>

>

কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম) - রণাঙ্গনে পা হারানো বীর মুক্তিযোদ্ধার 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড'

কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম) - রণাঙ্গনে পা হারানো বীর মুক্তিযোদ্ধার 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড'

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ এবং উত্তর-স্বাধীনতা সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, বহুঘটনাবহুল এবং ট্র্যাজিক চরিত্রের অন্যতম কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম)। মুখোমুখি যুদ্ধে অত্যন্ত সুরক্ষিত শত্রুঘাঁটি ধ্বংস করতে গিয়ে নিজের বাম পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণকারী বীরউত্তম কর্নেল আবু তাহের কেবল সামরিক পোশাকের পরিধিতে নিজেকে বন্দি রাখেননি। পঙ্গুত্ব সত্ত্বেও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথাগত সামরিক ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও সৈনিকদের সমন্বয়ে একটি 'উৎপাদনমুখী গণবাহিনী' ও সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্নে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনীতি ও এর সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর রাজনৈতিক দর্শনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

TruthBangla

কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম) - রণাঙ্গনে পা হারানো বীর মুক্তিযোদ্ধার 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড'

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ এবং উত্তর-স্বাধীনতা সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, বহুঘটনাবহুল এবং ট্র্যাজিক চরিত্রের অন্যতম কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের দূরদর্শী ও দুঃসাহসী কমান্ডার হিসেবে রণাঙ্গনে নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি যে রণকৌশল প্রদর্শন করেছিলেন, তা কেবল সামরিক ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে এক অনন্য মাইলফলক। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জীবন বাজি রেখে তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

মুখোমুখি যুদ্ধে অত্যন্ত সুরক্ষিত শত্রুঘাঁটি ধ্বংস করতে গিয়ে নিজের বাম পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণকারী বীরউত্তম কর্নেল আবু তাহের কেবল সামরিক পোশাকের পরিধিতে নিজেকে বন্দি রাখেননি। পঙ্গুত্ব সত্ত্বেও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথাগত সামরিক ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও সৈনিকদের সমন্বয়ে একটি 'উৎপাদনমুখী গণবাহিনী' ও সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্নে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনীতি ও এর সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর রাজনৈতিক দর্শনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তার প্রেক্ষিতে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের 'সিপাহী-জনতা বিপ্লবে' তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান, গোপন ট্রাইব্যুনালের প্রহসন এবং অবশেষে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ফাঁসির মঞ্চে তার জীবনের যবনিকা ঘটে। দীর্ঘ তিন দশক পর ২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে যা 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে চিহ্নিত হয়।

উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমান্ডো জীবন

আবু তাহেরের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৪ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের অসমের করিমগঞ্জ জেলার বদরপুরে। তার পৈতৃক নিবাস ছিল নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বয়রা গ্রামে। বাবা বাহার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের একজন স্টেশন মাস্টার এবং মা আশরাফুন্নেসা ছিলেন একজন গৃহিনী। এক রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন পরিবারে বেড়ে ওঠা তাহেরের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে আসাম ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।

কৈশোর পার হতেই দেশের তৎকালীন তরুণদের মতো তার মধ্যেও সাহসিকতা ও জাতীয়তাবোধের উর্বর স্ফুরণ ঘটে। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে চাটগাঁর ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তবে সাধারণ সিভিল সার্ভিসের আরামদায়ক জীবনের চেয়ে তার মানসিক ঝোঁক ছিল রোমাঞ্চকর সামরিক জীবনের দিকে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান ও 'এসএসজি' প্রাইড

১৯৬১ সালে আবু তাহের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বালুচ রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা, ক্ষিপ্রতা, বিচক্ষণতা ও মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। তাকে দ্রুতই অত্যন্ত কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিজাত 'স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ' (SSG) বা কমান্ডো বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কর্নেল তাহের ছিলেন সেই বিরল বাঙালি অফিসারদের একজন, যিনি বিশ্বের শীর্ষ সামরিক মহলে সর্বোচ্চ মানের ব্যাটল ট্রেনিং লাভ করেছিলেন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে তিনি প্যারাশুট রেজিমেন্টের অধীনে বিশেষ প্যারা-কমান্ডো প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার বিখ্যাত 'ফোর্ট ব্র্যাগ' (Fort Bragg)-এ স্পেশাল ফোর্সেস অফিসার্স কোর্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ইউএস এয়ারবোর্ন স্কুল' থেকে উচ্চতর এয়ারবোর্ন ও গেরিলা যুদ্ধের বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করেন।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি শিয়ালকোট ও কাশ্মীর সেক্টরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো টিমের নেতৃত্ব দেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হন। সাহসিকতার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে 'সিতারা-ই-হরব' পদকে ভূষিত করে। ১৯৬৯ সালে তিনি পেশোয়ারের কোহাটে 'আইএসএসবি' (Inter Services Selection Board)-এর সিনিয়র টেস্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের খারি সামরিক ঘাঁটিতে স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

১৯৭১: পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দুঃসাহসিক পলায়ন ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক জান্তা যখন 'অপারেশন সার্চলাইট' এর নামে ঢাকা শহরসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোত্তম গণহত্যা শুরু করে, তখন কর্নেল আবু তাহের অবস্থান করছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশের অভ্যন্তরে নিজের স্বজাতি, ছাত্র, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ ও সহকর্মীদের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই পৈশাচিক নৃশংসতার সংবাদ পৌঁছামাত্রই তার সামরিক বিবেক ও দেশপ্রেম তীব্রভাবে আলোড়িত হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিলাসবহুল ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ পদোন্নতির সুযোগ এবং নিশ্চিত নিরাপদ জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যেভাবেই হোক পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিসংগ্রামে যোগ দিতে হবে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি অফিসারদের ওপর অত্যন্ত কড়া সামরিক গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হতো। যেকোনো মুহূর্তে ধরা পড়লে তাদের পরিণতি হতো কোর্ট মার্শাল কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড।

অ্যাবোটাবাদ থেকে খাইবার পাসের সীমানা অতিক্রম

এই চরম মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক ঝুঁকি নিয়েই ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে কর্নেল তাহের এক দুঃসাহসিক ছক তৈরি করেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের খারি সামরিক ঘাঁটি থেকে পালিয়ে পেশোয়ারে পৌঁছান। সেখানে তার সাথে যুক্ত হন তৎকালীন মেজর জিয়াউদ্দিন, ক্যাপ্টেন পটোয়ারী এবং তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (তৎকালীন সিভিল সার্ভিস অফিসার)। তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য ও মরু পথ অতিক্রম করে, গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অ্যাবোটাবাদ হয়ে শিয়ালকোট সীমান্তে পৌঁছান। গভীর রাতে জীবনবাজি রেখে পাহাড়ি নদী সাঁতরে ও দুর্গম সীমান্ত এলাকা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে তারা ভারতে প্রবেশ করেন।

সাময়িক সামরিক বন্দিদশা এবং মৃত্যুঝুঁকি পেরিয়ে ভারতে পৌঁছেই তারা সরাসরি যোগাযোগ করেন কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অস্থায়ী কার্যালয় এবং সেনাপ্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সাথে। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য একজন আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষিত বাঙালি কমান্ডো অফিসারের এই আগমন মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল।

১১ নম্বর সেক্টর গঠন ও আবু তাহেরের 'জনযুদ্ধের' সামরিক উদ্ভাবন

মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের ভৌগোলিক সীমানা ছিল অত্যন্ত কৌশলগত ও বিস্তৃত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা (জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ), টাঙ্গাইল জেলা এবং রংপুরের চিলমারী ও রৌমারী এলাকা নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। রৌমারী ছিল মুক্তিযুদ্ধের এমন একটি ব্যতিক্রমী অঞ্চল, যা ৯ মাসের যুদ্ধে কখনো পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে যায়নি এবং সার্বক্ষণিকভাবে মুক্তাঞ্চল হিসেবে বজায় ছিল।

প্রাথমিকভাবে ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি এবং সাব-সেক্টর গঠনে নেতৃত্ব দেন। জুলাই মাসের শেষের দিকে নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড 'জেড-ফোর্স' গঠিত হলে মেজর জিয়াউর রহমান এর অধিনায়ক হিসেবে মেহেরপুর সীমান্ত এলাকায় স্থানান্তরিত হন। এরপর ৪ আগস্ট পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (SSG)-এর অভিজ্ঞ কমান্ডো কর্মকর্তা মেজর (পরবর্তীকালে কর্নেল) আবু তাহের ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১১ নম্বর সেক্টরকে প্রশাসনিক ও সামরিক কার্যকারিতার জন্য ৮টি প্রধান সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল:

মানকারচর সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার এম হামিদুল্লাহ খান।
মহেন্দ্রগঞ্জ সাব-সেক্টর: প্রথমে মেজর আবু তাহের এবং পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট মান্নান।
পুরাখাসিয়া সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট হাশেম।
ডালু সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এম হামিদুল্লাহ খান ও পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট তাহের।
শিববাড়ী সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান।
বাঘমারা সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন রব্বানী।
মহেশখোলা সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আলিমুল্লাহ।
রংরা সাব-সেক্টর: দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউর।

কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্ব ও সামরিক অবস্থার পরিবর্তন

কর্নেল আবু তাহের যখন ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নেন, তখন এই অঞ্চলের সামরিক অবকাঠামো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ছিল। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের তীব্র অভাব এবং সীমান্তজুড়ে শক্তিশালী পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল প্রতিরক্ষামূলক।

আমেরিকার ফোর্ট ব্র্যাগে কমান্ডো ও গেরিলা যুদ্ধের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের প্রচলিত সামরিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও অন্যান্য আর্টিলারি ইউনিটের শক্তিশালী ফায়ারপাওয়ারের বিপরীতে কেবল প্রথাগত ব্যাটালিয়ন যুদ্ধ চালনা ক্ষতিকর হবে অনুধাবন করে তিনি 'পিপলস ওয়ার' বা 'জনযুদ্ধ'-এর সামরিক মডেল গ্রহণ করেন।

'পিপলস আর্মি' বা গণবাহিনীর উদ্ভাবন

কর্নেল তাহের ১১ নম্বর সেক্টরে প্রয়োগ করেন তার সুচিন্তিত 'গণযুদ্ধ' বা 'পিপলস ওয়ার' থিওরি। তাঁর উদ্ভাবিত কৌশলগত রূপরেখা ১১ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধধারাকে মূলধারার গেরিলা যুদ্ধে রূপান্তরিত করে।

দ্রুত গেরিলা রূপান্তর ও গণপ্রশিক্ষণ: নিয়মিত সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ যুবকদের মাত্র ২ থেকে ৩ সপ্তাহের নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তাদের রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলা (Ambush), ল্যান্ডমাইন স্থাপন, সেতু ধ্বংস এবং রেকি করার কাজে পারদর্শী করে তোলা হয়।

সীমান্ত হেডকোয়ার্টার জিরো পয়েন্টে স্থানান্তর: অধিকাংশ সেক্টর কমান্ডার ভারতের নিরাপদ অভ্যন্তরে সদর দপ্তর স্থাপন করলেও কর্নেল তাহের ১১ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ থেকে সরিয়ে একদম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো পয়েন্টে নিয়ে আসেন। এতে কমান্ডার ও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের দূরত্ব কমে যায় এবং সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরে মুক্তাঞ্চল তৈরি: ভারত সীমান্তে অবস্থান নিয়ে কেবল 'হিট অ্যান্ড রান' (আঘাত করে পালিয়ে যাওয়া) কৌশলের বদলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে স্থায়ী মুক্তাঞ্চল বা 'লিবারেটেড এরিয়া' গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেরপুর ও জামালপুরের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল মুক্ত করে সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ: যুদ্ধে গ্রামের কৃষক ও সাধারণ মানুষকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, রসদ সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান এবং ছদ্মবেশ ধারণের কাজে সরাসরি যুক্ত করা হয়, যা গণবাহিনীর রূপ ধারণ করে।

কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে কৌশলগত ঐক্য

টাঙ্গাইলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ও স্বতন্ত্র 'কাদেরিয়া বাহিনী'-র সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা ছিল তাহেরের সামরিক মেধার অন্যতম নিদর্শন। প্রায় ১৬ থেকে ২০ হাজার গেরিলা সমন্বয়ে গঠিত কাদেরিয়া বাহিনীকে ১১ নম্বর সেক্টর থেকে নিয়মিত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও কৌশলগত সহায়তা পাঠানো হতো।

কাদেরিয়া বাহিনী ও ১১ নম্বর সেক্টরের যৌথ ও সমন্বিত আক্রমণের ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, জামালপুর-ঢাকা রেলপথ এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর নৌপথ পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। এর ফলে ময়মনসিংহ ও জামালপুরে অবস্থানরত পাকিস্তানি ৯৩তম ব্রিগেড ঢাকায় মূল বাহিনীর সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

তার এই বিপ্লবী ও আক্রমণাত্মক মনোভাবের কারণে মাত্র দুই মাসের মধ্যে ১১ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন বিশাল এলাকা বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও জামালপুরের গ্রামাঞ্চল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হটিয়ে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা সম্ভব হয়।

ঐতিহাসিক কমলপুর যুদ্ধ: ঢাকার প্রবেশদ্বারে রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত কমলপুর সীমান্ত ফাঁড়ি (Kamalpur BOP) দখল ছিল এক অত্যন্ত জটিল ও সামরিক কৌশলগত সাফল্য। এটিকে "ঢাকার উত্তর প্রবেশদ্বার" বিবেচনা করা হতো, কারণ কমলপুর থেকে বকশীগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহ হয়ে সরাসরি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানোর প্রধান মহাসড়কটি বিস্তৃত ছিল। পাকিস্তান সামরিক কমান্ড ঢাকা রক্ষায় কমলপুরকে একটি অলঙ্ঘনীয় সামরিক দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলে।

কমলপুর বিওপি-তে ঘাঁটি গেড়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের একটি সুপ্রশিক্ষিত কোম্পানি। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিপুল সংখ্যক ইপিসিএএফ (র্যাঞ্জার্স), আর্মড পুলিশ ও স্থানীয় রাজাকার সদস্য। পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল প্রায় এক ডজন আরসিসি পিলারের ওপর নির্মিত ভূগর্ভস্থ কংক্রিট বাঙ্কার, যা ৮১ মিমি মর্টার বা ভারী আর্টিলারির সরাসরি আঘাত সহ্য করতে সক্ষম ছিল। বাঙ্কারগুলোর মধ্যে ছিল পরস্পরযুক্ত যোগাযোগ পরিখা (trench) এবং আন্ডারগ্রাউন্ড সুড়ঙ্গ। ঘাঁটিটিকে ঘিরে কয়েক স্তরে প্রাণঘাতী অ্যান্টি-পার্সোনেল ও অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন পোঁতা হয়েছিল, আর চারপাশে ছিল কাঁটাতারের ফাঁদ ও মিডিয়াম মেশিনগান (MMG) নেস্ট।

পূর্ববর্তী রক্তক্ষয়ী আক্রমণ ও জেড ফোর্সের অভিজ্ঞতা: ১৯৭১ সালের মে থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী অন্তত চার থেকে পাঁচবার কমলপুর দখলের চেষ্টা চালায়। এর মধ্যে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটেছিল ৩১ জুলাই রাতে। তৎকালীন ‘জেড ফোর্স’-এর অধীনে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর মুক্তিযোদ্ধারা মেজর জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনায় এবং ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজের সাহসিকতায় কমলপুরে ভয়াবহ আক্রমণ চালান। সেই রাতে প্রবল গোলাগুলির মুখে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজসহ ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং বহু জোয়ান আহত হন। শক্ত প্রতিরক্ষা এবং মাইনফিল্ডের কারণে সেবার মুক্তিবাহিনীকে পিছু হটতে হয়।

সেক্টর কমান্ডার আবু তাহেরের কৌশল: আগস্ট মাসে ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরবর্তীতে কর্নেল) আবু তাহের। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রথাগত দূরপাল্লার তোপ দাগা বা সরাসরি আত্মঘাতী আক্রমণ চালিয়ে এই বাঙ্কার ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তিনি "অবরোধ যুদ্ধ" (Siege Warfare) এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের আশ্রয় নেন।

নভেম্বরের শুরুতেই বকশীগঞ্জ থেকে কমলপুর ঘাঁটির রসদ সরবরাহ লাইন কেটে দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ঘাঁটির বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের তার বিচ্ছিন্ন করেন এবং চতুর্দিক থেকে সুনির্দিষ্ট পরিখা খুঁড়ে শত্রুর একদম কাছে গিয়ে অবস্থান নেন। ফলে পাক সেনারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং খাবার, পানীয় জল ও গোলাবারুদের তীব্র সংকটে ভোগে।

১৩-১৪ নভেম্বরের কালরাত ও তাহেরের পা হারানো

১৩ নভেম্বর গভীর রাতে ভারতীয় ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেড (ব্রিগেডিয়ার হারদেব সিং ক্লেরের নেতৃত্বে) এবং ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কমলপুর অবরুদ্ধকরণের চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিরল এক উদাহরণ সৃষ্টি করে স্বয়ং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহের স্টেনগান হাতে প্রথম সারিতে (Frontline) নেমে শত্রুর বাঙ্কারের মাত্র কয়েক গজ দূরে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন।

১৪ নভেম্বর ভোররাতের দিকে, যখন যৌথ বাহিনী শত্রু ঘাঁটির শেষ প্রতিরক্ষাবলয় ভেঙে ভেতরে ঢুকছিল, তখন শত্রু ঘাঁটি থেকে ছোঁড়া একটি সিগন্যাল ফ্লেয়ারের আলোয় তাহেরের অবস্থান চিহ্নিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই কাছে আছড়ে পড়ে একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন বা মর্টার শেল। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কর্নেল তাহের মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তার বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলতে থাকে। অমানুষিক রক্তক্ষরণের মধ্যেও তিনি গর্জে উঠে সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলেন,

"আমার জন্য যুদ্ধ থামাবে না! সামনে বাড়ো, কমলপুর আমাদের চাই!"

সহযোদ্ধারা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ভারতের আসামের তুরা ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে যান এবং পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পুনে সামরিক হাসপাতালে এয়ারলিফ্ট করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার জীবন বাঁচাতে ক্ষতবশত বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে বাদ (Amputate) দিতে বাধ্য হন।

৪ঠা ডিসেম্বর-ঐতিহাসিক যৌথ আত্মসমর্পণ: কর্নেল তাহের আহত হলেও তার অনুসৃত অবরোধ কৌশল পণ্ড হয়নি। ২১ নভেম্বর থেকে কমলপুর ঘাঁটিকে ভারতীয় বিমানবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আর্টিলারি দিয়ে লাগাতার আক্রমণ চালিয়ে আরো কোণঠাসা করা হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হলে ৪ঠা ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেড ও ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কমলপুরকে পূর্ণাঙ্গভাবে চেপে ধরেন।

ব্রিগেডিয়ার এইচ. এস. ক্লেরের নির্দেশে স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে পরপর কয়েকবার আত্মসমর্পণ বার্তা পাঠানো হলে, পাকিস্তান বাহিনীর ঘাঁটি অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আহসান মালিক বুঝতে পারেন তাদের আর বাঁচার কোনো পথ নেই। অবশেষে ৪ঠা ডিসেম্বর বিকেলে ক্যাপ্টেন আহসান মালিক তার অধীনে থাকা ১৪০ জনের বেশি সুপ্রশিক্ষিত পাক সেনা ও সদস্যসহ ভারতীয় ও যৌথ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এটিই ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রথম কোনো শক্তিশালী সুসংগঠিত ঘাঁটির পতন ও আনুষ্ঠানিক যৌথ আত্মসমর্পণ, যা পরবর্তীতে জামালপুর ও ময়মনসিংহ মুক্ত করে বীরদর্পণে ঢাকার দিকে জয়ের অগ্রযাত্রাকে সুগম করে তোলে।

রণাঙ্গনে অঙ্গহানি ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন

মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার অন্যতম প্রতীকে পরিণত হওয়া কর্নেল আবু তাহের ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ থেকে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেন। তিনি ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও শেরপুর অঞ্চল) সেক্টর কমান্ডার। মুক্তিসংগ্রামে অবদান রাখা শত শত সামরিক অধিনায়কদের মধ্যে কর্নেল আবু তাহের ছিলেন একমাত্র সেক্টর কমান্ডার, যিনি রণাঙ্গনে সরাসরি শত্রু অস্ত্র বা মাইনের মুখোমুখি হয়ে নিজ দেহের অঙ্গ বিসর্জন দিয়েছিলেন। ১-১০ নম্বর সেক্টরের কোনো কমান্ডারের যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি এভাবে মারাত্মক শারীরিক পঙ্গুত্ব বরণ করার নজির নেই।

১৯৭১ সালের ১৪ই নভেম্বর জামালপুরের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি 'কমলপুর বিওপি' মুক্ত করার অভিযানে তিনি সরাসরি সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ চলাকালে শত্রুঘাঁটি দখলের চূড়ান্ত মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনীর ছোঁড়া গোলার বিকট বিস্ফোরণে তার বাঁ পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে হাঁটুর ওপর থেকে কেটে বাদ দিতে হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, বিজয়ের সেই আনন্দমুখর মাহেন্দ্রক্ষণে দেশের অন্যতম প্রধান নায়ক কর্নেল তাহের শুয়ে ছিলেন ভারতের পুনের সামরিক হাসপাতালের একটি হিমশীতল শয্যায়। গুয়াহাটি ফিল্ড হাসপাতাল থেকে উন্নত অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এক পা বিচ্ছিন্ন হওয়া অবস্থায় অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা ও কৃত্রিম পা লাগানোর প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি বীরের বেশে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশ সরকার তাকে তার এই অতুলনীয় বীরত্ব, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে আসার দুঃসাহস এবং অসামান্য সামরিক দূরদর্শিতার স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব 'বীর উত্তম' উপাধিতে ভূষিত করে।

যুদ্ধোত্তর সামরিক নীতি, রাজনৈতিক মতবিরোধ ও 'উৎপাদনমুখী সেনাবাহিনী'র স্বপ্ন

স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে ১৯৭২ সালের এপ্রিলে পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম নীতি-নির্ধারক পদ 'অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল' (Adjutant General) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন কর্নেল তাহের। পরবর্তীতে তিনি সেনাবাহিনীর ৪৪তম ব্রিগেডের অধিনায়ক এবং কুমিল্লা সেনানিবাসের আঞ্চলিক কমান্ডারের গুরুদায়িত্ব লাভ করেন। কুমিল্লা সেনানিবাসে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজ প্রস্তাবিত দর্শনের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন হিসেবে সেনাসদস্যদের সমন্বয়ে কৃষি খামার স্থাপন ও স্বনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন।

তবে স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী কেমন হবে এই দর্শনের প্রশ্নে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারক ও চিরাচরিত সামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে কর্নেল তাহেরের তীব্র আদর্শগত ও নীতিগত সংঘাত শুরু হয়। মূলত সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং গণবাহিনীর (People's Army) আদলে তিনি শ্রেণীহীন ও জনমুখী একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধাঁচের ব্যারাকে বন্দি, বিপুল অর্থ অপচয়কারী সনাতন সামরিক কাঠামো মেনে নিতে পারেননি এই গণযোদ্ধা। তিনি সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে এক যুগান্তকারী ও বিপ্লবাত্মক ধারণা পেশ করেন, যাকে বলা হতো 'উৎপাদনমুখী সেনাবাহিনী' (Productive Army)। তাহেরের মূল প্রস্তাবনাগুলো ছিল:

১. স্বাধীন বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র ও সদ্য স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনী কেবল ব্যারাকে বসে কুচকাওয়াজ করবে না এবং অপ্রতুল জাতীয় বাজেটের ওপর অপপ্রযোজ্য বোঝা হবে না।
২. সেনাসদস্যরা সরাসরি দেশের কৃষি, শিল্প, রাস্তাঘাট তৈরি, সেতু নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে, যাতে বাহিনী নিজেদের খরচের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারে।
৩. সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অফিসার ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্যমান ঔপনিবেশিক আমলের মানসিক বৈষম্য, 'আর্দালি বা খাসদস্য প্রথা' ও কৃত্রিম দূরত্ব চিরতরে দূর করে সৈনিক ও অফিসারের মধ্যে সমমর্যাদা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. একটি ছোট পেশাদার স্থায়ী সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সর্বসাধারণের সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি 'গণবাহিনী' রূপরেখা তৈরি করতে হবে, যাতে যেকোনো জাতীয় সংকটে পুরো দেশ রক্ষাব্যূহ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কিন্তু তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায় এবং অন্যান্য প্রথাগত সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার এই বিপ্লবী 'উৎপাদনমুখী সামরিক মডেল' গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তারা ঔপনিবেশিক সামরিক প্রথা ও প্রথাগত ব্যারাকে বন্দি কাঠামো ধরে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন। একই সাথে সামরিক বাহিনীর সমান্তরালে সদ্য গঠিত 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী'র রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ নানাবিধ বন্দোবস্তের সাথে নীতিগত অমিল প্রকাশ পাওয়ায় গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন তাহের।

ফলস্বরূপ, তৎকালীন সরকারের সামরিক নীতি ও দেশের রাজনৈতিক পরিচালনার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও নীতিগত অনাস্থা প্রকাশ করে ১৯৭২ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর কর্নেল আবু তাহের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উজ্জ্বল চাকরি ও কমান্ডারের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। সামরিক বাহিনী ত্যাগের পর তিনি বাংলাদেশ ড্রেজিং কর্পোরেশনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'র সাথে যুক্ত হয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন বিপ্লবী ধারার সূচনা করেন।

জাসদ গঠন, 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' ও ১৯৭৫ এর উত্তাল পটভূমি

১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনীর প্রথাগত কাঠামোর বদলে একটি ‘উৎপাদনশীল গণসেনাবাহিনী’ গঠনের আদর্শিক দ্বন্দ্বে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম)। এরপর তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্বে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুব ও ছাত্র সংগঠন থেকে বেরিয়ে আসা একদল বিপ্লবী তরুণ সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ এবং কাজী আরেফ আহমেদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ)-এ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। জাসদের রাজনৈতিক পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হয়ে তাহের দলের রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

তাহেরের দৃষ্টিভঙ্গিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অধরা স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা। তিনি মনে করতেন, কেবল সরকার বা শাসক পরিবর্তন নয়, বরং আমূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য একটি 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র'মুখী বিপ্লব প্রয়োজন। এই আদর্শ বাস্তবায়নে জাসদের দুটি গোপন শাখা গঠিত হয়: গণমানুষের সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য ‘গণবাহিনী’ এবং সশস্ত্র বাহিনীর নিম্নপদের সাধারণ জোয়ান ও সুবেদারদের সংগঠিত করার জন্য ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ (Revolutionary Soldiers' Organization)। কর্নেল তাহের ছিলেন এই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক তাত্ত্বিক। তিনি সাধারণ সিপাহীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, তারা ঔপনিবেশিক আমলের শোষক সামরিক কাঠামোর শৃঙ্খলে বন্দি।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি চরম বিশৃঙ্খলার রূপ নেয়। ১৫ই আগস্ট ভোরে একদল বিপথগামী সেনাকর্মকর্তার হাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। এর মাধ্যমে খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেও সেনানিবাসে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। ১৫ই আগস্টের ক্যু-র পরিকল্পনাকারী জুনিয়র অফিসারদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে ৩রা নভেম্বর বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে এক পাল্টা ক্যু (Counter-coup) সংঘটিত হয়। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ধানমন্ডির বাসভবনে গৃহবন্দি করেন এবং খালেদ মোশাররফ নিজেকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে খালেদ মোশাররফের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জনের কারণে সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই চরম অনিশ্চয়তাকে নিজেদের বিপ্লবী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উপযুক্ত সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কর্নেল তাহেরের গোপন সংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'

৭ই নভেম্বরের 'সিপাহী-জনতা গণঅভ্যুত্থান' ও ক্ষমতার নাটকীয় পরিবর্তন

১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর গভীর রাত থেকে ৭ই নভেম্বরের প্রথম প্রহরে কর্নেল আবু তাহের এবং জাসদের 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'-র আহ্বানে ঢাকা সেনানিবাসে সূচিত হয় ঐতিহাসিক 'সিপাহী-জনতা গণঅভ্যুত্থান'। রাত ১২টার পর থেকেই সৈনিকরা ব্যারাকে ব্যারাকে সংগঠিত হয়ে সামরিক অফিসারদের নির্দেশ অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে। ফাঁকা গুলি ছুড়ে এবং ট্রাকে করে ঢাকা শহর ও সেনানিবাসজুড়ে বিপ্লবী স্লোগান ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাহেরের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় বিপ্লবী সিপাহীরা ধানমন্ডির বন্দিদশা থেকে তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে ২য় ফিল্ড আর্টিলারি সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। জিয়াকে মুক্ত করে উৎফুল্ল সিপাহীরা স্লোগান দেয়: "সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, সুবেদারের রক্ত চাই", "জিয়া-তাহের ভাই ভাই", "সিপাহী-জনতা জিন্দাবাদ"। অন্যদিকে ৩রা নভেম্বরের ক্যু-র নায়ক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার শেরেবাংলা নগরে অবস্থানকালে ক্ষুব্ধ সৈনিকদের হাতে নিহত হন।

এই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উত্থাপিত ১২-দফা দাবি (12-point Demand)। কর্নেল তাহের রচিত এই দাবিনামার মূল দিকগুলো ছিল:

১. রাজনৈতিক বন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি প্রদান ও বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা।
২. সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মকর্তা ও সাধারণ সিপাহীদের মধ্যকার ঔপনিবেশিক যুগের বৈষম্য ও প্রথা বিলোপ করা।
৩. সামরিক আইন বাতিল করে কৃষক, শ্রমিক ও সিপাহীদের প্রতিনিধিত্বে একটি বিপ্লবী সরকার গঠন করা।
৪. সাধারণ সিপাহীদের অধিকার রক্ষায় 'সৈনিক সমিতি' গঠন এবং সেনাবাহিনীকে একটি উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তর করা।

৭ই নভেম্বর সকালে সেনাসদর দপ্তরে মুক্ত জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে কর্নেল তাহের অভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক রূপরেখা ও ১২-দফা দাবি বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তবে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পরই জিয়াউর রহমান বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামরিক শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সেনাবাহিনীর অফিসারদের চাপ, জাসদের বামপন্থী বিপ্লবের প্রতি সাধারণ অফিসারদের আতঙ্ক এবং চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় জিয়াউর রহমান অতি দ্রুত নিজের অবস্থান সুসংহত করতে শুরু করেন।

জিয়াউর রহমান তাহেরের বিপ্লবী ১২-দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং সেনানিবাসে সামরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দোহাই দিয়ে জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ওপর কঠোর প্রশাসনিক দমনপীড়ন শুরু করেন। অভ্যুত্থানের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতার শীর্ষস্থানে আরোহণ করেন। ফলস্বরূপ, ৭ই নভেম্বরের যে অভ্যুত্থান জিয়া ও তাহেরকে সাময়িকভাবে একমঞ্চে এনেছিল, সামরিক ও রাজনৈতিক আদর্শের দ্বন্দ্বে তা দ্রুতই চরম শত্রুতায় রূপ নেয়।

গোপন ট্রাইব্যুনাল, প্রসিডিংস ও ঐতিহাসিক প্রহসন

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার অনুধাবন করে যে, সামরিক বাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝে এবং ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’য় কর্নেল আবু তাহেরের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেন, ব্যারাকের ভেতরে কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক আদর্শ ও জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ থাকলে বিদ্যমান সামরিক ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। এই আশঙ্কায় অভ্যুত্থানের মাত্র ১৭ দিনের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ২৪শে নভেম্বর গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের গৃহসুখ শান্তিনিকেতনের পারিবারিক বাসভবন থেকে কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও দ্রুত অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দূরবর্তী রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন ও এজলাস স্থাপন: ১৯৭৬ সালের জুন মাসে সামরিক সরকার ১৯৭৬ সালের বিশেষ সামরিক আইন অধ্যাদেশ (Special Martial Law Regulation) জারি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরেই ‘স্পেশাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল নম্বর ১’ গঠন করে। সামরিক বাহিনীর বিচারিক প্রক্রিয়ার ইতিহাসে কারাগারের অভ্যন্তরীণ প্রকোষ্ঠে এমন বিচারালয় বসানোর ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান করা হয় কর্নেল গোলাম মাকসুদকে। ট্রাইব্যুনালে আরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন সামরিক ও বেসামরিক ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

আসামিদের তালিকা ও অভিযুক্ত ব্যক্তিত্বগণ

ট্রাইব্যুনালে কর্নেল তাহেরকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৩ জন রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বকে অভিযুক্ত করা হয়। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন:

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর শীর্ষ নেতা সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, হাসানুল হক ইনু, শাহজাহান সিরাজ, মাহমুদুর রহমান মান্না এবং অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমান।

সামরিক কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা: ১ নম্বর সেক্টরের সাবেক কমান্ডার ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া মেজর জিয়াউদ্দিন, ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন, সুবেদার প্রধান জালালউদ্দিনসহ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার একাধিক সদস্য।

আইনি জালিয়াতি ও প্রহসনমূলক বিচার প্রক্রিয়া

ট্রাইব্যুনালের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় আইনি নীতি ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে:

রুদ্ধদ্বার বিচার: বিচারে কোনো স্বাধীন সাংবাদিক, মানবাধিকার পর্যবেক্ষক বা সাধারণ জনগণকে উপস্থিত হতে দেওয়া হয়নি।

আইনি সুরক্ষার অভাব: আসামিদের পছন্দের প্রতিরক্ষা আইনজীবী নিয়োগে বাধা দেওয়া হয় এবং পর্যাপ্ত সময় বা নথিপত্র সরবরাহ করা হয়নি।

ভূতাপেক্ষ আইনের প্রয়োগ (Retroactive Law): তৎকালীন বিদ্যমান সামরিক বা বেসামরিক আইনে বেসামরিক ব্যক্তিদের সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। এজন্য সরকার বিশেষ সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (retrospective effect) প্রদান করে তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পথ সুগম করে।

আপিলের সুযোগহীনতা: এই সামরিক ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বা সাংবিধানিক প্রতিকার প্রার্থনার কোনো অধিকার রাখা হয়নি।

অভিযোগের ধরণ ও রাষ্ট্রপক্ষের দাবি: রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তারা সশস্ত্র বাহিনীকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করেছেন, বৈধ সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন, গোপনে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ গঠন করে সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা বিনষ্ট করেছেন এবং দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সশস্ত্র গৃহযুদ্ধের ছক এঁকেছিলেন।

ডকে দাঁড়িয়ে কর্নেল তাহেরের জবানবন্দি

মুক্তিযুদ্ধে পা হারানো রণাঙ্গনের বীর বিক্রম কর্নেল তাহের কৃত্রিম পায়ে ভর দিয়ে কাঠের ডকে দাঁড়িয়ে দৃঢ়তার সাথে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিযোগকারীদের নৈতিকতা ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তার ঐতিহাসিক আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য পেশ করেন:

"আজ যে ট্রাইব্যুনাল আমার বিচার করছে, সেই ট্রাইব্যুনাল ও জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অস্তিত্বের পেছনের মূল কারিগর ছিলাম আমি। ৭ই নভেম্বর আমি তাকে সুনির্দিষ্ট মৃত্যুর হাত থেকে মুক্ত করেছিলাম। আজ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিচার করছে। ইতিহাস একদিন বিচার করবে কারা দেশপ্রেমিক আর কারা বিশ্বাসঘাতক!"

রায় ঘোষণা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: ১৯৭৬ সালের ১৭ই জুলাই ট্রাইব্যুনাল সংক্ষিপ্ত ও পূর্বনির্ধারিত রায় ঘোষণা করে। বিচারালয় কর্নেল তাহেরকে ফাঁসির আদেশ দেয় এবং সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রবসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সাজা প্রদান করে। রায় ঘোষণার মাত্র চার দিন পর, ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই ভোর ৪:৩০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্নেল আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।

হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়: ঘটনার দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০১১ সালের ২২শে মার্চ বাংলাদেশের হাইকোর্ট এক রায়ে ১৯৭৬ সালের ওই বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন ও পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে অসংবিধানিক, অবৈধ ও সামরিক ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে ঘোষণা করেন। আদালত স্পষ্ট মতামত দেন যে, কর্নেল তাহেরের বিচারটি ছিল একটি সাজানো প্রশাসনিক প্রহসন এবং এই ফাঁসি ছিল আইনের সুযোগ নিয়ে ঘটানো একটি ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড (cold-blooded murder)।

২১শে জুলাই ১৯৭৬: ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মহাবীর কর্নেল তাহের

ট্রাইব্যুনালের রায় পূর্বনির্ধারিত ছিল। ১৯৭৬ সালের ১৫ই জুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে 'বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল নম্বর-১' গঠন করে এই বিচারের প্রহসন শুরু হয়। মাত্র কয়েকদিনের প্রহসনের শুনানি শেষে সামরিক ট্রাইব্যুনাল কর্নেল আবু তাহেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে এবং বাকি আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। কোনো ধরনের সংবাদমাধ্যম বা বাইরের কাউকে এই বিচার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এই গোপন বিচারে তাহের তার ঐতিহাসিক দীর্ঘ জবানবন্দিতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং অবৈধ সামরিক আদালতের বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের টেবিলে মার্জনার আবেদন না পাঠানোর বিষয়ে কর্নেল আবু তাহের ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো ধরনের প্রাণভিক্ষার আবেদন তিনি করতে দেননি এবং নিজেও করেননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো অবৈধ সামরিক জান্তার কাছে কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণের ভিক্ষা চাইতে পারে না।

১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই, ভোররাত ৪টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে স্বাধীন বাংলাদেশের এই মহান বীরকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। তৎকালীন কারাগারের বিধি অনুযায়ী রায় ঘোষণার পর আপিল বা প্রস্তুতির যে ন্যূনতম সময় দেওয়ার কথা ছিল, তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই মাত্র তিনদিনের মাথায় তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফাঁসির ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগেও তাহেরের মধ্যে কোনো ভীতি বা অনুশোচনার বিন্দুমাত্র ছাপ ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, তিনি নিজ হাতে জল্লাদের পরাতে যাওয়া টুপিটি ঠিক করে নিয়েছিলেন, নিজের এক পায়ে ভর দিয়ে হেঁটে অত্যন্ত শান্তভাবে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন এবং উপস্থিত জেল কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে হেসে বলেছিলেন,

"ফাঁসি তো সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য, আমাকে নয়। আমার এই রক্ত বৃথা যাবে না।"

মৃত্যুর পূর্বে তিনি পরিবারকে লেখা শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন:

"মৃত্যুকে আমি কোনোদিন ভয় পাইনি। রণাঙ্গনে আমার এক পা দিয়েছি, এবার দিলাম আমার প্রাণ। এতে যদি আমার দেশের শোষিত মানুষের কোনো কল্যাণ হয়, তবে আমার এই রক্তদান সার্থক।"

ফাঁসি কার্যকরের পর তার মরদেহ কড়া নিরাপত্তায় নেত্রকোনার পূর্বধলার কাজীলা গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়। এই ঘটনার দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০১১ সালের ২২শে মার্চ বাংলাদেশের হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে ১৯৭৬ সালের ওই সামরিক ট্রাইব্যুনালের বিচারকে 'অবৈধ ও অসংবিধানিক' ঘোষণা করে। একই সাথে আদালত কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ডকে 'পরিকল্পিত বিচারবিভাগীয় হত্যা' হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে পূর্ণ দেশপ্রেমিক ও নির্দোষ হিসেবে পুন প্রতিষ্ঠিত করে।

এক নজরে কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম

এক নজরে কর্নেল আবু তাহেরের বর্ণাঢ্য জীবন, সামরিক অভিযান ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলকসমূহ নিচের সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:

সময়কাল / তারিখ

ঐতিহাসিক ঘটনা

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও কৌশলগত গুরুত্ব

১৪ নভেম্বর ১৯৩৮

জন্ম গ্রহণ

আসামের বদরপুরে জন্ম। পিতা বাহা উদ্দিন আহমেদ ও মাতা আশরাফুন্নেসা।

১৯৬১ – ১৯৬৫

সামরিক প্রশিক্ষণ ও কমিশন

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান, কমান্ডো (SSG) প্রশিক্ষণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ফোর্ট ব্র্যাগ' থেকে উচ্চতর প্যারা-কমান্ডো ডিগ্রি লাভ।

জুলাই ১৯৭১

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পলায়ণ

জীবনবাজি রেখে পেশোয়ার ও শিয়ালকোট সীমান্ত হয়ে ভারতে প্রবেশ এবং সরাসরি মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ।

আগস্ট – নভেম্বর ১৯৭১

১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার

'গণযুদ্ধ' (People's War) মডেল প্রয়োগ, টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে সমন্বয় এবং মুক্তাঞ্চলের ব্যাপ্তি বাড়ানো।

১৪ নভেম্বর ১৯৭১

কমলপুর যুদ্ধ ও পা হারানো

সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রু মাইনের আঘাতে বাম পা বিচ্ছিন্ন হওয়া; পরবর্তীতে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত।

এপ্রিল – সেপ্টেম্বর ১৯৭২

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পদত্যাগ

সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল ও ৪৪ ব্রিগেডের অধিনায়ক দায়িত্ব গ্রহণ; 'উৎপাদনমুখী সেনাবাহিনী' গড়ে তোলার নীতিগত প্রশ্নে মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ।

১৯৭২ – ১৯৭৫

জাসদ ও 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'

জাসদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাধারণ সেনাসদস্যদের অধিকার রক্ষায় গোপন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' গঠন।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫

সিপাহী-জনতা গণঅভ্যুত্থান

জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার এবং সৈন্যদের ১২-দফা দাবির ভিত্তিতে ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লবের নেতৃত্বদান।

২৪ নভেম্বর ১৯৭৫

গ্রেফতার ও গোপন বিচার

জিয়াউর রহমান সরকারের নির্দেশে গ্রেফতার; ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বেআইনি ট্রাইব্যুনাল গঠন।

২১ জুলাই ১৯৭৬

ফাঁসি ও শাহাদাত বরন

মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রহসনের রায়ে ফাঁসি কার্যকর।

২২ মার্চ ২০১১

হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়

হাইকোর্ট কর্তৃক ১৯৭৬ সালের বিচারকে বেআইনি ও 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে ঘোষণা এবং মর্যাদা পুনর্প্রতিষ্ঠা।

তিন দশক পর বিচারবিভাগীয় পুনর্গঠন: ২০১১ সালের হাইকোর্টের কালজয়ী রায়

কর্নেল আবু তাহেরকে ফাঁসি দেওয়ার পর দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই বিতর্ককে একটি ধামাচাপা দেওয়া অধ্যায় হিসেবে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের সত্যকে কখনোই চিরতরে মুছে ফেলা যায় না।

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে অপপ্রচারের শিকার হওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি লড়াইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কর্নেল তাহেরের স্ত্রী ইনামুন্নাহার রশীদ তাহের (লুৎফা তাহের), ভাই অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, এবং ওই বিচারে দণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই সামরিক কর্মকর্তা ইউসুফ হাসান ও সাখাওয়াত হোসেনের উদ্যোগে ২০১০ সালের আগস্টে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (রিট নং ৬৫৮২/২০১০) দায়ের করা হয়। পিটিশনে ১৯৭৬ সালের সামরিক ট্রাইব্যুনাল ও সামরিক আইন অধ্যাদেশ ১৬-কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণার আবেদন জানানো হয়।

দীর্ঘ শুনানি ও তৎকালীন আইনি ও রাজনৈতিক নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর, ২০১১ সালের ২২শে মার্চ বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী এবং বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক কালজয়ী রায় প্রদান করেন। পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশে আদালত উল্লেখ করেন:

বেআইনি ও প্রহসনের বিচার: ১৯৭৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গঠিত গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালটি ছিল সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, স্বৈরাচারী এবং আইনি কাঠামোর বাইরে গঠিত এক পরিকল্পিত প্রহসন।

পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড: কর্নেল আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কোনো আইনি বা বিচারিক রায় ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন সামরিক জান্তার আদেশে পরিচালিত এক "পরিকল্পিত ঠান্ডা মাথার প্রশাসনিক হত্যা" (Cold-blooded Preplanned Murder)।

প্রধান কারিগর চিহ্নিতকরণ: রায়ে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানকে (মরণোত্তর) এই অন্যায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডের মূল রূপকার ও নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

মর্যাদা পুনর্বহাল ও শহীদ ঘোষণা: আদালত কর্নেল তাহেরকে একজন 'শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা' হিসেবে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার নির্দেশ দেন এবং তাঁর বীরত্ব ও মহান দেশপ্রেমকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করেন।

ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্যদের অব্যাহতি: ঐ সামরিক ট্রাইব্যুনালে কর্নেল তাহেরের সঙ্গে বেআইনিভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য সকল সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সাজা বাতিল করে তাঁদের ওপর থেকে সকল আইনি কলঙ্ক মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক শাসনের অধীনে ঘটে যাওয়া এক বড় বিচারিক অন্যায়ের অপনোদন ঘটে। হাইকোর্টের রায়টি কেবল কর্নেল তাহেরের সম্মান ও সুনামই ফিরিয়ে দেয়নি, বরং সংবিধান বহির্ভূতভাবে বিচারালয় গঠন ও আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের অপচেষ্টাকে আইনিভাবে ধিক্কার জানিয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এ রায় ন্যায়বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠার এক স্থায়ী দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কর্নেল তাহেরের অমর লেগ্যাসি

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে উত্তর-স্বাধীনতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে কর্নেল আবু তাহের কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক অদম্য বিপ্লবী চেতনার প্রতীক। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া এই বীর সেনানীর সামরিক ও রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান শিক্ষা ও গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

রণাঙ্গনে নির্ভীক নেতৃত্ব: ১১ নম্বর সেক্টরে তার নেতৃত্ব প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের অধিনায়ক তিনি যিনি সৈন্যদের পেছনে থেকে নির্দেশ দেন না, বরং নিজে সামনে থেকে রক্তাক্ত বাঙ্কারের মুখে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কামালপুর যুদ্ধঘাঁটি মুক্ত করার অভিযানে তিনি গুরুতর আহত হন এবং একটি পা হারান। এই শারীরিক ত্যাগ তার বৈপ্লবিক মনোবলকে ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি।

বিপ্লবী সামরিক চিন্তা ও 'উৎপাদনমুখী গণবাহিনী': ঐতিহ্যগত ঔপনিবেশিক সামরিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি আত্মনির্ভরশীল ও উৎপাদনমুখী 'গণবাহিনী' গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আজও আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানে গভীর আলোচনার দাবি রাখে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সেনাবাহিনী কেবল ব্যারাকে আবদ্ধ না থেকে দেশের কৃষিকাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় উৎপাদনে সরাসরি অংশ নেবে।

সমঝোতাহীন আদর্শবাদ ও শোষিতের অধিকার: সামরিক জীবনের বিশাল সুযোগ-সুবিধা, পদ-পদবি ও ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে তিনি সারা জীবন কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ সেনাসদস্যদের অধিকারের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করে গেছেন। ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়েও তিনি নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক আদর্শ থেকে এক চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটকালে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ও জাসদের মাধ্যমে শোষিত শ্রেণি ও সাধারণ সৈনিকদের পক্ষে তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য।

শহীদী আত্মত্যাগ ও বিচার বিভাগীয় পুনর্বাসন: ১৯৭৬ সালে সামরিক আদালতের প্রহসনমূলক বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চেও তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন অবিচল মাথায়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০১১ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট উক্ত সামরিক আদালত ও তার ফাঁসির রায়কে অসাংবিধানিক ও বেআইনি ঘোষণা করে তার দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও আইনি মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়।

কমলপুরের রক্তভেজা মাটি থেকে শুরু করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন ফাঁসির মঞ্চ কর্নেল আবু তাহেরের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক সাম্যের জন্য উৎসর্গীকৃত। তার জীবনের ট্র্যাজেডি কেবল তার ব্যক্তিগত ক্ষতি ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাথমিক পথচলায় এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে ইতিহাস তাকে একজন পরাজিত সৈনিক হিসেবে নয়, বরং চিরঞ্জীব এক বীর, অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা এবং আপসহীন সমাজ সংস্কারক হিসেবেই স্মরণের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.