>

>

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক - মিরপুর যুদ্ধে সশস্ত্র বিহারীদের হাতে খন্ডবিখন্ড বীর

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক - মিরপুর যুদ্ধে সশস্ত্র বিহারীদের হাতে খন্ডবিখন্ড বীর

মিরপুর মুক্ত যুদ্ধে শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান (বীর প্রতীক) এমন এক বীর সেনানী ছিলেন যার মৃতদেহকে সশস্ত্র বিহারী মিলিশিয়ারা খন্ডবিখন্ড করেছিলো। যাঁর ছিন্নভিন্ন মরদেহ কালাপানির ঢাল ও নালায় ফেলে দেয়া হয়। মিরপুরের মুক্তিকামী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করে রাখা, তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে এক অঘোষিত 'ক্ষুদ্র পাকিস্তান' বানিয়ে রাখার এই দুঃসাহস ভেঙে দিতে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি পরিচালিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিরপুর’। আর এই ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী অভিযানে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অকুতোভয় সেনানী লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সেলিম (বীর প্রতীক)।

TruthBangla

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক - মিরপুর যুদ্ধে সশস্ত্র বিহারীদের হাতে খন্ডবিখন্ড বীর

"মিরপুর মুক্ত যুদ্ধে শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান (বীর প্রতীক) এমন এক বীর সেনানী ছিলেন যার মৃতদেহকে সশস্ত্র বিহারী মিলিশিয়ারা খন্ডবিখন্ড করেছিলো। যাঁর ছিন্নভিন্ন মরদেহ কালাপানির ঢাল ও নালায় ফেলে দেয়া হয়।"

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। রক্তক্ষয়ী নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্যের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে উদিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সূর্য। পুরো দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা, মিষ্টি বিতরণ আর লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে উল্লাসে মেতে উঠেছিল, ঠিক তখনই রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত মিরপুর ছিল এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

১৬ ডিসেম্বরের পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় দেড় মাস অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর ছিল এক অবরুদ্ধ ও শত্রুপুরী এলাকা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের পরাজয় মেনে নিলেও মিরপুরে অবস্থানরত হাজার হাজার সশস্ত্র উর্দূভাষী বিহারী, রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তান সেনাদলের অবশিষ্টাংশ অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকার করে। তারা পুরো মিরপুরকে এক দুর্ভেদ্য সেনাদ দুর্গে পরিণত করে উড়িয়ে রেখেছিল পাকিস্তানের পতাকা।

মিরপুরের মুক্তিকামী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করে রাখা, তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে এক অঘোষিত 'ক্ষুদ্র পাকিস্তান' বানিয়ে রাখার এই দুঃসাহস ভেঙে দিতে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি পরিচালিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিরপুর’

আর এই ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী অভিযানে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অকুতোভয় সেনানী লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান (বীর প্রতীক)। এই নিবন্ধে আমরা শহীদ লে. সেলিমের বীরত্বপূর্ণ জীবন, ৩০ জানুয়ারির সেই ভয়াল ও থমথমে যুদ্ধগাথা, অবরুদ্ধ মিরপুরের নৃশংসতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর ইতিহাস-উপেক্ষার করুণ বাস্তবতা বিস্তারিত আলোচনা করব।

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক: এক অকুতোভয় বীরের পরিচয়

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে যেক'জন তরুণ সামরিক অফিসার তাঁদের অসাধারণ সাহসিকতা, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা এবং অনন্য নেতৃত্বের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট সেলিম অন্যতম।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান: মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সেলিম তরুণ বয়সে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে যোগ দেন। কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সহজাত নেতৃত্বের গুণের কারণে তিনি সহযোদ্ধা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাঁর ধমনীতে প্রবহমান ছিল দেশপ্রেমের এক অদম্য শিখা।

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক - মিরপুর যুদ্ধে সশস্ত্র বিহারীদের হাতে খন্ডবিখন্ড বীর

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ও 'বীর প্রতীক' উপাধি: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সেনাসদস্যদের সাথে সাথে লে. সেলিমও বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি যোগ দেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে (যাদের ঐতিহাসিকভাবে "জুনিয়র টাইগার্স" বলা হতো)।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস জুড়ে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে হাবিলদার, জেসিও এবং সহযোদ্ধাদের নিয়ে একাধিক দুঃসাহসিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন লে. সেলিম। ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন রণাঙ্গনে, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর সরবরাহ লাইন ধ্বংস করা, অ্যামবুশ পরিচালনা এবং শত্রুর শক্ত ঘাঁটি গুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেলিম ছিলেন এক অপরাজেয় সৈনিক। তাঁর এই অসামান্য বীরত্ব, সাহস এবং দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে।

অবরুদ্ধ মিরপুরের পটভূমি: কেন দেড় মাস পর সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হলো?

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর সর্বাত্মক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করলেও, পুরো দেশ কিন্তু সেদিন সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়নি। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বুকঘেঁষে অবস্থিত মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা দীর্ঘ দেড় মাস ধরে এক অবরুদ্ধ, অস্ত্রধারী ও নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব শত্রুঘাঁটিতে পরিণত হয়ে ছিল। মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা তখনো সশস্ত্র বিহারী, রাজাকার এবং ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে অবরুদ্ধ ছিল।

১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসের পর থেকে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৪৫ দিন মিরপুর কার্যত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর এক বিচ্ছিন্ন, সশস্ত্র এবং প্রতাপশালী পাকিস্তানপন্থী ছিটমহল

মিরপুরের এই অস্বাভাবিক সামরিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং কেন শেষ পর্যন্ত সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালাতে হয়েছিল তার বিস্তারিত ঐতিহাসিক কারণসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

অস্ত্র সমর্পণে বিহারীদের চরম অস্বীকৃতি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর অঞ্চলটি ছিল প্রধানত অ-বাঙালি বিহারী অধ্যুষিত এলাকা। তৎকালীন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ ছিল উগ্র পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীন বাংলাদেশবিরোধী।

কাইয়ুম স্কোয়াড ও সশস্ত্র সংগঠন: যুদ্ধের পুরো নয় মাস পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল সশস্ত্র 'কাইয়ুম স্কোয়াড', 'কাদেরিয়া ব্রিগেড' এবং নানা মিলিশিয়া বাহিনী। তারা স্থানীয় বাঙালি নিধন, আল-বদর ও রাজাকারদের পথপ্রদর্শন এবং বাঙালি পরিবারগুলোকে উচ্ছেদে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

স্বয়ংক্রিয় ও ভারী অস্ত্র ধরে রাখা: ১৬ ডিসেম্বরের পর যৌথ বাহিনীর নিকট জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলেও মিরপুরের সশস্ত্র বিহারীরা তাদের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ: পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটার সময় এবং সাধারণ চরমপন্থীদের হাতে হস্তান্তরিত হালকা বর্ডার আর্টিলারি, ভারী মেশিনগান (LMG/SMG), রিকয়েলেস rifle, এবং প্রচুর পরিমাণ চীনা ও পাকিস্তানি হ্যান্ডগ্রেনেড তারা গোপন বাঙ্কারে মজুত করে রাখে।

বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ অমান্য: স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট আলটিমেটাম দিয়ে বারবার অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা তা অমান্য করে এবং প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানায়।

পলাতক পাকিস্তানি সেনাদের আত্মগোপন ও দুর্গ নির্মাণ

১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের ঠিক আগে এবং অব্যবহিত পরে ঢাকার সেনানিবাস, কুর্মিটোলা ঘাটি ও আশেপাশের বিভিন্ন সামরিক ক্যাম্প থেকে শত শত পাকিস্তানি সেনা সদস্য ও কমান্ডো বেসামরিক লোকজনের পোশাক পরে পালিয়ে গিয়ে মিরপুরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আশ্রয় নেয়।

সুবিধাজনক আশ্রয়স্থল: পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা প্রধানত মিরপুর সেকশন-১০, ১১, ১২, শিয়ালবাড়ি, কালাপানি ও মুসলিম বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। সেখানকার অ-বাঙালি জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সমর্থন ও সুনির্দিষ্ট সহায়তায় তারা সহজেই স্থানীয় ছদ্মবেশ ধারণ করতে সক্ষম হয়।

পেশাদার সামরিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকরণ: কেবল সাধারণ বিহারীদের উস্কানি দেওয়া নয়, বরং পলায়ত পেশাদার পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা মিরপুরের সরু গলি, বহুতল পাকা ভবন ও জলাশয়ঘেরা ফাঁকা জায়গায় সুসংগঠিত বাঙ্কার, ট্রেন্স এবং স্নাইপার পোস্ট তৈরি করে।

দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা হামলার পরিকল্পনা: তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার সন্নিকটেই একটি প্রতিরোধ কেন্দ্র টিকিয়ে রাখা, যাতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শুরুতেই চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে পড়ে। তাদের কাছে থাকা অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে তারা যেকোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ ঠেকানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল।

বাঙালিদের ওপর অব্যাহত নির্যাতন, বধ্যভূমি গঠন ও জহির রায়হানের হত্যাকান্ড

পুরো দেশে যখন স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপিত হচ্ছিল, তখনো অবরুদ্ধ মিরপুরের ভেতরে অবস্থানরত বাঙালিদের জীবন ছিল চরম বিপন্ন। বিহারী চরমপন্থী ও পাকিস্তানি সেনারা মিরপুরকে একটি নিষিদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী এলাকায় পরিণত করে রেখেছিল।

ভয়াবহ বধ্যভূমি ও জল্লাদখানা: মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের 'জল্লাদখানা', শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি, রাইনখোলা, বাঙলা কলেজ, পাম্প হাউস এবং কালাপানির ঢাল এলাকাগুলোকে তারা নৃশংস হত্যাপুরীতে রূপান্তর করেছিল। সেখানে কোনো বাঙালি ভুলবশত বা স্বজনদের খোঁজে প্রবেশ করলেই তাকে চেইন দিয়ে বেঁধে, নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হতো।

শরণার্থীদের ওপর অমানবিক আক্রমণ: বিভিন্ন এলাকা থেকে নিজেদের বাসস্থানে ফিরতে চাওয়া বাস্তুচ্যুত বাঙালি পরিবারগুলোর ওপর প্রায়শই গুলিবর্ষণ করা হতো। ২৭ থেকে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে সীমান্ত এলাকায় বিহারীদের গুলিতে বহু বাঙালি আহত ও নিহত হন।

কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া: ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে জহির রায়হান একটি অজ্ঞাত ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন যে তাঁর নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুর সেকশন-১২ এর কোনো একটি গোপন আস্তানায় জীবিত আটকে রাখা হয়েছে। ভাইকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে তিনি সেদিন সকালেই সেনা ও পুলিশের সাথে মিরপুরে প্রবেশ করেন।

গাড়িতে থাকা জহির রায়হান এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য বিহারী ক্যাডারদের ছিটকে আসা বুলেটের মুখে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গুলির তাণ্ডবে চারদিকে যখন চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তখন জহির রায়হান গাড়ি থেকে নেমে একটি গলির দিকে আশ্রয় নিতে যান। সেখানে ওত পেতে থাকা সশস্ত্র বিহারী ক্যাডাররা উনাকে ঘিরে ফেলে। সেখানে ওত পেতে থাকা বিহারী ও পাকিস্তানি সেনাদের ছোঁড়া গুলিতে তিনি শহীদ হন। বিহারীরা তার মরদেহ টেনেহিচড়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ৩১শে জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত হওয়ার পর জহির রায়হানের কোনো সন্ধান বা মরদেহ আর পাওয়া যায়নি। তিনি মিশে গেছেন মিরপুরের রক্তভেজা মাটিতে।

সরকারি সিদ্ধান্ত ও অস্ত্র উদ্ধার অভিযান

তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এবং সামরিক নেতৃত্বের যৌথ সিদ্ধান্তে স্থির হয় যে, মিরপুর থেকে সমস্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করতে হবে। ৩০ জানুয়ারি ভারতীয় মিত্রবাহিনী তাদের পাহারা সরিয়ে নিলে সম্পূর্ণ অভিযানের ভার ন্যস্ত হয় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ওপর।

দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব: ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি রাতে পুরো মিরপুরে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করে ঘিরে ফেলা হয়। এই ঐতিহাসিক ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে মূল সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব পায় দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তৎকালীন তরুণ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ খান (বীর বিক্রম)-এর অধীনে ডেেল্টা কোম্পানির প্রায় ৮২ জন সৈনিক এবং আড়াই শতাধিক পুলিশ সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন।

রক্তক্ষয়ী রক্তক্ষয় ও আত্মত্যাগ: ৩১ জানুয়ারি ভোরে সেনা ও পুলিশ যৌথভাবে তল্লাশি চালাতে প্রবেশ করলে প্রতিটি গলি ও পাকা বাড়ির ছাদ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, মেশিনগান ও গ্রেনেড নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত ও ব্যাপক হামলা চালানো হয়। অসম এই মুখোমুখি যুদ্ধে শত্রুর গুলিতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তরুণ কর্মকর্তা সেকেন্ড নম্বর লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ আবদুল কাদিরসহ ৪২ জন সেনাসদস্য এবং ৮২ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন।

চূড়ান্ত মুক্তি: সেনাদলের এই প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পর অতিরিক্ত সাজোয়া যান, অতিরিক্ত সৈন্য ও শক্তিশালী ভারী অস্ত্র এনে অভিযান জোরদার করা হয়। টানা ও কঠোর অভিযানের মুখে অবরুদ্ধ শত্রুরা পরাস্ত হতে বাধ্য হয়। বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিকেলে মিরপুর পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয় এবং সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলিত হয়।

৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ 'অপারেশন মিরপুর' ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগাথা

৩০ জানুয়ারি সকালে শুরু হওয়া এই অভিযানে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪১ জন সশস্ত্র সেনা সদস্য, ডিএসপি এস. এ. লোদীর নেতৃত্বে প্রায় ৩০০ জন পুলিশ সদস্য এবং শতাধিক স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন। সেনা দলটির নেতৃত্বে ছিলেন দুই তরুণ অফিসার লেফটেন্যান্ট খন্দকার আজিজুল ইসলাম সেলিম (লেফটেন্যান্ট সেলিম) এবংফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদ।

মিরপুরে প্রবেশ ও ১১টার ঘাতক হামলা

৩০ জানুয়ারি ঘড়ির কাঁটায় যখন সকাল ১০:০০ টা, তখন লে. সেলিম ও লে. হেলাল মোর্শেদের নেতৃত্বে যৌথ সেনাদল মিরপুর সেকশন-১২-এর পানির ট্যাংকের সামনে এসে পৌঁছায়। এলাকাটি ছিল একদম নিস্তব্ধ ও অস্বাভাবিক নীরবতায় আচ্ছন্ন। চারপাশের বাড়িঘরের জানালা-কপাট সব বন্ধ ছিল, যা একটি বড় ধরনের অশুভ সংকেত বহন করছিল।

ঠিক সকাল ১১:০০ টা। থমথমে নীরবতা চিরে হঠাৎ চারদিক থেকে কেঁপে ওঠে মেশিনগান, এলএমজি এবং ৬৪ মিলিমিটার মর্টারের বিরামহীন গোলাগুলিতে। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই মিরপুর ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের পেছনের বাড়িগুলো, গলি এবং উঁচু ছাদ থেকে সারিবদ্ধভাবে গুলি বর্ষণ শুরু করে অস্ত্রধারী বিহারী ও লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনারা। সুরক্ষিত দালানের আড়াল থেকে আসা এই অতর্কিত হামলায় শুরুতেই যৌথ বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক - মিরপুর যুদ্ধে সশস্ত্র বিহারীদের হাতে খন্ডবিখন্ড বীর

ক্যাপশন: বামে সশস্ত্র বিহারী মিলিশিয়ারা এবং ডানে মিরপুর মুক্ত করার যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান।

ঘেরাও হয়ে পড়া যৌথ বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকে। অন্যদিকে উঁচু ভবনের ওপর থেকে বিহারী ও পাকিস্তানি সৈন্যরা হ্যান্ড গ্রেনেড ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ভারী গুলি বর্ষণ অব্যাহত রাখে। সঙ্কটময় মুহূর্তে রাস্তার উল্টো পাশে থাকা একটি বিশাল কাঁঠাল গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা একটি দূরপাল্লার স্নাইপার বুলেট সোজাসুজি এসে লাগে অকুতোভয় লে. সেলিমের ডান বুকে। মুহূর্তের মধ্যে রক্তে ভেসে যায় সেলিমের সবুজ সামরিক পোশাক, গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

"আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না"

বুকে বুলেট লাগার পর রক্তে ভেসে যাওয়া সেলিমকে অতি দ্রুত টেনে রাস্তার পাশের একটি কাঁচা ঘরে নিয়ে যান তাঁর সহযোদ্ধা ও সহ-অধিনায়ক লে. হেলাল মোর্শেদ। বুলেটের মারাত্মক আঘাতে কিছুক্ষণের জন্য নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন সেলিম। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজের অদম্য মানসিক শক্তিতে জ্ঞান ফিরে পান এই অমর বীর।

চোখ মেলেই তিনি উপলব্ধি করেন বাইরে তাঁর সহযোদ্ধা সৈনিক ও পুলিশ সদস্যরা শত্রুর ঘেরাওয়ের মুখে পড়ে জীবনপণ লড়াই করছে। তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। কোনো ব্যথানাশক ওষুধ বা প্রাথমিক চিকিৎসার তোয়াক্কা না করে, নিজের রক্তে ভেজা শার্টটি খুলে বুকের মারাত্মক ক্ষতস্থানে শক্ত করে বাঁধেন।

সহযোদ্ধারা যখন তাঁর সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে পিছু হটে নিরাপদে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন, তখন এই কিংবদন্তি বীর গর্জে উঠেছিলেন। তিনি রক্তমাখা মুখে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন:

"আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না! শেষ বুলেট পর্যন্ত আমরা লড়াই করব!"

বুকের ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তকে তোয়াক্কা না করে, স্টেনগান হাতে আবার ঘর থেকে বের হয়ে আসেন সেলিম। তাঁর আদেশে পুনরায় আগুন ঝরাতে শুরু করে ২য় ইস্ট বেঙ্গলের যোদ্ধাদের অস্ত্র। একটানা গোলাগুলিতে সেনাসদস্যদের হাতের স্টেনগানের ব্যারেলগুলো তেতে লাল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শত্রুর সংখ্যা ছিল বহুগুণ বেশি এবং তারা পাকা দালানের কৌশলগত পজিশনে অবস্থান নিয়েছিল।

পৈশাচিক বর্বরতা, কসাইখানা ও শহীদ সেলিমের অন্তর্ধান

৩০ জানুয়ারি সকালে যখন ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য ও পুলিশের দল অস্ত্র উদ্ধারে মিরপুরে প্রবেশ করে, তখন পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদে পড়ে যায় তারা। চারদিকের চারতলা-পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে ভারী মরটার, এলএমজি এবং স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে অবরুদ্ধ যৌথ বাহিনীর ওপর নারকীয় গোলাবর্ষণ শুরু হয়।

পৈশাচিক প্রতিশোধ ও সেলিমের দেহ খণ্ডবিখণ্ড করণ

যুদ্ধের এক পর্যায়ে চরম গোলাবারুদের স্বল্পতা এবং চতুর্মুখী ঘেরাওয়ের কারণে সেনা ও পুলিশ দল একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সংকীর্ণ গলির ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও শত্রুর কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানের সামনে যৌথ বাহিনীর অনেকে মারাত্মক আহত অবস্থায় বন্দি হন।

পাকিস্তানি অনুচর ও বিহারী ঘাতকদের মূল আক্রোশ ছিল অভিযানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া দুঃসাহসী সেনাপতি লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন সেলিমের (লে. সেলিম) ওপর। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরবর্তী সামরিক অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী:

গুলিবিদ্ধ ও মারাত্মক আহত অবস্থায় লে. সেলিমকে ঘাতকরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় বন্দি করে। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বন্দি সেলিমের ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন।

দেহ খণ্ডবিখণ্ড করণ ও অবমাননা: তলোয়ার, রামদা ও চাপাতালির আঘাতে এই বীর সেনাপতির দেহকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। পশুর চেয়েও হীন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে তাঁর ছিন্নভিন্ন মরদেহ কালাপানির ঢাল ও নালায় নিক্ষেপ করা হয়।

"লে. সেলিম ছিলেন এক নির্ভীক নেতৃত্বের প্রতীক। শত্রুরা তাঁকে কেবল হত্যাই করেনি, তাদের চরম ক্ষোভ মেটাতে তাঁর নিথর দেহকে টুকরো টুকরো করে কেটে অবমাননা করেছিল।"

কালাপানি ও জল্লাদখানার ভয়াবহতা

৩০ জানুয়ারির বিপর্যয়ের পরদিন, ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও ভারী গোলন্দাজ বহর নিয়ে মিরপুরে পূর্ণাঙ্গ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর ৩১ জানুয়ারি অপরাহ্নে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রে শেষ অবরুদ্ধ অঞ্চল হিসেবে মিরপুর সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। এই অভিযান শেষে প্রায় ১০ হাজার সশস্ত্র অবাঙালি বিহারী ও পলায়ত পাকিস্তানি সেনাকে আটক করা হয়।

মিরপুর মুক্ত হলেও যৌথ বাহিনীর সামনে উন্মোচিত হয় এক ভয়াবহ ভয়াল চিত্র। সেনাদল তাদের প্রিয় অধিনায়ক লে. সেলিম, ডিএসপি জিয়াউল হক লোদী এবং ৪১ জন বীর সেনাসদস্যের সন্ধানে পুরো এলাকা চষে ফেলে।

লাশের পাহাড়: কালাপানির ঢাল, রূপনগরের খাস জমি, জল্লাদখানা পাম্প হাউস এবং সেকশন-১২ এর পানির ট্যাংকের পেছনের ডোবায় ভেসে উঠছিল শত শত পচা-গলা লাশ।মরদেহগুলোকে খুঁচিয়ে, অঙ্গচ্ছেদ করে এবং বিকৃত করে ফেলা হয়েছিল, যার ফলে কোনটা সাধারণ নাগরিক, কোনটা পুলিশের লাশ আর কোনটা সেনা জওয়ানের লাশ তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

লে. সেলিমের কোনো অখণ্ড মরদেহ বা সুনির্দিষ্ট কবর আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি; এই বীর সৈনিক মিশে গেছেন মিরপুরের রক্তস্নাত মাটিতে।

‘অপারেশন মিরপুর’ কি অপরিকল্পিত ছিল? সামরিক বিশ্লেষণ

মিরপুর যুদ্ধ এবং লে. সেলিমসহ ৪২ জন সেনাসদস্য ও শতাধিক পুলিশের নির্মম শাহাদাত নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা-বিশ্লেষণ হয়েছে। ৩০ জানুয়ারির এই অভিযান সামরিক কৌশল ও পরিকল্পনার দিক থেকে কতটা যথাযথ ছিল, তা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়। আজও প্রশ্ন ওঠে সেদিনের সেই অভিযানটি কি কৌশলগত দিক থেকে কিছুটা অপরিকল্পিত বা তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল? সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে:

"১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি এবং মানসিকভাবে শত্রুকে দুর্বল মনে করাই ৩০ জানুয়ারির অভিযানে বিপুল প্রাণহানির প্রধান কারণ।"

গোয়েন্দা তথ্যের প্রচণ্ড ঘাটতি (Intelligence Failure)

যে কোনো সামরিক বা আধা-সামরিক অভিযানের মূল ভিত্তি হলো সঠিক গোয়েন্দা তথ্য (Tactical Intelligence)। কিন্তু ৩০ জানুয়ারির অভিযানে নামার আগে তৎকালীন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শত্রুঘাঁটির অভ্যন্তরীণ শক্তি নিরূপণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা ছিল ১৬ ডিসেম্বরের পর বিহারীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং তাদের কাছে কেবল কিছু হালকা অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (SSG) ও নিয়মিত বাহিনীর অনেক সদস্য বেসামরিক পোশাক পরিধান করে অবস্থান নিয়েছিল।

মিরপুরের প্রায় প্রতিটি ঘরকে সুসংগঠিত বাঙ্কারে রূপান্তর করা হয়েছিল। সেখানে বিপুল পরিমাণ ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, মর্টার এবং রকেট চালিত গ্রেনেড (RPG) মজুত রাখা হয়েছিল, যা গোয়েন্দা নথিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। গলির ভেতরের জটিল ভূ-প্রকৃতি এবং বহুতল ভবনের ভেতরের পজিশন সম্পর্কে পদাতিক বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো মানচিত্র ছিল না।

ভারী সাঁজোয়া যানের অভাব

সামরিক কৌশলে নগরাঞ্চল বা জনবহুল সরু গলিতে যুদ্ধ করাকে সবচেয়ে জটিল হিসেবে গণ্য করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে কেবল হালকা পদাতিক বাহিনী পাঠানো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ৩০ জানুয়ারি সকালে যৌথ বাহিনীকে যখন মিরপুরে পাঠানো হয়, তখন তাদের সঙ্গে কোনো সাঁজোয়া যান (Armoured Personnel Carrier - APC) ছিল না।

সরু গলিতে অগ্রসর হওয়ার সময় বাহিনীর কাছে কোনো সাঁজোয়া কভার বা গোলন্দাজ সমর্থন (Artillery Support) ছিল না। বহুতল ভবনের ছাদ এবং ছদ্মবেশী বাঙ্কার থেকে যখন শত্রুরা ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি বর্ষণ শুরু করে, তখন কেবল হালকা স্টেনগান ও রাইফেল নিয়ে পদাতিক সৈন্যরা প্রকাশ্য লক্ষ্যবস্তুতে (Open Targets) পরিণত হন।

৩১ জানুয়ারির বিপরীত কৌশল ও চূড়ান্ত বিজয়

৩০ জানুয়ারির ভয়াবহ বিপর্যয়, লে. সেলিমসহ ৪২ জন সেনাসদস্য এবং শতাধিক পুলিশ সদস্যের শাহাদাতের পর সামরিক নেতৃত্ব দ্রুত তাদের ভুল অনুধাবন করে। এর পরদিনই, অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি, কৌশল পরিবর্তন করা হয়। সেনাবাহিনী পূর্ণ সামরিক শক্তিতে সজ্জিত হয়ে ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান এবং ভারী গোলন্দাজ বহর নিয়ে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ চালায়। ভারী যানের সুরক্ষায় পরিচালিত এই অভিযানের সামনে শত্রুদের প্রতিরোধ চুরমার হয়ে যায় এবং অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে ওপরে ওড়ে বিজয়ের পতাকা।

একনজরে শহীদ লে. সেলিম ও ঐতিহাসিক ‘অপারেশন মিরপুর’

শহীদ লে. সেলিম বীর প্রতীক এবং ৩১ জানুয়ারির ঐতিহাসিক মিরপুর মুক্ত যুদ্ধের প্রামাণিক সারসংক্ষেপ তথ্য নিচে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় ও মানদণ্ড

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিস্তারিত বিবরণ

প্রধান শহীদ বীর

লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সেলিম, বীর প্রতীক

সংযুক্ত সামরিক ইউনিট

দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ("জুনিয়র টাইগার্স")।

অন্যান্য প্রধান অধিনায়ক

তৎকালীন লে. হেলাল মোর্শেদ (বীর বিক্রম) এবং ডিএসপি এস. এ. লোদী (শহীদ)।

অভিযানের নাম ও তারিখ

‘অপারেশন মিরপুর’ (৩০ জানুয়ারি ১৯৭২)।

মিরপুর মুক্ত দিবস

৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ (দেশ ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হলেও এটি মুক্ত হয় দেড় মাস পর)।

অভিযানের মূল লক্ষ্য

অবরুদ্ধ মিরপুরে উর্দূভাষী সশস্ত্র বিহারী ও লুকিয়ে থাকা পাক সেনাদের নিরস্ত্রীকরণ।

যুদ্ধের মূল ঘটনাস্থল

মিরপুর সেকশন-১২ পানির ট্যাংক, কালাপানির ঢাল, রূপনগর ও জল্লাদখানা।

লে. সেলিমের ঐতিহাসিক উক্তি

"আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না!" (বুকে গুলি লাগার পর স্বহস্তে শার্ট বেঁধে)।

অভিযানের ক্ষয়ক্ষতি

৪১ জন সামরিক সদস্য, ডিএসপি লোদীসহ শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ।

অভিযানের ফলাফল

মিরপুর শত্রু মুক্ত, ১০ হাজার সশস্ত্র বিহারী বন্দি ও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন।

জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি

মিরপুরের প্রধান সড়কের নাম 'শহীদ সেলিম সড়ক' এবং মিরপুরকে 'সেলিমবাদ/সেলিমনগর' ঘোষণা।

স্মৃতির ধুলোবালি ও অধরা দাবি: ৫৩ বছরেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সম্মান

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু অত্যন্ত আফসোসের বিষয় হলো, অবরুদ্ধ মিরপুর মুক্ত করার জন্য যে বীর সেনানী তাঁর দেহকে খণ্ডবিখণ্ড হতে দিয়ে নিজের রক্তে স্বাধীন বাংলাদেশের শেষ শত্রুপুরী মুক্ত করলেন, সেই শহীদ লে. সেলিম রয়ে গেছেন একপ্রকার উপেক্ষিত।

'মিরপুর তরুণ সংঘ' ও 'শহীদ লে. সেলিম মঞ্চ'-এর আন্দোলন: স্বাধীনতার পর থেকেই মিরপুরের স্থানীয় সচেতন তরুণ সমাজ, ‘মিরপুর তরুণ সংঘ’ এবং ‘শহীদ লে. সেলিম মঞ্চ’ ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। তারা প্রতি বছর ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত দিবস উদযাপন করে এবং শহীদ লে. সেলিমের আত্মত্যাগের স্মরণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে।

উপেক্ষিত দাবি ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা

স্থানীয় জনগণের মূল দাবি ছিল তিনটি:

১. মিরপুর সেকশন-১২ এর প্রধান সড়কটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শহীদ লে. সেলিম সড়ক’ হিসেবে নামকরণ করা।
২. অবরুদ্ধ মিরপুরকে বীরত্বের সাথে মুক্ত করার সম্মানার্থে পুরো এলাকাটির নাম পরিবর্তন করে ‘সেলিমবাদ’ বা ‘সেলিমনগর’ রাখা।
৩. সেকশন-১২ এর পানির ট্যাংকের পাশে যেখানে সেলিম প্রথম বুলেটের আঘাত সহ্য করেছিলেন, সেখানে একটি বিশালাকার জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা।

পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রম করলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লে. সেলিমের এই অনন্য আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বড় কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মিরপুর ১২ নম্বরের সেই পানির ট্যাংক বা কালাপানির ঢালে আজ ইটের অট্টালিকা গড়ে উঠেছে, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে সেলিম ও তাঁর ৪১ জন সহযোদ্ধার স্মৃতিচিহ্ন।

১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক মাটি খনন: প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও মানবকঙ্কাল উদ্ধার

স্বাধীনতার দীর্ঘ ২৮ বছর পর, ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে মিরপুরের বধ্যভূমি নিয়ে এমন এক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক আবিষ্কার ঘটে, যা সমগ্র জাতিকে একাত্তরের নৃশংসতার কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

জুলাই ১৯৯৯-নূরী মসজিদের ঘটনা: মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারের নূরী মসজিদের সংস্কার ও সম্প্রসারণের জন্য শ্রমিকরা মাটি খোঁড়া শুরু করে। কিন্তু মাত্র কয়েক ফুট গভীরে যেতেই কোদালের মাথায় উঠে আসে সারি সারি মাথার খুলি, মানুষের হাতের ও পায়ের হাড় এবং পচে যাওয়া জামাকাপড়।

খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুক্তিসংগ্রামের গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।

ফরেনসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্ধার অভিযান

সরকারের নির্দেশে এলাকাটিকে ঘিরে ফেলে বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক পদ্ধতিতে মাটি খনন শুরু করা হয়। এই খননকার্যে নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞবৃন্দ এবং সশস্ত্র বাহিনীর মেডিকেল কোর। খননকাজ চালিয়ে উদ্ধার করা হয়:

শত শত মানব মাথার খুলি: যার মধ্যে অনেকগুলোতে বেয়ানেটের আঘাত ও বুলেটের ছিদ্র স্পষ্ট ছিল।
নারীদের ব্যবহৃত পোশাক ও অলংকার: শাড়ির অংশ, কাঁচের চুড়ি এবং আংটি, যা প্রমাণ করে সেখানে অসংখ্য নারীকে হত্যা করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীদের চশমা ও জুতো: চশমার ফ্রেম, কলম, ঘড়ি ও পকেটের মানিব্যাগ উদ্ধার করা হয়, যা থেকে গবেষকরা নিশ্চিত হন যে ধরে আনা বাঙালিদের সেখানেই হত্যা করা হতো।

এই উদ্ধারকৃত কঙ্কাল ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলোর একটি বড় অংশ বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর (আগারগাঁও) এবং মিরপুর সেকশন-১০ এ নির্মিত জল্লাদখানা স্মারকালয়ে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

হৃদয়ের মণিকোঠায় লে. সেলিম ও সহযোদ্ধাদের অমরত্ব

ইটের ফলক বা সরকারি নথিপত্রে শহীদ লে. সেলিমের নাম খোদাই করা হোক বা না হোক, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস এবং কোটি বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম বীর প্রতীক চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির সামরিক কর্মকর্তা, যিনি বুকেলে বুলেট নিয়েও সহযোদ্ধাদের একা ফেলে যাননি। নিজের রক্তে ভেজা শার্ট দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন:

“আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না!”

৩০ জানুয়ারি ও ৩১ জানুয়ারির সেই রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গনে শহীদ হওয়া ২য় ইস্ট বেঙ্গলের ৪১ জন জওয়ান, অকুতোভয় ডিএসপি এস. এ. লোদী, নাম না জানা শতাধিক পুলিশ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

মিরপুরের মাটি কেবল ধুলোবালির মাটি নয়; এ মাটি শহীদ সেলিমের খণ্ডবিখণ্ড দেহের রক্তে ভেজা এক পবিত্র আমানত। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হলো ইতিহাসের এই বিস্মৃত অধ্যায়কে লালন করা, শহীদ লে. সেলিমের অদম্য সাহসিকতার গল্প ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া এবং একটি সার্বভৌম, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁদের আত্মত্যাগের ঋণ পরিশোধ করা।

শহীদ লে. সেলিম ও অবরুদ্ধ মিরপুরের সকল বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। আপনারা অমর, আপনাদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.