>
>
একাত্তরে পবিত্র মসজিদ ও হাসপাতালে পাকিস্তানি বাহিনীর ন্যক্কারজনক গণহত্যা
একাত্তরে পবিত্র মসজিদ ও হাসপাতালে পাকিস্তানি বাহিনীর ন্যক্কারজনক গণহত্যা
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সামরিক বাহিনী সবসময় নিজেদের ‘ইসলামের রক্ষক’ এবং তাদের এই বর্বর আক্রমণকে ‘ইসলামি রাষ্ট্র রক্ষা’র ধর্মযুদ্ধ বলে মিথ্যা প্রচার চালাত। কিন্তু তাদের আসল রূপ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা এমন সব অপকর্ম ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল, যা ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস, পবিত্রতা এবং সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী। পবিত্র মসজিদ, মেহরাব, মাদ্রাসা কিংবা নিষ্পাপ শিশুদের পঠিত পবিত্র কুরআন শরিফের পৃষ্ঠা কোনোটাই তাদের বুলেটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে বাঙালি জাতির ওপর যে নজিরবিহীন গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বিশ্ব মানবেতিহাসের অন্যতম নির্মম ও বর্বরতম কালো অধ্যায়। তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসক ও তাদের দোসররা এই ভূখণ্ডে তাদের অবৈধ ক্ষমতা ও ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখতে এক সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ (Genocide) পরিচালনা করেছিল। এই নারকীয় তাণ্ডব কেবল রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী কিংবা সম্মুখ সমরের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সামরিক বাহিনী সবসময় নিজেদের ‘ইসলামের রক্ষক’ এবং তাদের এই বর্বর আক্রমণকে ‘ইসলামি রাষ্ট্র রক্ষা’র ধর্মযুদ্ধ বলে মিথ্যা প্রচার চালাত। কিন্তু তাদের আসল রূপ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা এমন সব অপকর্ম ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল, যা ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস, পবিত্রতা এবং সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী।
পবিত্র মসজিদ, মেহরাব, মাদ্রাসা কিংবা নিষ্পাপ শিশুদের পঠিত পবিত্র কুরআন শরিফের পৃষ্ঠা কোনোটাই তাদের বুলেটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইন এবং জেনেভা কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুদ্ধের সময় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের স্থান হাসপাতালগুলোকে তারা রূপান্তর করেছিল রক্তরঞ্জিত বধ্যভূমিতে। সেখানে চিকিৎসাধীন মুমূর্ষু রোগী, জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এই নিবন্ধে প্রামাণ্য গবেষণা, ঐতিহাসিক দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের ভিত্তিতে একাত্তরে মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পাকিস্তানি বাহিনীর সেই ন্যক্কারজনক পৈশাচিকতার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।
মসজিদ ও মাদ্রাসার রক্তভেজা ইতিহাস
পাকিস্তানের তৎকালীন স্বৈরাচারী সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান এবং এ কে নিয়াজির অনুগত সামরিক বাহিনী এ দেশের মানুষকে ধর্মীয় বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য নিয়মিত ‘ইসলাম বিপন্ন’ এবং ‘বাঙালিরা কাফের’ বলে অপপ্রচার চালাত। কিন্তু বাস্তবে তাদের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল পবিত্র মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও গবেষক ড. আহম্মেদ শরীফ তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১’-এ একাত্তরে ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে সংঘটিত বেশ কিছু মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক গণহত্যার তথ্য দালিলিক প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছেন।
ইবাদতরত বৃদ্ধ ও সাধারণ মুসল্লিদের ওপর নারকীয় হামলা
পাকিস্তানি সেনাদের কাছে একজন সালাতরত বা ইবাদতরত বৃদ্ধ মুসলিমের প্রাণের কোনো মূল্য ছিল না। তাদের বুলেটের আঘাতে মসজিদের রক্তভেজা কার্পেট ও মেহরাব কালিমালিপ্ত হয়েছিল।
নাটোর সদর উপজেলার বনবেলঘরিয়া গণহত্যা: নাটোর জেলার বনবেলঘরিয়া গ্রামের স্থানীয় মসজিদে ১০৫ বছর বয়সী প্রবীণ বৃদ্ধ সৈয়দ আলী মুন্সি ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। একাত্তরের নারকীয় তাণ্ডবের সময় জরাগ্রস্ত এই বৃদ্ধ ইবাদতরত অবস্থায় আল্লাহর জিকির করছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা বন্দুকের বাঁট ও বেয়নেট দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে মসজিদের ভেতর থেকে বাইরে বের করে আনে এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সালামপুর মসজিদ গণহত্যা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সালামপুর জামে মসজিদে জোহরের সালাত আদায়রত অবস্থায় সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী। ইবাদতের উদ্দেশ্যে সেজদায় অবনত থাকা দুজন নিষ্পাপ মুসল্লিকে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে মেহরাবের ওপরেই শহীদ করা হয়।
পঞ্চগড়ের দুইপাড়া মাদ্রাসা ও হাফেজ আসিকুল্লাহ হত্যাকাণ্ড: পঞ্চগড়ের দুইপাড়া এলাকায় অবস্থিত একটি দ্বীনি মাদ্রাসায় স্থানীয় আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ আশ্রয়ের আশায় সমবেত হয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অন্তত পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালাবে না। কিন্তু হানাদার বাহিনী সেখানে চড়াও হয়ে প্রবীণ ও তরুণদের টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সেখানেই তারা গুলি করে হত্যা করে পবিত্র কুরআনের হাফেজ আসিকুল্লাহকে, যিনি কোনো ধরনের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।
জীবন্ত মানুষ ভস্ম এবং পবিত্র কুরআনের অবমাননা
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতার সীমানা এতদূর পৌঁছেছিল যে, তারা মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় পবিত্র শৃঙ্খল ও গ্রন্থগুলোকেও আগুনে পুড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেনি।
লালমনিরহাটে সাকোয়া জামে মসজিদের বিভীষিকা
লালমনিরহাট জেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নে অবস্থিত সাকোয়া জামে মসজিদে একাত্তরে মানব সভ্যতার অন্যতম বীভৎস অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। গ্রামে আর্মি ঢোকার খবর পেয়ে আতঙ্কিত ৬৪ জন সাধারণ গ্রামবাসী প্রাণ বাঁচাতে ও আল্লাহর জিকির করতে মসজিদে আশ্রয় নেন।
পাকিস্তানি সেনারা ঘটনাটি জানতে পেরে পুরো মসজিদটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তারা মসজিদের দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেয় এবং জানালায় কাঠ ও পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের তীব্র লেলিহান শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ছটফট করতে করতে পবিত্র ঘরের ভেতরই ভস্মীভূত হয়ে প্রাণ হারান ৬৪ জন নিরীহ মানুষ।
ঠাকুরগাঁওয়ে পবিত্র কুরআনের পাতায় রক্তের দাগ
ফতেঙ্গাপাড়া এলাকায় সংঘটিত গণহত্যা শেষে যখন স্বজনরা শহীদদের লাশ উদ্ধার করতে যান, তখন শহীদ আব্দুস সালাম সরকারের বুকের ওপর পাওয়া যায় একটি রক্তভেজা পবিত্র কুরআন শরিফ। তিনি মৃত্যুর আগমুহূর্তেও পবিত্র কুরআন বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন, যা বুলেট দ্বারা ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও জেলায় পুলিশ লাইনস সংলগ্ন মাদ্রাসায় আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের স্থানীয় দোসররা কক্ষের ভেতরে থাকা পবিত্র কুরআন শরিফ ও অন্যান্য হাদিসের বই স্তূপ করে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধর্মের কোনো প্রকৃত নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্য ছিল না; ধর্ম ছিল কেবল বাঙালির জাতিসত্তা ধ্বংস করার একটি ছদ্মবেশী কূটনৈতিক অস্ত্র।
সাতক্ষীরার মাহমুদপুর ঘোনার মসজিদ ট্র্যাজেডি
একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর বাহিনী যে নারী নির্যাতন ও গণধর্ষণ চালিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে অন্যতম জঘন্যতম ঘটনা। গবেষক তপন কুমার দে তাঁর ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ’-এ এই অবর্ণনীয় নির্যাতনের প্রামাণ্য নথিপত্র তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সাতক্ষীরার মাহমুদপুর ঘোনার মসজিদে সংঘটিত ঘটনাটি যেকোনো মানবতাবোধসম্পন্ন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতে বাধ্য।
১০ই ডিসেম্বরের সেই বিভীষিকাময় উদ্ধার অভিযান
১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর। চড়ম পরাজয় আসন্ন জেনেও পাকিস্তানি সেনারা তাদের বর্বরতা থামায়নি। মিত্রবাহিনীর অংশ হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং তখন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের সাথে সাতক্ষীরার সীমান্ত পার হয়ে ভেতরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সেই বহরে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও দূরদর্শী মুসা সাদিক।
সাতক্ষীরার মাহমুদপুর ঘোনার কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎ তিনজন সাধারণ কৃষক এবং দুজন ছোট বালক হাত নেড়ে কান্নাকাটি করতে করতে তাঁদের গাড়ি থামায়। মুক্তিযোদ্ধারা গাড়ি থেকে নেমে আসার পর ওই গ্রামীণ কৃষকেরা কান্নায় ভেঙে পড়ে মাহমুদপুর ঘোনার স্থানীয় জামে মসজিদের দিকে ইঙ্গিত করেন। তারা জানান, গত কয়েক মাস ধরে পাকিস্তানি হানাদারদের একটি দল ওই পবিত্র মসজিদটিকে নিজেদের সামরিক আস্তানা ও নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করে রেখেছিল এবং সেখানে এলাকার ১১ জন উদীয়মান তরুণীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
অবর্ণনীয় ও লোমহর্ষক দৃশ্য
সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং ও মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি কাল বিলম্ব না করে দ্রুত মসজিদটি ঘেরাও করেন এবং কৌশলগত আক্রমণে ভেতরের পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্ত করে মসজিদটি দখলমুক্ত করেন।
কিন্তু মসজিদের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করার পর যে দৃশ্য তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা বর্ণনা করার ভাষা কোনো মানুষের জানা নেই।
মসজিদের কার্পেট ও মেহরাবের ওপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বাকরুদ্ধ হয়ে কাঁদছিলেন ১১ জন নারী। তাঁদের প্রত্যেকের শরীর ছিল সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন ও বিবস্ত্র। টানা কয়েক মাস ধরে পরম সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের জন্য নির্ধারিত ওই স্থানটিতে এই নারীদের ওপর চালানো হয়েছিল পাশবিক নির্যাতন ও পাশবিকতার নারকীয় তাণ্ডব। যে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের বিশ্বমঞ্চে ‘ইসলামের সৈনিক’ হিসেবে দাবি করত, তারাই পবিত্র ইবাদতখানাকে তাদের পৈশাচিক যৌন লালসা মেটানোর আস্তানায় পরিণত করে রেখেছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে, একাত্তরে পাকিস্তানিদের পৈশাচিকতার কাছে কোনো নৈতিকতা বা ধর্মীয় পবিত্রতা শ্রদ্ধার পাত্র ছিল না।
আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে হাসপাতালে হামলা
আন্তর্জাতিক সামরিক আইন, ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন (Geneva Convention) এবং সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালীন যেকোনো পরিস্থিতিতে হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স এবং লাল ক্রস/লাল অর্ধচন্দ্র চিহ্নিত স্থানগুলো সম্পূর্ণ ‘নিরাপদ অঞ্চল’ (Safe Zone) হিসেবে গণ্য হবে। সেখানে আঘাত হানা বা কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করা গুরুতর যুদ্ধাপরাধ (War Crime) হিসেবে বিবেচিত।
কিন্তু ১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী বিশ্বজনীন এই সমস্ত আইনি ও মানবিক বিধিবিধানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল। তারা ভেবেছিল, আহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাদানকারী ডাক্তার-নার্সদের ধ্বংস করতে পারলে বাঙালি জাতিকে সহজেই নিঃশেষ করা যাবে। ফলে তারা হাসপাতালগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হিংস্র পশুর মতো।
ড. আহম্মেদ শরীফ তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, একাত্তরে কুমিল্লা পুলিশ লাইন হাসপাতাল, নাটোর সদর হাসপাতাল এবং লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত হামলা ছিল আধুনিক সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলোর অন্যতম।
নাটোর সদর হাসপাতাল ও শহীদ জীবনকৃষ্ণ মানির মর্মান্তিক আখ্যান
সুমা কর্মকার তাঁর প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: নাটোর জেলা’-এ নাটোর সদর হাসপাতালে সংঘটিত একটি রোমহর্ষক ও বেদনাদায়ক হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত লিপিবদ্ধ করেছেন।
মরণফাঁদ ও জীবনের বিনিময়ে সেবা
১৯৭১ সালের ১৬ই এপ্রিল। নাটোরে প্রবেশ করেছে পাকিস্তানি সেনারা। চারদিকে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা। নাটোর সদর হাসপাতালের একনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী জীবনকৃষ্ণ মানি যখন সার্বিক নিরাপত্তার অভাব দেখে পরিবার নিয়ে শহর ছেড়ে নিরাপদ কোনো গ্রামে চলে যেতে চেয়েছিলেন, তখন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী দালাল ও অসাধু ব্যক্তি (আঁকি চৌধুরী, মধু মিয়া ও দুদু মিয়া) তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল। তারা তাঁকে বলেছিল:
"তুমি তো একজন হাসপাতালের সেবক, চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত মানুষের ওপর কেউ কখনো হামলা চালায় না। তোমরা হাসপাতালে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকো, তোমাদের কোনো বিপদ হবে না।"
কিন্তু তাঁদের এই আশ্বস্তকরণ ছিল একটি সুপরিকল্পিত 'মরণফাঁদ'। পাকিস্তানি সেনারা শহরে ঢুকে জীবনকৃষ্ণের বাড়িতে প্রথম আক্রমণ চালায় এবং তাঁকে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করে মারাত্মকভাবে আহত করে।
হাসপাতালের আঙিনায় ৩ রাউন্ড গুলির শব্দ
মারাত্মক আহত অবস্থায় জীবনকৃষ্ণকে যখন উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে বাঁচাতে আকুল হয়ে পড়েন। তাঁরা তাঁকে হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের পেছনের একটি সুরক্ষিত কক্ষে লুকিয়ে রেখে গোপনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু স্থানীয় দালালচক্র এই খবরটি দ্রুত হানাদার বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। পাকিস্তানি মিলিটারির একটি সশস্ত্র টিম হাসপাতালে প্রবেশ করে প্রতিটি ওয়ার্ডে তাণ্ডব চালায়। তারা জীবনকৃষ্ণকে খুঁজে বের করে টেনে-হিঁচড়ে হাসপাতালের আঙিনায় নিয়ে আসে এবং চিকিৎসাধীন ও সেবারত অন্যান্যদের সামনেই তাঁর বুক লক্ষ্য করে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালায়। রক্তে ভেসে যায় নাটোর সদর হাসপাতালের সাদা আঙিনা।
লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালে ৩০ জন চিকিৎসাধীন রোগীকে বেয়নেটে হত্যা
লালমনিরহাট ছিল তদানীন্তন উত্তরবঙ্গের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন ও কৌশলগত স্থান। আজহারুল আজাদ জুয়েল তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: লালমনিরহাট জেলা’-এ একাত্তরের এপ্রিল মাসে এই লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালে সংঘটিত নারকীয় নিধনযজ্ঞের কথা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
শয্যাশায়ী রোগীদের ওপর বেয়নেটের তাণ্ডব
১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লালমনিরহাট শহরে প্রথম প্রবেশ করেই রেলওয়ে হাসপাতালটি ঘেরাও করে। সাধারণ সময়ে যেকোনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকেন। কিন্তু উন্মত্ত পাকিস্তানি সেনাদের কাছে তাঁদের রোগাক্রান্ত শরীর কোনো সহানুভূতি পায়নি।
হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে প্রতিটি বেডে গিয়ে শায়িত থাকা প্রায় ৩০ জন মুমূর্ষু রোগীকে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করে। কোনো কোনো রোগীকে বিছানা থেকে টেনে মেঝেতে আছড়ে ফেলে বুট দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করা হয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে শহীদদের মধ্যে ছিলেন লালমনিরহাট থানার তৎকালীন দায়িত্বশীল ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোশাররফ হোসেন এবং খোচাবাড়ি মডেল হাই স্কুলের মেধাবী ছাত্র সোলেমান আলী কান্দু।
নার্সের সামনে দুই কিশোর সন্তানের মর্মান্তিক পরিণতি
রেলওয়ে হাসপাতালের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সমান্তরালে হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই ঘটেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা। উক্ত হাসপাতালে লতিফা বেগম নামের এক নিষ্ঠাবান নার্স কর্মরত ছিলেন, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে আহত রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন।
পাকিস্তানি সেনারা হাসপাতালে ঢোকার পর লতিফা বেগমের দুই কিশোর ছেলে লতিফুল ইসলাম ও রিয়াজুল ইসলামকে আটক করে। অবুঝ এই দুই সন্তান তাদের মায়ের কাজের জায়গায় কেবল অবস্থান করছিল। সেনারা দুই কিশোরকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় হাসপাতালের কাছে থাকা ট্রলিল্যান্ড এলাকায়।
সেখানে প্রসূতি ও রোগী সেবায় নিয়োজিত মা লতিফা বেগমের চোখের সামনেই তাঁর দুই সন্তানকে ধারালো অস্ত্র ও বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে ও খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একজন মায়ের চোখের সামনে তাঁর সন্তানদের এই নারকীয় মৃত্যু প্রমাণ করে যে, একাত্তরে চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর প্রতি পাকিস্তানি শাসক ও সেনাবাহিনীর কতখানি অন্ধ আক্রোশ ছিল।
একাত্তরে মসজিদ ও হাসপাতালে পরিচালিত প্রধান গণহত্যার পরিসংখ্যান ও ইতিহাস
নিচে একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘটিত প্রধান প্রধান গণহত্যা ও বর্বরোচিত আক্রমণের তথ্যভিত্তিক সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
হামলার স্থান / প্রতিষ্ঠান | জেলার নাম | ঘটনার বিবরণ ও আক্রমণ পদ্ধতি | হতাহতের সংখ্যা / শহীদদের পরিচিতি | ঐতিহাসিক দালিলিক উৎস |
বনবেলঘরিয়া জামে মসজিদ | নাটোর | ১০৫ বছরের বৃদ্ধ সৈয়দ আলী মুন্সিকে ইবাদতরত অবস্থায় টেনে বের করে হত্যা। | ১ জন (প্রবীণ মুসল্লি) | ড. আহম্মেদ শরীফ (মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ) |
সালামপুর জামে মসজিদ | চাঁপাইনবাবগঞ্জ | সেজদারত ও সালাতরত অবস্থায় সাধারণ মুসল্লিদের ওপর কাছ থেকে গুলি চালনা। | ২ জন (সাধারণ সালাত আদায়কারী) | ড. আহম্মেদ শরীফ (মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ) |
সাকোয়া জামে মসজিদ | লালমনিরহাট | মসজিদে আশ্রয় নেওয়া ৬৪ জন সাধারণ মানুষকে তালাবদ্ধ করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। | ৬৪ জন (ভস্মীভূত নিরীহ গ্রামবাসী) | ড. আহম্মেদ শরীফ (মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ) |
দুইপাড়া মাদ্রাসা | পঞ্চগড় | আশ্রিত মানুষদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা এবং কুরআনের হাফেজকে গুলি। | হাফেজ আসিকুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন | ড. আহম্মেদ শরীফ (মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ) |
মাহমুদপুর ঘোনার মসজিদ | সাতক্ষীরা | পবিত্র মসজিদকে পাকিস্তানি ক্যাম্প বানিয়ে দীর্ঘ সময় ১১ জন তরুণীকে বন্দি ও নির্যাতন। | ১১ জন বীরাঙ্গনা নারী (উদ্ধার প্রাপ্ত) | তপন কুমার দে (পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ) |
নাটোর সদর হাসপাতাল | নাটোর | চিকিৎসাধীন আহত কর্মী জীবনকৃষ্ণ মানিকে খুঁজে বের করে ৩ রাউন্ড গুলি করে হত্যা। | ১ জন (হাসপাতাল কর্মী জীবনকৃষ্ণ) | সুমা কর্মকার (গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ) |
লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতাল | লালমনিরহাট | হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে বেডে শায়িত ৩০ জন মুমূর্ষু রোগীকে বেয়নেটে খুঁচিয়ে হত্যা। | ৩০ জন রোগী (ওসি মোশাররফ ও অন্যান্য) | আজহারুল আজাদ জুয়েল (গণহত্যা-বধ্যভূমি জরিপ) |
রেলওয়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ | লালমনিরহাট | নার্স লতিফা বেগমের দুই কিশোর সন্তান লতিফুল ও রিয়াজুলকে কুপিয়ে হত্যা। | ২ জন কিশোর | আজহারুল আজাদ জুয়েল (গণহত্যা-বধ্যভূমি জরিপ) |
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) মানবতাবিরোধী অপরাধ কেবল সম্মুখ সমরে বা সাধারণ গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন (Geneva Conventions) অনুযায়ী যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতের সময় হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ইবাদতখানা (মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা) এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে ‘সুরক্ষিত ও নিরাপদ এলাকা’ (Protected Zones) হিসেবে গণ্য করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু একাত্তরে বাঙালি জাতিকে মেধা, চেতনা ও শারীরিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে দখলদার বাহিনী এই সমস্ত সুরক্ষিত স্থানে ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল।
ধর্মীয় উপাসনালয়ে তাণ্ডব: রমনা কালী মন্দির, সেন্ট পলস চার্চ ও অন্যান্য বধ্যভূমি
পাকিস্তানি বাহিনী একদিকে যেমন ইসলামের দোহাই দিয়ে মসজিদগুলোতে রক্তপাত ঘটিয়েছে, অন্যদিকে এ দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিনাশ করতে মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়গুলোকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযানে মেতেছিল।
রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম গণহত্যা (২৭শে মার্চ ১৯৭১)
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর পর ২৭শে মার্চ ভোরে পাকিস্তানি সেনাদল ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রমে ভারী ট্যাংক ও কামান নিয়ে হামলা চালায়।
আক্রমণের ভয়াবহতা: ভোরবেলায় মন্দিরের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পাকিস্তানি সেনারা সেখানে অবস্থানরত সাধু, পুণ্যার্থী ও আশ্রয় নেওয়া সাধারণ পরিবারের ওপর চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি: মন্দিরের পুরোহিত শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরিসহ ১০০ জনেরও বেশি নিরপরাধ নারী, পুরুষ ও শিশুকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর পুরো মন্দির ও ঐতিহ্যবাহী আশ্রমটিকে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়।
ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার মারিও ভেরোনেসি হত্যা ও সেন্ট পলস চার্চ হামলা
খুলনার ধানঝুড়িতে অবস্থিত সেন্ট পলস চার্চ এবং তার সংলগ্ন জপমালা প্রসূতি হাসপাতালে একাত্তরে মানবিক সেবাদান চলছিল। যুদ্ধের সময় সেখানে অনেক আহত বাঙালি ও অন্তঃসত্ত্বা নারী আশ্রয় নিয়েছিলেন।
ফাদার মারিও ভেরোনেসির আত্মত্যাগ: ইতালীয় ক্যাথলিক ধর্মযাজক ফাদার মারিও ভেরোনেসি (Father Mario Veronesi) রেড ক্রস বা লাল ক্রস পতাকা টানিয়ে আহত মানুষদের সেবা দিচ্ছিলেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি বাহিনী চার্চ ও হাসপাতালে হামলা চালায়। ফাদার মারিও ভেরোনেসি যখন বুকে ক্রুশ নিয়ে হানাদারদের থামানোর চেষ্টা করেন, তখন পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। একজন আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ ধর্মযাজকও তাদের হিংস্রতা থেকে রেহাই পাননি।
চিকিৎসকদের ওপর 'টার্গেটেড কিলিং' ও হাসপাতাল বধ্যভূমি
একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম সুদূরপ্রসারী কৌশল ছিল চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেওয়া, যেন আহত মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ নাগরিকেরা কোনো চিকিৎসা না পান। এর জন্য তারা কেবল হাসপাতালে রোগী হত্যা করেনি, বরং তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় মানবতাবাদী চিকিৎসকদের তালিকা করে হত্যা করেছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে হামলা
২৫শে মার্চের রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সংলগ্ন হোস্টেলে আক্রমণ চালানো হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রক্তদান করতে আসা ও চিকিৎসা নিতে আসা বহু মানুষকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়। একইভাবে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে ঢুকে একাধিক ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীকে হত্যা করে তাদের লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
শহীদ ড. ফজলে রাব্বী ও শহীদ ড. আলিম চৌধুরী হত্যা
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, যখন পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন আল-বদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী নিধন তালিকার অংশ হিসেবে দেশের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের তাঁদের বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে যায়।
অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বী: ঢাকা মেডিকেল কলেজের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বী গোপনে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পাঠাতেন। ১৫ই ডিসেম্বর তাঁকে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
অধ্যাপক ডা. আলিম চৌধুরী: প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলিম চৌধুরীকে ১৪ই ডিসেম্বর তাঁর রমনাস্থিত বাসভবন থেকে আল-বদর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মিরপুর বধ্যভূমিতে তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়, যেখানে তাঁর শরীরে অসংখ্য বেয়নেরটের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাসকে বধ্যভূমিতে রূপান্তর
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। তাই ২৫শে মার্চ থেকে শুরু করে পুরো ৯ মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সামরিক ক্যাম্প ও বধ্যভূমিতে রূপান্তর করে রাখা হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক ও জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি: ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।
জগন্নাথ হল গণহত্যা: ২৫শে মার্চ গভীর রাতে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে জহুরুল হক হল (তৎকালীন ইকবাল হল) ও জগন্নাথ হলে হামলা চালানো হয়। হলের কক্ষগুলোতে রকেট লঞ্চার ও গ্রেনেড ছুড়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। রুম থেকে বের হয়ে আসা ছাত্র, কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারদের হলের মাঠের সেন্ট্রাল লনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়।
হল সংলগ্ন শিব মন্দির ও কর্মচারী আবাসন: জগন্নাথ হলের ভেতরে থাকা শিব মন্দিরে আক্রমণ চালিয়ে পুরোহিত ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়ে গণকবর তৈরি করে আহত ও নিহতদের একসাথে চাপা দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুদ্ধ আইনসমূহের প্রতিটি ধারা প্রকাশ্যে ভেঙেছিল।
১৯৪৯ সালের প্রথম ও চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন (Geneva Conventions of 1949):
ধারা ১৮ ও ১৯ (Article 18 & 19): বেসামরিক হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র কোনো অবস্থাতেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারবে না।
ধারা ২৪ (Article 24): যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী কর্মী, নার্স ও চিকিৎসকদের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
পাকিস্তানি বাহিনীর ভূমিকা: লালমনিরহাট, নাটোর ও কুমিল্লার হাসপাতালে রোগী ও চিকিৎসকদের হত্যা করে এই আইনের সরাসরি লঙ্ঘন করা হয়।
১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন (The Hague Convention 1954):
কালচারাল প্রপার্টি ও ধর্মীয় উপাসনালয় (মসজিদ, মন্দির, গির্জা) যুদ্ধের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
পাকিস্তানি বাহিনীর ভূমিকা: রমনা কালী মন্দির ধ্বংস, সাকোয়া মসজিদে আগুন এবং মাহমুদপুর ঘোনার মসজিদে বন্দিশালা বানিয়ে ধর্মীয় স্থাপনার অবমাননা করা হয়।
কেন মসজিদ ও হাসপাতালে হামলা চালানো হয়েছিল?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনী কেন ইবাদতখানা এবং হাসপাতালের মতো সুরক্ষিত স্থানগুলোকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল? এর নেপথ্যে ছিল কতগুলো নির্দিষ্ট সামরিক ও মানসিক কারণ:
নৈতিক বিশ্বাস ও আত্মবল ধ্বংস করার কৌশল: বাঙালি জাতিসত্তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য তারা সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে আঘাত হেনেছিল। একটি গ্রামের মানুষকে ভয় দেখানোর সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল সেখানকার মসজিদ, মন্দির কিংবা প্রধান আশ্রয়ের জায়গায় হামলা চালানো।
‘ইসলাম বিপন্ন’ কার্ডের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন দেখল যে বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিমরা তাদের ধর্মের ফাঁদে না পা দিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, তখন তাদের ক্রোধ গিয়ে পড়ে এ দেশের সাধারণ মুসলিম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর।
আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাপথ রুদ্ধ করা: পাকিস্তানি সেনারা জানত যে, যুদ্ধের ময়দানে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্থানীয় হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই শত্রুর চিকিৎসার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে তারা সরাসরি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল।
ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর কুফল: কোনো গোষ্ঠী যখন নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে ঢাকার জন্য ধর্মকে কেবল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তাদের কাছে ধর্মের মৌলিক পবিত্রতা বা ইবাদতখানার মর্যাদার কোনো স্থান থাকে না। পাকিস্তানি বাহিনীর ক্ষেত্রেও এটিই ঘটেছিল।
বর্তমান প্রজন্ম ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এই ইতিহাস
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে একাত্তরে মসজিদ, মাদ্রাসা ও হাসপাতালে পরিচালিত এই গণহত্যার স্মৃতি কেবল একটি পুরনো দুঃখের ইতিহাস নয়; এটি বর্তমান প্রজন্ম এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এক বিরাট শিক্ষা।
ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চরম শিক্ষা: একাত্তরের ঘটনা প্রমাণ করে, যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চায় বা অন্যায় রক্তপাত ঘটাতে চায়, তারা কখনো ধর্মের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। তারা নিজেদের স্বার্থে পবিত্র উপাসনালয় বা ধর্মগ্রন্থকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
মানবাধিকার ও যুদ্ধাপরাধের চিরন্তন দলিল: যুদ্ধের সময় হাসপাতাল ও সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের ওপর হামলা চালানো আন্তর্জাতিক অপরাধ। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর এই বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডগুলো বিশ্বমঞ্চে ‘বাঙালি গণহত্যা’র স্বীকৃতি অর্জনের জন্য অত্যন্ত শক্ত দালিলিক প্রমাণ।
স্বাধীনতার মূল্য অনুধাবন: আজকের তরুণ প্রজন্মকে জানতে হবে, যে স্বাধীন বাংলাদেশ তারা উপহার পেয়েছে, তার প্রতিটি ইঞ্চির পেছনে কত ত্যাগ জমা হয়ে আছে। যে দেশে আজ শান্তিতে আজান হয়, যে দেশের হাসপাতালে আজ নির্বিঘ্নে মানুষ সেবা পায় সেই পরিবেশ তৈরি করতে হাজারও জীবনকৃষ্ণ কিংবা হাফেজ আসিকুল্লাহকে রক্ত দিতে হয়েছে।
উপসংহার
১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নয়টি মাস ধরে বাংলার মাটিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা যে তান্ডবলীলা চালিয়েছিল, তা কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই ছিল না; তা ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মৌলিক মানবিকতার ওপর চরম আঘাত।
পবিত্র মসজিদের মেহরাবে নামাজরত অবস্থায় বৃদ্ধের প্রাণ কেড়ে নেওয়া, সাকোয়া মসজিদে ৬৪ জন মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, মাহমুদপুর ঘোনার মসজিদে মা-বোনদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো এবং হাসপাতালের শয্যায় শায়িত মুমূর্ষু রোগীকে বেয়নেটে খুঁচিয়ে মারা এই প্রতিটি ঘটনা একাত্তরের ট্র্যাজেডির এক একটি রক্তঝরা দলিল।
পাকিস্তানের দখলদার সেনারা মুখে 'ইসলাম রক্ষার' বুলি আওড়ালেও তাদের কাজ ছিল সম্পূর্ণ ইবলিসি ও পাশবিক। ইতিহাস কোনো অপরাধীকে ক্ষমা করে না। আজ স্বাধীনতার এত বছর পরও ঐতিহাসিক দলিলে তাদের এই ঘৃণ্য অপরাধগুলো উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার স্মৃতির সাথে এই বেদনাবিধুর ত্যাগের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে, যেন ধর্মের অপব্যবহার করে কোনো স্বৈরাচারী বা দখলদার শক্তি আর কখনোই মানবতা, বিশ্বাস ও ইবাদতখানার পবিত্রতার ওপর চড়াও হওয়ার দুঃসাহস না পায়।
তথ্যসূত্র:
১. গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: লালমনিরহাট জেলা - আজহারুল আজাদ জুয়েল।
২. গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: নাটোর জেলা - সুমা কর্মকার।
৩. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ - ড. আহম্মেদ শরীফ।
৪. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ - ড. আহম্মেদ শরীফ।
৫. বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ - তপন কুমার দে।















