের গুদামে অগ্নিসংযোজন এবং রেললাইনে নাশকতা চালায়। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে জাসদের বহু কর্মী হতাহত হন।
বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা: কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর মধ্যে গোপনে গঠিত হয় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। সেনা সদস্যদের উসকানি দিয়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা এবং নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে তথাকথিত 'সিপাহী-জনতার বিপ্লব' ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রক্তাক্ত সিপাহী বিপ্লবে রূপ নেয়।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তন: জিয়াউর রহমানের নীতি ও আইনি বাতিল অধ্যাদেশ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পটভূমি সম্পূর্ণ উল্টে যায়। সামরিক খোলস থেকে খন্দকার মোশতাক এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে নেন।
দালাল আইন বাতিল অধ্যাদেশ (৩১ ডিসেম্বর, ১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তত্কালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ. এস. সায়েম এবং উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (D CMLA) জিয়াউর রহমানের আদেশে জারি করা হয় ‘The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975’ (Ordinance No. LXIII of 1975)।
আদালত ও বিচার বাতিল: এই অধ্যাদেশের ১ নম্বর ধারার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের দালাল আইনটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়।
সকল বিচার স্থগিত: অধ্যাদেশের ২ নম্বর ধারায় বলা হয়, এই আদেশ জারির পূর্বে ট্রাইব্যুনাল, আদালত বা পুলিশের কাছে থাকা সমস্ত চলমান মামলা, তদন্ত ও বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতির যোগ্য হবেন।
এর সরাসরি ফলশ্রুতিতে, যেসব দাগী রাজাকার, আল-বদর, ও খুনি কারাগারে বিচারে শাস্তি ভোগ করছিল বা বিচারধীন ছিল, তারা সবাই এক রাতে মুক্ত হয়ে যায়।
নাগরিকত্ব আদেশ সংশোধন (১৮ জানুয়ারি, ১৯৭৬): ১৯৭৬ সালের ১৮ জানুয়ারি জিয়াউর রহমান সরকার ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আদেশ’ সংশোধন করে। এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া এবং পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা ব্যাক্তিদের (যেমন: গোলাম আযম, শাহ আজিজুর রহমান, খাজা খায়েরউদ্দিন) বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।
সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন ও ৫ম সংশোধনী: ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িকতা রক্ষার জন্য ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তে বলা হয়েছিল “ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোনো রাজনৈতিক দল বা সমিতি গঠন করা যাইবে না।”
১৯৭৬ সালের মে মাসে এক সামরিক ফরমানের মাধ্যমে ৩৮ অনুচ্ছেদের এই শর্তটি মুছে দেওয়া হয়। এর ফলে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, এবং মুসলিম লীগ আইনগতভাবে পুনরায় রাজনৈতিক দল গঠনের ও রাজপথে রাজনীতি করার অধিকার পায়।
পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির মনোনয়নে বা সতন্ত্রভাবে যুদ্ধাপরাধীরা সংসদে আসার সুযোগ পায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের উপ-প্রধান শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়াউর রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।
দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিরতি ও ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের অপরাধের আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় যে বিচারের আইনি শক্ত ভিত্তি (ICTA 1973) স্থাপন করে গিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালের পর সামরিক সরকারগুলো তা পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়।
দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের আমলে গড়ে উঠেছিল, তার অবসান ঘটে ২০১০ সালে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুনরায় ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ (ICT) গঠন করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো ২০১০ সালে রাজাকার, আল-বদর ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কিন্তু কোনো নতুন আইনে হয়নি; বরং বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা সেই ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ (ICTA 1973)-এর অধীনেই কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইতিহাস বিকৃতি ও প্রগতিশীল রাজনীতির ট্র্যাজেডি
বিগত ১৭ বছর ধরে (বইটি প্রকাশের সময়কাল অনুযায়ী) এদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল রাজনীতিকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা জিয়াউর রহমানের দালাল আইন বাতিলের আসল ইতিহাস চেপে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর 'সাধারণ ক্ষমা'কে কাঠগড়ায় তোলার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ঐতিহাসিক সত্য হলো:
সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু ৪ লক্ষ আটকে পড়া বাঙালিকে পাকিস্তান থেকে উদ্ধার করার জন্য এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সচল করার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা না করতেন তবে আজ এই প্রগতিশীলরাই বলতেন:
"বঙ্গবন্ধু ভারতের ইঙ্গিতে জেদ ধরে রেখে ৪ লক্ষ বাঙালিকে পাকিস্তানে মানবেতরভাবে মরতে দিয়েছিলেন!"
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক চাপ ও সামাজিক বাস্তবতার মুখে সাধারণ সহযোগীদের ক্ষমা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেননি। জিয়াউর রহমান এবং সামরিক শাসকগোষ্ঠীই দালাল আইন বাতিল করে আন্তর্জাতিক অপরাধীদের আইনি মুক্তি দিয়ে রাজনীতির প্রধান ধারায় বসিয়েছিলেন।
আমাদের দেশের প্রগতিশীলদের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো তারা প্রধান শত্রুকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন। তারা নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে 'এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের নীতি' গ্রহণ করে বারবার ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন এবং পরোক্ষভাবে স্বৈরাচার ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতকেই শক্তিশালী করেছেন।
সত্যের মুখোমুখি নতুন প্রজন্ম
ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম। সত্যকে সাময়িকভাবে মিথ্যার কুয়াশা দিয়ে ঢেকে রাখা গেলেও শেষ পর্যন্ত ইতিহাস নিজের বিচার নিজেই করে। আজ যখন বাংলাদেশে গোলাম আযম ও চিহ্নিত রাজাকার-আলবদরদের নাগরিকত্ব ও রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাজপথে নেমে এসেছে, তখন আমাদের অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন, তা ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য ভূ-রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়। আর ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান যে দালাল আইন বাতিল করেছিলেন, তা ছিল অর্জিত স্বাধীনতার সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
এই দুটি ঘটনার পার্থক্য নতুন প্রজন্মকে সঠিকভাবে বোঝানো আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। বিরোধী রাজনীতির মুখরোচক প্রপাগাণ্ডা ও 'এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের' অপরিণামদর্শী রাজনীতি পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির একটাই মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত ইতিহাসের প্রকৃত সত্যকে ধারণ করা এবং অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভীতকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করা। সত্যের এই ধারায় ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে একজন দূরদর্শী ও মানবিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই স্মরণ রাখবে।
তথ্যসূত্র: বঙ্গবন্ধু ও ইসলামী মূল্যবোধ - মওলানা আবদুল আউয়াল বই থেকে হবহু তুলে ধরা হয়েছে।















