আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না - বঙ্গবন্ধুর কান্না
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বাঙালির ইতিহাসের এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় দিন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রেখেছিলেন। সেই অপরাহ্ণে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না; বরং তা ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের আগামীর রূপরেখা এবং এক নেতার তাঁর জনগণের প্রতি ভালোবাসার চরম বহিঃপ্রকাশ।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার নতিস্বীকার ও আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে এক স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং ১ কোটি মানুষের শরণার্থী জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় ছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অর্জন।
তবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সেই অসামান্য বিজয়টি উদযাপনের মধ্যেও বাঙালির হৃদয়ে এক গভীর, অসম্পূর্ণতার বেদনা বিরাজ করছিল। যে মহামানবের কালজয়ী দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও বজ্রকণ্ঠে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি নিরস্ত্র জাতি বিশ্বমানচিত্রের সবচেয়ে সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করল, সেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান তখনো পাকিস্তানের অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করছিলেন। সমগ্র বাঙালি জাতির মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা তখন ছিল এমন জাতির পিতা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিজয়ের পূর্ণতা অসম্ভব।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সেই অপূর্ণতার অবসান ঘটে। পাকিস্তানের কারাগারের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বীরের বেশে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশের পবিত্র মাটিতে ফিরে আসেন। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত সেদিন ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে ছুটে আসা প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছিল। সেই অপরাহ্ণে জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি যে আবেগঘন, দিকনির্দেশনামূলক ও দর্শনভিত্তিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তা কেবল কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না; বরং তা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের নীতিপত্র, অসাম্প্রদায়িক পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের চিরন্তন রূপরেখা।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দীর্ঘ ও জটিল কূটনৈতিক পথ: রাওয়ালপিন্ডি থেকে লন্ডন, দিল্লি হয়ে ঢাকা
বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারির ঐতিহাসিক ভাষণ ও তাঁর রাষ্ট্রনায়কসুলভ চিন্তার গভীরতা বুঝতে হলে তাঁর কারামুক্তি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পেছনের অত্যন্ত জটিল, সূক্ষ্ম এবং মহাকাব্যিক কূটনৈতিক পটভূমিটি অনুধাবন করা অপরিহার্য।
রাওয়ালপিন্ডি থেকে লন্ডন
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকাতে আত্মসমর্পণ করলেও পাকিস্তানের তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর জন্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক জনমতের প্রচণ্ড চাপ, সেই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কূটনৈতিক কৌশলের মাঝে পড়ে ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন যে বঙ্গবন্ধুকে আর বন্দি রাখা রাজনৈতিকভাবে সম্ভব নয়।
৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের গভীর রাতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের (PIA) একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হয় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে। লন্ডনে পৌঁছানোর পরপরই বিশ্বগণমাধ্যমে এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু ওঠেন লন্ডনের বিখ্যাত ক্ল্যারিজ হোটেলে।
সেখানে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি ব্রিটিশ প্রথা ভেঙে ডাউনিং স্ট্রিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। সে সময় যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিলেও প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা প্রদর্শন করেন। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে নিমেষেই সুদৃঢ় করে তোলে।
দিল্লিতে অবস্থান ও মিত্রবাহিনী প্রত্যাহারের কূটনীতি
৯ জানুয়ারি রাতে লন্ডন থেকে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর (RAF) বিশেষ বিমানে (কমেট জেট) ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন বঙ্গবন্ধু। পথে ১০ জানুয়ারি সকালে ভারতের রাজধানী দিল্লির পালম বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পুরো মন্ত্রিসভা বঙ্গবন্ধুকে ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করে।
দিল্লি সেনানিবাসের প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ভারতের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আদায় করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জানতে চান: "ম্যাডাম, আপনি কবে বাংলাদেশ থেকে আপনার সৈন্য প্রত্যাহার করবেন?"
ইন্দিরা গান্ধী মুহূর্তের মধ্যে জবাব দিয়েছিলেন, "আপনি যখনই চাইবেন।" বিশ্বের ইতিহাসে কোনো মিত্রবাহিনী স্বাধীন দেশের মাটিতে এতদিন অবস্থানের পর এভাবে বিজয়ী নায়কের কেবল এক বাক্যের অনুরোধে কয়েক মাসের মধ্যে (১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ) নিজ দেশে ফিরে গেছে এমন নজির অত্যন্ত বিরল। এই কূটনৈতিক সাফল্য বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কত্বের অনন্য স্বাক্ষর বহন করে।
মিয়ানওয়ালী কারাগার: মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক অটল হিমালয়
রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু তাঁর কারাজীবনের যে রোমহর্ষক ও ট্র্যাজিক বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিমানে করে লাহোর হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রহসনের সামরিক ট্রাইব্যুনাল ও মৃত্যুদণ্ড
মিয়ানওয়ালী জেলের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে (Solitary Confinement) বঙ্গবন্ধুকে ৯ মাস বন্দি রাখা হয়। ১৯৭১ সালের আগস্ট থেকে শুরু হয় এক প্রহসনের বিচার। 'কোর্ট মার্শাল' বা গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল বসিয়ে তৎকালীন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বিনষ্টসহ ১২টি মিথ্যা অভিযোগ আনে। যার মধ্যে ৬টি অপরাধের শাস্তি ছিল সরাসরি ফাসি।
বঙ্গবন্ধুকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী একে ব্রোহীকে নিয়োগ দেওয়া হলেও বঙ্গবন্ধু সেই ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ ঘোষণা করে দীর্ঘ সময় নীরব থাকেন। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর সামরিক আদালত বঙ্গবন্ধুকে ফাসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় প্রদান করে।
সেলের পাশে কবর ও অদম্য আত্মমর্যাদা
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণ যখন মিয়ানওয়ালী জেলের কাছে পৌঁছায় এবং মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে ধাবিত হয়, তখন জেলের ভেতর বঙ্গবন্ধুর সেলের ঠিক পাশেই একটি সাড়ে তিন হাত গর্ত খোঁড়া হয়। তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য প্রতিদিন সেই গর্ত দেখানো হতো এবং জানানো হতো যে এটিই তাঁর কবর।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মবলীয়ান মনস্তত্ত্ব ও হিমালয়সম ব্যক্তিত্বের সামনে সেই চরম ভয়ও পরাস্ত হয়েছিল। ১০ জানুয়ারির ভাষণে সেই স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর কালজয়ী সেই ঘোষণা:
"আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালি জাতকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।"

মৃত্যুর কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে একজন নেতার নিজের জাতি, ভাষা ও পতাকার প্রতি এই আপসহীন আনুগত্য রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ফাসির দড়ি বা সাড়ে তিন হাত গর্তের ভয় দেখিয়ে বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখা অসম্ভব।
"বিশ্বকবি তুমি দেখে যাও"
১০ জানুয়ারির রেসকোর্সের জনসমুদ্রে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে আসা স্বদেশের কোটি কোটি মানুষের অশ্রু আর ত্যাগের কথা চিন্তা করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লক্ষ্য করে তিনি এক ঐতিহাসিক উত্তর প্রদান করেন।
১৮৯৬ সালে (১৩০৩ বঙ্গাব্দ) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত 'বঙ্গমাতা' কবিতায় বাঙালির জাতীয় চরিত্র, অলসতা, দীর্ঘদিনের পরাধীনতা এবং দায়িত্বহীনতার প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছিলেন:
"রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।"
রবীন্দ্রনাথের এই আক্ষেপটি কেবল একটি কাব্যিক পঙ্ক্তি ছিল না; বরং ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ উপনিবেশবাদের ফলে বাঙালির সাহসিকতা, ঐক্য ও লড়াই করার ক্ষমতার যে অবক্ষয় ঘটেছিল, এটি ছিল তারই এক গভীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবচ্ছেদ। রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছিলেন, জনসংখ্যায় বহুগুণ হলেও অধিকার অর্জনে সংগ্রাম না করা পর্যন্ত একটি জাতি কেবল 'বাঙালি' হিসেবে পরিচয় দিতে পারে, বিশ্বমঞ্চে বীর ও আত্মমর্যাদাশীল 'মানুষ' হতে পারে না।
রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রত্যুত্তর
বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রাম ও ৯ মাসের নজিরবিহীন সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আক্ষেপের জবাব দিয়েছিলেন। ১০ জানুয়ারির ভাষণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোটি জনতাকে সাক্ষী রেখে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন:
"বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ ৭ কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।"
এটি কেবল রবীন্দ্র-সাহিত্যের ওপর কোনো মন্তব্য ছিল না; এটি ছিল বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতির বীরত্বের অফিশিয়াল স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন যে, সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি কেবল নিজের ভৌগোলিক পরিচয় পুনরুদ্ধার করেনি, বরং বিশ্বমানচিত্রে রক্ত দিয়ে বীরত্ব ও মননশীলতার এক অনন্য "মানুষ" হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
"আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান"
বঙ্গবন্ধুর আত্মপরিচয়ভিত্তিক দর্শনটি ছিল বহুমুখী, সর্বজনীন এবং অত্যন্ত গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যমণ্ডিত। ১০ জানুয়ারির ভাষণে তিনি আত্মপরিচয়ের যে তিনটি সুনির্দিষ্ট উপাদান উল্লেখ করেছিলেন বাঙালি, মানুষ এবং মুসলমান এই ত্রি-মাত্রিক সত্তাটি তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং নবগঠিত বাংলাদেশের জন্য একটি আদর্শিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছিল।
"আমি বাঙালি" - অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ
'বাঙালি' ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২-র ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬-র ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি যে জাতীয়তাবাদী ধারার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন, তার ভিত্তি ছিল ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি।
পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করে বাঙালিদের বিভক্ত করতে চেয়েছিল, তখন বঙ্গবন্ধু 'বাঙালি' পরিচয়টিকে রাষ্ট্রগঠনের মূল উপাদান হিসেবে দাঁড় করান। তাঁর কাছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে ভূখণ্ড ও ভাষার কারণে সবাই ছিল সমান অধিকারসম্পন্ন 'বাঙালি'। এই পরিচয়ই অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
"আমি মানুষ" - বিশ্ব মানবতার বিশ্বজনীন অবস্থান
বাঙালি জাতীয়তাবাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেকে সর্বদা একজন সর্বজনীন মানবতাবাদী নেতা হিসেবে দেখতেন। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটে নিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন: "বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।"
১০ জানুয়ারির ভাষণে "আমি মানুষ" কথাটির মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, অপশাসন, অন্যায়, অত্যাচার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই কেবল ভৌগোলিক কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়। যে কোনো মানুষের অধিকার হরণ, গণহত্যা বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই মানবতার প্রথম শিক্ষা। তিনি রাষ্ট্রপরিচালনায় ক্ষমতার চেয়ে মানবিক মূল্যবোধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
"আমি মুসলমান" - ধর্মীয় উদারতা ও শোষণের বিরুদ্ধে ইসলাম
পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক এলিট শ্রেণি ২৪ বছর ধরে ধর্মকে ঢাল বানিয়ে এবং ইসলামকে বিপন্ন ঘোষণা করে বাঙালি জাতিকে শোষণ ও শাসন করেছিল। তারা গণহত্যা, ধর্ষণ এবং লুণ্ঠনকেও 'ইসলাম রক্ষার যুদ্ধ' বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়।
বঙ্গবন্ধু "আমি মুসলমান" বলে সেই অপপ্রচারের ওপর এক চরম আদর্শিক আঘাত হানেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, সত্যিকারের ইসলামের মূল বার্তা হলো সাম্য, মানবতা, সততা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। ইসলামের শিক্ষা কখনো অন্য ধর্মের মানুষকে নির্যাতন করা, স্বজাতিকে হত্যা করা বা প্রতারণা করা শেখায় না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, যিনি নিজে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলতেন; কিন্তু তিনি ধর্মকে রাজনীতির পশরা বানানোর চরম বিরোধী ছিলেন।
এই তিন সত্তার অপূর্ব সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকবে নিজস্ব জায়গায়, জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে ভাষার ভিত্তিতে, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা।
১০ জানুয়ারির ভাষণ
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের ভাষণটি কেবল একটি আবেগীয় স্মারক ছিল না; বরং এটি ছিল সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের জন্য নীতি নির্ধারণী মূল নথি। একটি দেশ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত, চারদিকে পোড়ামাটি নীতি প্রয়োগের ক্ষত, অর্থনীতি বলতে কিছু নেই তখন এক অসীম প্রজ্ঞা নিয়ে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের মঞ্চ থেকে দেশবাসীকে প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান ও শৃঙ্খলা রক্ষা
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর, রাজাকার, আল-বদর বা বিহারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মাঝে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধ বা সংঘাত ছড়ানোর আশঙ্কা ছিল বিপুল। বঙ্গবন্ধু বিষয়টি অনুধাবন করে ভাষণে স্পষ্ট নির্দেশ দেন:
"আপনারা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এবং সরকারের। কোনো অন্যায় প্রতিশোধ নয়, আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব।"
এই একটি নির্দেশের ফলে স্বাধীনতার পরপরই দেশে কোনো বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় বা অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক সহিংসতা ঘটা থেকে দেশ রক্ষা পায়। তিনি একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
আন্তর্জাতিক পররাষ্ট্রনীতি: "সবার সাথে বন্ধুত্ব"
বঙ্গবন্ধু তাঁর ১০ জানুয়ারির ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ঘোষণা করেন, যা আজও আমাদের বৈদেশিক নীতির প্রধান স্তম্ভ: "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।"
তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান বাংলাদেশকে দ্রুত কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। একই সাথে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করতে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার আকুল আবেদন জানান।
পাকিস্তানের প্রতি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর বার্তা
পাকিস্তান ও তৎকালীন পাকি শাসক ভুট্টোকে উদ্দেশ্য করে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানে প্রচার করা "কনফেডারেশন" বা পুনরায় যৌথ রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো ধরনের অলীক ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বলেন:
"আপনাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। আপনারা স্বাধীন দেশ হিসেবে থাকুন, আমাদের স্বাধীনভাবে সুখে থাকতে দিন। আমরা আর কখনো আপনাদের সাথে এক হতে পারব না। তবে আপনারা যদি ভালো থাকেন, আমরাও খুশি হব।"
বঙ্গবন্ধুর এই দূরদর্শী বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ এবং এটি কোনো শর্তাধীন বা সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা নয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাস্টিসের অঙ্গীকার
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে বর্বরোচিত গণহত্যা, লুণ্ঠন ও নারীনির্যাতন চালিয়েছে এবং তাদের যে দেশীয় সহযোগীরা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) এই কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে, তাদের বিচারের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু কোনো আপস করেননি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার করে বলেন যে, সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষীদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে 'দালাল আইন' এবং ১৯৭৩ সালে বিশ্বমানের 'আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন' প্রণয়ন করা হয়।
ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ গড়ার ডাক
বঙ্গবন্ধু জানতেন স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ৭ কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা। যোগাযোগের মাধ্যম ব্রীজ-কালভার্ট, রেললাইন, বন্দর সবকিছু ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত। তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন:
"আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমার চাল নেই, ডাল নেই, পরনের কাপড় নেই। আপনারা যদি কঠোর পরিশ্রম করে ফসল না ফলান, কলকারখানা না চালু করেন, তবে এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার পর আমাদের এখন অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে হবে।"
মহাকাব্যিক ভাষণের অতুলনীয় তাৎপর্য
১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর ভাষণটি কোনো লিখিত খসড়া দেখে দেওয়া বক্তব্য ছিল না। এটি ছিল এক মহামানবের দীর্ঘ ২৪ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ, আবেগ, দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।
ভাষণটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্টভাবে উঠে আসে:
রাষ্ট্রকাঠামোর বৈধতা ও স্থায়িত্ব: ১০ জানুয়ারির আগে বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার (মুজিবনগর সরকার) রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও জাতির পিতার উপস্থিতি সরকারকে একটি আন্তর্জাতিক ও সার্বজনীন আইনি এবং নৈতিক ভিত্তি দান করে।
জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র: ৯ মাসের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিধ্বস্ত একটি বিভক্ত জাতিকে মুহূর্তের মধ্যে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর এই আবেগঘন উপস্থিতি ও কালজয়ী দিকনির্দেশনা জাদুর মতো কাজ করেছিল।
আধুনিক ও আধুনিকমনস্ক বাংলাদেশের স্বপ্নভিত্তি: একটি নতুন রাষ্ট্র কীভাবে চলবে তা ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রভিত্তিক (অর্থনৈতিক সমতা) হবে তার রূপরেখা বঙ্গবন্ধু সেই অপরাহ্ণে প্রদান করেন।
বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক: "একবার মরে দুইবার মরে না" এই নীতি কেবল বঙ্গবন্ধুর একার ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যেকোনো সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক প্রতিকূলতায় মাথা নত না করার প্রেরণা জোগান দেয় এই ভাষণ।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পটভূমি ও মূল তথ্যসমূহ
পটভূমির বিষয়/ঘটনা | স্থান/মাধ্যম | তারিখ ও সময় | ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও প্রধান অর্জন |
পাকিস্তানে বন্দিত্ব ও ট্রাইব্যুনাল | মিয়ানওয়ালী কারাগার, পাকিস্তান | ২৬ মার্চ ১৯৭১ – ৭ জানুয়ারি ১৯৭২ | গোপন সামরিক আদালতে প্রাণদণ্ডের রায়, কবরের সামনে দাঁড়িয়েও আপসহীন অবস্থান। |
কারামুক্তি ও যাত্রা | রাওয়ালপিন্ডি (চকলালা বিমানবন্দর) | ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ (ভোর রাত) | পিআইএ-র বিশেষ বিমানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর উপস্থিতিতে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা। |
লন্ডনে অবস্থান ও কূটনীতি | ক্ল্যারিজ হোটেল ও ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট, লন্ডন | ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ | ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ও বিরোধীদলীয় নেতা হার্যার্ড উইলসনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক; স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সমর্থনের ভিত্তি স্থাপন। |
দিল্লিতে যাত্রাবিরতি | পালম বিমানবন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ড, দিল্লি | ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ (সকাল) | ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা; মিত্রবাহিনীর দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক চুক্তি ও অঙ্গীকার আদায়। |
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন | তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা | ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ (দুপুর ১:৪১ মিনিট) | রাজকীয় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কমেট বিমানে ধানমন্ডির বীরের নিজ মাতৃভূমিতে অবতরণ; ১০-১৫ লাখ মানুষের বাঁধভাঙা সংবর্ধনা। |
ঐতিহাসিক ভাষণ | রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা | ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ (অপরাহ্ণ) | সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রগঠন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক দিগদর্শন। |
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন (১২ জানুয়ারি ১৯৭২)
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ভাষণের পরদিন থেকেই নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে মনোনিবেশ করা হয়। তৎকালীন মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে গঠিত মুজিবনগর সরকারের শাসনকাঠামো ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই সংসদীয় গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন।
অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি: ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু 'অস্থায়ী সংবিধান আদেশ-১৯৭২' জারি করেন। এর মাধ্যমে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়।
মন্ত্রিসভা গঠন ও ক্ষমতা হস্তান্তর: ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ পাঠ করানো হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান এবং মনসুর আলীর সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ কর্মসূচি: যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর চরণে অস্ত্র সমর্পণ করেন। ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জমা নেওয়া হয় এবং তাঁদের জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধান প্রণয়ন ও চার মূলনীতির প্রতিষ্ঠা
১০ জানুয়ারির ভাষণে রাষ্ট্র পরিচালনার যে মৌলিক আদর্শিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান তৈরি করা হয়।
সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন: ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র বিরোধীদলীয় সদস্য ছিলেন ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু।
খসড়া উপস্থাপন ও অনুমোদন: মাত্র সাত মাসের রেকর্ড সময়ে খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করা হয়। ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদে খসড়া সংবিধান উত্থাপিত হয় এবং ৪ নভেম্বর তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে এটি কার্যকর করা হয়।
রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি: সংবিধানের মূলস্তম্ভ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারির দর্শনের প্রতিফলন ঘটে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বিশেষ করে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' সংযোজনের মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রকে সর্বজনীন মানবিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮)
১৯৭২ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশ ছিল এক সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপ। খাদ্য সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার শূন্য রিজার্ভ, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বন্দরের অচলাবস্থা মোকাবেলা করতে হয়।
জাতীয় পরিকল্পনা কমিশন গঠন: দেশের অর্থনীতিকে সুনির্দিষ্ট মডেলে রূপ দিতে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নূরুল ইসলামকে সহ-সভাপতি এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. আনিসুর রহমান ও ড. খালিকুজ্জামানকে সদস্য করে জাতীয় পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়।
ভারী শিল্প ও ব্যাংক জাতীয়করণ (Nationalization Policy): পাকিস্তানি মালিকেরা সমস্ত মূলধন পাচার করে কলকারখানা ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় শিল্প খাত চালু রাখতে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ব্যাংক, বীমা, পাট, বস্ত্র ও চিনি কলসহ সমস্ত পরিত্যক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়।
বন্দর ও অবকাঠামো উদ্ধার অভিযান: চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরে শত্রু বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ এবং ডুবন্ত জাহাজ উদ্ধার করে বন্দর সচল করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌবাহিনীর সাথে বিশেষ চুক্তি করা হয়। সোভিয়েত অ্যাডমিরাল জুকভের নেতৃত্বে উদ্ধারকারী দল সফলভাবে চট্টগ্রাম বন্দর সচল করে।
জাতিসংঘ ত্রাণ অভিযান (UNROD/UNROB): যুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষ এড়াতে এবং খাদ্য ও ত্রাণ বিতরণে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি অ্যালেন বুথের নেতৃত্বে পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল ভূমিকা পালন করে।
কূটনৈতিক সাফল্য ও বৈশ্বিক সংস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থান
বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারির পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারোর সাথে বৈরিতা নয়" এর ওপর ভিত্তি করে দ্রুততম সময়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন শুরু হয়।
কমনওয়েলথ যোগদান (১৮ এপ্রিল ১৯৭২): বাংলাদেশ কমনওয়েলথের ৩৪তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর প্রতিবাদে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান কমনওয়েলথ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন - NAM (১৯৭৩): আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটে নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু অংশ নেন। সেখানে ফিদেল কাস্ত্রো, আনোয়ার সাদাত, জাওয়ারাত আল আসাদ ও মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো বিশ্বনেতাদের সাথে বৈশ্বিক কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্মেলনেই ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর প্রখ্যাত উক্তিটি করেন: "আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।"
ওআইসি লাহোর সম্মেলন (১৯৭৪): ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (OIC) দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সিংহভাগ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করা হয়।
জাতিসংঘের ১৩৮তম সদস্যপদ (১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪): কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৮তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে বিশ্বমঞ্চে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলা ভাষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ও বর্তমান দায়বদ্ধতা
আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের সেই মহামানবের প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য এবং তাঁর সেই অমর ভাষণ আমাদের জাতীয় জীবনে সমভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাণবন্ত।
বঙ্গবন্ধু যে 'সোনার বাংলা'র স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কেবল একটি ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সত্তা ছিল না; বরং তা ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, উগ্রতা, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত এক মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিজের ধর্ম ও মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে, যেখানে বাঙালি পরিচয়ে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যাবে এবং যেখানে 'মানুষ' হিসেবে মানুষের অধিকার সর্বাগ্রে স্থান পাবে।
রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ যেভাবে ৭ কোটি বাঙালি ১৯৭১ সালে নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে মোচন করেছিল, ঠিক তেমনি আজকের তরুণ প্রজন্মকেও সেই অদম্য প্রেরণা বুক ধারণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সেই ত্রিমাত্রিক পরিচয় বাঙালি, মানুষ এবং মুসলমান আমাদের শেখায় কীভাবে নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতির শিকড়ে অবস্থান করেও বিশ্বজনীন মানবিক চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়া যায়।
১০ জানুয়ারির সেই ঐতিহাসিক বিকেলে রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা যে আমানত আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তাকে রক্ষা করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরে একটি উন্নত, সমতাভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল ১০ জানুয়ারির সেই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব। সেই পথেই নিহিত রয়েছে বাঙালির প্রকৃত মুক্তি ও বিশ্ব দরবারে চিরস্থায়ী মর্যাদা।














