বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন নাকি ধর্মহীন ছিলেন? ইসলামের প্রসারে বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা ও ব্যক্তিগত জীবনের গভীরতম সত্যকে আড়াল করতে একটি কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী স্বাধীনতার পর থেকেই একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তাদের মূল দাবি ১৯৭২ সালের সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নাকি রাষ্ট্রকে 'ধর্মহীন' বা 'নাস্তিকতাবাদী' বানিয়ে ফেলা হয়েছিল! তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতা, প্রামাণ্য দলিল এবং বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অপপ্রচার কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই নয়, ইতিহাসকে বিকৃত করার এক হীন চক্রান্ত।

TruthBangla

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা ও ব্যক্তিগত জীবনের গভীরতম সত্যকে আড়াল করতে একটি কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী স্বাধীনতার পর থেকেই একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তাদের মূল দাবি ১৯৭২ সালের সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নাকি রাষ্ট্রকে 'ধর্মহীন' বা 'নাস্তিকতাবাদী' বানিয়ে ফেলা হয়েছিল! তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতা, প্রামাণ্য দলিল এবং বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অপপ্রচার কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই নয়, ইতিহাসকে বিকৃত করার এক হীন চক্রান্ত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো অবস্থাতেই ধর্মহীন বা নাস্তিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন খাঁটি, অনুশীলনকারী ও ঈমানদার মুসলমান। একই সাথে তিনি ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর কাছে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র অর্থ কোনো ধর্মহীনতা বা ধর্মের বিরোধিতা ছিল না, বরং তার অর্থ ছিল রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও সম্মানজনকভাবে পালনের গ্যারান্টি দেওয়া।
বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার এই মহান দর্শন, স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান, এবং পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে ইসলামের যে অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ সূচিত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও সচিত্র ইতিহাস এখানে তুলে ধরা হলো।
ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মহীনতা এবং বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট দর্শন
রাজনীতি ও সমাজনীতিতে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' এবং 'ধর্মহীনতা' দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা। ইউরোপীয় ধারার ‘সেকুলারিজম’ অনেক সময় সমাজ থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা নির্বাসিত করার কথা বলে, যাকে 'ধর্মহীনতা' বলা চলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এবং আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক হাজার বছরের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৯৭২ সালের ৪ই নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার সময় গণপরিষদে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু নিজের ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শন অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করেছিলেন:
"ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাঁদের ধর্ম পালন করবে তারে কেউ বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের নেই। হিন্দুরা তাঁদের ধর্ম পালন করবে কেউ তাঁদের বাধা দিতে পারবে না। বৌদ্ধরা তাঁদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাঁদের ধর্ম পালন করবে কেউ তাঁদের বাধা দিতে পারবে না।”
“আমাদের শুধু আপত্তি হলো যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ৫৪ বছর ধরে আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে প্রতারণা, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে খুন ও জিনা এই বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অত্যন্ত পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।"
এই বক্তব্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মকে শোষণের হাতিয়ার করা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রতিটি মানুষের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার অধিকারকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার রূপ দিয়েছিলেন।
১৯৭২ সালের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৪১: ধর্মীয় স্বাধীনতা): "প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচার করিবার অধিকার রহিয়াছে এবং প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে।"
"ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে তোরা কি নাস্তিক হয়ে গেছিস?"-তিন নেতার মাজার জিয়ারতে বঙ্গবন্ধু
স্বাধীনতার পরপরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন 'তিন নেতার মাজার' (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের মাজার) জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন।
সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর সাথে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক এবং বিশিষ্ট আলেম মাওলানা উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী।
ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী এবং ছবিতে উপস্থিত মাওলানা উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, বঙ্গবন্ধুর মেয়াদের গণভবন ও পরবর্তীতে সচিবালয় মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী বিষয়টির যে স্মৃতিচারণ করেছেন, তা ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ।
মাজারে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করলেন, তাঁর সাথে যাওয়া তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও সহচরেরা হাত না তুলে নিরবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে বঙ্গবন্ধু ক্ষুব্ধ হন এবং সাথে সাথে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেন:
"ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে তোরা কি নাস্তিক হয়ে গেছিস? সূরা-কালেমা ভুলে গেছিস? সবাই পড়, সূরা ফাতিহা, কুলহুআল্লাহ... যে যা জানিস পড়। কি মাওলানা ভাই, তুমি তাদের কিছু বলছো না কেন? মনে রাখবি আমরা মুসলমান। কবর জিয়ারতসহ সব ধর্মীয় কাজ শরীয়ত মত চলবে। ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া মানে ধর্মহীন হওয়া নয়। এর অর্থ, সব ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার।"
বঙ্গবন্ধুর এই একটি বাক্য "আমরা মুসলমান, কবর জিয়ারতসহ সব ধর্মীয় কাজ শরীয়ত মত চলবে" তাঁর ঈমানি দৃঢ়তা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত রূপ তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। তিনি তাঁর অনুসারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা গ্রহণ করার অর্থ স্বধর্ম ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ত্যাগ করা নয়।
রেডিও-টেলিভিশনে তিলাওয়াত ও কারী ওবায়দুল্লাহর স্মারক আখ্যান
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে বেতার ও সম্প্রচার ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হচ্ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ঠিক পরপরই কিছু অতি-উৎসাহী আমলা বা কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে টানা কয়েকদিন বাংলাদেশ বেতারে (রেডিওতে) সকালে কুরআন তিলাওয়াত সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল।
রাজশাহীর বিশিষ্ট আলেম ও লেখক ওবায়দুর রহমান খান নদভী তাঁর ঐতিহাসিক লেখায় এই ঘটনার পেছনের সত্যটি উদ্ঘাটন করেছেন:
স্বাধীনতার পর একদিন সকালে বঙ্গবন্ধু ঠিক সকাল ৭টায় ঘুম থেকে জেগে রেডিও অন করলেন। তিনি দেখলেন, প্রতিদিনের মতো সকালে যে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু মুহূর্তের মধ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তাত্ক্ষণিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান।
বঙ্গবন্ধু গর্জে উঠে বলেছিলেন, "এই, তোরা সব বিধর্মী হয়ে গেলি নাকি? কারী ওবায়দুল্লাহ কই? তাঁকে এখনই নিয়ে আয়, বেতারে যেন কুরআন তিলাওয়াত নিয়মিত শুরু হয়।"
বঙ্গবন্ধুর সেই সরাসরি হস্তক্ষেপর ও আদেশের পর বাংলাদেশে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রতিদিনের সম্প্রচার পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু করার স্থায়ী নিয়ম প্রবর্তিত হয়। শুধু তা-ই নয়, তিনি নিশ্চিত করেন যেন অন্যান্য প্রধান ধর্মের অনুসারীদের জন্যও তাঁদের স্ব-স্ব ধর্মগ্রন্থের বাণী প্রচারের ব্যবস্থা রাখা হয়, যা ছিল ইসলামিক ইনসাফ ও সাম্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
আলেম ও প্রত্যক্ষদর্শী মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন, "বঙ্গবন্ধুকে ধর্মহীন বানানোর অপচেষ্টা ভিত্তিহীন। স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, কাকরাইল মসজিদ ও ইজতেমার জমি প্রদান এবং বেতারে কুরআন তিলাওয়াত চালুর মাধ্যমে তিনিই ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন।"
'মাসিক মদীনা' ও মাওলানা মহিউদ্দীন খান: বঙ্গবন্ধুর এক দরদী হৃদয়ের উপাখ্যান
বাংলাদেশে ইসলামিক সাংবাদিকতা ও রেনেসাঁর স্থপতি, বরেণ্য আলেম, 'মাসিক মদীনা' পত্রিকার বিশ্বখ্যাত সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দীন খান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যকার আত্মিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও হৃদ্যতাপূর্ণ। এই সম্পর্কের শিকড় ছড়িয়ে ছিল ১৯৫১ সালে।
১৯৫১ ও ৫২ এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৫১ সালে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান লালবাগ মাদ্রাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখানে তিনি যুক্তবাংলার বিশিষ্ট বুজুর্গ মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আসতেন। মাওলানা মহিউদ্দীন খান তখন লালবাগ মাদ্রাসায় ফরিদপুরী হুজুরের কাছেই থাকতেন।
সেখান থেকেই তরুণ শেখ মুজিবের সাথে তরুণ মহিউদ্দীন খানের পরিচয় ও ভাইতুল্য আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু তাঁকে 'তুই-তোকারি' করে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় উভয়ই জেল খাটেন এবং দীর্ঘ দেড় মাস কারাগারে একই সাথে বন্দিজীবন যাপন করেন।
১৯৭২ সালের 'মাসিক মদীনা' ও বঙ্গবন্ধুর বাবার চিঠি
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু অতি-উৎসাহী বা বিভ্রান্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন পত্রিকার সাথে জনপ্রিয় ইসলামী সাময়িকী 'মাসিক মদীনা'র ডিক্লারেশন বা অনুমোদন বাতিল করে দেয়।
ঠিক এই সংকটময় সময়ে টুঙ্গিপাড়া থেকে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান একটি চিঠি লেখেন মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দীন খানের কাছে:
শ্রদ্ধেয় সম্পাদক সাহেব!
সালাম নিবেন। আশা করি কুশলেই আছেন। পর কথা হলো, আমি মাসিক মদীনার একজন নিয়মিত গ্রাহক। গত দু’মাস ধরে মদীনা পত্রিকা আমার নামে আসছে না। তিন মাসের বকেয়া বাকি ছিল। তাই হয়তো আপনি পত্রিকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি মুজিবকে চিঠি লিখে বলে দিব, সে যেন আপনার টাকা পরিশোধ করে দেয়। আমি বৃদ্ধ মানুষ। প্রিয় মদীনা পত্রিকা ছাড়া সময় কাটানো অনেক কষ্টকর। আশা করি আগামী মাস থেকে মদীনা পড়তে পারব। আমার জন্য দোয়া করবেন।
ইতি-
শেখ লুৎফুর রহমান
টুঙ্গিপাড়া, ফরিদপুর।
চিঠিটি পাওয়া মাত্রই মাওলানা মহিউদ্দীন খান সেটি পকেটে নিয়ে সরাসরি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে (বঙ্গভবনে) বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।
মাওলানা মহিউদ্দীন খানকে দেখে বঙ্গবন্ধু প্রথমে স্নেহের ছলে বললেন, "তুই এতদিন পর আমাকে দেখতে এলি? সরকারে আসার পর সবাই যেন দূরে চলে গেছে, পর হয়ে গেছে।"
মাওলানা খান জবাব দিলেন, "মুজিব ভাই, আমার 'মাসিক মদীনা' পত্রিকার ডিক্লারেশন তো আপনার তথ্য মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে!"
বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে বললেন, "তুই তো রাজাকার ছিলি না, তাহলে তোর পত্রিকা ওরা বন্ধ করবে কেন?" এই বলে তিনি পিএসকে নির্দেশ দিলেন তথ্য সচিবকে ফোন লাগাতে।
ঠিক তখনই মাওলানা মহিউদ্দীন খান পকেট থেকে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমানের লেখা চিঠিটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন। পিতার হাতের চেনা লেখা দেখেই বঙ্গবন্ধুর চোখ পানিতে ভরে যায়। পড়া শেষ করার আগেই তিনি কেঁদে ফেলেন এবং মাওলানা মহিউদ্দীন খানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।
বঙ্গবন্ধু আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন:
"তুই আমার কাছে আরও আগে কেন আসলি না? হারামজাদাদেরকে তো আমি ইসলামী কোনো পত্রিকা বন্ধ করতে বলিনি! আজ আমার বাবা দুনিয়াতে নেই (চিঠিটি পাওয়ার কিছুদিন আগেই বঙ্গবন্ধুর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন)। তিনি মদীনা পত্রিকা না পেয়ে কষ্ট পেয়েছেন!"
এরপর বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে তথ্য সচিবকে তীব্র বকাঝকা করেন এবং অবিলম্বে ‘মাসিক মদীনা’-র বাতিলকৃত ডিক্লারেশন পুনর্বহাল করার কঠোর নির্দেশ দেন। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গবন্ধু মাওলানা মহিউদ্দীন খানের হাত ধরে অত্যন্ত মমতায় নিজের গাড়িতে তুলে ধানমন্ডির বাসভবনে নিয়ে যান এবং সাথে বসিয়ে দুপুরের খাবার খাইয়ে বিদায় দেন। (সূত্র: আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে শাকের হুসেন শিবলী; এবং সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান, ২০০৯)।
স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী পদক্ষেপসমূহ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক ছিলেন না, বরং স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য তিনি যা করে গেছেন, তা তৎকালীন কোনো মুসলিম বিশ্বেও বিরল ছিল।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৫ সালের ২২শে মার্চ এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেন 'ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ'। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইসলামী গবেষণা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। একই সাথে তিনি 'ইসলামিক একাডেমি'-কে সুসংগঠিত করেন যাতে পবিত্র কুরআনের অনুবাদ, তাফসীর, হাদীস চর্চা এবং ইসলামী বিশ্বকোষ প্রণয়নের কাজ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পন্ন হয়।
মদ, জুয়া, রেস ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধকরণ: 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' নামে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৪ বছরের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে অবাধে মদের দোকান চালু ছিল এবং শহরের মোড়ে মোড়ে জুয়া ও হাউজির আসর বসানো হতো। এছাড়া মদ ও অসামাজিক কার্যকলাপ ছিল অবাধ।
স্বাধীনতা অর্জনের পরই বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে জুয়া ও ঘোড়দৌড় চিরতরে নিষিদ্ধ করেন। আইন করে মদ ও সুরাপান নিষিদ্ধ করেন। জুয়া, হাউজি ও লটারি খেলা বেআইনি ঘোষণা করেন। পবিত্র রমজান মাসে মদের দোকান বন্ধ রাখা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার নির্দেশ জারি করেন। পতিতাবৃত্তি ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের কঠোর আইন প্রণয়ন করেন এবং শাস্তির বিধান জারি করেন।
টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার সুবিশাল জায়গা বরাদ্দ: মহানবী (সা.)-এর সুন্নাত অনুযায়ী মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকার এই মহান দায়িত্ব পালন করে থাকে তাবলীগ জামাত। আজ গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা যে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েতে পরিণত হয়েছে, তার মূল অবদান বঙ্গবন্ধুর। বঙ্গবন্ধু তাবলীগ জামায়াতের ইজতেমার জন্য টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে ১৬০ একর জমি স্থায়ীভাবে বিনামূল্যে বরাদ্দ দেন। আজকে টঙ্গীর এই ইজতেমা প্রাঙ্গণ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসমাবেশে (মক্কার হজের পর) পরিণত হয়েছে।
কাকরাইল মসজিদের স্থান ও জমি সম্প্রসারণ: রাজধানী ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ মসজিদটি স্বাধীনতা পূর্বে অত্যন্ত অপ্রশস্ত ও সংকুচিত ছিল। মসজিদের প্রসারণ ও তাবলীগ জামায়াতের মারকাজ পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত জমি বরাদ্দ দেন। মসজিদের চারপাশে অতিরিক্ত সরকারি জমি বরাদ্দ দেন এবং তাঁরই নির্দেশে মসজিদটি আধুনিক ও বিশাল পরিসরে সম্প্রসারিত করা হয়। এর ফলে কাকরাইল মসজিদ সমগ্র বিশ্বের দাওয়াতি কাজের অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ওআইসি সম্মেলন ও মুসলিম বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সেতু: ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি (Islamic Cooperation Organization) শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু যোগ দেন। পাকিস্তান ও পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কে একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরপরই সৌদি আরব, কুয়েত, মিসর, আলজেরিয়া সহ বহু মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং হাাজ পালন সহজতর হয়।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন: পাকিস্তান আমলে বা তার পূর্বে বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বায়ত্তশাসিত আইনি স্বীকৃতি বা আলাদা বোর্ড ছিল না। মাদ্রাসা শিক্ষা ছিল অবহেলিত এবং এর শিক্ষকরা ছিলেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। আলেম-ওলামাদের মর্যাদা এবং কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার ধর্মীয় শিক্ষার মান সংরক্ষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম 'বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড' পুনর্গঠন করেন এবং মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য সরকারি অনুদান নিশ্চিত করেন। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষকদের সরকারি স্কেলে চাকরির নিশ্চয়তা দেন। আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সমাজে যথাযথ সম্মানজনক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।
হজযাত্রীদের জন্য ভ্রমণ কর রহিত ও সরকারি অনুদান: পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের হজযাত্রীদের জন্য কোনো সরকারি আর্থিক সাহায্য বা অনুদানের ব্যবস্থা ছিল না; বরং তাঁদের ওপর অতিরিক্ত ভ্রমণ কর (Travel Tax) চাপিয়ে রাখা হতো।স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম রাষ্ট্রনেতা, যিনি হজযাত্রীদের ওপর থেকে সব ধরনের ভ্রমণ কর সম্পূর্ণ রহিত বা মওকুফ করেন। সরকারি তহবিল থেকে হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেন। সস্তায় ও নিরাপদে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে 'হিজাজ' জাহাজ এবং বিমান বাংলাদেশের বিশেষ ফ্লাইট চালুর ব্যবস্থা করেন।
কুরআনের আলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা
মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে বিপুল সাহায্য করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু যখন উপলব্ধি করলেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানানো প্রয়োজন, তখন তিনি কেবল রাজনৈতিক চিঠি পাঠালেনি; বরং তিনি কুরআনিক শিক্ষাকে সামনে নিয়ে আসেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ইব্রাহীমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
"লা-ইন শাকারতুম লা-আযীদন্নাকুম, ওয়া লা-ইন কাফারতুম ইন্না আজাবী লাশাদীদ।" (অর্থ: "যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো আমার শাস্তি বড়ই কঠোর।")
বঙ্গবন্ধু আলেমদের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দলকে মস্কো পাঠান। প্রতিনিধি দলকে বিদায় দেওয়ার সময় তিনি এই আয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
"সোভিয়েত রাশিয়া আমাদের চরম বিপদের দিনে সাহায্য করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞতা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই একজন মুসলিম হিসেবে উপকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।"
বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল যখন মধ্য এশিয়ার প্রখ্যাত মুফতি ও কাজাখস্তানের ধর্মীয় নেতা বাবা জিয়াউদ্দিন খানভ-এর কাছে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে কৃতজ্ঞতা বার্তা পৌঁছে দেন, তখন সেই বয়োবৃদ্ধ মুসলিম নেতার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল। তিনি অভিভূত হয়ে বলেছিলেন, "বাংলাদেশের নেতা কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন প্রকৃত কুরআনের অনুসারী মুসলিম।"
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে (রাশিয়া) প্রথম তাবলীগ জামাত প্রেরণ
সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ছিল একটি কমিউনিস্ট ও সাম্যবাদী ভাবধারার রাষ্ট্র। সে সময়ে সেদেশে কোনো ধর্মীয় প্রচার বা বিদেশ থেকে কোনো দাওয়াতি মিশন প্রবেশের ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক সমর্থনের কারণে দেশটির সাথে বঙ্গবন্ধুর গভীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর এই কূটনৈতিক সম্পর্ক ও গ্রহণযোগ্যতাকে ব্যবহার করেছিলেন পবিত্র ইসলামের দাওয়াত প্রসারে।
স্বাধীনতার পরপরই তিনি সোভিয়েত সরকারের সাথে আলোচনা করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নের মাটিতে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতের প্রতিনিধি দল (মিশন) প্রেরণের অনন্য ব্যবস্থা করে দেন। আজকে রাশিয়ার তাতারস্তান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানসহ সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলে যে নতুন করে ইসলামের দাওয়াতি রেনেসাঁ দেখা যাচ্ছে, তার ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
রেসকোর্স ময়দানের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বৃক্ষরোপণ
পাকিস্তান আমলে ঢাকার বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাম ছিল ‘রেসকোর্স ময়দান’। সেখানে নিয়মিত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বড় আকারের জুয়া ও বাজি ধরা। এই বাজিতে হেরে প্রতিদিন শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যেত।
১৯৭২ সালে দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের এই অনৈসলামিক ঘোড়দৌড় ও জুয়ার আসর চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করেন। তিনি সেই অনৈসলামিক স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার জন্য ময়দানটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন "সোহরাওয়ার্দী উদ্যান"। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বৃক্ষরোপণের প্রতি অপরিসীম গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন:
"যদি তুমি নিশ্চিত জানো যে আগামীকাল কিয়ামত হবে, তবুও আজ একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করো।"
বিশ্বনবী (সা.)-এর এই সুন্নাহ ও শিক্ষার অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধু জুয়ার আড্ডা রেসকোর্স ময়দানে নিজ হাতে আম, জাম, সেগুনসহ হাজার হাজার ফলের ও গাছের চারা রোপণ করে সেটিকে এক সবুজ উদ্যানে পরিণত করেন। ঢাকার বুকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আজকের এই বিশাল বৃক্ষরাজি বঙ্গবন্ধুর রসূলপ্রীতি ও ইসলামিক পরিবেশবান্ধব ভাবনার অমলীন স্মারক।
বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা: বাংলাদেশে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য ও ৫৬০টি মডেল মসজিদ
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের যে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই ভিত্তিপ্রস্তরকে এক অনন্য ও স্বর্ণালী উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন।
বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন: ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
পৃথিবীর সমগ্র ইতিহাসে কোনো একক রাষ্ট্রনায়ক বা সরকারপ্রধান একসাথে সরকারি অর্থায়নে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সুবিধাসম্পন্ন মডেল মসজিদগুলো প্রতিষ্ঠা করেন।
এই মডেল মসজিদগুলোতে কেবল সালাত আদায়ের ব্যবস্থাই রাখা হয়নি, বরং এখানে রয়েছে:
১. ইসলামী গবেষণা ও লাইব্রেরি সুবিধা।
২. হাজীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
৩. ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল সেন্টার।
৪. মক্তব ও হেফজখানা এবং নারী-পুরুষদের পৃথক ও সম্মানজনক ওজু ও সালাতের স্থান।
কওমি মাদ্রাসা সনদের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি (২০১৮)
দীর্ঘ শতাব্দী ধরে অবহেলিত ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিবঞ্চিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ 'দাওরায়ে হাদীস'-কে ২০১৮ সালে আইন পাসের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-র সমমান প্রদান করেন শেখ হাসিনা। এর ফলে দেশের লাখ লাখ কওমি আলেম ও শিক্ষার্থী সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষার আইনি সুযোগ লাভ করেন।
কওমি সনদ ও মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "কওমি মাদ্রাসার লাখ লাখ আলেম ও শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রীয় মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।"
"কওমি মাদ্রাসার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল; তাই 'দাওরায়ে হাদীস'-কে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে ইসলামের সঠিক চর্চা প্রচার এবং উগ্রবাদ দূরীকরণে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি আধুনিক মডেল মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।"
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ফাজিল-কামিল শিক্ষার্থীদের ডিগ্রির প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠা করেন দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত 'ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়'।
ইসলাম বনাম রাজনীতি ও উগ্রবাদ: নিষিদ্ধকরণের আসল সত্য
একটি কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল প্রায়শই অভিযোগ তোলে যে, আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা নাকি ইসলামী রাজনৈতিক দলের ওপর নির্যাতন চালায় কিংবা ইসলামি সংস্থা বন্ধ করে। কিন্তু নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রমাণ করে বাংলাদেশে কোনো দিনও ইসলামের ধর্মীয় অনুশাসন বা সাধনার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমন নীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "ইসলাম শান্তির ধর্ম, এখানে কোনো ধ্বংসাত্মক উগ্রবাদ বা বোমাবাজির স্থান নেই। ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নষ্টের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমাদের নীতি 'জিরো টলারেন্স'।"
কেন জামায়াতে ইসলামী ও জঙ্গি সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল?
১৯৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধ: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে 'জামায়াতে ইসলামী' ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গোলাম আজম ও অন্যান্য জামায়াতে ইসলামী নেতারা মুক্তিযোদ্ধাদের "দুষ্কৃতকারী", "ভারতের এজেন্ট" এবং "ইসলামের শত্রু" বলে অভিহিত করতেন।
তাদের গঠিত শান্তি কমিটি ও সশস্ত্র মিলিশিয়া রাজাকার বাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দিতেন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনচেতা বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের হত্যা করতে। জামায়াতের দলীয় শীর্ষ নেতারা সশস্ত্র শান্তিকমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন করে গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিল।
ধর্মের অপব্যবহার ও রাজনৈতিক চক্রান্ত: বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনৈতিক প্রতারণা ও সহিংসতা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এই কারণে যে, জামায়াত ও তার সহযোগী ছাত্র সংগঠন (শিবির) ইসলামকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করত।
উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূল: ২০০১-২০০৬ মেয়াদে দেশে যে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মতো উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী গজিয়ে উঠেছিল, যারা দেশজুড়ে একযোগে ৬৩টি জেলায় ৫০০ স্থানে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেই জেএমবি (JMB), হিজবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT)-এর মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলোকে দমন করা হয়েছিল দেশের সার্বভৌমত্ব ও শান্তিকামী সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায়।
বাংলাদেশে ধর্ম বা ইসলামের কারণে কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ হয়নি; নিষিদ্ধ করা হয়েছে উগ্রবাদ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বোমাবাজি, জঙ্গিবাদ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট আইনি অভিযোগে।
এক নজরে বাংলাদেশে ইসলামের প্রসারে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অবদান
পাঠকদের সুবিধার্থে স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের হেফাজত, উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার কালজয়ী পদক্ষেপসমূহ একটি সুবিন্যস্ত সারণীর (Table) মাধ্যমে নিচে তুলে ধরা হলো:
ক্ষেত্র ও বিষয়াবলী | জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান (১৯৭১-১৯৭৫) | প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান (২০০৯-বর্তমান) |
প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো | ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং 'ইসলামিক একাডেমি' প্রতিষ্ঠা করেন। | প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৬০টি আধুনিক মডেল মসজিদ নির্মাণ। |
শিক্ষা ও সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি | 'বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড' পুনর্গঠন ও সরকারি অনুদান প্রদান। | কওমি মাদ্রাসার 'দাওরায়ে হাদীস'-কে মাস্টার্স ডিগ্রির আইনি স্বীকৃতি ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। |
ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক সংস্কার | রেসকোর্সে ঘোড়দৌড়, জুয়া, মদ ও অসামাজিক কার্যকলাপ আইনত নিষিদ্ধকরণ। | সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও ধর্মান্ধ উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি প্রয়োগ। |
আন্তর্জাতিক কূটনীত ও ওআইসি | ১৯৭৪ লাহোর ওআইসি সামিটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশকে অন্যতম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি দান। | আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন আয়োজন এবং ফিলিস্তিন সহ বিশ্ব মুসলিমদের অধিকারের পক্ষে সংহতি প্রকাশ। |
তাবলীগ ও অন্যান্য ধর্মীয় সেবা | টঙ্গীতে ইজতেমার জন্য ১৬০ একর জমি ও কাকরাইল মসজিদের সম্প্রসারণ জমি দান। | বিশ্ব ইজতেমার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্থায়ী সড়ক নির্মাণ। |
মিডিয়া ও ধর্মীয় সম্প্রচার | রেডিও ও টেলিভিশনে প্রতিদিন সকালে কুরআন তিলাওয়াত বাধ্যতামূলক শুরু করা। | বিটিভি ও বেতারে ধর্মীয় সম্প্রচারের পরিসর বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ইসলামী দাওয়াত প্রসার। |
১৯৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনী ভাষণ ও ‘কুরআন-সুন্নাহ’ বিষয়ক অঙ্গীকার
১৯৭০ সালের ২৮শে অক্টোবর জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে রেডিও ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ইসলামিক মূল্যবোধের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। বিরোধী পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধিতার অপপ্রচারের জবাবে তিনি সরাসরি ঘোষণা করেন:
"আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা নাকি ইসলামে বিশ্বাস করি না। এর উত্তরে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য আমরা এমন কোনো আইন বা নীতি গ্রহণ করব না যা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক বিধানের পরিপন্থী।"
স্বাধীনতার পূর্বেই তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, স্বাধিকার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি, ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানা নয়।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৭৩ সালের অক্টোবরে সংঘটিত চতুর্থ আরব-ইসরায়েল (ইওম কিপুর) যুদ্ধের সময় সদ্য স্বাধীন ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অকুতোভয়ভাবে আরব বিশ্বের (মিসর ও সিরিয়া) পক্ষে অবস্থান নেন।
সামরিক মেডিকেল টিম প্রেরণ: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মিসরীয় সেনাবাহিনীর জন্য ২৮ সদস্যের একটি সামরিক চিকিৎসক দল ও প্রচুর পরিমাণ ঔষধপত্র পাঠানো হয়।
উপহার ও কূটনৈতিক সাহায্য: যুদ্ধের ময়দানে লড়াইরত আরব সেনাদের জন্য উপহার হিসেবে ১ লাখ পাউন্ড উন্নতমানের চা প্রেরণ করা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম: ইয়াসির আরাফাত এবং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (PLO) সাথে বঙ্গবন্ধুর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন এবং আরব ভাইদের সত্তার রক্তক্ষরণ আমাদের নিজস্ব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামেরই অংশ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে শত অভাব থাকা সত্ত্বেও আমরা মিসর ও সিরিয়ার পাশে আছি এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিকে পূর্ণ সমর্থন করি।"
এর ফলেই আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারি বুমেদিন এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য সরাসরি ভূমিকা রাখেন।
১৯৭৪ সালের ওআইসি লাহোর সম্মেলন ও মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি
১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-র দ্বিতীয় ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলন। পাকিস্তান ও কিছু দেশ বাংলাদেশকে এই সম্মেলনে আটকানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মিসর, আলজেরিয়া, সুদান ও সৌদি আরবের চাপে ওআইসি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায়।
আলজেরিয়ার বিপ্লবীর নেতা ও প্রেসিডেন্ট হুয়ারী বুমেদীন নিজের ব্যক্তিগত রাজকীয় বিমান পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে লাহোরে নিয়ে যান। যে পাকিস্তানে মাত্র তিন বছর আগে তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেই লাহোর বিমানবন্দরে পা দেওয়া মাত্রই বিভিন্ন আরব ও মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বঙ্গবন্ধুকে 'উম্মাহর বীর নায়ক' হিসেবে লাল গালিচা সংবর্ধনা জানান। লাহোর সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ভাষণে বলেন:
"আমরা আজ এমন এক বিশ্বে বাস করছি যেখানে শোষিত ও নিপীড়িত মানুষ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী ভাইদের অধিকার ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এবং বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ওআইসির সংগ্রাম থামতে পারে না। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ইনসাফ ও মানবতার পাশে দাঁড়াতে।"
বঙ্গবন্ধুর এই দূরদর্শী ভাষণের পরই ওআইসি বাংলাদেশকে পূর্ণ সদস্যপদ প্রদান করে এবং একে একে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান সহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান করে।
জাতীয় পর্যায়ে সীরাত মজলিস ও সরকারি ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) চালু
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে সরকারিভাবে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ আলোচনার জন্য ‘জাতীয় সীরাত কমিটি’ গঠন করা হয়।
জাতীয় সীরাত কমিটির মাধ্যমে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সপ্তাহব্যাপী আন্তর্জাতিক সীরাত কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিতরা অংশ নেন।
সরকারি ছুটি হিসেবে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)’ উদ্যাপনের রীতি পুনর্প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা প্রচারের নির্দেশনা জারি করা হয়।
বাংলাদেশ হজ বোর্ড গঠন ও হাজীদের সরকারি ভর্তুকি
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থনৈতিক সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ফরজ কাজ হজ পালনে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার ব্যবস্থা করেন।
হজ বোর্ড গঠন: ১৯৭২ সালেই সরকারি তদারকিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে হজ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘বাংলাদেশ হজ বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ভর্তুকি ও ভ্রমণ পথ: সমুদ্রপথে কম খরচে ‘হিজাজ’ জাহাজে করে এবং বাংলাদেশ বিমান-এর বিশেষ ফ্লাইটে হাজীদের পবিত্র মক্কায় যাওয়ার সরকারি সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালের সংবিধান: অনুচ্ছেদ ১২ ও অনুচ্ছেদ ৪১-এর আইনি মেলবন্ধন
বঙ্গবন্ধু প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র বিধান যুক্ত করার সাথে সাথে নাগরিকের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সংবিধানের মূল মৌলিক অধিকার হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছিল।
অনুচ্ছেদ ১২: রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো বিশেষ ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বা শোষণের সুযোগ বন্ধ করা।
অনুচ্ছেদ ৪১ (১) (ক): পরিষ্কার ভাষায় আইন করা হয় "প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচার করিবার অধিকার রহিয়াছে।"
অনুচ্ছেদ ৪১ (১) (খ): "প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে।"
এই আইনি কাঠামোটিই প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শনে ধর্মনিরপেক্ষতা কোনোভাবেই ধর্মহীনতা ছিল না; বরং তা ছিল প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক গ্যারান্টি।
সমকালীন উগ্রতা, ধর্মব্যবসা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন
আজকে যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, ধর্মকে ব্যবসায় পরিণত করে নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাছিল করতে চায়, কিংবা ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সভাকে রাজনৈতিক বিষবাষ্প ছড়ানোর হাতিয়ার বানায় তাদের কাছেই মূলত বঙ্গবন্ধুর 'ধর্মনিরপেক্ষতা' তত্ত্বটি আপত্তিকর বলে মনে হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে ধর্মের লেবাস পরে কিছু ভণ্ড ও বিভ্রান্ত ব্যক্তি।মসজিদ ও মাদ্রাসার পবিত্র পরিবেশকে নিজের কুৎসিত কামনার শিকার বানায় (শিশু নির্যাতন বা বলাৎকার)। পরকীয়া ও সামাজিক নৈরাজ্যকে ধর্মের নামে ঢাকতে মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়। 'তৌহিদী জনতা'র ভুয়া ব্যানার টাঙিয়ে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মাজার, সুফি সাধকদের দরগাহ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির-প্রতিমা ভাঙচুরে লিপ্ত হয়।
ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম অন্যের উপাসনালয় ভাঙচুর করা সমর্থন করে না, ইসলাম নিরপরাধ মানুষ হত্যা করা বা ধর্মীয় উগ্রবাদ সমর্থন করে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন যে, ধর্মকে যদি রাজনীতি ও কায়েমী স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়, তবে তা ইসলামের পবিত্রতাকেই সবচেয়ে বেশি নষ্ট করবে।
অতএব, বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার মূল নির্যাস ছিল: "ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।" যেখানে প্রত্যেক মুসলমান পূর্ণ ঈমানি আকিদা নিয়ে বুক ফুলিয়ে তাঁর ইসলাম ধর্ম পালন করবে, আর অন্য ধর্মের মানুষও নির্ভয়ে তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক খাঁটি ঈমানদার মুসলমান, অকুতোভয় রাষ্ট্রনায়ক এবং বাঙালি জাতির পরম অভিভাবক। ১৯৫১ সালে লালবাগ মাদ্রাসায় হযরত শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্য থেকে শুরু করে, ১৯৭২ সালে তিন নেতার মাজারে দাঁড়িয়ে সাথীদের কড়া শাসন করে বলা "আমরা মুসলমান, আমাদের সব কাজ শরীয়ত মতে চলবে", কিংবা 'মাসিক মদীনা'র সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দীন খানকে জড়িয়ে ধরে বাবার চিঠি পড়ে কাঁদতে কাঁদতে ডিক্লারেশন পুনর্বহাল করা প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধুর ধমনিতে প্রবাহিত ছিল ইসলামের চিরন্তন প্রীতি ও শ্রদ্ধা।
আজকে যারা না জেনে বা রাজনৈতিক হিংসা থেকে বঙ্গবন্ধুকে 'ধর্মহীন' বা 'ইসলামবিরোধী' বানানোর অপচেষ্টা করে, তারা কেবল নিজেদের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মদ-জুয়া নিষিদ্ধকরণ, বিশ্ব ইজতেমার জমি প্রদান, এবং বেতারে কুরআন তিলাওয়াত চালুর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করেছিলেন, তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়ে সেই আলোকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শই হলো বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং ইসলাম ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য রক্ষা করার একমাত্র গ্যারান্টি। ইতিহাস সাক্ষী দেয় গতকালও বঙ্গবন্ধু ও তাঁর উত্তরসূরিরা ইসলামের সবচেয়ে বড় ও খাঁটি পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, আজও আছেন, এবং ইতিহাসজুড়ে তাঁদের এই অমলিন অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।














