>
>
মেজর জিয়াউর রহমান - মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘জেড ফোর্স’ ও সেক্টর কমান্ডারের বীরত্ব
মেজর জিয়াউর রহমান - মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘জেড ফোর্স’ ও সেক্টর কমান্ডারের বীরত্ব
স্বাধীনতাসংগ্রামে যেসব সামরিক অধিনায়ক বীরত্ব, অসীম সাহসিকতা এবং সুদূরপ্রসারী রণকৌশল দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি) অন্যতম। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমান “উই রিভোল্ট” (আমরা বিদ্রোহ করলাম) বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ সালের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার, পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ (Z Force)-এর অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বহু রক্তক্ষয়ী ও কৌশলগত সম্মুখ যুদ্ধের নকশা তৈরি, নির্দেশ প্রদান ও সরাসরি নেতৃত্ব দেন।

TruthBangla

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও সশস্ত্র সংগ্রাম। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পৈশাচিক ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর বিরুদ্ধে বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ পরবর্তীতে এক সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। এই স্বাধীনতাসংগ্রামে যেসব সামরিক অধিনায়ক বীরত্ব, অসীম সাহসিকতা এবং সুদূরপ্রসারী রণকৌশল দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি) অন্যতম।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমান “উই রিভোল্ট” (আমরা বিদ্রোহ করলাম) বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৬শে মার্চ তিনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে প্রাথমিক ঘোষণা দেন এবং পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। দিশেহারা মুক্তিকামী মানুষ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের মাঝে এই ঘোষণা বিজয়ের প্রবল উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করে।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ সালের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার, পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ (Z Force)-এর অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বহু রক্তক্ষয়ী ও কৌশলগত সম্মুখ যুদ্ধের নকশা তৈরি, নির্দেশ প্রদান ও সরাসরি নেতৃত্ব দেন।
চট্টগ্রাম ও কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ: মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই সামরিক প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে "উই রিভোল্ট" ঘোষণা দিয়ে তিনি রেজিমেন্টের পাকিস্তানি অধিনায়ক সংলগ্ন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রশিদ জানজুয়াসহ শত্রু মনোভাবাপন্ন অফিসারদের বন্দি করেন এবং পুরো ব্যাটালিয়নের একক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তাঁর অধীনস্থ ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ক্যাপ্টেন খালেকউজ্জামান এবং সংসংলগ্ন বাঙালি অফিসারদের নিয়ে তিনি প্রাথমিক সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের অঞ্চলকে পাকিস্তানি দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি বিদ্রোহ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করেন।
চট্টগ্রাম শহর ও ষোলশহর ব্যাটলফিল্ড: চট্টগ্রাম শহর ও ষোলশহর ব্যাটলফিল্ডে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ২৬শে মার্চ ভোরেই জিয়াউর রহমানের নির্দেশনায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সেনা মোতায়েন করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর, সেনানিবাসের প্রবেশপথ, ষোলশহর ব্যাটালিয়ন সদর এবং আগ্রাবাদ এলাকায় শক্তিশালী প্রতিরোধ চেইন তৈরি করা হয়। ২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা বাঙালি সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করে।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও প্রতিরোধ ব্যূহ: কালুরঘাট ব্রিজ ছিল চট্টগ্রাম শহর থেকে কাপ্তাই ও কক্সবাজারমুখী যাতায়াতের এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র সুরক্ষার মূল সামরিক কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২০তম বালুচ রেজিমেন্ট এবং ৫৩তম ফিল্ড আর্টলারির বিশাল কনভয় চট্টগ্রাম শহর পুনর্দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলে কালুরঘাট ব্রিজের মুখে মেজর জিয়ার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ট্রেঞ্চ খনন ও কৌশলগত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করা হয়। বাঙালি সৈনিকরা সীমিত সমরাস্ত্র ও পরিমিত গোলাবারুদ নিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তোলে।
পটিয়া ও কালুরঘাট যুদ্ধ: এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কালুরঘাট ও পটিয়া অঞ্চলে চরম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনী পদাতিক আক্রমণের পাশাপাশি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর স্যাবার জেট দিয়ে আকাশপথে বোমা হামলা চালায় এবং বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজ 'পিএনএস বাবর' থেকে ভারী নৌ-গোলন্দাজ গোলাবর্ষণ শুরু করে। এই নজিরবিহীন সর্বাত্মক আক্রমণের মুখেও মেজর জিয়ার নির্দেশে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, তৎকালীন ইআরপি (ইপিআর), পুলিশ ও সাধারণ মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা বেশ কয়েক দিন ধরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।
এই দীর্ঘায়িত প্রতিরোধ যুদ্ধের মূল সফলতা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে বেশ কিছুদিন আটকে রাখা, যার ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থানরত হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক সদস্যরা নিরাপদে আশ্রয়ে সরে যেতে পেরেছিলেন এবং ভারতের মাটিতে দীর্ঘমেয়াদী মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান।
‘জেড ফোর্স’ গঠন ও সামরিক কৌশলবিদ হিসেবে মেজর জিয়া
১৯৭১ সালের জুন-জুলাই মাসে তেলিয়াপাড়া সামরিক বৈঠক এবং পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার ও যৌথ কমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে কৌশলগত রূপান্তর আনা হয়। শুধুমাত্র ছোট ছোট দলে বিভক্ত গেরিলা আক্রমণের পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি প্রথাগত সম্মুখ যুদ্ধে (Conventional Warfare) পরাজিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ই জুলাই ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ-মেঘালয় সীমান্তের তৎকালীন টেলঢালা (ক্যাঙ্গারু ক্যাম্প) এলাকায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত পদাতিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়, যার নামকরণ করা হয় এর অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের নামের প্রথম অক্ষর 'জেড' (Z) অনুযায়ী।
জেড ফোর্সের অধীনে নিয়মিত সেনাবাহিনীর তিনটি ব্যাটালিয়নকে সংসংগঠিত করা হয়—১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (সিনিয়র টাইগার্স), ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই ব্যাটালিয়নগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে মেজর এম. এ. জিয়াউদ্দিন, মেজর শাফায়াত জামিল এবং মেজর এ. জে. এম. আমিনুল হক। সামরিক কৌশলবিদ হিসেবে মেজর জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, সদ্য সংগঠিত একটি বাহিনীকে কীভাবে প্রথাগত যুদ্ধ এবং গেরিলা কৌশলের সমন্বয়ে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে হয়। তিনি টেলঢালা ও আশপাশের পাহাড়ে সৈনিকদের রাত্রিকালীন দীর্ঘ মার্চ, ট্রেঞ্চ খনন, শত্রুঘাঁটি ঘেরাও এবং গোলন্দাজ বাহিনীর সাথে সমন্বয় সাধনের কঠোর প্রশিক্ষণ দেন।
মেজর জিয়া চিরাচরিত হিট-অ্যান্ড-রান কৌশলের সাথে প্রথাগত সামরিক আক্রমণের সমন্বয় ঘটান। তাঁর নির্দেশনায় জেড ফোর্স ১৯৭১ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তিশালী সীমান্ত পোস্ট ও শক্ত ঘাঁটিগুলোতে একাধিক ঐতিহাসিক সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করে। এর মধ্যে কামালপুর বিওপি আক্রমণ, নকশী বিওপির যুদ্ধ, বাহাদুরাবাদ ঘাট অভিযান, ছাতক যুদ্ধ এবং ধলাই চা বাগান যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কামালপুর ও নকশীর যুদ্ধে জেড ফোর্সের জোয়ানরা শত্রুর সুসংগঠিত কংক্রিট বাংকারে সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তান বাহিনীকে প্রচণ্ড ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।
মেজর জিয়ার কৌশলগত দক্ষতার অন্যতম দিক ছিল ব্যাটালিয়নগুলোর মধ্যে কার্যকর সিগন্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পেছনের রিয়ার লজিস্টিকস সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা। ৩ ইঞ্চি মর্টার ও গোলন্দাজ ব্যাটারির নিখুঁত ব্যবহার নিশ্চিত করে তিনি ব্রিগেডটিকে একটি পেশাদার সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করেন। এই প্রথাগত যুদ্ধ পরিচালনার সামর্থ্য একদিকে যেমন মুক্তাঞ্চল গঠনে সহায়তা করে, অন্যদিকে পরবর্তীকালে যৌথ বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের পথকে ত্বরান্বিত করে।
মেজর জিয়ার সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব দেয়া প্রধান যুদ্ধসমূহ
মেজর জিয়াউর রহমানের সামরিক পরিকল্পনা, প্রত্যক্ষ নির্দেশ এবং নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড 'জেড ফোর্স' এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যগণ শত্রুঘাঁটির ওপর বেশ কিছু ভয়াবহ, সুপরিকল্পিত ও ঐতিহাসিক আক্রমণ পরিচালনা করেন:
কামালপুর বিওপির যুদ্ধ (জামালপুর-শেরপুর সীমান্ত)
তৎকালীন জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত কামালপুর সীমান্ত ফাঁড়িটি (BOP) ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। এটি ছিল জামালপুর ও ময়মনসিংহ হয়ে সরাসরি রাজধানী ঢাকা দখলের মূল কৌশলগত প্রবেশদ্বার। ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের অধীনে ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও ইপিসিএএফ-এর বিপুল সৈন্য এখানে অবস্থান নেয়। শত্রু বাহিনী এই ঘাঁটিতে প্রায় ১৫-১৬ ফুট পুরু শক্তিশালী কংক্রিট বাংকার, কয়েক স্তরের কাঁটাতারের বেড়া, অ্যান্টি-পার্সোনেল ও অ্যান্টি-ট্যাংক মাইনফিল্ড এবং স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্র প্রতিস্থাপন করে একে প্রায় অভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিল।
মেজর জিয়ার রণকৌশল ও পরিকল্পনা: 'জেড ফোর্স' কমান্ডার হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমান স্বয়ং কামালপুর দুর্গ পতনের জন্য ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে এক সমন্বিত আক্রমণের নকশা তৈরি করেন। তিনি চতুর্বিধ কৌশল গ্রহণ করেন, যাতে প্রধান ঘাঁটিতে আক্রমণের পাশাপাশি শত্রুর রসদ ও যোগাযোগের বিকল্প পথগুলো অবরুদ্ধ করা যায়। ১৯৭১ সালের ৩১শে জুলাই গভীর রাতে জিয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় ১ম ইস্ট বেঙ্গলের 'ডেল্টা' ও 'ব্রাভো' কোম্পানি নিয়ে ঐতিহাসিক এই আক্রমণ শুরু হয়। এই অভিযানে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ছিলেন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী।
যুদ্ধের তীব্রতা: ৩১শে জুলাই রাতের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হাতাহাতি লড়াই চলাকালে আমরণ লড়াই করে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজসহ বেশ কয়েকজন সদস্য বীরত্বের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। প্রাথমিক আক্রমণে উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও মেজর জিয়া পিছু না হেঁটে কৌশল পরিবর্তন করেন। তিনি জুলাই থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কামালপুরকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ রাখার কৌশল নেন এবং নিয়মিত আর্টিলারি গোলাবর্ষণ ও গেরিলা আক্রমণের নির্দেশ দেন। জিয়ার তৈরি এই নিরবচ্ছিন্ন অবরোধের ফলেই পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ ও খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরিশেষে, রসদহীন ও দিশেহারা হয়ে ৪ঠা ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের নেতৃত্বে ৭৯ জন প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সেনা যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
কামালপুর অভিযানের সাথে সমন্বয় রেখে ১৯৭১ সালের ৩রা আগস্ট মেজর জিয়ার নির্দেশে নকশী বিওপিতে আক্রমণ চালায় 'জেড ফোর্স'-এর ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। চরম প্রতিকূল আবহাওয়া ও মাইনফিল্ডের প্রতিকূলতা সত্ত্বে পরিচালিত এই আক্রমণ শেরপুর অঞ্চলের শত্রুর কৌশলগত অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেয়।
ছাতক যুদ্ধ (সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চল)
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে সিলেট অঞ্চলের অতি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরি ছাতক মুক্ত করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন মেজর জিয়া। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স একটি সামরিক দুর্গে রূপান্তর করেছিল। সিমেন্ট কারখানার বহুতল ভবন ও সাইলোতে ভারী মেশিনগান এবং পর্যবেক্ষক পোস্ট বসিয়ে পাকিস্তানিরা সুনামগঞ্জ, ছাতক এবং সিলেটের বিস্তীর্ণ নদীপথ ও সড়ক যোগাযোগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখত।
জিয়াউর রহমানের ট্রিপল-অ্যাটাক প্ল্যান: ছাতকের ভৌগোলিক জটিলতা বিবেচনা করে মেজর জিয়া ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে যুক্ত করে এক ত্রিভুজাকৃতির সাঁড়াশি আক্রমণের (Triple-Attack Plan) পরিকল্পনা তৈরি করেন:
প্রথম দল (৩য় ইস্ট বেঙ্গল): সুরমা নদী অতিক্রম করে সরাসরি ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও শহরের প্রধান পাকিস্তানি ঘাঁটিতে আঘাত হানবে।
দ্বিতীয় দল (৮ম ইস্ট বেঙ্গল): সিলেট-ছাতক সড়ক ও রেলপথ অবরুদ্ধ করে রাখবে, যাতে সিলেট সেনানিবাস থেকে শত্রুর কোনো অতিরিক্ত সৈন্য (Reinforcement) ছাতকে আসতে না পারে।
তৃতীয় দল (রিজার্ভ ফোর্স): একটি শক্ত রিজার্ভ ইউনিট হিসেবে অবস্থান নিয়ে যেকোনো আকস্মিক পরিস্থিতি সামাল দেবে।
যুদ্ধ পরিচালনা ও অগ্রবর্তী কমান্ড পোস্ট: ১৯৭১ সালের ১৩ই অক্টোবর গভীর রাতে মেজর জিয়ার নির্দেশে মুক্তিসেনারা কৌশলগতভাবে সুরমা নদী পার হয়ে ছাতক শহরের ভেতরে প্রবেশ করে। ১৫ই অক্টোবর থেকে যুদ্ধের তীব্রতা চরম আকার ধারণ করে। মেজর জিয়া নিরাপদ দূরত্বে না থেকে সেনাদলের একদম কাছাকাছি 'ফরোয়ার্ড কমান্ড পোস্টে' অবস্থান নিয়ে স্বশরীরে প্রতিটি সামরিক মুভমেন্ট পরিচালনা করেন। তীব্র গোলাবর্ষণের মুখে মুক্তিসেনারা ছাতক সিমেন্ট কারখানার কম্পাউন্ডের ভেতর ঢুকে পড়ে শত্রুকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।
ফলাফল ও রণনৈতিক অর্জন: টানা চার দিন (১৩ থেকে ১৭ই অক্টোবর) চলা এই ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন সৈন্য নিহত হয় এবং তাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ঘাঁটি ও গোলাবারুদের ডিপো ধ্বংস হয়। সিলেট থেকে আসা পিরিয়ডিক রিইনফোর্সমেন্ট বা অতিরিক্ত পাকিস্তানি সেনাদলকে ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যরা সফলভাবে আটকে দেয়। ছাতক যুদ্ধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ব্যাটালিয়ন ও brigade স্তরের অন্যতম বৃহৎ ও সুপরিকল্পিত আক্রমণ, যা সিলেট অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক শক্তি ও মনোবল চিরতরে ভেঙে দিয়েছিল।
ধলই বিওপির যুদ্ধ (মৌলভীবাজার সীমান্ত)
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানের নিকটে অবস্থিত ধলই বিওপি (বর্ডার আউটপোস্ট) ছিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর এক অতি-দুপর্ভেদ্য ও কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি। এখানে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানি ৩০তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের একটি সুসজ্জিত ইউনিট। ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন ত্রিপুরা রাজ্য থেকে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারে মুক্তিসেনাদের ভেতরে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করতে এটি ছিল পাকিস্তানি সেনাসদর দপ্তরের অন্যতম মূল প্রতিরক্ষা বলয়।
পরিকল্পনা ও তোপধ্বনি সমন্বয়: ১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষভাগে ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ধলই বিওপি পুনর্দখলের সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন এবং আক্রমণের দায়িত্ব দেন ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে। শত্রুর কংক্রিটের তৈরি গভীর বাংকার, মাইনফিল্ড ও কাঁটাতারের বেড়া ধ্বংস করার জন্য তিনি মিত্রবাহিনীর ৪৯ ফিল্ড রেজিমেন্টের তোপধ্বনি (Artillery Support) এবং পদাতিক বাহিনীর অগ্রযাত্রার সময়ের অত্যন্ত নির্ভুল সমন্বয় সাধন করেন।
সিপাহী হামিদুর রহমানের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ: ২৮শে অক্টোবর রাতে চারদিক থেকে সমন্বিত আক্রমণ শুরু হয়। ১ম ইস্ট বেঙ্গলের ‘সি’ কোম্পানি ও ‘ডি’ কোম্পানি অগ্রসর হলে শত্রুর একটি সুরক্ষিত স্বয়ংক্রিয় ভারী এলএমজি (লাইট মেশিন গান) বাংকার থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। এই সংকটময় মুহূর্তে সিপাহী হামিদুর রহমান শত্রুর বুলেটের তোয়াক্কা না করে মাটিতে বুকে হেঁটে কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে সরাসরি এলএমজি বাংকারের দিকে এগিয়ে যান। তিনি সাহসিকতার সাথে বাংকারের ভেতর দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণে শত্রুবাংকার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে হামিদুর রহমান গুলবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন এবং দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ অর্জন করেন।
যুদ্ধের ফলাফল: বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের অসীম আত্মত্যাগে থমকে যাওয়া আক্রমণ পুনরায় গতি পায়। জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনায় ও ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ে কয়েকদিনের টানা সংঘাতের পর ৩রা নভেম্বর মুক্তিসেনারা ধলই ঘাঁটি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হয়।
রাধানগর যুদ্ধ (সিলেট অঞ্চল)
সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকার রাধানগর ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি। গোয়াইনঘাট ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নজরদারি চালানো এবং ভারতীয় সীমান্ত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবেশ ঠেকাতে ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সেনাসদস্যরা এখানে শক্তিশালী বাংকার ব্যবস্থা ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল।
কৌশলগত ব্যূহ ভেদ ও ছদ্ম আক্রমণ: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে মেজর জিয়াউর রহমান রাধানগর ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নির্দেশ দেন এবং আক্রমণের সামরিক নকশা প্রণয়ন করেন। এলাকাটি ছিল পাহাড়ি টিলা, জলাভূমি ও ঘন জঙ্গল পরিবেষ্টিত। শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে মেজর জিয়া একটি ছদ্ম আক্রমণের (Feint Attack) কৌশল নেন। মূল আক্রমণের আগে রাতের আঁধারে একটি সেনাদল কৌশলগতভাবে একটি ভিন্ন দিক থেকে ভুয়া আক্রমণ চালায়। এর ফলে পাকিস্তানি সেনাদল ভেবেছিল মূল হামলা সেই দিক থেকেই আসছে এবং তারা সেদিকে মনোযোগ স্থানান্তরিত করে।
রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষ: শত্রুর বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে মেজর শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মূল সেনাদল পাহাড়ি জঙ্গল পেরিয়ে পেছনের দিক থেকে প্রধান ঘাঁটিতে অতর্কিত আঘাত হানে। সেখানে শুরু হয় ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী হাতাহাতি যুদ্ধ (Hand-to-Hand Combat)। বেয়োনেট ও খুকরি দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর শক্ত বাংকারগুলোতে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাস্ত করেন।
যুদ্ধের ফলাফল: মেজর জিয়ার নির্ভুল মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক কৌশলের কারণে মুক্তিবাহিনী রাধানগরের মতো জটিল পাহাড়ি ডিফেন্স লাইন ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। এই জয়ের ফলে গোয়াইনঘাট এলাকা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয় এবং পরবর্তীতে সিলেট শহর অভিমুখে যৌথ বাহিনীর দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার কৌশলগত পথ সুগম হয়।
নকশী বিওপির যুদ্ধ (শেরপুর সীমান্ত)
ময়মনসিংহ-শেরপুর অঞ্চলের তদানীন্তন জামালপুর মহকুমার ঝিনাইগাতী সীমান্তে অবস্থিত নকশী বিওপি ঘাঁটিটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১২তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি সুপ্রশিক্ষিত ও ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কোম্পানি দখল করে রেখেছিল।
জেড ফোর্সের প্রথম প্রথাগত আক্রমণ: ১৯৭১ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মেজর জিয়াউর রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নকশী ঘাঁটিতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি ছিল সদ্য গঠিত প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড 'জেড ফোর্স'-এর অধীনে পরিচালিত প্রথম প্রথাগত ব্যাটালিয়ন স্তরের আক্রমণ (Conventional Warfare)। আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে (অধিনায়ক মেজর আমীনুল ইসলাম)।
সারপ্রাইজ অ্যাটাক ও রাতের অপারেশন: ৬ই আগস্ট দিবাগত গভীর রাতে মুষলধারে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে মুক্তিসেনারা নকশী ঘাঁটির ওপর আকস্মিক हमला চালান। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী নকশী বিওপির চারপাশে গভীর মাইনফিল্ড, কাঁটাতার এবং মাটির নিচে মাইন সাজিয়ে রেখেছিল। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আর্টিলারির গোলাবর্ষণে সাময়িক গোলযোগ তৈরি হলেও জিয়াউর রহমান ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমে অবিরাম দিকনির্দেশনা প্রদান করে সেনাদলের মনোবল ধরে রাখেন।
হাতাহাতি যুদ্ধ ও সামরিক তাৎপর্য: প্রচণ্ড প্রতিকূলতা ও শত্রুর ভারী গোলাবর্ষণের মধ্যেও মুক্তিসেনারা মাইনফিল্ড অতিক্রম করে শত্রুর মূল বাংকারে প্রবেশ করেন এবং মুখোমুখি হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হন। তীব্র সংঘাতের ফলে উভয় পক্ষে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। নকশীর যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে, বীর মুক্তিযোদ্ধারা কেবল গেরিলা যুদ্ধেই নয়, বরং সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি মুখোমুখি প্রথাগত যুদ্ধেও সমানে সমান লড়াই করার সামরিক সামর্থ্য রাখে।
মেজর জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রধান যুদ্ধসমূহের রণকৌশলগত সংক্ষেপ
নিচে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রধান যুদ্ধসমূহ এবং সেগুলোর সামরিক কৌশলের এক নজর সারণী প্রদান করা হলো:
যুদ্ধের নাম | সময়কাল ও অঞ্চল | প্রতিপক্ষ ও সামরিক গুরুত্ব | জিয়াউর রহমানের রণকৌশল ও নেতৃত্ব | যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফল ও প্রভাব |
চট্টগ্রাম ও কালুরঘাট যুদ্ধ | মার্চ – এপ্রিল ১৯৭১ (চট্টগ্রাম অঞ্চল) | ২০তম বালুচ ও ৫৩তম ফিল্ড আর্টিলারি; চট্টগ্রাম বন্দর ও বেতার কেন্দ্র রক্ষা। | ইস্ট বেঙ্গলের বিদ্রোহ পরিচালনা, পটিয়া ও কালুরঘাট ব্রিজে ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি। | পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা বিলম্বিত হয় এবং মুক্তিবাহিনী পুনর্গঠনের মূল্যবান সময় পায়। |
নকশী বিওপির যুদ্ধ | আগস্ট ১৯৭১ (শেরপুর সীমান্ত) | ১২তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট; সীমান্ত নজরদারি ও সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করা। | ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের মাধ্যমে রাতের আঁধারে সারপ্রাইজ সার্কেল অ্যাটাক ও হ্যান্ড-টু-হ্যান্ড কমব্যাট। | জেড ফোর্সের প্রথম সফল প্রথাগত আক্রমণ, শত্রুঘাঁটি আংশিক ধ্বংস ও পাকিস্তানি সেনাশক্তি হ্রাস। |
ছাতক যুদ্ধ | অক্টোবর ১৯৭১ (সুনামগঞ্জ-সিলেট) | ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট; ছাতক সিমেন্ট কারখানা ঘাঁটি ও নদীপথ নিয়ন্ত্রণ। | ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে সমন্বিত ত্রিভুজাকৃতির সাঁড়াশি আক্রমণ পরিকল্পনা। | শত্রুঘাঁটি অবরুদ্ধ, তিন শতাধিক পাকিস্তানি সেনা নিহত ও সিলেট অঞ্চলে শত্রুর রশদ সরবরাহ বন্ধ। |
ধলই বিওপির যুদ্ধ | অক্টোবর ১৯৭১ (মৌলভীবাজার) | ৩০তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স; মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল অক্ষের মূল প্রতিরক্ষা কেন্দ্র। | ১ম ইস্ট বেঙ্গল দিয়ে অবরুদ্ধকরণ এবং গোলন্দাজ বহরের সাথে পদাতিক বাহিনীর সুনির্দিষ্ট টাইম-ম্যাচিং। | ধলই বিওপি দখল, পাকিস্তানি ফ্রন্টিয়ার ফোর্স পিছু হটতে বাধ্য হয় (সিপাহী হামিদুর রহমানের বীরত্ব)। |
কামালপুর বিওপির যুদ্ধ | জুলাই – নভেম্বর ১৯৭১ (জামালপুর সীমান্ত) | ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও রেঞ্জার্স; ঢাকা অভিমুখে প্রবেশের মূল সামরিক দরজা। | নিয়মিত পদাতিক বাহিনীর সাহায্যে চতুর্বিধ অবরোধ ও ক্রমাগত প্রেসার ট্যাকটিক্স। | শত্রু সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ৪ঠা ডিসেম্বর অধিনায়কসহ সকল পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে। |
রাধানগর যুদ্ধ | নভেম্বর ১৯৭১ (সিলেট সীমান্ত) | ৩য় রামপুর রেজিমেন্ট ও রেঞ্জার্স; গোয়াইনঘাট-সিলেট অক্ষের নিয়ন্ত্রণ। | ফেইন্ট অ্যাটাক (ছদ্ম আক্রমণ) চালিয়ে শত্রুর মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে মূল ঘাঁটিতে আঘাত। | রাধানগর প্রতিরক্ষা ব্যূহ চূর্ণ এবং সিলেট শহর মুক্ত করার পথ উন্মুক্ত হয়। |
১৯৭১ পূর্ববর্তী সামরিক জীবন ও কৌশলগত পটভূমি
মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি (PMA) কাকুলে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৫ সালে ১২তম পিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২য় পাঞ্জাব রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হন এবং সামরিক বাহিনীতে একজন ব্যতিক্রমী কৌশলবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের 'আলফা' কোম্পানির অধিনায়ক (Company Commander) হিসেবে খেমেকারান (Khemkaran) সেক্টরের বেডিয়ান ফ্রন্টে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ভারতীয় বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে তাঁর অসামান্য রণকৌশল, স্থিতধী নেতৃত্ব ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাঁকে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব 'হিলাল-ই-জুরআত' প্রদান করে। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সেনাবাহিনীতে 'বেঙ্গল টাইগার্স' নামে পরিচিতি এনে দিয়েছিল।
কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে উচ্চতর প্রশিক্ষণ: যুদ্ধের পর জিয়াউর রহমান কোয়েটার বিখ্যাত স্টাফ কলেজ থেকে সামরিক বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি (psc) অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কাকুলের পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি নতুন সেনা কর্মকর্তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আধুনিক যুদ্ধনীতির পাঠদান করতেন। এর পাশাপাশি তিনি যুক্তরাজ্য থেকেও সামরিক গোয়েন্দা বিষয়ে বিশেষ উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন।
৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান: ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক উত্তাপের প্রেক্ষাপটে তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বদলি করা হয়। চট্টগ্রামে নবগঠিত ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (2IC) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই রেজিমেন্টের অধিকাংশ সৈনিক ও জুনিয়র অফিসার ছিলেন বাঙালি। জিয়াউর রহমানের প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগত জ্ঞান ও পাকিস্তানি সামরিক কাঠামোর ভেতরের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ‘জেড ফোর্স’ গঠন, পরিচালনা ও সরাসরি ব্রিগেড আকারের সম্মুখযুদ্ধ পরিচালনায় প্রধান নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিল।
২৫শে মার্চ কালরাত ও "উই রিভোল্ট": বিদ্রোহের পটভূমি
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রাম সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চলে পরিণত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছিল পাকিস্তান নৌবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রবাহী জাহাজ এমভি সোয়াত (MV Swat), যা ভর্তি ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা প্রায় ৫,৭০০ টন গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র। চট্টগ্রামবাসী ও স্থলাভিষিক্ত বাঙালি জোয়ানরা এই অস্ত্র খালাস প্রতিরোধে বন্দর এলাকায় অভূতপূর্ব ব্যারিকেড গড়ে তোলেন।
২৫শে মার্চ রাত ১১:৩০ মিনিট: ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন পাকিস্তানি অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল জানজুয়া বাঙালি সৈন্যদের নিঃশ্বেষ ও নিরস্ত্র করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কৌশলে মেজর জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস তদারকি করার দাপ্তরিক নির্দেশ দিয়ে একটি জোয়ান দল ও ট্রাকসহ মেজর জিয়াকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠান।
এনায়েত বাজারে পথরোধ: মেজর জিয়ার কনভয়টি যখন ষোলশহর ব্যারাকে থাকা তাঁর সামরিক ইউনিট ছেড়ে শহরের এনায়েত বাজার ও আগ্রাবাদের মধ্যবর্তী এলাকায় পৌঁছায়, তখন ক্যাপ্টেন অলি আহমদের প্রেরিত জরুরি বার্তা নিয়ে এক বাঙালি সৈনিক সেখানে পৌঁছায়। বার্তা মারফত তিনি জানতে পারেন যে, ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করে বাঙালি সিভিলিয়ান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং এটি ছিল তাঁকে বন্দর এলাকায় ডেকে নেওয়ার এক পরিকল্পিত ফাঁদ।
"উই রিভোল্ট" মুহূর্ত: পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করে মেজর জিয়া বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর বহরে থাকা পাকিস্তানি ট্রাক ড্রাইভার ও অফিসারকে তাৎক্ষণিক নিরস্ত্র করেন এবং উচ্চকণ্ঠে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন "We Revolt" (আমরা বিদ্রোহ করলাম)।
ষোলশহর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ: বন্দরে না গিয়ে মেজর জিয়া গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত ষোলশহর ব্যারাকে ফিরে আসেন। সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানি কমান্ডিং অফিসার লেফট্যানেন্ট কর্নেল জানজুয়া ও মেজর রিয়াজকে বন্দি করেন এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেকে অধিনায়ক ঘোষণা করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও ২৬-২৭ মার্চের ঐতিহাসিক ঘোষণা
৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে ষোলশহরে বিদ্রোহ ঘোষণার পর মেজর জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে এই সশস্ত্র প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত জাতীয় সংগ্রামে রূপান্তর করতে সাধারণ মানুষ ও বিশ্ববাসীর কাছে বার্তা পৌঁছানো জরুরি। কালুরঘাটে স্থাপিত 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' এই যোগাযোগের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২৬শে মার্চের প্রথম ঘোষণা: ২৬শে মার্চ বিকেলে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে মেজর জিয়া প্রথম স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নিজেকে সামরিক প্রধান ও অস্থায়ী প্রধান হিসেবে উল্লেখ করে স্বাধীনতার বার্তা পাঠ করেন। এতে তিনি জানান যে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি সামরিক সদস্যরা বিদ্রোহ করেছে এবং প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
২৭শে মার্চের পরিমার্জিত ঘোষণা: ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে তিনি ঘোষণাটি পরিমার্জন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পুনরায় পাঠ করেন:
"I, Major Ziaur Rahman, do hereby declare the Independence of Bangladesh on behalf of our Great National Leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman..."
মনস্তাত্ত্বিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব: এই রেডিও বার্তা বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দ্রুত প্রচারিত হয়। এটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপপ্রচারের বিপরীতে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিত করে যে নিয়মিত সামরিক বাহিনীও যুদ্ধে নেমেছে, যা সাধারণ নাগরিক, পুলিশ ও ইপিআর সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক সাহস জোগায়।
সেক্টর ১-এর অধিনায়কত্ব ও রামগড় প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত মেজর জিয়া চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেনী এবং মুহুরী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কালুরঘাট ও পটিয়ার যুদ্ধ: এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কালুরঘাট সেতু ও বেতার কেন্দ্র সংলগ্ন কৌশলগত অবস্থান রক্ষায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২০তম বালুচ রেজিমেন্ট এবং ৫৩তম ফিল্ড আর্টলারির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। পটিয়ার দিকে অগ্রসরমাণ শত্রু বাহিনীকে রুখে দিতে বাঙালি সেনারা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যেখানে পাকিস্তানি বিমান বাহিনী এফ-৮৬ সেবর বিমান থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও হামলা চালায়।
কৌশলগত পিছু হটা (Tactical Retreat): পাকিস্তানি বাহিনীর বিপুল গোলাবারুদ ও বিমান হামলার মুখে জনবল ও অস্ত্র রক্ষা করতে তিনি 'ইকোনমি অব ফোর্স' (Economy of Force) সামরিক নীতি গ্রহণ করেন। বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তিনি সেনাদলকে কালুরঘাট থেকে পটিয়া, রাঙ্গামাটি ও মহালছড়ি হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড় এবং ফেনী সীমান্তে সফলভাবে সরিয়ে নেন।
১ নম্বর সেক্টরের সংগঠক ও হরিণা সদর দপ্তর: ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন ত্রিপুরা রাজ্যের হরিণায় ১ নম্বর সেক্টরের স্থায়ী সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। এখান থেকে মেজর জিয়া হাজার হাজার বাঙালি যুবক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সংগঠিত করেন। তিনি হরিণা ও বেলোনিয়া অঞ্চলে যুব অভ্যর্থনা কেন্দ্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করেন, যা পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা ও কৌশলগত যুদ্ধের ভিত গড়ে তোলে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ (Z Force)
১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত কলকাতার ৮ থিয়েটার রোডে অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলনে কেবল গেরিলা আক্রমণ নয়, বরং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখপ্রহরের প্রথাগত (Conventional) সামরিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩০শে জুলাই ১৯৭১ সালে ভারতের মেঘালয়ের তেলঢালায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়, যার নাম রাখা হয় এর অধিনায়ক মেজর জিয়ার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে।
১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (Senior Tigers): মেজর এ.এস.এম নাসিমের নেতৃত্বে পরিচালিত এই ব্যাটালিয়নটি ময়মনসিংহের কামালপুর বিওপি আক্রমণ, সিলেট সীমান্ত ও ধলই সীমান্ত চৌকির রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয়। কামালপুরের যুদ্ধে ব্যাটালিয়নটি পাকিস্তানি বাহিনীকে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলে।
৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: মেজর শাফায়াত জামিলের অধিনায়কত্বে গঠিত এই ইউনিটটি সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ছাতক, গোয়াইনঘাট এবং রাধানগরে প্রথাগত আক্রমণ পরিচালনা করে। ছাতক আক্রমণটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালিত প্রথম বৃহৎ মাপের প্রথাগত বা কনভেনশনাল যুদ্ধ।
৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: মেজর এ.জে.এম আমিনুল হকের নেতৃত্বে ব্যাটালিয়নটি নকশী বিওপি আক্রমণ, কামালপুর দ্বিতীয় পর্বের যুদ্ধ এবং ডিসেম্বরের চূড়ান্ত পর্যায়ে সিলেট শহর মুক্ত করার মূল অভিযানে অংশ নেয়।
মুজিব ব্যাটারি (First Field Artillery Battery): ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন আবদুল হকের নেতৃত্বে ৩.৭-ইঞ্চি মাউন্টেন হাউইটজার কামান নিয়ে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের এই প্রথম আর্টলারি বা তোপখানা ইউনিটটি জেড ফোর্সের পদাতিক ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রতিটি অভিযানে দূরপাল্লার ফায়ার সাপোর্ট প্রদান করে।
অধিনায়ক হিসেবে মেজর জিয়ার অবদান: তেলঢালার দুর্গম পাহাড়ি ঘাঁটিতে অবস্থান করে মেজর জিয়া এসব ব্যাটালিয়নকে সুসংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কঠোর সামরিক ডিসিপ্লিন, নৈশকালীন যুদ্ধকৌশল (Night Combat Training) এবং পদাতিক বাহিনীর সাথে তোপখানার ফায়ার সমন্বয় শেখান, যা পরবর্তীতে প্রতিটি সম্মুখযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সেক্টর ১১ এর অধিনায়কত্ব ও জামালপুর-ময়মনসিংহ অক্ষ
১৯৭১ সালের ৩রা নভেম্বর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কামালপুর সীমান্তে পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণের সময় ১১ নম্বর সেক্টরের তৎকালীন কমান্ডার মেজর এম এ তাহের মারাত্মকভাবে আহত হন এবং এক পা হারান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যৌথ কমান্ডের সিদ্ধান্তে 'জেড ফোর্স'-এর অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ১১ নম্বর সেক্টরের (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর ও কুড়িগ্রামের একাংশ) অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি উত্তর রণাঙ্গনের সামগ্রিক যুদ্ধকৌশলে নতুন গতিবেগ আনেন এবং নিয়মিত বাহিনীর সাথে আঞ্চলিক অনিয়মিত বাহিনীর সমন্বয় ঘটিয়ে ঢাকা পৌঁছানোর উত্তর পথ প্রস্তুত করেন।
কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে সংযোগ ও সমন্বয়: টাঙ্গাইল অঞ্চলে সক্রিয় ও সুসংগঠিত ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ (অধিনায়ক: আবদুল কাদের সিদ্দিকী)-র সাথে মেজর জিয়া নিবিড় সামরিক যোগাযোগ স্থাপন করেন। শত্রুবেষ্টিত গভীর অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে থাকা কাদেরিয়া বাহিনীর অবস্থানকে কাজে লাগাতে তিনি ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক এবং বিশেষ বার্তাবাহকদের (মেসেঞ্জার) মাধ্যমে নিয়মিত কৌশলগত তথ্য আদান-প্রদান করতেন। কাদেরিয়া বাহিনীর অভ্যন্তরীণ গেরিলা হামলা এবং জেড ফোর্সের ব্যাটালিয়নগুলোর অগ্রযাত্রার সমন্বয়ে ঢাকা অভিমুখে এক শক্তিশালী সম্মিলিত সামরিক ছক তৈরি করা হয়, যা পাকিস্তানি বাহিনীকে উভয় দিক থেকে চাপের মুখে ফেলে দেয়।
কামালপুর যুদ্ধ ও জামালপুর ব্লকেড: কামালপুর সীমান্ত ঘাঁটি ছিল ঢাকায় প্রবেশের উত্তর দ্বারের সবচেয়ে সুরক্ষিত পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি (৩১ পাঞ্জাব Regiment দ্বারা সুরক্ষিত)। ৪ঠা ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণের মুখে কামালপুর ঘাঁটির পতন নিশ্চিত হলে মেজর জিয়া কালক্ষেপণ না করে দ্রুত জামালপুর ও ময়মনসিংহ অক্ষ বরাবর অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ১ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন ও ৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নকে জামালপুর সামরিক ঘাঁটি অবরোধ (ব্লকেড) করার সামরিক আদেশ দেন। জামালপুরে অবস্থানরত পাকিস্তানি কর্নেল সুলতান আহমেদের বাহিনীর ওপর ১ ও ৮ ইস্ট বেঙ্গল এবং মিত্রবাহিনীর ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেড যৌথভাবে কঠোর অবরোধ সৃষ্টি করে। এই অবরোধ ও পরবর্তী যৌথ আক্রমণের ফলে ১০-১১ ডিসেম্বরের মধ্যে জামালপুর ঘাঁটির পতন ঘটে, যা ময়মনসিংহ অঞ্চল পেরিয়ে ঢাকা দখলের সামরিক পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়।
মেজর জিয়ার যুদ্ধকালীন সামরিক অবদানের কালানুক্রমিক সংক্ষিপ্তসার
তারিখ / সময়কাল | স্থান / অঞ্চল | ঘটনার বর্ণনা & মেজর জিয়ার সামরিক ভূমিকা | কৌশলগত ফলাফল & ঐতিহাসিক গুরুত্ব |
২৫-২৬ মার্চ, ১৯৭১ | ষোলশহর, চট্টগ্রাম | "উই রিভোল্ট" ঘোষণা, পাকিস্তানি জানজুয়াকে গ্রেপ্তার ও ব্যাটালিয়নের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ। | বাংলাদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথাগত সূচনা। |
২৬-২৭ মার্চ, ১৯৭১ | কালুরঘাট, চট্টগ্রাম | কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক বার্তা পাঠ। | দেশব্যাপী বাঙালি সৈনিক ও জনগণের মাঝে সশস্ত্র মানসিক প্রস্তুতি তৈরি। |
এপ্রিল - জুন, ১৯৭১ | ১ নম্বর সেক্টর (চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম) | সেক্টর অধিনায়ক হিসেবে সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষা লাইন গঠন ও ক্যাডার সংগঠিতকরণ। | প্রাথমিক আঘাত সামলে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা ও প্রথাগত যুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন। |
৩০শে জুলাই, ১৯৭১ | তেলঢালা (মেঘালয় সীমান্ত) | 'জেড ফোর্স' গঠন এবং এর অধিনায়ক হিসেবে তিনটি ব্যাটালিয়ন ও আর্টলারি সুসংগঠিতকরণ। | নিয়মিত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিকাশ। |
আগস্ট - নভেম্বর, ১৯৭১ | কামালপুর, ছাতক, ধলই, রাধানগর | জেড ফোর্সের ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে সরাসরি সীমান্ত ঘাঁটিতে প্রথাগত আক্রমণ পরিচালনা। | পাকিস্তানি ৩০ ও ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মূল শক্তি ধ্বংস ও রশদ বিচ্ছিন্ন। |
নভেম্বর - ডিসেম্বর, ১৯৭১ | ১১ নম্বর সেক্টর (ময়মনসিংহ-শেরপুর) | সেক্টর ১১-এর কমান্ড গ্রহণ এবং জামালপুর-ঢাকা অক্ষ মুক্তকরণের পরিকল্পনা। | মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর জন্য দ্রুত ঢাকা প্রবেশের উত্তর পথ উন্মুক্ত। |
মেজর জিয়ার রণকৌশল, সামরিক নেতৃত্ব ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে 'জেড ফোর্স' ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব সামরিক বিশ্লেষকদের নিকট বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর যুদ্ধ পরিচালনার ধরণে কয়েকটি মৌলিক ও স্বতন্ত্র কৌশল পরিলক্ষিত হয়:
অগ্রবর্তী কমান্ড পোস্ট থেকে নেতৃত্ব: সাধারণ সামরিক প্রথা অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন বা ব্রিগেড কমান্ডাররা পিছনের নিরাপদ হেডকোয়ার্টার থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। কিন্তু মেজর জিয়া ছাতক আক্রমণ (অক্টোবর ১৯৭১), নকশী বিওপি যুদ্ধ (আগস্ট ১৯৭১) এবং কামালপুর যুদ্ধের সময় সরাসরি শত্রুর গোলাবর্ষণের আওতাভুক্ত এলাকাতে 'ফরওয়ার্ড কমান্ড পোস্ট' স্থাপন করতেন। ছাতক যুদ্ধের সময় তিনি সুরমা নদীর নিকটবর্তী সম্মুখসারিতে অবস্থান নিয়ে রেডিও সেটে সরাসরি নির্দেশ প্রদান করেন। কমান্ডারকে একদম সামনে দেখে সাধারণ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে মনোবল বহু গুণ বৃদ্ধি পেত।
চিরাচরিত ও অ-চিরাচরিত যুদ্ধের চমৎকার মিশ্রণ: বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সেনা ব্রিগেড 'জেড ফোর্স'-এর প্রধান হিসেবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল অ-চিরাচরিত গেরিলা আক্রমণ দিয়ে সুসংগঠিত শত্রুঘাঁটি সম্পূর্ণ দখল করা সম্ভব নয়। তাই তিনি চিরাচরিত পদাতিক হামলা (Conventional Infantry Warfare) এবং অনিয়মিত গেরিলা আক্রমণের সমন্বয় ঘটান। একদিকে গণবাহিনীর গেরিলারা শত্রুর রসদ সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করা ও অতর্কিত 'হিট অ্যান্ড রান' হামলা চালাত, অন্যদিকে ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের নিয়মিত সেনারা আর্টিলারি ও মর্টারের সহায়তায় ভারী আক্রমণ চালিয়ে শত্রুঘাঁটির পতন নিশ্চিত করত।
কঠোর ডিসিপ্লিন ও সৈনিকদের প্রতি গভীর সহানুভূতি: যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত নির্ভুলতার প্রশ্নে মেজর জিয়া ছিলেন কঠোর ও আপসহীন। কোনো ধরনের শিথিলতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গ তিনি বরদাশত করতেন না। একই সাথে অধীনস্থ সৈনিকদের কল্যাণ ও জীবনের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। ধলই চা-বাগান যুদ্ধ এবং নকশী বিওপির সম্মুখযুদ্ধে যখন ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের একাধিক সৈনিক শহীদ ও আহত হন, তখন তিনি নিজে উপস্থিত থেকে আহতদের দ্রত উদ্ধার করে চিকিৎসা নিশ্চিত করার (MEDEVAC) ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ সেনাদের যথাযথ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা এবং তাঁদের নাম ও বীরত্বের বিবরণ নথিভুক্ত রাখতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও 'বীর উত্তম' খেতাব অর্জন
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করলে চট্টগ্রাম ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমান ২৬শে মার্চ প্রথমার্ধে "আমরা বিদ্রোহ করলাম" (We Revolt) ঘোষণার মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৭শে মার্চ কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন এবং সর্বসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী এলাকা নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত ও প্রথাগত সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করতে ১৯৭১ সালের ১৭ই জুলাই ভারতের মেঘালয়ের তেলঢালায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ বাহিনীর প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড 'জেড ফোর্স' (Z Force)। মেজর জিয়াউর রহমানের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে নামাঙ্কিত এই ব্রিগেডের প্রধান হিসেবে তিনি ১ম, ৩য় এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক কাঠামো দাঁড় করান। একই সাথে তিনি জুন মাসের পর থেকে ১১ নম্বর সেক্টরের (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কুড়িগ্রাম এলাকা) সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বও পালন করেন।
তাঁর পরিকল্পিত ও পরিচালিত কামালপুর, ছাতক, ধলই, রাধানগর ও নকশীর মতো যুদ্ধগুলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মূল স্পাইন বা মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। এই সম্মুখ যুদ্ধগুলোর কারণে পাকিস্তানি জেনারেলরা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার।
স্বাধীনতার পর, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, একক সামরিক দূরদর্শিতা, রণকৌশল এবং দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার মেজর জিয়াউর রহমানকে সশস্ত্র বাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একজন সাহসী সেক্টর কমান্ডার এবং সফল ব্রিগেড প্রধান হিসেবে তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগত সাফল্য চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।















