অঁদ্রে মালরো - একাত্তরে জীবিতদের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি বলেছিলেন যিনি
ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ, স্পেনের গৃহযুদ্ধের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যান্টি-নাৎসি প্রতিরোধের কিংবদন্তী গেরিলা এবং স্বাধীন ফ্রান্সের প্রথম সংস্কৃতিমন্ত্রী অঁদ্রে মালরো (André Malraux) ছিলেন সেই বিরলতম বৈশ্বিক মানবতাবাদীদের একজন। ১৯৭১ সালে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট এক ভূখণ্ডে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইতিহাসের অন্যতম বর্বর গণহত্যায় মেতে উঠেছিল, তখন সত্তোরোর্ধ্ব বার্ধক্যের শারীরিক অসুস্থতা ও ফরাসি রাজকীয় অভিজাত জীবনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গর্জে উঠেছিলেন এই প্রবীণ সিংহ।

TruthBangla

বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মানচিত্রে এমন কিছু বিরল ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, যাঁদের জীবন কোনো একক মহাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় কিংবা সাধারণ জীবনকালের স্বাভাবিক বৃত্তে বন্দি থাকে না। তাঁরা জীবনকে কেবল একটি ব্যক্তিগত যাত্রাক্রম হিসেবে দেখেন না; বরং ন্যায়বিচারের সার্বজনীন লড়াইয়ে নিজেকে বাজি ধরেন। ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ, স্পেনের গৃহযুদ্ধের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যান্টি-নাৎসি প্রতিরোধের কিংবদন্তী গেরিলা এবং স্বাধীন ফ্রান্সের প্রথম সংস্কৃতিমন্ত্রী অঁদ্রে মালরো (André Malraux) ছিলেন সেই বিরলতম বৈশ্বিক মানবতাবাদীদের একজন।
১৯৭১ সালে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট এক ভূখণ্ডে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইতিহাসের অন্যতম বর্বর গণহত্যায় মেতে উঠেছিল, তখন সত্তোরোর্ধ্ব বার্ধক্যের শারীরিক অসুস্থতা ও ফরাসি রাজকীয় অভিজাত জীবনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গর্জে উঠেছিলেন এই প্রবীণ সিংহ। ৭০ বছর বয়সে তিনি বিশ্বকে স্তম্ভিত করে ঘোষণা করেছিলেন তিনি বাংলাদেশের মুক্তিকামী তরুণদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গনে ট্যাংক চালাতে চান, উড়তে চান যুদ্ধবিমানে।
একজন ফরাসি নোবেলমনোনীত সাহিত্যিকের এই হুঙ্কার কেবল বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণকে তছনছ করে দেয়নি, বরং বিশ্বজনমতের দরবারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটি "বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন" থেকে "মানবতার সার্বজনীন মুক্তির যুদ্ধে" উন্নীত করেছিল। নিচে অঁদ্রে মালরোর বর্ণিল মহাকাব্যিক জীবন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান, রিচার্ড নিক্সনকে দেওয়া ঐতিহাসিক কূটনৈতিক তোপ, এবং পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর ঐতিহাসিক আগমনের এক পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
অঁদ্রে মালরো: সাহিত্যের আড়ালে এক জীবনমুখী বিপ্লবী (১৯০১ – ১৯৬৯)
অঁদ্রে মালরো ১৯০১ সালের ৩রা নভেম্বর প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোর থেকেই তিনি প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চৌকাঠে বন্দি না থেকে প্রাচ্য তত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব ও দর্শনে নিজেকে নিমজ্জিত করেন। তবে মালরোর সর্বাপেক্ষা বড় স্বকীয়তা ছিল তিনি ঘরের কোণে বসে বা আরামদায়ক লাইব্রেরিতে বসে কেবল সাহিত্য রচনা করার মত নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিজীবী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্রিয়া বা কর্মের (Action) মধ্য দিয়েই মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ ও ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেড: ১৯৩৬ সালে যখন জেনারেল ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্পেনের রিপাবলিকানরা লড়ছিল, তখন মালরো কেবল সংহতি বার্তা পাঠিয়ে ক্ষান্ত হননি। তিনি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক বিমানবাহিনী 'এসকাদ্রিলা স্প্যানিয়া' (Escadrilla España) গঠন করেন এবং একজন বীর সেনাপতির মতো স্বয়ং বিমান চালিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বোমাবর্ষণ করেন। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘এল এস্পোয়ার’ (L'Espoir / Hope)।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ফরাসি প্রতিরোধ সংগ্রাম: ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মালরো ফরাসি ট্যাঙ্ক রেজিমেন্টে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনীর হাতে বন্দি হলেও তিনি নাটকীয়ভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং সরাসরি যুক্ত হন 'ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্স' (French Resistance)-এ। 'কর্নেল বের্জার' ছদ্মনামে তিনি অ্যালসেস-লোরেইন ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেন। নাৎসিদের বিরুদ্ধে এই রক্তক্ষয়ী গেরিলা যুদ্ধে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ফরাসি মুক্তিসংগ্রামের প্রধান পুরুষ জেনারেল শার্ল দ্য গোল (Charles de Gaulle)-এর অত্যন্ত আস্থাভাজন ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধায় পরিণত হন।
ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের কারিগর: ১৯৫৮ সালে জেনারেল দ্য গোল ক্ষমতায় এলে তিনি ফ্রান্সের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন এবং অঁদ্রে মালরোকে স্বাধীন ফ্রান্সের প্রথম সংস্কৃতিমন্ত্রী (১৯৫৯-১৯৬৯) হিসেবে নিযুক্ত করেন। মন্ত্রিত্বকালে তিনি ফ্রান্সের ঐতিহাসিক প্রাসাদ ও স্থাপত্যের সংরক্ষণ, 'মেসোঁ দ্য লা কুলত্যুর' (সংস্কৃতি ভবন) প্রতিষ্ঠা এবং প্যারিসের সাংস্কৃতিক দৃশ্যপটকে বৈশ্বিক উচ্চতায় নিয়ে যান। কিন্তু ১৯৬৯ সালে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পরও তাঁর ভেতরে থাকা রাজপথের বিপ্লবী যোদ্ধা সত্তাটি এক মুহূর্তের জন্যও ঝিমিয়ে পড়েনি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রোপাগান্ডা ও বিশ্বজুড়ে নীরবতার দেয়াল
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নজিরবিহীন গণহত্যা শুরু করে। বিশ্বগণমাধ্যমে গণহত্যার সংবাদ আসতে শুরু করলেও, ঠাণ্ডা যুদ্ধের (Cold War) তৎকালীন ভূ-রাজনীতির সমীকরণে বিশ্বনেতারা চরম কূটনৈতিক নীতিহীনতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রোপাগান্ডা
ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সারাবিশ্বে বিলিয়ন ডলারের প্রচারণায় মেতে উঠেছিল। তারা বিশ্ব দরবারে দাবি করছিল পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণাধীন এবং যা ঘটছে তা কেবল "ভারতের অর্থপুষ্ট কয়েকজন দুষ্কৃতী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীর কর্মকাণ্ড"।
তারা এটিকে ইসলামের অভ্যন্তরীণ রক্ষাকবচ হিসেবে উপস্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন আদায়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। এই ভয়াবহ মিথ্যার প্রাচীর যখন সত্যকে ঢেকে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই পশ্চিমা বিশ্বের আঁধার চিরে গর্জে ওঠেন এক সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধ অঁদ্রে মালরো।

৭০ বছরের প্রবীণ যোদ্ধার বিশ্ব কাঁপানো হুঙ্কার (সেপ্টেম্বর ১৯৭১)
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বজুড়ে যখন পাকিস্তানের সমর্থনে নানা ধরনের কূটনৈতিক জাল বোনা হচ্ছিল, তখন প্যারিসে নিজ বাসভবনে বসে চরম অস্থিরতা অনুভব করছিলেন অঁদ্রে মালরো। ১৯৩০-এর দশকে স্পেনের মাটিতে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের মতো একটি সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবী দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেন।
প্যারিসের ঐতিহাসিক ঘোষণা: ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ও সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় ফেলে একটি খবর প্রকাশিত হয়। আমেরিকার 'ওয়াশিংটন নিউজ' পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় শিরোনাম করা হয়:
"André Malraux Offers to Aid Bengaliz" (অঁদ্রে মালরো বাঙালিদের সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন)।
প্যারিসে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মালরো পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ঐতিহাসিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন:
"ফাঁকা বুলি আওড়াবার কোনো অভ্যেস আমার কোনোদিন ছিল না। আমার বয়স ৭০ বছর হতে পারে, কিন্তু আমার ট্যাংক যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। আমি কোনো সহানুভূতিমূলক বক্তৃতা দিতে আসিনি; আমি ঘোষণা করছি, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর অধীনে একটি আন্তর্জাতিক ট্যাংক ইউনিট গঠনে আমি অটল।"
তিনি ফরাসি সরকারের কাছে সরাসরি একটি সামরিক বিমান দাবি করে বলেন:
"আমাকে একটি বিমান দাও, আমি গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তির জন্য জীবনের শেষ লড়াইটি লড়ব। পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিঃশর্তভাবে 'না' বলতে পারে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে গৌরবময় কাজ একজন মানুষের জীবনে আর কিছু হতে পারে না।"
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রভাব
মালরোর এই একটি বক্তব্য বিশ্বরাজনীতির পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয়।
আইনগত ও নৈতিক বৈধতা: একজন ফরাসি প্রাক্তন মন্ত্রী, নাৎসি প্রতিরোধের জাতীয় বীর এবং বিশ্বখ্যাত লেখকের এই সচিত্র ঘোষণা বিশ্বকে বাধ্য করে এটি উপলব্ধি করতে যে বাংলাদেশের যুদ্ধটি কোনো আঞ্চলিক বা বিচ্ছিন্নতাবাদী দাঙ্গা নয়; এটি হচ্ছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের চরম নৈতিক যুদ্ধ।
মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যখন অঁদ্রে মালরোর এই সংহতি বার্তা প্রচার করা হয়, তখন ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত ক্যাম্পগুলোতে থাকা প্রশিক্ষণরত হাজার হাজার তরুণের রক্তে নতুন করে উদ্দীপনার বারুদ জ্বলে ওঠে। তারা বুঝতে পারেন, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে বিশ্ববিবেক তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে কড়া কূটনৈতিক চিঠি ও ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের একাট্টা করা
কেবল যুদ্ধ জয়ের ঘোষণাই নয়, অঁদ্রে মালরো আন্তর্জাতিক কূটনীতির শীর্ষ অলিন্দে নিজের সর্বোচ্চ প্রভাব প্রয়োগ করেছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে চিঠি: তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিউ. কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে প্রত্যক্ষ অস্ত্র ও রাজনৈতিক সমর্থন জোগাচ্ছিল। মালরো মার্কিন নীতির এই নগ্ন রূপ দেখে ক্ষুব্ধ হন। তিনি সরাসরি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে এক খোলা চিঠিতে লেখেন:
"মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনি কি উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, আপনি যাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন, তারা একটি সম্পূর্ণ জাতিকে গণহত্যা করছে? গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বড়াই করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করে একটি ফ্যাসিস্ট সামরিক জান্তার হাতে ট্যাংক ও কামান তুলে দিতে পারে? অবিলম্বে এই রক্তপাত বন্ধে পাকিস্তানকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করুন।"
এই চিঠিটি হোয়াইট হাউসের তৎকালীন নীতির ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। এর কিছুদিন পরেই নিক্সনের চীন ও চীন-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে মালরোর কূটনৈতিক যুক্তিগুলো বৈশ্বিক মিডিয়ার প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়।
ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ করা: মালরো প্যারিস ও লন্ডনের শীর্ষস্থানীয় দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও লেখকদের (যাঁদের মধ্যে জঁ-পল সার্ত্রে, লুই আরাগঁর মতো ব্যক্তিত্বরা ছিলেন) একসাথে এনে 'বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক কমিটি'র আন্তর্জাতিক সমর্থন বলয় তৈরি করেন। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফরাসি নাগরিক সমাজ বাংলাদেশ ফান্ডের জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে এবং ফরাসি সরকারকে বাধ্য করে যেন তারা জাতিসংঘে পাকিস্তানের গণহত্যার বিপক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
রণাঙ্গনে না আসার সামরিক কূটনীতি ও ইন্দিরার দূরদর্শিতা
মালরো চেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকদের একটি বিশেষ ব্রিগেড নিয়ে ভারতে এসে পৌঁছাতে। ভারতের বর্ষীয়ান রাজনীতিক জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং বাংলাদেশের বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান তাঁকে রণাঙ্গনে আসার জন্য সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন তিনি ট্যাংক নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে পারেননি? এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী কৌশল: তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অঁদ্রে মালরোর এই অভূতপূর্ব প্রস্তাবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা হিসাব করে দেখেন যে, ৭০ বছর বয়সী ফরাসি আইকন যদি যুদ্ধের ময়দানে এসে পৌঁছান এবং পাকিস্তানি গোলার আঘাতে তাঁর কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক চরম বিশৃঙ্খলা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
ইন্দিরা গান্ধী মালরোকে বিনম্র বার্তার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, রণাঙ্গনে ট্যাংক চালানোর চেয়ে ইউরোপের মাটিতে বসে তাঁর কলম চালানো এবং নিক্সন-ইয়াহিয়াকে বিশ্বমঞ্চে নাস্তানাবুদ করা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য হাজার গুণ বেশি কার্যকর।
শারীরিক অসুস্থতা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্পেনের যুদ্ধে একাধিকবার গুলির আঘাত পাওয়া মালরোর শরীর বার্ধক্যের কারণে শারীরিকভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার আর্দ্র ও কাদামাটি ঘেরা রণাঙ্গনে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। কিন্তু মানসিক বিচারে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে একজন "বাংলাদেশি গেরিলা" মনে করতেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক আগমন (২১-২৩ এপ্রিল ১৯৭৩)
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে বিজয় অর্জনের পর অঁদ্রে মালরোর জন্য এই ঘটনাটি ছিল তাঁর নিজের জীবনের এক গভীর ব্যক্তিগত জয়। স্বাধীনতার মাত্র দেড় বছরের মাথায়, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে ১৯৭৩ সালের ২১শে এপ্রিল অঁদ্রে মালরো ঢাকায় পা রাখেন।
তেজগাঁও বিমানবন্দরে অভূতপূর্ব গণসংবর্ধনা
১৯৭৩ সালের ২১শে এপ্রিল দুপুরবেলা তেজগাঁও বিমানবন্দরে মালরোকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করে। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্যগণ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
শাহীন স্কুলের ছোট ছোট শিশুরা যখন ফুল ছিটিয়ে ফরাসি বীরকে বরণ করে নিচ্ছিল, তখন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন প্রবীণ মালরো। তিনি এক শিশুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন এবং স্বাচ্ছন্দে বলে উঠেছিলেন:
"আজ আমি ধন্য! তোমাদের এই মুক্ত স্বাধীন বাতাস প্রমাণ করে যে, মানুষের মুক্তির লড়াই কখনো ব্যর্থ হতে পারে না। তোমাদের এই স্বাধীনতা আমার নিজেরও মুক্তি!"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বলেছিলেন 'জীবিতের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি' (২২ এপ্রিল ১৯৭৩)
অঁদ্রে মালরোর সফরের সবচেয়ে আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটি রচিত হয় ১৯৭২-৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনী যে নারকীয় গণহত্যা চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে মালরো পূর্ণ অবগত ছিলেন।
সলিমুল্লাহ হল ও কার্জন হলের ঐতিহাসিক ভাষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের উপচে পড়া জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে মালরো সেই বিখ্যাত ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন, যা চিরকালের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে:
"আজ আমি আমার জীবনে পৃথিবীর এমন এক অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে যাওয়ার আগে শহীদের স্মৃতির সামনে মাথা নোয়াতে হয়। আমি আজ এমন এক ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে জীবিত শিক্ষার্থীদের চেয়ে শহীদ ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি!"
এই উক্তিটির সাথে সাথে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল। সেখানে উপস্থিত হাজারো ছাত্র, যাঁরা নিজেরা একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন এবং নিজেদের সহপাঠীদের হারিয়েছিলেন, তাঁরা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। এটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মত্যাগের প্রতি বিশ্বমানের শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিজীবী সম্মাননা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি
ঢাকা সফরের পর তিনি যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও শিক্ষকবৃন্দ অঁদ্রে মালরোর এই ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (D.Litt) ডিগ্রিতে ভূষিত করেন। সফরকালে তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ (Alliance Française)-এর একটি নতুন শাখার ভিত্তি উন্মোচন করেন এবং মুক্তিকামী ছাত্র সমাজকে একটি আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
অঁদ্রে মালরোর জীবন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
অঁদ্রে মালরোর সামগ্রিক জীবন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সাথে তাঁর আত্মিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ককে সংক্ষেপে একটি সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
তারিখ / সময়কাল | স্থান / অবস্থান | ঘটনা / পদক্ষেপ | ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও প্রভাব |
৩ নভেম্বর ১৯০১ | প্যারিস, ফ্রান্স | জন্মগ্রহণ করেন। | সাহিত্য, শিল্পকলা ও সমাজচিন্তায় ফরাসি যুগের সূচনা। |
১৯৩৬ - ১৯৩৯ | স্পেন | স্পেনের গৃহযুদ্ধে রিপাবলিকানদের পক্ষে যুদ্ধ পরিচালনা। | 'এসকাদ্রিলা স্প্যানিয়া' গঠন ও বিমান নিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। |
১৯৪০ - ১৯৪৫ | ফ্রান্স | ফরাসি রেজিস্ট্যান্স (French Resistance)-এর নেতৃত্বদান। | নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ; 'কর্নেল বের্জার' নামে পরিচিতি। |
১৯৫৯ - ১৯৬৯ | প্যারিস, ফ্রান্স | স্বাধীন ফ্রান্সের প্রথম সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন। | ফরাসি সংস্কৃতি ও বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণে বৈপ্লবিক রূপান্তর। |
১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ | প্যারিস / ওয়াশিংটন | বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের ঐতিহাসিক ঘোষণা। | "মুক্তিবাহিনীর অধীনে ট্যাংক চালাব" মর্মে বিবৃতি বিশ্ব দরবারে তোলপাড় ফেলে। |
অক্টোবর ১৯৭১ | হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন | প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে খোলা চিঠি প্রেরণ। | পাকিস্তানকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধে চাপ প্রয়োগ ও গণহত্যার প্রতিবাদ। |
২১ এপ্রিল ১৯৭৩ | তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা | স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক পদার্পণ। | বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে উষ্ণ গণসংবর্ধনা লাভ। |
২২ এপ্রিল ১৯৭৩ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক আবেগঘন ভাষণ। | "জীবিতের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি" বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মত্যাগের বৈশ্বিক স্বীকৃতি। |
২৩ এপ্রিল ১৯৭৩ | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় | সম্মানসূচক D.Litt (ডক্টরেট) ডিগ্রি গ্রহণ। | বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন থেকে সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। |
২৩ নভেম্বর ১৯৭৬ | ক্রেমলিন-বিসেত্র, ফ্রান্স | ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। | বিশ্বজুড়ে একজন প্রকৃত মানবতাবাদী ও বিপ্লবীর জীবনাবসান। |
(তথ্যসূত্র: ফরাসি জাতীয় আর্কাইভস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নথি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক নথিপত্র)
অঁদ্রে মালরোর সাহিত্যিক দর্শন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যোগসূত্র
অঁদ্রে মালরোর চিন্তাজগতের কেন্দ্রবিন্দু ছিল "মানবীয় মর্যাদা" (Human Dignity) এবং "অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্বীকার" (La Négation)। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ জন্মায় এক নিরর্থক ও নিষ্ঠুর পৃথিবীতে, কিন্তু অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমেই সে নিজের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।
'লা কঁদিসিওঁ উমেন' এবং '৭১-এর আত্মত্যাগ: ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'লা কঁদিসিওঁ উমেন' (La Condition Humaine - মানব ভাগ্য)-এর জন্য তিনি ফ্রান্সে সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা 'প্রি গঁকুর' (Prix Goncourt) লাভ করেন। এই বইয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শোষণকে প্রত্যাখ্যান করে।
১৯৭১ সালে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রামের মাটি পরিদর্শন করেন, তখন তিনি এই বইয়ের দর্শনেরই বাস্তব রূপ দেখেছিলেন ঢাকার তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। তিনি অনুভব করেছিলেন, বাঙালি তরুণরা কেবল একটি ভূখণ্ডের জন্য লড়ছে না, তারা সমগ্র মানবজাতির মর্যাদার পুনর্প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করছে।
প্রাচ্য দর্শন ও রবীন্দ্রনাথের সাথে সংযোগ: মালরো কেবল পশ্চিমাদের চশমায় বিশ্বকে দেখেননি। যৌবনে তিনি ভারত, ইন্দোচীন ও শ্রীলঙ্কায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আসেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী এবং স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনে গভীর প্রভাবিত ছিলেন।
১৯৩০-এর দশকে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন মালরো। তিনি বাংলাকে দেখতেন প্রাচ্যের এক গভীর সাংস্কৃতিক ও আত্মিক কেন্দ্র হিসেবে। ফলে ১৯৭১ সালে যখন সেই সংস্কৃতির ওপর বর্বর হামলা হয়, তখন তা মালরোর কাছে নিজের ব্যক্তিগত ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল।
অঁদ্রে মালরোর বাংলাদেশ অভিযানের অপ্রকাশিত কূটনৈতিক ও সামরিক অধ্যায়
১৯৭১ সালে ওয়াশিংটন নিউজে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর মালরো কেবল কথার কথা বলেননি, তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন।
ফরাসি পাইলটদের সংগঠিত করার উদ্যোগ: মালরো ১৯৩৬ সালের স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের আদলে ফরাসি প্রতিরোধ যুদ্ধের পুরোনো সহযোদ্ধা এবং কয়েকজন তরুণ ফরাসি বিমানবাহিনীর পাইলটকে নিয়ে একটি "আন্তর্জাতিক ভলান্টিয়ার এয়ার-স্কোয়াড্রন" গঠনের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছিলেন। তিনি তৎকালীন ফরাসি সরকারের কাছে গোপন বার্তা পাঠিয়েছিলেন যেন তাঁকে নিষ্ক্রিয় থাকা কয়েকটি সামরিক পরিবহন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর সাথে ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক বৈঠক: ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে আগমন করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অঁদ্রে মালরোকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ধানমন্ডি ও গণভবনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। সেই ঐতিহাসিক বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আলোচনা হয়:
১. যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন: মালরো বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দেন যে, ভৌত অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তাঁর অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা।
২. জাতীয় জাদুঘর ও শিল্পকলা: ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বাংলাদেশে একটি বিশ্বমানের জাতীয় জাদুঘর ও ইতিহাস সংরক্ষণাগার তৈরির নকশায় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
৩. ফরাসি-বাংলাদেশ বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার প্রসারে 'অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ'-এর কাজকে রাষ্ট্রীয় স্তরে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য প্রাতঃস্মরণীয় আন্তর্জাতিক বন্ধুগণ
অঁদ্রে মালরো যখন ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী মহলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করেছিলেন।
জর্জ হ্যারিসন ও পন্ডিত রবিশঙ্কর: 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'
১৯৭১ সালের ১লা আগস্ট নিউ ইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত হয় 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'। এটি ছিল সংগীতাঙ্গনের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বমাপের মানবিক চ্যারিটি কনসার্ট। বিটলস ব্যান্ডের বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন এবং সেতারবাদক পন্ডিত রবিশঙ্কর-এর যৌথ উদ্যোগে এই কনসার্টে বব ডিলান, এরিক ক্লাপটন, রিংগো স্টারের মতো শিল্পীরা অংশ নেন।
হ্যারিসনের গাওয়া “Bangladesh, Bangladesh / Where too many people are dying / And it looks like a human madness” গানটি কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং জাতিসংঘের ত্রাণ তহবিলে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহ করে।
অ্যালেন গিন্সবার্গ: 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড'
মার্কিন বিট প্রজন্মের বিখ্যাত কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসেন। তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে যশোর রোডের ধারে কাদা-পানি ও বর্ষায় ভিজতে থাকা লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থীর দুর্দশা স্বচক্ষে দেখেন।
নিউ ইয়র্কে ফিরে গিয়ে তিনি রচনা করেন তাঁর ১৫২ লাইনের কালজয়ী দীর্ঘ কবিতা 'September on Jessore Road'। কবিতাটিতে তিনি মার্কিন সরকারের অস্ত্র সরবরাহের কঠোর সমালোচনা করেন এবং শরণার্থীদের চিৎকারকে বিশ্বমানবতার দরবারে তুলে ধরেন: “Millions of babies watching the skies / Burning with fever, calling out eyes...”
সাইমন ড্রিং ও অ্যান্থনি মাসকারেনহাস
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২৫শে মার্চের গণহত্যার পর সব বিদেশী সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দিয়েছিল। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছিলেন দু'জন সাংবাদিক:
সাইমন ড্রিং (Daily Telegraph): তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আত্মগোপন করে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রাজারবাগ ও পুরান ঢাকার নারকীয় গণহত্যার প্রথম বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট বিশ্ববাসীর সামনে আনেন।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (The Sunday Times): পাকিস্তানি নাগরিক ও সাংবাদিক হয়েও মাসকারেনহাস সামরিক জান্তার এই পাশবিকতা সহ্য করতে পারেননি। তিনি পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে পালিয়ে গিয়ে ১৩ই জুন ১৯৭১ সালে দ্য সানডে টাইমসে 'Genocide' শিরোনামে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা তৎকালীন বিশ্বনেতাদের অবস্থান বদলাতে বাধ্য করেছিল।
সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি: ওয়াশিংটনে নৈতিক কণ্ঠস্বর
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যখন ইয়াহিয়া খানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিচ্ছিলেন, তখন মার্কিন সিনেটে এর বিরুদ্ধে প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন ডেমোক্রেটিক সিনেটর এডওয়ার্ড 'টেড' কেনেডি।
তিনি ১৯৭১ সালের আগস্টে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শন করেন এবং কাদা-পানিতে হেঁটে আহত শিশু ও নারীদের সাথে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তিনি মার্কিন কংগ্রেসে 'Crisis in South Asia' শীর্ষক একটি বিশদ রিপোর্ট পেশ করেন এবং পাকিস্তানকে দেওয়া সমস্ত সামরিক সহায়তা অবিলম্বে বন্ধ করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
লিয়ার লেভিন ও 'মুক্তির গান': ক্যামেরায় যুদ্ধক্ষেত্রের ইতিহাস
মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন (Lear Levin) ১৯৭১ সালে নিজের অর্থায়নে ক্যামেরাম্যানদের সাথে নিয়ে মুক্তাঞ্চল ও যুদ্ধের রণাঙ্গনে ঘুরে বেড়ান।
তিনি 'সংগ্রামী স্বাধীন বাংলা শিল্পী সনস্থায়'-এর শিল্পীদের (যাঁরা ট্রাকে করে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের গান গেয়ে সাহস জোগাতেন) প্রায় ২০ ঘণ্টার বিরল ফুটেজ রেকর্ড করেন।পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ সেই ফুটেজ উদ্ধার করে তৈরি করেন কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র 'মুক্তির গান'।
ফ্রাঙ্কো-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও আধুনিক প্রজন্মে মালরোর প্রাসঙ্গিকতা
অঁদ্রে মালরোর ১৯৭১ সালের সেই মহান হুঙ্কার কেবল তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণেই প্রভাব ফেলেনি, বরং তা স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে ফ্রান্সের দীর্ঘমেয়াদী দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল।
ফরাসি কূটনৈতিক স্বীকৃতির ত্বরান্বিতকরণ: মালরোর লাগাতার আন্দোলন ও ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণেই ১৯৭২ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন সরকার দ্রুততার সাথে স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যে বিপুল সাড়া তৈরি হয়েছিল, তার মূল কারিগর ছিলেন মালরো।
স্মরণ ও আধুনিক সম্মাননা: বাংলাদেশে অঁদ্রে মালরোর স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সাথে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ঢাকার ধানমন্ডিস্থ অলিয়ঁস ফ্রঁসেজের প্রধান গ্যালারি এবং বিভিন্ন মিলনায়তনের নাম অঁদ্রে মালরোর নামে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামের অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর সফরের ফলক আজও ফরাসি-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে সংরক্ষিত। ফরাসি সরকার পরবর্তীতে প্যারিসের 'প্যান্থিয়ন' (Panthéon - যেখানে ফরাসি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সমাহিত করা হয়)-এ অঁদ্রে মালরোর স্মারক স্থাপন করে সম্মান জানায়।
উপসংহার
অঁদ্রে মালরোর জীবন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্কের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন এমন এক অনন্য বৈশ্বিক মানবতাবাদী, যিনি প্রমান করেছিলেন ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং স্বাধীনতার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা বয়সের কোটা থাকে না।
যখন একজন ৭০ বছরের ফরাসি বৃদ্ধ, যিনি জীবনের সমস্ত খ্যাতি, ক্ষমতা ও পদমর্যাদার চূড়ায় আসীন ছিলেন, একটি অচেনা-অজানা মহাদেশের নির্যাতিত মানুষের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধবিমানে উঠতে চান তখন তা বিশ্ব মানবজাতির নৈতিক শক্তির শ্রেষ্ঠতম স্মারক হয়ে দাঁড়ায়। মালরোর সেই উক্তি:
"পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে 'না' বলতে পারে, তাদের পক্ষ নেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না"
আজও প্রতিটা স্বাধীনচেতা বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন প্রদীপের মতো জ্বলে। অঁদ্রে মালরো কেবল ফ্রান্সের বীর সেনানী বা কালজয়ী লেখক নন; তিনি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অবিনাশী, উজ্জ্বল ও রক্তিম অধ্যায়।















