এক রাতেই ৩০০ শহীদ – ঢাবি ইকবাল হল এবং জগন্নাথ হলে নির্মম গণহত্যা
বাঙালি জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের যে পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন করেছিল, তার মূল বধ্যভূমি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালির আত্মার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং জগন্নাথ হল জুড়ে সেদিন রচে যাওয়া নির্মমতা পৃথিবীর যেকোনো চণ্ডাল হিংস্রতাকেও হার মানায়। চারদিক থেকে ভারী ট্যাংক, সাজোঁয়া যান, ট্রেসার বুলেট আর মোর্টার শেলের তাণ্ডবে কেঁপে উঠেছিল গোটা ক্যাম্পাস।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। বসন্তের শেষলগ্নে মায়াবী পূর্ণিমার আলোয় ভাসছিল ঢাকা নগরী। কিন্তু সেই স্নিগ্ধ আলোর নেপথ্যে ঘনীভূত হচ্ছিল এক বীভৎস মানবেতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়। বাঙালি জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের যে পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন করেছিল, তার মূল বধ্যভূমি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালির আত্মার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং জগন্নাথ হল জুড়ে সেদিন রচে যাওয়া নির্মমতা পৃথিবীর যেকোনো চণ্ডাল হিংস্রতাকেও হার মানায়। চারদিক থেকে ভারী ট্যাংক, সাজোঁয়া যান, ট্রেসার বুলেট আর মোর্টার শেলের তাণ্ডবে কেঁপে উঠেছিল গোটা ক্যাম্পাস। ছাত্রদের রুমে রুমে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, হলের মাঠে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার, আর রক্তাক্ত করিডোরে বুটের শব্দে এক নরক গুলজার রচিত হয়েছিল সেই রাতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের শিউরে ওঠা বয়ানে ফুটে উঠেছে কীভাবে ছাদে পানির ট্যাংকের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশ হয়ে লুকিয়ে থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের, কীভাবে নিজের সহপাঠীর তাজা রক্তের স্রোতে ডুবে জীবন বাঁচাতে হয়েছিল বেঁচে যাওয়া ভাগ্যহতদের। সেই কালরাতের বীভৎসতা কেবল প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিতেই আটকে থাকেনি; সেনাসদরের ওয়ারলেসে পাকিস্তানি ঘাতক অফিসারদের ক্রূর উল্লাস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রত্যক্ষপ্রমাণে তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল নারকীয়তার দলিল হয়ে আছে।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের মেগা-প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১” এ সংরক্ষিত হয়েছে সেই অভিশপ্ত রাতের হাড়হিম করা ইতিহাসের টুকরোগুলো। ২৫শে মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত গণহত্যা, ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের নারকীয়তা, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, ওয়ারলেস বার্তার গোপন সত্য এবং প্রামাণ্যচিত্রের আয়নায় সেই রক্তভেজা স্মৃতির এক বিস্তারিত আখ্যান এখানে তুলে ধরা হলো।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর ব্লুপ্রিন্ট এবং ঢাবির গণহত্যা
১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের চূড়ান্ত সংগ্রামের সময়। ৭ই মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর পুরো দেশ চলছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ এবং আওয়ামী লীগের নির্দেশনায়। কার্যত ৭ই মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান শাসিত হচ্ছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর পূর্ব পাকিস্তানস্থ গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন, বাঙালিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করতে হলে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে হলে তার আঘাত হানতে হবে দুটি জায়গায় এক. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এবং দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে অত্যন্ত গোপনে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর সামরিক ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন।
এই ব্লুপ্রিন্টের মূল নির্দেশনাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলগুলো সম্পূর্ণ কর্ডন বা ঘিরে ফেলা। ইকবাল হল এবং জগন্নাথ হলকে ‘সশস্ত্র বিদ্রোহীদের আস্তানা’ আখ্যা দিয়ে ভারী অস্ত্রে ধ্বংস করে দেওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র নেতাদের চিহ্নিত করে হত্যা করা।যেকোনো মূল্যে যেকোনো প্রতিরোধক বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং কোনো দয়া না দেখানো।
২৫শে মার্চ সন্ধ্যা বেলায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে করাচির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি টিক্কা খানকে সবুজ সংকেত দিয়ে যান। রাত ১১টা ৩০ মিনিটে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঘাতক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বহর কামান, ট্যাংক, আর সাজোঁয়া গাড়ি নিয়ে স্বাধিকারকামী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য শহরের দিকে ধেয়ে আসে।
১৯৭২ সালে বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২৫শে মার্চের রাত প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "আমার বাড়ি ঘিরে যখন ওরা বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল, আমি জানতাম আমার মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে হতে পারে। কিন্তু আমি পাকিস্তানি বাহিনীকে কোনো বাহানা দিতে চাইনি। আমি জানতাম, আমি ধরা না দিলে ওরা পুরো ঢাকাকে শ্মশান বানিয়ে ফেলবে যদিও শেষ পর্যন্ত ওরা ঠিক সেটাই করেছিল।"
১১ই এপ্রিল ১৯৭১, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, "পাকিস্তান আজ মৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও নিরীহ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে পাকিস্তান গণহত্যা শুরু করেছে, তার সাথে আর কোনো আপস হতে পারে না। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আজ নিজেদের ভূখণ্ড স্বাধীন করার জন্য ঐক্যবদ্ধ।"
কালরাতের প্রথম আঘাত নিলক্ষেত ও শাহবাগ দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ
ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বিশাল কনভয় মীরপুর রোড ধরে সোজা নিলক্ষেত ও ফার্মগেট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তবে ক্যাম্পাসে ঢোকার পথটি খুব সহজ ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় ছাত্র ও সাধারণ বাঙালিরা গাছ কেটে, ইট-পাথর ফেলে এবং পেট্রোল পাম্পের ড্রম দিয়ে রাস্তায় বিশালাকার ব্যারিকেড তৈরি করে রেখেছিল।
ফার্মগেটে প্রথম বাধা পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা মেশিনগানের গুলি চালিয়ে ব্যারিকেড গুঁড়িয়ে দেয়। রাত ১২টার দিকে সাঁজোয়া বহর নিলক্ষেত মোড় ও শাহবাগ মোড়ে এসে পৌঁছায়। সেই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ি ও চারপাশের নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রহরীদের ওপর প্রথম আক্রমণ চালানো হয়।
নিলক্ষেত মোড়ে ব্যারিকেড ভেঙে ঢুকতেই পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করে ট্রেসার বুলেটের বৃষ্টি। আকাশজুড়ে লাল আর সবুজ আলোর শিখা ফুঁড়ে নামছিল বুলেটের শীষ। মোর্টারের বিকট শব্দে কেঁপে উঠছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, স্যার সলিমুল্লাহ হলের চারপাশ এবং ইকবাল হলের দেয়ালগুলো। রাতের ঘুমে মগ্ন হাজার হাজার ছাত্র তখনও বুঝতে পারেনি, তাঁদের নিজেদের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে এক রক্তাক্ত কসাইখানায়।
অপারেশন সার্চলাইটের কমান্ডিং অফিসারদের নির্দেশ ছিল, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলের আলো বন্ধ করে দিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে হবে, যাতে একজন ছাত্রও পালিয়ে যেতে না পারে।”
২৭শে মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড, ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ এ ওয়াশিংটনকে পাঠানো বার্তা, "এখানে কোনো সামরিক অভিযান চলছে না; চলছে একতরফা এবং পরিকল্পিত 'বাছাইকৃত গণহত্যা' (Selective Genocide)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের তালিকা ধরে হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের সরকার এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ব্যর্থ হয়ে নৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিচ্ছে।"
ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) প্রথম প্রতিরোধ ও বীভৎস হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। 'স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' এর প্রধান কার্যালয় এবং ছাত্রনেতাদের মূল আস্তানা ছিল এই ইকবাল হল। স্বভাবতই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল রাগ ও আক্রোশের প্রথম শিকার হয় এই হলটি।
মোর্টার আক্রমণ ও রুমে রুমে অগ্নিকাণ্ড
রাত ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩ পাউইন্দাস (৩য় কম্যান্ডো ব্যাটালিয়ন) এবং ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা ইকবাল হল ঘিরে ফেলে। হলের ভেতরের ছাত্ররা সামান্য কিছু কাঠের লাঠি, পেট্রোল বোমা আর দু-একটি হালকা অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সেনাবাহিনীর ১০৬ মিলিমিটার রিকয়েললেস রাইফেল এবং ভারী ট্যাংক আক্রমণের সামনে তা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।
সৈন্যরা প্রথমে হলের প্রধান ফটক উড়িয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় মোর্টার শেলিং। মোর্টারের আঘাতে ইকবাল হলের ৩য় ও ৪থ তলার একাধিক কক্ষ মুহূর্তে ভেঙে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে অনেক ছাত্র ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে দরজাতেই তাঁদের ঝাঝরা করে দেওয়া হয় মেশিনগানের গুলিতে।
ছাদ, পানির ট্যাংক এবং নারকীয় অভিজ্ঞতার বয়ান
ইকবাল হলের যে সব ছাত্র জীবন বাঁচাতে হলের ছাদে বা পানির ট্যাংকের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের ভাগ্যও সুপ্রসন্ন হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ঘাতক সৈন্যরা ছাদে উঠে লাইট জ্বালিয়ে তল্লাশি চালায়।
ছাদের কোণে এবং পানির ট্যাংকের পেছনের সামান্য ফাঁকে ৫-৬ জন ছাত্র গায়ে গা লাগিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিলেন। সৈন্যরা পানির ট্যাংকের ভেতরে ও নিচে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করে। বুলেটের আঘাতে ট্যাংকের ভেতরের পানি রক্তে লাল হয়ে নর্দমা দিয়ে নিচে নামতে থাকে। অনেকে গুলিতে সাথে সাথে মারা যান, আর যাঁরা আহত হয়ে কাতরাচ্ছিলেন, তাঁদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হলের চারতলা থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।
হলের প্রতিটি ব্লকে ঢুকে সৈন্যরা রুমের দরজা বুট দিয়ে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। যে ঘরেই আলো দেখা গেছে বা পেছনের বাথরুমে মানুষ লুকিয়ে থাকার সন্দেহ হয়েছে, সেখানেই গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়েছে। ইকবাল হলের করিডোরগুলো মুহূর্তের মধ্যে রক্ত, মগজ, হাড় আর পোড়া চামড়ার গন্ধে নরকে পরিণত হয়।
১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ যুক্তরাজ্যের ‘ডেইলি টেলিগ্রাম’ পত্রিকার সাংবাদিক সাইমন ড্রিং বলেন, "ঢাকার রাস্তাগুলো এখন পোড়া গন্ধ আর লাশের দুর্গন্ধে ভরা। ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে পাকিস্তানি বাহিনী যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা কেবল কোনো সামরিক অভিযান নয়; তা ছিল নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর চালানো এক বর্বর ও পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। ট্যাংকের গোলা ও মেশিনগানের মুখে ছাত্ররা কোনো সুযোগই পায়নি।"
জগন্নাথ হল: গণকবর, সংখ্যালঘু নিধন ও চরম বর্বরতা
ইকবাল হলে যখন তাণ্ডব চলছিল, ঠিক একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্যালঘু (হিন্দু) ছাত্রদের আবাসিক হল জগন্নাথ হলে নেমে এসেছিল আরও বেশি ভয়াবহ ও পরিকল্পিত বিপর্যয়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই হলটিকে একটি বিশেষ জাতিগত ও ধর্মীয় নিধনের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
নর্থ ও সাউথ ব্লকে গণহত্যা
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স জগন্নাথ হলের উত্তর ও দক্ষিণ ব্লকে একযোগে হামলা চালায়। হলের স্টাফ কোয়ার্টার, কর্মচারী পল্লি এবং ছাত্রদের কামরায় ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। জগন্নাথ হলের ছাদে এবং বারান্দায় সারিবদ্ধভাবে ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়।

হলের সিঁড়ি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে নামছিল ছাদ থেকে নিচতলা পর্যন্ত। ছাত্ররা যখন বাঁচার জন্য কাকুতি-মিনতি করছিলেন, তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা অট্টহাসি হেসে তাঁদের বুকে বেয়োনেট চালিয়ে দিচ্ছিল।
হলের মাঠে গণকবর ও জীবন্ত মানুষকে মাটিচাপা
জগন্নাথ হলের এই হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে নারকীয় অধ্যায়টি ঘটেছিল ২৬শে মার্চ ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে। বেঁচে থাকা এবং সামান্য আহত ছাত্র ও হলের কর্মচারীদের টেনে-হিঁচড়ে জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বলি মাঠে (সাউথ হাউসের সামনের মাঠ) নিয়ে আসা হয়।
ঘাতক সৈন্যরা তাঁদের নির্দেশ দেয় মাঠের এক কোণে বড় গর্ত বা নালা খুঁড়তে। নিজেদের গণকবর নিজেদের হাতেই খুঁড়তে হয়েছিল সেই হতভাগ্য বাঙালি সন্তানদের। গর্ত খোঁড়া শেষ হওয়া মাত্রই সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাঁদের ওপর এলএমজি (LMG)-র ব্রাশফায়ার চালানো হয়।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গুলিতে যাঁরা সঙ্গে সঙ্গে মারা যাননি, কেবল আহত হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তাঁদের আলাদা করে মারা হয়নি। তাঁদেরও মৃতদেহগুলোর সাথেই ঠেলে গর্তের ভেতর ফেলে দেওয়া হয় এবং ওপর থেকে বুলডোজার দিয়ে মাটি চাপা দেওয়া হয়। মাটির নিচ থেকে হাত-পা নাড়ানোর করুণ দৃশ্য দেখেও ঘাতকদের পাষাণ হৃদয় একটুও গলেনি।
সেনা সদর থেকে ফিল্ড কমান্ডারের গোপন বার্তাকথন (২৫শে মার্চ ১৯৭১, রাত ২:১৫ মিনিট):
"ভিক্টর ফক্স টু কন্ট্রোল... টার্গেট এ বি সি (বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা) সম্পূর্ণ কর্ডন করা হয়েছে। ইকবাল ও জগন্নাথ হলে আর কোনো রেজিস্ট্যান্স নেই। অল ক্লিয়ার!"
যুক্তরাজ্যের তৎকালীন ব্রিটিশ এমপি জন স্টোনহাউস বলেছিলেন, "ঢাকায় যা ঘটে চলেছে, তা কেবল কোনো গৃহযুদ্ধ নয়। হিটলার যেভাবে ইউরোপে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক সেভাবেই একটি জাতির মেধা ও বিবেককে মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।"
প্রফেসর নূরুল উলার গোপন ভিডিও রেকর্ড
জগন্নাথ হলের এই নারকীয় গণহত্যার একটি ঐতিহাসিক দৃশ্যপট গোপনে ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমান বুয়েট) অধ্যাপক নূরুল উলা তাঁর কোয়ার্টারের জানালা থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে জগন্নাথ হলের মাঠে ঘটা গণহত্যার ভিডিও ধারণ করেন।
৮ মিলিমিটার ক্যামেরায় ধারণ করা সেই ঝাপসা কিন্তু নির্মম ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনারা কীভাবে ছাত্রদের লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। একঝাঁক গুলিতে কীভাবে মানুষগুলো এক সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। কীভাবে লাশগুলোকে টেনে হেঁচড়ে এক জায়গায় স্তূপ করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে এই ভিডিও ফুটেজটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ২৬শে মার্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যার এক খণ্ডনহীন প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপিত হয়েছিল।
বুদ্ধিজীবী নিধন: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমহল ও কর্মচারীদের ওপর আক্রমণ
২৫শে মার্চের কালরাতে ঘাতকরা কেবল সাধারণ ছাত্রদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা জানত যে একটি জাতির মূল মেরুদণ্ড হলো তার বুদ্ধিজীবী সমাজ। তাই অত্যন্ত নিখুঁত তালিকা ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবাসন ও কোয়ার্টারগুলোতে তাণ্ডব চালানো হয়।
ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (জি সি দেব): বিশ্বখ্যাত মানবতাবাদী দার্শনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৎকালীন প্রধান ড. জি সি দেব ছিলেন অত্যন্ত অহিংস প্রকৃতির মানুষ। তিনি সর্বদাই বলতেন, "সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া আমার আর কোনো দর্শন নেই।" কিন্তু এই অহিংস মানুষটিকেও পাকিস্তানি ঘাতকেরা ক্ষমা করেনি। নিলক্ষেতের শিক্ষকদের কোয়ার্টারে ঢুকে ড. দেবকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর দত্তক নেওয়া কন্যা রোকেয়া বেগম ও তাঁর স্বামীকেও ঘাতকেরা রেহাই দেয়নি। পরবর্তীতে ড. দেবের মৃতদেহ জগন্নাথ হলের মাঠে গণকবরে ফেলে দেওয়া হয়।
ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা: ইংরেজি বিভাগের প্রখ্যাত শিক্ষক এবং জগন্নাথ হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা নিজ বাসভবনেই আক্রান্ত হন। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁর দরজায় লাথি মেরে ভেতরে ঢোকে এবং পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। তিনি নিজের নাম বলা মাত্রই স্ত্রীর সামনে তাঁকে টেনে বাইরে এনে গুলি করা হয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় তিনি চার দিন যন্ত্রণায় ছটফট করার পর হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
আহত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর পূর্বে প্রদত্ত শেষ বয়ানে ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা বলেন,
"তারা এসে দরজায় লাথি মারল। আমার নাম জিজ্ঞেস করল। আমি নাম বলতেই তারা কোনো কথা না বলে আমাকে টেনে বাইরে এনে গুলি করল। আমার কোনো অপরাধ ছিল না, আমার অপরাধ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাঙালি।"
শহীদ ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার সহধর্মিণী বাসন্তী গুহঠাকুরতা বলেছিলেন, "বাইরে তখন বৃষ্টির মতো মোর্টারের শব্দ আর ঘাতকদের হিংস্র চিৎকার। ঘরের অন্ধকারে বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম। জ্যোতির্ময় তখন অত্যন্ত ধীরে আমাকে বলেছিল 'ওরা আমাদের দেহ বুলেট দিয়ে ঝাজরা করতে পারবে বাসন্তী, কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে হত্যা করতে পারবে না।'"
অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য: পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রদ্বীত তরুণ শিক্ষক অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য জগন্নাথ হলের সহকারী হাউস টিউটর হিসেবে হলের কোয়ার্টারেই অবস্থান করছিলেন। ছাত্রদের বাঁচাতে তিনি ঘাতকদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু নির্মম পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকেও রেহাই দেয়নি। হলের বারান্দাতেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করে তাঁর লাশ হলের মাঠের গণকবরে ছুড়ে ফেলা হয়।
অন্যান্য শহীদ শিক্ষক ও কর্মচারীবৃন্দ
সেই রাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে একে একে শহীদ হন:
ড. এ এন এম মনিরুজ্জামান: পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক, যাকে তাঁর ভাই ও ভাগ্নেসহ নিজের বাসভবনে হত্যা করা হয়।
অধ্যাপক ফজলুর রহমান খান: মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।
ড. কায়সার পাশা: পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক।
অধ্যাপক শরাফত আলী: গণিত বিভাগের শিক্ষক।
অধ্যাপক এ আর খান খাদিম: পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ কর্মচারী, মালী, ক্যানটিন বয়, দারোয়ানদের মতো নিরীহ বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। রোকেয়া হলের ক্যানটিন বয় চিত্র কুমার ও কান্তিলাল, মধুর ক্যানটিনের প্রতিষ্ঠাতা মধুদা (মধুসূদন দে), তাঁর স্ত্রী, পুত্র ও পুত্রবধূকে একই সাথে ওই রাতেই জগন্নাথ হল ও মধুর ক্যানটিন থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
শহীদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশা তাঁর ১৯৭১ সালে লেখা কালজয়ী উপন্যাস ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ এ লিখেছেন, "যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র মাটি আমার প্রিয় ছাত্রদের তাজা রক্তে লাল হলো, সেদিনই সুনিশ্চিত হয়ে গেল এই ভূখণ্ডে পাকিস্তানি পতাকা আর কোনো দিন সম্মানের সঙ্গে উড়তে পারবে না। নতুন সূর্য উঠবেই।"
ওয়ারলেসের ঘাতক সেনা কর্মকর্তাদের অমানবিক উল্লাস
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর এই নারকীয় অপারেশনের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও প্রামাণিক দলিল পাওয়া যায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ গোপন রেডিও ও ওয়ারলেস যোগাযোগের গোপন বার্তা আড়িপাতার মাধ্যমে। তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে ইন্টারসেপ্ট হওয়া পাকিস্তানি মিলিটারির রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির কথোপকথন পরবর্তীতে বিশ্বগণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা (কন্ট্রোল রুম) এবং ফিল্ডে থাকা ঘাতক কমান্ডারদের কথা শুনে বোঝা যায়, তারা কোনো সেনা অভিযান পরিচালনা করছিল না, বরং চালচ্ছিল এক উল্লাসজনক মানব শিকার।
কন্ট্রোল থেকে ফিল্ড কমান্ডারকে বার্তা: "৮৮ (৮৮ ফিল্ড ইউনিট), হোয়াট ইজ দ্য এস্টিমেট অব ক্যাজুয়ালটিজ এট দ্য ইউনিভার্সিটি?" (বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহতের সংখ্যা কত মনে হচ্ছে?)
ফিল্ড কমান্ডার (ক্যাপ্টেন বুখারি/কমান্ডিং অফিসার)-এর উত্তর: "৮৮ টু কন্ট্রোল... এরাউন্ড ৩০০ কিলেড। আই রিপিট, ৩০০ কিলেড! টার্গেট সম্পূর্ণ ক্লিয়ার।"
কন্ট্রোল রুম থেকে উল্লাস: "ওয়েল ডান! এক্সিলেন্ট জব! ৮৮, যেকোনো নড়াচড়া দেখলেই শুট টু কিল।"
এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনটিই প্রমাণ করে যে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৩০০ জন ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এটি কোনো যুদ্ধের স্বাভাবিক ক্ষতি ছিল না, ছিল শতভাগ পরিকল্পিত এবং ঠান্ডা মাথায় চালানো ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা।
১৩ই জুন ১৯৭১ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ‘দ্য সানডে টাইমস’ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ‘Genocide’ এ লিখেছিলেন, "এক পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা আমাকে অত্যন্ত গর্বের সাথে বলেছিলেন 'আমরা এখানে নিশ্চিত করতে এসেছি যে, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে কোনো বাঙালি যেন আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে বা বিদ্রোহ করার সাহস না পায়। আমরা এই ভূখণ্ডকে নতুন করে গড়ে তুলব।'"
তানভীর মোকাম্মেলের মেগা-প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর নির্মিত অন্যতম নিরপেক্ষ, বিস্তারিত ও প্রামাণিক তথ্যচিত্র হলো খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত মেগা-প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১”। বেশ কয়েক ঘণ্টার এই বিশাল প্রামাণ্যচিত্রে ২৫শে মার্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অভিশপ্ত কালরাতের প্রত্যক্ষদর্শী, অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ছাত্র, শিক্ষকমণ্ডলী এবং শহীদদের স্বজনদের যে বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে, তা শ শুনলে আজও রুদ্ধ হয়ে আসে শ্বাসনালী।
তানভীর মোকাম্মেলের মেগা-প্রামাণ্যচিত্রের ভিডিও
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও পানির ট্যাংকের স্মৃতি
তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্রে ইকবাল হলের এক ছাত্র বর্ণনা দিতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তিনি জানান, কীভাবে রাতের আঁধারে মোর্টারের গোলা আসার পর চারদিক কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। তিনি এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু হলের ছাদের পানির ট্যাংকের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
সৈন্যরা যখন ছাদে ওঠে, বুটের আওয়াজ আর বেয়োনেটের খটখট শব্দ তাঁদের বুকের স্পন্দন বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। সৈন্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ট্যাংকের পাইপ ফেটে রক্তমিশ্রিত পানি তাঁদের গায়ের ওপর পড়েছিল। তাঁর পাশেই থাকা বন্ধুটির মাথায় বুলেট লেগে মুহূর্তে তিনি শান্ত হয়ে যান, কিন্তু প্রাণভয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি সেই তরুণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের পরম বন্ধুর লাশের পাশে রক্তে ভেসে রাত কাটাতে হয়েছিল তাঁকে।
লাশের স্তূপ থেকে ফিরে আসার গল্প
জগন্নাথ হলের এক বেঁচে যাওয়া কর্মচারী ও ছাত্রের বিবরণও তানভীর মোকাম্মেলের এই প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে। গুলি খাওয়ার পর তিনি মারা যাননি, কিন্তু লাশের সারির নিচে পড়ে যান। ওপর থেকে একের পর এক বন্ধুর মৃতদেহ তাঁর ওপর আছড়ে পড়ে।
পরদিন ভোরে যখন সেনা সদস্যরা গর্তে সবাইকে ফেলে মাটি দেওয়া শুরু করে, তখন তিনি লাশের নিচে দম আটকে কোনোমতে চুপ করে পড়ে থাকেন। সেনাসদস্যরা চলে যাওয়ার পর রক্তাক্ত মাটি ঠেলে তিনি যেভাবে অলৌকিকভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন, সেই গল্প ইতিহাসকে শিহরিত করে তোলে।
তানভীর মোকাম্মেলের “১৯৭১” কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যার এক অখণ্ড ঐতিহাসিক বিশ্বস্ত দলিল, যা নতুন প্রজন্মকে ২৫শে মার্চের নারকীয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
একনজরে ২৫শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যার সারসংক্ষেপ
পাঠকদের সুবিধার্থে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিচালিত গণহত্যার মূল তথ্যসমূহ নিচে একটি সুবিন্যস্ত সারণীর (Table) মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
গণহত্যার মূল ক্ষেত্রসমূহ | সংক্ষিপ্ত ও নিখুঁত ঐতিহাসিক বিবরণ |
অভিযানের সাংকেতিক নাম | অপারেশন সার্চলাইট (Operation Searchlight)। |
তারিখ ও প্রাথমিক সময় | ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ (বৃহস্পতিবার রাত ১১:৩০ মিনিট থেকে শুরু)। |
প্রধান লক্ষ্যবস্তু (ক্যাম্পাস) | ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল ও শিক্ষাকোয়ার্টার। |
আক্রমণকারী ঘাতক বাহিনী | পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩য় কম্যান্ডো ব্যাটালিয়ন, ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও ২২ বালুচ রেজিমেন্ট। |
ব্যবহৃত মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র | M47 প্যাটনের ভারী ট্যাংক, ১০৬ মিমি রিকয়েললেস রকেট, ভারী মোর্টার ও এলএমজি ট্রেসার বুলেট। |
মৌলিক কারণ ও উদ্দেশ্য | বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল কেন্দ্র ধ্বংস করা এবং স্বাধিকার আন্দোলনকারী ছাত্রদের নিশ্চিহ্ন করা। |
প্রথম রাতের আনুমানিক শহীদ | বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল প্রথম রাতেই ৩০০ জন বা তার বেশি ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারী শহীদ হন। |
শহীদ বিশিষ্ট শিক্ষকবৃন্দ | ড. জি সি দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. এ এন এম মনিরুজ্জামান, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য প্রমুখ। |
শহীদ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব/কর্মচারী | মধুদা (মধুসূদন দে - মধুর ক্যানটিন), ক্যানটিন কর্মী চিত্র কুমার, কান্তিলাল ও একাধিক হলের প্রহারীবৃন্দ। |
ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল | বুয়েটের অধ্যাপক নূরুল উলার গোপনে ধারণকৃত ৮ মিমি ভিডিও ও প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১” (তানভীর মোকাম্মেল)। |
রোকেয়া হল ও নারী শিক্ষার্থীদের ওপর আঘাতের বাস্তবতা
২৫শে মার্চের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র নারী আবাসিক হল রোকেয়া হল-ও পাকিস্তানি ঘাতকদের হিংস্র থাবা থেকে রেহাই পায়নি। যদিও তৎকালীন সময়ে অধিকাংশ ছাত্রী মার্চের অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে আগেই হল ত্যাগ করে পরিবারের কাছে চলে গিয়েছিলেন, তবুও কিছু ছাত্রী ও হলের কর্মচারীদের পরিবার সেখানে অবস্থান করছিল।
পাকিস্তানি সেনারা রোকেয়া হলে প্রবেশ করে ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়। হলের কর্মচারীদের স্টাফ কোয়ার্টারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
হলের মালী ও প্রহরীদের টেনে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। বেশ কয়েকজন আবাসিক কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের নারীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। হলের ভেতরে যে কয়জন ছাত্রী ছিলেন, তাঁদের কক্ষে গ্রেনেড ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় এবং প্রাঙ্গণজুড়ে ধ্বংসলীলা চালানো হয়।
পরদিন ২৬শে মার্চ সকালে রোকেয়া হলের চারপাশের দেয়াল এবং কর্মচারীদের কোয়ার্টার আগুনে ভস্মীভূত হয়ে ধোঁয়া উঠছিল, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারকীয় তাণ্ডবের নীরব সাক্ষ্য বহন করছিল।
অপারেশন সার্চলাইটের সামরিক কমান্ড স্ট্রাকচার ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা
২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত এই গণহত্যার পেছনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট কমান্ড হায়ারার্কি কাজ করেছিল। সার্বিক সামরিক অভিযানের নেপথ্যে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান এবং পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।
২৫শে মার্চ করাচি যাত্রার পূর্বে এবং ২৬শে মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে জেনারেল ইয়াহিয়া খান বলেন, "শেখ মুজিব ও তার অনুসারীরা দেশের শত্রু। তারা পাকিস্তানের ঐক্য বিনষ্ট করতে চেয়েছে... এই অপরাধকে কোনোভাবেই শাস্তিহীন থাকতে দেওয়া হবে না। এবার আমি তাদের কঠোরভাবে শিক্ষা দেব।"
অপারেশন সার্চলাইটের কৌশলগত নির্দেশ হিসেবে বহুল আলোচিত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও টিক্কা খান নির্দেশ দেন, "আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।" (We want the land, not the people.)
মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখিত উদ্ধৃতি: "পূর্ব পাকিস্তানের এই সবুজ ভূখণ্ডকে প্রয়োজনে রক্তে লাল করে দেওয়া হবে।" (The green land of East Pakistan will be painted red.)
ঢাকা শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় জোনের দায়িত্ব: ৫৭তম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার আর আর জহিরকে ঢাকা শহর পুনর্দখল এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কর্ডন করার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ফিল্ড কমান্ডিং অফিসার: ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে মূল আঘাত হানে ৩য় কম্যান্ডো ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল জহির এবং ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর ফারুক।
অপারেশনাল কোড: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়ারলেস যোগাযোগের মূল কোড ছিল ‘ব্লিটজ’ (Blitz)। সংকেত পাওয়ার সাথে সাথেই কুর্মিটোলা এবং পিলখানা থেকে ভারী অস্ত্রসজ্জিত সাঁজোয়া বহর বেরিয়ে আসে।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ফজলুল হক মুসলিম হলে তাণ্ডব
ইকবাল ও জগন্নাথ হলের বাইরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য আবাসিক হলগুলোতে একই রাতে সমান্তরাল আক্রমণ চালায় ঘাতক বাহিনী।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (SM Hall): রাত ১টার দিকে সাঁজোয়া যান নিয়ে পিলখানার দিক থেকে একদল সেনা সদস্য এসএম হলে প্রবেশ করে। প্রধান গেট রিকয়েললেস রাইফেল দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। হলে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন ছাত্রকে বারান্দা ও রুম থেকে টেনে এনে হলের অভ্যন্তরীণ উঠানে গুলি করে হত্যা করা হয়। হলের কর্মচারী ও প্রহরীদের ওপরও নির্বিচারে গুলি চালানো হয়।
ফজলুল হক মুসলিম হল: হলের পিছনের দেয়াল টপকে সেনা সদস্যরা ভেতরে ঢোকে। রুমের দরজা ভেঙে তল্লাশি চালানোর নামে একাধিক ছাত্রকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করা হয়। সেই রাতের আক্রমণে হলের কর্মচারী ক্যানটিন স্টাফসহ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত ও শহীদ হন।
শিক্ষকদের আবাসিক কোয়ার্টারে তাণ্ডবের বিস্তারিত বিবরণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টারগুলোতে (বিশেষ করে নিলক্ষেত ৯ নম্বর বিল্ডিং এবং ফুলার রোডের আবাসিক ভবনসমূহ) সেনাবাহিনী চরম পরিকল্পিত হামলা চালায়।
ড. এ এন এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখ্যান বিভাগ): নিলক্ষেতের ৯ নম্বর ভবনে ঘাতকরা ঢুকে ড. মনিরুজ্জামান, তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শরাফত আলী (গণিত বিভাগের শিক্ষক), তাঁর পুত্র ও ভাগ্নেকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে ব্রাশফায়ার করে। একই পরিবারের একাধিক সদস্য সেই রাতেই ধূলিসাৎ হয়ে যান।
অধ্যাপক ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ): ফুলার রোডের কোয়ার্টারে অবস্থানকালে ঘাতকেরা তাঁর দরজায় আঘাত করে। দরজা খোলার সাথে সাথেই ড. ফজলুর রহমানকে তাঁর স্ত্রীর সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়।
ড. কে এ মুনিম ও ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: তৎকালীন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও ড. কে এ মুনিম অলৌকিকভাবে রেহাই পেলেও নিজেদের বারান্দা ও পাশ্ববর্তী বাসা থেকে সহকর্মীদের আকুতি ও বুলেটের বিকট শব্দ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের লেখায় এই রাতের বীভৎস বিবরণ উঠে আসে।
সাইমন ড্রিং ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গণহত্যার উন্মোচন
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ কৌশলগতভাবে ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থানরত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ জন আন্তর্জাতিক সাংবাদিককে বন্দি করে ফেলে। ২৬শে মার্চ সকালে তাঁদের জোরপূর্বক বিমানে তুলে করাচি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে গণহত্যার কোনো খবর বিশ্বমিডিয়ায় না পৌঁছায়।
সাইমন ড্রিংয়ের সাহসিকতা: যুক্তরাজ্যের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ (The Daily Telegraph)-এর ২৭ বছর বয়সী অকুতোভয় সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এবং বিখ্যাত আলোকচিত্রী মিশেল লরেন্ট হোটেলের ছাদ ও রান্নাঘরে আত্মগোপন করে থেকে যান।
ক্যাম্পাস পরিদর্শন: ২৭শে মার্চ ভোরে সাময়িক কারফিউ শিথিল হলে সাইমন ড্রিং অত্যন্ত গোপনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ইকবাল হল, জগন্নাথ হল এবং শহীদ মিনার এলাকা ঘুরে দেখেন। তিনি জলন্ত ধ্বংসস্তূপ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গলিত লাশ এবং রক্তাপ্লুত মাঠের ছবি তোলেন ও তথ্য সংগ্রহ করেন।
ঐতিহাসিক প্রতিবেদন: দেশ থেকে গোপনে পালিয়ে গিয়ে ৩০শে মার্চ ১৯৭১ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সাইমন ড্রিংয়ের বিশ্ব আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রতিবেদন "Tanks Crush Revolt in Pakistan" (অন্য সংস্করণে "Dateline Dacca")। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিচালিত নারকীয় জেনোসাইডের প্রকৃত খবর।
মার্চ ১৯৭১ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গ বলেছিলেন, "২৫শে মার্চের রাতে ঢাকা শহর আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের নিজেদের ভূখণ্ডের নাগরিকদের ওপর এমনভাবে ট্যাংক, তোপ আর মোর্টার ব্যবহার করছিল, যেন তারা শত্রুপক্ষের কোনো সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।"
যুক্তরাজ্যের তৎকালীন ব্রিটিশ এমপি জন স্টোনহাউস বলেছিলেন, "ঢাকায় যা ঘটে চলেছে, তা কেবল কোনো গৃহযুদ্ধ নয়। হিটলার যেভাবে ইউরোপে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক সেভাবেই একটি জাতির মেধা ও বিবেককে মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।"
সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন সেনেট শুনানিতে এবং ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মন্তব্য করেন, "পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত নির্মমতা ও মানবজাতির বিরুদ্ধে সংঘটিত মারাত্মক অপরাধ। মার্কিন সরকারের অনতিবিলম্বে এই নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া উচিত।"
আর্চার ব্লাডের ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড (Archer K. Blood) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের গণহত্যা নিজ চোখে ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্রে প্রত্যক্ষ করেন।
টেলিগ্রাম প্রেরণ: আর্চার ব্লাড ২৭শে মার্চ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে একাধিক গোপন কূটনৈতিক বার্তা (যা ইতিহাসে Blood Telegram নামে খ্যাত) পাঠাতে থাকেন।
‘বাছাইকৃত গণহত্যা’ (Selective Genocide): আর্চার ব্লাড তাঁর টেলিগ্রামে স্পষ্ট ভাষায় লেখেন যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী যা করছে তা কোনো রাজনৈতিক দাঙ্গা বা অভিযান নয়; এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে এক পরিকল্পিত "Selective Genocide" বা বাছাইকৃত গণহত্যা।
মার্কিন নীতির বিরোধিতা: তৎকালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সরকারকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। আর্চার ব্লাড এবং তাঁর অধীনস্থ ২০ জন কূটনৈতিক কর্মকর্তা মার্কিন সরকারের এই নৈতিক নীরবতার বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিবাদলিপি পাঠায়, যার খেসারত হিসেবে ব্লাডকে পরবর্তীতে ঢাকা থেকে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও সাংস্কৃতিক প্রতীক ধ্বংসের মানসিকতা
পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সংস্কৃতির মূল উৎপাটন করা। সেই উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অবস্থিত বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীকগুলোতে আঘাত হানা হয়।
শহীদ মিনার ধ্বংস: ২৬শে মার্চ ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে সেনাসদস্যরা ট্যাংক ও ভারী গোলন্দাজ বাহিনী দিয়ে ভাষা আন্দোলনের স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে গুঁড়িয়ে দেয়।
‘মসজিদ’ সাইনবোর্ড: শহীদ মিনারের ভিত্তির ওপর ইটের ধ্বংসস্তূপের ওপর পাকিস্তানি সেনারা কাঠের সাইনবোর্ডে লিখে দেয় "Masjid" (মসজিদ), যা ছিল অত্যন্ত আপত্তিকর এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় আঘাত হানা পরিকল্পিত চক্রান্ত।
রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম: ২৭শে মার্চ সকালে সামরিক বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাচীন রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রমে হামলা চালায়। মন্দির ও আশ্রমের সেবায়েত, সাধু ও দর্শনার্থীসহ প্রায় শতাধিক মানুষকে হত্যা করে পুরো প্রাঙ্গণ ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
জুলাই-আগস্ট ১৯৭১ জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার অপচেষ্টা
গণহত্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ দিন সম্পূর্ণ জনশূন্য ও থমথমে অবস্থায় থাকে। বিশ্বজনমত শান্ত করতে এবং পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ দেখানোর জন্য তৎকালীন সামরিক গভর্নর ড. এ এম মালিক ও সামরিক জান্তা আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় খোলার আদেশ জারি করে।
সহযোগিতাকারী উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের জন্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ছাত্র ও শিক্ষকদের বয়কট: কিন্তু সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষকরা এই আহ্বান সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ও বয়কট করেন। ক্লাসরুমগুলো খালি পড়ে থাকে। অধিকাংশ অকুতোভয় ছাত্র ততদিনে ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলোতে পৌঁছে গিয়েছেন এবং ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ গঠন করে পুনরায় ঢাকায় ফিরে এসে গেরিলা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অর্জন
২৫শে মার্চের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি শাসকদের শেষ আশাটুকুও চিরতরে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।
স্বাধীনতার অমলিন ভিত্তি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের আত্মত্যাগ বাঙালি জাতিকে বোঝাতে পেরেছিল যে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই।
মুক্তিবাহিনীর নিউক্লিয়াস: ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের যে ছাত্ররা ২৫শে মার্চ রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁরাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক সংগঠক ও গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তের নদী পেরিয়েই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয়। এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ধূলিকণা আজও স্মরণ করিয়ে দেয় এক মহাকাব্যিক আত্মত্যাগের ইতিহাস।
রক্তভেজা ফিনিক্স: গণহত্যা থেকে উদিত স্বাধীন বাংলাদেশ
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ভেবেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ জন ছাত্র ও প্রথিতযশা শিক্ষকদের হত্যা করে, তাঁদের রক্তে হলগুলোর করিডোর ভাসিয়ে দিলে বাঙালি জাতি ভয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, অত্যাচারী শাসকরা সর্বদাই হিসেব মেলাতে ভুল করে।
২৫শে মার্চের সেই রক্তস্রোত বাঙালিকে ভয় পাইয়ে দেয়নি; বরং ভীতিকে রূপান্তরিত করেছিল চরম প্রতিশোধের অগ্নিশিখায়। যে ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের মাটি রক্তে লাল হয়েছিল, সেই হলের বেঁচে যাওয়া ছাত্ররাই পরদিন সকালে ক্যাম্পাসের সীমানা ডিঙিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন সারা বাংলাদেশে। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল মুক্তিবাহিনী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের সেই রক্ত বৃথা যায়নি। ২৫শে মার্চের কালরাতে যে আগুনের বীজ পাকিস্তানি সৈন্যরা বুনে দিয়েছিল, নয় মাসের বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সেই আগুনেই ছাই হয়ে গিয়েছিল পশতু আর পাঞ্জাবি হানাদারদের অহংকার। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, তার ভিত্তিপ্রস্তরটি রচিত হয়েছিল ২৫শে মার্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই।
২৫শে মার্চ কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়; এটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক পরম বেদনার এবং পরম গৌরবের স্মারকমূল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ, ইকবাল হলের অন্ধকার ধ্বংসস্তূপ আর জগন্নাথ হলের সেই গণকবর আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ কোনো উপহার পাওয়া ভূখণ্ড নয়। ৩ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ অকুতোভয় শহীদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১” এর মতো ঐতিহাসিক দলিলগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত শিক্ষা দেয় ইতিহাসকে ভুলে না যেতে। যে জাতি তার বীর শহীদদের আত্মত্যাগকে ভুলে যায়, সে জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। ২৫শে মার্চের রক্তভেজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা ও অদম্য সাহসের সর্বজনীন প্রতীক। শহীদদের সেই অমর আত্মত্যাগ শতবর্ষ ধরে বাঙালির প্রতিটি স্পন্দনে রক্তে ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে থাকবে চিরকাল।
তথ্যসূত্র:
১. প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১”: তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত মেগা-প্রামাণ্যচিত্র “১৯৭১” (মুক্তি: ২০০৬)।
২. জগন্নাথ হলের গণহত্যার ভিডিও: অধ্যাপক নূরুল উলা (তৎকালীন ইপ্সুয়েট/বর্তমান বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের শিক্ষক) কর্তৃক ৮ মিলিমিটার ক্যামেরায় গোপনে ধারণকৃত ভিডিও (২৬শে মার্চ ১৯৭১)।
৩. সাইমন ড্রিং-এর প্রতিবেদন: "Tanks Crush Revolt in Pakistan" (বা "Dateline Dacca"), দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ (The Daily Telegraph, UK), প্রকাশনা তারিখ: ৩০শে মার্চ ১৯৭১।
৪. অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর প্রচ্ছদ প্রতিবেদন: "Genocide", দ্য সানডে টাইমস (The Sunday Times, UK), প্রকাশনা তারিখ: ১৩ই জুন ১৯৭১।
৫. সিডনি শ্যানবার্গ-এর প্রতিবেদন: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times), মার্চ-এপ্রিল ১৯৭১-এর ঢাকা কভারেজ।
৬. 'রাইফেল রোটি আওরাত': শহীদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশা রচিত কালজয়ী উপন্যাস
৭. ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার শেষ বক্তব্য ও স্মৃতিকথা
৮. 'অপারেশন সার্চলাইট' এর ব্লুপ্রিন্ট ও সামরিক পরিকল্পনা: Major General Khadim Hussain Raja রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “A Stranger in My Own Country: East Pakistan, 1969-1971” (Oxford University Press)।
৯. মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর বক্তব্য: Rao Farman Ali রচিত গ্রন্থ “How Pakistan Was Divided”।















