ভারত-পাকিস্তানের যত যুদ্ধ যত সংঘাত - দক্ষিণ এশিয়ার রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই দুটি রাষ্ট্র গত পৌনে এক শতাব্দী ধরে এক অবিরাম বৈরিতা, সীমান্ত সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। যে স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে উপমহাদেশে দুটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার পেছনে ছিল ১৯৪৭ সালের বিভাজনের এক অভিশপ্ত মানবিক ট্র্যাজেডি যেখানে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটিচ্যুত হয় এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

TruthBangla

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তি। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই দুটি রাষ্ট্র গত পৌনে এক শতাব্দী ধরে এক অবিরাম বৈরিতা, সীমান্ত সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। যে স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে উপমহাদেশে দুটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার পেছনে ছিল ১৯৪৭ সালের বিভাজনের এক অভিশপ্ত মানবিক ট্র্যাজেডি যেখানে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটিচ্যুত হয় এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এই ঐতিহাসিক বিভাজনের পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও বৈরিতা। আর এই চিরন্তন শত্রুতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে বরফাবৃত সুন্দর কিন্তু ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মির।
পারমাণবিক অস্ত্রাগার গড়ে তোলার পর এই দুটি দেশের সীমান্ত সংঘাত কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আঞ্চলিক বিরোধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা প্রসারিত হয়েছে প্রক্সি ওয়ার (Proxy War), জলবণ্টন চুক্তি, কূটনৈতিক স্নায়যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলার জটিল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই দুই দেশের মধ্যকার সকল প্রধান যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত, প্রক্সি যুদ্ধ ও পারমাণবিক উত্তেজনার এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ: কাশ্মির সংকটের সূচনা
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত যখন বিভক্ত হয়, তখন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫৬৫টি স্বাধীন বা আধা-স্বাধীন দেশীয় রাজ্য (Princely States) বিদ্যমান ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের নীতি অনুসারে, এসব রাজ্যকে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যার ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো একটি রাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার অথবা স্বাধীন থাকার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
বেশিরভাগ রাজ্য সহজ সিদ্ধান্ত নিলেও জটিলতা তৈরি হয় জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যকে ঘিরে। অঞ্চলটির প্রায় ৮০% মানুষ ছিলেন মুসলিম, কিন্তু এর শাসক ছিলেন হিন্দু মহারাজা হরি সিং। মহারাজা হরি সিং তাৎক্ষণিকভাবে ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং উভয় দেশের সাথে 'স্ট্যান্ডস্টিল এগ্রিমেন্ট' (Standstill Agreement) স্বাক্ষরের চেষ্টা করেন। পাকিস্তান এই চুক্তিতে সম্মতি দিলেও ভারতে যোগদানের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
অপারেশন্স এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি
১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সমর্থিত পশতুন উপজাতি (লশকর) এবং স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী কাশ্মিরে অনুপ্রবেশ করে। 'অপারেশন গুলমার্গ' নামে পরিচিত এই অভিযানের মাধ্যমে তারা মুজাফফরাবাদ পার হয়ে রাজধানী শ্রীনগরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। উপজাতীয়দের হাতে ব্যাপক লুণ্ঠন ও সহিংসতার মুখে মহারাজা হরি সিং আতঙ্কিত হয়ে ভারতের সামরিক সহায়তা প্রার্থনা করেন।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কাশ্মির আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত না হলে ভারতীয় সেনা পাঠানো আইনিভাবে অসম্ভব। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং ভারতে যোগদানের দলিলে (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন।
পরদিনই অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর ভারতীয় বিমান বাহিনী শ্রীনগরে সৈন্য অবতরণ করায়। ভারতীয় বাহিনী আক্রমণকারীদের পিছু হঠাতে শুরু করে এবং কাশ্মির উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর জবাবে পাকিস্তান তাদের নিয়মিত সেনাবাহিনী পূর্ণাঙ্গভাবে যুদ্ধে নামায়। ফলে এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রথম পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC)
যুদ্ধ যখন উভয় পক্ষের জন্য দীর্ঘায়িত রূপ নিচ্ছিল, তখন ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি ভারত বিষয়টিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যায়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ৪৮ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে বলা হয়েছিল:
১. উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি পালন করতে হবে।
২. পাকিস্তানকে তাদের সকল সৈন্য ও উপজাতীয় যোদ্ধা সরিয়ে নিতে হবে।
৩. ভারত তার সেনাসংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে কমিয়ে আনবে।
৪. জনগণের মতামতের ভিত্তিতে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণভোট (Plebiscite) অনুষ্ঠিত হবে।
তবে কোনো পক্ষই জাতিসংঘের শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। পাকিস্তান তাদের সেনা প্রত্যাহার করেনি, ফলে ভারতও গণভোটের আয়োজন থেকে বিরত থাকে। যুদ্ধ বিরতির ফলে জম্মু-কাশ্মিরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল (কাশ্মির উপত্যকা, জম্মু ও লাদাখ) ভারতের অধীনে থাকে এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল (আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান) পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই যুদ্ধবিরতি রেখাটিই পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তির মাধ্যমে 'লাইন অব কন্ট্রোল' (LoC) বা নিয়ন্ত্রণ রেখা হিসেবে স্বীকৃত পায়।
১৯৬৫ সালের দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ: ট্যাঙ্ক যুদ্ধ ও তাসখন্দ চুক্তি
১৯৪৭ সালের প্রথম যুদ্ধের পর এক দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে এক থমথমে পরিবেশ বজায় ছিল। তবে ১৯৬৫ সালের প্রথম দিকে গুজরাটের সীমানা সংলগ্ন 'রান অব কাচ্ছ' (Rann of Kutch) অঞ্চলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু হয়। সেখানে স্থানীয় সামরিক সাফল্য লাভ করার পর পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের মাঝে ধারণা তৈরি হয় যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে পরাজয়ের পর সামরিকভাবে বেশ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কাশ্মিরকে জোরপূর্বক দখলের একটি গোপন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী 'অপারেশন জিব্রালটার' (Operation Gibraltar) শুরু করে। এর অধীনে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সৈন্য ও গেরিলা সদস্যকে ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে অনুপ্রবেশ করানো হয়, যাতে তারা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে।
তবে পাকিস্তানি কৌশলবিদদের হিসাব নিকাশে ভুল ছিল। স্থানীয় কাশ্মিরিরা পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন না দিয়ে বরং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের অবস্থান প্রকাশ করে দেয়। ভারত তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে হাজিপীর পাসসহ বেশ কিছু কৌশলগত পাহাড়ি ঘাঁটি দখল করে নেয়।
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ও 'অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম'
জবাবে পাকিস্তান ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালে জম্মু খাতের আখণুর লক্ষ্য করে 'অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম' নামে একটি বিশাল সাঁজোয়া আক্রমণ চালায়, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সাথে কাশ্মিরের যোগাযোগ পথ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
পরিস্থিতির গাম্ভীর্য অনুধাবন করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী যুদ্ধের পরিধি কেবল কাশ্মিরে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান শহর লাহোর এবং শিয়ালকোট সেক্টরে সরাসরি আক্রমণ চালায়। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সশস্ত্র সংঘাতের একটিতে পরিণত হয়।
চাউইন্ডার যুদ্ধ (Battle of Chawinda): শিয়ালকোটের কাছে অবস্থিত চাউইন্ডাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ট্যাঙ্ক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ ট্যাঙ্ক এই যুদ্ধে সরাসরি মুখোমুখি হয়।
আকাশযুদ্ধ ও নৌসংঘাত: উভয় দেশের বিমান বাহিনী (IAF ও PAF) ব্যাপক বিমান যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পাকিস্তান নৌবাহিনী ভারতের গুজরাট উপকূলীয় শহর দ্বারকায় আক্রমণ চালায় (অপারেশন দ্বারকা)।
যুদ্ধবিরতি ও তাসখন্দ ঘোষণা
১৭ দিনব্যাপী চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয় পক্ষের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভারতের সেনাবাহিনী লাহোরের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়, অন্যদিকে পাকিস্তানও ভারতীয় ভূখণ্ডের কিছু অংশ দখল করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক ও সামরিক রসদ কোনো দেশেরই ছিল না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে ২২ সেপ্টেম্বর উভয় দেশ যুদ্ধবিরতি স্বীকার করে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় উজবেকিস্তানের তাসখন্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে ঐতিহাসিক 'তাসখন্দ ঘোষণা' (Tashkent Declaration) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ যুদ্ধের পূর্ববর্তী সীমান্তে (৫ আগস্ট ১৯৬৫-এর অবস্থান) ফিরে যেতে রাজি হয় এবং বিজিত ভূখণ্ড একে অপরকে ফেরত দেয়। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাসখন্দেই রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানের মানচিত্র সংশোধন
১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ছিল পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। এটি কেবল কাশ্মিরকেন্দ্রিক সংঘাত ছিল না, বরং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনগণের স্বাধিকার আন্দোলন ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-সামাজিক বৈষম্যের একটি চূড়ান্ত পরিণতি।
১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈষম্য চাপিয়ে দেয়। এই বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলন গড়ে তোলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন) অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।
২৫ মার্চের গণহত্যা ও ভারতের পরোক্ষ ভূমিকা
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ডাক দেন। পাকিস্তান সামরিক জান্তা আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার মুখে প্রায় ১ কোটি বাঙালি শরণার্থী হিসেবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে আশ্রয় নেয়। এই অভূতপূর্ব শরণার্থী সংকট ভারতের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী উপলব্ধি করেন যে, এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ভারত বাংলাদেশকে মানবিক সাহায্য, আশ্রয় প্রদানের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী 'মুক্তিবাহিনী'কে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও কৌশলগত সহায়তা দিতে শুরু করে।
'অপারেশন চেঙ্গিজ খান' ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা
দীর্ঘ আট মাস ধরে ভারত পটভূমিতে থেকে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক জানতেন যে ভারত তাদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করছে। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ অপরাহ্নে পাকিস্তান বিমান বাহিনী 'অপারেশন চেঙ্গিজ খান' নাম দিয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ১১টি বিমানঘাঁটিতে (যার মধ্যে অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, যোধপুর অন্তর্ভুক্ত ছিল) আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। এর মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চতুর্থ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়।
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। জবাবে পাকিস্তান ভারতের সাথে তাদের সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
যুদ্ধক্ষেত্র: পূর্ব ও পশ্চিম ফ্রন্ট এবং পরাশক্তিদের ভূমিকা
১৯৭১ সালের যুদ্ধটি দুটি প্রধান থিয়েটারে পরিচালিত হয়েছিল:
পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) থিয়েটার: ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড (মিত্রবাহিনী) দ্রুত গতিতে পূর্ব পাকিস্তানের চারিদিক থেকে ঢাকা অভিমুখে ঘিরে ফেলে। পাকিস্তান বাহিনী তাদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে আটকে থাকলেও মিত্রবাহিনী নদীমাতৃক বাংলাদেশের কৌশলগত পথগুলো বাইপাস করে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
পশ্চিম ফ্রন্ট: ভারতের পশ্চিম সীমান্তে (রাজস্থান, পাঞ্জাব ও কাশ্মির) পাকিস্তান সেনাবাহিনী তীব্র আক্রমণ চালায় যেন ভারতে চাপ সৃষ্টি করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মনোযোগ সরানো যায়। রাজস্থানের লঙ্গেওয়ালার যুদ্ধে (Battle of Longewala) ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বিশাল সাঁজোয়া ডিভিশনের আক্রমণ রুখে দিয়ে বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনীতি: এই যুদ্ধে বিশ্ব রাজনীতি দুটি স্পষ্ট ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার) এবং চীন সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌ অবরোধ ভাঙতে এবং ভারতকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখতে তাদের পরমাণুবাহী সপ্তম নৌবহর (US 7th Fleet) প্রেরণ করে। অন্যদিকে, ভারত ১৯৭১ সালের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে 'ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি' স্বাক্ষর করেছিল। এর অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের পারমাণবিক সাবমেরিন ও নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পাঠায় মার্কিন পদক্ষেপ প্রতিহত করার জন্য এবং জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে আনা সকল মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে।
পরাজয়, আত্মসমর্পণ ও শিমলা চুক্তি
মাত্র ১৩ দিনের তীব্রতম যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী ৯৩,০০০ সৈন্যসহ মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন।
এর মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যের আত্মসমর্পণের ঘটনা এটাই প্রথম ছিল। ১৭ ডিসেম্বর পশ্চিম সীমান্তেও উভয় দেশ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
১৯৭২ সালের মে মাসে ভারতের হিমাচল প্রদেশের শিমলায় ইন্দিরা গান্ধী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে ঐতিহাসিক 'শিমলা চুক্তি' (Simla Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল:
১৯৪৯ সালের জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতি রেখাকে সামান্য সংশোধন করে 'লাইন অব কন্ট্রোল' (LoC) নামে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। উভয় দেশ তাদের সমস্ত বিরোধ দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে সম্মত হয়, কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ব্যতিরেকে। ভারত আটককৃত ৯৩,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে (POW) মুক্তি দেয়।
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ: পরমাণু বোমার ছায়ায় প্রথম সংঘাত
১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত (পোখরান-২) এবং পাকিস্তান (চাগাই-১) পর পর সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশঙ্কা করেছিল যে, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের ফলে দেশ দুটির মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যাবে।
এই আশাকে আরও জোরদার করে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী বাসে চড়ে লাহোর সফর করেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সাথে ঐতিহাসিক 'লাহোর ঘোষণা' স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এই শান্তিপ উদ্যোগের আড়ালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক গোপন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছিল।
'অপারেশন বদর' ও কৌশলগত অনুপ্রবেশ
১৯৯৮-৯৯ সালের শীতকালে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের নির্দেশে পাকিস্তান সেনার নর্দার্ন লাইট ইনফ্যান্ট্রি (NLI) এবং কাশ্মীরি মিলিশিয়ারা গোপনে নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখণ্ডের কার্গিল, ড্রাস, বাতালিক এবং কাকসার খাতের উঁচু পাহাড়ি পর্যবেক্ষণ পোস্টগুলো দখল করে নেয়।
ঐতিহ্যগতভাবে, তীব্র শীতের সময় (মাইনাস ৩০-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা) উভয় দেশই এই চরম দুর্গম পাহাড়ি পোস্টগুলো ত্যাগ করত এবং বসন্তে পুনরায় তা দখল করত। তবে ১৯৯৯ সালের মে মাসে স্থানীয় ভেড়া পালনকারী রাখালরা ভারতীয় সেনাকে খবর দেয় যে, খালি পড়ে থাকা উঁচু চূড়াগুলোতে অপরিচিত সশস্ত্র বাহিনী অবস্থান করছে।
পাকিস্তানি বাহিনীর মূল কৌশলগত লক্ষ্য ছিল শ্রীনগর থেকে লেহ্ সংযোগকারী জাতীয় মহাসড়ক (NH-1D) কে তাদের কামানের আওতায় নিয়ে আসা, যাতে ভারতীয় সামরিক বাহিনী লাদাখ ও চিয়াচেন হিমবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কাশ্মির ইস্যু পুনরায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া: 'অপারেশন বিজয়' ও 'অপারেশন সাদা সাগর'
অনুপ্রবেশের সত্যতা উন্মোচিত হওয়ার পর ভারত সরকার পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয় 'অপারেশন বিজয়' (Operation Vijay)। ভারতীয় বিমান বাহিনী পাঠায় 'অপারেশন সাদা সাগর'।
উচ্চভূমির যুদ্ধ (High Altitude Warfare): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬,০০০ থেকে ১৮,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থানরত সুরক্ষিত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। পাকিস্তানি সেনারা পাহাড়ের চূড়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, আর ভারতীয় বাহিনীকে খালি গায়ে খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে হচ্ছিল।
বোফোর্স কামানের ভূমিকা: ভারতের মিডিয়া এই যুদ্ধ সরাসরি কভার করে, যা বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হয়। এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী বোফোর্স (Bofors) ১৫৫ মিমি হাওইটজার কামান প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর ধ্বংসাত্মক গোলাবর্ষণ করে।
টাইগার হিল ও তোলোলিং দখল: ভারতীয় পদাতিক বাহিনী, বিশেষ করে রাজপূত রাইফেলস, গ্রেনেডিয়ার্স এবং গোর্খা রেজিমেন্ট অভূতপূর্ব সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একে একে তোলোলিং (Tololing) ও টাইগার হিল (Tiger Hill) পুনর্দখল করে।
কূটনৈতিক চাপ ও পাকিস্তানের পিছু হঠা
ভারত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্দেশ দিয়েছিল যে তাদের কোনো বিমান বা সৈন্য যেন আন্তর্জাতিক সীমান্ত বা নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) অতিক্রম না করে। ভারতের এই দায়িত্বশীল আচরণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসা কুড়ায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ৪ জুলাই ১৯৯৯ সালে ওয়াশিংটনে জরুরি ভিত্তিতে ডাকা এক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে স্পষ্ট জানান যে, পাকিস্তানকে অনতিবিলম্বে LoC-এর ওপারে সেনারহস্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সামরিক পরাজয়ের মুখে পাকিস্তান সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২৬ জুলাই ১৯৯৯ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্গিল যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা দেয়। এই দিনটি ভারতে 'কার্গিল বিজয় দিবস' হিসেবে উদযাপিত হয়।
প্রক্সি ওয়ার, সন্ত্রাসী হামলা ও সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়া (২০০০ - বর্তমান)
কার্গিল যুদ্ধের পর সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না হলেও, দুই দেশের সংঘাত এক নতুন রূপ নেয় যাকে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় 'নিম্ন মাত্রার সংঘাত' (Low-Intensity Conflict) বা প্রক্সি ওয়ার। ভারত অভিযোগ করে আসছে যে, পাকিস্তান তাদের 'স্টেট স্পনসরড টেররিজম' বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে (যেমন: লস্কর-ই-তৈয়বা, জৈশ-ই-মোহাম্মদ) ব্যবহার করে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়মিত রক্তপাত ঘটাচ্ছে।
প্রধান প্রধান সন্ত্রাসী হামলা ও সংঘাতসমূহ
চিয়াচেন সংঘাত (১৯৮৪-বর্তমান): ১৯৮৪ সালে ভারত 'অপারেশন মেঘদূত' চালিয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র চিয়াচেন হিমবাহ (Siachen Glacier) দখল করে নেয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০,০০০ ফুটেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই হিমবাহের আধিপত্য নিয়ে এখনও উভয় দেশের মধ্যে ছোটখাটো সংঘাত বজায় রয়েছে।
কাশ্মীর বিধানসভা ও ভারতীয় সংসদে হামলা (২০০১):
২০০১ সালের অক্টোবরে শ্রীনগরে কাশ্মীর বিধানসভা ভবনে আত্মঘাতী হামলায় ৩৮ জন নিহত হয়।
২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের জাতীয় সংসদ ভবনে জৈশ-ই-মোহাম্মদ ও লস্কর-ই-তৈয়বার সশস্ত্র জঙ্গিরা হামলা চালায়। এই ঘটনার পর ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সীমান্তে প্রায় ৫ লাখ সৈন্য মোতায়েন করে (অপারেশন পরাক্রম), যা দুই দেশকে পুনরায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
সমঝোতা এক্সপ্রেস বিস্ফোরণ (২০০৭): ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংযোগকারী ঐতিহাসিক 'সমঝোতা এক্সপ্রেস' ট্রেনে বোমা হামলায় ৬৮ জন সাধারণ যাত্রী নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক।
২০০৮ মুম্বাই হামলা (২৬/১১): ২৬ নভেম্বর ২০০৮ সালে লস্কর-ই-তৈয়বার ১০ জন সশস্ত্র জঙ্গি সমুদ্রপথে ভারতের মুম্বাই শহরে প্রবেশ করে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস, তাজমহল প্যালেস হোটেল, ওবেরয় ট্রাইডেন্ট এবং নরিমান হাউসে একযোগে হামলা চালায়। ৬০ ঘণ্টা ধরে চলা এই নৃশংস হামলায় ১৬৬ জন নিহত এবং ৩০০ এর বেশি মানুষ আহত হন। এই ঘটনা ভারত-পাকিস্তানের সমস্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও ক্রিকেটীয় সম্পর্ককে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়।
পাঠানকোট বিমানঘাঁটি হামলা (২০১৬): ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পাঞ্জাবের পাঠানকোট ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে চার দিন ধরে চলা জঙ্গি হামলায় ৭ জন ভারতীয় নিরাপত্তা সদস্য প্রাণ হারান।
উরি হামলা ও ভারতের 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' (২০১৬): ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের উরিতে একটি সেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় ১৯ জন ভারতীয় জোয়ান শহীদ হন। ১০ দিন পর, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) অতিক্রম করে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের অভ্যন্তরে কথিত 'জঙ্গি লঞ্চ প্যাড'গুলোতে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' (Surgical Strike) চালানোর দাবি করে। পাকিস্তান তবে এরকম কোনো হামলার দাবি অস্বীকার করে এবং এটিকে সাধারণ সীমান্ত গোলাবর্ষণ বলে উল্লেখ করে।
পুলওয়ামা হামলা ও বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক (২০১৯): ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পুলওয়ামায় ভারতীয় সিআরপিএফ (CRPF) কনভয়ে জৈশ-ই-মোহাম্মদের এক আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জন জওয়ান নিহত হন।
এর জবাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত খাইবার পাখতুনখোয়ার বালাকোটে প্রবেশ করে জৈশ-ই-মোহাম্মদের প্রশিক্ষণ শিবিরে 'প্রিমেপ্টিভ এয়ারস্ট্রাইক' চালায়। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম ভারতীয় বিমান সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালায়।
পরদিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বিমান বাহিনীও ভারতীয় কাশ্মিরে আকাশপথে জবাব দেয়। এই আকাশযুদ্ধে ভারতের একটি মিগ-২১ (Mig-21) বিমান ভূপাতিত হয় এবং ভারতীয় উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্ধমান পাকিস্তানের হাতে বন্দী হন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপে এবং উত্তেজনা হ্রাসের লক্ষ্যে পাকিস্তান ১ মার্চ অভিনন্দনকে সসম্মানে ভারতের কাছে হস্তান্তর করে।
এক নজরে ভারত-পাকিস্তানের প্রধান সামরিক সংঘাতের ইতিহাস
নিচে ১৯৪৭ সাল থেকে পরিচালিত ভারত-পাকিস্তানের প্রধান প্রধান যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের একটি সারসংক্ষেপ সারণী আকারে উপস্থাপন করা হলো:
যুদ্ধের নাম / সংঘাত | সময়কাল | মূল কারণ ও স্থান | সামরিক ও কূটনৈতিক ফলাফল | ঐতিহাসিক গুরুত্ব |
প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ | ১৯৪৭ - ১৯৪৯ (১৫ মাস) | কাশ্মিরের মহারাজা হরি সিংয়ের ভারতে যোগদান এবং পাকিস্তানের সমর্থিত উপজাতি অনুপ্রবেশ। | জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি; জম্মু-কাশ্মির বিভাজন এবং যুদ্ধবিরতি রেখা (বর্তমানে LoC) সৃষ্টি। | কাশ্মির বিরোধের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ও জাতিসংঘে ইস্যুটির প্রবেশ। |
দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ | ১৯৬৫ (আগস্ট - সেপ্টেম্বর) | পাকিস্তানের 'অপারেশন জিব্রালটার' এর মাধ্যমে কাশ্মিরে অনুপ্রবেশ ও রান অব কাচ্ছ বিতর্ক। | সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় 'তাসখন্দ ঘোষণা'; যুদ্ধের পূর্বের অবস্থানে প্রত্যাবর্তন। | চাউইন্ডার ঐতিহাসিক বিশাল ট্যাঙ্ক যুদ্ধ এবং উভয় দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি। |
১৯৭১ সালের যুদ্ধ (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ) | ১৯৭১ (৩ ডিসেম্বর - ১৭ ডিসেম্বর) | পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক জান্তার গণহত্যা, ১ কোটি শরণার্থী সংকট ও পাকিস্তানের ভারতীয় ঘাঁটিতে হামলা। | পাকিস্তান বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ; স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়; 'শিমলা চুক্তি' স্বাক্ষর। | দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও মানচিত্র পরিবর্তন; ৯৩,০০০ সেনার ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ। |
কার্গিল যুদ্ধ | ১৯৯৯ (মে - জুলাই) | কার্গিল ও ড্রাস খাতের বরফাবৃত পাহাড়ি চূড়ায় পাকিস্তান সেনার 'অপারেশন বদর' অনুপ্রবেশ। | ভারতের 'অপারেশন বিজয়' সফল; মার্কিন কূটনৈতিক চাপে পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার। | পারমাণবিক শক্তি অর্জনের পর দুই পরমাণুশক্তির প্রথম প্রত্যক্ষ পাহাড়ি যুদ্ধ। |
উরি ও পুলওয়ামা পরবর্তী সামরিক সংঘাত | ২০১৬ ও ২০১৯ | সীমান্তে সন্ত্রাসী হামলা (উরি ও পুলওয়ামা); ভারতীয় সেনার উরি প্রতিশোধ ও বালাকোট বিমান হামলা। | ভারতের 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' ও বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক; অভিনন্দন বর্ধমানের বন্দী ও মুক্তি। | ভারতের নতুন প্রতিরক্ষা নীতি (ডকট্রিন) প্রদর্শন: প্রক্সি ওয়ারের জবাবে সরাসরি সীমান্ত অতিক্রম। |
ঐতিহাসিকভাবে বিভাজনের ক্ষত ও 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'
ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধের মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৪৭ সালের বিভাজনে।
দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory): অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রস্তাবিত 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'-এর ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের জন্ম হয়, যেখানে বলা হয়েছিল হিন্দু ও মুসলিম দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি এবং তাদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। অন্যদিকে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অখণ্ড ভারতের নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। এই ধারণাগত মৌলিক পার্থক্য আজও উভয় রাষ্ট্রের জাতীয় ভাবমাদর্শের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে আছে।
রাডক্লিফ লাইন (Radcliffe Line): স্যার সিডিল রাডক্লিফ মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোনো ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার তোয়াক্কা না করে সীমানা নির্ধারণ করেন। এর ফলে গ্রাম, নদী, এমনকি ঘরবাড়ি দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
দেশীয় রাজ্যগুলোর ভুক্তি (Princely States Issue): বিভাজনের সময় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যকে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে অধিকাংশ রাজ্য নিজ নিজ ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কিন্তু হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় এবং জম্মু-কাশ্মির নিয়ে সংকট তৈরি হয়। হিন্দুশাসিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড় ভারতে অন্তর্ভুক্ত হলেও, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুশাসিত জম্মু-কাশ্মির আন্তর্জাতিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
মূল শিক্ষা: ১৯৪৭ সালের বিভাজন কেবল ভূমির বণ্টন ছিল না; এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তক্ষরণ, স্থানচ্যুতি এবং দুই দেশের রাজনীতিতে এক চিরস্থায়ী অবিশ্বাসের বীজ বপন।
কাশ্মির সংকট: ভূ-কৌশলগত ও আইনি টানাপোড়েন
কাশ্মির বিরোধ কেবল একটি অঞ্চল দখলের লড়াই নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর নিরাপত্তা ও ভূ-কৌশলগত কারণ।
নদীর উৎপত্তিস্থল: সিন্ধু অববাহিকার প্রধান প্রধান নদীগুলো (ঝেলম, চেনাব, সিন্ধু) কাশ্মির অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। পাকিস্তানের কৃষি ও অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে এই নদীগুলোর পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই কাশ্মিরে ভারতের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের পানির নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মধ্য এশিয়া ও চীনের সংযোগ: কৌশলগতভাবে কাশ্মির অঞ্চলটি চীন, আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত। বর্তমানে চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর অংশ CPEC (China-Pakistan Economic Corridor) গিলগিট-বালতিস্তানের ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের অন্তর্ভুক্ত।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈরিতা
আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫-এ (Article 370 & 35A): ভারতীয় সংবিধানে জম্মু ও কাশ্মিরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করে রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা তুলে নেয় এবং একে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (জম্মু-কাশ্মির এবং লাদাখ) বিভক্ত করে। ভারত এটিকে তাদের "অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়" হিসেবে অভিহিত করলেও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্তব্ধ করে দেয়।
সীমান্ত যুদ্ধ থেকে ছায়াযুদ্ধ (Proxy Warfare) ও সন্ত্রাসবাদ
চারটি প্রধান যুদ্ধ (১৯৪৭-৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯) ছাড়াও দুই দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব 'অপ্রথাগত যুদ্ধ' বা 'অপ্রতিসম যুদ্ধে' (Asymmetric Warfare) রূপ নিয়েছে।
প্রক্সি ওয়ার ও সীমান্ত পারের সন্ত্রাসবাদ
ভারত শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) ভারতে অস্থায়িত্ব তৈরি করতে ছায়াযুদ্ধ নীতি গ্রহণ করেছে।
কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদ (১৯৮৯ - বর্তমান): ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে কাশ্মির উপত্যকায় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। ভারত দাবি করে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন: হিজবুল মুজাহিদিন, লস্কর-ই-তৈয়বা) পাকিস্তান অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে।
মুম্বাই হামলা (২০০৮) ও কৌশলগত প্রভাব: ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে লস্কর-ই-তৈয়বার সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৬৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত-পাকিস্তানের সমস্ত কম্প্রিহেন্সিভ ডায়ালগ (Comprehensive Dialogue) বন্ধ হয়ে যায়। ভারত স্পষ্ট বার্তা দেয় "সন্ত্রাসবাদ ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না।"
ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও বালুচিস্তান ইস্যু
অন্যদিকে, পাকিস্তান পাল্টা অভিযোগ করে যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW) পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন: বেলুচ লিবারেশন আর্মি - BLA) অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে ইন্ধন দিচ্ছে। কুলভূষণ যাদব নামক এক প্রাক্তন ভারতীয় নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে বালুচিস্তান থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান নিজেদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে।
হাইড্রোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার: সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি
যুদ্ধ ও তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে সফল এবং দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি হলো ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি (Indus Waters Treaty - IWT), যা বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
বর্তমান জটিলতা ও বিরোধ
যদিও এই চুক্তিটি একাধিক যুদ্ধ সত্ত্বেও টিকে গেছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতে ফাটল দেখা দিয়েছে:
ভারতের প্রকল্প: ভারত পশ্চিমের নদীগুলোতে 'কিশানগঙ্গা' এবং 'র্যাটেল' জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে। পাকিস্তানের দাবি, এসব বাঁধের নকশা চুক্তি লঙ্ঘন করে এবং নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দিতে পারে।
ভারতের অবস্থান কঠোর হওয়া: ২০১৬ সালে উরি হামলার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মন্তব্য করেছিলেন "রক্ত এবং পানি একসাথে বইতে পারে না।" ভারত বর্তমানে এই চুক্তির শর্তাবলী পুনরায় পর্যালোচনার জন্য পাকিস্তানকে নোটিশ পাঠিয়েছে, যা নতুন কৌশলগত উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
পারমাণবিক কৌশল ও সামরিক ডকট্রিন: 'কোল্ড স্টার্ট' বনাম 'ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন'
১৯৯৮ সালে উভয় দেশ পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর পর দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্যের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। দুই দেশের সামরিক কৌশল এখন মূলত পারমাণবিক প্রতিরোধের (Nuclear Deterrence) ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
ভারতের 'কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন' (Cold Start Doctrine)
২০০১ সালে ভারতীয় সংসদে সন্ত্রাসী হামলার পর সামরিক বাহিনী পাঠাতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী 'কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন' তৈরি করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো:
পাকিস্তানকে পারমাণবিক বোমার বোতামে চাপ দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, খুব অল্প সময়ে (৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে) সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের সীমিত অংশ দখল করে নেওয়া। এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টেবিলে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করা।
পাকিস্তানের 'ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন' (TNW)
ভারতের প্রচলিত সামরিক শক্তির (Conventional Superiority) মোকাবিলা করতে পাকিস্তান তৈরি করেছে 'নসর' (Nasr)-এর মতো স্বল্পপাল্লার পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র।
পাকিস্তান একটি 'ফুল স্পেকট্রাম ডিটারেন্স' নীতি অনুসরণ করে। তাদের কৌশল হলো যদি ভারতীয় বাহিনী কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিনের অধীনে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, তবে তারা নিজের ভূখণ্ডেই অতি-ক্ষুদ্র বা 'ট্যাকটিক্যাল' পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে ভারতীয় বহর ধ্বংস করে দেবে।
এই দুই বৈপরিত্যপূর্ণ কৌশলের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় সামান্য সীমান্ত সংঘর্ষও মুহূর্তের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। উভয় দেশই একে অপরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলে সরাসরি যুদ্ধ এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ব্লক
ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটিয়েছে।
চীন-পাকিস্তান 'অল-ওয়েদার' মিত্রতা
চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে বলা হয় "হিমালয়ের চেয়ে উঁচু এবং সমুদ্রের চেয়ে গভীর"। চীনের মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতকে দক্ষিণ এশিয়াতেই ব্যস্ত রাখা, যাতে ভারত ভারত মহাসাগর বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্যে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী না হতে পারে।
CPEC নির্মাণের মাধ্যমে চীন সরাসরি আরব সাগরে (গিয়াদার বন্দর) পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে, যা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অর্থনৈতিক-সামরিক ঘনিষ্ঠতা
শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিলেও, একুশ শতকে চীনের উত্থান ঠেকাতে মার্কিন নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ভারত। QUAD (Quadrilateral Security Dialogue)-এর মাধ্যমে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া জোটবদ্ধ হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রদান করছে এবং পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে যাতে তারা তাদের জমিতে থাকা জঙ্গি অবকাঠামো ধ্বংস করে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও সার্ক (SAARC)-এর অকার্যকারিতা
ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ জনগণকে।
বাণিজ্যের সম্ভাবনা হারানো: বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যের সম্ভাবনা বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বৈরিতার কারণে বর্তমান আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। অধিকাংশ পণ্য এখন দুবাই হয়ে ঘুরপথে চড়া দামে আদান-প্রদান হয়।
সার্ক (SAARC)-এর মৃত্যুঘণ্টা: দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC) মূলত ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দের কারণেই সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ভারত বর্জন করার পর থেকে এই সংস্থাটির কার্যক্রম প্রায় স্থবির। ভারত এখন সার্কের বদলে BIMSTEC (বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল)-কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা: শান্তির সম্ভাবনা কতটুকু?
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোনো দিকে মোড় নেবে তা কয়েকটি প্রধান বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে:
ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি (Backchannel Talks): প্রকাশ্য শত্রুতা থাকলেও উভয় দেশের গোয়েন্দা প্রধান ও নিরাপত্তা উপদেষ্টারা গোপনে আলোচনা চালান। ২০২১ সালের সীমান্ত যুদ্ধবিরতি নবায়ন এই গোপন আলোচনারই সফল পরিণতি ছিল।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংকট: পাকিস্তান বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ (IMF)-এর শর্তাবলী এবং আন্তর্জাতিক চাপে তাদের প্রতিরক্ষা নীতিতে কিছুটা নমনীয়তা আনতে হতে পারে।
কাশ্মির কেন্দ্রিক অচলাবস্থা ভাঙা: ভারত অনুচ্ছেদ ৩৭০ পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যাবে না বলে স্পষ্ট করেছে। অন্যদিকে, ভারতও সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসতে নারাজ।
পারমাণবিক কৌশল ও দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতি
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত কেবল প্রচলিত (Conventional) সামরিক ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা নিয়ন্ত্রিত হয় পারমাণবিক প্রতিরোধের (Nuclear Deterrence) নীতি দ্বারা।
ভারতের পারমাণবিক নীতি: ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে 'নো ফার্স্ট ইউজ' (No First Use - NFU) নীতি মেনে চলে। অর্থাৎ, ভারত আগে কোনো দেশের ওপর পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে ভারতের ওপর যদি পারমাণবিক বা জৈব হামলা হয়, তবে ভারত ধ্বংসাত্মক দ্বিতীয় আঘাত (Massive Retaliation) হানবে।
পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতি: পাকিস্তান কোনো 'নো ফার্স্ট ইউজ' নীতি মানতে বাধ্য নয়। প্রচলিত সামরিক বিচারে ভারতের চেয়ে আকারে ছোট হওয়ায় পাকিস্তান তাদের প্রতিরক্ষার জন্য 'ফুল স্পেকট্রাম ডিটারেন্স' নীতি অনুসরণ করে। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পপাল্লার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র (Tactical Nuclear Weapons - যেমন: নসর ক্ষেপণাস্ত্র), যা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোনো সম্ভাব্য বড় আকারের স্থল হামলা (যেমন: ভারতের 'কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন') থামিয়ে দিতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল ও বর্তমান স্থবিরতা
২০১৯ সালের আগস্টে ভারত সরকার তাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ (Article 370) বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা তুলে নেয় এবং রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ) বিভক্ত করে। পাকিস্তান এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ভারতের সাথে সমস্ত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বন্ধ করে দেয় এবং রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে নেয়।
বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নেই। তবে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশন্স (DGMO) সংবেদনশীল 'লাইন অব কন্ট্রোল' (LoC)-এ ২০০৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুনরায় কঠোরভাবে মেনে চলার ব্যাপারে এক যৌথ সম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা সীমান্তে সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
শান্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ভারত ও পাকিস্তানের গত সাত দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস মূলত যুদ্ধ, অবিশ্বাস, ধ্বংস এবং রাজনৈতিক চাপানউতোরের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের বিভাজনের যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা নিরাময় হওয়ার পরিবর্তে বছরের পর বছর সামরিক সংঘাত ও উগ্র জাতীয়তাবাদের জ্বালানিতে আরও বিষাক্ত হয়েছে।
দুই দেশেরই বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনও দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, অশিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। অথচ এই দুটি দেশ তাদের বাজেটের বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখছে সামরিক খাত এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার পেছনে।
জাতিসংঘ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের মতে, কাশ্মির সমস্যার একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নির্মূল এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তবে ভূ-কৌশলগত জটিলতা, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং ইতিহাসের তিক্ত স্মৃতি বিবেচনা করলে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার বিরোধের জল আরও অনেক দূর গড়াবে এবং যেকোনো ছোট সীমান্ত উদ্দীপনা মুহূর্তেই এক আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।















