>

>

দেওয়ানবাগী পীর মাহবুব-এ-খোদা – একাত্তরের রণাঙ্গনে তসবিহ ও স্টেনগান হাতে সুফি সৈনিক

দেওয়ানবাগী পীর মাহবুব-এ-খোদা – একাত্তরের রণাঙ্গনে তসবিহ ও স্টেনগান হাতে সুফি সৈনিক

যখন শর্ষিণার পীর বা গোলাম আযমের মতো কিছু প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষ নিয়ে ফতোয়া দিচ্ছিলেন এবং বাঙালির নির্মূল অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন, ঠিক তখনই আরেকজন প্রভাবশালী আলেম, মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা (পরবর্তীকালে সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী হুজুর হিসেবে পরিচিত) অস্ত্র হাতেই হানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। একাত্তরের রণাঙ্গনে তাঁর ভূমিকা ছিল আপোষহীন।

TruthBangla

দেওয়ানবাগী পীর মাহবুব-এ-খোদা – একাত্তরের রণাঙ্গনে তসবিহ ও স্টেনগান হাতে সুফি সৈনিক

“আমি একজন আলেম। জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষাদানই আমার মূল ব্রত। কিন্তু যখন মাতৃভূমি আক্রান্ত হয়, নিরীহ মানুষের রক্তের নদী বয়ে যায়, তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। আমি কোনো সামরিক পদ বা সুবিধার জন্য যুদ্ধ করিনি, করেছি কেবল আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিকে শোষকের হাত থেকে মুক্ত করতে।” - মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন কমান্ডার মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা (দেওয়ানবাগী হুজুর)

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট পেশার মানুষের সংগ্রাম ছিল না। এটি ছিল একটি সর্বাত্মক ও রক্তক্ষয়ী ‘জনযুদ্ধ’ (People's War)। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, সামরিক বাহিনীর জোয়ান থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বাজি রেখেছিলেন। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ সমাজেও এক বিশাল বৈচারিক ও ঐতিহাসিক বিভাজন লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

একদিকে যখন পাকিস্তানি হানাদার জান্তা এবং তাদের এদেশীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, শর্ষিণার পীর কিংবা পিস কমিটির নেতারা ‘ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার’ নামে সাধারণ বাঙালি হত্যা, নারী নির্যাতন ও লুটেরাকর্মকে ফতোয়া দিয়ে জায়েজ করার জঘন্য চক্রান্তে লিপ্ত ছিল; ঠিক তখনই অন্যদিকে একদল খাঁটি দেশপ্রেমিক আলেম কোরআন ও হাদিসের প্রকৃত শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কলম ধরেছিলেন, কেউ আলেম সমাজকে সংগঠিত করেছিলেন, আবার কেউ সরাসরি কাঁধে স্টেনগান তুলে নিয়ে রণাঙ্গনে শত্রুর মোকাবিলা করেছিলেন।

রণাঙ্গনের সেই অকুতোভয় আলেমদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা যাঁকে বিশ্ববাসী পরবর্তী জীবনে সূফি সম্রাট দেওয়ানবাগী হুজুর হিসেবে চেনে।

বর্তমান সময়ে দেওয়ানবাগী হুজুরকে নিয়ে নানা ধরণের ধর্মীয় মতাদর্শিক বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোলিং দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম ও বস্তুনিষ্ঠ সত্য হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং তা সরকারি দলিল, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সামরিক নথি এবং ৩ নম্বর সেক্টরের শীর্ষ অধিনায়কদের লিখিত বইয়ে স্বমহিমায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। ব্যক্তির পরবর্তী জীবনের বিশ্বাস বা ধর্মীয় চর্চা যা-ই হোক না কেন, একাত্তরে লাল-সবুজের পতাকার জন্য তাঁর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। এই নিবন্ধে রণাঙ্গনে আলেম যোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা (দেওয়ানবাগী হুজুর)-এর সেই রোমাঞ্চকর, অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক ভূমিকা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

একাত্তরে অপব্যাখ্যার ফতোয়া বনাম আলেমদের সশস্ত্র প্রতিরোধ

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর নামে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে, তখন তারা এই গণসংহারকে একটি ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা প্রচার করছিল যে, বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলন হলো ‘পাক-ভারত ষড়যন্ত্র’ এবং ‘ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’

দেওয়ানবাগী পীর মাহবুব-এ-খোদা – একাত্তরের রণাঙ্গনে তসবিহ ও স্টেনগান হাতে সুফি সৈনিক

ফতোয়াবাজদের ঘৃণ্য ভূমিকা: সেই সময়ে শর্ষিণার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ কিংবা জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন প্রধান গোলাম আযমের মতো প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা মুক্তিকামী বাঙালিদের ‘কাফের’ বা ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে ফতোয়া দিয়েছিলেন। এমনকি বাঙালি নারীদের ‘মালে গনিমত’ (যুদ্ধের ময়দানে অর্জিত গণিমতের মাল) বলে পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য অবমাননাকরভাবে বৈধ করার মতো পৈশাচিক প্রচারণাও চালানো হয়েছিল।

সত্যপন্থী আলেমদের প্রতিরোধ: এই চরম ইসলামবিরোধী ও মানবতাবিরোধী অপপ্রচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তৎকালীন বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আলেম ও পীর-মাশায়েক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, অমানবিক জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা। মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল বক্তৃতা বা ফতোয়া দিয়ে এই নরঘাতকদের থামানো যাবে না। শত্রুকে পরাস্ত করতে হলে শত্রুর ভাষাতেই জবাব দিতে হবে অর্থাৎ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

রাজনৈতিক চেতনা ও রণাঙ্গনের পূর্বপ্রস্তুতি (১৯৬৯–১৯৭০)

মাওলানা মাহবুব-এ-খোদার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। রণাঙ্গনে নামার বহু আগেই তিনি একজন সচেতন রাজনৈতিক সংগঠক ও সমাজসেবক হিসেবে স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব: ১৯৬৯ সালে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল হয়ে উঠেছিল, তখন তরুণ আলেম মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একজন ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ হয়েও ছাত্র সমাজের অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তাঁর অসামান্য উদারতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ ছিল।

৭০ এর নির্বাচনে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পরও যখন ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে, তখন মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা উপলব্ধি করেন যে, রাজনৈতিক সংকট অচিরেই একটি পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে। এই দূরদর্শিতা থেকে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় তরুণদের সংগঠিত করেন এবং লাঠি, সর্কি ও মৌলিক শরীরচর্চার মাধ্যমে সামরিক যুদ্ধের প্রাথমিক মানসিক ও শারীরিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

দেওয়ানবাগী পীর মাহবুব-এ-খোদা – একাত্তরের রণাঙ্গনে তসবিহ ও স্টেনগান হাতে সুফি সৈনিক

মেডডা ক্যাম্প থেকে ৩ নম্বর সেক্টর: স্বেচ্ছাসেবক থেকে প্লাটুন কমান্ডার

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর পুরো দেশ যখন জ্বলছিল, তখন মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা প্রথম দিকে রিফিউজি ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় ও খাদ্যের সংস্থান করতে একটি শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা দিন দিন বাড়তে থাকলে তিনি বুঝতে পারেন যে, কেবল ত্রাণ কার্যক্রম দিয়ে এই গণহত্যা ঠেকানো সম্ভব নয়।

৭২ জন সহযোদ্ধা নিয়ে রণাঙ্গনে যাত্রা

১৯৭১ সালের ১১ই এপ্রিল যখন অনেক রাজনৈতিক নেতাও সীমান্ত পার হওয়ার সঠিক পথ খুঁজছিলেন, ঠিক তখন মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা তাঁর এলাকার ৭২ জন অকুতোভয় সাহসী যুবককে একত্রিত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেড্ডায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগ দেন। এটি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর রণাঙ্গনের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রথম ধাপ।

তেলিয়াপাড়া ৩ নম্বর সেক্টরে দায়িত্ব গ্রহণ

মেডডা ক্যাম্প থেকে পরবর্তীতে তাঁদের ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া ৩ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর মেধা, সাহসিকতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং নেতৃত্বগুণ দেখে ৩ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক তৎকালীন মেজর কে এম সফিউল্লাহ (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেল) তাঁকে ৬০ জন বাছাইকৃত তরুণের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ প্লাটুনের ‘প্লাটুন কমান্ডার’ (Platoon Commander) হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন।

এখানে স্মরণীয় যে, তৎকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত ও সংগঠিত হওয়ার আগেই তিনি রণাঙ্গনে একজন প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধের ময়দানে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

সরকারি দলিল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণপত্র

দেওয়ানবাগী হুজুরের এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টি কেবল মুখের কথা বা অনুমাননির্ভর নয়। বাংলাদেশের সরকারি নথিপত্রে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তাঁর নাম ও রেকর্ড রয়েছে:

ভারতীয় মিত্রবাহিনীর অফিশিয়াল রেকর্ড: ভারতের রিক্রুটমেন্ট বইয়ে তাঁর ক্রমিক নম্বর MF Volume-7, Page-11 হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের রেকর্ড: বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত মুক্তিবার্তা ও কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকায় তাঁর স্বনামে সনদপত্র ও ক্রমিক নম্বর রয়েছে ৩৪০৬৬

দেওয়ানবাগী পীর মাহবুব-এ-খোদা – একাত্তরের রণাঙ্গনে তসবিহ ও স্টেনগান হাতে সুফি সৈনিক

রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমর ও সফল সামরিক অপারেশনসমূহ

৩ নম্বর সেক্টরের একজন অত্যন্ত সক্রিয় প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা টানা আড়াই মাস সরাসরি সম্মুখ সমর (Direct Battle) এবং বিপজ্জনক সব গেরিলা অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবহরের ওপর তাঁদের প্লাটুন একের পর এক ধ্বংসাত্মক হামলা চালায়।

শাহবাজপুরের ঐতিহাসিক যুদ্ধ (২৬শে এপ্রিল ১৯৭১)

প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে মাওলানা মাহবুব-এ-খোদার জীবনের প্রথম সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালের ২৬শে এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে। পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্তিশালী কন্টিনজেন্ট যখন সামনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত প্লাটুন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় শত্রুর ওপর ‘টার্গেট অ্যাটাক’ (Target Attack) চালায়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকজন সৈন্য হতাহত হয় এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মাধবপুরের যুদ্ধ (২৮শে এপ্রিল ১৯৭১)

শাহবাজপুর যুদ্ধের দু'দিন পরই ২৮শে এপ্রিল মাধবপুরে পাকিস্তানি কনভয়ের মুখোমুখি হয় তাঁর টিম। ভারী অস্ত্রের মুখেও তিনি মাথা ঠাণ্ডা রেখে তাঁর প্লাটুনের জোয়ানদের পজিশন ধরে রাখার নির্দেশ দেন। দীর্ঘ সময় গোলাগুলির পর শত্রু সেনাদল পিছু হটলে মুক্তিযোদ্ধারা ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন।

মে মাসের প্রাণঘাতী অ্যামবুশ সিরিজ (১১, ১২ ও ১৬ই মে ১৯৭১)

মে মাসে ৩ নম্বর সেক্টরে ‘এস’ ফোর্সের অধীনে পাকিস্তানি সেনাবহরের গতিপথ স্তব্ধ করে দিতে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অ্যামবুশ (Ambush) বা অতর্কিত হামলা পরিচালনা করা হয়।

১১ই মে (সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক): পাকি বাহিনীর রসদবাহী ট্রাকে সফল অ্যামবুশ চালিয়ে ট্রাক ধ্বংস করা হয়।

১২ই মে (বাগসাইর গ্রাম, মাধবপুর): গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানি টহল দলের ওপর হামলা চালানো হয়।

১৬ই মে (তেলিয়াপাড়া ও চুনারুঘাট মহাসড়ক): একই সাথে দুটি মহাসড়কে কৌশলগত অ্যামবুশ পরিচালনা করে শত্রু সেনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

মনতলা-হরষপুরের যুদ্ধ (১৫ই জুন ১৯৭১)

১৫ই জুন আখাউড়া-সিলেট রেললাইনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট মনতলা ও হরষপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সুরক্ষিত ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালানো হয়। মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা তাঁর প্লাটুনের অগ্রভাগে থেকে ফায়ারিং কভার দেন, যার ফলে সহযোদ্ধারা শত্রুর বাংকারে গ্রেনেড হামলা চালাতে সক্ষম হন।

১ নম্বর সেক্টরে দায়িত্ব পালন, ৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল ও মেজর জিয়াউর রহমানের সান্নিধ্য

যুদ্ধের কৌশলগত প্রয়োজনে ৩ নম্বর সেক্টর থেকে কিছু সুপ্রশিক্ষিত কোম্পানিকে অন্যান্য সেক্টরে রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে পাঠানো হতো।

ত্রিপুরা-ধর্মনগর সীমান্তে কৌশলগত মিশন: কৌশলগত জটিলতার মুখে ৩ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর কে এম সফিউল্লাহ ১ নম্বর সেক্টরের (ত্রিপুরা/ধর্মনগর সীমান্ত এলাকা) প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেন। এই কাজের জন্য একটি বিশেষ কোম্পানি গঠন করা হয় এবং সেটির প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্ব দিয়ে মাওলানা মাহবুব-এ-খোদাকে সেখানে পাঠানো হয়।

৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন ও মেজর জিয়া: ১ নম্বর সেক্টরে পৌঁছে তিনি তৎকালীন ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি)-এর অধীনে টানা দুই সপ্তাহ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাব কাজ করেন। সেখানে তিনি ঐতিহাসিক ‘৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ (যা পরবর্তীতে 'ফ্লায়িং টাইগার্স' নামে পরিচিত লাভ করে) পুনর্গঠন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন আলেমের এই সামরিক দক্ষতা ও শৃ্ঙ্খলা দেখে মেজর জিয়াও বেশ ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

সামরিক কমিশনড অফিসার পদ প্রত্যাখ্যান: নিস্বার্থ দেশপ্রেমের অনন্য নজির

রণাঙ্গনে মাওলানা মাহবুব-এ-খোদার সাহসিকতা, ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অসাধারণ নেতৃত্বগুণ দেখে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কर्नल এম এ জি ওসমানী এবং সেক্টর অধিনায়করা তাঁকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়মিত অফিসারদের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ‘কমিশনড অফিসার’ (Commissioned Officer) পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন।

মহৎ প্রত্যাখ্যান: তৎকালীন সময়ে যেকোনো তরুণের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কমিশনড অফিসার হওয়া ছিল পরম ভাগ্য ও মর্যাদার বিষয়। কিন্তু পরম আলেম মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা সেই লোভনীয় প্রস্তাব বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন:

“আমি একজন আলেম। আলেম সমাজকে হেদায়েত করা, জ্ঞানচর্চা ও দ্বীনের খিদমত করাই আমার মূল দায়িত্ব ও পেশা। আমি কোনো সামরিক পদবি, চাকরি বা ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ার লোভে মুক্তিযুদ্ধে আসিনি। আমার জন্মভূমি আক্রান্ত হয়েছে, আমার মা-বোনেরা নির্যাতিত হচ্ছে একজন মুমিন হিসেবে দেশকে শত্রুমুক্ত করা আমার ঈমানী দায়িত্ব ছিল। দেশ স্বাধীন হলে আমি পুনরায় আমার দ্বীনি খেদমতে ফিরে যাব।”

এই একটি সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে, তিনি ক্ষমতার মোহ বা জাগতিক অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেননি; তাঁর যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণভাবে খোদার সন্তুষ্টি এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য।

হেজামারার ঐতিহাসিক খুতবা ও অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী (১৯শে নভেম্বর ১৯৭১)

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্লাটুন কমান্ডার মাওলানা মাহবুব-এ-খোদার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, আলোচিত এবং স্মরণীয় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১৯শে নভেম্বর, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনে।

ঈদের নামাজের ইমামতি: তখন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হেজামারায় অবস্থিত ৩ নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন হাজার হাজার রণাঙ্গনের যোদ্ধা। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে, রক্ত ও বারুদের গন্ধে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঈদের নামাজ আদায় করতে সমবেত হন। সর্বসম্মতিক্রমে ইমামতির দায়িত্ব দেওয়া হয় রণাঙ্গনের বীর আলেম যোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদাকে।

নামাজ শেষে খুতবা দেওয়ার সময় পরিবেশ এক অত্যন্ত আবেগঘন রূপ নেয়। দেশমাতৃকার পরাধীনতা, লাখো শহীদের রক্ত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে জোয়ানরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী ও শপথ: কাদঁতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে রণাঙ্গনের এই আলেম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আল্লাহর নামে শপথ করে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন:

“হে আমার সহযোদ্ধা বীর ভাইয়েরা! চোখের পানি মুছে ফেলুন। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি আসন্ন ঈদুল আজহা (কুরবানির ঈদ)-র আগেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন হবে! এবং আমি আল্লাহর দরবারে ওয়াদা করছি, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আমি নিজে আপনাদের সাথে নিয়ে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করব!”

চরম অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের ঘোর অন্ধকারের মধ্যে এই ঘোষণা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক স্বর্গীয় বাণীর মতো। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে এক হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

অক্ষরে অক্ষরে ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়া

বিস্ময়করভাবে, তাঁর সেই কথা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল! ঘোষণাদানের মাত্র ২৭ দিন পর, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।

ঠিক তার পরবর্তী মাস অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২৬শে জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ঐতিহাসিক ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো বিজয়ী বীর জনতার সেই ঐতিহাসিক প্রথম ঈদুল আজহার জামাতে স্বয়ং ইমামতি করেছিলেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা সেই মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা (দেওয়ানবাগী হুজুর)।

শীর্ষ সামরিক অধিনায়কদের বইয়ে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি

দেওয়ানবাগী হুজুরের এই ঐতিহাসিক খুতবা ও ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয়টি কেবল কোনো মৌখিক জনশ্রুতি নয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রধান সামরিক ঐতিহাসিকদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে:

মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ (৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক সেনাপ্রধান): তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া: তাঁর লিখিত বইয়ে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির গুরুত্ব আলোচনা করেছেন।

মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া: তাঁর বিখ্যাত সামরিক গ্রন্থ ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’-এর ৩১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় হেজামারা ক্যাম্পের এই ঘটনা এবং দেওয়ানবাগী হুজুরের ঐতিহাসিক খুতবার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন।

একনজরে রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ানবাগী হুজুর

মুক্তিযুদ্ধে এই বীর আলেম যোদ্ধার ভূমিকা, সামরিক রেকর্ড ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সংক্ষেপে একনজরে দেখার জন্য নিচে একটি সারসংক্ষেপ সারণী প্রদান করা হলো:

বিষয়/ক্ষেত্র

তথ্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ

মূল নাম

মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা

পরবর্তী পরিচিতি

সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী হুজুর (প্রতিষ্ঠাতা, দেওয়ানবাগ শরীফ)

পূর্ব প্রস্তুতি (১৯৬৯)

সভাপতি, ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ (পশ্চিম ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের তারিখ

১১ই এপ্রিল ১৯৭১ (৭২ জন সহযোদ্ধা সহ মেডডা ক্যাম্পে যোগদান)

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ইউনিট

৩ নম্বর সেক্টর (অধিনায়ক: মেজর কে এম সফিউল্লাহ) এবং 'এস' ফোর্স

ধার্যকৃত পদবী

প্লাটুন কমান্ডার (৬০ জন বাছাইকৃত প্রাক-প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধার প্রধান)

ভারতীয় সামরিক রেকর্ড নম্বর

MF Volume-7, Page-11

বাংলাদেশ কল্যাণ ট্রাস্ট নম্বর

৩৪০৬৬

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ

১. শাহবাজপুর যুদ্ধ (২৬ এপ্রিল)

২. মাধবপুর যুদ্ধ (২৮ এপ্রিল)

৩. সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রোডে অ্যামবুশ (১১ মে)

৪. বাগসাইর গ্রাম আক্রমণ (১২ মে)

৫. চুনারুঘাট মহাসড়কে অ্যামবুশ (১৬ মে)

৬. মনতলা-হরষপুর যুদ্ধ (১৫ জুন)

অন্যান্য বিশেষ ভূমিকা

১. ১ নম্বর সেক্টরে ৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনে মেজর জিয়াউর রহমানকে সহায়তা।

২. সেনাপতি এম এ জি ওসমানীর প্রস্তাবিত নিয়মিত সামরিক ‘কমিশন’ পদ প্রত্যাখ্যান।

ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী

১৯ নভেম্বর ১৯৭১ (হেজামারা ক্যাম্প): "কুরবানির ঈদের আগেই দেশ স্বাধীন হবে এবং রেসকোর্সে নামাজ হবে।"

ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয় অর্জন; ২৬ জানুয়ারি ১৯৭২ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রথম ঈদের জামাতে ইমামতি।

বিতর্ক, ট্রোলিং এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের দাবি

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের দিকে মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা আধ্যাত্মিক চর্চার দিকে গভীর মনোযোগ দেন এবং সুফিবাদের প্রচারক হিসেবে নিজেকে নিবেদিত করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘দেওয়ানবাগী হুজুর’ নামে পরিচিত হন এবং ঢাকার মতিঝিলে ‘দেওয়ানবাগ শরীফ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ধর্মীয় বিতর্ক বনাম রণাঙ্গনের সত্য: পরবর্তী জীবনে তাঁর কিছু সুফি তরিকাগত বক্তব্য, আধ্যাত্মিক দাবি এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে দেশের মূলধারার বেশ কিছু কওমি ও আহলে হাদিস আলেমদের সাথে তাঁর চরম মতাদর্শিক বিরোধ তৈরি হয়। বর্তমান যুগে ইন্টারনেট ও ট্রোল সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর এই বীরত্বগাথার চেয়ে তাঁর বিতর্কিত বয়ানগুলোই বেশি প্রাধান্য পায়।

ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের গুরুত্ব: কিন্তু একজন প্রকৃত ইতিহাসবিদের দায়িত্ব হলো ব্যক্তির ধর্মীয় বিতর্ক এবং তাঁর জাতীয় অবদানকে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা

দেওয়ানবাগী হুজুরের সূফি তরিকা বা আধ্যাত্মিক দাবি নিয়ে কারো তীব্র বিরোধিতা বা দ্বিমত থাকতেই পারে সেটি ধর্মতত্ত্বের আলোচনার বিষয়। কিন্তু ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যখন অনেক বড় বড় হুজুর দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করছিলেন, তখন এই মানুষটি কোনো জাগতিক পদের আশা না করে নিজের বুক পেতে দিয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।

ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা ট্রোল সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার রক্তের ইতিহাসকে অস্বীকার করা জাতীয় অকৃতজ্ঞতার শামিল।

দেশপ্রেমের চিরন্তন শিক্ষা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল বহু মত, বহু পথ এবং ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শের মানুষের এক মহামিলন ক্ষেত্র। আলেম যোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা (দেওয়ানবাগী হুজুর)-এর রণাঙ্গনের জীবন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায় যে:

প্রকৃত ধর্ম চর্চা মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়: ধর্ম কখনো কাপুরুষতা শেখায় না। যখন শোষক বাহিনী অমানবিক নির্যাতন চালায়, তখন জপমালা রেখে কাঁধে স্টেনগান তুলে নেওয়াও ধর্মীয় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

নিঃস্বার্থ ত্যাগের প্রতীক: যিনি অফিসার পদের লোভ লালসা ত্যাগ করে শুধু মাতৃভূমির টানে যুদ্ধ করতে পারেন, তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

ইতিহাসের সততা: ইতিহাস কাউকে ভুলিয়ে দেয় না। দেওয়ানবাগী হুজুরের যুদ্ধকালীন ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালের লাল-সবুজের পতাকায় টুপি ও দাড়িওয়ালা খাঁটি দেশপ্রেমিক আলেমদের রক্তও সমপরিমাণে মিশে আছে।

স্বাধীনতার এত বছর পর, আমাদের উচিত একাত্তরের সেইসব অকুতোভয় আলেম যোদ্ধাদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যাঁরা ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে গিয়ে রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন:

“মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করাই একজন প্রকৃত মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।”

মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন কমান্ডার মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা আপনার একাত্তরের সেই বীরত্বময় সংগ্রামের প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশের অনন্ত শ্রদ্ধা ও লাল সালাম!

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.