>

>

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের দুইটা ভাগ ও পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের দুইটা ভাগ ও পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি

বিজয়ের রক্তিম সূর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই, সদ্য স্বাধীন এই রাষ্ট্রকে দুটি গভীর, দীর্ঘস্থায়ী এবং সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয়েছে। এই ক্ষতগুলো কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেনি, বরং রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই বারবার কাঁপিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষতটি ছিল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল রক্ষাকর্তা নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ আদর্শিক ও কাঠামোগত বিভাজন।

TruthBangla

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের দুইটা ভাগ ও পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পর বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবগাথা। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শোষণ, বঞ্চনা এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার বিরুদ্ধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার আপামর জনসাধারণ যে অভূতপূর্ব ঐক্যের পরিচয় দিয়েছিল, তা ছিল আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

কিন্তু বিজয়ের রক্তিম সূর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই, সদ্য স্বাধীন এই রাষ্ট্রকে দুটি গভীর, দীর্ঘস্থায়ী এবং সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয়েছে। এই ক্ষতগুলো কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেনি, বরং রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই বারবার কাঁপিয়ে দিয়েছে। এর প্রথম ক্ষতটি ছিল দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা এবং আন্তর্জাতিকভাবে মদদপুষ্ট পাকিস্তানপন্থী ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী সংগঠনসমূহ। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষতটি ছিল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল রক্ষাকর্তা নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ আদর্শিক ও কাঠামোগত বিভাজন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একই সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসার ও জোয়ানেরা দেশপ্রেম ও আনুগত্যের প্রশ্নে দুই স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। একদল জীবনের মায়া ত্যাগ করে, সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙে দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র ধরেছিলেন; অন্যদিকে আরেকদল কর্মকর্তা পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও আনুগত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন কেউ নীরব থেকে, কেউ বা সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে সরব সমর্থন জুগিয়ে। স্বাধীনতার পর এই দুই বিপরীত মেরুর, সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তত্ত্বের সামরিক কর্মকর্তাদের এক ছাদের নিচে, একই সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার মধ্য দিয়েই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জন্ম নেয় এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক ট্র্যাজেডির, যার খেসারত রাষ্ট্রকে আজও দিতে হচ্ছে।

একটি দেশের সেনাবাহিনী যখন তার জন্মলগ্ন থেকেই দুই বিপরীতমুখী আদর্শিক মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব কেবল ব্যারাকেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সমগ্র রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় সুরক্ষাকে চিরতরে ভঙ্গুর করে তোলে।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই রাষ্ট্রের কাঁধে চেপে বসা দুই বোঝা

যেকোনো নতুন ও স্বাধীন দেশের জন্য একটি সুশৃঙ্খল, পেশাদার এবং একক আদর্শে উদ্বুদ্ধ সেনাবাহিনী হলো তার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রধান ঢাল। বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক বিশাল সংকট সামনে ছিল। কিন্তু এই বিশাল চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাঁধে চেপে বসেছিল দুটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বোঝা। এই দুই বোঝার প্রথমটি ছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তি, যারা পরাজয় মেনে নিলেও মানসিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলো, যারা সরাসরি আল-বদর, আল-শামস এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করে বাঙালি নিধনে অংশ নিয়েছিল, তারা স্বাধীনতার পর সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হলেও তাদের ভূগর্ভস্থ তৎপরতা এবং পাকিস্তানপন্থী মনস্তত্ত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিল।

দ্বিতীয় বোঝাটি ছিল আরও মারাত্মক এবং তা দৃশ্যমান হয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই বিভাজনটি ছিল নিছক পদমর্যাদা, জ্যেষ্ঠতা বা সুযোগ-সুবিধার দ্বন্দ্ব নয়; এটি ছিল গভীর আদর্শিক, বিশ্বাসগত এবং মনস্তাত্ত্বিক ফাটল। একদিকে ছিল মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে উঠে আসা অসীম সাহসী 'মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা', যাদের ধমনীতে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশের চেতনা।

অন্যদিকে ছিল 'পাকিস্তান ফেরত' বা 'প্রত্যাবাসিত কর্মকর্তা', যারা একাত্তরের পুরো নয়টি মাস পাকিস্তানের বন্দিশালায় বা ব্যারাকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করেছিলেন এবং যাদের মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠেছিল পাকিস্তানি সামরিক একাডেমিগুলোর কট্টরপন্থী, ভারত-বিদ্বেষী এবং ধর্মীয় উগ্রতার আবহে। এই দুই পরস্পরবিরোধী পক্ষকে যখন একসাথে মিলিয়ে একটি জাতীয় বাহিনী গঠনের চেষ্টা করা হয়, তখন থেকেই বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এক 'ঐতিহাসিক পাপের' সূত্রপাত ঘটে, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।

সেনাবাহিনীর জন্মগত বিভাজন

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই জন্মগত ও কাঠামোগত বিভাজনটি বুঝতে হলে একাত্তরের রণাঙ্গন এবং ১৯৭৩ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক-সামরিক সিদ্ধান্তের দিকে তাকাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি সামরিক অফিসারদের ভূমিকা ও অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, যা পরবর্তীকালে স্বাধীন দেশে এক অত্যন্ত জটিল ও সংঘাতময় কাঠামোর জন্ম দেয়।

মুক্তির সপক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারা

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং গণহত্যা শুরু করে, তখন তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বহু দেশপ্রেমিক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও জোয়ান সামরিক শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁরা জীবন বাজি রেখে, কোনো সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় আদেশ ছাড়াই, যার যা কিছু ছিল তা-ই নিয়ে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর কে এম শফিউল্লাহ, মেজর আবু তাহের, মেজর এম এ মঞ্জুরসহ আরও বহু সামরিক ব্যক্তিত্ব রণাঙ্গনে বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেডের (যেমন জেড ফোর্স, কে ফোর্স, এস ফোর্স) নেতৃত্ব দেন। এঁদের ত্যাগ, বীরত্ব এবং রক্তের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মূল ভিত্তি। এই কর্মকর্তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়ে এসেছিলেন বলে তাঁদের মধ্যে এক ধরনের বিপ্লবী চেতনা, জনসম্পৃক্ততা এবং মুক্তিসংগ্রামের প্রগতিশীল আদর্শিক ভিত্তি প্রোথিত ছিল।

পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থাকা কর্মকর্তারা (প্রত্যাবাসিত গোষ্ঠী)

এর বিপরীতে, বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের আরেকটি বিশাল অংশ দেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেননি বা নেওয়ার সুযোগ পাননি। তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি অনুগত থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসে সামরিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পুরো সময়টা এই কর্মকর্তারা পাকিস্তানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুরক্ষিত অবস্থায় কাটিয়েছিলেন।

যুদ্ধ শেষে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন ১৯৭৩ সালের দিল্লি চুক্তি এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া প্রায় ৩৩,০০০ বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সদ্য স্বাধীন দেশ এবং মানবিক কারণে বঙ্গবন্ধু সরকার তাঁদেরকে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক মনে হলেও, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকে ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

এই প্রত্যাবাসিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ আদর্শগত ও মানসিকভাবে পাকিস্তানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ধারণা, কট্টরপন্থী সামরিক সংস্কৃতি এবং ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব ধারণ করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে যখন তারা দেখলেন যে, তাদের চেয়ে বয়সে বা পূর্বতন পদমর্যাদায় জুনিয়র মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা দুই বছরের বিশেষ জ্যেষ্ঠতা (Seniority) পেয়ে তাদের ওপরে স্থান করে নিয়েছেন, তখন তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঈর্ষার জন্ম হয়। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক মানসিকতার সাথে পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের আমলাতান্ত্রিক ও কট্টরপন্থী সামরিক মানসিকতার দূরত্ব ছিল দুর্লঙ্ঘনীয়। ফলে, ব্যারাকে এক অলিখিত ও ঠাণ্ডা যুদ্ধ শুরু হয়, যা সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ডকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছিল।

'কাকুল বনাম রণাঙ্গন' মনস্তত্ত্ব

সেনাবাহিনীর ভেতরের এই সংঘাত কেবল রাজনৈতিক ছিল না, এটি ছিল প্রশিক্ষণের সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের সংঘাত।

পাকিস্তানি সামরিক সংস্কৃতি (Kakul Mindset): পাকিস্তান ফেরত অফিসাররা পাকিস্তানের 'কাকুল সামরিক একাডেমি' (PMA Kakul) থেকে কঠোর ঔপনিবেশিক এবং আমলাতান্ত্রিক ধারায় প্রশিক্ষিত ছিলেন। সেখানে শেখানো হতো সেনাবাহিনী একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী (Elite Class) এবং তারা সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের মনস্তত্ত্বে কট্টর ভারত-বিদ্বেষ এবং ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

রণাঙ্গনের বিপ্লবী সংস্কৃতি (Sector Mindset): অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার এবং সাধারণ সিপাহিরা ৯ মাস কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, কাদা-পানিতে এক হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। সেখানে অফিসার ও সাধারণ জোয়ানের মধ্যকার ঔপনিবেশিক দূরত্ব মুছে গিয়েছিল। জোয়ানেরা অফিসারদের 'স্যার' বলার চেয়ে 'ভাই' বলে সম্বোধন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। এই বিপ্লবী ও গণমুখী চেতনা পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের চিরাচরিত সামরিক শৃঙ্খলার ধারণাকে স্তম্ভিত করেছিল। তারা মনে করতেন, মুক্তিযোদ্ধারা সেনাবাহিনীর 'পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা' নষ্ট করে ফেলেছেন।

১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি: পাকিস্তানপন্থী ষড়যন্ত্রের প্রথম আঘাত

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালিমালিপ্ত ও নৃশংস অধ্যায়। এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডটি কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা একটি রাজনৈতিক পরিবারের অবসান ছিল না; এটি ছিল মূলত সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল ভিত্তির ওপর পাকিস্তানপন্থী সামরিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সুপরিকল্পিত আঘাত। এই হত্যাকাণ্ডের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা তথা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক মেরুদণ্ডকে চিরতরে ভেঙে দেওয়া।

সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাকিস্তান ফেরত কুশীলব

১৫ আগস্টের এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত হওয়া সেই আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। এই অভ্যুত্থানে যারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল এবং পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছিল, তাদের অনেকেই ছিলেন এমন সামরিক কর্মকর্তা যাদের মনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা বঙ্গবন্ধুর প্রতি কোনো ন্যূনতম শ্রদ্ধা বা আনুগত্য ছিল না।

খোন্দকার মোশতাক আহমদের মতো রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকদের সাথে হাত মিলিয়েছিল সেনাবাহিনীর একাংশ, যার মধ্যে পাকিস্তান ফেরত ও পাকিস্তানপন্থী কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন জুগিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে তারা সদ্য স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেয় এবং রাষ্ট্রকে পুনরায় পাকিস্তানি ধারার সামরিক একনায়কতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়ার পথ সুগম করে। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সামরিক অভ্যুত্থানের আড়ালে আসলে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানপন্থী শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল স্রোতে ফিরে আসার রাস্তা খুঁজছিল।

আদর্শিক শূন্যতা ও জামায়াতের সংযোগ

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনে কেবল কতিপয় উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা ক্ষমতা লিপ্সা ছিল না; এর পেছনে ছিল একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ আদর্শিক ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের সাথে একাত্তরের পরাজিত বিহারী জনগোষ্ঠী এবং আত্মগোপনে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন 'ইসলামী ছাত্রসংঘ'-এর নেতাকর্মীদের গভীর সংযোগ ছিল। ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল আদেশিক শূন্যতা তৈরি হয়, তাকে অপব্যবহার করে পাকিস্তানপন্থী সামরিক জান্তা ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি।

রাষ্ট্রীয় বেতারের নাম 'বাংলাদেশ বেতার' থেকে পরিবর্তন করে পাকিস্তানি কায়দায় 'রেডিও বাংলাদেশ' করা হয়, এবং 'জয় বাংলা' স্লোগানকে নির্বাসনে পাঠিয়ে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' চালু করা হয়। এই সমস্ত প্রতীকী পরিবর্তনই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে সরিয়ে একটি ছদ্ম-পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই একাত্তরে গণহত্যাকারী ও কোণঠাসা হয়ে পড়া জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো ধীরে ধীরে পুনর্বাসিত হওয়ার এবং রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ লাভ করে।

'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খোন্দকার মোশতাক আহমদ যে 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' (Indemnity Ordinance) জারি করেছিলেন (যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল), জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে বৈধতা দেন।

এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সংস্কৃতিতে এক গভীর নৈতিক ক্ষত সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয় যে যথেষ্ট ক্ষমতা ও অস্ত্র থাকলে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করলেও পার পাওয়া সম্ভব, এমনকি পুরস্কৃত হওয়া যায় (খুনিদের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়েছিল)।

এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ব্যারাকে এত গভীরে প্রবেশ করেছিল যে, জুনিয়র অফিসাররা সিনিয়র অফিসারদের নির্দেশ অমান্য করা বা ক্যু করাকে একটি নিয়মিত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখতে শুরু করে।

৭ নভেম্বরের পাল্টা আঘাত: মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্ব নির্মূলের ব্লুপ্রিন্ট

১৫ আগস্টের ঘটনার পর বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোতে যে চরম অস্থিরতা শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে ঘটে যায় একের পর এক পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান। ৩রা নভেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ১৫ আগস্টের খুনি চক্রের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটে, যার লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ড ফিরিয়ে আনা এবং খুনিদের শাস্তি দেওয়া।

কিন্তু এই অভ্যুত্থানের পরপরই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় নেতাকে (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান) নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর মাত্র চার দিন পর, ৭ই নভেম্বর ঘটে যায় আরেকটি রক্তাক্ত পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান, যা 'সিপাহী-জনতার বিপ্লব' নামে চালানো হলেও এর আসল চরিত্র ছিল সেনাবাহিনী থেকে প্রগতিশীল ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চিরতরে নির্মূল করা।

টার্গেট কিলিংস ও মুক্তিযোদ্ধা নিধনযজ্ঞ

৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী কয়েক দিনের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এক সুপরিকল্পিত এবং টার্গেট কিলিং বা বেছে বেছে হত্যার উৎসব শুরু হয়। এই রক্তাক্ত অধ্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর, কে-ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা বীর বিক্রম এবং লে কর্নেল এ টি এম হায়দার বীর উত্তমসহ বহু প্রখ্যাত ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাকে অতি নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো আকস্মিক বিশৃঙ্খলার ফল ছিল না, এটি ছিল সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী ও মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্বকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার এক সুগভীর ব্লুপ্রিন্ট। যারা একাত্তরে পাকিস্তানি আধুনিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছিলেন, স্বাধীন দেশে তাদেরকেই ব্যারাকে নিজের সহকর্মীদের বুলেটের আঘাতে প্রাণ দিতে হলো। এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পাকিস্তানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী আদর্শ কতটা শক্তিশালী এবং হিংস্র হয়ে উঠেছিল।

কর্নেল তাহেরের ট্র্যাজেডি এবং বিচারিক হত্যাকাণ্ড

৭ নভেম্বরের ঘটনার অন্যতম প্রধান নায়ক ছিলেন জাসদের গণবাহিনীর নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম। তিনি জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ দ্রুতই বদলে যায়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সুসংহত করার পরপরই কর্নেল তাহেরকে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে এক গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে, সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক ও তড়িঘড়ি করা বিচারের নামে কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২১শে জুলাই তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

কর্নেল তাহেরের এই ট্র্যাজেডি কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, এটি ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বামপন্থী, প্রগতিশীল এবং বিপ্লবী চিন্তাচেতনা ধারণকারী মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জোয়ানদের সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় মেকানিজম। এর ফলে সেনাবাহিনীর আদর্শিক কাঠামো চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাকিস্তান ফেরত রক্ষণশীল আমলাতান্ত্রিক সামরিক গোষ্ঠী ক্ষমতার চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং কর্নেল তাহেরের 'শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী'র ধারণা

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহি বিদ্রোহের পেছনে সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি ছিল জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এবং কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'। তারা সেনাবাহিনীর প্রথাগত কাঠামো ভেঙে একটি 'উৎপাদনশীল শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী' (Classless Army) গঠন করতে চেয়েছিল।

তাদের ১২-দফা দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল: অফিসার ও সিপাহিদের মধ্যকার ব্রিটিশ আমলের বৈষম্য দূর করা, অফিসারদের বিশেষ সুবিধা (যেমন: ব্যাটম্যান বা আরদালি প্রথা) বাতিল করা, সিপাহিদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে অফিসার পদে উন্নীত করা এবং সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রীয় উৎপাদনশীল কাজে (কৃষি, শিল্প) নিয়োজিত করা।

অফিসারদের ঐক্য: এই ১২-দফা দাবি সেনাবাহিনীর চিরাচরিত সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ফলে, আদর্শগতভাবে জিয়াউর রহমান (মুক্তিযোদ্ধা) এবং পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে চরম বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও, এই 'শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী'র ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিতে তারা সাময়িকভাবে এক হয়ে যান। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা হাতে নিয়েই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাকে কঠোর হস্তে দমন করেন এবং কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেন।

জিয়াউর রহমানের উত্থান, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ এবং সামরিক ট্রাইব্যুনাল

৭ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান এবং পরবর্তীতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। জিয়াউর রহমান নিজে একজন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর ক্ষমতা গ্রহণ, তা টিকিয়ে রাখা এবং ক্ষমতার কুক্ষিগতকরণের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত, রহস্যময় এবং বৈপরীত্যে ভরা।

চতুর রাজনৈতিক চাল ও সামরিক সুবিধাবাদ

ক্ষমতা লাভের পর জিয়াউর রহমান নিজের অবস্থানকে একচ্ছত্র ও নিষ্কণ্টক করতে এক চতুর রাজনৈতিক চাল চালেন। তিনি একদিকে নিজের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, অন্যদিকে ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য সেই সমস্ত পাকিস্তান ফেরত অফিসার ও ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সাথে আপস ও জোট গঠন করেন, যারা আদর্শগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল। তাঁর এই সামরিক সুবিধাবাদের ফলে মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানপন্থী এই দুই পরস্পরবিরোধী শিবিরই সাময়িকভাবে ক্ষমতার অংশীদার হয়।

কিন্তু বাস্তবিকভাবে, পাকিস্তান ফেরত অফিসাররা, যারা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিলেন, তারা জিয়াউর রহমানের আশপাশে ভিড় করতে শুরু করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে নেন। জিয়াউর রহমানের এই political পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ফলেই একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজুর রহমানকে দেশের প্রধানমন্ত্রী করা হয়। এই ক্ষমতার খেলা প্রমাণ করে যে, সদ্য স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী এবং তার নেতৃত্ব অতি দ্রুত নিজেদের মূল আদর্শিক চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের এবং তা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।

১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের বিদ্রোহ এবং বিমান বাহিনীর অবসান

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর ঢাকা এবং বগুড়া সেনানিবাসে যে বিদ্রোহ ঘটেছিল, তা ছিল সবচেয়ে বড় এবং রক্তক্ষয়ী। ওই সময়ে ঢাকায় জাপানি রেড আর্মির উগ্রপন্থীরা একটি বিমান হাইজ্যাক করে (JAL Flight 472) ঢাকা বিমানবন্দরে অবস্থান করছিল।

এই আন্তর্জাতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে বিমান বাহিনীর একটি বড় অংশ এবং সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ এবং জিয়াউর রহমানকে বন্দি বা হত্যার চেষ্টা করে।

এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর জিয়াউর রহমান যে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেন, তা ছিল নজিরবিহীন। তৎকালীন সামরিক ট্রাইব্যুনালগুলোর কোনো আইনি বৈধতা বা আপিলের সুযোগ ছিল না।

মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ জন বিমান বাহিনীর জোয়ান ও অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তার ইতিহাসের সবচেয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানদের হারায়, যা বাহিনীকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল।

১৯৮১ সালের মেগা-হত্যাকাণ্ড এবং জেনারেল মঞ্জুরের ট্র্যাজেডি

১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন আরেকজন প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর (বীর উত্তম)

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন সেনাপ্রধান লে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ (যিনি নিজে একজন পাকিস্তান ফেরত অফিসার ছিলেন) অত্যন্ত চতুরতার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। জেনারেল মঞ্জুরকে বন্দি করার পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে হত্যা করা হয়।

এরশাদের নির্দেশে গঠিত সামরিক আদালতে জিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচারে ৩১ জন সামরিক কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ১৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ফাঁসির মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সক্রিয় থাকা সর্বশেষ শীর্ষস্থানীয় এবং প্রভাবশালী মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের অধ্যায় চিরতরে শেষ হয়ে যায়।

বিচার ও হত্যাযজ্ঞের স্থায়ী ক্ষত

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৭ থেকে ১৯৮১) সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অন্তত ১৯ থেকে ২০টি ছোট-বড় অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহের চেষ্টা ঘটে। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর জাপানি বিমান হাইজ্যাকিংয়ের ঘটনার সময় ঢাকা ও বগুড়া সেনানিবাসে এক বিশাল সিপাহী বিদ্রোহ ঘটে। এই সমস্ত বিদ্রোহ দমন এবং নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে জিয়াউর রহমান ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অমানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একের পর এক গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং প্রহসনমূলক বিচারের নামে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার সেনা কর্মকর্তা, বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সাধারণ জোয়ানকে ফাঁসি ও ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হত্যা করেন।

ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, এই নিষ্ঠুর বিচার ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়া অফিসারদের সিংহভাগই ছিলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। ফাঁসি দেওয়ার আগে অনেককে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম সুযোগও দেওয়া হয়নি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে রাতের অন্ধকারে শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেওয়া হয়, যাদের লাশ পর্যন্ত তাদের পরিবার খুঁজে পায়নি। এই সুপরিকল্পিত নিধনযজ্ঞের ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই নৃশংসতা ও প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা এবং মনস্তত্ত্বের ওপর এমন এক স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন এঁকে দেয়, যার প্রভাব যুগ যুগ ধরে রয়ে গেছে।

জেনারেল এরশাদের আমল এবং প্রত্যাবাসিত গোষ্ঠীর চূড়ান্ত বিজয়

১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন লে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদের এই ক্ষমতা আরোহণের মধ্য দিয়েই সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পাকিস্তান ফেরত বা প্রত্যাবাসিত কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত এবং একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে ব্যারাকে আর কোনো বড় ধরনের বিদ্রোহ বা ক্যু (Coup) হয়নি। এর কারণ, তিনি সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কাঠামো থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে পাকিস্তান ফেরত অনুগত অফিসারদের বড় বড় পদে বসিয়েছিলেন।

এরশাদ বুঝতে পেরেছিলেন যে, অফিসারদের ব্যারাকে শান্ত রাখতে হলে তাদের বিশাল আর্থিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তিনি বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে (যেমন: সচিব, কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রদূত) সামরিক কর্মকর্তাদের ডেপুটেশনে নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। এছাড়া, 'সেনা কল্যাণ সংস্থা' এবং সামরিক ট্রাস্টগুলোর পরিধি বৃদ্ধি করে অফিসারদের জন্য প্লট, ফ্ল্যাট এবং ব্যবসার লাইসেন্স নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে সেনাবাহিনীর চরিত্র 'বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ' থেকে পরিবর্তিত হয়ে 'ব্যবসায়িক-আমলাতান্ত্রিক' চরিত্রে রূপ নেয়।

সেনাবাহিনীতে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরাধিকার

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এই ধারাবাহিক আদেশিক নিধনযজ্ঞ এবং পাকিস্তানপন্থী ভাবধারার প্রসারের সবচেয়ে ভয়াবহ ও লজ্জাজনক বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং দেশদ্রোহীদের সন্তানেরা সেনাবাহিনীর মতো একটি স্পর্শকাতর ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারণী পদে আসীন হওয়ার সুযোগ পায়।

গোলাম আযমের পুত্র এবং সামরিক বাহিনীতে অনুপ্রবেশ

অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কেবল বিরোধিতাই করেননি, বরং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করতে কুখ্যাত রাজাকার, আল-বদর এবং শান্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশ ও পরিকল্পনায় লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ চালানো হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে তিনি পাকিস্তানে পালিয়ে যান এবং সেখানে বসে 'পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি' গঠন করে স্বাধীন বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানের অংশ করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে লবিং ও অপপ্রচার চালান। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং এ দেশের নাগরিকত্ব না থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে রাজনীতি করতে থাকেন।

সেই পরম শত্রু ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের পুত্র আবদুল্লাহিল আমান আজমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ পান এবং বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতি পেয়ে শেষ পর্যন্ত 'ব্রিগেডিয়ার জেনারেল' এর মতো অত্যন্ত উচ্চ ও স্পর্শকাতর পদে আসীন হন। দেশ সৃষ্টির ঘোর বিরোধিতাকারী, যার পিতা বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই স্বীকার করতে চায়নি, তার সন্তান যখন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রধান রক্ষাকর্তা তথা সেনাবাহিনীর একটি আস্ত ব্রিগেডের অধিনায়ক হয়, তখন তা জাতির বিবেককে দংশন করে।

এটি ছিল সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের ওপর এক চরম কুঠারাঘাত। এই ধরনের পদায়ন ও পদোন্নতি প্রমাণ করে যে, দীর্ঘদিনের সামরিক একনায়কত্ব এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে সেনাবাহিনী আদর্শিক মূল্যবোধের দিক থেকে কতটা दूষিত, স্খলিত এবং পরিচয় সংকটে পড়েছিল। এটি তরুণ প্রজন্মের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক মারাত্মক বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, যেখানে দেশপ্রেম আর দেশদ্রোহিতার সীমানা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

সমকালীন সেনাবাহিনী: জাতীয়তাবাদের দুর্বল ভিত্তি ও বাণিজ্যমুখিতা

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর এসে আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাহ্যিক আধুনিকায়ন, অস্ত্রসজ্জা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিধি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু যদি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে যে, একাত্তরের রণাঙ্গনে যে তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনা, অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং জনগণের সাথে একাত্ম হওয়ার যে তেজ ছিল, তার ভিত্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। আজকের সেনাবাহিনী বহুলাংশে একটি আমলাতান্ত্রিক এবং কর্পোরেট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে।

সেনাবাহিনীর বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৌশলগত নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌম অস্তিত্ব বা প্রতিরক্ষার চেয়ে বাণিজ্যিক দিকটি অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। সেনাবাহিনী আজ ব্যাংক, ট্রাস্ট, রিয়েল এস্টেট, ফাইভ-স্টার হোটেল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বড় বড় অবকাঠামোগত বাণিজ্যিক প্রজেক্টের সাথে সরাসরি যুক্ত। এর পাশাপাশি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তি মিশন (UN Peacekeeping Mission) ধরে রাখা এবং সেখানে নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখাকে সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যদিও আন্তর্জাতিক শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান অত্যন্ত গৌরবময় এবং তা দেশের জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে আসে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সত্যটি হলো এই মিশনের পেছনে সামরিক বাহিনীর জাতীয় বীরত্ব বা প্রতিরক্ষামূলক চেতনার চেয়ে আর্থিক সুবিধা, ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা বেশি ভূমিকা রাখছে।

যখন একটি জাতীয় বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি আদর্শের চেয়ে আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার সাথে একাত্তরের সেই গৌরবময় আদর্শিক উত্তরাধিকারের শূন্যতা যোগ হয়, তখন তা সামগ্রিকভাবে জাতীয় সুরক্ষার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ব্যারাকে বুক চিতিয়ে দেশকে ভালোবাসা এবং দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে লড়াই করার মতো অফিসারদের সংখ্যা দিন দিন সংকুচিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ও আদর্শিক বিভাজনের সারসংক্ষেপ

সময়কাল/তারিখ

ঐতিহাসিক ঘটনা

মূল কুশীলব ও পক্ষসমূহ

আদর্শগত ও রাজনৈতিক প্রভাব

মার্চ - ডিসেম্বর ১৯৭১

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সেনাবাহিনীর জন্ম

বাঙালি বিদ্রোহী অফিসার (জিয়া, খালেদ মোশাররফ, শফিউল্লাহ প্রমুখ) বনাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙে দেশপ্রেমের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।

১৯৭৩ - ১৯৭৪

পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া সামরিক কর্মকর্তাদের প্রত্যাবর্তন

প্রায় ৩৩,০০০ প্রত্যাবাসিত সামরিক কর্মকর্তা ও জোয়ান।

সেনাবাহিনীতে 'মুক্তিযোদ্ধা' বনাম 'প্রত্যাবাসিত' কট্টরপন্থী পাকিস্তানপন্থী আদর্শিক বিভাজনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত। জ্যেষ্ঠতা নিয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা

খন্দকার মোশতাক, মেজর ডালিম, মেজর রশিদ, ফারুক এবং পাকিস্তানপন্থী সামরিক চক্র।

ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর প্রথম বড় আঘাত। সামরিক একনায়কতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান।

৩ নভেম্বর ১৯৭৫

৪ জাতীয় নেতা হত্যাকাণ্ড ও খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা জেলে অবস্থানরত খুনি চক্র।

সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ড ফেরানোর চেষ্টা ব্যর্থ, জাতীয় নেতৃত্ব শূন্য করার চূড়ান্ত অশুভ পদক্ষেপ।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫

পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ও সিপাহী বিদ্রোহ

কর্নেল আবু তাহের (জাসদ), জিয়াউর রহমান এবং উগ্র ডানপন্থী-চরমপন্থী অংশ।

জেনারেল খালেদ মোশাররফ, নাজমুল হুদা, হায়দারসহ শীর্ষস্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নৃশংসভাবে হত্যা। প্রগতিশীল শক্তির অপসারন।

২১ জুলাই ১৯৭৬

কর্নেল আবু তাহেরের গোপন বিচার ও ফাঁসি

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও সামরিক ট্রাইব্যুনাল।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিপ্লবী ও বামপন্থী মুক্তিসংগ্রামের চেতনাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।

১৯৭৭ - ১৯৮১

সামরিক ট্রাইব্যুনাল এবং গণ-ফাঁসি

জিয়াউর রহমান সরকার ও সামরিক আদালতসমূহ।

প্রায় আড়াই হাজার সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যকে (অধিকাংশই মুক্তিযোদ্ধা) প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণ নির্মূলীকরণ।

১৯৭৮ - ১৯৮০-এর দশক

যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন ও গোলাম আযমের প্রত্যাবর্তন

জিয়াউর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, জামায়াতে ইসলামী।

একাত্তরের পরাজিত শক্তির রাজনৈতিক পুনর্জন্ম। রাষ্ট্রীয় আদর্শের চরম পতন ও সাম্প্রদায়িকতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।

আধুনিক যুগ

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের উচ্চপদে আসীন হওয়া ও বাণিজ্যমুখিতা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী (গোলাম আযমের পুত্র) ও অন্যান্যরা।

সামরিক বাহিনীর নৈতিক অবক্ষয়, পরিচয় সংকট, এবং প্রতিরক্ষার চেয়ে কর্পোরেট ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রাধান্য।

ক্ষত নিরাময় ও জাতীয় আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যে ঐতিহাসিক ও আদর্শিক বিভাজনের জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের পর, তা কেবল ব্যারাকে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় ছিল না। এটি ছিল মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর এক গভীর অন্তর্ঘাত। ১৫ আগস্টের নির্মম নিষ্ঠুরতা, ৩ ও ৭ নভেম্বরের সুপরিকল্পিত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার নিধনযজ্ঞ এবং পরবর্তী সামরিক শাসনের মাধ্যমে এই আদর্শিক ফাটলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সামরিক বাহিনী তার মূল নৈতিক ভিত্তি যা একাত্তরের মহান মুক্তিসংগ্রাম থেকে অর্জিত হয়েছিল তা থেকে বহুলাংশে দূরে সরে যায়।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসে আজ সময় এসেছে এই দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক ক্ষত নিরাময় করার এবং জাতীয় আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার। একটি দেশের সেনাবাহিনী তখনই প্রকৃত অর্থে অপরাজেয় হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি সদস্য একক ও অবিভাজ্য জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সম্পূর্ণ উদ্বুদ্ধ থাকে। সেনাবাহিনীর প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে ক্যাডেট একাডেমিগুলো থেকে শুরু করে উচ্চতর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অসাম্প্রদায়িক দেশপ্রেমের আদর্শিক পাঠ বাধ্যতামূলক ও সুদৃঢ় করতে হবে।

সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে political হস্তক্ষেপ ও সংকীর্ণ দলীয় মানসিকতার ঊর্ধ্বে রেখে একটি স্বাধীন, পেশাদার এবং চেইন অফ কমান্ড-নির্ভর জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি এবং তাদের দোসর ও আদর্শিক উত্তরাধিকারীদের যেকোনো ধরনের পরোক্ষ বা प्रत्यक्ष প্রভাব থেকে সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ ও চিরতরে মুক্ত রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীকে দেশবিরোধীদের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

যে সমস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ও জোয়ানদের ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে অন্যায়ভাবে, গোপন ট্রাইব্যুনালের নামে প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দেওয়া বা হত্যা করা হয়েছে, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তাদের পরিবারের প্রতি ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া বীর অফিসার ও জোয়ানদের পবিত্র রক্ত যেন কোনোভাবেই আদর্শহীন, ক্ষমতালিপ্সু এবং পাকিস্তানপন্থী সামরিক গোষ্ঠীর হাতে আর কখনো অপমানিত না হয় তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং অনস্বীকার্য দাবি। তবেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকৃত অর্থে 'জনগণের বাহিনী' এবং সার্বভৌমত্বের অভেদ্য দুর্গে পরিণত হবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.