>

>

কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, মিশর কিংবা গ্রিস) তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস অত্যন্ত নতুন। মাত্র পৌনে তিনশত বছর আগের একটি ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ১৩টি ছোট ও বিক্ষিপ্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু হওয়া একটি দেশ আজ পৃথিবীর একক পরাশক্তি (Global Hegemon)। কীভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনে থাকা একটি ভূখণ্ড পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

TruthBangla

কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

আজকের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি সত্য অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অনুশাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কোন দেশের? প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে কে সবার শীর্ষে? বৈশ্বিক মুদ্রা বাজার কার ইশারায় পরিচালিত হয়? কিংবা কোন দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও সমালোচনা হয়, অথচ সেই দেশের একটি ভিসার জন্য পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ মুখিয়ে থাকে?

এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর একটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States of America)

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, মিশর কিংবা গ্রিস) তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস অত্যন্ত নতুন। মাত্র পৌনে তিনশত বছর আগের একটি ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ১৩টি ছোট ও বিক্ষিপ্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু হওয়া একটি দেশ আজ পৃথিবীর একক পরাশক্তি (Global Hegemon)। কীভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনে থাকা একটি ভূখণ্ড পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তিতে পরিণত হলো?

এই বিশাল রূপান্তরের পেছনে কাজ করেছে ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, ভৌগোলিক অবস্থান, দুটি বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ, পেট্রোডলারের কূটনীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং অত্যন্ত চতুর পররাষ্ট্রনীতি। নিচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হওয়ার সেই রোমাঞ্চকর ও জটিল ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

কলোনাইজেশন থেকে স্বাধীনতা: একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম (১৪৯২ – ১৭৮৩)

আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের ইতিহাস রক্তক্ষয় এবং ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের ইতিহাসে ভরা।

ইউরোপীয় আগমন ও নেটিভ আমেরিকানদের ধ্বংসযজ্ঞ

১৪৯২ সালে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস (স্পেনের অর্থায়নে) আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ভুলবশত আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছান। ইউরোপীয়দের জন্য এটি ছিল 'নতুন পৃথিবী' (New World) আবিষ্কারের শুভসূচনা, কিন্তু আমেরিকার আদিবাসী নেটিভ আমেরিকান বা ‘রেড ইন্ডিয়ানদের’ জন্য এটি ছিল এক মহাবিপর্যয়ের সূচনা।

স্পেন, ফ্রান্স এবং গ্রেট ব্রিটেন একে একে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ দখল করতে শুরু করে। ইউরোপীয়দের সাথে আনা গুটিবসন্ত (Smallpox), হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মারণব্যাধি, যার বিরুদ্ধে আদিবাসীদের কোনো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না, এবং ইউরোপীয়দের অস্ত্র ও গণহত্যার মুখে প্রায় ৮০-৯০% নেটিভ আমেরিকান আদিবাসী বিলুপ্ত হয়ে যায়।

১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম

১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ার জেমসটাউনে ব্রিটেন তাদের প্রথম স্থায়ী উপনিবেশ স্থাপন করে। উত্তর আমেরিকার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে মূলত ব্রিটেনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়, আর দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল স্প্যানিশদের আধিপত্য (যার কারণে আজও পুরো লাতিন আমেরিকায় প্রধান ভাষা স্প্যানিশ)।

১৭৩২ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকায় ১৩টি আলাদা ব্রিটিশ অঙ্গরাজ্য বা কলোনি গড়ে ওঠে। ব্রিটেন যখন এই কলোনিগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় কর (যেমন স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, চা কর) চাপাতে শুরু করল, তখন 'No taxation without representation' (প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো কর নয়) নীতিতে সোচ্চার হয় কলোনিগুলো।

১৭৭৬ (৪ জুলাই): ১৩টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতৃত্ব দেন জর্জ ওয়াশিংটন এবং স্বাধীনতার মূল ঘোষণাপত্র রচনা করেন থমাস জেফারসন

১৭৮৩: আট বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর 'প্যারিস চুক্তি' (Peace of Paris)-র মাধ্যমে ব্রিটেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

ভূ-রাজনৈতিক সম্প্রসারণ ও ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’: মহাদেশীয় বিস্তার (১৭৮৩ – ১৮৬৭)

স্বাধীনতার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল ১৩টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাদের মাঝে কাজ করছিল এক উগ্র ও আত্মবিশ্বাসী ধারণা ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ (Manifest Destiny)। এই ধারণার মূল কথা ছিল সমগ্র উত্তর আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে নিজেদের শাসন ও গণতন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়া আমেরিকানদের ঐশ্বরিক দায়িত্ব।

ভূখণ্ড ক্রয়ের ইতিহাস

আমেরিকা কেবল যুদ্ধ করেই জমি দখল করেনি, কৌশলগতভাবে কিনেও নিয়েছে।

লুইজিয়ানা ক্রয় (১৮০৩): ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কাছ থেকে মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলারে বিশাল লুইজিয়ানা ভূখণ্ড কিনে নেয় আমেরিকা। এর ফলে রাতারাতি আমেরিকার ভূখণ্ডের আকার দ্বিগুণ হয়ে যায়।

আলাস্কা ক্রয় (১৮৬৭): রাশিয়ার জার সরকারের কাছ থেকে মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেওয়া হয় বিশাল বরফাবৃত ভূখণ্ড 'আলাস্কা'। সে সময় সমালোচকেরা একে "Seward's Folly" (তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সিওয়ার্ডের বোকামি) বললেও, পরবর্তীতে দেখা যায় আলাস্কা সোনা, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের বিশাল ভাণ্ডার।

মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধ (১৮৪৬ – ১৮৪৮)

১৮৩৬ সালে টেক্সাস অঙ্গরাজ্য মেক্সিকোর থেকে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হতে চায়। এর জের ধরে ১৮৪৬ সালে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৪৮ সালে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মেক্সিকো তাদের মোট ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি অংশ আমেরিকার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমেই জন্ম নেয় বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাডা, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা, ইউটা এবং কলোরাডোর মতো সম্পদশালী মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলো।

এই আগ্রাসী সম্প্রসারণ নীতি ও ভূখণ্ড দখলের ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই যুক্তরাষ্ট্র এক সুবিশাল আয়তন ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

বিশ্বযুদ্ধদ্বয় ও বিশ্ব অর্থনীতির মোড় পরিবর্তন (১৯১৪ – ১৯৪৫)

বিংশ শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধ পুরো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, আর ঠিক সেই সুযোগেই বিশ্বমঞ্চে মূল নায়ক হিসেবে উত্থান ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪ – ১৯১৮): অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন

ইউরোপ যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুনে জ্বলছিল, আমেরিকা তখন বহুদূরে নিজেদের মূল ভূখণ্ড অক্ষত রেখে অলস বসেছিল। আমেরিকা যুদ্ধের একদম শেষ মুহূর্তে (১৯১৭ সালে) বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে যোগ দেয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সৈন্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের শিল্পকারখানা, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি অক্ষত ছিল। যুদ্ধের সময় ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে বিশাল অঙ্কের ঋণ ও খাদ্য সরবরাহ করে আমেরিকা। ফলে যুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির ঋণদাতা দেশে (Creditor Nation) পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯ – ১৯৪৫): 'আর্সেনাল অব ডেমোক্রেসি' ও গোল্ড রিজার্ভ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাতেও আমেরিকা তাদের ঐতিহ্যবাহী 'বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি' (Isolationism) বজায় রাখে। তারা সরাসরি যুদ্ধে না নেমে উভয় পক্ষকে, বিশেষ করে মিত্রশক্তিকে (যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন) বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে থাকে, যা 'Lend-Lease Act' নামে পরিচিত।

আমেরিকার অস্ত্র কেনার জন্য ইউরোপের দেশগুলো গোল্ড বা সোনা দিয়ে অর্থ পরিশোধ করত। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত 'জিনোয়ার গোল্ড এক্সচেঞ্জ স্ট্যান্ডার্ড'-এর সুযোগ নিয়ে বিশ্বের মোট স্বর্ণ রিজার্ভের প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন কোষাগারে জমা হয়ে যায়।

১৯৪১ সালে জাপান মুক্ত মুক্তো পোতাশ্রয়ে (Pearl Harbor) হামলা চালালে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার মাধ্যমে যুদ্ধ সমাপ্তি ঘটায় আমেরিকা। বিশ্বযুদ্ধ শেষে যখন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগতভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছে, তখন পৃথিবীর একমাত্র সুস্থ ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকা পরাশক্তি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ব্রেটন উডস চুক্তি ও ডলারের একচ্ছত্র বিশ্ব শাসন (১৯৪৪)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগের বছর, ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে, বিশ্বের ৪৪টি মিত্র দেশের প্রতিনিধিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস (Bretton Woods) নামক স্থানে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনে মিলিত হন। লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা এবং একটি নতুন বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা তৈরি করা।

এই সম্মেলনের মাধ্যমেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে তিনটি শক্তিশালী সংস্থার জন্ম হয়:

আইএমএফ (International Monetary Fund - IMF): সদস্য দেশগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায়।

বিশ্বব্যাংক (World Bank): যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য।

গ্যাট (GATT): আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করার জন্য, যা পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিও (WTO)-তে রূপ নেয়।

ডলার কীভাবে বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি হলো?

ব্রেটন উডস সম্মেলনে স্থির হয় যে, বিশ্ব বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হবে মার্কিন ডলার। আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দেয় যে বিশ্বের যেকোনো দেশ ৩৫ ডলার জমা দিলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ তাকে ১ আউন্স খাঁটি সোনা ফেরত দেবে। আর পৃথিবীর অন্যান্য দেশ তাদের মুদ্রার মান ডলারের সাথে নির্দিষ্ট (Fixed exchange rate) করে রাখবে। এভাবে মার্কিন ডলার বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধানতম ও একমাত্র রিজার্ভ কারেন্সিতে পরিণত হয়।

নিক্সন শক ও পেট্রোডলার ব্যবস্থার উদ্ভব (১৯৭১ – ১৯৭৪)

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে বিপুল অর্থ অপচয় করে। এতে মার্কিনীরা অবাধে নতুন ডলার ছাপাতে শুরু করে। ইউরোপীয় দেশগুলো (বিশেষ করে ফ্রান্স) সন্দেহ করে যে, আমেরিকার কাছে যে পরিমাণ ডলার বাজারে ঘুরছে, সেই পরিমাণ সোনা তাদের ভল্টে নেই। ফলে ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশ ডলার ফেরত দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সোনা তুলে নিতে শুরু করে।

নিক্সন শক (১৯৭১)

আমেরিকার গোল্ড রিজার্ভ খালি হওয়ার আশঙ্কায় ১৫ আগস্ট ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ দেওয়ার অঙ্গীকার চিরতরে বাতিল করে দেন। ইতিহাসে এটি 'নিক্সন শক' (Nixon Shock) নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতন ঘটে এবং বিশ্বজুড়ে চালু হয় কাগজের মুদ্রার ওপর ভিত্তি করে 'ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট' (Floating Exchange Rate)।

স্বর্ণের ব্যাকআপ না থাকায় মার্কিন ডলারের দর মারাত্মকভাবে কমতে শুরু করে এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্য সংকটে পড়ে।

পেট্রোডলার চুক্তি (১৯৭৪)

এই অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এক মাস্টারপ্ল্যান বানান। ১৯৭৪ সালে আমেরিকা সৌদি আরবের সাথে একটি গোপন চুক্তি করে, যা ইতিহাসে ‘পেট্রোডলার চুক্তি’ নামে বিখ্যাত।

চুক্তির শর্ত: সৌদি আরব তাদের উৎপাদিত সমস্ত খনিজ তেল কেবল এবং একমাত্র মার্কিন ডলারে বিক্রি করবে।

আমেরিকার প্রতিশ্রুতি: বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজপরিবারকে পূর্ণ সামরিক নিরাপত্তা দেবে, তাদের আধুনিক অস্ত্র দেবে এবং যেকোনো শত্রুভাবাপন্ন দেশের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।

যেহেতু সৌদি আরব ছিল আন্তর্জাতিক তেল রফতানিকারক সংস্থা ওপেকের (OPEC) প্রধান নেতা, তাই তাদের দেখাদেখি অন্যান্য আরব দেশগুলোও কেবল ডলারে তেল বিক্রি করতে শুরু করে।

ফলাফল: পৃথিবীর যেকোনো দেশকে (তা সে চীন, ভারত বা জার্মানি হোক না কেন) তেল কিনতে হলে আগে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে হতো। ডলারের বিপরীতে স্বর্ণের ব্যাকআপ তুলে নেওয়া সত্ত্বেও, পৃথিবীর তেলের চাহিদাই ডলারের চাহিদাকে টিকিয়ে রাখল। কাগজ দিয়ে ছাপানো ডলার হয়ে উঠল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র!

স্নায়যুদ্ধ ও একক মেরু বিশ্বের জন্ম (১৯৪৭ – ১৯৯১)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতি দুটি ভাবাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক ব্লক, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী ব্লক। এই দুই পরাশক্তির প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ছাড়া প্রায় চার দশক ধরে চলা পরোক্ষ সংঘাতই হলো স্নায়যুদ্ধ বা Cold War

কৌশলগত নীতি ও জোট গঠন

কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকাতে আমেরিকা বেশ কিছু নীতি ও সামরিক জোট গঠন করে:

ট্রুম্যান নীতি (Truman Doctrine - ১৯৪৭): কোনো দেশ যেন কমিউনিস্টদের দখলে না যায়, সেজন্য তাদের আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দেওয়ার নীতি।

মার্শাল প্ল্যান (Marshall Plan): যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম ইউরোপকে পুনর্গঠনে ১২ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়ে সেখানে পুঁজিবাদের শেকড় শক্ত করা।

ন্যাটো (NATO - ১৯৪৯): নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন গঠন করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সামরিক নিরাপত্তাকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা।

প্রক্সি ওয়ার ও চরমপন্থা

সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘায়েল করতে আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছায়াযুদ্ধ (Proxy War) পরিচালনা করে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, তখন আমেরিকা (CIA), পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মাধ্যমে আফগান মুজাহিদদের কোটি কোটি ডলারের অর্থ ও স্টিনগার মিসাইলের মতো আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করে।

অবশেষে, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আফগানিস্তানে সামরিক পরাজয়ের কারণে ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অবসান ঘটে দীর্ঘ স্নায়যুদ্ধের। বিশ্ব রাজনীতি প্রবেশ করে একমেরু বিশ্বে (Unipolar World), যার একমাত্র অধিপতি হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মূল চালিকাশক্তি: পররাষ্ট্রনীতির ৮টি শক্তিশালী স্তম্ভ

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে তাদের আধিপত্য ধরে রাখল? মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো Defense, Diplomacy and Development বা ‘3D’। নিজেদের পরাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে তারা প্রধানত ৮টি স্তম্ভ ব্যবহার করে:

অতুলনীয় সামরিক সক্ষমতা (Military Supremacy)

আমেরিকার সামরিক বাজেট পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশ্ব সামরিক ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাকি ৯টি দেশের সম্মিলিত বাজেটের থেকেও আমেরিকার একক বাজেট বেশি!

বাজেট: কেবল ২০২১ সালেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক খাতে প্রায় ৮০১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।

গ্লোবাল নেটওয়ার্ক: পৃথিবীর ৮০টিরও বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫০টিরও বেশি সক্রিয় সামরিক ঘাঁটি (Military Base) রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সামরিক হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে ওয়াশিংটন।

বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বাণিজ্য (Arms Export)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স' (Military-Industrial Complex) বা অস্ত্র কারখানাগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের মোট অস্ত্র রফতানির ৪০ শতাংশের বেশি একা নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকা। নিজেদের অস্ত্র ব্যবসা চাঙ্গা রাখতে এবং ডলারের প্রভাব বজায় রাখতে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বজায় রাখে (যেমন: চীন-তাইওয়ান বিরোধ, ইউক্রেন যুদ্ধ, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত)।

বিশ্ব অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ (Financial Hegemony)

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ডব্লিউটিওর প্রধান কার্যালয় আমেরিকায় অবস্থিত এবং এই সংস্থাগুলোর ভোটিং পাওয়ারের সিংহভাগ আমেরিকানদের হাতে। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের প্রধান মাধ্যম SWIFT (Society for Worldwide Interbank Financial Telecommunication) সিস্টেমের ওপর পূর্ণ প্রভাব রয়েছে ওয়াশিংটনের। যেকোনো দেশকে অর্থনৈতিক স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাতারাতি পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে আমেরিকা।

তৃতীয় বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ ও নব্য-উপনিবেশবাদ (Neo-Colonialism)

সরাসরি দেশ দখল না করে অর্থনৈতিক ঋণের ফাঁদে ফেলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার নীতিই হলো নব্য-উপনিবেশবাদ। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ দেওয়ার সময় এমন সব কড়া শর্ত ও নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ওই দেশগুলোর বাজার আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং নীতি নির্ধারণে পশ্চিমা ব্লকের ওপর তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

সামরিক ও বাণিজ্যিক জোট গঠন (Strategic Alliances)

ইউরোপে ন্যাটো (NATO) ছাড়াও উদীয়মান পরাশক্তি চীনকে প্রতিহত করতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকা গঠন করেছে কোয়াড (QUAD), অকাস (AUKUS) এবং আইপিইএফ (IPEF)-এর মতো শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক জোট। জাতিসংঘের সাধারণ বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৫%) দেয় যুক্তরাষ্ট্র, যার ফলে জাতিসংঘের নীতি নির্ধারণেও তাদের পরোক্ষ প্রভাব কাজ করে।

মিডিয়া ও কালচারাল সফট পাওয়ার (Cultural Imperialism)

সফট পাওয়ার বা সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে আমেরিকার সমকক্ষ কেউ নেই। New York Times, Wall Street Journal, CNN, Fox News-এর মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করে। অন্যদিকে হলিউড চলচ্চিত্র, পপ মিউজিক, ম্যাকডোনাল্ডস, কোকা-কোলা সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের লাইফস্টাইল ও চিন্তাভাবনাকে আমেরিকান সংস্কৃতির অনুগামী করে তুলেছে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় একচ্ছত্র আধিপত্য (Tech Dominance)

প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক বিশ্ব অচল, আর প্রযুক্তির মূল চাবিকাঠি আমেরিকার হাতে। Apple, Microsoft, Google (Alphabet), Meta (Facebook), Amazon, Tesla, Intel, Nvidia-এর মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো আমেরিকার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, আমেরিকা তাদের জিডিপির প্রায় ৩.৪৫% (বছরে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি) কেবল গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় করে, যা বিশ্ব রেকর্ড।

মেধা আকর্ষণ ও অভিবাসন নীতি (Brain Drain & Meritocracy)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সফলতার অন্যতম বড় গোপন সূত্র হলো তারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেরা মেধাগুলোকে নিজের দেশে টেনে আনে। মার্কিন অভিবাসন নীতি সবসময় যোগ্য ও মেধাবীদের স্বাগত জানিয়েছে।

  • নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন জন্মসূত্রে জার্মান।

  • টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক জন্মসূত্রে দক্ষিণ আফ্রিকান।

  • গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

  • ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাভেদ করিম এবং স্টিভ চেন জন্মসূত্রে আমেরিকান নন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেধাবীদের এনে তাদের বিকাশ ঘটার সুযোগ দেওয়া এবং সেই মেধা দিয়ে নিজেদের দেশ গড়ে তোলাই আমেরিকান মেধার মূল দর্শন।

এক নজরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হয়ে ওঠার ঐতিহাসিক মাইলফলক

নিচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের ইতিহাস, প্রধান ঘটনা ও তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

সাল / সময়কাল

প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনা

কৌশলগত গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রভাব

১৪৯২

ক্রিস্টোফার কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কার

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা ও নেটিভ আমেরিকানদের বিলুপ্তি।

১৭৭৬ (৪ জুলাই)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা

১৩টি ব্রিটিশ কলোনি একত্রিত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে।

১৭৮৩

প্যারিস চুক্তি (Peace of Paris)

ব্রিটেন কর্তৃক মার্কিন স্বাধীনতা স্বীকার ও আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ।

১৮০৩

লুইজিয়ানা ক্রয় (Louisiana Purchase)

ফ্রান্সের থেকে বিশাল ভূখণ্ড ক্রয়ের মাধ্যমে আমেরিকার আয়তন রাতারাতি দ্বিগুণ হয়।

১৮৪৬ – ১৮৪৮

মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধ

মেক্সিকোকে পরাজিত করে ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনাসহ সমৃদ্ধ ভূখণ্ড দখল।

১৮৬৭

রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা ক্রয়

৭.২ মিলিয়ন ডলারে রাশিয়া থেকে আলাস্কা লাভ, যা বিশাল খনিজ সম্পদের উৎস হয়।

১৯১৪ – ১৯১৮

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ (১৯১৭)

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে ঋণ প্রদান করে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রধান ঋণদাতা দেশ হওয়া।

১৯৩৯ – ১৯৪৫

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হিরোশিমা-নাগাসাকি

যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের ৭০% গোল্ড রিজার্ভ অর্জন ও পারমাণবিক ক্ষমতার সূচনা।

১৯৪৪

ব্রেটন উডস চুক্তি (Bretton Woods)

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ গঠন এবং বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের স্বীকৃতি।

১৯৪৭ – ১৯৯১

স্নায়যুদ্ধ (Cold War) ও ন্যাটো গঠন

ক্যাপিটালিজম বনাম কমিউনিজম যুদ্ধ; বিশ্বজুড়ে প্রক্সি ওয়ার ও প্রভাব বিস্তার।

১৯৭১

নিক্সন শক (Nixon Shock)

ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল ও ফ্লোটিং কারেন্সির সূচনা।

১৯৭৪

পেট্রোডলার চুক্তি (Petrodollar Accord)

সৌদি আরবের সাথে চুক্তির মাধ্যমে খনিজ তেল ও ডলারের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপন।

১৯৯১

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন

দ্বিপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান এবং একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার উত্থান।

আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ কেবল দৃশ্যমান যুদ্ধ বা অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি গড়ে উঠেছে গোপন সামরিক প্রক্সি অপারেশন, মহাকাশ ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব এবং অস্ত্র উৎপাদনকারী জায়ান্টদের আঁতাতের ওপর।

মনরো ডকট্রিন ও 'দ্য বিগ স্টিক' কূটনীতি: লাতিন আমেরিকায় একচ্ছত্র রাজত্ব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে নামার আগে নিশ্চিত করেছিল যে তাদের নিজস্ব মহাদেশ অর্থাৎ সমগ্র আমেরিকা অঞ্চলে (উত্তর ও লাতিন আমেরিকা) অন্য কোনো ইউরোপীয় পরাশক্তি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

১৮২৩: মনরো নীতি (Monroe Doctrine)

১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো একটি ঐতিহাসিক নীতি ঘোষণা করেন। এতে বলা হয় ইউরোপীয় শক্তিগুলো যদি আমেরিকা মহাদেশের কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে বা নতুন কোনো উপনিবেশ গড়ার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে সরাসরি নিজেদের ওপর আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করবে। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব "পেছনের উঠান" (Backyard) বানিয়ে ফেলে।

থিওডোর রুজভেল্ট ও 'বিগ স্টিক' (Big Stick Diplomacy)

১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট মনরো নীতির সাথে নতুন শর্ত যুক্ত করেন (Roosevelt Corollary)। তাঁর বিখ্যাত নীতি ছিল: "Speak softly and carry a big stick; you will go far" (নম্রভাবে কথা বলো, কিন্তু হাতে একটি বড় লাঠি রাখো)।

এই নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পানামা খাল নির্মাণ নিশ্চিত করতে কলম্বিয়া থেকে পানামাকে আলাদা করে দেয় এবং ডোমিনিকান রিপাবলিক, হাইতি, নিকারাগুয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে নিজেদের অনুগত সরকার বসায়।

সিআইএ (CIA) ও গোপন অভ্যুত্থান কৌশল (Covert Operations & Regime Change)

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধে না গিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA) বিশ্বজুড়ে প্রক্সি যুদ্ধ ও গোপন সরকার পরিবর্তনের (Regime Change) পথ বেছে নেয়। কোনো দেশ যদি মার্কিন বা পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে নীতি গ্রহণ করত, তবে সিআইএ সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে অভ্যুত্থান ঘটাত।

ইরান (১৯৫৩ - Operation Ajax): ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক যখন দেশের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ (MI6) রাজপথে কৃত্রিম দাঙ্গা তৈরি করে মোসাদ্দেককে গ্রেপ্তার করে এবং মার্কিন অনুগত শাহকে ক্ষমতায় বসায়।

গুয়াতেমালা (১৯৫৪): আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি'-র স্বার্থ রক্ষা করতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জ্যাকোবো আরবেঞ্জকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়।

চিলি (১৯৭৩): গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে উৎখাত করতে চিলির অর্থনীতি স্তব্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সামরিক জান্তা জেনারেল অগাস্টো পিনোশেকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

মহাকাশ প্রতিযোগিতা ও আধুনিক ইন্টারনেটের জন্ম (Space Race & ARPANET)

প্রযুক্তিভিত্তিক সামরিক সক্ষমতাই যে পরাশক্তি হওয়ার মূল চাবিকাঠি, তা আমেরিকা খুব দ্রুত অনুধাবন করেছিল।

মহাকাশ প্রতিযোগিতা (Space Race)

১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ 'স্পুটনিক-১' মহাকাশে পাঠালে মার্কিন প্রশাসন বড় ধরনের ধাক্কা খায়। এর জবাবে ১৯৫৮ সালে গঠিত হয় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)

১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে নিল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন। এর মাধ্যমে আমেরিকা বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে।

আর্পানেট (ARPANET) ও ইন্টারনেট

আজকের বৈশ্বিক ইন্টারনেট মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক গোপন গবেষণার ফল। ১৯৬৯ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের DARPA (Advanced Research Projects Agency) প্রথম পারমাণবিক হামলার মুখেও যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম 'ARPANET' তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে এই প্রযুক্তিই সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে আজকের বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটে রূপ নেয়।

মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (Military-Industrial Complex)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি থাকার একটি প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশটির প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরকার ও সামরিক বাহিনীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক।

প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা (১৯৬১):

"আমাদের সরকার ও নীতি নির্ধারণে যেন অস্ত্র প্রস্তুতকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক বাহিনীর অশুভ আঁতাত (Military-Industrial Complex) অপ্রতিরোধ্য প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। এটি আমাদের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি।"

এই বেসরকারি অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক ফান্ড (Lobbying) প্রদান করে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করা, বিদেশে সামরিক সরঞ্জাম রফতানি করা এবং সামরিক বাজেট প্রতি বছর বৃদ্ধি করা মার্কিন নীতির স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছে।

আইভি লিগ, ইংরেজি ভাষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্স (Intellectual Hegemony)

সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির চেয়েও টেকসই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। বিশ্বজুড়ে নীতি নির্ধারণের যে ভাষা ও দর্শন, তা যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব কাঠামোর ভেতরে তৈরি করেছে।

আইভি লিগ ও বিশ্ববরেণ্য বিশ্ববিদ্যালয়

হার্ভার্ড, এমআইটি (MIT), স্ট্যানফোর্ড, ইয়েল, প্রিন্সটনের মতো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের মূল ধারা নির্ধারণ করে। বিশ্বজুড়ে শীর্ষ রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও আমলারা এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং দেশে ফিরে মার্কিন ঘরানার মুক্তবাজার নীতি ও ক্যাপিটালিজম বাস্তবায়ন করেন।

লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (Universal Language)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব বাণিজ্যে ব্রিটেনের জায়গা দখল করে আমেরিকা। ফলে ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিক ব্যবসা, বিজ্ঞান, বিমান চালনা ও সফটওয়্যারের একমাত্র সর্বজনীন ভাষায় রূপ নেয়।

২১ শতকে মার্কিন আধিপত্যের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

পৌনে তিনশত বছর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। একক পরাশক্তির দিন শেষ হয়ে বিশ্ব এখন বহুমেরুভিত্তিক (Multipolar World) ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ডি-ডলারাইজেশন (De-dollarization) & BRICS

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব ও ইরানকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস (BRICS) জোট এখন মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ব্যাংকিং খাতের ওপর যে ডলার স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তাতে অনেক উন্নয়নশীল দেশই ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করা শুরু করেছে।

চীন-আমেরিকা 'চিপ ওয়ার' (The Semiconductor War)

আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), যুদ্ধবিমান এবং স্মার্টফোনের প্রাণকেন্দ্র হলো মাইক্রোচিপ বা সেমিকন্ডাক্টর। তাইওয়ান ও চীনের ওপর সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে চরম স্নায়যুদ্ধ চলছে। আমেরিকা সম্প্রতি চীনের কাছে উচ্চপ্রযুক্তির 'Nvidia' এআই চিপ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে।

বিপুল পরিমাণ জাতীয় ঋণ (National Debt)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জাতীয় ঋণ বর্তমানে ৩৫ ট্রিলিয়ন (Trillion) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির বাজেটের একটি বড় অংশ কেবল এই ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যায়, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।

মার্কিন আধিপত্যের নেপথ্য উপাদান ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

নিচে মার্কিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অদৃশ্য অনুঘটকসমূহ এবং বর্তমানে সেগুলোর সামনে আসা হুমকি সংক্ষেপে সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

ক্ষমতার অদৃশ্য স্তম্ভ

মূল মার্কিন কৌশল ও পদ্ধতি

বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ / হুমকি

আঞ্চলিক প্রভাব (Monroe Doctrine)

লাতিন আমেরিকাকে নিজস্ব সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখা।

লাতিন আমেরিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ ও বামপন্থী সরকারের উত্থান।

গোপন কূটনীতি (CIA Covert Ops)

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ও অনুগত সরকার বসানো।

মাল্টিপোলার বিশ্বের কারণে সার্বভৌম দেশগুলোর মার্কিন হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান।

প্রযুক্তিগত আধিপত্য (Tech Dominance)

ইন্টারনেট, জিপিএস, এআই এবং বিগ ডেটা প্ল্যাটফর্মের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

চীন (Huawei, SMIC) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর প্রযুক্তিগত রেগুলেশন।

সামরিক-শিল্প আঁতাত (Military Complex)

বিশ্বজুড়ে সংঘাত বজায় রেখে বিশাল অস্ত্র শিল্পকে চাঙ্গা রাখা।

রাশিয়া ও চীনের হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি।

মুদ্রার একক শাসন (Petrodollar)

তেলের বাজার ও বৈশ্বিক লেনদেন কেবল ডলারে সীমাবদ্ধ রাখা।

ব্রিকস (BRICS) জোটের স্থানীয় মুদ্রায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস বাণিজ্য।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ইতিহাসে এমন এক অভূতপূর্ব সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, যার সামরিক উপস্থিতি পৃথিবীর আকাশে, সাগরে, মহাকাশে এবং এমনকি সাইবার স্পেসেও সমানভাবে বিদ্যমান। তাদের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি ছিল সুদূরপ্রসারী কৌশল, বুদ্ধিবৃত্তিক মেধাভিত্তিক অভিবাসন নীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং অত্যন্ত নির্মম কূটনীতির সমষ্টি।

বহুমেরু বিশ্বের চ্যালেঞ্জ ও ২১ শতকে মার্কিন আধিপত্যের ভবিষ্যৎ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের গল্পটি একদিকে যেমন কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল, মেধার মূল্যায়ন ও উদ্ভাবনের গল্প; অন্যদিকে এটি সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা, অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ, রক্তপাত ও অর্থনৈতিক শোষণের ইতিহাস।

আজকে ২১ শতকে এসে প্রশ্ন উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একক আধিপত্য কি চিরস্থায়ী?

বর্তমানে বিশ্বরাজনীতি দ্রুত বহুমেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার (Multipolar World) দিকে ধাবিত হচ্ছে। উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন সামরিক ও প্রযুক্তিতে আমেরিকাকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে। রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন, ব্রিকস (BRICS) জোটের উত্থান, এবং বিশ্বজুড়ে ডলারের ব্যবহার কমানোর প্রক্রিয়া বা 'ডি-ডলারাইজেশন' (De-dollarization) মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে।

তবে ইতিহাস প্রমাণ করে আমেরিকার পতন বা বিকল্প এত সহজে সম্ভব নয়। কারণ মার্কিন আধিপত্য কেবল কতগুলো ট্যাংক বা মিসাইলের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি বিশ্ব অর্থব্যবস্থা, বৈশ্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামো, গণমাধ্যম এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার শেকড়ে গভীরভাবে প্রোথিত। চীন বা অন্য যেকোনো পরাশক্তি হয়তো অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার কাছাকাছি যেতে পারবে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে 'সফট পাওয়ার' ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে, তা অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন।

সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে বহু পরাশক্তির উত্থান-পতন ঘটেছে, কিন্তু মাত্র দুইশত বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন এক ভূখণ্ড থেকে উঠে এসে গোটা বিশ্বকে নিজের অনুশাসনে পরিচালনা করার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গল্পটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল অধ্যায় হিসেবে চিরকাল টিকে থাকবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jul 25, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।

Jul 25, 2026

/

Post by

বিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রের সরকার পতন কিংবা কোনো অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য যে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন, ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমানের মহড়া চালানো হতো বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেই কৌশল প্রায় অপ্রচলিত। সামরিক আক্রমণের বদলে এখন জায়গা করে নিয়েছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্যের কারসাজি এবং তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের মোড়কে রাষ্ট্র ধ্বংসের সূক্ষ্ম চক্রান্ত। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা চলে ‘মেটিউকুলাস ডিজাইন’ (Meticulous Design)।

Jul 24, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই দুটি রাষ্ট্র গত পৌনে এক শতাব্দী ধরে এক অবিরাম বৈরিতা, সীমান্ত সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। যে স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে উপমহাদেশে দুটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার পেছনে ছিল ১৯৪৭ সালের বিভাজনের এক অভিশপ্ত মানবিক ট্র্যাজেডি যেখানে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটিচ্যুত হয় এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

Jul 21, 2026

/

Post by

বিগত বছরগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তরের অসংখ্য নেতার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, পরকীয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাবালিকা ও তরুণীদের শোষণ এবং গোপনে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের একের পর এক অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এসেছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের যুগে যখন গোপন কক্ষের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন উন্মোচিত হচ্ছে এই ধর্মীয় লেবাসধারীদের আসল রূপ।

Jul 21, 2026

/

Post by

২০২৬ সালের জুলাই মাস। গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামে দেখছি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কিংবা নানাবিধ ছাত্র সংগঠনের ব্যানার নিয়ে হাজার হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছ। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের একটি নিরীহ দাবি দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজ তা হঠাৎ করেই ভারতের পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাও এবং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক সরকার পতনের এক চরমপন্থী রূপ নিচ্ছে। তোমাদের এই উত্তপ্ত মিছিল, তোমাদের স্লোগান, আর ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া তোমাদের বৈপ্লবিক আবেগ দেখে আমার আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

Jul 19, 2026

/

Post by

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার কিছু উগ্র ডানপন্থী বা হিন্দুত্ববাদী মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একধরনের আক্রমণাত্মক বাগাড়ম্বর বা লম্ফঝম্ফ লক্ষ্য করা যায়। সেখানে প্রায়ই দাবি করা হয় ভারত একটি পারমাণবিক পরাশক্তি, তাই তারা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দিতে বা দখল করে নিতে পারে।

Jul 25, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সেনাপ্রধানদের সর্বময় ক্ষমতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশটি প্রায় পাঁচ দশক কাটিয়েছে সরাসরি সামরিক স্বৈরাচারদের অধীনে। আর অবশিষ্টাংশ সময়তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক শাসন' কায়েম থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতর (GHQ)।

Jul 25, 2026

/

Post by

বিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রের সরকার পতন কিংবা কোনো অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য যে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন, ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমানের মহড়া চালানো হতো বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেই কৌশল প্রায় অপ্রচলিত। সামরিক আক্রমণের বদলে এখন জায়গা করে নিয়েছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্যের কারসাজি এবং তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের মোড়কে রাষ্ট্র ধ্বংসের সূক্ষ্ম চক্রান্ত। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা চলে ‘মেটিউকুলাস ডিজাইন’ (Meticulous Design)।

Jul 24, 2026

/

Post by

১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই দুটি রাষ্ট্র গত পৌনে এক শতাব্দী ধরে এক অবিরাম বৈরিতা, সীমান্ত সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। যে স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে উপমহাদেশে দুটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার পেছনে ছিল ১৯৪৭ সালের বিভাজনের এক অভিশপ্ত মানবিক ট্র্যাজেডি যেখানে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটিচ্যুত হয় এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

Jul 21, 2026

/

Post by

বিগত বছরগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তরের অসংখ্য নেতার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, পরকীয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাবালিকা ও তরুণীদের শোষণ এবং গোপনে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের একের পর এক অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এসেছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের যুগে যখন গোপন কক্ষের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন উন্মোচিত হচ্ছে এই ধর্মীয় লেবাসধারীদের আসল রূপ।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.