একাত্তরের নারী রাজাকার - ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় ও নথি গোপনের নেপথ্য
মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

TruthBangla

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় এবং একই সাথে রক্তভেজা এক মহাকাব্য। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ মা-বোনের অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের প্রিয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় যেভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা, বীরাঙ্গনাদের অসীম ত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, ঠিক তেমনি ইতিহাসের আরও একটি সত্য অধ্যায় আমাদের সামনে আসে তাহল একাত্তরের ঘাতক, দালাল ও রাজাকারদের ভূমিকা।
তবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল।
আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল? কীভাবে তৎকালীন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান পরিবারের পাকিস্তানপন্থী নারী দালালদের নাম ক্ষমতার রাজনীতি ও অর্থের প্রভাবে সরকারি নথি ও রেকর্ড বুক থেকে গায়েব করে দেওয়া হলো?
নিচে ১৯৭১ সালের ৭২-এর দালাল আইনে গ্রেপ্তারকৃত ৫০ জন নারী রাজাকার, সারা দেশে ৬২ জনের তালিকা, সোহরাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আখতার সোলায়মান, শেরে বাংলার কন্যা রইসী বেগম, রাজিয়া ফয়েজ, ড. ফাতেমা সাদিক, কুখ্যাত জরিনা এবং নারী রাজাকারদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস সম্বলিত এক পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও নিরপেক্ষ দলিল উপস্থাপন করা হলো।
১৯৭২ সালের সংবাদপত্র এবং দালাল আইনে গ্রেপ্তারকৃত ৫০ জন নারী রাজাকারের দলিলি ইতিহাস
মুক্তিযুদ্ধের পর পরই বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের সহযোগীদের বিচারের জন্য 'দালাল আইন ১৯৭২' (P O 8 of 1972) প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় দেশজুড়ে হাজার হাজার রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংবাদপত্রের সুরক্ষিত আর্কাইভ আমাদের স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় যে, এই গ্রেপ্তারকৃত দালালদের মধ্যে কেবল পুরুষই ছিল না, নারীদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল।
দৈনিক পূর্বদেশের ঐতিহাসিক রিপোর্ট (২৩ মার্চ, ১৯৭২)
১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় (যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে) একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তৎকালীন অর্থ মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে যান।
সেই পরিদর্শনের তথ্যানুযায়ী, সেখানে দালাল আইনে গ্রেপ্তারকৃত মোট আসামী ছিল ৯ হাজার ৪৯৩ জন। তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, নারীন্যায, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মদদ জুগিয়েছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক তথ্য হলো এই সাড়ে নয় হাজার আসামীর মধ্যে ৫০ জন নারী ছিলেন, যারা সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী, গুপ্তচর ও সহচরী হিসেবে কাজ করায় দালাল আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বন্দি ছিলেন। এছাড়া সারা দেশে দালাল হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে সর্বমোট ৬২ জন নারী রাজাকারের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর গ্রেপ্তার: 'সংবাদ' পত্রিকার দলিল
স্বাধীনতার ঠিক পর পরই, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ১৭ই পৌষ (জানুয়ারি ১৯৭২) রবিবার তৎকালীন বিখ্যাত 'সংবাদ' পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেই রিপোর্টের মূল সংবাদটি ছিল "সাইম সরকার নিখোঁজ"। কিন্তু তার ঠিক পাশেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছাপা হয়েছিল: "আরও ৩৯ জন দালাল গ্রেপ্তার"।
এই ৩৯ জন দালালকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৩৯ জনের নাম প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে দু'জন কুখ্যাত নারী দালালের নাম পাওয়া যায়:
তালিকার ২৫ নম্বর নাম: বেগম রোকেয়া আব্বাস (বাসা: ঢাকা)।
তালিকার ২৯ নম্বর নাম: ফরিদা বেগম (গ্রাম: শিবচর, জেলা: ফরিদপুর)।
এই নথিপত্র প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে নারী রাজাকারদের চিহ্নিত করেছিল এবং বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি এনে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করেছিল।
কেন আড়ালে গেল ৫০ জন নারী রাজাকারের পরিচয়? নথি গায়েবের রাজনীতি
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এড়াতে সবসময়ই অর্থ ও ক্ষমতার রাজনীতি একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১-এর নারী দালালদের ক্ষেত্রেও এটি সবচেয়ে নগ্নভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
ক্ষমতাশীল পরিবারের সংযোগ ও 'কেপ্ট' কালচার
স্বাধীনতার পর গ্রেপ্তারকৃত ৫০ জন নারী রাজাকারের রেকর্ড কেন পরবর্তীতে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে গায়েব করা হলো তার অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি থমথমে তথ্য উন্মোচিত হয়। এই ৫০ জন নারী দালালের বেশিরভাগই ছিলেন সমাজের তথাকথিত সম্ভ্রান্ত, উচ্চবিত্ত এবং ক্ষমতাধর পরিবারের সদস্য।
এদের একটি বড় অংশ ছিলেন তৎকালীন জেনারেল ইয়াহিয়া খানসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারদের কেপ্ট বা শয্যাসঙ্গিনী। তারা মনে-প্রাণে পাকিস্তানের গণহত্যাকে সমর্থন করতেন। নিজেদের এবং স্বামীদের পদোন্নতি, ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য তারা পাকিস্তানি অফিসারদের সাথে শারীরিক ও মানসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হতেন এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের বিরুদ্ধে তথ্য পাচার ও গুপ্তচরবৃত্তি করতেন।
উচ্চবিত্তের যোগসাজশ: করিম ড্রাগস ও আফরোজা নূর আলী
তৎকালীন নামকরা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'করিম ড্রাগস'-এর মালিকের স্ত্রী এই দালালদের তালিকায় ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের পর মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক 'দালাল আইন ১৯৭২' বাতিল করার সুযোগে এরা সবাই আইনি ঝামেলা মুক্ত হন এবং বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
(উল্লেখ্য, পরবর্তীতে এই করিম ড্রাগস-এর বড় একটি শেয়ার বেক্সিমকো গ্রুপ কিনে নেয়)।
এছাড়াও দালালদের নথিতে 'আফরোজা নূর আলী' নামে এক প্রভাবশালী মহিলার নাম পাওয়া যায়, যিনি ছিলেন তৎকালীন সরকারের এক অত্যন্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী। এলিয়ট ক্লাবের আড্ডায় এবং পাকিস্তানি অফিসারদের ড্রয়িংরুমে বসে এই নারী দালালরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার নকশা তৈরি করতেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, জিয়াউর রহমান কর্তৃক দালাল আইন রদ এবং ১৯৮০-র দশকে উগ্র রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের মাধ্যমে এই অভিজাত পরিবারের নারী রাজাকাররা নিজেদের অর্থ ও ক্ষমতার দাপট ব্যবহার করে সরকারি রেকর্ড বুক থেকে নিজেদের নাম মুছে ফেলতে সক্ষম হয়।
ক্ষমতার মসনদে 'হাই প্রোফাইল' নারী রাজাকার: রইসী বেগম, রাজিয়া ফয়েজ ও অন্যান্য
নারীদের রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থী ভূমিকা কেবল গোপনে গুপ্তচরবৃত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত অংশ সরাসরি তৎকালীন গণমাধ্যম, রেডিও এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে গিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিল।
শেরে বাংলার কন্যা রইসী বেগম ও 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম'
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মেয়ে রইসী বেগম ছিলেন তৎকালীন উগ্র পাকিস্তানপন্থী সংগঠন 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম'-এর প্রেসিডেন্ট। ১৯৭১ সালের ১২ই এপ্রিল দৈনিক সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি চরম ধর্মীয় উগ্রতা ছড়িয়ে লিখেছিলেন:
"আমাদের প্রিয় পাকিস্তানের সীমান্তের ওপার থেকে শত্রুপক্ষ কর্তৃক সংগঠিত ও প্ররোচিত কতিপয় দেশদ্রোহীদের দ্বারা চরম ভয়ভীতি ও হুমকির মধ্যে কাল কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহ তাআলা লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত মুসলমানদের সারা রাতের আকুল প্রার্থনা কবুল করেছেন এবং পাকিস্তান কে সমূহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
এটা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার যে শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের জাত শত্রুদের সহায়তায় পাকিস্তানের সাত কোটি জনগণের এ অঞ্চলকে বিশ্বনাথ, কালী, ও দুর্গার মন্দিরে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। আল্লাহু আকবরের স্থলে শেখ মুজিব পৌত্তলিকদের যুদ্ধের স্লোগান 'জয় বাংলা' আমদানি করেছিলেন।"
ধর্মকে ঢাল বানিয়ে এই নারী রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের "দেশদ্রোহী" ও "ইসলামের শত্রু" আখ্যা দিয়েছিলেন এবং হুমকি দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ না করলে পাক সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর আরও কঠোর আঘাত হানবে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণহত্যার সাফাইকারী: রাজিয়া ফয়েজ ও ড. ফাতেমা সাদিক
১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করছিল এবং ভারতে এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল, তখন আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। সেই প্রতিনিধি দলে ছিলেন দুই কুখ্যাত নারী রাজাকার:
রাজিয়া ফয়েজ (পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান)।
ড. ফাতেমা সাদিক।
তারা জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো গণহত্যা হচ্ছে না, যা হচ্ছে তা হলো "ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রুটিন অভিযান"।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই রাজিয়া ফয়েজদের চরম পুনর্বাসন ঘটেছিল:
১৯৭৯: মুসলিম লীগ (খান এ সবুর) থেকে প্রথম নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এরশাদ আমল: সাতক্ষীরা সদর আসন থেকে জাতীয় পার্টির এমপি হয়ে শিশু ও মহিলা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হন।
২০০৬ পরবর্তী: জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশনে তাঁকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
একাত্তরের গণহত্যার পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফাই গাওয়া নারী পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের পূর্ণ মন্ত্রী এবং অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের ভাইস চেয়ারম্যান পদ অলঙ্কৃত করেন যা ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তের সাথে চরম রাজনৈতিক প্রতারণা।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আখতার সোলায়মান ও তাঁর পাকিস্তানপ্রেম
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম পুরোধা পুরুষ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অথচ তাঁরই নিজ কন্যা বেগম আখতার সোলায়মান ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অন্যতম প্রধান বেসামরিক মুখপাত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
রেডিও পাকিস্তানে টিক্কা খানের প্রশংসা (১২ জুন ১৯৭১)
১৯৭১ সালের ১২ জুন রেডিও পাকিস্তান থেকে এক ভাষণ সম্প্রচার করা হয়। এতে বেগম আখতার সোলায়মান সরাসরি তৎকালীন প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানের প্রতি অনুগত রাখার আহ্বান জানান।
দৈনিক আজাদ পত্রিকায় (১৩ জুন, ১৯৭১) প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, আখতার সোলায়মান তাঁর ভাষণে কুখ্যাত গণহত্যাকারী জেনারেল টিক্কা খানের প্রশংসা করে বলেন:
"জেনারেল টিকাক খান এই দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত সঠিক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আমাদের সবাইকে দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় পাক সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়াতে হবে।"
১৯৭৫-এর আগস্ট অভ্যুত্থান ও মোশতাক-ভুট্টোকে ঐতিহাসিক চিঠি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ যখন ক্ষমতার মসনদে বসেন, তখন পাকিস্তান ও সৌদি আরব অনতিবিলম্বে সেই নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।
সৌদি বাদশাহ খালেদ তৎকালীন মোশতাককে অভিনন্দিত করার পর, বেগম আখতার সোলায়মান ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে এক চিঠি লেখেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এ. এল. খতিব রচিত 'হু কিলড মুজিব' (Who Killed Mujib) গ্রন্থে সেই চিঠির প্রামাণ্য পাঠ উদ্ধৃত করা হয়েছে:
"আমি সব সময় আপনাকে একজন অসীম সাহসী, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও ব্যতিক্রমী দূরদর্শী মানুষ হিসেবেই জানি। 'বাংলাদেশ' বিষয়ে আপনি সকল প্রত্যাশাকে অতিক্রম করে গেছেন। আপনি মুসলিম ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন দেখিয়ে অত্যন্ত উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।"
অর্থাৎ, ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশে পুনরায় পাকিস্তানপন্থী ধারার সূচনা হয়, তখন এই বেগম আখতার সোলায়মানরা পুনরায় আনন্দের সাথে পাকিস্তান ও ভুট্টোর চাটুকারিতায় মেতে উঠেছিলেন।
মাঠ পর্যায়ের নারী রাজাকার: সিদ্দিক বাজারের কুখ্যাত জরিনা ও খুলনার 'মহিলা প্রতিরোধ কমিটি'
নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস কেবল উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম বা বেতার সম্প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঠ পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পগুলোতে বাঙালি নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়া, তথ্য পাচার এবং সরাসরি লজিস্টিক সহায়তার ক্ষেত্রেও কিছু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারী অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল।
সিদ্দিক বাজারের কুখ্যাত জরিনার গ্রেপ্তার (৭ জানুয়ারি, ১৯৭২)
১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি ঢাকা শহরের ২ নম্বর সেক্টরের অধীনস্থ সিদ্দিক বাজার এলাকার দুর্ধর্ষ গেরিলা সেনানীরা কুখ্যাত নারী রাজাকার 'জরিনা'কে তাঁর আস্তানা থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
জরিনার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল:
সে অবরুদ্ধ ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিত।
সিদ্দিক বাজার ও পুরান ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা কার্যক্রম ও চলাচলের তথ্য পাক বাহিনীর কাছে পাচার করত।
সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ ছিল জরিনার প্রত্যক্ষ সহায়তায় পাকিস্তানি আর্মি পুরান ঢাকার বহু নিরীহ বাঙালি মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
গ্রেপ্তারের পর গেরিলা যোদ্ধাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জরিনা স্বীকার করে যে, পাক সেনারা মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সেই মেয়েদের ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ দেখভাল ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নাকি তাঁর (জরিনার) হাতেই ন্যস্ত ছিল! বস্তুত, সে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য নারী পাচারকারী ও ক্যাম্প ম্যানেজমেন্টের অন্যতম মূল হোতা।
২. খুলনা মহিলা প্রতিরোধ কমিটি (৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১)
দৈনিক পূর্বদেশের আর্কাইভাল রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর যখন চারিদিকে যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা কোণঠাসা তখন খুলনায় 'মহিলা প্রতিরোধ কমিটি' নামক পাকিস্তান সমর্থক একটি নারীদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সেই সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া নারী রাজাকারা প্রতিজ্ঞা করেছিল যে: "যেকোনো মূল্যে, নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা হবে এবং তথাকথিত ভারতীয় অনুচরদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) খতম করা হবে।"
গবেষণার আলোয় নারী রাজাকারের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকগ্রাউন্ড
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ 'মুক্তিযুদ্ধ ও নারী'-তে গবেষক রোকেয়া কবীর এবং মুজিব মেহেদী অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে নারী রাজাকারদের উত্থান ও তাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।
গবেষকদের মতে:
পারিবারিক স্বীকৃতি ও ধর্মান্ধতা: যুদ্ধাপরাধী কাজগুলোতে লিপ্ত নারীদের অধিকাংশের পেছনেই তাদের পরিবারের পূর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্বীকৃতি ছিল। যে পরিবারগুলোর পিতা, ভাই, স্বামী বা চাচারা শান্তি কমিটি, রাজাকার বা মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত ছিল, সেই পরিবারের নারীরাই মূলত এই নেতিবাচক ও ঘাতক ভূমিকায় লিপ্ত হয়েছিল।
শ্রেণিভিত্তিক ভূমিকা: উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত স্তরের নারীদের সক্রিয়তা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনীতিপ্রসূত (যেমন: লিফলেট বিতরণ, বিবৃতি দেওয়া, রেডিওতে ভাষণ দেওয়া, ফান্ড তৈরি করা)।
নিম্নবিত্তের ভূমিকা: নিম্নবিত্ত নারীদের ক্ষেত্রে কারণ ছিল ভিন্ন। পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পগুলোতে আয়া, রাঁধুনী, সেবিকা বা তথ্য পাচারকারী হিসেবে কাজ করার পেছনে মূল কারণ ছিল বস্তুগত সুবিধা, অর্থপ্রাপ্তি এবং টিকে থাকার কৌশল।
কেন প্রামাণ্য ইতিহাসে উপেক্ষিত নারী রাজাকারের অধ্যায়?
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত শত শত ইতিহাস গ্রন্থে আমরা বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা (যেমন: তারামন বিবি, সিতারা বেগম, কাঁকন বিবি) এবং সহযোদ্ধা নারীদের অসামান্য বীরত্বের কথা পাই। কিন্তু নারী রাজাকারদের এই কুখ্যাত অধ্যায়টি ইতিহাসবিদেরা দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছেন বা আড়ালে রেখেছেন।
এর প্রধান কারণসমূহ:
স্পর্শকাতর সামাজিক ট্যাবু: বাঙালি সমাজে নারী প্রথাগতভাবে ‘মাতৃত্ব’ ও ‘সেবা’-র প্রতীক। নারীরাও যে নির্মম গণসংহারের মতো অপরাধে সরাসরি মদদদাতা বা পরিকল্পনাকারী হতে পারে এই বাস্তবতাটি স্বীকার করা সামাজিক ও মানসিকভাবে স্পর্শকাতর ছিল।
ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাব: আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ৫০ জন এবং তালিকার ৬২ জন নারী রাজাকারের সিংহভাগই ছিলেন সমাজের উচ্চবিত্ত, সামরিক অফিসারদের স্ত্রী বা অভিজাত পরিবারের সদস্য। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা অর্থ ও ক্ষমতার চরম ব্যবহার করে সরকারি রেকর্ড আর্কাইভ থেকে নিজেদের নাম গায়েব করে ফেলেছিল।
রাজনৈতিক পুনর্বাসন: রাজিয়া ফয়েজ বা বেগম আখতার সোলায়মানদের মতো উগ্র পাকিস্তানপন্থীদের পরবর্তীতে মুসলিম লীগ, জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির শীর্ষ পদে বসিয়ে রাজনৈতিকভাবে পবিত্র করা হয়েছিল। ফলে তাদের অতীত ইতিহাস লোকচক্ষুর অন্তরালে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
এক নজরে ১৯৭১ এর প্রখ্যাত নারী দালাল ও রাজাকারের প্রামাণ্য নথি
নাম / পরিচয় | তৎকালীন পদবী ও ভূমিকা | ১৯৭১ সালের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য | স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি |
বেগম আখতার সোলায়মান | হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা; শীর্ষ পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিত্ব। | রেডিও পাকিস্তানে 'টিক্কা খান'-এর শাসনের প্রশংসা; মুক্তিযোদ্ধাদের 'দুষ্কৃতকারী' আখ্যা প্রদান। | ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক ও জুলফিকার আলী ভুট্টোকে অভিনন্দিত করে চিঠি প্রেরণ। |
রইসী বেগম | শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কন্যা; 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম'-এর প্রেসিডেন্ট। | ২৬শে মার্চকে "বিপদ মুক্তির দিন" বলা; 'জয় বাংলা' স্লোগানকে "পৌত্তলিকদের স্লোগান" বলে গালি দেওয়া। | স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আদর্শিক পাকিস্তানপন্থী হিসেবে ইতিহাসে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত। |
রাজিয়া ফয়েজ | ১৯৭১-এ জাতিসংঘের পাক প্রতিনিধি দলের সদস্য। | আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণহত্যা আড়াল করে পাকিস্তানের পক্ষে কুখ্যাত সাফাই গায়ন। | ১৯৭৯-এ মুসলিম লীগ থেকে প্রথম নারী এমপি; পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। |
ড. ফাতেমা সাদিক | ১৯৭১-এ জাতিসংঘের পাক প্রতিনিধি দলের সদস্য। | বিদেশে বাঙালি স্বাধিকার আন্দোলনকে "ভারতীয় চক্রান্ত" হিসেবে বয়ান তৈরি। | পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির সুবাদে পরবর্তী সময়ে অন্তরালে আত্মগোপন। |
বেগম রোকেয়া আব্বাস | ঢাকা থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ গ্রেপ্তারকৃত কুখ্যাত দালাল (তালিকার ২৫ নং)। | পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সাথে ঘাগু যোগাযোগ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন তথ্য পাচার। | ১৯৭২-এ দালাল আইনে অভিযুক্ত; পরবর্তীতে মামলা প্রত্যাহার সূত্রে ক্ষমতার জোরে মুক্ত। |
ফরিদা বেগম | শিবচর, ফরিদপুর থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ গ্রেপ্তার (তালিকার ২৯ নং)। | স্থানীয় পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা ও গ্রামে গ্রামে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান প্রদান। | দালাল আইনে গ্রেপ্তার পরবর্তীতে রাজনৈতিক সুযোগ নিয়ে আত্মগোপন। |
কুখ্যাত জরিনা | সিদ্দিক বাজারের প্রখ্যাত দালাল ও সরবরাহকারী (৭ জানুয়ারি ১৯৭২ গ্রেপ্তার)। | পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া এবং গুপ্তচরবৃত্তি সম্পাদন। | ২ নম্বর সেক্টরের গেরিলা বীরদের হাতে সিদ্দিক বাজার থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার। |
আফরোজা নূর আলী | তৎকালীন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী; এলিট সোসাইটির প্রতিনিধি। | পাকিস্তানি অফিসারদের কেপ্ট ও শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে গোপনীয় জাতীয় তথ্য সরবরাহ। | অর্থ ও ক্ষমতার জোর ব্যবহার করে ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে রেকর্ড বুক থেকে নাম গায়েব। |
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ভূমিকা আলোচনা করতে গেলে সাধারণত পুরুষ রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটির পুরুষ নেতাদের নামই সামনে আসে। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল, তৎকালীন সংবাদপত্র এবং যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা ও সামাজিক নিপীড়নকে বৈধতা দিতে এবং মুক্তিকামী বাঙালিদের দমনে একশ্রেণির নারী দালাল ও রাজাকার সরাসরি সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে ভূমিকা রেখেছিল।
নারী রাজাকারদের সাংগঠনিক কাঠামো ও পৃষ্ঠপোষকতা
একাত্তরে নারী দালাল ও রাজাকারদের ভূমিকা কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল বেশ কয়েকটি পাকিস্তানপন্থী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা।
ইসলামী ছাত্রী সংঘ ও জামায়াতে ইসলামীর নারী শাখা: তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রী সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রী সংঘ’ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা) এবং জামায়াতের মহিলা উইং একাত্তরে পাকিস্তান রক্ষার নামে সুসংগঠিতভাবে কাজ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রী সংঘের একাংশ সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সংগ্রহ এবং সাধারণ ছাত্রীদের মানসিক ব্রেইনওয়াশ করার কাজে নিয়োজিত ছিল। তারা রেজিস্টার্ড স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করার শপথ নিয়েছিল।
মুসলিম লীগ মহিলা শাখা ও শান্তি কমিটির নারী উইং: মুসলিম লীগের ফজলুল কাদের চৌধুরী, খান এ সবুর এবং খাজা খায়েরউদ্দিনের মতো উগ্র পাকিস্তানপন্থী নেতাদের পরিবারের নারী সদস্য এবং অনুসারী নারীরা 'মহিলা শান্তি কমিটি' গঠন করেছিলেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ময়মনসিংহে এই কমিটিগুলো স্থানীয় রাজাকারের কাজ সহজ করার জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করত।
মাঠে ও সামাজিক বলয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কৌশল
নগর ও গ্রামে সাধারণ মানুষের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে নারী দালালরা বেশ কিছু কৌশলগত উপায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা (Inter-Services Intelligence বা ISI) ও সামরিক পুলিশকে (Military Police) সাহায্য করত।
ছদ্মবেশী ফ্যামিলি ভিজিট (Family Visit): একাত্তরে অবরুদ্ধ ঢাকায় বা অন্যান্য শহরে অনেক নারী দালাল সাধারণ প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের ছদ্মবেশে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ঘরে যেতেন। পরিবারটিতে কোনো তরুণ বা ছাত্র মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছে কিনা, ঘরে ভারতের রেডিও শোনা হয় কিনা কিংবা কোনো শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে কিনা তা সুকৌশলে জেনে এসে স্থানীয় মিলিটারি ক্যাম্প বা পিস কমিটিকে জানিয়ে দেওয়া হতো।
চেকপোস্টে তল্লাশি ও সন্দেহভাজন শনাক্তকরণ: ঢাকা শহরের ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, সাভার, রাজারবাগ ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পাকিস্তানি সেনারা যখন তল্লাশি চালাত, তখন পুরুষ সেনারা বাঙালি নারীদের সরাসরি তল্লাশি করতে গিয়ে কিছুটা দ্বিধায় পড়ত। এই সুযোগে নারী দালালদের চেকপোস্টে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হতো। তারা স্বাধীনতাকামী নারী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ছদ্মবেশ ধরে থাকা সদস্যদের ব্যাগ ও পোশাক তল্লাশি করত এবং সন্দেহভাজনদের আর্মি ভ্যানে তুলে দিত।
সারপ্রাইজ ট্র্যাপ ও আশ্রয় দেওয়ার ছল: ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু কুখ্যাত নারী দালাল (যেমন পুরান ঢাকার জরিনা ও অন্যান্যরা) নিজেদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার ভান করত। তরুণ গেরিলারা নিরাপদ আশ্রয় মনে করে সেখানে উঠলেই রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাদের খবর দিয়ে পুরো বাড়ি ঘেরাও করিয়ে তাদের ধরিয়ে দেওয়া হতো।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রপাগান্ডা ও 'মহিলা প্রতিনিধি দল'
আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে জাতিসংঘ, রেড ক্রস (ICRC) এবং বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা ও ২ লাখ বাঙালি নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন পাকিস্তান সরকার সেই তথ্য মিথ্যা প্রমাণ করতে নারীদের দিয়ে প্রপাগান্ডা সেল তৈরি করেছিল।
জাতিসংঘে রাজিয়া ফয়েজ ও ড. ফাতেমা সাদিক
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তান চূড়ান্তভাবে কূটনৈতিক চাপে পড়ে। তখন জাতিসংঘে প্রেরিত প্রতিনিধি দলে রাজিয়া ফয়েজ এবং ড. ফাতেমা সাদিককে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের দায়িত্ব ছিল বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে বলা যে:
"পূর্ব পাকিস্তানে কোনো নারী নির্যাতন বা গণহত্যা হচ্ছে না। বাঙালি নারীরা অত্যন্ত নিরাপদে আছেন এবং তারা পাকিস্তান অখণ্ড রাখার জন্য পাক সেনাবাহিনীকে স্বেচ্ছায় সহায়তা করছেন। ভারত ভুয়া খবর ছড়িয়ে বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করছে।"
রেডিও পাকিস্তানে বিশেষ নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকার
১৯৭১ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে "আমাদের পাকিস্তান" এবং "মুসলিম বোনের প্রতি" শিরোনামে নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো। এতে রাজিয়া ফয়েজ, রইসী বেগম এবং বেগম আখতার সোলাইমানদের রেকর্ডকৃত ভাষণ বাজানো হতো, যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘শয়তানের অনুচর’ ও ‘কাফের’ আখ্যা দিয়ে বাঙালি নারীদের তাদের ছেলেদের মুক্তিবাহিনী থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হতো।
দালাল আইন ১৯৭২ এবং তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত সত্য
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী 'দালাল আইন' (The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972 - P.O. No. 8 of 1972) জারি করেন। এই আইনের আওতায় দেশজুড়ে তদন্ত শুরু হলে নারী দালালদের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
কেন নারী দালালদের বিচারে জটিলতা তৈরি হয়েছিল?
প্রমাণের অস্পষ্টতা ও সাক্ষী না পাওয়া: পুরুষ রাজাকাররা সরাসরি অস্ত্র হাতে টহল দিত বলে প্রামাণ্য সাক্ষী পাওয়া সহজ ছিল। কিন্তু নারী দালালদের অপরাধের বড় অংশ ছিল ড্রয়িংরুমের ষড়যন্ত্র, তথ্য পাচার ও কূটনৈতিক মিথ্যাচার, যার লিখিত প্রমাণ বা সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী খুঁজে বের করা কঠিন ছিল।
সামাজিক চাপ ও পারিবারিক গোপনীয়তা: অনেক ক্ষেত্রে নারী দালালরা ছিলেন উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের পরিবারগুলো স্বাধীনতার পর দ্রুত রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে মামলা প্রত্যাহারের তোড়জোর শুরু করে।
১৯৭৩ সালের আংশিক ক্ষমা (General Amnesty): ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার যেসব দালালের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা, rape (ধর্ষণ), অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল না, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। ফলে যেসব নারী দালাল কেবল "তথ্য পাচার" বা "প্রপাগান্ডা"-র সাথে যুক্ত ছিল, তারা আইনি ফাঁকগলে জেল থেকে জামিনে বের হয়ে আসে।
১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নথি গায়েবের নেপথ্য
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর বাংলাদেশের রাজনীতির উল্টো রথ শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি সায়েম ও তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান অধ্যাদেশ জারি করে 'দালাল আইন ১৯৭২' সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেন।
নথি গায়েব করার প্রশাসনিক কৌশল
দালাল আইন বাতিল হওয়ার পরপরই কারাগারে আটকে থাকা দালালরা মুক্তি পায়। একই সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় কারাগারের রেজিস্টার এবং থানা পর্যায়ের যেসব নথিতে এই ৫০ জন নারী দালাল ও সারাদেশে চিহ্নিত ৬২ জন নারীর নাম ছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ নিখোঁজ হয়ে যায়।
অর্থের প্রভাব: উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের নারী দালালরা মোটা অঙ্কের অর্থ ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পুলিশের ফাইল থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে ফেলে।
বিদেশে আত্মগোপন: করিম ড্রাগসের মালিকের স্ত্রীসহ এলিট শ্রেণির নারী দালালরা মামলা মুক্ত হয়ে দ্রত যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও আমেরিকায় পাড়ি জমান।
রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন
পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৮০-র দশকে রাজিয়া ফয়েজদের মতো নারী রাজাকারদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত করা হয়। তারা শুধু সমাজেই ফিরে আসেননি, বরং সংসদ সদস্য ও সরকারের পূর্ণ মন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করেন। এর ফলে একাত্তরে তাদের দালালির ইতিহাস ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।
ইতিহাসচর্চায় নারী রাজাকারদের অনুপস্থিতির সমাজতাত্ত্বিক কারণ
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্য ও ইতিহাসে কেন নারী রাজাকারদের কথা উঠে আসেনি, তার পেছনে কয়েকটি প্রধান সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক কারণ বিদ্যমান:
ভিকটিম বনাম অপরাধী (Victim vs. Perpetrator) মনস্তত্ত্ব: স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় নারীদের স্থান দেওয়া হয়েছিল মূলত "বীরাঙ্গনা" বা "নির্যাতিতা" (Victim) হিসেবে অথবা "বিক্ষুব্ধ জনতা/সহযোগিনী" হিসেবে। সমাজ মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বাস করতে চাইত না যে, নারীরাও এত বড় একটি গণসংহারে ঘাতকদের সহযোগী বা অপরাধী (Perpetrator) হতে পারে।
পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: বাঙালি সমাজ নারীকে প্রথাগতভাবে কোমল ও মমতাময়ী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। ফলে নারী যে কোনো ঘৃণ্য রাজনৈতিক চক্রান্তের মূল কারিগর বা দালাল হতে পারে এই সত্যটিকে সামাজিকভাবে এড়িয়ে যাওয়ার এক ধরণের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
এলিট ফ্যামিলি সিন্ডিকেট: একাত্তরের নারী রাজাকারদের একটি বড় অংশ ছিল শিক্ষিত ও তৎকালীন সমাজপতিদের পরিবারের সদস্য। ফলে স্বাধীনতার পর তাদের পরিবারগুলো সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিকদের কাছে এসব তথ্য প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করেছিল।
ঐতিহাসিক সত্যের পুনর্জাগরণ
ইতিহাস কখনো চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। ১৯৭২ সালের ২২ ও ২৩ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদ এবং পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদ এ. এল. খতিবের 'হু কিলড মুজিব', রোকেয়া কবীর ও মুজিব মেহেদীর 'মুক্তিযুদ্ধ ও নারী' ইত্যাদি প্রামাণ্য গ্রন্থ ও আর্কাইভাল নথি থেকে নারী রাজাকারদের যে ইতিহাস পাওয়া যায়, তা অকাট্য।
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে সম্পূর্ণরূপে জানতে হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার পাশাপাশি একাত্তরের ঘষেটি বেগমদের চিহ্নিত করাও সমান জরুরি।
যে ৫০ জন নারী দালাল ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিল, সিদ্দিক বাজারের যে জরিনা মেয়েদের পাক ক্যাম্পে পাঠাত কিংবা জাতিসংঘের মঞ্চে যে রাজিয়া ফয়েজরা গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইত তারা প্রত্যেকেই ৩০ লাখ শহীদের রক্তের কাছে অপরাধী।
ইতিহাসের বিচার ও বর্তমান প্রজন্মের দায়বদ্ধতা
ইতিহাসের এক চিরন্তন সত্য হলো অপরাধীকে কোনোদিন ঢেকে রাখা যায় না। যুগে যুগে যেভাবে ঘষেটি বেগমরা নিজের দেশ, জাতি ও স্বদেশের মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে মীর জাফরের সাথে হাত মিলিয়েছিল; ১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতেও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
এই ৫০ জন বা ৬২ জন নারী রাজাকার এবং রাজিয়া ফয়েজ, রইসী বেগম, বেগম আখতার সোলায়মানরা ছিলেন ১৯৭১ সালের আধুনিক 'ঘষেটি বেগম'। তারা নিজেদের সামান্য অর্থনৈতিক সুবিধা, ক্ষমতার দাপট, স্বামীদের পদোন্নতি এবং উগ্র ধর্মান্ধতার কারণে নিজ দেশের ৩০ লাখ মানুষের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করেছিলেন।
আজ স্বাধীনতার বহু দশক অতিক্রম করার পর, এই নারী রাজাকাররা জীবিত থাকুক বা না থাকুক ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের অবস্থান চিরকালের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।
ইতিহাস সচেতন নাগরিক এবং তরুণ প্রজন্মের প্রধান দায়িত্ব হলো:
সত্য নথি উদ্ধার করা: সরকারি ও বেসরকারি আর্কাইভে থাকা ১৯৭২ সালের দালাল আইনের নথিগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে নারী রাজাকারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা উন্মোচন করা।
রাজনৈতিক পুনর্বাসনের মুখোশ উন্মোচন: কীভাবে একাত্তরের দালালরা পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে পুনর্বাসিত হয়েছিল, তা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
স্মৃতি রক্ষা ও তীব্র ধিক্কার: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে আমরা শ্রদ্ধার সাথে হৃদয়ে ধারণ করব, ঠিক তেমনি ঘষেটি বেগম ও নারী রাজাকারদের ইতিহাসকেও তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কারের সাথে মনে রাখতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ইতিহাস বিকৃতির সাহস না পায়।
উপসংহার
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ন্যায় বনাম অন্যায়ের, সত্য বনাম অসত্যের এবং মানবতা বনাম দানবীয়তার যুদ্ধ। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যারা নিজেদের স্বজাতি ও মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাদের কোনো লিঙ্গভিত্তিক ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
পুরুষ রাজাকারের অপরাধ যতটুকু, নারী রাজাকারের অপরাধও ঠিক ততটুকুই গুরুতর। ইতিহাসকে তার সম্পূর্ণ সত্য রূপেই গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা সেই ৫০ জন নারী রাজাকার, সিদ্দিক বাজারের কুখ্যাত জরিনা কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বিষোদগার করা রাজিয়া ফয়েজরা বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের কলঙ্কিত চরিত্র। ক্ষমতার জোরে বা রেকর্ড বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলে সাময়িকভাবে নিজেদের নাম লুকানো গেলেও, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের আদালতে এদের প্রতি অনন্তকাল ঘৃণা ও ধিক্কার অব্যাহত থাকবে। ইতিহাস চিরদিন সত্যের জয়ঘোষণা করে এবং ঘষেটি বেগমদের ধিক্কার জানিয়ে বীরদের অমরত্ব প্রদান করে।















