>
>
৩৯ মুক্তিযোদ্ধা ও ৪ খেতাবপ্রাপ্ত বীর - ধানুয়া কামালপুর স্কুলের বীর সন্তানেরা
৩৯ মুক্তিযোদ্ধা ও ৪ খেতাবপ্রাপ্ত বীর - ধানুয়া কামালপুর স্কুলের বীর সন্তানেরা
জামালপুরের বকশীগঞ্জে অবস্থিত ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের। এটিই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে অন্তত ৩৩ জন (মূল তথ্যে ৩৯ জন বলা হলেও, যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী ৩৩ জন) ছাত্র সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এবং তাদের মধ্যে তিন জন ছাত্র চারটি বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব লাভ করেন।

TruthBangla

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বিপুল রক্ত, অতুলনীয় আত্মত্যাগ এবং কোটি মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধগাথায় রচিত এক মহাকাব্য। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক আলোচনায় সচরাচর বড় বড় সামরিক অপারেশন, মেজর কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয় নীতিগুলোই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় ইতিহাসের মূল ধারার অলক্ষ্যে মফস্বলের নিভৃত পল্লিতে রয়ে গেছে অসংখ্য অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর ইতিহাস, যা কোনো কাল্পনিক মহাকাব্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
তেমনি এক প্রায়-বিস্মৃত কিন্তু চরম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী অখ্যাত গ্রাম ধানুয়া কামালপুরে অবস্থিত ‘ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়’। এটি সম্ভবত বাংলাদেশের সমগ্র প্রশাসনিক ও সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য এবং একক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার শ্রেণিকক্ষ থেকে খাতা-কলম ফেলে ১৯৭১ সালে সরাসরি রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন অন্তত ৩৩ জন (স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মূল তালিকায় ৩৯ জন বলা হলেও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী ৩৩ জন) কিশোর ও তরুণ ছাত্র। কেবল তা-ই নয়, এই একক স্কুলেরই ৩ জন বীর ছাত্র রণাঙ্গনে প্রদর্শিত অসীম সাহসিকতার জন্য অর্জন করেছিলেন রাষ্ট্রীয় ৪টি বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বিরল রেকর্ড।
একাত্তরের রণাঙ্গনে এই বিদ্যাপীঠটি কীভাবে সাধারণ শিক্ষার কেন্দ্র থেকে রূপ নিয়েছিল কিশোর সেনানিদের এক দুর্ভেদ্য প্রশিক্ষণ ও প্রতিরোধের দুর্গে, কীভাবে এক দশম শ্রেণির ছাত্র সাদা পতাকা হাতে সরাসরি পাকিস্তানি ঘাঁটিতে ঢুকে ২০০ সশস্ত্র সৈন্যকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিলেন সেই অবিস্মরণীয় ইতিহাস, ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং বর্তমান সময়ের বিস্মৃতির প্রেক্ষাপট বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
১১ নম্বর সেক্টরের মূল ফটক 'ধানুয়া কামালপুর' সামরিক গুরুত্ব
ধানুয়া কামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অনন্য ভূমিকা বুঝতে হলে প্রথমে ১৯৭১ সালের রণক্ষেত্রে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সামরিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত ধানুয়া কামালপুর গ্রামটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা।
১১ নম্বর সেক্টর ও সীমানার সংযোগ: জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার অধীন ধানুয়া কামালপুর গ্রামটি একেবারে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত। এর ঠিক ওপারেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তূরা ও মহেন্দ্রগঞ্জ এলাকা। ১৯৭১ সালে এই অঞ্চলটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। এই সেক্টরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীর উত্তম মেজর জিয়াউর রহমান (প্রাথমিক পর্যায়ে), পরবর্তীতে বীর উত্তম কর্নেল আবু তাহের এবং উইং কমান্ডার এম হামিদুল্লাহ খান।
ধানুয়া কামালপুর ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েকশো গজ দূরে অবস্থিত হওয়ায় এটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ভারতীয় সীমানার ওপারে মেঘালয়ের তুরা ও অন্যান্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা এই পথ দিয়েই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেন। অপারেশন শেষ করে নিরাপদে ফিরে যাওয়া কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে রসদ সরবরাহের জন্য এই রুটটির বিকল্প ছিল না।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তঘাঁটি ও 'কামালপুর বিওপি': ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কাছেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তারা ধানুয়া কামালপুরে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বিওপি (Border Outpost) বা সীমান্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের সেনাসদস্য এবং বিপুল পরিমাণ ইআরপি (East Pakistan Rifle) ও রাজাকারদের সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল। চারদিকে কংক্রিটের বাঙ্কার, ল্যান্ডমাইন এবং কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এই ঘাঁটিটিকে প্রায় একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল এই ট্রানজিট পয়েন্টটিকে অবরুদ্ধ করে রাখা, যাতে ভারতীয় সীমানা থেকে কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে। এর ফলে, সমগ্র ১৯৭১ সালে কামালপুর সীমান্ত অঞ্চলটি পরিণত হয়েছিল এক নিদারুণ বারুদখণ্ডে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এই কামালপুর ঘাঁটি দখলের জন্য অন্তত চারবার ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি এতই রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্র ছিল যে, স্বয়ং ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের এখানে যুদ্ধ করতে গিয়েই একটি পা হারান।
এমন এক বিভীষিকাময়, প্রতিনিয়ত বোমারু বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণে কাঁপতে থাকা সীমান্তে অবস্থিত ছিল ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়’। যুদ্ধ যখন দরজায় কড়া নাড়ছিল, তখন এই স্কুলের ক্লাসরুমগুলো খালি হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ হয়েছিল রণাঙ্গনের বারুদ আর রক্তে।
এক স্কুলের ৩৩ জন বীর সন্তান: শ্রেণিকক্ষ থেকে রণাঙ্গন
একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী যুদ্ধে যেতে পারে? একটি কিংবা দুটি, বড়জোর পাঁচ-দশটি ছেলে প্রথাগত শিক্ষা ছেড়ে অস্ত্র তুলে নিতে পারে এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় সেই সমস্ত স্বাভাবিকতার হিসাবনিকাশ উল্টে দিয়েছিল।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যাচাইকৃত তালিকা ও স্থানীয় ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, এই একটি মাত্র স্কুল থেকেই অন্তত ৩৩ জন ছাত্র সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন (যদিও লোকমুখে ও প্রাথমিক অপেশাদার তালিকায় ৩৯ জনের নাম উঠে এসেছিল, তবে কঠোর সামরিক ও প্রশাসনিক যাচাইয়ের পর ৩৩ জনের তালিকাটি চূড়ান্ত হিসেবে স্বীকৃত)। এরা কেউ ছিলেন অষ্টম, কেউ নবম, আবার কেউ দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
১৯৬৪ সালে স্থানীয় শিক্ষা অনুরাগীদের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়’। পাকিস্তানি বাহিনীর পোড়ামাটি নীতি ও সীমান্ত সংলগ্ন তাণ্ডব যখন গ্রামটিকে নরককুণ্ডে পরিণত করে, তখন এই স্কুলের কিশোর শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুম ছেড়ে হাতে তুলে নেন অ্যাসল্ট রাইফেল ও গ্রেনেড।
খেতাবপ্রাপ্ত তিন বীর সেনানি ও তাঁদের ৪টি সামরিক খেতাব
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে চার ধরণের বীরত্বসূচক খেতাব দেওয়া হয়: বীর শ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক। সমগ্র বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা একাধিক খেতাব পেয়েছেন। অথচ, ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়েরই ৩ জন ছাত্র একাত্তরে অর্জন করেন মোট ৪টি বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব।
১. নূর ইসলাম (বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক)
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধে একজন সাধারণ কিশোর যোদ্ধা একটি সামরিক খেতাব পেলেই সেটি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। কিন্তু নূর ইসলাম গড়েছিলেন এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি একই সাথে ‘বীর বিক্রম’ এবং ‘বীর প্রতীক’ এই দুটি উচ্চ সামরিক খেতাব লাভ করেন।
নূর ইসলাম যখন যুদ্ধে যান, তখন তাঁর বয়স ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর গোলার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি যে শীতল সামরিক মস্তিষ্ক ও নির্ভীকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পেশাদার সামরিক কর্মকর্তাদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। ১১ নম্বর সেক্টরের ধানুয়া কামালপুর, বকশীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত একাধিক সম্মুখযুদ্ধে নূর ইসলাম অটোমেটিক অস্ত্র হাতে শত্রুর ওপর চড়াও হয়েছিলেন। তাঁর এই দ্বি-খেতাব অর্জন কেবল ধানুয়া কামালপুর স্কুলের নয়, পুরো জামালপুর ও বাংলাদেশের গৌরব।
২. মতিউর রহমান (বীর প্রতীক)
বিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী মতিউর রহমান ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন এক অদম্য দেশপ্রেমে। বকশীগঞ্জ ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় যখন পাকিস্তানি বাহিনীর টহল দল গ্রামীণ জনপদে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন মতিউর রহমান স্থানীয় অন্যান্য সহযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করেছিলেন এক প্রতিরোধ ব্যূহ। বিভিন্ন অসম যুদ্ধে নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষা করা এবং শত্রুঘাঁটিতে নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানার জন্য তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
৩. বশির আহমেদ (বীর প্রতীক)
দশম শ্রেণীর ছাত্র বশির আহমেদের বীরত্বগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলোর একটি। মাত্র ১৬-১৭ বছরের একটি কিশোর কীভাবে এক সুবিশাল সুসজ্জিত সামরিক বহরকে বুদ্ধি ও মানসিক সাহসিকতা দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে, বশির আহমেদ ছিলেন তারই বাস্তব প্রমাণ।

সাধারণ ছাত্র থেকে ৩০ বীর গেরিলা সেনানি
খেতাবপ্রাপ্ত এই তিন মহাবীর ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ সংসদের যাচাইকৃত তালিকা অনুযায়ী এই স্কুলের অন্তত আরও ৩০ জন ছাত্র সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গিয়ে উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান ও অন্যান্য ভারতীয় প্রদেয় ইনস্ট্রাক্টরদের অধীনে উচ্চতর সামরিক ও স্কোয়াড প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরা ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে কামালপুর, বকশীগঞ্জ, শ্রীবরদী, শেরপুর এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে গেরিলা হামলা, ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া এবং তথ্য পাচারের কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছিলেন।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব ইতিহাসের খুব কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশ একসাথে কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়মিত বা গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছে। এর চেয়েও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছে তাঁদের বীরত্বসূচক স্বীকৃতির পরিসংখ্যানে। এই ৩৩ জন কিশোর যোদ্ধার মধ্যে তিন জন ছাত্র একাই ছিনিয়ে এনেছিলেন বাংলাদেশের ৪টি রাষ্ট্রীয় বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব।
নিচে ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই ঐতিহাসিক খেতাবপ্রাপ্ত বীর ও যাচাইকৃত তথ্যাবলীর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হলো:
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের খেতাবপ্রাপ্ত বীরদের সংক্ষিপ্ত তালিকা
বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম | ১৯৭১ সালে শিক্ষাগত/তৎকালীন অবস্থা | অর্জিত বীরত্বসূচক খেতাব | মুক্তিযুদ্ধে মূল অবদান ও অপারেশনের ক্ষেত্র |
নূর ইসলাম | ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র | বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক | ১১ নম্বর সেক্টরে একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অভূতপূর্ব সাহসিকতা এবং একই মুক্তিযুদ্ধে দুটি ভিন্ন বীরত্বসূচক খেতাব অর্জনের বিরল গৌরব। |
মতিউর রহমান | ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র | বীর প্রতীক | কামালপুর ও বকশীগঞ্জ অंचलে গেরিলা অপারেশন পরিচালনায় সামরিক প্রজ্ঞা ও সম্মুখসমরে অসামান্য অবদান। |
বশির আহমেদ | ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র | বীর প্রতীক | সাদা পতাকা হাতে শত্রুর বাঙ্কারে প্রবেশ করে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি এবং ২০০ পাকিস্তানি সৈন্যকে সফলভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। |
(নোট: উক্ত খেতাবপ্রাপ্ত ৩ জন বীর ছাড়াও বিদ্যালয়টির আরও ৩০ জন ছাত্র সরাসরি ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কিংবা দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ও সম্মুখসমরে সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন।)
বশির আহমেদের অবিশ্বাস্য অপারেশন: সাদা পতাকা ও ২০০ পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণ
বাংলাদেশের যুদ্ধের ইতিহাসে কামালপুরের যুদ্ধ ছিল অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় তখন দ্বারে কড়া নাড়ছে। কিন্তু ধানুয়া কামালপুর বিওপিতে আটকে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের শক্তিশালী অবশিষ্টাংশ এবং তাদের সহযোগী প্রায় ২০০ সৈন্য তখনও বাঙ্কারে অবস্থান নিয়ে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত কামালপুর বিওপিতে যৌথ বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর চূড়ান্ত যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এর আগেই এই ঘাঁটিতে হামলা চালাতে গিয়ে বীর উত্তম সালাহউদ্দিন মমতাজ শহীদ হন এবং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহের নিজের একটি পা হারান। চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হলেও পাক অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের অধীনে থাকা পাক সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।
মিত্রবাহিনী ও যৌথবাহিনীর (মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনী) যৌথ কামান ও বিমান হামলায় চারদিক বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মাটির নিচের গভীর কংক্রিট বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনারা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করছিল না। একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও তাদের পুরোপুরি পরাস্ত করা যাচ্ছিল না, অথচ সময় গড়াচ্ছিল এবং উভয় পক্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছিল।
হাতে সাদা পতাকা, মুখে স্পষ্ট বার্তা "সারেন্ডার করো"
৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। টানা বিমান হামলা ও কামানের গোলার পরও পাকিস্তানিরা যখন বাঙ্কারের ভেতর থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন রক্তক্ষয় ও মিত্রবাহিনীর সেনাক্ষয় এড়াতে বশির আহমেদ এক অবিশ্বাস্য ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটি সাদা কাপড় বের করে লাঠিতে বেঁধে নিঃসঙ্গভাবে, বুকে অদম্য সাহস নিয়ে সরাসরি পাকিস্তানি সৈন্যদের মাইনফিল্ড ও বাঙ্কারের দিকে হাঁটতে শুরু করেন।
বশির আহমেদ জানতেন, বাঙ্কারে গোলাবর্ষণ করে শত্রু ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তাতে বহু সহযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের প্রাণ যাবে, এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে। তিনি সম্পূর্ণ নিজ ঝুঁকিতে একটি অদ্ভুত ও অতীব বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের গলায় একটি সাধারণ শীতের মাফলার জড়িয়ে, হাতে একটি সাদা নিশান (আত্মসমর্পণ বা মধ্যস্থতার প্রতীক) উঁচিয়ে ধরে একাকী হাঁটতে শুরু করেন পাকিস্তানি বাঙ্কারের দিকে।
গলায় মাফলার পেঁচানো, কাঁধে সাধারণ রাইফেল ঝুলানো ১০ম শ্রেণির এই কিশোরকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় বাঙ্কারে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা। যে স্থানে কয়েক সেকেন্ড পরপর কামানের গোলা আর ভারী মেশিনের গুলি বর্ষিত হচ্ছিল, সেখানে একটি কিশোর একাকী হেঁটে আসছে এই দৃশ্য দেখে উভয় পক্ষের গোলাগুলি সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি সেনারাও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাদের ট্র্রিগার থেকে আঙুল সরিয়ে নেয়।
বশির আহমেদ শত্রুর বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে পাক অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ও গম্ভীর কণ্ঠে বলেন:
"তোমাদের চারদিক থেকে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা ঘিরে ফেলেছে। পালানোর কোনো পথ নেই। আর ১০ মিনিট পর চূড়ান্ত বিমান হামলা শুরু হবে। যদি বাঁচতে চাও, তবে এখনই সারেন্ডার করো।"
২০০ পাক সেনার ঐতিহাসিক সারেন্ডার
বশির আহমেদের এই মধ্যস্থতা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের ফলে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্রসংবরণে রাজি হয়। একজন সাধারণ কিশোরের মুখে এমন অকম্পিত ও চরম সত্য নির্দেশ শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন পাক ক্যাপ্টেন আহসান মালিক।
বশির আহমেদের এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং অকুতোভয় মধ্যস্থতার কারণে পাক অধিনায়ক তাঁর অধীনস্থ প্রায় ২০০ জন প্রশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে সাদা পতাকা তুলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
বশির আহমেদ নিজ দায়িত্বে তাঁদের নিরাপদে ভারতের সীমান্তে যৌথ বাহিনীর কাছে নিয়ে যান। রক্তপাতহীনভাবে এত বড় একটি শক্তিশালী শত্রুঘাঁটির পতন ঘটানোর ঘটনা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসেও এক বিরল নজির, যা অর্জন করেছিলেন এই স্কুলেরই এক দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সামরিক কৌশলের বিচারে, একজন ১০ম শ্রেণীর ছাত্রের এভাবে শত্রুশিবিরে ঢুকে ২০০ সেনাকে আত্মসমর্পণ করানো একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এই অসম সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার বশির আহমেদকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে।
প্রতিরোধ কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যাপীঠের ভূমিকা
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় কেবল কিশোর যোদ্ধা তৈরির কারখানা ছিল না; এটি ছিল স্থানীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা ও নৈতিক প্রতিরোধের এক অদৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয়।
একটি গ্রামীণ সাধারণ স্কুল কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার জন্ম দিতে পারল? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তৎকালীন সামাজিক, ভৌগোলিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পটভূমিতে। ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় কেবল ইট-কাঠের কিছু শ্রেণীকক্ষ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল স্থানীয় প্রতিরোধ সংগ্রামের নৈতিক ও মানসিক কেন্দ্রবিন্দু।
শিক্ষকদের অদম্য নৈতিক প্রেরণা: যুদ্ধের আগে থেকেই তৎকালীন স্কুলের শিক্ষকমণ্ডলী শিক্ষার্থীদের কেবল বাঁধাধরা পাঠ্যবই পড়াতেন না, বরং তাদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, স্বাধিকার আন্দোলন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চিন্তা বপন করে দিতেন। শিক্ষকরা নিজেরা অস্ত্র হাতে না নিলেও, তাঁরা ছিলেন কিশোরদের মানসিক অভিভাবক। যখন যুদ্ধ শুরু হয়, শিক্ষকরা ছাত্রদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন:
"দেশ রক্ষা করা এখন আমাদের প্রধান কর্তব্য।"
ছাত্র সংসদ ও রাজনৈতিক সচেতনতা: তৎকালীন সময়ে মফস্বল অঞ্চলের স্কুলগুলোতেও একটি সক্রিয় ছাত্র সংসদ বা স্টুডেন্ট কাউন্সিল থাকত। ধানুয়া কামালপুর স্কুলের ছাত্র সংসদ অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন ছিল। ৬ দফা, ১১ দফা আন্দোলন এবং ৭০-এর নির্বাচনের প্রভাব এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গভীরভাবে পড়েছিল। ফলে ১৯৭১ সালের মার্চে যখন শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন, তখন এই স্কুলের ছাত্ররা মানসিকভাবে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
গেরিলা সংযোগ ও ইন্টেলিজেন্স সেন্টার: স্কুলটির অবস্থান সীমান্তে হওয়ায় এবং স্থানীয় জনগণ সারাক্ষণ পাকিস্তানি মিলিটারির অত্যাচার প্রত্যক্ষ করায়, একটি প্রতিরোধমুখী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই স্কুলের ছাত্রদের অভিভাবকরা যাঁরা ছিলেন স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তাঁরাও তাঁদের সন্তানদের যুদ্ধে যেতে বাধা দেননি, বরং বুক ভরা আশীর্বাদ দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছিলেন। স্কুলের আশেপাশের বাড়িগুলো হয়ে উঠেছিল স্থানীয় গেরিলা যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় ও রসদ সরবরাহের গোপন কেন্দ্র।
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস
নিচে ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষার্থী সংখ্যা, প্রাপ্ত খেতাব এবং বীরত্বগাথার একটি সুনির্দিষ্ট তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
বিষয় ও সূচক | বিস্তারিত বিবরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য |
প্রতিষ্ঠানের নাম | ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় |
প্রতিষ্ঠাসাল ও অবস্থান | ১৯৬৪ সাল; গ্রাম: ধানুয়া কামালপুর, উপজেলা: বকশীগঞ্জ, জেলা: জামালপুর। |
কৌশলগত সামরিক এলাকা | ভারত সীমান্ত (মেঘালয়) সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট; ১৯৭১ সালের ১১ নম্বর সেক্টর। |
সেক্টর অধিনায়কগণ | মেজর এম আবু তাহের (কর্নেল তাহের) এবং উইং কমান্ডার এম হামিদুল্লাহ খান। |
মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষার্থীর সংখ্যা | মোট যাচাইকৃত ছাত্র: ৩৩ জন (মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মূল তালিকায় ৩৯ জন)। |
অর্জিত সামরিক খেতাবসমূহ | মোট ৪টি খেতাব (১# রক্তের আখরে লেখা এক সাধারণ স্কুলের অসাধারণ গল্প: ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় ও একাত্তরের কিশোর সেনানীরা |
অবহেলার দীর্ঘ ছায়া ও ম্যুরাল স্থাপনের দাবি
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় যা অর্জন করেছে, তা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য একটি জাতীয় গর্বের প্রতীক হতে পারত। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পর ফিরে তাকালে আমাদের অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে স্বীকার করতে হয় যে, এই বিদ্যালয়টির গৌরবময় ইতিহাস জাতীয় পর্যায়ে প্রায় পুরোটাই উপেক্ষিত ও বিস্মৃত থেকে গেছে।
জাতীয় স্বীকৃতির অভাব: আমরা ঢাকার ঐতিহাসিক স্থান, ক্যাডেট কলেজ বা বড় শহরগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবদান নিয়ে যত আলোচনা করি, মফস্বলের এই রক্তভেজা আলোকবর্তিকা নিয়ে তার শতাংশের এক ভাগও আলোচনা করি না। জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে ধানুয়া কামালপুর স্কুলের ৩৩ জন বীরের গল্প কিংবা বশির আহমেদের এই বিস্ময়কর আত্মসমর্পণের ঘটনা কোনো স্থান পায়নি।
বর্তমান প্রজন্মের অজ্ঞতা ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা: সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, যে স্কুলের মাটিতে পা রেখে বশির, নূর ইসলাম ও মতিউর রহমানরা দেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন, সেই ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকেই তাদের এই পূর্বসূরিদের গৌরবগাথা সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না! এটি কেবল একটি স্কুলের ব্যর্থতা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাস সংরক্ষণ ব্যবস্থার এক চরম দেউলিয়াত্ব।
'মুক্তিযোদ্ধা ম্যুরাল' স্থাপনের দীর্ঘসূত্রী আন্দোলন: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় সচেতন নাগরিক, রণাঙ্গনের বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধা এবং কয়েকজন তরুণ গবেষক ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি ‘মুক্তিযোদ্ধা ম্যুরাল’ বা ‘স্মারক ভাস্কর্য’ স্থাপনের জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছেন। যেখানে বিদ্যালয়ের ৩৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং চার খেতাবপ্রাপ্ত ছাত্রের নাম ও অবদান খোদাই করা থাকবে।
স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস এবং মৌখিক নির্দেশনা দিলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং এক ধরনের অপরাধমূলক উদাসীনতার কারণে আজও সেই ম্যুরালটি নির্মিত হয়নি। যে প্রাঙ্গণ থেকে একাত্তরে স্বাধীনতার বারুদ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই প্রাঙ্গণে একটি স্মারক ম্যুরাল না থাকা আমাদের মেধা ও ইতিহাসের প্রতি এক বিরাট অবমাননা।
ইতিহাস রক্ষায় তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার
ধানউয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, স্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট অভিজাত শ্রেণী বা প্রাপ্তবয়স্ক সামরিক পেশাদারদের একচ্ছত্র অর্জন ছিল না। এটি ছিল কিশোরদের স্বপ্ন, তরুণদের রক্ত আর সাধারণ মানুষের অপরিসীম আত্মত্যাগের সমষ্টি।
আজ যখন আমরা একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের কথা বলি, তখন আমাদের অতীত ভিত্তিকে ভুলে গেলে চলবে না। ধানুয়া কামালপুর স্কুলের বীরত্বগাথা কেবল স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি রাখার বস্তু নয়, এটি আমাদের জাতীয় মানচিত্রের নিরাপত্তা ও স্বকীয়তার এক জ্বলন্ত প্রমান।
আমাদের করণীয়
স্মারক ম্যুরাল নির্মাণ: কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সরকারি অর্থায়নে একটি দৃষ্টিনন্দন ও পূর্ণাঙ্গ 'মুক্তিযোদ্ধা স্মারক ম্যুরাল' নির্মাণ করতে হবে।
পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)-এর মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের ইতিহাসে "কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ও ধানুয়া কামালপুর স্কুলের অবদান" শীর্ষক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ডকুমেন্টারি ও গ্যাজেট সংরক্ষণ: ৩৩ জন ছাত্রের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও তাঁদের যুদ্ধকালীন সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা জরুরি, যাতে এই বীরদের স্মৃতি চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
বার্ষিক স্মারক দিবস: ধানুয়া কামালপুর স্কুলের এই ঐতিহাসিক অবদানকে স্মরণ করে প্রতি বছর স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে 'কিশোর মুক্তিযোদ্ধা দিবস' বা স্মারক আলোচনা সভার আয়োজন করা উচিত।
ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয় এক রক্তভেজা আলোকবর্তিকা। একাত্তরের সেই বারুদমাখা দিনগুলোতে দশম শ্রেণীর বশির আহমেদ, নূর ইসলাম কিংবা মতিউর রহমানরা যখন বইখাতা টেবিল ছেড়ে অস্ত্র হাতে সীমান্তে নেমেছিলেন, তখন তারা কোনো রাষ্ট্রীয় খেতাব বা সুবিধার আশা করেননি। তাঁরা চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন পতাকা, একটি মুক্ত স্বদেশ।
আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি তাঁদেরই আত্মত্যাগের বিনিময়ে। ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই ৩৩ জন অমর বীরের প্রতি, এবং একাত্তরের সমস্ত কিশোর সেনানীর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, অভিবাদন ও গভীর ভালোবাসা। এই বিস্মৃত ইতিহাসকে অন্ধকারের পর্দা ঠেলে আলোর মুখে নিয়ে আসা আমাদের প্রজন্মের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। এই বীরেরা অমর, এই ইতিহাস অক্ষয়।















