বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা - রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত ও জজ মিয়া নাটক
তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত অস্থায়ী ট্রাক থেকে নিচে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই চারদিক কাঁপিয়ে শুরু হয় একের পর এক পাকিস্তানি সামরিক গ্রেডের ‘আর্জেস ৮৪’ গ্রেনেড বিস্ফোরণ। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটি জনসভা পরিণত হয় নারকীয় শ্মশানে। একের পর এক ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণে পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ রক্ত ও ছিন্নভিন্ন লাশের স্তূপে পরিণত হয়। পুরো এলাকা কালো ধোঁয়া, আর্তচিৎকার, বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর রক্তের সাগরে ভেসে যায়। অলৌকিকভাবে শেখ হাসিনা মানবঢাল তৈরির মাধ্যমে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

TruthBangla

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। স্থান: ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। রক্তঝরা বিকেলের সেই উত্তাল প্রহরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আয়োজনে চলছিল সন্ত্রাসবিরোধী এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত অস্থায়ী ট্রাক থেকে নিচে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই চারদিক কাঁপিয়ে শুরু হয় একের পর এক পাকিস্তানি সামরিক গ্রেডের ‘আর্জেস ৮৪’ গ্রেনেড বিস্ফোরণ।
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটি জনসভা পরিণত হয় নারকীয় শ্মশানে। একের পর এক ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণে পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ রক্ত ও ছিন্নভিন্ন লাশের স্তূপে পরিণত হয়। পুরো এলাকা কালো ধোঁয়া, আর্তচিৎকার, বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর রক্তের সাগরে ভেসে যায়। অলৌকিকভাবে শেখ হাসিনা মানবঢাল তৈরির মাধ্যমে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এই বর্বরোচিত হামলায় ঘাতকদের স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা হয়ে প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের নারী বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন তাজা প্রাণ। পঙ্গুত্ব বরণ করেন ও শরীরে আজীবনের জন্য নরকযন্ত্রণা বহন করে বেঁচে থাকেন পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২১ আগস্টের হামলা কেবল একটি আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও স্বাধিকারের নেতৃত্বের ওপর এক সুপরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ।
নরকীয় তাণ্ডব ও ঘাতকের আর্জেস গ্রেনেড
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু সৈন্য ধ্বংস করতে যে ধরনের সামরিক গ্রেডের আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়, ঠিক তেমন আর্জেস গ্রেনেড একটি রাজপথের গণসমাবেশে ছুড়ে মারা হয়েছিল। সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে এই সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে। এরপর একে একে ১৩টি গ্রেনেড দিয়ে পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হয়।
মানবঢালে আত্মরক্ষা: ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। প্রথম গ্রেনেডটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথেই মঞ্চে থাকা দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতারা (যেমন মোস্তাক আহমেদ সেলিনা, মোহাম্মদ হানিফ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের প্রমুখ) নিজেদের জীবন বাজি রেখে শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করেন।
বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেদিন কাঁদতে কাঁদতে শেখ হাসিনা বলেছিলেন,
“আমার কর্মীরা জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছে। গ্রেনেড যখন বিস্ফোরিত হচ্ছিল, তখন নেতা-কর্মীরা আমাকে ঘিরে রেখেছিল। এখনও আমার কাপড়ে তাদের শরীরের রক্ত লেগে আছে।”
পেশাদার ঘাতকের নিশানা: সরাসরি মানবঢালের কারণে ট্রাকে নিশানায় আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়ে ঘাতকরা ট্রাকের সিঁড়ি ও চাকা লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। একই সাথে যখন শেখ হাসিনাকে তাঁর বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ গাড়িতে তুলে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ও টায়ার লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করা হয়। গুলির আঘাতে গাড়ির কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং টায়ার পাংচার হয়ে গেলেও চালক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গাড়িটি টেনে সুধা সদনে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
মোস্তাক আহমেদ সেলিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একই দিনে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৬ রাউন্ড গুলি করা হয়। তার ব্যবহৃত গাড়িতে এখনও তিনটি গুলির আঘাতের চিহ্ন ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত আছে।”
শত শত প্রাণের পঙ্গুত্ব: কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভয়াবহ এই হামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদসহ ঘটনাস্থলেই ও পরবর্তীতে হাসপাতালে মোট ২৪ জন প্রাণ হারান। প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হন। হামলায় শেখ হাসিনার শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহতদের অনেকের শরীরেই বিঁধে যায় সহস্রাধিক বিষাক্ত ধাতব স্প্লিন্টার, যা অস্ত্রোপচার করেও বের করা সম্ভব হয়নি; ফলে আজও সেই স্প্লিন্টারের অসহ্য যন্ত্রণা বহন করে চলছেন শত শত মানুষ।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বাবর-পিন্টু ও হুজির ঘৃণ্য চক্রান্ত
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা কোনো আকস্মিক সন্ত্রাসী ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠনের যৌথ প্রযোজনায় পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। জবানবন্দি ও আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক ছাতার নিচেই এই নীল নকশা তৈরি হয়।
তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কুখ্যাত বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র 'হাওয়া ভবন' এই হামলার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল।
মাওলানা তাজউদ্দিন ও গ্রেনেড সরবরাহ: হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেয় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)। হুজির প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে স্পষ্ট হয় যে, সামরিক বাহিনীর সংরক্ষিত অস্ত্রাগারে ব্যবহারযোগ্য 'আর্জেস' গ্রেনেড সরবরাহ করেছিলেন তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর আপন ভাই ও হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন। পাকিস্তানের সামরিক সংযোগ থেকে আসা এসব বিস্ফোরক নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে এনে জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
ধানমন্ডির হাওয়া ভবনের বৈঠক: মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, বিএনপি নেতা তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই (NSI) ও ডিজিএফআই (DGFI)-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বারবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুফতি হান্নানসহ অন্যান্য জঙ্গি নেতাদের নিশ্চিত করা হয় যে, হামলা চালানোর পর প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো বাধা আসবে না এবং তাদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করা হবে।
অস্ত্র ও প্রশাসনের সমন্বয়: হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো কীভাবে সামরিক অস্ত্রাগার বা আন্তর্জাতিক চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে এলো এবং তা কীভাবে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে গেল তার সরাসরি উত্তর ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিজিএফআই-এনএসআই-এর একটি অংশের প্রত্যক্ষ মদদ।
আলামত ধ্বংস, জজ মিয়া নাটক ও ঘাতকদের বিদেশে পলায়নে রাষ্ট্রীয় সহায়তা
হামলা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মূল অপরাধীদের বাঁচাতে সরকারি পর্যায়ে কতটা নজিরবিহীন কারসাজি করা হয়েছিল। গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর যখন চারদিকে আহতদের আর্তনাদ চলছিল এবং দলীয় কর্মীরা রক্তাপ্লুত স্বজনদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছিলেন, তখন উদ্ধারকারীদের সাহায্য করার বদলে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ চালিয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল করে তোলে, যাতে হামলাকারীরা সহজেই এলাকা ত্যাগ করতে পারে।
তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা ও জজ মিয়া নাটক: হামলার পরপরই অপরাধস্থল সংরক্ষণ না করে গভীর রাতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি দিয়ে স্পট ধুয়ে-মুছে ফেলা হয়। আলামত হিসেবে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত গ্রেনেড ও স্প্লিন্টার বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আগেই দ্রুত ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংস্থা এফবিআই (FBI) ও ইন্টারপোল তদন্তে আসতে চাইলেও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তকাজে নানাবিধ বাধা সৃষ্টি ও তথ্য গোপনের চেষ্টা করা হয়। লালবাগ ও মতিঝিল থানায় আওয়ামী লীগের আহত ও পঙ্গু নেতারা যখন মামলা করতে যান, পুলিশ সে মামলা নিতে অস্বীকার করে।
সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ছিল তৎকালীন সিআইডি (CID) কর্মকর্তাদের তৈরি করা ‘জজ মিয়া নাটক’। মূল হামলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করতে নোয়াখালীর গ্রাম থেকে মো. জালাল ওরফে জজ মিয়া নামের এক সাধারণ যুবককে তুলে এনে নির্যাতন চালানো হয়। তাঁর পরিবারকে মাসোহারা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে সিআইডি একটি কাল্পনিক জবানবন্দি তৈরি করে, যেখানে বলা হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’ এই হামলা চালিয়েছে।
অপরাধীদের সুপরিকল্পিত পলায়ন
হামলার সাথে জড়িত শীর্ষ জঙ্গি ও মাস্টারমাইন্ডদের নিরাপদে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিল তৎকালীন জোট সরকার:
মাওলানা তাজউদ্দিনের পলায়ন: ২১ আগস্ট হামলার মূল সরবরাহকারী ও অন্যতম প্রধান চক্রান্তকারী ছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সামরিক উগ্রবাদী সংগঠন 'হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ' (হুজি-বি)-এর শীর্ষ নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, যিনি তৎকালীন জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই।
হামলার মূল পরিকল্পনা ও সামরিক গ্রেডের গ্রেনেড সরবরাহের তথ্য ফাঁস হওয়ার উপক্রম হলে তৎকালীন প্রশাসনিক সহায়তায় তাঁকে বিদেশে পাঠনোর পথ সুগম করা হয়। সিআইডি তদন্ত ও রাজসাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় ২০০৬ সালের ১ অক্টোবর মাওলানা তাজউদ্দিনকে ভুয়া পাসপোর্টে 'ভুয়া নাম-পরিচয়' ব্যবহার করে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে করাচিতে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হয়। পরবর্তীতে তিনি সেখান থেকে পাকিস্তানে আত্মগোপন করেন।
যুক্তরাজ্যে ৯ ঘাতকের আশ্রয়: হামলা পরিচালনকারী হুজি-বি ও যুক্ত শীর্ষ জঙ্গি শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই, মাওলানা জোবায়ের, খলিলুর রহমান, মোহাম্মদ ইকবাল, বাবু ওরফে রাতুল বাবুসহ চিহ্নিত অভিযুক্তদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি থেকে সরিয়ে সীমান্ত পার করে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হয়। তৎকালীন সরকারের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের একশ্রেণীর কর্মকর্তা আসামিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো নিরাপদ রুট তৈরি করে দেন, যার ফলে এই আসামিরা বিশেষ সুবিধায় যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে আশ্রয় লাভ করে।

কারাগারে একই গ্রেনেড মিল পাওয়া: ২১ আগস্টের হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল অস্ট্রিয়ান প্রযুক্তিভিত্তিক সামরিক গ্রেডের আর্জেস-৮৪ (Arges 84) হ্যান্ড গ্রেনেড, যা সাধারণ কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে সহজে থাকা সম্ভব নয়। এর ঠিক কয়েকদিন পর, ২০০৪ সালের ২৬ আগস্ট পুরান ঢাকার তৎকালীন প্রধান কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে একটি তাজা ও না-ফোটা আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়।
একটি চরম সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় কারাগারের ভেতরে এ জাতীয় বিষাক্ত সামরিক গ্রেনেড পাওয়া এটিই সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার থেকে এই গ্রেনেডগুলো সংগ্রহ করে সরকারি নিয়ন্ত্রাধীন হেফাজতে রাখা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই এগুলো উগ্রবাদী হামলায় ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়।
জঙ্গিবাদ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত: আফগান ফেরত যোদ্ধা, জামায়াত-শিবির ও আইএসআই
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলীয় কোন্দলের ফল ছিল না; এটি ছিল উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা চক্রান্তের এক বিষাক্ত ফসল।
আফগান যুদ্ধ ও হুজির জন্মকথা: ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর যৌথ অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণে বিশ্বজুড়ে উগ্রবাদী তরোয়াল তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ থেকেও 'জিহাদের' নামে ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ করে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার তরুণকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়।
এই তরুণদের একটি বড় অংশ ছিল তৎকালীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র ক্যাডার। যুদ্ধ শেষে সামরিক কৌশল ও বিস্ফোরক ব্যবহারের উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই যোদ্ধারা দেশে ফিরে এসে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে 'হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ' (হুজি-বি) গঠনের ঘোষণা দেয়।
পরবর্তীতে বাংলাদেশে সংগঠিত ভয়াবহ সব সন্ত্রাসী আক্রমণ যেমন ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলা, ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হামলা, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি বোমা পুতে রাখা এবং সিলেটে হজরত শাহজালালের মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা এই আফগান-ফেরত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছিল।
জামায়াত-শিবির ও পাকিস্তানের আইএসআই (ISI)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করা অসাম্প্রদায়িক ধারাকে চিরতরে ধ্বংস করতে এবং বাংলাদেশকে একটি আফগানিস্তান বা পাকিস্তান ধাঁচের উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করাই ছিল এই চক্রের উদ্দেশ্য।
আইএসআই-এর অর্থায়ন ও ভূ-রাজনীতি: পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) সর্বদাই বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতে অস্থিরতা তৈরি এবং বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবে বাংলাদেশকে একটি ধর্মান্ধ ও প্রশাসনিকভাবে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য চক্রান্ত চালিয়ে আসছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অস্থিরতা তৈরি এবং বাংলাদেশে একটি প্রগতিশীল উন্নয়নশীল সরকার যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্য পাকিস্তান নিয়মিতভাবে হুজি, জেএমবি ও উগ্রবাদী দলগুলোকে প্রচুর অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছিল। পাকিস্তানের এই উদ্দেশ্য অর্জনে দেশীয় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল জামায়াত-শিবির ও তাদের আদর্শে লালিত গোষ্ঠীগুলো, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধ্বংস করা।
১৭ আগস্টের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঠিক এক বছর পর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও হুজি-বি যৌথ সমন্বয়ে দেশের ৬৩টি জেলায় (মুন্সিগঞ্জ বাদে) মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে একযোগে ৫০০টিরও বেশি স্থানে সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়।
জেলা জজ আদালত, হাইকোর্ট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সচিবালয় ও বিমানবন্দরসহ স্পর্শকাতর সরকারি স্থাপনায় এই হামলা চালিয়ে তারা দেশে শরিয়া আইন চালুর হুমকি দেয়। এই হামলা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক লালনক্ষেত্র ছাড়া এত বিশাল ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে একযোগে বোমা হামলার সক্ষমতা এককভাবে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। এই জঙ্গি হামলারও মূল কান্ডারি ছিল জামায়াত-শিবিরের আদর্শে অনুপ্রাণিত জঙ্গিরা।

শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার অপচেষ্টা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অন্তত ১৯ বার হত্যা করার ষড়যন্ত্র ও সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, যার প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামরিক, উগ্রবাদী ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী চক্রের উপস্থিতি দেখা যায়।
১৯৮৯ সালের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের হামলা: ১৯৮৯ সালের ১০ই আগস্ট মধ্যরাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে ফ্রিডম পার্টির সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা (৭৫-এর খুনি ফারুক-রশিদের গঠিত দল) অতর্কিত গুলি ও গ্রেনেড বর্ষণ করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিকিউরিটি গার্ড ও দলীয় কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।
শেখ হাসিনাকে হত্যার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর (ঈশ্বরদী): পাবনার ঈশ্বরদী ও কাপ্তাই রেলওয়ে স্টেশনে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের বগি লক্ষ্য করে একের পর এক গুলিবর্ষণ ও বোমাবর্ষণ করা হয়।
১৯৯৫ সালের ৭ মার্চ (কার্জন হল): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে তাঁর অল্প দূরেই শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ও হত্যার চেষ্টা করা হয়।
২০০০ সালের ২০ জুলাই (কোটালীপাড়া): গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার নির্ধারিত জনসভাস্থল শেখ লুৎফর রহমান সরকারি কলেজ মাঠের কাছে এবং হেলিপ্যাডের তলদেশে ৭৬ কেজি ও ৪০ কেজি ওজনের দুটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও শক্তিশালী বোমা পুতে রাখা হয়, যা জনসভার পূর্বে উদ্ধার হওয়ায় নিশ্চিত গণসংহার এড়ানো সম্ভব হয়।
২০০১ সালের ৩০ মে (রূপসা সেতু): খুলনা জেলার রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শক্তিশালী বোমা পুতে রাখা হয়েছিল।
২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর (সিলেট): সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনী জনসভাস্থলে শেখ হাসিনা পৌঁছানোর মাত্র অল্প কিছুক্ষণ আগে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে বহু নেতাকর্মী নিহত ও হাত-পা হারান।
২০০৪ সালের ২৪ জানুয়ারি (চাটমোহর): পাবনার চাটমোহরে শেখ হাসিনার মোটর শোভাযাত্রায় সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট (বঙ্গবন্ধু এভিনিউ): শেখ হাসিনাকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে আর্জেস গ্রেনেডের সিরিজ আক্রমণ চালানো হয়, যেখানে আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে রক্ষা পেলেও স্থায়ীভাবে তাঁর শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পিন্টু পরিবারের অপরাধ সিন্ডিকেট: ২১ আগস্ট থেকে ২০০৯ এর বিডিআর বিদ্রোহ
বিএনপির তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ভূমি উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু এবং তাঁর ভাইদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার করে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেটটি রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায় লিপ্ত হয়।
২১ আগস্টের গ্রেনেড সরবরাহে আবদুস সালাম পিন্টু ও তাঁর ভাই জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) অন্যতম প্রধান মাওলানা তাজউদ্দিন অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। বিচারে প্রমাণিত তথ্য অনুযায়ী, হামলার পূর্বে সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির সরকারি বাসভবনে মুফতি হান্নান ও অন্যান্য চক্রান্তকারীদের নিয়ে একাধিক ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকেই মাওলানা তাজউদ্দিন হামলার জন্য পাকিস্তান থেকে আনা আর্জেস (Arges) গ্রেনেড সরবরাহ করেন। বিএসএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিচারিক আদালত এই হামলায় জড়িত থাকার অপরাধে আবদুস সালাম পিন্টুকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করে।
ঠিক একইভাবে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বিডিআর বিদ্রোহেও এই পরিবারের আরেক ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর নাম সরাসরি চলে আসে।
পিলখানা গণহত্যায় সহায়তা: ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা বিডিআর সদর দফতরে সংঘটিত বিদ্রোহ ও গণহত্যায় দেশের ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়ায় উঠে আসে যে, লালবাগ অঞ্চলের সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু (সালাম পিন্টু ও মাওলানা তাজউদ্দিনের ভাই) এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
পিলখানার ৩ ও ৪ নম্বর গেট দিয়ে খুনি ও বিদ্রোহী জওয়ানদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে তিনি ট্রাক ও নৌ-পরিবহন সরবরাহ করে সহায়তা করেন। গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্যভিত্তিক বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় বিচারে এই রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত ও সহায়তা বিচারে প্রমাণিত হওয়ায় সাবেক এমপি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
স্প্লিন্টারের চিরস্থায়ী ক্ষত: ভুক্তভোগী ও শহীদদের বেদনাবিধুর উপাখ্যান
২১ আগস্টের রাজনৈতিক খতিয়ান ও হিসাব-নিকাশের বাইরে যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেদনাদায়ক, তা হলো এই হামলায় নিহত ও শত শত বেঁচে যাওয়া মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি এবং করুণ জীবনগাথা।

শহীদ রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা)
২১ আগস্টের শহীদদের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন রফিকুল ইসলাম, যিনি সবার কাছে ‘আদা চাচা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
তিনি পাঞ্জাবির দুই পকেটে দুটি প্লাস্টিকের কৌটায় রোদে শুকানো আদা কুচি নিয়ে আওয়ামী লীগের যেকোনো জনসভায় হাজির হতেন। প্রচণ্ড গরমে স্লোগান দেওয়া দলীয় নেতাকর্মী ও বক্তাদের গলা যেন ভেঙে না যায়, সেজন্য তিনি সবাইকে আদা কুচি খেতে দিতেন। বলতেন, "এই আদা আমার ছেলেদের (নেতাকর্মীদের) সুস্থ রাখবে।"
নেত্রী শেখ হাসিনাও তাকে চিনতেন এবং জনসভায় আদা চাচার কাছ থেকে আদা চেয়ে খেতেন। ২১ আগস্ট সেদিনও আদা চাচা নেত্রীকে আদা খাওয়াতে মঞ্চের ঠিক নিচেই অপেক্ষা করছিলেন। গ্রেনেডের প্রাণঘাতী স্প্লিন্টারে শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার পর, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মুহূর্তে রক্তে ভেসে যাওয়া আদা চাচার শেষ শব্দগুলো ছিল "বুবু? বুবু বেঁচে আছেন তো?" নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে নেত্রীর জীবনের খোঁজ নেওয়া এই ভালোবাসা রাজনীতির ইতিহাসে এক অমর উপাখ্যান।
মর্গের লাশের স্তূপ থেকে ফিরে আসা রত্না আক্তার রুবি
২১ আগস্টের ভয়াবহ বিস্ফোরণে রত্না আক্তার রুবির শরীরে শত শত স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়। রক্তে ভেজা অচেতন রুবিকে উদ্ধারকারীরা মৃত ভেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে অন্য লাশের স্তূপে ফেলে রেখে আসে। দীর্ঘ সময় পর মর্গে রাখা লাশের মধ্য থেকে তাঁর সাময়িক শরীর নড়াচড়া করতে দেখে এক উদ্ধারকারী তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচলেও আজ দুই দশক ধরে শরীরের ভেতরে বহন করা অসংখ্য স্প্লিন্টারের অসহ্য যন্ত্রণায় প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করছেন তিনি।
চোখের আলো হারানো দৌলতুন্নাহার
পল্লবী থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি দৌলতুন্নাহার সেদিন গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে চিরতরে নিজের বাম চোখ হারিয়ে ফেলেন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে এখনো বহু স্প্লিন্টার গাঁথা রয়েছে। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পাশাপাশি জীবনের স্বাভাবিক গতি ও কার্যক্ষমতাও হারিয়ে গেছে তাঁর।
বোনকে হারানো ও চাকরিচ্যুত সেলিনা
কলাবাগান আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কর্মচারী সেলিনা সেদিন সভানেত্রীর মঞ্চের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখের সামনেই ছোট বোন সুফিয়া খাতুনকে গ্রেনেড বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে প্রাণ হারাতে দেখেন তিনি। বোনকে বাঁচাতে গিয়ে তিনিও স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক শারীরিক পঙ্গুত্ব ভোগ করা এবং নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যস্ত থাকার কারণে একপর্যায়ে তিনি নিজের চাকরিটিও হারান।
যন্ত্রণাদায়ক ট্রমার শিকার নার্গিস আক্তার
ভাটারা ইউনিয়নের মহিলা আওয়ামী লীগ কর্মী নার্গিস আক্তার আজও ভয়াল ২১ আগস্টের বিভীষিকা থেকে বের হতে পারেননি। দুই দশক পার হলেও শরীরে বহন করা স্প্লিন্টারের যন্ত্রণার পাশাপাশি বিকট বিস্ফোরণ ও লাশের স্তূপের দৃশ্য তাঁর মানসিক স্থায়িত্ব কেড়ে নিয়েছে। রাতের আঁধারে ঘুমের ঘোরে আজও আচমকা বিকট আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
বিচারিক ইতিহাস, রাজনৈতিক পালাবদল ও বর্তমান বাস্তবতা
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার প্রক্রিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ, জটিল ও বিতর্কিত পথপরিক্রমা অতিক্রম করেছে। ২০০৪ সালের ভয়াবহ এই ঘটনার পর তদন্তের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বিভ্রান্তিকর জবানবন্দি এবং পরবর্তী সময়ে আইনি ত্রুটির কারণে মামলাটির গতিপথ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।
তদন্তের সূচনালগ্ন ও 'জজ মিয়া নাটক': ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর প্রাথমিক তদন্তে ব্যাপক অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ ওঠে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সিআইডির তদন্ত দল রাজনৈতিক প্রভাবে মামলার প্রকৃত গতিপথ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
২০০৫ সালে নোয়াখালীর এক সাধারণ যুবক জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে এনে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়। সিআইডি তাকে প্রতি মাসে মাসোহারা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এই জালিয়াতি উন্মোচিত হলে 'জজ মিয়া নাটক' বিচারিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ আমলের তদন্ত: ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটির পুনরায় নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু হয়। সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীর তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নিশ্চিত হন যে এটি কোনো স্থানীয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং এর পেছনে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি-বি)-এর শীর্ষনেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার সহযোগীরা সরাসরি যুক্ত ছিল। ২০০৮ সালের ৯ জুন সিআইডি ২২ জনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়। সিআইডির বিশেষ সুপার আব্দুল কাহহার আকন্দের পুনস্তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই একটি সম্পূরক অভিযোগপত্র (Supplementary Charge Sheet) আদালতে দাখিল করা হয়। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাগণ এবং কয়েকজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাসহ নতুন করে ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে মোট আসামির সংখ্যা ৪৯ এ উন্নীত করা হয়।
২০১৮ সালের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়
দীর্ঘ ১৪ বছরের আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের দুটি পৃথক মামলায় রায় ঘোষণা করেন:
মৃত্যুদণ্ড (১৯ জন): সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, এনএসআই-এর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুর রহিম, হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, শেখ আবদুস সালাম, আব্দুল মাজেদ ভাট এবং আবদুল মালেকসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (১৯ জন): বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, আবদুর রউফ এবং সাব্বির আহমেদসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড (১১ জন): দায়িত্বে অবহেলা, প্রকৃত অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা এবং আলামত ধ্বংসের অভিযোগে সাবেক তিন পুলিশ প্রধান (আশরাফুল হুদা, শাহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী), সিআইডির সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাসহ ১১ জনকে দুই থেকে তিন বছরের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিচারহীনতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এই নজিরবিহীন পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বিচার বিভাগে পূর্ববর্তী রায়ের আইনি পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল এবং ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানির পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, সালাম পিন্টুসহ চার্জশিটভুক্ত সকল আসামিকে বেকসুর খালাস দেন।
হাইকোর্টের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে লিভ টু আপিল করা হলে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তা নিষ্পত্তি করেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ৬ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন।
আপিল বিভাগ তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণকালে নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে অস্বাভাবিক দ্রুততা দেখানো হয়েছিল, যা জবানবন্দিগুলোর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এর মাধ্যমে মামলাটির সব আইনি ধাপের চূড়ান্ত ইতি ঘটে।
বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া: আদালতের এই খালাসের রায়ের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনি প্রক্রিয়ায় রেহাই পেলেও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নারকীয় এবং ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের দায় কার সেই সুনির্দিষ্ট উত্তর অধরাই থেকে গেল। ২৪ জন নিরপরাধ মানুষের নির্মম মৃত্যু এবং ৫০০ এর বেশি আহত মানুষের আজীবন পঙ্গুত্ব বহন করার বিপরীতে কোনো ঘাতক বা ষড়যন্ত্রকারীর সাজা বহাল না থাকায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে গভীর হতাশা ও বিচারহীনতার বেদনা দানা বাঁধে।
প্রারম্ভিক তদন্তে রাজনৈতিক তছরুপ, জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে আসল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা, আলামত নষ্ট করা এবং পরবর্তীকালে আইনি প্রক্রিয়াগত গুরুতর ভুলের কারণেই ২২ বছর পর মামলাটিতে একটি সাজাও বহাল থাকল না। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে কার ষড়যন্ত্রে এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছিল এবং এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির প্রকৃত ন্যায়বিচার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেই প্রশ্নটি দেশের সর্বাধুনিক ইতিহাসে এক বিশাল শূন্যতা হিসেবে রয়ে গেল।
একনজরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা
২১ আগস্টের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা ও এর সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াবলীর একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয় ও দিক | সংক্ষিপ্ত তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ |
ঘটনার তারিখ ও স্থান | ২১ আগস্ট ২০০৪; বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ঢাকা (আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ)। |
মূল লক্ষ্যবস্তু | তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। |
অস্ত্রের ধরন | সামরিক গ্রেডের আর্জেস (Arges) গ্রেনেড ও তাজা বুলেটের ব্যবহার। |
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ | নিহত ২৪ জন (আইভি রহমান সহ); আহত ও পঙ্গু ৫ শতাধিক নেতাকর্মী। |
হামলাকারী মূল সংগঠন | হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি-বি); নেতৃত্বে মুফতি আব্দুল হান্নান। |
মূল অভিযুক্ত রাষ্ট্রীয় চরিত্র | লুৎফুজ্জামান বাবর, তারেক রহমান, আবদুস সালাম পিন্টু, গোয়েন্দা কর্মকর্তা (এনএসআই/ডিজিএফআই)। |
পলায়ন ও আশ্রয় | সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে মাওলানা তাজউদ্দিনের পলায়ন; যুক্তরাজ্যে ৯ জনের রাজনৈতিক আশ্রয়। |
তদন্তে বিভ্রান্তি | জজ মিয়া নাটক সাজানো, পুলিশের মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি ও আলামত ধ্বংসের চেষ্টা। |
আন্তর্জাতিক কনেকশন | আফগান যুদ্ধ ফেরত যোদ্ধা, জামায়াত-শিবির ক্যাডার, পাকিস্তানের আইএসআই (ISI) রসদ। |
সম্পূরক পরিবারগত অপরাধ | পিন্টু পরিবারের ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু কর্তৃক ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে সহায়তা প্রদান। |
বিচারিক ইতিহাস | ২০১৮ সালে ট্রাইব্যুনালে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১৯ জনের যাবজ্জীবন সাজা প্রদান; পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২০২৫ সালে উচ্চ আদালত ও সর্বোচ্চ আপিল বিভাগে অভিযুক্তদের খালাস প্রদান। |
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে আরো তথ্য
আর্জেস ৮৪ গ্রেনেডের সামরিক ধ্বংসক্ষমতা: ২১ আগস্টের হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো ছিল অস্ট্রিয়ান ডিজাইনে তৈরি এবং পাকিস্তানের 'ওয়াহ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি' (Wah Ordnance Factory)-তে উৎপাদিত 'আর্জেস ৮৪' (Arges 84) অ্যান্টি-পার্সোনেল ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড। এই গ্রেনেড বিস্ফোরণের সাথে সাথে এর বহিরাবরণ ছিন্নভিন্ন হয়ে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ ক্ষুদ্র সামুদ্রিক স্টিলের বল বা স্প্লিন্টার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,০০০ মিটার বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আর্জেস ৮৪ গ্রেনেড মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে খোলা জায়গায় থাকা শশত্রু পদাতিক বাহিনীকে একসাথে নিধন করার জন্য তৈরি। হামলার দিন জনসভায় ঘাতকেরা ১৩টি গ্রেনেড ছোঁড়ে। উদ্দেশ্য ছিল বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ না রেখে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের পুরো মানবজাতিকে নির্মূল করা।
হাওয়া ভবন ও ধানমন্ডির গোপন বৈঠকের সময়রেখা:
জুলাই ২০০৪ (হাওয়া ভবনের বৈঠক): হামলার প্রায় এক মাস আগে হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের উপস্থিতি ও সম্মতিতে একটি গোপন বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন হুজি প্রধান মুফতি হান্নান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই-এর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী।
আগস্ট ২০০৪ (সালাম পিন্টুর সরকারি বাসভবন): আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির সরকারি বাসভবনে চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী মাজেদ ভাটকে প্রশাসনিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর্জেস গ্রেনেডের চালান হস্তান্তর করেন পিন্টুর ভাই ও হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন।
হামলার দিন স্পেশাল রুট: নির্দেশ ছিল, হামলার পরপরই ঘাতকেরা যাতে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল এবং ধানমন্ডি অভিমুখে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারে, তার জন্য নির্দিষ্ট পথের পুলিশি নিরাপত্তা শিথিল রাখা হবে।
বিচারিক কমিশন, এফবিআই এবং তদন্ত ডাইভারশন: হামলার তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার পর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে নিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই কমিশন মাত্র ৩৬ দিনে একটি মনগড়া প্রতিবেদন তৈরি করে দাবি করে যে, "প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও দেশের ভেতরের শত্রু রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এই হামলা চালিয়েছে।"
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই (FBI) এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে তদন্তের জন্য ঢাকায় আনা হলেও সিআইডি ও পুলিশ গোয়েন্দারা তাদের আলামত দেখতে দেয়নি। উদ্ধারকৃত অবিস্ফোরিত গ্রেনেডগুলো তাদের পরীক্ষা করতে না দিয়ে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তড়িঘড়ি নিষ্ক্রিয় ও ধ্বংস করে আলামত নষ্ট করা হয়।
২০০৬ সালে জাতীয় পত্রিকার অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের টানা প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয় কীভাবে সাধারণ যুবক জজ মিয়াকে নোয়াখালী থেকে তুলে এনে সিআইডি কার্যালয়ে নির্যাতন করা হতো এবং তার পরিবারকে প্রতি মাসে সরকারের গোপন তহবিল থেকে টাকা পাঠিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হতো।
বীরত্বের মহাকাব্য-মেয়র হানিফ ও পিসিও মাহবুব: শেখ হাসিনাকে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার থেকে বাঁচাতে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা (পিসিও) মাহবুবুর রহমান নিজের শরীর দিয়ে ঢাল তৈরি করেছিলেন। গাড়ির দরজা খুলে নেত্রীকে ভেতরে তোলার মুহূর্তে ঘাতকদের ছোড়া বুলেট মাহবুবের মাথায় বিঁধে এবং তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
মঞ্চে গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হওয়া মাত্রই প্রবীণ নেতা ও ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ শেখ হাসিনাকে নিজের শরীর দিয়ে ঢেকে রাখেন। একের পর এক গ্রেনেডের স্প্লিন্টার মেয়র হানিফের মাথায় ও পিঠে বিঁধে যায়। পরবর্তীতে তাঁর মাথা থেকে বহু স্প্লিন্টার বের করা সম্ভব হয়নি, যার বিষক্রিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
প্রবীণ রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আব্দুর রাজ্জাক মারাত্মকভাবে আহত হন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শরীরে আমৃত্যু তিন শতাধিক স্প্লিন্টার রয়ে গিয়েছিল, যা বর্ষাকালে ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করতো।
খালেদা জিয়ার উপহাস: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “শেখ হাসিনাকে মারবে কে? শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে এসেছিলেন।” শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য কোটালিপাড়া যাওয়ার পথে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল। সে খবর প্রকাশ হওয়ার পরে খালেদা জিয়া সংসদে উপহাস করে বলেছিলেন, “আওয়ামীলীগ নিজেরাই হামলার নাটক সাজাচ্ছে। আগামী একশ বছরেও আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না।”
পাকিস্তানের আইএসআই ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান সংযোগ: ২০০৪ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামে ধরা পড়া ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানের সাথে ২১ আগস্টের গ্রেনেডের সুগভীর সংযোগ ছিল। উভয় চালানের মূল উৎস ছিল ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করা এবং বাংলাদেশের ভেতরে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
লশকর-ই-তৈয়বা ও আফগান রুট: হুজি নেতা ও পাকিস্তানি নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাটের স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সহায়তায় এই আর্জেস গ্রেনেডগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তান অঞ্চল থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এবং পরবর্তীতে সিলেটের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়।
ইতিহাসের অমোঘ দায় ও স্মৃতির চিরন্তন সত্য
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা সরকারের বদল কোনো অপরাধের ভয়াবহতাকে মুছে দিতে পারে না। ২১ আগস্টের রক্তস্নাত সড়ক, আইভি রহমানের ধুলোয় পড়ে থাকা নিথর দেহ, আদা চাচার শেষ মুহূর্তের ভালোবাসার আকুতি কিংবা রত্না আক্তার রুবির শরীরের ভেতর জমে থাকা শত শত স্প্লিন্টার কোনো রাজনৈতিক গল্প নয় এগুলো রক্তমাংসের সত্য।
ক্ষমতার রাজনীতিতে বিচারিক রায় নানা সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে ২১ আগস্টের বর্বরোচিত হামলার দায় কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে বার বার উগ্রবাদ ও অস্ত্রের মুখে থমকে দেওয়ার যে চক্রান্ত হয়েছিল, সেই সত্যকে জাগ্রত রাখা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। শহীদদের রক্ত আর পঙ্গুত্ব বরণকারী মানুষদের নীরব কান্না প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রাম কখনো থেমে যেতে পারে না।
তথ্যসূত্র:
ট্রাইব্যুনালের রায় (২০১৮): ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের ১০ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে ঘোষিত রায় (মামলা নম্বর: হত্যা মামলা নং-৩৯/২০০৮ এবং বিস্ফোরক মামলা নং-৪০/২০০৮)।
উচ্চ আদালতের রায় (২০২৪-২০২৫): হাইকোর্ট বিভাগের ১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের খালাসের রায় এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের চূড়ান্ত রায়।
সিআইডির চার্জশিট: বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কর্তৃক ৯ জুন ২০০৮-এ দাখিল করা প্রথম অভিযোগপত্র এবং ৩ জুলাই ২০১১-এ দাখিল করা সম্পূরক অভিযোগপত্র।
১৬৪ ধারার জবানবন্দি: ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় গৃহীত হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও অন্যান্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি।
সংবাদ সংস্থা ও জাতীয় দৈনিক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দৈনিক প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক জনকণ্ঠের ২০০৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বর্ষপূর্তিতে প্রকাশিত বিশেষ আর্কাইভ।
ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার: রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রত্না আক্তার রুবি ও দৌলতুন্নাহারসহ আহত ও শহীদদের পরিবার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অনুবেদন।















