>

>

স্টেনগান টু জায়নামাজ – একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশেরা

স্টেনগান টু জায়নামাজ – একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশেরা

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

TruthBangla

স্টেনগান টু জায়নামাজ: একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশেরা

‘আজান হয়েছে, আমাকে দুই রাকাত ফজরের নামাজ পড়তে দাও।’

একাত্তরের পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্যত বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো এই মিনতিটুকু করেছিলেন পীর বেলায়েত হোসেন। কিন্তু ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের বুলি আওড়ানো পাকিস্তানি মিলিটারিরা তাঁকে সেই সুযোগটুকুও দেয়নি। তপ্ত বুলেটের ব্রাশফায়ারে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় তাঁর বৃদ্ধ দেহ। একই সাথে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় তাঁর পরিবারের আরও ১০ জন সদস্যকে।

পরীর বাড়ির সন্তান কিশোর মুকুল সেদিন নিজের চোখের সামনে মায়ের সম্ভ্রম বাঁচাতে বন্দুক তুলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ঘাতকের বুলেটে তাঁকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। একটু গভীরে গিয়ে চিন্তা করলে অনুধাবন করা যায় যে পাকিস্তানি বাহিনী নিজেদের ‘ইসলামের সৈনিক’ বা ‘মুসলিম আর্মি’ হিসেবে দাবি করত, তারা কীভাবে সেহরির দস্তরখান থেকে তুলে নিয়ে একজন পীর ও তাঁর পরিবারের ১১ জন সদস্যকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি! পুকুর পাড়ের সেই রক্তস্নাত অন্ধকার ভোর আজও সাক্ষী দেয় একাত্তরে বাংলা ও বাঙালির ওপর নেমে আসা এই কালরাত্রিতে ইসলাম বিপন্ন ছিল না, বিপন্ন ছিল মানবতা ও ন্যায়বিচার। আর সেই مظلوم (মজবুল) মানবতা ও স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন এই বাংলার পীর পরিবারের সন্তানেরা।

দীর্ঘদিন ধরে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি অত্যন্ত চতুর ও একপেশে সামাজিক-রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। সেই কৃত্রিম বয়ানটি হলো একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধটি নাকি ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র এক সংঘাত।

পাকিস্তানি জালেম জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে খুব সচেতনভাবেই এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল। আবার স্বাধীনতোত্তর পর্যায় থেকেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের কায়েমি স্বার্থে বারবার প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছে যে দাড়ি, টুপি, জুব্বা আর তসবিহ হাতে থাকা মানুষ মানেই বুঝি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী বা রাজাকার!

কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে বেরিয়ে আসে এক লোমহর্ষক, বৈপ্লবিক ও শিহরণ জাগানিয়া সত্য। সত্যটি হলো বাংলার সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা এবং খানকার নিভৃতচারী দরবেশেরা কেবল জায়নামাজে বসে দেশ ও জাতির জন্য দোয়া করেই ক্ষান্ত হননি; তাঁরা পরম মমতায় একদিকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, আর অন্যদিকে নিজেদের বুক পেতে দিয়েছেন শত্রুর বুলেটের সামনে। এমনকি প্রয়োজনবোধে জিকির ছেড়ে কাঁধে স্টেনগান তুলে নিয়ে রণাঙ্গনে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন।

একাত্তরের যুদ্ধটা কি ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ ছিল?

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ তা অনুধাবন করেছিলেন এবং সেই চেতনা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন এদেশের সুফি-সাধক সমাজ।

স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। একদিকে পাকিস্তানি দোসরদের ধর্মান্ধতা, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একপেশে সরলীকরণ এই দুইয়ের চাপে হারিয়ে যান সেইসব সুফি সাধক ও পীর-মাশায়েখরা, যাঁরা নিজের ঈমানী তাগিদ থেকেই মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন।

বাংলার সুফি ঐতিহ্যের মূল সুরই হলো জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। সুফি সাধকেরা কখনোই শাসককুলের অন্যায্য তোষামোদকারী ছিলেন না। কদমতলীর পীর, গোলাপনগরের চিশতী পীর, কিংবা মাইজভাণ্ডার ও ফটিকছড়ির সুফিরা প্রমাণ করেছেন ইসলামের মূল বার্তা হলো 'ইনসাফ' বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। জালেম শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।

বাংলার সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ এবং খানকার নিভৃতচারী দরবেশেরা কেবল জায়নামাজে বসে দোয়া করেননি, তাঁরা বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে, কেউ কেউ স্টেনগান কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে।

গোলাপনগরের রক্তিম স্মৃতি: শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (রহ.)

একাত্তরের রক্তঝরা এপ্রিল মাস। কুষ্টিয়ার পদ্মার তীর তখন বারুদ ও বোমার গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপার থেকে পাকিস্তানি হানাদারেরা যখন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ভেড়ামারা শহর ও আশপাশের গ্রামগুলোকে তছনছ করে এগোচ্ছিল, তখন গোলাপনগরের এক নিভৃত আস্তানায় আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (রহ.)।

পালানোর সুযোগ ফিরিয়ে দিয়ে সাহসিকতা

সোলাইমান শাহ্ জানতেন, পাকিস্তানি মিলিটারি যেকোনো মুহূর্তে তাঁর আস্তানায় হানা দেবে। ভক্ত ও অনুসারীরা তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য আকুল মিনতি করেছিলেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানতেন, তাঁর মতো একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক নেতা যদি রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যান, তবে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার সাধারণ মানুষের মনোবল একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। পলায়নপরতা বা কাপুরুষতা সুফিবাদের শিক্ষা নয়; বরং সুফিবাদের শিক্ষা হলো সত্যের ওপর অবিচল থাকা।

পাকিস্তানি বাহিনীর রক্তপিপাসু ঘাতক দল যখন গোলাপনগরের আস্তানাটি ঘেরাও করল, তখনো সোলাইমান শাহ্ ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত ও অকুতোভয়। ঘাতকদের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একবিন্দু অনুনয়-বিনয় করেননি। বরং মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন পরম স্রষ্টার ওপর ভরসা রেখে। পাকিস্তানি হায়েনাদের ব্রাশফায়ারে সেদিন গোলাপনগরের পবিত্র মাটি ভিজে গেল এই মহান সুফি সাধক এবং তাঁর আটজন ভক্ত-সহচরের পবিত্র রক্তে।

সোলাইমান শাহ্ চিশতী (রহ.) তাঁর শাহাদাত দিয়ে একাত্তরের রণাঙ্গনে প্রমাণ করে গেলেন, ধর্ম রক্ষার দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি জান্তারা যা করছে তা শুধুই ভণ্ডামি ও ক্ষমতার লিপ্সা। আর একজন প্রকৃত ধার্মিক ও খোদাভীরু সুফি নিজের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেন দেশপ্রেমই ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

মাইজভাণ্ডার, মতিভাণ্ডার ও খানকাহ্ দরবারসমূহ

মুক্তিযুদ্ধে পীর-মাশায়েখদের ভূমিকা কেবল আত্মত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রখ্যাত দরবার ও খানকাহগুলো পরিণত হয়েছিল সশস্ত্র প্রতিরোধের একেকটি শক্তিশালী ঘাঁটি ও লজিস্টিক হাবে।

মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের ঐতিহাসিক ভূমিকা: চট্টগ্রামের বিশ্বখ্যাত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে সাহসিকতা ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল, তা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ৫ই এপ্রিল, যখন পুরো দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘কাফের’ ও ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে ফতোয়া জারি করা হচ্ছিল, ঠিক তখন মাইজভাণ্ডারের বার্ষিক ওরসে হাজার হাজার ভক্ত ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শঙ্কাকে তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে উড়ানো হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।

এটি ছিল তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। মাইজভাণ্ডার দরবারের বিশাল খামারগুলোর গোয়ালভরা গরু, পুকুরের মাছ এবং গোলাভরা ধান উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আহারের জন্য। দরবারের আস্তানাগুলো হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আশ্রয়স্থল।

সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে মতিভাণ্ডার দরবার: ফটিকছড়ির মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ একাত্তরে কার্যত সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারের ভূমিকা পালন করেছিল। দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই দরবারটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল অত্যন্ত নিরাপদ এক 'সেফ হ্যাভেন' বা আশ্রয়কেন্দ্র।

যখন পাকিস্তানি মিলিটারি মাইক বাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাফের বলে বিভ্রান্তি ছড়াত, তখন এসব দরবারের পীর ও সুফিরা মুক্তিযোদ্ধাদের মাথায় হাত রেখে দোয়া করতেন এবং বলতেন: "তোমরা হকের (সত্যের) পথে আছ, জালেমের বিরুদ্ধে লড়াই করছ। তোমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।"

রণাঙ্গনে যখন গোলাবারুদের অভাব ঘটত, তখন পীরদের এই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সমর্থন মুক্তিযোদ্ধাদের মনে পারমাণবিক শক্তির চেয়েও বেশি সাহস জোগাত।

স্টেনগান হাতে রণাঙ্গনে: ৩ নম্বর সেক্টরের প্লাটুন কমান্ডার সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা (দেওয়ানবাগী)

একাত্তরের রণাঙ্গনের অন্যতম চমকপ্রদ ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা (যিনি পরবর্তীতে দেওয়ানবাগী হুজুর হিসেবে পরিচিতি পান)-কে কেন্দ্র করে। বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেকেই হয়তো তাঁর পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেন, কিন্তু ১৯৭১ সালের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় এক নির্ভীক, দেশপ্রেমিক সশস্ত্র যোদ্ধার অবয়ব।

থ্রি-নট-থ্রি ও স্টেনগান হাতে রণাঙ্গনে

১৯৭১ সালের উত্তাল দিনে তরুণ সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে প্রথমে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ও স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন। কিন্তু তিনি দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন, শুধুই সেবা বা পরোক্ষ সহায়তা দিয়ে এই সশস্ত্র ঘাতক বাহিনীকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি সরাসরি ৩ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহর (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) অধীনে তিনি একটি প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।

তাঁর এই যুদ্ধ জয়ের কাহিনী কোনো কল্পকথা নয়; বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ৩ নম্বর সেক্টরের নথিপত্র এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অফিসিয়াল দলিলে অত্যন্ত সম্মানের সাথে সংরক্ষিত রয়েছে।

সম্মুখ সমর ও বীরত্বগাথা

২৬শে এপ্রিল, শাহবাজপুরের যুদ্ধ: এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে তিনি তাঁর প্লাটুন নিয়ে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করেন।

সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কে অ্যামবুশ: মে মাসজুড়ে পাকিস্তানি মিলিটারির রসদ ও যানবাহন ধ্বংস করার জন্য তিনি একের পর এক দুঃসাহসিক অ্যামবুশ পরিচালনা করেন।

মাধবপুর ও মনতলা-হরষপুরের সংগ্রাম: এসব অঞ্চলের রক্তাক্ত সম্মুখ যুদ্ধে তিনি সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দেন।

তাঁর রণকৌশল, শৃঙ্খলাপরায়ণতা এবং অসীম সাহসিকতা দেখে ৩ নম্বর সেক্টরের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা যুদ্ধের সময়ই তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সরাসরি 'কমিশনড অফিসার' হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন খাঁটি সুফির মতো বিনয়ের সাথে তিনি সেই লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন:

"আমি একজন আলেম। ধর্মচর্চা, গবেষণা ও শিক্ষাদানই আমার মূল পথ। আমি যুদ্ধে এসেছি কেবল আমার মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে, কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক পেশা গ্রহণ করতে নয়। দেশ স্বাধীন হলে আমি আমার নিজের ভুবনে, অর্থাৎ দ্বীনী খেদমতে ফিরে যাব।"

তাঁর এই স্পষ্ট অবস্থান প্রমাণ করে, তিনি কোনো ব্যক্তিগত খ্যাতি, পদপদবি বা ক্ষমতার আশায় যুদ্ধে নামেননি; তাঁর এই সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল বিশুদ্ধ দেশপ্রেম ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধের তাগিদ থেকে।

হেজামারা ক্যাম্পের সেই ঐতিহাসিক খুতবা ও রেসকোর্স ময়দান

রণাঙ্গনে সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার একটি ঘটনা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৯শে নভেম্বর ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। ভারতের ত্রিপুরাস্থ হেজামারা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে হাজার হাজার সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতিতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেই জামাতে ইমামতি ও খুতবা দিচ্ছিলেন প্লাটুন কমান্ডার মাহবুব-এ-খোদা। খুতবা দেওয়ার সময় তিনি এক গভীর আবেগঘন ও আধ্যাত্মিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে সমবেত যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন:

"আল্লাহর কসম! পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রেখে বলছি, আগামী ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) আমরা এক স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে উদযাপন করব। আর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে সেই ঈদের নামাজ পড়াব আমি নিজে!"

কারফিউ, যুদ্ধ আর বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই দিনগুলোতে সাধারণ অনেক মুক্তিযোদ্ধার কাছে এই কথাটিকে অসম্ভব এক স্বপ্নের মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু কী অলৌকিক সত্য! ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং দেশ স্বাধীন হয়।

পরবর্তীতে, ১৯৭২ সালের ২৬শে জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানেই। আর হাজার হাজার বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার উপস্থিতিতে সেই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করেছিলেন রণাঙ্গন ফেরত সেই বীর যোদ্ধা মাওলানা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা!

একজন সুফি সাধকের এই যে 'স্টেনগান টু জায়নামাজ' অর্থাৎ রণক্ষেত্রের স্টেনগান ফেলে বিজয়ী দেশের জায়নামাজে ইমামতি করা এটিই বাংলাদেশ ও আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও বর্ণিল অধ্যায়।

রণাঙ্গনে ও নীতি নির্ধারণে শীর্ষ আলেম ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কেবল মাঠপর্যায়ের সুফিরাই নন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, শায়খুল হাদিস এবং আধ্যাত্মিক রাজনীতিকেরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

মওলানা ভাসানী ছিলেন একাধারে বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিক এবং অন্যাধারে পীর ও সুফি সাধক। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তিনিই প্রথম অনুধাবন করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সাথে পূর্ব বাংলার দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকা সম্ভব নয়। সেখান থেকেই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্পষ্ট পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে আশিোর্ধ্ব এই প্রবীণ নেতা ভারতে অবস্থান নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সর্বজ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী আরব মুসলিম দেশের প্রধানদের কাছে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা ও নারীনির্যাতনকে 'সম্পূর্ণ অনৈসলামিক, বর্বর ও জঘন্য অপকর্ম' হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর অনুসারী হাজার হাজার কৃষক ও তরুণ কাদেরিয়া বাহিনীসহ দেশের বিভিন্ন সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন।

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)

বুখারী শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী ও বিশ্ববরেণ্য হাদিস বিশারদ আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) একাত্তরে পাকিস্তানি জান্তার ভুয়া 'ইসলাম রক্ষা'র প্রোপাগান্ডার মুখে তীব্র নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

যখন ঢাকা শহর রক্তাক্ত হচ্ছিল, তখন আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, নিরীহ বাঙালি মুসলিমদের ওপর জুলুম, হত্যা ও লুণ্ঠন চালানো কোনোভাবেই ইসলামের সীমানার মধ্যে পড়ে না; এটি স্পষ্ট 'জুলুম'। তিনি লালবাগ ক্যাডেট মাদ্রাসা ও বড় কাটরা মাদ্রাসায় অবস্থান করে তাঁর হাজার হাজার ছাত্রকে এই শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলেন। তাঁর অগণিত ছাত্র ও ভক্ত সরাসরি অস্ত্র হাতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।

হাফেজ্জি হুজুর [মাওলানা মুহাম্মদউল্লাহ] (রহ.)

দেওবন্দি ধারার অন্যতম আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক সংস্কারক হাফেজ্জি হুজুর (রহ.) ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই আক্রমণকে 'জালেমের আক্রমণ' বলে ফতোয়া দেন। তিনি কোনো প্রকার রাজনৈতিক চাপ বা ভয়ের কাছে নতিস্বীকার না করে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের পক্ষে অবস্থান নেন।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর ও লালবাগ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণকে তিনি রূপান্তর করেছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। হাজার হাজার গৃহহীন, ভিটেমাটিহারা ও ক্ষুধার্ত মানুষকে তিনি আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আশ্রয়দান ও দোয়ার মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের পুরো নয় মাস এক অনন্য মানবিক দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।

শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান: ওলামায়ে কেরামের প্রথম সারির শহীদ

মাওলানা অলিউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতাকামী ওলামায়ে কেরামের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধিকার আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্রথম থেকেই সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার পক্ষে সংগঠিত করতে শুরু করেন।

২৫শে মার্চের গণহত্যার পর তিনি প্রকাশ্যে জুমার খুতবা ও স্থানীয় ধর্মীয় মাহফিলে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন: "পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যা করছে তা ইসলাম নয়, তা জালেমের কাজ। এই জালেমের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব।"

এই অপরাধে রাজাকার ও পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং মধ্যযুগীয় বর্বর নির্যাতন চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আলেম সমাজের আত্মত্যাগের ইতিহাসে তিনি অন্যতম প্রথম সারির শহীদ হিসেবে অমর হয়ে আছেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা অন্যান্য পীর ও আলেমদের অবদান

গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অগণিত দরবেশ, আলেম ও পীরেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় মুক্তির এই লড়াইয়ে শরিক হয়েছিলেন।

সিলেটের পাগলা পীর ও ছাতকের পীরেরা: সুনামগঞ্জ ও ছাতক অঞ্চলের এই আধ্যাত্মিক সাধকেরা তাঁদের আখড়া ও আস্তানাগুলোকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সুনামগঞ্জের হাসন রাজার বংশধর ও স্থানীয় পীরেরা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত রসদ ও অর্থ জোগাতেন।

ফরিদপুরের আটরশি দরবার: ফরিদপুরের আটরশি দরবার শরীফ থেকে তৎকালীন সময়ে পরোক্ষভাবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হতো।

দিনাজপুরের পীর এঙ্গোজ শাহ: উত্তরাঞ্চলের প্রখ্যাত সাধক পীর এঙ্গোজ শাহ ও তাঁর হাজার হাজার অনুসারী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের নদী পারাপারে সহায়তা করেন।

ঢাকার মাজারসমূহের খাদেম সমাজ: ঢাকার বিখ্যাত পীরজঙ্গি মাজার ও হাইকোর্ট মাজারের খাদেমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাক বাহিনীর চলাচল, গানবোটের গতিপথ এবং খবরের গোপন চিঠি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।

কুমিল্লার পীর শাহ সুফি তোফাজ্জল হোসেন (রহ.): তিনি জুমার নামাজে প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের জন্য দোয়া করতেন এবং মাদ্রাসার তরুণ ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন।

রাজনৈতিক ইসলাম বনাম সুফি সাধনা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে একটি তেতো সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই একাত্তরে আলেম ও পীর সমাজের সবাই কিন্তু ইতিবাচক ভূমিকা রাখেননি। একটি পক্ষ শোষক শ্রেণীর দোসর হয়েছিল।

শর্ষিণার তৎকালীন পীর কিংবা জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামের মতো রাজনৈতিক ধর্মভিত্তিক দলগুলো ইসলামকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়েছিল। তারা ফতোয়া দিয়েছিল যে, পাকিস্তান টিকিয়ে রাখা নাকি ইসলামের ফরজ দায়িত্ব এবং মুক্তিযোদ্ধারা নাকি ‘ভারতের দালাল’ বা ‘কাফের’!

তবে সংখ্যাতাত্ত্বিক, নৈতিক ও গুণগত বিচারে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় এদেশের মাটি, সংস্কৃতি ও মানুষের সাথে মিশে থাকা খাঁটি সুফি সাধক ও পীরেরা কখনোই শোষকের পক্ষে দাঁড়াননি। যাঁরা শোষকের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন মূলত ‘ধর্ম ব্যবসায়ী’ কিংবা ক্ষমতা লোভী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যাঁদের কাছে ধর্ম ছিল শুধুই সুবিধাবাদের শৃঙ্খল।

কিন্তু সোলাইমান শাহ্ চিশতী, রামশহরের পীর পরিবার, মাইজভাণ্ডারের দরবেশকুল এবং রণাঙ্গনের সৈনিক দেওয়ানবাগী হুজুররা নিজেদের তাজা রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে, একাত্তরের সংগ্রামটি কোনো ধর্ম বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ছিল না। এটি ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম। আর এই জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পীরের তসবিহ আর কৃষকের লাঙ্গল, সুফির রক্ত আর শ্রমিকের রক্ত একই মোহনায় এসে মিশে গিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে পীর-মাশায়েখ, আলেম সমাজ ও দরবার সমূহের অবদান

মুক্তিযুদ্ধে বাংলার আলেম সমাজ, সুফি সাধক ও দরবারসমূহের অবিস্মরণীয় অবদান এক নজরে অনুধাবনের জন্য নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:

ব্যক্তিত্ব / প্রতিষ্ঠান

অঞ্চল / সেক্টর

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ও আত্মত্যাগ

ঐতিহাসিক তাৎপর্য

শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (রহ.)

ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া

আস্তানা ছেড়ে পালাতে অস্বীকৃতি জানান এবং ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাক বাহিনীর ব্রাশফায়ারে ৮ সহচরসহ শহীদ হন।

সুফিবাদের অবিচলতা ও দেশপ্রেমের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন।

পীর বেলায়েত হোসেন ও পীর পরিবার

রামশহর (পরীর বাড়ি)

সেহরির সময় পরিবারের ১১ জন সদস্যসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।

'পাকিস্তান বাহিনীর ইসলাম রক্ষা'র মিথ্যা বয়ান ও অপপ্রচারের চূড়ান্ত মুখোশ উন্মোচন।

সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা (দেওয়ানবাগী হুজুর)

৩ নম্বর সেক্টর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেট)

সরাসরি প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে থ্রি-নট-থ্রি ও স্টেনগান হাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণ; শাহবাজপুর ও মাধবপুর সমরে নেতৃত্ব দান।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে সুফি সাধকদের সরাসরি সশস্ত্র অংশগ্রহণের উজ্জ্বলতম প্রমাণ।

মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ

ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম

৫ই এপ্রিল ওরসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন; খাদ্য, গবাদিপশু ও গোলাভরা ধান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উন্মুক্তকরণ।

মুক্তিসংগ্রামের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও লজিস্টিক সহায়তা কেন্দ্র।

মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ

ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম

মুক্তিযোদ্ধাদের সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার ও সেফ হ্যাভেন হিসেবে কাজ করে।

সামরিক রসদ ও গোপন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে আস্তানার ব্যবহার।

মওলানা আব্দুল হামিদ خان ভাসানী

মুজিবনগর (প্রবাসী সরকার)

সর্বজ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্ব ও প্রধান শক্তিগুলোর কাছে গণহত্যা বিরোধী চিঠি প্রেরণ।

মুক্তিযুদ্ধের বৈশ্বিক জনমত গঠন ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)

ঢাকা (লালবাগ ও বড় কাটরা)

পাকিস্তানি বাহিনীর 'ইসলামী সংহতি'র অপপ্রচারের বিরুদ্ধে একাডেমিক ও নৈতিক ফতোয়া প্রদান; ছাত্রদের যুদ্ধে উৎসাহদান।

কওমি আলেমদের জাতীয় রাজনীতিতে সাহসিকতাপূর্ণ ও স্বাধীনতাকামী অবস্থান।

হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)

কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা

পাকিস্তানি আক্রমণকে 'জুলুম' আখ্যা দান; হাজার হাজার শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপদ খাদ্য ও আশ্রয় প্রদান।

চরম সংকটে সাধারণ মানুষের প্রতি আলেম সমাজের মানবতাবাদী অবস্থান।

শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান

ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল

৭ই মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে জুমার খুতবায় পাকি সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান; পরবর্তীতে রাজাকারের হাতে শহীদ।

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আলেম সমাজের প্রথম সারির আত্মত্যাগ।

পাগলা পীর ও স্থানীয় সুফিসমাজ

সুনামগঞ্জ ও ছাতক

হাওরাঞ্চলের নদীপথে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলে সার্বিক দিকনির্দেশনা, তথ্য সংগ্রহ ও আশ্রয় প্রদান।

গ্রামীণ অঞ্চলের সুফি সাধকদের স্বতঃস্ফূর্ত দেশপ্রেম।

মাওলানা তর্কবাগীশ ও 'দ্বীনি সংগ্রাম পরিষদ'

মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমি তৈরিতে এবং যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের সমর্থনে এদেশের গণমান্য আলেম রাজনীতিবিদেরা অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।

মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ: আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন একাত্তরের অন্যতম প্রধান কান্ডারি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা। একাত্তরের মার্চে বঙ্গবন্ধুর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে তিনি স্পষ্ট জানান, পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য ও বর্বরতা সম্পূর্ণ অনৈসলামিক।

যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়ে প্রবাসী সরকারের সহযোগী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে জনমত গঠনে নামেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে চিঠি দিয়ে জানান যে, বাংলাদেশে কোনো গৃহযুদ্ধ বা 'ইসলামি রাষ্ট্র রক্ষার যুদ্ধ' হচ্ছে না, বরং পশতু ও পাঞ্জাবি সৈন্যরা বাঙালি মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে গণহত্যা চালাচ্ছে।

'বাংলাদেশ দ্বীনি সংগ্রাম পরিষদ' গঠন: ১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী আলেম ও পীরদের একটি বড় অংশ একত্রিত হয়ে গঠন করেছিলেন 'বাংলাদেশ দ্বীনি সংগ্রাম পরিষদ'। এই পরিষদের মূল কাজ ছিল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ও শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত লাখ লাখ শরণার্থীকে নৈতিক ও মানসিক শক্তি জোগানো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধ ও স্বাধিকারের পক্ষে বক্তব্য প্রচার করা। বিশ্ব মুসলিম জনমতকে পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত করা।

মাওলানা আসাদুল মাদানী ও ভারতীয় ওলামা সমাজ

একাত্তরের রণাঙ্গনে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দি আলেমদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

মাওলানা আসাদুল মাদানী (রহ.): ভারতের জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আসাদুল মাদানী (রহ.) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেন। তিনি ভারতের কোণায় কোণায় ঘুরে ১ কোটি বাঙালি শরণার্থীর খাদ্য, পোশাক ও চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন।

তিনি বারবার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন এবং সাধারণ আলেম ও সাধারণ মানুষদের মুক্তিসংগ্রামে সহায়তার আহ্বান জানান। তাঁর নেতৃত্বেই দেওবন্দের আলেমসমাজ একাত্ম হয়ে ঘোষণা করেন যে, বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর পাকিস্তানি মিলিটারির হামলা কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়, এটি স্পষ্ট জুলুম।

কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ও আশ্রয়দান

মুক্তিযুদ্ধে কেবল সুফি দরবার নয়, তৎকালীন কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার অগণিত শিক্ষক ও ছাত্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন।

আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)

জামিয়া শরইয়্যা মালিবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট আলেম কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) ১৯৭১ সালে মুক্তিসংগ্রামের সরাসরি পক্ষে অবস্থান নেন। ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলে তাঁর অগণিত ছাত্রকে তিনি সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর বাসভবন ও পরিচালিত মাদ্রাসাগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপন তথ্য আদান-প্রদান এবং অস্ত্র লুকিয়ে রাখার স্থানে পরিণত হয়েছিল।

আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের এনসিডি ও গেরিলা প্রশিক্ষণ

পাবনা ও ঈশ্বরদী: পাবনা ও ঈশ্বরদীর আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার বহু ছাত্র ভারতের মেলঘর ও অন্যান্য সামরিক ক্যাম্পে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে ৭ ও ৮ নম্বর সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধ করেন।

সিলেটের বায়তুল মুকাদ্দাস ও কাজীরবাজার মাদ্রাসা: সিলেট অঞ্চলের আলেমগণ মুক্তিযোদ্ধাদের নদী পারাপার, সীমান্ত অতিক্রম এবং পাক বাহিনীর টহল সম্পর্কিত গোপন খবরাখবর পৌঁছে দিতেন।

বরিশালের মাহমুদীয়া মাদ্রাসা: এই মাদ্রাসার তৎকালীন তরুণ ছাত্র ও শিক্ষকেরা স্থানীয় ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে সশস্ত্র অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আলেম সমাজ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস জোগাত। এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, তার বাংলা তরজমা এবং জাতীয়তাবাদী তাফসীর পরিবেশন করা হতো।

কুরআন তেলাওয়াত ও তাফসীর: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করা হতো যে, কোনো অত্যাচারী ও জালেম শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কুরআনের নির্দেশ।

পাকিস্তানি অপপ্রচারের মোক্ষম জবাব: রেডিও পাকিস্তান থেকে যখন প্রচার করা হতো যে 'মুক্তিযোদ্ধারা কাফের ও ভারতের দালাল', তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আলেম প্রতিনিধিরা কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে প্রমাণ করতেন যে, স্বদেশের স্বাধীনতা ও হকের পক্ষে লড়াই করাই প্রকৃত মুমিনের কাজ।

একাত্তরে প্রাণ উৎসর্গকারী আরও কিছু বীর শহীদ আলেম ও সাধক

পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় ঘাতক চক্র খুব ভালো করেই জানত যে, যেসব আলেম ও পীর স্বাধিকারের কথা বলছেন, তারা সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচণ্ড জনপ্রিয়। ফলে বহু আলেমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

শহীদ আল্লামা নজমুল হক (রংপুর): রংপুর অঞ্চলে প্রখ্যাত এই আলেম ও সমাজসেবক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তরুণদের সংগঠিত করছিলেন। ২৫শে মার্চের পর পাক আর্মি তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে।

শহীদ কবি মাওলানা হারুনুর রশীদ: তিনি তাঁর কবিতা ও বক্তব্যের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে চেতনা জাগ্রত করতেন। ১৯৭১ সালের মে মাসে ঘাতক বাহিনী তাঁকে হত্যা করে।

শহীদ ক্বারী মোশতাক আহমদ: ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অবস্থানকালে পাক সেনাদের গণহত্যা দেখে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয়দের সতর্ক করার অপরাধে শহীদ হন।

শহীদ মাওলানা ইমদাদুল্লাহ (দিনাজপুর): সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে পাক বাহিনী তাঁর পুরো বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

খানকাহ্ ও দরবারের নারী সমাজ: পর্দার আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের রসদ যোগান

মুক্তিযুদ্ধে সুফি দরবার ও খানকাহ্ সংশ্লিষ্ট নারীদের (পীরজাদী ও খাদেম পরিবার) অবদান ইতিহাসে খুব কমই উঠে এসেছে।

খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশন: পেয়ারা বাগান, মাইজভাণ্ডার, কিংবা বিভিন্ন গ্রামীণ খানকাহে রাত জেগে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার জন্য রুটি ও খাবার তৈরি করতেন আস্তানাগুলোর গৃহিণী ও নারীরা।

অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকানো: পাক বাহিনী যখন দরবার বা খানকাহ্ ত তল্লাশি চালাত, তখন নারী সদস্যরা নিজেদের পোশাক, ধান রাখার গোলা কিংবা রান্নাঘরের মাটির নিচে অস্ত্র ও কার্তুজ লুকিয়ে রাখতেন।

সংকেত প্রদান: অনেক অঞ্চলে খানকাহের নারীরা দূর থেকে পাক বাহিনীর আগমন টের পেলে নির্দিষ্ট সংকেত (যেমন নির্দিষ্ট রঙের কাপড় শুকাতে দেওয়া বা হ্যারিকেন জ্বালানো) ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করে দিতেন।

একাত্তরের রণাঙ্গনে ইসলামি মূল্যবোধ, সুফি ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ছিল সর্বস্তরের মানুষের এক গণযুদ্ধ। এই যুদ্ধে টুপি-দাড়ি পরা মানুষ এবং পীর-দরবেশদের ভূমিকা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল জালেমের বিরুদ্ধে তাদের বিশ্বাস ও ঈমানী দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশ।

রক্তের অক্ষরে লেখা সত্যের পুনরাবিষ্কার

একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর আজ যখন সমগ্র জাতি তাদের ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার, মূল দলিলগুলোকে নতুনভাবে মূল্যায়নের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে, তখন যেন আমরা মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবোজ্জ্বল ও আধ্যাত্মিক অধ্যায়টিকে কোনোভাবেই বিস্মৃত না হই।

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে জানতে হবে আজকের এই লাল-সবুজ স্বাধীন মানচিত্রের প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে যেমন মিশে আছে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সৈনিকের রক্ত; ঠিক তেমনি মিশে আছে তসবিহ পাঠকারী সেইসব পবিত্র হাতের স্পর্শ যাঁরা পরম স্রষ্টার প্রেমে ব্যাকুল ছিলেন, আবার দেশের প্রয়োজনে আঙুল দিয়ে বন্দুকের ট্রিগার চাপতেও এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করেননি।

দেওয়ানবাগী হুজুর, সোলাইমান শাহ্ চিশতী কিংবা পীর বেলায়েত হোসেনের মতো চরিত্ররা তাঁদের কর্ম ও রক্ত দিয়ে আমাদের শিখিয়ে গেছেন দেশপ্রেম কোনো রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয় নয়, এটি আমাদের ঈমান ও অস্তিত্বের মূল ভিত্তি।

আজকে যারা না জেনে বা জেনেশুনে অপপ্রচার চালায় যে একাত্তরে বাংলাদেশের আলেম সমাজ, পীর কিংবা ধার্মিক মানুষেরা সবাই পাকিস্তানের দালাল ছিল; তারা হয় ইতিহাসের অ আ ক খ জানে না, নয়তো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইতিহাসের এক পরম মহিমান্বিত অধ্যায়কে ধামাচাপা দিতে চায়।

ইতিহাসের অমোঘ সত্য এটাই যে বাংলার সুফিবাদের মূল বাণীই হলো স্বাধীনতা, সাম্য ও ইনসাফ। আর সেই মানচিত্রের স্বাধীনতার জন্য এদেশের পীরেরা জায়নামাজ থেকে উঠে এসে স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছিলেন, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন এবং প্রকৃত অর্থেই মুক্ত করেছেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Sep 5, 2026

/

Post by

দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দেশীয় পৈশাচিক দালাল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির), রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির প্রত্যক্ষ মদদে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হয় এক পদ্ধতিগত ও পরিকল্পিত গণহত্যা। এই গণহত্যার সবচেয়ে বিভৎস, কলঙ্কজনক এবং নির্মম অধ্যায়টি ছিল বাঙালি নারীদের ওপর চালানো নজিরবিহীন গণধর্ষণ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। একাত্তরে নারী নির্যাতন ছিল পাকিস্তানি সামরিক উচ্চপর্যায় ও জামায়াতে ইসলামীর যৌথ মাস্টারপ্ল্যান।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Sep 5, 2026

/

Post by

দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দেশীয় পৈশাচিক দালাল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির), রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির প্রত্যক্ষ মদদে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হয় এক পদ্ধতিগত ও পরিকল্পিত গণহত্যা। এই গণহত্যার সবচেয়ে বিভৎস, কলঙ্কজনক এবং নির্মম অধ্যায়টি ছিল বাঙালি নারীদের ওপর চালানো নজিরবিহীন গণধর্ষণ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। একাত্তরে নারী নির্যাতন ছিল পাকিস্তানি সামরিক উচ্চপর্যায় ও জামায়াতে ইসলামীর যৌথ মাস্টারপ্ল্যান।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.