একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বন্দিদশায় কেমন ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবার?
দেশের সর্বাধিনায়ক যখন পাকিস্তানি কারাগারে মৃত্যুযন্ত্রণা ও চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন ঢাকায় তাঁর পরিবার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, অন্তর্বর্তীকালীন গর্ভবতী কন্যা শেখ হাসিনা, কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা, এবং দুই কনিষ্ঠ পুত্র শেখ জামাল ও শেখ রাসেল অতিক্রম করছিলেন এক ভয়াবহ, নির্মম ও মানবেতর বন্দিজীবন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস এই পরিবারটিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অত্যন্ত কড়া নজরদারিতে গৃহবন্দি করে রেখেছিল। একদিকে পিতা ও স্বামীর জীবন নিয়ে চরম উদ্বেগ, অন্যদিকে প্রতিদিনের খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সংকট এই সব মিলিয়ে একটি পরিবার মুক্তিযুদ্ধের চরম সংকটকালে দিন কাটিয়েছে।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন নিরীহ বাঙালিদের ওপর নির্মম গণহত্যা শুরু করে, ঠিক তখনই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার এই ঘোষণার পরপরই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। দেশের সর্বাধিনায়ক যখন পাকিস্তানি কারাগারে মৃত্যুযন্ত্রণা ও চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন ঢাকায় তাঁর পরিবার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, অন্তর্বর্তীকালীন গর্ভবতী কন্যা শেখ হাসিনা, কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা, এবং দুই কনিষ্ঠ পুত্র শেখ জামাল ও শেখ রাসেল অতিক্রম করছিলেন এক ভয়াবহ, নির্মম ও মানবেতর বন্দিজীবন।
মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস এই পরিবারটিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অত্যন্ত কড়া নজরদারিতে গৃহবন্দি করে রেখেছিল। একদিকে পিতা ও স্বামীর জীবন নিয়ে চরম উদ্বেগ, অন্যদিকে প্রতিদিনের খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সংকট এই সব মিলিয়ে একটি পরিবার কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চরম সংকটকালে দিন কাটিয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
২৫ মার্চের কালরাত্রি এবং বঙ্গবন্ধুর কারাবাস
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত একটার পর (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাসভবনে পাকিস্তানি বাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আক্রমণ চালায়। চারদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আত্মগোপনে না গিয়ে নিজ বাসভবনে অবস্থান নেন এবং সেখান থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে ঘোষণাবার্তাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন। পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে যায় তৎকালীন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে (বর্তমানে শহীদ আনোয়ার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ)। সেখানে সেই রাতে তাঁকে আটকে রাখার পরদিন, অর্থাৎ ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় নেওয়া হয় ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে।
১ এপ্রিল চরম গোপনীয়তা রক্ষা করে সামরিক বিমানে করে বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে অপর একটি বিমানে রাওয়ালপিন্ডি এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বন্দি করা হয় উত্তর পাঞ্জাবের মিয়াওয়ালি শহরের নির্জন কারাগারে। মিয়াওয়ালি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে কাটাতে হয় যুদ্ধের পুরোটা সময়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামে প্রহসনের বিচার শুরু হয় এবং এমনকি কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে তাঁর পরিবারের ওপর তখন নেমে এসেছিল এক ভিন্ন ধরণের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।
আশ্রয়ের খোঁজে বঙ্গবন্ধু পরিবারের দুই মাসে ১৯ বার স্থান পরিবর্তন
বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পর মুহূর্তেই পরিবারটি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। শেখ হাসিনা তখন ছিলেন পূর্ণ অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর শারীরিক সুরক্ষার কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেয়েদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া নিজের দায়িত্বে অন্তঃসত্ত্বা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং খালাতো বোন জলিকে (ফরিদা) নিয়ে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর সড়কের একটি বাসায় নিয়ে যান। এদিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে রটতে থাকা চরম উত্তেজনার মাঝে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
মধ্যরাতে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী ৩২ নম্বরের বাড়ি ঘেরাও করে স্বয়ংসক্রিয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ শুরু করে। আক্রমণ শুরুর পর মুহূর্তেই বেগম মুজিব কনিষ্ঠ সন্তান শেখ জামাল ও শেখ রাসেলকে নিয়ে পাঁচিল টপকে পার্শ্ববর্তী এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। ২৬শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা দ্বিতীয় দফায় ৩২ নম্বরের বাড়িতে ভাঙচুর ও ভয়াবহ লুণ্ঠন চালায়।
২৭শে মার্চ সকালে সাময়িকভাবে কারফিউ শিথিল হলে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ৩২ নম্বরের বাসায় যান সার্বিক খবর নিতে। সেখানে পৌঁছাতেই তিনি জানতে পারেন বেগম মুজিব সন্তানদের নিয়ে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডের দিকে রওনা হয়েছেন। ১৫ নম্বর রোডটি পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের আনাগোনার কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
ফলে ড. ওয়াজেদ মিয়া কৌশল পরিবর্তন করেন। তিনি শেখ হাসিনা ও জলিকে নিয়ে মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় তাঁর পরিচিত বন্ধু ড. মোজাম্মেল হোসেনের বাসায় উঠেন। অন্যদিকে বেগম মুজিব, শেখ রেহানা, শেখ জামাল এবং বালক শেখ রাসেলকে নিয়ে অন্য শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় পুরানঢাকার ওয়ারীর একটি গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
খিলগাঁও চৌধুরী পাড়ায় সাময়িক অবস্থান: পরবর্তী সময়টুকু ছিল চরম অনিশ্চয়তা ও ভাসমান জীবনের। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অবস্থান পৃথক হয়ে পড়ায় এবং ক্রমাগত পাকিস্তানি তল্লাশির কারণে ১লা এপ্রিল ড. ওয়াজেদ মিয়া নতুন পদক্ষেপ নেন। তিনি নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কেন্দ্রের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে খিলগাঁও চৌধুরী পাড়ায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সেখানে বেগম মুজিবসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের একত্র করা সম্ভব হয়।
তবে সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৫ থেকে ৬ দিন। প্রতিবেশী ও বাড়িওয়ালি কোনোভাবে টের পেয়ে যান যে এই পরিবারটি গ্রেপ্তারকৃত বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মীয়স্বজন। ভীতিগ্রস্ত বাড়িওয়ালি বেগম মুজিবের কাছে এসে আকুল অনুনয়-বিনয় করে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন,
"আপনাদের পরিচয় জানাজানি হয়ে গেছে। আল্লাহর দোহাই, আপনারা দয়া করে এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। তা না-হলে পাকিস্তানি আর্মিরা আমাদের এই বাড়িটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেবে।"
বাড়িওয়ালি ও ভবনের অন্য বাসিন্দাদের জীবন রক্ষার্থে এবং নিজেদের সুরক্ষার তাগিদে পুনরায় বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হয়।
মগবাজারের গোপন অবস্থান: খিলগাঁও ত্যাগ করার পর আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম বদরুন্নেসার স্বামী নূর উদ্দিন আহমদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় মগবাজার চৌরাস্তার কাছে একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় এই পরিবারের সাময়িক থাকার সংস্থান হয়। কিন্তু নিচতলার ফ্ল্যাটে থাকা অবস্থায় দেখা যায় সামনের রাস্তায় সার্বক্ষণিক ড্রেস পরা সামরিক পোশাক ও অবাঙালিদের সন্দেহজনক আনাগোনা এবং ঘনঘন সামরিক ট্রাক যাতায়াত করছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানটি নিরাপত্তার জন্য ঘোর বিপজ্জনক বিবেচনা করে বেগম মুজিবের পরামর্শে অদূরেই অপর একটি দোতলা ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হয়। সেখানে পরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে তারা প্রায় ১৫ দিন অবস্থান করতে সক্ষম হন।
দুই মাসে ১৯ বার স্থান পরিবর্তন: ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ এই দুই মাসের স্বল্প পরিসরে পাকিস্তানি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে অন্তত ১৯ বার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল। কখনো মালিবাগ, কখনো মগবাজার, খিলগাঁও কিংবা ওয়ারীর অচেনা গলিতে কাটাতে হয়েছে নির্ঘুম রাত।
গর্ভবতী হওয়ায় শেখ হাসিনার শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছিল; স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবার দূরে থাক, প্রতিদিনের দুবেলা চাল-ডাল জোগাড় করাও ছিল অসম্ভব এক সংগ্রাম। মেঝেতে পাটি বিছিয়ে রাত কাটাতে হতো পরম শংকায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ছদ্মবেশে গোপনে পরিবারের সঙ্গে দেখা করে কিছু অর্থ পৌঁছে দিয়ে আবার সম্মুখ সমরে যোগ দেন।

ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের বন্দিশালা (১২ মে - ১৭ ডিসেম্বর)
লাগাতার স্থান পরিবর্তন ও অনিশ্চিত ফেরারি জীবনের অবসান ঘটে ১৯৭১ সালের ১২ই মে। মগবাজারের গোপন আস্তানার সন্ধান পেয়ে যায় পাকিস্তানি মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স। ১২ই মে সন্ধ্যার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি সশস্ত্র দল ওই বাসা ঘেরাও করে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল ও ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে বন্দি করে। সেখান থেকে তাঁদের সোজা নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর (বর্তমান ৪১ নম্বর) বাড়িতে। এরপর ১২ মে থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই একতলা বাড়িটিই হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু পরিবারের জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দিশালা।
অবরুদ্ধ পরিবেশ ও চরম মানবেতর অবস্থা: বাড়িটিকে একটি মিনি-সামরিক কারাগারে রূপান্তর করা হয়েছিল। চারপাশে উঁচু কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাদের প্রহরায় রাখা হতো। বাইরের কোনো মানুষের সাথে যোগাযোগের সুযোগ তো ছিলই না, এমনকি কোনো খবরের কাগজ বা রেডিও ব্যবহার করার অনুমতিও দেওয়া হতো না।
ঘরটিতে থাকার মতো ন্যূনতম আসবাবপত্র, খাট বা তোশক ছিল না। তীব্র গরম ও স্যাঁতসেঁতে মেঝেজুড়ে বিছানা পেতে পরিবারের সদস্যদের ঘুমাতে হতো। বন্দিদশার প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাদ্য বা ওষুধ সরবরাহ করতেও পাকিস্তানি সেনারা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বাজারে গিয়ে খাদ্যদ্রব্য বা জরুরি জিনিসপত্র কেনার ওপর ছিল কঠোর বিধিনিষেধ।
বন্দি অবস্থায় শেখ হাসিনা ও জয়ের জন্ম
বন্দিশালার মানসিক নির্যাতন ও চরম শারীরিক কষ্টের মধ্যেই শেখ হাসিনা তাঁর প্রথম সন্তান গর্ভে ধারণের কঠিন দিনগুলো পার করেন। যথাযথ সুচিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে তাঁর স্বাস্থ্যগত অবনতি ঘটলেও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো না। পরিবারের আকুল আবেদনের পর অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৬শে জুলাই রাতে কড়া সামরিক নিরাপত্তায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন, ২৭শে জুলাই ১৯৭১ তারিখে প্রখ্যাত চিকিৎসক জাতীয় অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে সজীব ওয়াজেদ জয় জন্মগ্রহণ করেন। হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের সময়ও চারপাশ সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে রেখেছিল।
যুদ্ধের ভয়াবহতা, চারপাশে গোলাগুলি এবং পরিবারের ওপর পাকিস্তানি বন্দিদশার খড়্গ সব মিলিয়ে এক চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্রের। সন্তান জন্মের পর শেখ হাসিনাকে আবার দ্রুত সেই বন্দিশালায় ফেরত আনা হয়।
বঙ্গবন্ধু পরিবারের 'মাসিক ভাতা' গ্রহণের মিথ্যাচার
স্বাধীনতার চিরশত্রু জামায়াত-শিবির ও বিভিন্ন উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে অপপ্রচার চালিয়ে দাবি করার চেষ্টা করেছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবরুদ্ধ অবস্থায় ধানমন্ডির বাড়িতে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু পরিবারকে 'মাসিক ভাতা' প্রদান করত। তবে ঐতিহাসিক সত্য ও দাপ্তরিক নথিপত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।
সরকারি বা দাফতরিক প্রমাণ: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোপনীয় রেকর্ড (GHQ/Eastern Command Files), তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ট্রেজারি অ্যাকাউন্টস কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে গঠিত তদন্ত কমিটির নথিতে এমন কোনো ভাতা মঞ্জুরের ন্যূনতম উল্লেখ বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই দাবিটি মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের ত্যাগকে অবমাননা করতে স্বাধীনতার চিরশত্রু উগ্রবাদীদের চরম নির্লজ্জ মিথ্যাচার।
মানবেতর জীবনযাত্রা: যে পরিবারকে সাধারণ আসবাবপত্র ছাড়া খালি মেঝেতে ঘুমাতে বাধ্য করা হয়েছে, যাদের অন্তঃসত্ত্বা সদস্যকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য দিনের পর দিন অনুনয় করতে হয়েছে, তাদের 'সরকারি ভাতা' বা ‘মাসিক ভাতা’ সুবিধা দেওয়ার গল্পটি পুরোপুরি মিথ্যাচার।
শুভাকাঙ্ক্ষীদের গোপন সহায়তা: অবরুদ্ধ অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রহরার কারণে পরিবারটি মারাত্মক খাদ্য ও আর্থিক সংকটে পড়েছিল। সেই মানবেতর পরিস্থিতিতে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও তাঁর সন্তানদের বাঁচিয়ে রেখেছিলেন স্থানীয় কিছু দেশপ্রেমিক নাগরিক, বঙ্গবন্ধুর অনুগত রাজনৈতিক কর্মী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী। তাঁরা সবজি বিক্রেতা, গৃহস্থালি জিনিসপত্র হকার বা দিনমজুরের ছদ্মবেশে পাহারার দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং মাঝে মাঝে সেন্ট্রিদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে খাবার পৌছে দিতেন। তাঁরা রাতের আঁধারে ১৮ নম্বর রোডের সীমানা প্রাচীরের পেছন দিয়ে ফেলনা কাগজের টুকরোয় গোপন বার্তা এবং চাল, ডাল কিংবা টাকার প্যাকেট ছুঁড়ে ভেতরে ছুড়ে ফেলতেন। এই ঝুঁকিপূর্ণ গোপন সহায়তার ওপর ভর করেই পরিবারটিকে ক্ষুধা ও দৈনন্দিন সংকট সামাল দিতে হয়েছে।
শেখ জামালের পলায়ন: ৫ই আগস্ট তরুণ শেখ জামাল কড়া পাহারা ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। এ ঘটনায় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান ঘাঁটিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর পর পরই ধানমন্ডির অবরুদ্ধ বাড়িটির ওপর প্রহরা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। চারপাশে অতিরিক্ত কাঁটাতারের বেড়া, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্চলাইট এবং সশস্ত্র সিপাহি মোতায়েন করা হয়। ফলে পেছনের দেয়াল দিয়ে ছদ্মবেশী শুভানুধ্যায়ীদের সামান্য গোপন সহায়তা পৌঁছানোর যে পথটুকু খোলা ছিল, সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিজয় অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবারটি আরও চরম বিচ্ছিন্নতা, অভুক্ত অবস্থা ও মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
শেখ কামাল ও শেখ জামাল বন্দিশালা থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে
পিতা অবরুদ্ধ পাকিস্তানের কারাগারে, মা ও ভাই-বোনেরা ধানমন্ডির অবরুদ্ধ বন্দিশালায়, এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর দুই জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল বসে থাকেননি। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা পালিয়ে ভারতে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
শেখ কামালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ (২৫ মার্চ ১৯৭১)
২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তাণ্ডব শুরুর কয়েক ঘণ্টা পূর্বেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র শেখ কামাল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ত্যাগ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রদের সঙ্গে মিলে ধানমন্ডি ও ধানমন্ডি-লেক এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখতে গাছের গুঁড়ি ও ইট দিয়ে ব্যারিকড তৈরিতে সরাসরি অংশ নেন।
কারফিউর মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম: বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হলে, শেখ কামাল নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি প্রায় ৫০টি বাড়ির সীমানা প্রাচীর টপকে কোনোক্রমে মায়ের সঙ্গে দেখা করেন এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের উদ্দেশ্যে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। মার্চ-এপ্রিলের সন্ধিক্ষণে তিনি সীমানা অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন।
ফার্স্ট ওয়ার কোর্স ও কমিশন লাভ: ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক অফিসার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গের 'মূর্তি ক্যাম্প' (Murtee Camp, Officers Training Wing)-এ 'ফার্স্ট ওয়ার কোর্স' এর জন্য নির্বাচিত হন। ৬১ জন ক্যাডেটের (Gentleman Cadet) সঙ্গে কঠোর শারীরিক ও সামরিক কৌশলগত প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করে ১৯৭১ সালের ৯ই অক্টোবর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন।
এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন: কমিশন অর্জনের পর শেখ কামালকে বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি (Aid-de-Camp) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয়, মুক্তিবাহিনীর নবীন কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা রক্ষা এবং মুক্তিসংগ্রামের নীতি ও সামরিক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
শেখ জামালের দুঃসাহসিক পলায়ন (৫ আগস্ট ১৯৭১)
বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালের বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর। ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের বন্দিশিবিরে পাকিস্তানি সেনাদের কড়া পাহারায় ছিলেন তিনি। কিন্তু রক্তে যাঁর স্বাধীনতার তেজ, তাঁকে বন্দি রাখা সম্ভব ছিল না।
পলায়নের পরিকল্পনা: ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট। কড়া পাহারা এবং ধরা পড়লে নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জেনেও দুঃসাহসিক এক সিদ্ধান্ত নেন শেখ জামাল। ভোররাতে পাকিস্তানি সেনাদলের প্রহরীদের নজর এড়িয়ে ও বিপজ্জনক তারকাঁটার বেড়া টপকে শেখ জামাল সফলভাবে বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যান। হঠাৎ তাঁর এই পলায়নের ফলে পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং বিশ্বের সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয় যে শেখ মুজিবের মেজ ছেলে পাকিস্তান বাহিনীর হাত থেকে গায়েব বা অপহৃত হয়েছেন।
ভারতে গমন ও প্রশিক্ষণ: তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে প্রথমে ভারতের আগরতলায় প্রবেশ করেন। সেখান থেকে তিনি কলকাতা যান এবং বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। কলকাতা থেকে শেখ জামালকে ভারতের উত্তর প্রদেশের কালশী সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স - BLF) অংশ হিসেবে কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় নির্বাচিত ৮০ জন তরুণের সাথে তিনি ২১ দিনের বিশেষায়িত গেরিলা যুদ্ধকৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।
রণাঙ্গনে যোগদান: সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে শেখ জামাল সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। তিনি মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বাধীন ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন এবং বীর গেরিলা কমান্ডার মাহফুজ আলম বেগের সরাসরি নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
১৯৭১ সালের ১ই ডিসেম্বর সীমান্ত থেকে ১০ মাইল ভেতরে কালিগঞ্জ অঞ্চলে ভারী সাবমেশিনগান ও যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সময় আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি-র (AP) প্রখ্যাত আলোকচিত্রী হরস্ট ফাস (Horst Faas) তাঁর যুদ্ধরত অবস্থার ঐতিহাসিক ছবি তোলেন, যা পরবর্তীতে লন্ডনের 'দ্য গার্ডিয়ান' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ কামাল ও শেখ জামাল দুই ভাই রণাঙ্গন থেকে জলপাই-সবুজ সামরিক পোশাকে ধানমন্ডির স্বজনদের কাছে প্রত্যাবর্তন করেন। অবরুদ্ধ দশা থেকে সদ্য মুক্ত বোন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ছোট ভাই শেখ রাসেলের জন্য তাঁদের বীর ভাইদের ফিরে পাওয়ার সেই দিনটি ছিল পরম আনন্দের। ওই দিন বিকেলেই ঢাকার পল্টন ময়দানে কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের উপস্থিতিতে আয়োজিত স্বাধীন বাংলার প্রথম উন্মুক্ত বিশাল জনসভায় রণাঙ্গনের সামরিক পোশাকেই শেখ জামাল উপস্থিত ছিলেন।
১৬ থেকে ১৭ ডিসেম্বর বিজয়ের পর চূড়ান্ত মুক্তি ও পতাকা দহন
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সারা দেশ যখন "জয় বাংলা" স্লোগান আর স্বাধীনতার আনন্দে উত্তাল, তখন ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি একতলা বাড়িতে (বর্তমানে সড়ক নম্বর ২৬) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায় বন্দি ছিলেন।
পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা ১৬ ডিসেম্বর সারেন্ডার করলেও ১৮ নম্বর বাড়ির পাহারায় থাকা পাক ঘাতকেরা আত্মসমর্পণের খবর স্বীকার করতে চায়নি। তারা ভবনের ছাদে ও চারপাশে ভারী অস্ত্র উঁচিয়ে পাহারা দিতে থাকে। ফলে ১৬ ডিসেম্বর পুরো দেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গমাতা ও তাঁর সন্তানেরা মুক্ত হতে পারেননি।
পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি: ১৬ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করলেও ধানমন্ডির ১৮ নম্বর বাড়ির পাহারায় নিয়োজিত পাকিস্তানি ঘাতক সেনারা সেই আত্মসমর্পণের খবর স্বীকার করতে চায়নি। বাড়ির ছাদে ও চারপাশে পাকা বাংকার বানিয়ে ভারী অস্ত্র এবং মেশিনগান উঁচিয়ে তারা অবস্থান ধরে রাখে।
১৬ই ডিসেম্বর বিকেল থেকে ১৭ই ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত পুরো দেশ স্বাধীন হলেও বাড়ির ভেতরের অবরুদ্ধ বন্দিদের জন্য কোনো স্বস্তি আসেনি। পাক সেনারা হুমকি দেয় যে কেউ বাড়ির কাছে আসার চেষ্টা করলে বা ভেতরে থাকা পরিবারটি বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হবে। ১৬ই ডিসেম্বর বিকেল থেকে ১৭ই ডিসেম্বর সকাল ১১টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ পরিবারটি শুধুই পানি খেয়ে চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সময় পার করে।
১৭ই ডিসেম্বরের যৌথ বাহিনীর উদ্ধার অভিযান: ১৭ই ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনীর ১৪ গার্ডস রেজিমেন্টের একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা মেজর অশোক তারা (পরবর্তীতে কর্নেল) মাত্র ৩ জন জোয়ানকে নিয়ে এই বিপজ্জনক উদ্ধার অভিযানে এগিয়ে যান। বাড়িটির কাছাকাছি পৌঁছাতেই ছাদ ও বাংকার থেকে পাহারারত পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি করার হুমকি দেয়।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মেজর অশোক তারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের অস্ত্র সহযোগীদের কাছে জমা দিয়ে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় একা পাকিস্তানি সৈন্যদের মুখোমুখি হেঁটে যান। তিনি পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের উর্দু ভাষায় সতর্ক করে জানান যে তাদের হেডকোয়ার্টার ইতোমধ্যেই আত্মসমর্পণ করেছে এবং আকাশে মিত্রবাহিনীর হেলিকপ্টার টহল দিচ্ছে। তিনি তাদের প্রাণরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়ে অস্ত্র সংবরণের নির্দেশ দেন। মেজর অশোক তারার এই বীরত্বপূর্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের মুখে পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণ করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। দুপুর ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত হয় বেগম ফজিলাতুন্নেছা ও তাঁর পরিবার।
বেগম মুজিবের চরম ক্ষোভ ও পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো: পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে চলে যাওয়ার পরপরই দীর্ঘ নয় মাসের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চরম সাহস ও বীরত্বের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ির ছাদে উঠে যান, যেখানে পাকিস্তানি দখলদার সেনারা এতকাল তাদের জাতীয় পতাকা টাঙিয়ে রেখেছিল।
বঙ্গমাতা চরম ক্ষোভ ও প্রদীপ্ত সাহসের সাথে সেই পাকিস্তানি পতাকাকে নিচে নামিয়ে আনেন এবং নিজের হাতে টেনে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। এরপর পতাকার টুকরোগুলোকে মাটিতে ফেলে পায়ের নিচে মাড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। দখলদার বাহিনীর দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও শিকল ভাঙার উল্লাসে তিনি নিজে উচ্চকণ্ঠে "জয় বাংলা" স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদটি ছিল পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে জাতির পিতার পরিবারের চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা।
১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘটনাক্রমের ঐতিহাসিক বিবরণ
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার, পরিবারটির পলাতক জীবন, বন্দিদশা এবং মুক্তিলাভের প্রধান ঘটনাগুলো সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:
সময়কাল / তারিখ | ঐতিহাসিক স্থান | প্রধান ঘটনা ও বিবরণ |
২৫-২৬ মার্চ, ১৯৭১ | ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি | ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হামলা। প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পরবর্তীতে গ্রেপ্তার। |
২৬ মার্চ - ১ এপ্রিল | আদমজী স্কুল ও ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজ | ধানমন্ডিতে আক্রমণের পর বঙ্গবন্ধুকে আদমজী স্কুল ও পরে ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে রাখা হয়। ১ এপ্রিল বিমানে পাকিস্তানে স্থানান্তর। |
২৭ মার্চ - মে মাসের শুরু | মালিবাগ, ওয়ারী, খিলগাঁও, মগবাজার | গ্রেপ্তারের পর বেগম মুজিব ও স্বজনেরা ধানমন্ডি ছেড়ে বিভিন্ন বাসায় আত্মগোপন করেন। ২ মাসে মোট ১৯ বার স্থান পরিবর্তন। |
১২ মে, ১৯৭১ | মগবাজারের ভাড়া বাসা | মগবাজারের গোপন আস্তানা থেকে বেগম মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলকে পাক বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার। |
১২ মে - ১৭ ডিসেম্বর | ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোড (বাসা ২৬) | কড়া সামরিক নজরদারিতে পরিবারটির দীর্ঘ ৭ মাসের গৃহবন্দিদশা। তারকাঁটার ঘেরাও এবং চরম খাদ্য ও ওষুধ সংকট। |
২৭ জুলাই, ১৯৭১ | ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল | বন্দি অবস্থায় শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম। |
৫ আগস্ট, ১৯৭১ | ১৮ নম্বর রোডের বন্দিশালা | শেখ জামালের দুঃসাহসিক পলায়ন। তারকাঁটার বেড়া টপকে সীমান্ত পাড়ি এবং কালশীতে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৯ নম্বর সেক্টরে যোগদান। |
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | সমগ্র বাংলাদেশ / রেসকোর্স ময়দান | পাকিস্তানি বাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ। তবে ১৮ নম্বর রোডের বাড়িতে তখনও পাক সেনাদের অবরুদ্ধতা বহাল। |
১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোড | মিত্রবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিবারের চূড়ান্ত মুক্তি। বঙ্গমাতা বেগম মুজিব কর্তৃক পাক পতাকা ছেঁড়া, মাড়ানো ও ভস্মীভূতকরণ। |
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ | তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা | জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। সামরিক পোশাকে পিতা শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জানান দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান শেখ কামাল ও শেখ জামাল। |
বঙ্গবন্ধু পরিবারের অবরুদ্ধ দিনগুলোর কিছু তথ্য
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নথিবদ্ধ অভিজ্ঞতা: বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের পিতা এবং পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু স্মৃতি’-তে গৃহবন্দি সময়কালের জটিল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন।
ড. ওয়াজেদ মিয়া পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনের একজন কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই তাঁর বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। এর ফলে পরিবারটির দৈনন্দিন বাজার-সদাই ও চিকিৎসাব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ধানমন্ডি ১৮ নম্বর সড়কের বাইরে এবং আণবিক শক্তি কেন্দ্রের অফিসে ড. ওয়াজেদ মিয়াকে কড়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা নজরদারিতে (Intelligence Surveillance) রাখা হতো। তিনি যেন কোনোভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া বা প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন, সে জন্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ রেকর্ড করা হতো।
ধানমন্ডি ১৮ নম্বরের ২৬ নম্বর বাসার মানবেতর জীবন: যে বাসাটিতে পরিবারটিকে বন্দি রাখা হয়েছিল, সেটি ছিল বাসযোগ্য সুবিধাবিহীন একটি জরাজীর্ণ একতলা বাড়ি। পুরো বাড়িতে ছিল না কোনো খাট, চেয়ার বা টেবিল। জানালায় কোনো পর্দা ছিল না, যার ফলে বাইরের প্রখর রোদ সরাসরি ঘরে আসত এবং সেনাসদস্যরা বাইর থেকে ভেতরে নজর রাখতে পারত।
শিশু শেখ রাসেলের মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা: অবরুদ্ধ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে ছিল ৭ বছরের শিশু শেখ রাসেল। পিতার অনুপস্থিতি, চারপাশের সশস্ত্র সেনাসদস্যদের তর্জন- গর্জন এবং খেলার সঙ্গীদের অভাব তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলেছিল। সে প্রায়ই কান্নাকাটি করে বলত, "আমাকে আব্বার কাছে নিয়ে যাও।" পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগম মুজিব অশ্রু চেপে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, "আমিই তো তোমার আব্বা, আমিই তোমার আম্মা।"
তৎকালীন কিশোরী শেখ রেহানা পরিবারের খাবার তৈরি, থালাবাসন ধোয়া এবং অন্তর্বাস ধোয়ার মতো পারিবারিক কাজে মাকে সহযোগিতা করতেন। একই সঙ্গে ছোট ভাই রাসেলকে মানসিকভাবে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হলেও বেগম মুজিব ও পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে যুদ্ধের খবরাখবর জোগাড় করতেন। একটি ছোট ব্যাটারিচালিত ট্রানজিস্টর রেডিও কাঁথা ও বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা হতো। গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের ডিউটি পরিবর্তনের সময় নিচু ভলিউমে তাঁরা 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' এবং 'আকাশবাণী কলকাতা'র খবর শুনতেন।
আশেপাশের কিছু সাহসী বাঙালি প্রতিবেশী ও শাকসবজি বিক্রেতা কখনো কখনো সেনাসদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাঁচা বাজারের ব্যাগের নিচে বা চটের প্যাকেটে মুড়িয়ে খবরের কাগজের কাটিং ও গোপন বার্তা ভেতরে পৌঁছে দিতেন।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালের ৯টি মাস বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে শারীরিক কষ্ট ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক একটি দিন অতিক্রম করতে হয়েছিল।
অবরুদ্ধ জীবনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
১৯৭১ সালের নয়টি মাস বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যেভাবে চরম প্রতিকূলতা, ভয় এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেও সন্তানদের আগলে রেখেছেন, তা কেবল এক মায়ের সংগ্রামের গল্প নয় তা ছিল সমগ্র অবরুদ্ধ বাংলাদেশের এক প্রতিচ্ছবি। একদিকে পিতা পাকিস্তানি কারাগারে মৃত্যুর মুখোমুখি, অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ দুই পুত্র রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধরত এই চরম বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়েও বেগম মুজিব কখনো আত্মবিশ্বাস ও সাহস হারাননি।
ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের সেই একতলা আসবাবহীন নগ্ন বাড়িটি সাক্ষী হয়ে আছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় কোনো সহজ পথ ছিল না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সেই পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। শত অপপ্রচার ও গুজবের মেঘ ভেদ করে আজ ইতিহাসের পাতায় এটিই সত্য যে বঙ্গবন্ধু পরিবার কেবল দূর থেকে নেতৃত্বই দেয়নি, বরং যুদ্ধের প্রতিটি অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের সমর্পণ করে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে এক চিরন্তন ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে।
তথ্যসূত্র:
১. 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু স্মৃতি' – ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া (ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড - UPL)।
২. 'আমার পিতা শেখ মুজিব' – শেখ হাসিনা (আগামী প্রকাশনী)।
৩. 'আমাদের ছোট রাসেল সোনা' – শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি)।
৪. কর্নেল অশোক তারা (অব.)-র সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ
৫. শেখ রেহানা ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারসমূহ
৬. 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র' (১৫ খণ্ড) – সম্পাদক: হাসান হাফিজুর রহমান (তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)।
৭. বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর্কাইভ (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শাখা)
৮. অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP Photo Archive) ও 'দ্য গার্ডিয়ান' (The Guardian, UK)















